Logo

পিবিআইয়ের অভিযানে গ্রেপ্তার দুই ‘জিনের বাদশা’

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:৫৪
পিবিআইয়ের অভিযানে গ্রেপ্তার দুই ‘জিনের বাদশা’
ছবি: সংগৃহীত

কখনো ‘জিনের বাদশা’, কখনো তান্ত্রিক-কবিরাজ, আবার কখনো পরিচিত ব্যবসায়ীর পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত একটি প্রতারক চক্র। এরপর নানা প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে বিকাশ-নগদের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হতো টাকা। এমন অভিযোগে কথিত দুই ‘জিনের বাদশা’কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে চক্রটির দেশজুড়ে প্রতারণার নেটওয়ার্ক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে ফরিদপুর পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর রাজবাড়ী সদর থানায় দায়ের করা একটি প্রতারণার মামলার সূত্র ধরে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়।

মামলাটি করেন রাজবাড়ী সদর থানার বিনোদপুর এলাকার চাল ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, পরিচিত ব্যবসায়ী বিজয় বাবুর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে প্রতারক চক্রটি তাঁর কাছ থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।

পিবিআই জানায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ। ওই দিন চক্রের এক সদস্য বিজয় বাবুর পরিচয়ে রশিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জরুরি প্রয়োজনে কম দামে ৩৩ টন চাল বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। চাল বিকেল ৪টার মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। আগে বিজয় বাবুর সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন থাকায় প্রস্তাবটি বিশ্বাস করেন রশিদুল।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এরপর ওই দিন দুপুরে দেওয়া বিকাশ ও নগদ নম্বরে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। পরে কয়েক দফায় মোট আটটি নম্বরে আরও টাকা পাঠিয়ে সর্বমোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর বিজয় বাবুর কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করলে তিনি জানতে পারেন, চাল বিক্রির বিষয়ে বিজয় বাবুর সঙ্গে তাঁর কোনো কথাই হয়নি। তখনই প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

এ ঘটনায় রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেন রশিদুল ইসলাম। থানা-পুলিশের তদন্ত শেষে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার না করেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল বলে জানায় পিবিআই। পরে আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মামলাটির তদন্তভার পায় ফরিদপুর পিবিআই। তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) মাজিদুল হক খান।

ক্রেচারে ভর করে সংগ্রহ করতেন প্রতারণার টাকা

বিজ্ঞাপন

পিবিআই পুলিশ সুপার জানান, দীর্ঘ আট মাসের অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে প্রথমে সুমন (২৬) নামে এক যুবকের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর একটি পা নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতারণার টাকা বিভিন্ন বিকাশ ক্যাশ-আউট পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করতেন তিনি। ক্রেচারে ভর করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে টাকা সংগ্রহ করতেন সুমন।

সুমন ভোলার বোরহানউদ্দিন থানার ফুলকাচিয়া গ্রামের মৃত মোসলেম হাওলাদারের ছেলে। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালানোর পাশাপাশি অনলাইন প্রতারণা, জুয়া ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

তাঁকে গ্রেপ্তারের পর চক্রের প্রধান সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত মো. রাজিবকে (২৮) শনাক্ত করে পুলিশ। রাজিব একই থানার মূলপাইততন গ্রামের রমজান মিয়ার ছেলে। গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) বোরহানউদ্দিন থানার কুঞ্জেরহাট বাজারের আশপাশ থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটিতে মোট পাঁচজন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল নম্বর ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করতেন। অন্যরা প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করতেন এবং সুমন বিভিন্ন ক্যাশ-আউট পয়েন্ট থেকে টাকা তুলে আনতেন।

পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির একটি কৌশল ছিল গভীর রাতে ফোন করে নিজেদের ‘জিনের বাদশা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া। বিশেষ করে নারীদের ফোন করে মোবাইলের পাশে অদ্ভুত শব্দ সৃষ্টি করে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হতো। এরপর মূল্যবান সম্পদ হারানো কিংবা জীবনের ওপর বিপদ আসার ভয় দেখিয়ে সেই বিপদ থেকে মুক্তির আশ্বাস দেওয়া হতো। ভুক্তভোগীদের ভয় ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে টাকা আদায় করত চক্রটি।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তান্ত্রিক ও পরিচিত কবিরাজের পরিচয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। কঠিন ও গোপন রোগের সমাধান, প্রেমে সফলতা এবং দাম্পত্য জীবনে সুখ ফিরিয়ে আনার মতো নানা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো বলে জানিয়েছে পিবিআই।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পিবিআইয়ের এ তদন্তে পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে কথিত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও তান্ত্রিক চিকিৎসার নামে প্রতারণার একাধিক কৌশলের তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চক্রটির বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তার করা গেলে প্রতারণার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD