ভোটে স্বচ্ছতায় পরিচয় যাচাইয়ে নিকাব খোলা জায়েজ, জাল ভোট হারাম

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিকাব ও বোরকার আড়ালে ভুয়া ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইসলামী চিন্তাবিদ, ফিকহ বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একবাক্যে বলছেন, ইসলামের দৃষ্টিতে নিকাব পরে পরিচয় গোপন করে জাল ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা কখনোই বৈধ হতে পারে না। বরং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নারী পোলিং কর্মকর্তার সামনে মুখমণ্ডল খুলে পরিচয় যাচাই করে ভোট দেওয়া পুরোপুরি শরিয়তসম্মত ও বৈধ।
বিজ্ঞাপন
ইসলামী আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোরআন ও সহিহ হাদিসে নারীদের শালীনতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে চেহারা খোলার অনুমতি স্পষ্টভাবে রয়েছে। কোরআনের সূরা আন-নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নারীরা যেন শালীনতা বজায় রাখে এবং যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়, তা ছাড়া সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। বহু সাহাবি, তাফসিরকার ও ফিকহবিদ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জিকে স্বাভাবিকভাবে প্রকাশযোগ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইসলামী ইতিহাসে এর বাস্তব দৃষ্টান্তও রয়েছে। হজের সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.) পুরুষদের উপস্থিতিতে তাঁর পরিবারের নারীদের আড়াল করে রাখতেন। কিন্তু কাফেলা অতিক্রম করে গেলে নারীদের মুখ খোলার অনুমতি দিতেন। এটি প্রমাণ করে, পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্দার বিধানে শিথিলতা ইসলামে স্বীকৃত।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—ইহরাম অবস্থায় কোনো নারী নিকাব পরতে পারবে না। বাস্তবে হজ ও উমরার সময় সৌদি আরবে নারী হাজীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে নারী নিরাপত্তাকর্মীরা মুখমণ্ডল মিলিয়ে থাকেন। এটিকে সেখানে কখনোই পর্দাবিরোধী বা ধর্মবিরোধী হিসেবে দেখা হয় না।
ফিকহ বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—প্রয়োজনের সময় নিষিদ্ধ বিষয়ও সাময়িকভাবে বৈধ হতে পারে। তবে ভুয়া ভোট দেওয়া কোনোভাবেই সেই পর্যায়ে পড়ে না। বরং জাল ভোট ইসলামে আমানতের খেয়ানত, অন্যের অধিকার হরণ এবং গুরুতর কবিরা গোনাহ হিসেবে বিবেচিত। তাই এই ধরনের অনৈতিকতা প্রতিরোধে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য মুখ খোলা শুধু বৈধই নয়, বরং অপরিহার্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও আমানত। ইসলামী ফিকহে বিচার, সাক্ষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নারীর মুখ দেখা বৈধ বলে উল্লেখ রয়েছে। সেই যুক্তিতে ভোটগ্রহণের সময় নারী পোলিং কর্মকর্তার সামনে মুখ খুলে পরিচয় যাচাই করা ইসলামের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ধর্মের অজুহাতে যদি নিকাব বা বোরকার আড়ালে ভুয়া ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তা ইসলামের নামে বড় ধরনের অন্যায় হবে। এতে একদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের অপব্যবহার ঘটবে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে— ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নারী ভোটারদের ক্ষেত্রে নারী পোলিং কর্মকর্তা বা মহিলা এজেন্টের মাধ্যমে মুখমণ্ডল মিলিয়ে পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করা হোক। প্রয়োজনে আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও এই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। এতে একদিকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা রক্ষা পাবে, অন্যদিকে জাল ভোটের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।








