রাজনীতির অন্তরাল থেকে ‘প্রধানমন্ত্রী’র লড়াইয়ে জামায়াত আমির

এক সময় বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটের বাইরে থাকা একটি নাম—ডা. শফিকুর রহমান। অথচ আজ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর সাদা দাঁড়ি ও সাদা পোশাকের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড-পোস্টারে ভরে গেছে চারপাশ। সেখানে আহ্বান জানানো হচ্ছে—বাংলাদেশে প্রথম ইসলামপন্থি সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোট দেওয়ার জন্য। রাজনীতির আড়াল থেকে উঠে এসে ৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক এখন প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বী।
বিজ্ঞাপন
জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ডা. শফিকুর রহমান মূলত একটি সীমিত রাজনৈতিক পরিসরেই পরিচিত ছিলেন। ইসলামপন্থি গণ্ডির বাইরে তাঁর নাম খুব একটা আলোচনায় আসেনি। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁর উত্থান নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ে তাদের অবস্থান সাবেক মিত্র বিএনপির বিপরীতে, যে দলটির সঙ্গে এক সময় জামায়াতের রাজনৈতিক জোট ছিল।
২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পথে দেশ।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: হাসপাতালে ভর্তি রুহুল কবীর রিজভী
বিভিন্ন মতামত জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—এক সময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর জন্য এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্ত অবস্থান। এই সম্ভাবনা একদিকে দলটির সমর্থকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করলেও, অন্যদিকে মধ্যপন্থি ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়। দলটির শীর্ষ নেতারা কারাবন্দি হন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় এবং দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে জামায়াত দীর্ঘদিন কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। সেই সময় নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০২২ সালে ডা. শফিকুর রহমান গ্রেপ্তার হন এবং ১৫ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন।
বিজ্ঞাপন
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তাঁর জীবনধারাও বদলে দেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এর মধ্য দিয়ে দলটি আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরপরই জামায়াত দ্রুত মাঠে নামে। বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দাতব্য কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় দলটি। এসব কার্যক্রমে ডা. শফিকুর রহমান নিজেই সামনে থাকায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।
গত ডিসেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন তাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা আবার জনগণের সামনে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক পথচলা
১৯৫৮ সালে সিলেটের মৌলভীবাজারে জন্ম ডা. শফিকুর রহমানের। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও কোনোবারই জয় পাননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর ২০২০ সালে তিনি জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন।
তার স্ত্রী আমিনা বেগম একজন চিকিৎসক এবং ২০১৮ সালে নারী সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের দুই মেয়ে ও এক ছেলেও চিকিৎসা পেশায় যুক্ত। পারিবারিক উদ্যোগে সিলেটে একটি হাসপাতালও গড়ে তুলেছেন তিনি।
দলীয় সূত্রে ডা. শফিকুর রহমানকে একজন বিনয়ী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক শূন্যতা ও উত্থান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের পর যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাফি মোস্তফার ভাষায়, সে সময় দৃশ্যমান কোনো জাতীয় নেতা মাঠে ছিলেন না। তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে ডা. শফিকুর রহমান দেশজুড়ে সফর করেন, গণমাধ্যমে সক্রিয় হন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী পদের আলোচনায় উঠে আসেন।
তিনি জামায়াতকে দুর্নীতিমুক্ত, নৈতিকতা ও ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে গত ডিসেম্বরে জেন-জি এনসিপির সঙ্গে জোট গড়ে দলটি।
বিজ্ঞাপন
দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর পোস্টারে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অনুকরণে লেখা হচ্ছে—‘দাদু ইজ কামিং’। এসব প্রচারণা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিত করে তুলেছে।
অনেকে তাঁকে জামায়াতের তুলনামূলক মধ্যপন্থি মুখ হিসেবে দেখছেন। তিনি সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছেন। পাশাপাশি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের কথাও তুলে ধরছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে নারীবিষয়ক নীতিমালা নিয়ে তাঁর সমালোচনাও রয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। এছাড়া নারীদের জন্য পাঁচ ঘণ্টা কর্মঘণ্টার প্রস্তাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমানের বলেছেন, জামায়াত মধ্যপন্থি ও যুক্তিসঙ্গত রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তবে আদর্শ কোরআনভিত্তিক। কোরআনের বার্তা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য।
সূত্র: রয়টার্স








