Logo

ফ্রি সিমের লোভে পড়ে মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
ঠাকুরগাঁও
১৪ মার্চ, ২০২৬, ১৪:৪৮
ফ্রি সিমের লোভে পড়ে মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় বিনামূল্যে সিম ও রিচার্জের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র—এমন অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের কাছ থেকে সিম নেওয়ার পর অনেকেই এখন চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তাদের অজান্তেই একাধিক সিম নিবন্ধন করা হয়েছে, যা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় নিরীহ মানুষ আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সমস্যার সমাধানের আশায় তারা সংশ্লিষ্ট টেলিকম কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান পাননি। ফলে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন অনেক পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা, মোহাম্মদপুর ও চিলারং ইউনিয়নের গ্রামীণ ও সহজ-সরল মানুষদের লক্ষ্য করে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছে একটি চক্র। বিশেষ করে নারী ও গ্রামের সাধারণ মানুষদের টার্গেট করে তারা এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে একটি রবি বা এয়ারটেল সিম বিনামূল্যে দেওয়া হবে এবং তাতে ১০৫ টাকা রিচার্জ থাকবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে সিম নিবন্ধন করে নেয়।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, একটি সিম দেওয়ার কথা বললেও গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একাধিক সিম নিবন্ধন করা হয়। ফলে যারা একটি সিম নিয়েছেন, তাদের অনেকের এনআইডি কার্ডে অজান্তেই ১০টি পর্যন্ত অতিরিক্ত রবি ও এয়ারটেল নম্বর নিবন্ধিত হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এসব অতিরিক্ত সিম দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট সিম যার নামে নিবন্ধিত, তাকেই আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আকচা এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, তার পরিবারের সদস্যরাও এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার মা, ভাবি ও বোনকে বিনামূল্যে সিম ও রিচার্জের কথা বলে একটি সিম দেওয়া হয়েছিল। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তাদের এনআইডি ব্যবহার করে একাধিক সিম নিবন্ধন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর তারা চরম উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তার দাবি, এলাকার আরও অনেক পরিবার একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে এবং কেউ কেউ অজান্তেই বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন।

একই এলাকার নুর নাহার বেগম বলেন, তিনি একটি সিম কিনেছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে একাধিক সিম নিবন্ধন করা হয়েছে। এতে তিনি ভীত হয়ে পড়েছেন। সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি রবি কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে অতিরিক্ত নম্বরগুলো বাতিল করার অনুরোধ জানান। তবে সেখান থেকে তাকে জানানো হয়, এসব নম্বর বাতিল করা সম্ভব নয়। এতে তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

সাদিকুল নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, তার স্ত্রী একটি সিম নেওয়ার পর হঠাৎ একদিন পুলিশ তাদের বাড়িতে আসে এবং জানায় তার স্ত্রীর নামে একটি মামলা হয়েছে। ঘটনাটি জানার পর তাদের পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বিষয়টি সমাধানের জন্য তাদের ঢাকায় যেতে হয়েছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী সোলেমান জানান, তার স্ত্রীও একই ধরনের ঘটনায় মামলার আসামি হয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তাদের কয়েকবার পরিবারসহ কক্সবাজার যেতে হয়েছে। এতে তারা চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সমস্যার সমাধানের আশায় তারা বারবার কাস্টমার কেয়ারে গেলেও সেখান থেকে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। কাস্টমার কেয়ারের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে, নিবন্ধিত সিম বাতিল করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তবে এ বিষয়ে কাস্টমার কেয়ারের কর্মকর্তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয় জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং এনআইডি ব্যবহার করে একাধিক সিম নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ যদি এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীদের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।

রবি টেলিকম কোম্পানির কর্পোরেট কমিউনিকেশন অফিসার আশরাফুল ইসলাম বলেন, দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর এলাকা থেকেও আগে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং এই প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে কোম্পানির কোনো ব্যক্তি জড়িত আছেন কি না তা তদন্ত করা হবে।

বিজ্ঞাপন

নিবন্ধিত সিম বাতিল না হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিবন্ধন বাতিল না হওয়ার কোনো কারণ থাকার কথা নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম জানান, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং ইতোমধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD