মৃত্যুর রাতে বারে ‘স্যাড মিউজিক’ চালাতে বলেছিলেন তাহসিফ, তদন্তে নতুন তথ্য

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি মৃত্যুর দিন রাতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে গিয়েছিলেন বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপ ও এক তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে। সেখানে সাধারণ গান চলছিল। একপর্যায়ে তাহসিফ ‘স্যাড মিউজিক’ বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে ওই তরুণীকে তিনি বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’
বিজ্ঞাপন
রাত ১১টা ৫১ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যান তাঁরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পুরো সময়ই তাহসিফের মন খারাপ ছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। সূত্রটির ভাষ্য, ওই তরুণী অন্য এক ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোয় তাহসিফের মন খারাপ ও ক্ষোভ ছিল। তবে বিষয়টি তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে।
সিসিটিভিতে বারে প্রবেশ ও বের হওয়ার দৃশ্য
বিজ্ঞাপন
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ, দীপ ও ওই তরুণী উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান। তাঁরা মোটরসাইকেলে সেখানে যান। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে দীপকে আসতে দেখা যায়। পরে তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন।
অন্য একটি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও ওই তরুণী লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছান দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে তাঁরা মোটরসাইকেলে করে চলে যান।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাহসিফ এর আগেও একাধিকবার ওই রেস্টুরেন্টে নারী সঙ্গী নিয়ে গিয়েছিলেন। একবার বারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে নিজের পরিচয় নিয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বারে সময় কাটানোর পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। এলাকাটি মাদক সেবন ও বিক্রির জন্য পরিচিত। সেখানে মাদকসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে তাঁরা গিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত দল। এ বিষয়ে কিছু সূত্র ও আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
বিজ্ঞাপন
বারের কর্মকর্তার বক্তব্য
নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের জেনারেল ম্যানেজার ও সাবেক মেরিটাইম ক্যাপ্টেন হাসান হাবিব বলেন, ‘সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি শেষবার যেদিন রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন, সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন তিনি একই এক তরুণীসহ রেস্টুরেন্টে এসেছিলেন। এ সময় তাদের সঙ্গে দীপ ও দীপের সঙ্গে একজন তরুণীও ছিলেন (সম্ভবত দীপের বান্ধবী)। তারা রেস্টুরেন্টে গান শুনেছেন, নাচানাচি করেন এবং বেশ আনন্দ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগের একদিন যাওয়ার সময় তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয় ও কথা হয়। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি বর্তমানে আন্ডারকভার হিসেবে একটি স্বনামধন্য গ্রুপে কাজ করছেন। তবে তাহসিফের দেওয়া পরিচয়কে মিথ্যা বলে মনে হয়েছিল তার। কারণ, কেউ আন্ডারকভার হিসেবে কাজ করলে সাধারণত নিজেকে আন্ডারকভার পরিচয় দেন না।’
বিজ্ঞাপন
হাসান হাবিবের ভাষ্য, ওই সময় তাহসিফ রেস্টুরেন্টের গান নির্বাচন ও পরিবেশের প্রশংসা করেছিলেন। গান উপভোগের পর তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় নেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
শেষবার তাহসিফ রেস্টুরেন্টে যাওয়ার দিন ‘স্যাড মিউজিক’ বাজানোর অনুরোধ করেছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, সেদিন তিনি সেখানে ছিলেন না। সাধারণত রেস্টুরেন্টে টেলিভিশনে প্রচারিত গান বাজানো হয় এবং মিউজিক পরিচালনার বিষয়টি তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন।
টঙ্গীর বস্তিতে কী ঘটেছিল, খতিয়ে দেখছে পুলিশ
বিজ্ঞাপন
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বারে যাওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে টঙ্গী মাজার বস্তির দিকে রওনা হন। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তাঁরা মাজার রোড দিয়ে বস্তিতে প্রবেশ করেন। অন্য একটি ফুটেজে দেখা যায়, দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেল একসঙ্গে সেখানে ঢুকছে। প্রথম মোটরসাইকেলে তাহসিফ একাই ছিলেন।
সূত্রের ভাষ্য, সেখানে তাহসিফ চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। এ সময় কয়েকজন মাদক কারবারি ঘটনাস্থলে আসেন। পরে কয়েকজন ধাওয়া করলে সবাই ছড়িয়ে পড়ে পালিয়ে যান।
দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফ তুরাগ নদে পড়ে যান এবং তিনি একটি পিলারের পাশে লুকিয়ে থাকেন। পরে টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে দীপ জানান, তিনি লেফটেন্যান্ট তাহসিফের সঙ্গে এসেছেন। পুলিশ সদস্যরা তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।
বিজ্ঞাপন
দীপের দাবি, তিনি বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কিছুক্ষণ পর মূল সড়ক খুঁজে পেয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে যান। তবে তাহসিফকে খুঁজে না নিয়ে দীপ একাই কেন বাসায় ফিরলেন, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সেই রাতে বস্তিতে ধাওয়া দেওয়া পুলিশ সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। ধাওয়াকারীরা কারা ছিলেন, তাহসিফ বা দীপের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ ছিল কি না এবং নদে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাহসিফের কী হয়েছিল—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। চার দিনের রিমান্ডে থাকা দীপকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘ওই এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা ডিউটিতে থাকেন।’
বিজ্ঞাপন
তরুণীকে চার দিনের রিমান্ডে
তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার ওই বারে প্রবেশ ও বের হতে দেখা যাওয়া তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার (১ নভেম্বর) চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা যায়। এরপর তাঁরা আরও কয়েকটি স্থানে যান এবং তাঁদের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথাবার্তা হয়।
বিজ্ঞাপন
রিমান্ড শুনানিতে প্রসিকিউটর শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, আগে রিমান্ডে থাকা অপর আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ওই তরুণীর তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামির সর্বোচ্চ রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বারে যাওয়ার আগে তাহসিফ ও ওই তরুণীর কোথায় দেখা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, রেস্টুরেন্টে বসে কী আলোচনা হয়েছে এবং বের হওয়ার পর তাঁদের কথোপকথন কেমন ছিল—এসব বিষয়ে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
নৌ-পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চার দিনের রিমান্ডে দীপ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। তবে সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার শুরুতে দীপ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, পরে তা পরিবর্তন করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। এ কারণে তাঁর সব বক্তব্য সত্য ধরে নেওয়া হচ্ছে না।
ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষার প্রতিবেদন অপেক্ষায়
শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের সময় তাঁর পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টি মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং সাধারণত তাঁর সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে তিনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতার কাটা সম্ভব ছিল না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি তাহসিফ কোনো মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানা যেতে পারে। শনিবার প্রতিবেদন পাওয়ার কথা রয়েছে।
তুরাগ নদঘেঁষা ঢাকা-গাজীপুর সংযোগস্থলের হাজি মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। নির্জন পথ, নদীতীরবর্তী অবস্থান ও অপরাধী চক্রের প্রভাবের কারণে এলাকাটিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন সাধারণ মানুষও।








