৬৬০৮ কোটি টাকায় কেনা হবে পুলিশের বিশেষায়িত যানবাহন

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য পাঁচ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার ৮২৯টি হবে অপারেশনাল যানবাহন এবং এক হাজার একটি বিশেষায়িত যান। দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে এসব যানবাহন সংগ্রহে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ছয় হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মোট ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভা শেষে আগারগাঁওয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি পুলিশের যানবাহন কেনার পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এ জন্য তাদের আরও সক্রিয় করা এবং জননিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, চার হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন কিনতে ব্যয় হবে চার হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে এক হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহন সংগ্রহে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ছয় হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। অনেক থানায় মাত্র একটি পিকআপ ভ্যান রয়েছে। এ ধরনের সীমিত যানবাহন দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কঠিন। পুলিশের কাছ থেকে কার্যকর সেবা পেতে হলে প্রয়োজনীয় রসদ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।
একনেক সভায় জানানো হয়, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যান, অল-টেরেইন ভেহিকল (এটিভি), মোবাইল কমান্ড সেন্টার, ক্রাইম সিন ভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হবে। এ জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং এর সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে সরকার।
কেন প্রয়োজন বিশেষায়িত যানবাহন
বিজ্ঞাপন
জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেবা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ পুলিশ। অপরাধ দমন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য আধুনিক যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনের জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ টহল গাড়ির তুলনায় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যান বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় প্রচলিত যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা থাকায় সেখানে এটিভি ব্যবহার করা হবে। এসব যান দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান পরিচালনা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
মোবাইল কমান্ড সেন্টারকে ভ্রাম্যমাণ নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এতে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রম সমন্বয় করা সম্ভব হবে। অপরাধস্থল থেকে তাৎক্ষণিক আলামত ও প্রমাণ সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হবে ক্রাইম সিন ভ্যান। এতে তদন্তের কাজ সহজ হবে এবং অপরাধী শনাক্ত করতে সহায়তা মিলবে।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যমান যানবাহনের বড় অংশ পুরোনো
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক পুলিশ স্টেশনের অধীনে প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সেবা দিতে বর্তমানে পুলিশের যানবাহন রয়েছে এক হাজার ২৩৭টি। অর্থাৎ প্রতিটি থানায় গড়ে দুটিরও কম যানবাহন রয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান যানবাহনের প্রায় ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি।
এ অবস্থায় নিয়মিত টহল পরিচালনা, জরুরি ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। নতুন যানবাহন যুক্ত হলে পুলিশের চলাচল সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ে কাজের প্রস্তুতি বাড়বে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এর ফলে অপরাধ, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় বাহিনীটি আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশেষায়িত যানবাহনের পরিকল্পনায় জলপথে পুলিশি কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে। দেশের বিস্তৃত নদীপথে টহল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় স্পিডবোট ও দেশীয় নৌকা কেনার প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
যানবাহনের পাশাপাশি প্রশিক্ষণেও বরাদ্দ
প্রকল্প দুটিতে শুধু যানবাহন কেনা নয়, সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ জনকে হালকা যানবাহন চালনা ও মেকানিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ৩০০ জন ভারী যানবাহন চালনা ও মেকানিক এবং আরও ৫০ জন যানবাহন মেরামতের প্রশিক্ষণ পাবেন।
বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পে ৯১০ জন কর্মীকে ড্রাইভিং ও মেকানিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫০ জনকে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন যানবাহনের পাশাপাশি দক্ষ চালক ও মেকানিক তৈরি করা গেলে পুলিশের যানবাহন ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।








