‘আগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুন, তারপর ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করতে আসবেন’

আগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, তারপর ফুটপাতের দোকান বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘ফুটপাতে দোকানদারি করা সহজ কাজ নয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রোদে পুড়ে, কষ্ট করে তাদের কাজ করতে হয়। দোকানের মধ্যেই খাওয়াদাওয়া করতে হয়। একদিকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে সরকার এসে সেই মানুষের দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে। আগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, তারপর দোকান বন্ধ করতে আসবেন।’
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর জিরো পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ প্রসঙ্গে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এখানে অধিকাংশ মানুষ তরুণ প্রজন্মের। অনেকে ফুটপাতে দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সরকার ঢাকা শহর পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা সেই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। যানজটের কারণে রাস্তায় দোকান থাকতে পারবে না, সেটি ঠিক আছে। কিন্তু দোকান কেন হলো, সেই প্রশ্নও সরকারের কাছে রাখতে চাই।’
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘আপনি নোয়াখালী, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেননি। একজন মানুষ বিয়ে করেছেন, তার সন্তান হয়েছে। ঢাকায় এসে তিন-চারটি দোকান দিয়ে কোনোরকমে রাস্তায় বসে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেখানেও দোকান নিতে গেলে বিএনপির নেতাদের ছাড়া দোকান পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি আয় করে সন্তানের কাছে টাকা পাঠান।’
নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট নিয়ে রাজপথে নেমেছি। আমাদের ভাইয়েরা এসে বলেন, তাদের সন্তান কষ্টে আছে, পড়াশোনা করাতে পারেন না, স্ত্রীকে মুখ দেখাতে পারেন না, মা-বাবার ওষুধ কিনে দিতে পারেন না। মানুষের এই কষ্ট দেখেই আমরা রাজপথে নেমেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমি একটি ইস্যু ধরেছিলাম, সেটি হলো চাঁদাবাজি। তখন আমাকে বলা হয়েছিল, প্রমাণ দিতে হবে। এখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত। কারণ, চাঁদাবাজির এত প্রমাণ আসছে যে কাকে ছেড়ে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, তা নিয়ে তিনি হয়রান হয়ে গেছেন।’
বিজ্ঞাপন
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। সেই সন্ত্রাসের নমুনা আমরা দেখেছি, কীভাবে একজন প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র হাতে ধরেছেন। একটি বড় অস্ত্রের বিষয়ে এখনো কেউ স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন না, সেটি কেন নিয়ে আসা হয়েছিল। মিরপুরেও আমরা সন্ত্রাসের রাজত্ব দেখেছি। ইসরায়েলি বাহিনী যেভাবে রাতে হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেয়, সেভাবে রাতের আঁধারে একটি হাসপাতাল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দখলদারত্বের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। আপনারা দেখেছেন, বিভিন্ন জায়গায় মানুষের দোকান, ঘরবাড়ি—সবকিছু দখল করা হচ্ছে। মাদকবিরোধী অবস্থানের কথাও বলেছিলাম। অথচ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মাদকে ছেয়ে গেছে। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকায় মাদক আসে। এসব নিয়ে সংসদেও কথা হয়েছে। আমরা যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরেছিলাম।’
বর্তমানে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন বড় একটি ইস্যু আমাদের সামনে এসেছে, সেটি হলো সিন্ডিকেট। আমরা এখন থেকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য মাঠে নেমেছি। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু আপনি দোকানে গেলে ২ হাজার ৪০০ টাকার নিচে গ্যাস পাবেন না। কোথাও ২ হাজার ৫০০, ২ হাজার ৬০০, এমনকি ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মা-বোন ও ভাইদের এই এলপিজি গ্যাস কিনতে হচ্ছে। একজন ব্যবসায়ী লাভ করেন, আরেকটি সিন্ডিকেটের লোক কোনো কিছু না করেই বিএনপির পরিচয় দিয়ে প্রতিটি গ্যাসের বোতল থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করছে। পুরো বিশ্বে জ্বালানি সংকট চলছে। জ্বালানি ছাড়া রান্না করা যাচ্ছে না। এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের একটি উপাদান। সেই জিনিস নিয়ে কারসাজি হচ্ছে। এমনিতেই দাম বেড়েছে, তার ওপর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। এ জন্যই আমরা পথে নেমেছি।’
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সিন্ডিকেটের পাহারাদার হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রী ও গুলশান কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। বাংলাদেশে যদি এই সিন্ডিকেটকে দমন করতে পারি, তাহলে এলপিজি গ্যাসের দাম কমবে। নিত্যপণ্যের দামও কমাতে হবে। রান্নার তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম যে বেড়েছে, সেটিও সিন্ডিকেটের কারণে। আগে বলা হতো, রমজান এলে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়। এখন বাংলাদেশে ১২ মাসই রমজান। কারণ, ১২ মাসই সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে। তারা সব সময় বলে, সংকট আছে।’
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের সমালোচনা করে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ‘সরকার বলছে, বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশ। আমি তাদের জিজ্ঞেস করতে চাই, বাংলাদেশের এই মুক্তবাজার অর্থনীতি কে চালু করেছিলেন? তারা গর্ব করে বলবে, তাদের নেতা জিয়াউর রহমান। তাহলে আপনি যদি জিয়াউর রহমানের আদর্শের কর্মী হন, তিনি যদি মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করে থাকেন, তাহলে দুইটি কোম্পানির মধ্যে সব পণ্য আবদ্ধ করে রাখছেন কেন? আমরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলি, তখন তারা বলে, বেগম খালেদা জিয়া তাদের গণতন্ত্র শিখিয়েছেন। তাহলে বেগম খালেদা জিয়া যদি গণতন্ত্র শিখিয়ে থাকেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করতে চান কেন? এই প্রশ্ন আমরা তাদের কাছে রাখতে চাই।’
বিজ্ঞাপন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আমি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রার্থী হচ্ছি। গতকাল কিছুটা গবেষণা করছিলাম। আদমশুমারি অনুযায়ী, এখানে প্রায় ৪৩ লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ভোটার প্রায় ২৩ লাখ। প্রতি ভোটারের পেছনে ১০ টাকা করে খরচ করার কথা বলা হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেখানে এক হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। আমার সাত হাজার এজেন্ট লাগবে। সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তাদের থাকতে হবে। তিনবেলা খাবার দিতে হবে। খাবারের জন্য ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পকেট খরচ হিসেবে ১ হাজার টাকা দিলে একজন এজেন্টের পেছনে ৩ হাজার টাকা লাগে। সাত হাজার এজেন্টের পেছনে কত টাকা খরচ হবে, সেটি নির্বাচন কমিশনকে হিসাব করে দেখতে হবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রচারণা, ব্যানারসহ আরও অনেক খরচ আছে। এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোর জন্য গুন্ডাপাণ্ডা পালন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মির্জা আব্বাসের লোকজনসহ বিভিন্ন পক্ষ কীভাবে রাতের আঁধারে কেন্দ্র দখল করতে আসে, তা আমরা দেখেছি। গুলিস্তানের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়, রিকশাচালকদের কাছ থেকেও চাঁদা দাবি করা হয়। বাস ও বিভিন্ন পরিবহন লাইন থেকেও চাঁদার ভাগ নেওয়া হয়।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এসব লোক সারা বছর চাঁদাবাজি করে, গুন্ডাপাণ্ডা পালন করে এবং পরে নির্বাচনে নিজেদের এজেন্ট নিয়োগ করে। বিভিন্ন কলেজ, স্কুল ও প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে প্রিসাইডিং অফিসার ও এজেন্ট হিসেবে নিয়োগের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমি নির্বাচন কমিশনারদের জিজ্ঞেস করেছি, বাংলাদেশে আসলে সুস্থ নির্বাচন হওয়া সম্ভব কি না। গণতন্ত্রের কথা বলে যারা এসব করে, তারা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। যারা প্রতারণা করে, তাদের প্রতারক বলতে আমরা বাধ্য হব।’
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে বিদায় করা যাচ্ছে না, এমন কথা একসময় মানুষ বলত। আমরা পড়ার টেবিল থেকে উঠে শেখ হাসিনাকে বিদায় করেছি। আমরা দুর্নীতি করিনি। বাংলাদেশের সাতটি এজেন্সির কোনো একটিরও যদি সাহস থাকে, তারা এসে প্রমাণ করুক যে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বা হাসনাত আব্দুল্লাহ এক টাকার দুর্নীতি করেছেন। তাহলে আমরা রাজনীতি ছেড়ে দেব। আমরা বুকভরা সাহস নিয়ে রাজনীতি করি। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। মানুষের জন্য লড়াই করি।’
তারেক রহমানের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান বলেছেন, এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু ১০ জনের কর্মসংস্থানও তিনি করতে পারেননি। তার সঙ্গে যারা ঘোরেন, তাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে টাকা পাঠাতে বলা হয়, সেই টাকা গুলশান কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখেই আমরা রাজপথে নেমেছি।’








