Logo

এনসিপিকে ঘিরে পশ্চিমাদের বাড়তি আগ্রহের নেপথ্যে কী?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৬:৫৪
এনসিপিকে ঘিরে পশ্চিমাদের বাড়তি আগ্রহের নেপথ্যে কী?
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি গঠনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে এনসিপিকে ঘিরে আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে দলটির নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক ও মতবিনিময় সেই আগ্রহকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

বিজ্ঞাপন

দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে নতুন একটি দলকে বিদেশি কূটনীতিকদের এমন গুরুত্ব দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নও উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া এই যোগাযোগ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও অব্যাহত রয়েছে। ফলে এনসিপিকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহের কারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাত্রনেতৃত্ব গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে সামনে ছিল। সে সময় কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি সরকার পরিচালনায় না থাকায় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মতো বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি ছাত্রনেতৃত্বকেও গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন বিদেশিরা।

বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনসিপি এখন একটি সংসদীয় রাজনৈতিক দল এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক শক্তি। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়গুলো দলটির রাজনৈতিক এজেন্ডায় থাকায় আন্তর্জাতিক মহলের স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এটিকে কোনো বিশেষ পক্ষপাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও তিনি মনে করেন।

বিজ্ঞাপন

কূটনীতিকদের ধারাবাহিক বৈঠক

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এনসিপির একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নির্বাচন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সবশেষ ১২ আগস্ট এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চের সিনিয়র ডিরেক্টর সোনজা গ্লকলে নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। বৈঠকে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ৬ আগস্ট এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক।

এ ছাড়া ২২ জুলাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বাণিজ্য চুক্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

জুলাই মাসে স্পেন, ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও এনসিপি নেতাদের বৈঠক হয়েছে। এর আগে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের কর্মকর্তারাও দলটির সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়ার দাবি এনসিপির

দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের দাবি, নির্বাচনে ইতিবাচক ফলাফলের পর আন্তর্জাতিক মহলে এনসিপিকে ঘিরে আগ্রহ আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা নিয়মিত দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসছেন।

তিনি বলেন, এনসিপি তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিবর্তনের রাজনীতি করছে। নতুন রাজনৈতিক চিন্তা, তরুণ নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দলটিকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করছে।

বিজ্ঞাপন

সারোয়ার তুষারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশিরা এনসিপিকে কোনো রাজনৈতিক জোটের সাধারণ অংশীদার হিসেবে না দেখে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করছে। ভবিষ্যতে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারে—এমন সম্ভাবনাও আন্তর্জাতিক মহলের কেউ কেউ দেখছে বলে তাঁর দাবি।

প্রতিষ্ঠিত দল থাকা সত্ত্বেও কেন এনসিপি?

এনসিপির যুগ্ম-সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশিরের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দলটির নেতারা গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে তাঁদের গুরুত্বের ধরনও বদলেছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, এনসিপি নতুন দল হলেও অল্প সময়ের রাজনৈতিক যাত্রায় সংসদে তাদের কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছে। ফলে সংসদে দলটি গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। এর সঙ্গে তরুণ নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডাও বিদেশিদের আগ্রহের কারণ বলে তিনি মনে করেন।

জয়নাল আবেদীন শিশির আরও বলেন, ১১ দলীয় জোটের অংশীদার হলেও বিদেশিরা এনসিপিকে কেবল জোটের একটি দল হিসেবে দেখছে না। বরং নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়, নীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখার কারণে দলটিকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক আগ্রহের পেছনে কী?

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনসিপিকে সম্ভাবনাময় নতুন শক্তি হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। নির্বাচন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্র সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনীতি ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কও এসব আলোচনার অংশ।

তবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি নতুন একটি দলকে পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারাবাহিক গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা করছেন। যদিও এ ধরনের কোনো সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ অবশ্য বিষয়টিকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক, কৌশলগত ও রেমিট্যান্স সম্পর্ক থাকা দেশগুলো সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখে।

বিজ্ঞাপন

জামায়াতের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করলেও এনসিপিকে বিদেশিরা জামায়াতের অংশ হিসেবে দেখছে না বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক মহল এনসিপিকে স্বাধীন ও পৃথক রাজনৈতিক দল হিসেবেই মূল্যায়ন করছে।

পশ্চিমাদের প্রত্যাশা কী?

এনসিপির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দলটির প্রতি মূল প্রত্যাশা হলো গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার বিষয়টিকেও ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে বলে দলটির নেতারা মনে করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নিয়েও বৈশ্বিক অংশীদারদের আগ্রহ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির অবস্থান, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ধারণা আন্তর্জাতিক মহলের নজরে পড়েছে—এমনটাই মনে করছেন দলটির নেতারা।

তবে পশ্চিমাদের এই বাড়তি আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে এনসিপির রাজনৈতিক প্রভাব কতটা বাড়াবে এবং দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখার বিষয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD