নটর ডেম কর্মী লিপিকা হত্যা, পিবিআইয়ের তদন্তে বের হলো রহস্য

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা জুলিয়ানা গমেজ হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে উঠে এসেছে, মূলত চুরির উদ্দেশ্যেই তাঁর বাসায় ঢুকেছিলেন জুয়েল রানা ও নজরুল। তবে লিপিকা জেগে উঠে চিৎকার শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং তাঁকে হত্যা করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে। সূত্রাপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসার চতুর্থ তলায় একাই থাকতেন ৪০ বছর বয়সী লিপিকা। তদন্ত অনুযায়ী, পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল জানতেন লিপিকা একা থাকেন। সেই তথ্য তিনি তাঁর পরিচিত নজরুলকে জানান। পরে দুজন মিলে বাসায় চুরির পরিকল্পনা করেন।
ঘটনার দুই দিন আগে তাঁরা বাসাটির আশপাশ পর্যবেক্ষণ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে রশির সাহায্যে ছাদ থেকে নিচে নেমে ভেন্টিলেটর ভেঙে বাসায় প্রবেশ করেন নজরুল। পরে ভেতর থেকে দরজা খুলে জুয়েলকে ঢুকিয়ে নেন।
তদন্তে জানা যায়, দুজন ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র খুঁজছিলেন। একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে গেলে তিনি চিৎকার শুরু করেন। তখন নজরুল লোহার পাইপ দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। পরে জুয়েল বালিশ দিয়ে তাঁর মাথা চেপে ধরেন। এতে কিছুক্ষণ পর লিপিকা নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
এরপর লিপিকার দুটি মুঠোফোন, একটি হাতব্যাগ ও কিছু অলংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান তাঁরা। পালানোর আগে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেন, যাতে ঘটনাটি দ্রুত ধরা না পড়ে।
বিজ্ঞাপন
ব্যাগে ছিল ২৬ হাজার টাকার বেশি
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, লিপিকার হাতব্যাগে ২৬ হাজার ৩৫০ টাকা ছিল। ওই টাকা দুই আসামি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। চুরি করা দুটি মুঠোফোন সদরঘাট এলাকার শিবলু হোসেন ও জয়ের কাছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন তাঁরা।
অলংকার মনে করে কিছু গয়নাও নিয়ে গিয়েছিলেন আসামিরা। তবে পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো আসলে ইমিটেশন গয়না।
বিজ্ঞাপন
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম জানান, মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে প্রযুক্তিগত সহায়তায় আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে সদরঘাট ও সূত্রাপুর এলাকা থেকে জুয়েল ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি প্লায়ার্স, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার এবং লিপিকার চুরি যাওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়।
তালাবদ্ধ দরজায় প্রথমে সন্দেহ হয়নি
লিপিকার মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত বাসার দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ১১ সেপ্টেম্বর সকালে অফিসে না যাওয়ায় সহকর্মীরা তাঁর খোঁজ শুরু করেন। পরে তাঁরা কেয়ারটেকারের মাধ্যমে বাসার দরজা খোলেন।
বিজ্ঞাপন
ভেতরে ঢুকে প্রথমে ভেন্টিলেটর ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। পরে শয়নকক্ষে লিপিকাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। মাথার ওপর ও নিচে বালিশ ছিল। বালিশ সরানোর পর মাথার বাঁ পাশে রক্তাক্ত জখম দেখা যায়।
একা থাকার তথ্যই হয়ে ওঠে বিপদের কারণ
তদন্তে উঠে এসেছে, বাসা পরিবর্তনের সময় জুয়েল লিপিকার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। তখনই তিনি জানতে পারেন, ওই ফ্ল্যাটে লিপিকা একাই থাকেন। পরবর্তী সময়ে এই তথ্যই চুরির পরিকল্পনায় কাজে লাগান জুয়েল ও নজরুল।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
লিপিকার খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ওই বাসায় থাকতেন লিপিকা। এর আগে তিনি ঠাকুরমার সঙ্গে থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পর একাই বসবাস করছিলেন। ২০১৬ সালের মার্চে নটর ডেম কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও হত্যার বর্ণনা
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জুয়েল ও নজরুল চুরির উদ্দেশ্যে বাসায় প্রবেশ এবং লিপিকার ওপর হামলার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, লিপিকার ঘুম ভেঙে চিৎকার করার পর নজরুল তাঁর মাথায় আঘাত করেন এবং জুয়েল বালিশ দিয়ে মাথা চেপে ধরেন।
ঘটনার পর চুরি করা টাকা ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি রশিসহ কিছু জিনিস তাঁরা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
লিপিকা হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন তাঁর খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ। ১২ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর জুয়েল ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। ২০২৫ সালের ৭ মে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়।
মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। গ্রেপ্তার দুই আসামিই কারাগারে রয়েছেন।








