দ্বিতীয় যমুনা সেতুর রুট নিয়ে উত্তরাঞ্চলে বাড়ছে জল্পনা-কল্পনা

বৃহত্তর রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ—এই দুই রুটসহ সম্ভাব্য তিনটি অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোন পথে সেতুটি নির্মিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর সেতুর অবস্থান, নকশা ও নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। ফলে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়লেও আপাতত নির্দিষ্ট কোনো রুটকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, বৃহত্তর রংপুরকে যুক্ত করে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
সেতুমন্ত্রী বলেন, বৃহত্তর রংপুরকে যুক্ত করে দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরুর জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বৈঠকে জানানো হয়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমীক্ষা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সেতু দুটির সম্ভাব্য অবস্থান, নকশা এবং প্রকল্প ব্যয় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ওয়াই-আকৃতির সংযোগব্যবস্থা নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর পরিকল্পনায় রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যে তিনটি রুট বিবেচনায় রয়েছে
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্প তালিকায় দ্বিতীয় যমুনা সেতুর জন্য তিনটি সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্ট বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
১. বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুট
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ হতে পারে। প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, এই রুট বাস্তবায়িত হলে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার কমবে। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রেও দূরত্ব কমতে পারে ১০০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
২. সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুট
বিজ্ঞাপন
বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ পর্যন্ত সেতু নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। এই পথে সেতু হলে বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্ব আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার কমতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান যমুনা সেতু ব্যবহার করে ময়মনসিংহে যাতায়াতের প্রায় ১৮০ কিলোমিটারের পথও উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. অন্যান্য উপযুক্ত করিডোর
এই দুই রুটের বাইরে বিদ্যমান যমুনা সেতুর আশপাশে কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত করিডোরও বিবেচনায় রয়েছে। সমীক্ষায় বিভিন্ন রুটের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করে চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন
যমুনা নদীর ওপর আরেকটি সেতু নির্মাণের দাবিতে গাইবান্ধা, বগুড়া ও জামালপুরের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। উত্তরবঙ্গ ও রংপুর বিভাগের সঙ্গে ঢাকা এবং ময়মনসিংহ বিভাগের যোগাযোগ সহজ করা এ দাবির অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনার প্রত্যাশাও রয়েছে আন্দোলনকারীদের।
প্রস্তাবিত যেকোনো রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ঢাকাসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে কর্মরত উত্তরবঙ্গের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের যাতায়াতের সময় কমবে। এতে কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে যমুনার দুই পাড়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত আরও সহজ হবে।
বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় অবস্থিত বালাসীঘাট একসময় উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ১৯৩৮ সালে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যমুনা নদীতে তিস্তামুখ ঘাট ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে রেল ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তৎকালীন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে চালু হওয়া এই ফেরি ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
এই নৌপথে যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, ডিজেল, সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন করা হতো। তুলনামূলক কম খরচে ও অল্প সময়ে নদী পার হওয়ার সুযোগ থাকায় ঘাটটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে যমুনা নদীর নাব্যসংকট দেখা দিলে ১৯৯০ সালের পর রেল ফেরি সার্ভিসটি তিস্তামুখ ঘাট থেকে বালাসীঘাটে স্থানান্তর করা হয়। যমুনা সেতু নির্মাণের আগে দিনাজপুর থেকে রংপুর হয়ে গাইবান্ধার বালাসীঘাট পর্যন্ত ট্রেনে যাতায়াত করতেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। সান্তাহার, বগুড়া ও বোনারপাড়া হয়েও এই ঘাটে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল।
তবে যমুনা সেতু চালুর পর যাত্রীবাহী লোকাল, মেইল ও আন্তনগর ট্রেন চলাচলের এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। একই সময়ে নদীভাঙন ও নাব্য কমে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে বালাসীঘাট ও বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে রেলওয়ে ফেরি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিনের সেই যোগাযোগব্যবস্থার অভিজ্ঞতা এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের নতুন সেতুর দাবির প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত বালাসী-বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ নাকি অন্য কোনো করিডোরে সেতুটি নির্মিত হবে, তা নির্ভর করছে চলমান সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফলাফলের ওপর।








