Logo

জেকেরের নূর অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এবং কালেমা শরীফের মাহাত্ম্য

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৬ জুলাই, ২০২৬, ১৯:০১
জেকেরের নূর অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এবং কালেমা শরীফের মাহাত্ম্য
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত সুলতানুল আজকার ও নাফী-এসবাত জেকের بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ জেকেরের নূর অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এবং কালেমা শরীফের মাহাত্ম্য সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহতায়ালা কুরআন মজীদে এরশাদ ফরমান,

وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

অর্থাৎ-"মানুষ ও জ্বিনকে আমার ইবাদত ভিন্ন অন্য কাজের জন্য সৃষ্টি করি নাই।” মানুষ এককালীনভাবে আল্লাহতায়ালার গোলামী করুক, ইহাই আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা। আর এককালীন গোলামীর মধ্য দিয়াই মানুষ আল্লাহতায়ালার "হোব্ব" বা অবিমিশ্র মহব্বত কামনা করিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এই এককালীন অর্থে গোলাম হওয়ার অর্থ কি? এককালীন গোলামের বৈশিষ্ট্য কি? তাহা কিভাবে অর্জন করা যায়? অর্জন করিবার পথে কি কি বাধা তাহা খোদাতালাশী ব্যক্তিদের জানা দরকার।

মানুষের নাক্স বা আদামাতের সত্ত্বাই আল্লাহতায়ালার গোলামী অর্জনের পথে সব চেয়ে বড় বাধা। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব ফরমাইয়াছেন, "নাফসে আম্মারা মানুষকে সদা সর্বদা ধোকা ও ফাঁকি দিয়া আল্লাহতায়ালার পথ হইতে গাফেল করিতেছে। অর্থাৎ মানুষের নিজ সত্ত্বাই আল্লাহতায়ালার গোলামী অর্জনের পথে সব চেয়ে বড় বাধা। আর নিজ সত্ত্বা অতিক্রম করিয়াই আল্লাহপাকের প্রকৃত গোলামীর গুণ অর্জন করিতে হয়। অর্থাৎ এমন পণ ও পন্থা অবলম্বন করিতে হয় যে, নাফসের ধোকা হইতে রক্ষা পাওয়া যায়।

মানুষের নাই সকল অমঙ্গলের উৎস, কারক ও ধারক। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ বলেন, "হে আদম সন্তান! আমার নিকট হইতে তোমার উপর মঙ্গল অবতীর্ণ হয়। আর তোমার নিকট হইতে সকল অমঙ্গল সৃষ্টি হয়।”

বিজ্ঞাপন

মানব দেহ জড় জগতের জড় উপাদান তথা- আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস দ্বারা তৈরী। এই সকল পদার্থের মধ্যে তাহাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। আগুন দ্বারা জ্বিন ও শয়তানের সৃষ্টি। অপরিশুদ্ধ নাক্স তাই জ্বিন ও শয়তানের আশ্রয় স্থল হয়। শয়তান আদম ও বণী আদমের শত্রু। তাই শয়তান মানুষকে সকল সময় ওয়াছওয়াছা বা আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলিবার পরামর্শ, মন্ত্রণা ও যুক্তি দিয়া থাকে। শয়তানের ওয়াছওয়াছা এবং সৃষ্ট বস্তু সমূহের খারাবী বা দোষ হইতে মুক্ত থাকার জন্য আল্লাহপাক কুরআন মজীদে মানব জাতিকে নির্দেশ দান করিয়াছেন।

রাসূলে করীম (সঃ) এর হাদীস ব্যাখ্যা করিয়া গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) ছাহেব বলেন, আল্লাহপাক মানুষকে দুইটি জিহাদের সংবাদ দিয়াছেন। ইহার একটি বাতেনী জিহাদ, অন্যটি জাহেরী জিহাদ। নাফস, কামনা, প্রবৃত্তি এবং শয়তানের ওয়াছওয়াছার বিরুদ্ধে জিহাদ করা, তওবাতে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা এবং হারাম বস্তু হইতে দূরে থাকাই বাতেনী জিহাদ। জাহেরী জিহাদ হইল, আল্লাহ ও রাসূল (সঃ) এর বিরুদ্ধে যাহারা শত্রুতা পোষণ করে তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। বাতেনী জিহাদ জাহেরী জিহাদের চেয়ে কঠিন। যে ব্যক্তি উভয় জিহাদ সম্বন্ধে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পালন করেন, সেই ব্যক্তিই কেবল আল্লাহতায়ালার গোলাম হইবার জন্য আল্লাহতায়ালার দ্বারা গৃহীত হইতে পারেন। বাতেনী জিহাদকে সূফী পরিভাষায় রিয়াজত বা কঠিন সংযম বলা হয়।

গউস পাক হযরত জিলানী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, যাহারা নিজ নাফস বা শয়তান বা প্রবৃত্তির দাস তাহারা আল্লাহতায়ালার বান্দা বা খাঁটী ঈমানদার বলিয়া দাবী করিতে পারেন না। খাঁটী ঈমানদার আল্লাহতায়ালাকেই কাম্য মনে করেন এবং এখলাস বা ইবাদতের বিশুদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করেন। কারণ আল্লাহ বলেন, তাহারা (মানবজাতি) একমাত্র আল্লাহতায়ালাকেই এখলাস বা বিশুদ্ধতার সহিত বন্দেগী করিতে আদিষ্ট হইয়াছে।

বিজ্ঞাপন

খাঁটী ঈমানদার ব্যক্তি হইতে হইলে দুইটি বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন। যথাঃ (১) দেল ও দেহের পবিত্রতা অর্জন এবং (২) সেই উদ্দেশ্যের জন্য নাফস ও শয়তানের হাত হইতে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু এই গুণদ্বয় লাভ করা কঠিন কাজ।

কুরআন মজীদে আল্লাহপাক মানুষকে জানাইয়া দিয়াছেন, শয়তান প্রথম দিনই প্রতিজ্ঞা করিয়াছে যে, সে মানুষকে বিপথগামী করিবার জন্য সামনে-পেছন, ডান-বাম তথা চতুর্দিক হইতে এমন কি শিরায় শিরায় ঘেরাও করিবে।

হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন যে, আল্লাহতায়ালার এশক, মহব্বত ও ভয়ই মানুষকে কেবল নাক্সানিয়াত বা দৈহিক প্রবৃত্তি ও শয়তানিয়াত হইতে রক্ষা করিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার মহব্বত অর্জনের একটি পথ হইল জেকের। কুরআন পাকে আল্লাহ রাহমানুর রাহিম এরশাদ ফরমান,

فَاذْكُرُونِي أَذْ كُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَ لَا تَكْفُرُونِ

অর্থাৎ-"যদি তোমরা আমার জেকের কর, তবে আমিও তোমাদের জেকের করিব। তোমরা আমার শুকরিয়া আদায় কর। আমাকে অমান্য করিও না"। (সূরা বাকারাহঃ ১৫২)

বিজ্ঞাপন

যাহারা আল্লাহতায়ালার মহব্বত লাভ করিয়াছেন, তাহারা সকলেই জেকের করিয়াছেন। প্রথমে জবান দিয়া, তাহার পর কালব বা দিল দ্বারা। তাহার পর দেহের মধ্যে রক্ষিত আরশের উপরের জগতের উপাদান বা লতিফাসমূহ যেমন রূহ, সের, খফি, আখফা এবং সর্ব শরীরের অন্যান্য লতিফার দ্বারা। যাহারা এই রূপ জেকের করেন, আল্লাহতায়ালা তাহাদের সম্বন্ধে বলেন, “যে ব্যক্তি আমার জেকের করে আমি তাহার সহিত উপবিষ্ট সাথী।" এই ভাবে যাহারা আল্লাহতায়ালার জেকেরে মশগুল থাকেন তাহারা আল্লাহতায়ালার সাথী ও আল্লাহতায়ালার সহিত তাহার দরবারে উপবিষ্ট হইবার নসিব লাভকরিয়া থাকেন। এই ভাবে আল্লাহতায়ালার নৈকট্যই কেবল মানুষকে শয়তানের প্রভাব হইতে রক্ষা করিতে পারে। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন,

يَايَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعي إلى رَبِّكَ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً -

অর্থাৎ-“হে শান্তিপ্রাপ্ত আত্মা! তোমার প্রতিপালক আল্লাহতায়ালার দিকে এমনভাবে প্রত্যাবর্তন কর, যেন তিনি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হন ও রাজী থাকেন এবং তুমিও তাহার প্রতি রাজী থাক।" (সূরা ফাজ্বরঃ ২৭)

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালা যে মানুষকে তাহার নিকট প্রত্যাবর্তন করিতে ও তাহার নৈকট্য অর্জন করিতে ও তাহার সাথী হইতে বলিতেছেন: দেখা যাইতেছে জেকেরই তাহার একমাত্র পথ। পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহর বলেতে প্রথমে মুরীদের কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফক্স এবং পরে আব, আতশ, খাক, বাদ, তথা সর্ব শরীরে আল্লাহপাকের জেকের পয়দা হয়। জেকেরের ফলে মুরীদ তাহার সকল লতিফায় আল্লাহপাকের নূরের জেল্লী বা প্রতিচ্ছবি দেখিতে পায়। এই অবস্থাতে আকাশে বাতাসে তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রতি অনু-পরমাণুতে যে সর্বদাই আল্লাহপাকের জেকের হইতেছে মুরীদ তাহা শুনিতে পায় ও দেখিতে পারে। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন,

يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوتِ وَ مَا فِي الْأَرْضِ

অর্থাৎ-"আসমান জমিন ও তন্মধ্যস্থিত যাহা কিছু আছে সব কিছুই আল্লাহতায়ালার জেকের করিতেছে।" (সূরা জুমু'আঃ ১)

বিজ্ঞাপন

হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন,

بذكرش هر چه بینی در خروش است ولی داند در معنی که گوش است

উচ্চারণঃ

বিজ্ঞাপন

"বাজেক্ রাশ হর চেবিনি দর খোরুশ্ আস্ত,

ওয়ালে দানাত্ দরি মানি কে গোশ্ আস্ত"।

অর্থাৎ- আকাশে, বাতাসে, গ্রহে, নক্ষত্রের প্রতি অনু-পরমাণুতে আল্লাহর নামের জেকের হইতেছে। যদি তুমি তাহা শুনিতে চাও, দেলের কানকে পরিস্কার কর।

বিজ্ঞাপন

পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ বলেতে মুরীদের অজুদ রাজ্যের কোটি কোটি লতিফা জাগ্রত হয়। যেমন ইলেকট্রিক কারেন্ট, মূল স্রোতের সহিত কানেকশন লাগাইয়া যেখানেই বাল্ব ফিট করা হউক না কেন, এক টিপিতেই লক্ষ বাতি জ্বলিয়া উঠে। তেমনি পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহতে মুরীদের দেহের কোটি কোটি লতিফায় নূরের বাল্ব জ্বলিয়া ওঠে। তখন তাহার সারা দেহ ও সত্ত্বা নূরের বর্মের মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। এই রূপে সর্বদেহের লতিফা সমূহের একই সাথে জেকেরকে সর্ব শরীরের জেকের বলে।

লৌহের বর্মের মধ্যে যেমন যুদ্ধরত সৈন্য সুরক্ষিত থাকে, কোন অস্ত্রই তাহার বর্ম ভেদ করিয়া ক্ষতি করিতে পারে না, তেমনি আল্লাহতায়ালার নূরের বর্ম ভেদ করিয়া শয়তানের ওয়াছওয়াছা ও ধোকাবাজির অস্ত্র আর সেই মুরীদের কোন ক্ষতি করিতে পারে না। এই অবস্থা লাভ হয় পীরে কামেলের সহিত পরিপূর্ণ মেলামেশার দ্বারা অর্থাৎ মুর্শিদে কামেলের সহিত পরিপূর্ণ ফানা হইয়া। ইহা ছাড়া মুরীদ নিজেকে শয়তানের হাত হইতে রক্ষার জন্য আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে আর একটি উপায় লাভ করিতে পারে তাহা হইল কুওতে এলাহিয়ার ফয়েজের দূর্গ। এই ফয়েজ দোসরা দায়েরা হইতে জাতপাক হইয়া রাসূলে করীম (সঃ) ও মুর্শেদে কামেলগণের পাক দেল হইয়া মুরীদের দেলে আসে। প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এই ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়। এই ফয়েজ খেয়াল করিয়া মুর্শিদে কামেল তদীয় মুরীদ পৃথিবীর যে স্থানেই থাকুক না কেন, সেই স্থানেই তাহাকে কুওতে এলাহিয়ার হেফাজতে রাখিতে পারেন।

মুর্শিদে কামেলকে আল্লাহতায়ালা এই রূপ ক্ষমতা দান করেন, শুধু মুরীদকেই নয় মুরীদের আত্মীয় স্বজন, মালসামানা, বাড়ী-ঘর যাহা কিছুই খেয়াল করুক, তাহার সব কিছুই আল্লাহতায়ালার কুওতের কেল্লায় বন্দী করিয়া দেন। ইহা বেলায়েতে ছোগরার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিদিন সকালে মুজাদ্দেদীয়া তরীকার নিয়ম অনুযায়ী ৭০০ মোর্তবা খতম শরীফ পড়িয়া মুজাদ্দেদ ছাহেবকে নজরানা দিতে হয়। সন্ধ্যায় বাদ মাগরীব এই ফয়েজ পুনরায় খেয়াল করিতে হয়। তাহা হইলে দিন রাত্রির সকল সময় এই কুওতে এলাহিয়ার ফয়েজে কেল্লা বন্দী থাকা যায়। এই কুওতে এলাহিয়ার ফয়েজ এবং সার্বক্ষণিক জেকেরই শয়তানের হাত হইতে রক্ষা পাইবার অন্যতম পথ। কারণ মানব দেহের প্রতি লতিফার জেকেরেই নূরের বিচ্ছুরণ হয়। আর এই লতিফা সমূহ হইতে বিচ্ছুরিত নূরই মানুষকে শয়তানের প্রভাব হইতে পর্দা করিয়া তাহাকে রক্ষা করে।

হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) বলিতেছেন, "আল্লাহতায়ালার নূর আমার ডানে, বামে, নীচে, উপরে এবং মাথায় ও গলায় মালার মতন ঘেরিয়া থাকে। এই নূরের বেষ্টনী ছাড়া শয়তানের হাত হইতে রক্ষা পাওয়া যায় না। আর নিজ দেহের সর্ব স্থানে তথা চতুর্পার্শ্বে এই নূরের বেষ্টনীর জন্য আল্লাহতায়ালার নিকট দয়া, রহমত ও করুণা ভিক্ষা চাহিতে হইবে। যেমন, হাদীস শরীফে স্বয়ং রাসূলে করীম (সঃ) তদীয় সাহাবাগণের অনেককেই আল্লাহতায়ালার নিকট এই উদ্দেশ্যে দয়া চাইতে তাগিদ ও শিক্ষা দান করিয়াছেন। এই সকল দু'আর সমষ্টি হইলঃ-

"হে আল্লাহ! আমার দেলে নূর দান করুন। আমার চোখে নূর দান করুন। আমার কানে নূর দান করুন। আমার ডানে নূর দান করুন। আমার বামে নূর দান করুন। আমার পেছনে নূর দান করুন। আমার সম্মুখে নূর দান করুন। আমার শিরায় শিরায়, স্নায়ুতে, স্নায়ুতে, আমার মাংসে নূর দান করুন, আমার রক্তে নূর দান করুন। আমার আপাদমস্তক নূর বানাইয়া দেন, আপনি আমার উপর নীচে নূর দান করুন। ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাকে নূর-নূরই দান করুন।

এই রূপ মানব দেহের সর্বত্রই আল্লাহতায়ালার নূরই কেবল আদম সন্তানকে শয়তানের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারে। এই রূপ নূর দ্বারা সুরক্ষিত না হইলে শয়তানের হাত হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে না। কারণ হাদীস শরীফে রাসূলে করীম (সঃ) বলিতেছেন,

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مَجْرَى الدَّمِ

অর্থাৎ- "শয়তান তোমাদের রক্তে চলাচল করে।"

অতএব শরীরের প্রতি স্থানই শয়তানের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য নূর দ্বারা সুরক্ষিত করিতে হইবে অর্থাৎ দেহের সর্বত্র সকল অনু-পরমাণুতে জেকেরের নূর সৃষ্টি করিতে হইবে তাহা না হইলে শয়তানের হাত হইতে রক্ষা পাইবার অন্য কোন পথ নাই। এই স্থানে প্রশ্ন হইতে পারে-দেহ আগুন, পানি, মাটি, বাতাস এই সকল জড় পদার্থ হইতে তৈরী। জড় পদার্থ কি রূপে জেকের করিবে? আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান, "আসমান জমিনের প্রতি অনু-পরমাণু আল্লাহতায়ালার জেকেরে রত রহিয়াছে।"

আর জড় পদার্থ সমূহ যে আল্লাহপাকের আদেশ মান্য করিয়া থাকে তাহার প্রমাণ ইতিহাসে বহু রহিয়াছে। মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব ঐ রূপ ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহের কিছু তাহার মছনবী শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি উল্লেখ করিয়াছেন, নমরূদ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে আগুনে নিক্ষেপ করিয়াছিল। কিন্তু আগুন তাহাকে হেফাজত করিয়াছে। এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহতায়ালার মকবুল বান্দা ছিলেন। আগুন তাই তাঁহাকে স্পর্শ করে নাই। ঐ রূপ প্রবৃত্তির আগুনও দীনদ্বার ব্যক্তির কোন ক্ষতি করিতে বা তাহাকে আল্লাহতায়ালার পথ হইতে বিচ্যুত করিতে পারে না। নীল দরিয়ার তরংগ ফেরাউন ও তাহার সৈন্যদলকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল। কিন্তু ঐ পানি হযরত মুছা (আঃ) এর কোন ক্ষতি করে নাই। আল্লাহতায়ালার আদেশে জমিন কারুনকে গ্রাস করিয়া ফেলিয়াছিল।

আ'দের কওমকে আল্লাহতায়ালার আদেশে বাতাস উড়াইয়া লইয়া গিয়াছিল। দেখা যাইতেছে, প্রকৃতির জড় পদার্থ আল্লাহতায়ালার আদেশ পালন করিয়া থাকে।

প্রকৃতিতে জড় পদার্থ যে রূপ আল্লাহতায়ালার আদেশে জেকের করে তেমনি মানব দেহের উপাদান- জড় পদার্থও আল্লাহতায়ালার জেকের করিতে সক্ষম। আর সেই জেকেরই কেবল মানুষকে শয়তানের হাত হইতে রক্ষা করিয়া আল্লাহতায়ালার নৈকট্য দান করিতে পারে।

আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিতেছেন, আসমান ও জমিনের সকল বস্তুই তাহার নূর ও তাহারই প্রকাশ স্থল। তাই সকল বস্তু হইতেই তাহার নূর প্রকাশিত হইবে ও তাহার জেকের ধ্বনিত হইবে-ইহাই স্বাভাবিক। মানব দেহ জড় পদার্থ হইলেও তাহার দেহের অনু-পরমাণু হইতে জেকের তাই সম্ভব।

কিন্তু ইহা কখন সম্ভব? প্রথমেই বলা হইতেছে তাহার জন্য দেলকে শয়তানের খপ্পর হইতে মুক্ত করিতে হইবে। তথা নাফস বা প্রবৃত্তির দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে হইবে। ইহার একমাত্র উপায় হইল দেল ও দেহে কলেমা প্রতিষ্ঠা করা। তরীকতের ভাষায় ইহাকে বেলায়েত বলে। তরীকতের পীরানে পীরগণ বলিয়াছেন কামালাতে নবুয়তের অধ্যায়ে মানুষের দেহ সকল প্রকার আদামাতের দোষ হইতে মুক্ত হয়। মুরীদ যখন এই দায়েরা অতিক্রম করিয়া দায়েরায়ে হকিকতে কাবার' অধ্যায়ে যাইতে থাকে তখন সমগ্র সৃষ্টিই যে হকিকতে কাবার দিকে সিজদা করিতেছে তাহা সে অনুধাবন করিতে পারে।

এই মাকাম অর্জন করিবার জন্য তাই নিজের নাক্স বা প্রবৃত্তি হইতে পরিপূর্ণ রূপে মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন। নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব হইতে মুক্তি পাইবার একমাত্র পথ কামেল মুকাম্মেল মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে থাকিয়া কঠিন ব্রতের দ্বারা নাফসের তাড়না হইতে মুক্তি লাভ করা। কারণ মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন, মুর্শিদে কামেলই কেবল নাক্স রূপ কাল সাপ হইতে রক্ষা করিতে পারেন। তিনিই আত্মার প্রকৃত চিকিৎসক।

মুর্শিদে কামেল তদীয় খোদাতালাশী মুরীদ সন্তানকে একে একে পার্থিব চাহিদা হইতে মুক্ত করিয়া তাহার কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাক্স, আব, আতশ, খাক, বাদ, ও দেহের ৭০,০০০ লতিফা সম্বলিত কালেবকে পবিত্র করিয়া তদীয় পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তাহার সারা দেহে জেকের জারী করাইয়া দেন। বস্তুত এই স্তরে মুরীদের প্রতি অংগ তখন আপন পীরে কামেলের সহিত ফানা হইয়া এই গুণ প্রাপ্ত হয়। পীরে কামেলের অজুদ, শহুদ ও মুদগা এই স্তরে ছালেকের সহিত ফানা প্রাপ্ত হয়। এই স্তরে আসিয়া ছালেক বুঝিতে পারে আসমান জমিন ব্যাপী নাফী-এসবাত জেকেরের চাকা ঘুরিতেছে।

অজুদ হইল কলেমা প্রতিষ্ঠিত দেল সম্বলিত দেহ। অর্থাৎ যে দেহের অভ্যন্তরে এমন দেল বা কালব রহিয়াছে যাহাতে শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, পাকে-নাপাকে, সর্ব অবস্থায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কলেমা প্রতিষ্ঠিত থাকে। ইহা বস্তুত ফানা-ফিশ-শেখের মাকাম বলিয়াও অভিহিত হইয়া থাকে। এই মাকাম পরিপূর্ণ হাসিল হইলে মুরীদ তাহার আলমে আমরের' লতিফাসমূহ অর্থাৎ কালব, রূহ, সের, খফি, আখফায় সর্ব অবস্থায় জেকের জারী থাকে এবং ঐ ছয় লতিফায় ছয় রংগের নূর সর্বক্ষণ প্রবাহমান থাকে। এই ছয় লতিফা জারী হইলে ছালেক ফানা-ফিশ-শেখের মাকাম অতিক্রম করিয়া ফানা-ফির-রাসূলের মাকামে উন্নীত হয়। তখন ছালেক আপন পীরের রূহে বেমেছালীর সহিত পরিপূর্ণ ফানা লাভ করে। আপন মুর্শিদে কামেলের পবিত্র রূহ পূর্ব হইতেই রাসূলে করীম (সঃ) এর পবিত্র রূহ মুবারকের সহিত বিলীন বা ফানাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকে। এই অবস্থা হইতে দেহের অন্যান্য লতিফায় জেকের জারীর জন্য পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহতে মুরীদ চেষ্টা করিতে থাকে।

মুর্শিদে কামেলের দয়া হইলে আলমে খালকের' বাকী চার লতিফায় জেকের জারী হইয়া নূর সর্বক্ষণের জন্য প্রবাহিত হয়। এই অবস্থা প্রাপ্ত হইলে মুরীদের নাক্স আলমে আরওয়াহর গুণাগুণ অর্থাৎ পৃথিবীতে আগমনের পূর্বাবস্থায় মানব আত্মার যে গুণাগুণ ছিল তাহা ফিরিয়া পায়, যাহাকে নাফসে মোৎমাইন্না বা শান্তিপ্রাপ্ত নাক্স বা মানব সত্ত্বা বলে। ইহা ওলীগণের বেলায়েতের পর্যায়। এই স্তরে ছয় বা দশ লতিফায় কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইলে ছালেক তাহার ছয় বা দশ লতিফায় আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লী দেখিয়া থাকে। তখন তাহার ছয় বা দশ লতিফায় জেকেরের নূরের জেল্লী কালবে পড়ে। ছালেকের চোখে তখন সমগ্র আসমান জমিন নূরে নিমজ্জিত দেখা যায়। এই অবস্থায় সাধকের সারা দেহে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই কলেমা প্রতিষ্ঠিত দেহকে অজুদ বলে। এই অজুদে দেহের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের পরস্পর বিরোধিতা ও সৃষ্টি জগতের বৈশিষ্ট্য সমূহ শেষ হইয়া যায় বিধায় না শান্তিপ্রাপ্ত হয়।

এই অবস্থায় ছালেক যাহা দেখিতে পায়, তাহা আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লী বা পার্থিব জগতের পূর্ব স্তরের রূপ যখন সকল কিছুই নূরের আকারে ছিল, বস্তু বা জড়রূপ লাভ করে নাই। এই পর্যন্ত ছুলুক ছায়েরের দ্বারা অগ্রসর হওয়া যায়। ইহার পর আল্লাহতায়ালা যাহাকে পছন্দ করেন, তাহাকে বলেন, "আসুন আমার আকরাবিয়াতে বা প্রেমের হেরেমে।" সেখানে আল্লাহতায়ালার সহিত ছালেকের প্রেমের খেলা শুরু হয়। আল্লাহপাক বলেন, "তোমরা তিনটি জগত পার হইয়া আমার আকরাবিয়াতে আস। এই তিনটি জগৎ হইলঃ জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত। তারপরই হইবে তোমাদের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক।" ছালেক ইহার পর আল্লাহতায়ালার মহব্বতে বেলায়েতে কোবরা, কামালাতে নবুয়ত, হকিকতে এলাহিয়া, হকিকতে আম্বিয়ার মাকাম সমূহে এবং সর্বশেষে হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকাম সমূহে উন্নীত হয়।

হোব্বে ছেরফা মহব্বতের পথ, আর মাবুদিয়াতে ছেরফা ইবাদতের পথ। মহব্বত ছাড়া ইবাদত মূল্যহীন এবং ইবাদত ছাড়া শুধু মহব্বতেরও কোন দাম নাই। হোব্বে ছেরফার মাকামে মহব্বত এবং মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকামে ইবাদত পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই দুই মাকামের পরিপূর্ণতা লাভ হইলেই "আস্সালাতু মেরাজুল মুমিনীন" এর হকিকত ও মারিফত ছালেক বুঝিতে পরে।

এই পর্যায়ে মুরীদ আল্লাহতায়ালার জাতি নূর, সিফাতে হাকীকীর নূর ও তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূরের প্রবাহ তাহার দেহের সর্ব অংগে দেখিতে পায় ও সেই নূরের তুফানে বা দায়েমী তাজাল্লীতে ছালেকের সর্বাংগে জেকের হইতে থাকে ও জেকেরের চাপে তাহার দেহ কাঁপিতে থাকে। তদীয় দেহ কখনও কখনও ভূমিকম্পের মত কাঁপিতে থাকে। এই পর্যায়ে ছালেক আপন দেহ সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টি জগতের লতিফা সমূহের তমদোষ বা অন্ধকার দোষ হইতে মুক্ত পাইয়া থাকে। এই পবিত্র দেহ ও পবিত্র দেহের অভ্যন্তরে যে দেল সেই দেলকে 'মুদগা' বলে।

এই স্তরে ছালেক বা মুরীদ দেখিতে ও অনুভব করিতে পারে সমগ্র আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্র তথা পৃথিবীর সমগ্র বস্তুই আল্লাহতায়ালার জেকেরে নিমজ্জিত রহিয়াছে। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল কর্মই আল্লাহতায়ালার আফ্যালে জাতিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইতেছে এবং তাহার পরিকল্পনা ও ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত হইতেছে। ছালেক বা মুরীদের অজুদে নাফসের অভ্যন্তরে তখন সমগ্র সৃষ্টির কর্মকান্ডের প্রতিচ্ছবি দেখা যায় বলিয়া তরীকতের পীরানে পীরগণ জানাইয়াছেন।

সিফাতে হাকীকীর নূর গ্রহণ করিবার সময় মুরীদ বুঝিতে পারে সৃষ্ট সকল বস্তুর সকল হাকীকী গুণই আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে আসিতেছে। কোন সৃষ্ট জীবেরই কোন গুণ নাই। আল্লাহতায়ালার গুণের সহিত তখন মুরীদ বা ঐ পর্যায়ে উন্নীত ছালেকের সত্ত্বা একীভূত হয়।

জাতি নূর গ্রহণ করিবার সময় দেহের সর্বাংগের আকর্ষণ তীব্র হয়, যদিও এই নূরের রং তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আয়ালের মত তীব্র নয়, জাতি নূরের তাজাল্লী দায়েমী বা সার্বক্ষণিকই চলিতে থাকে। তাই এই স্তরে উন্নীত ছালেকের সর্বাংগে জেকের সর্বক্ষণই চলিতে থাকে। এই স্তরে ছালেক ইত্তেহাদে আফালিয়াত বা আল্লাহতায়ালার ক্রিয়া সমূহ এবং সিফাতে হাকীকীর বা হাকীকী সিফাতের সহিত ইত্তেহাদ বা ফানা অনুভব করিতে থাকে। আল্লাহতায়ালার জাতি নূর পতন হয় রাসূলে করীম (সঃ) এর উৎপত্তি স্থল জাত লাতাইন হইতে যাহা আল্লাহতায়ালার হোব্ব- এর প্রকাশ স্থল। এই নূর পতনের সময় ছালেকের সর্বাংগে এমনই শীতল বায়ু প্রবাহ বহিয়া যায় যাহাকে রোজ আজল বা সৃষ্টির প্রথম দিনে আল্লাহতায়ালার আনন্দময় অনুভূতি হইতে উদ্ভূত শান্তিময় বায়ুর প্রবাহলব্ধ অনুভুতি বলা হইয়াছে।

এই স্তরে মুরীদের দেহের সর্ব দোষ দূরীভূত হয় ও ছবর, তাকওয়া, রেজা প্রভৃতি গুনাগুণ লাভ করে। আল্লাহতায়ালার সহিত তখন বান্দার যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় তাহাকে পারস্যের খ্যাতনামা সাধক মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব লায়লী মজনুর প্রেম উপাখ্যানের রূপক হিসেবে প্রকাশ করিয়াছেন। এই উপাখ্যানে মজনুকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, লায়লী কে? সে বলিয়াছিল "আমি"। মজনুকে আবার জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, মজনু কে? সে উত্তর দিয়াছিল "আমি"। লায়লীর দেহে আঘাত করিলে মজনুর দেহে তাহার দাগ পড়িতে দেখা যাইত। আল্লাহ ও তাহার মহব্বতের বান্দার সহিত তখন এইরূপই মহব্বতের সম্বন্ধ স্থাপন হয় বলিয়া হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) জানাইয়াছেন। আল্লাহ ও বান্দার সহিত তখন প্রকৃত আশেক মাশুকের সম্পর্ক স্থাপন হয় ও তাহাদের মধ্যে কালাম বিনিময় হয়। এই পর্যায়ে উন্নীত নাক্সকে "নাফসে মোলহেমা" বলা হয়।

আল্লাহতায়ালার সহিত বান্দার যখন এই সম্পর্ক স্থাপন হয়, বান্দা তখন অনুভব করে সমগ্র সৃষ্টিজগতই কলেমা শরীফের অধীন। কলেমা শরীফের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য দ্বারাই সমগ্র সৃষ্টি জগৎ পরিচালিত হইতেছে। ইসলামের কলেমা শরীফই সমগ্র সৃষ্টি রহস্যের চাবীকাঠি। আল্লাহতায়ালার সহিত বান্দার এই দুর্লভ সম্পর্ক ও তাহার জাতপাক, সিফাত ও আফালিয়াতের নূরের দায়েমী স্রোত আপন পীরের অজুদ, শহুদ ও মুদগার মাধ্যমেই ছালেক লাভ করিতে পারে। কারণ কামেল মুর্শিদে কেবলার অজুদও পূর্ব হইতেই পবিত্রতা লাভ করিয়া আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা ও বাকা সিদ্ধ থাকে। আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা ও বাকা সিদ্ধ লাভের পরও পীরে কামেল আল্লাহতায়ালার দয়ায় কামালিয়াত বা সৃষ্টির জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞান লাভ করেন ও মানুষের আত্মার অবস্থা পরিবর্তনের দুর্লভ ক্ষমতা লাভ করেন। মানুষের কালব আরশের উপরের স্তরের উপাদান আর রূহ হইল স্বয়ং অনাদি অনন্ত আল্লাহপাকের আমরে রাব্বী৫।

মানব দেহে অবস্থিত এই রূহ ও কালবের অবস্থা পরিবর্তন ও উন্নয়নের ক্ষমতা যে কত বড় ক্ষমতা তাহা জ্ঞানী লোকের চিন্তা করিয়া দেখা উচিত। মুর্শিদে কামেলগণ সেই ক্ষমতা ও জ্ঞান দ্বারা একই সাথে হাজার হাজার মানুষের আত্মা, নাক্স, কালব ও রূহের অবস্থার পবিবর্তন করাইয়া মানুষকে তাহার প্রবৃত্তির দাসত্ব হইতে মুক্তি দিয়া ইনছানে হাকীকীর মর্যাদা বা হযরত আদম (আঃ) কে যে রূপ আল্লাহপাক তাহার খলিফা হিসেবে আখ্যায়িত করিয়াছিলেন, সেই মর্যাদা দান করিতে পারেন। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে মুর্শিদে কামেল তাই শ্রেষ্ঠ মানব যাহাকে হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব "পরশ পাথর” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তিনিই মাটির মানুষের দেহ রূপ কবরের মধ্যে রক্ষিত আল্লাহতায়ালার নিদর্শন কালব, সের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক, বাদ, কালেব প্রভৃতি লতিফা সমূহে তদীয় পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা আল্লাহতায়ালার নূরের তাজাল্লী প্রবাহিত করেন। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব মুর্শেদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহকে ইস্রাফিলের শিংগার ধ্বনির সহিত তুলনা করিয়াছেন।

ইস্রাফিল ফেরেশতা যখন শিংগা ফুঁকিবেন, তখন সমস্ত মুর্দা কবর থেকে উঠিয়া হাশরের মাঠের দিকে দৌড়াইতে শুরু করিবে। মুর্শেদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহর বলে, আলস্যরূপ কাফন ছিন্ন করিয়া দেহ রূপ কবর হইতে জাগ্রত হইয়া লতিফা সমূহ আল্লাহর দিকে দৌড়াইতে থাকে। শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হয় না। মাটির দেহের জড় পদার্থের প্রতি অনু-পরমাণুতে প্রাণ সঞ্চার করিয়া তাহাকে সাত আসমান পার করাইয়া আল্লাহতায়ালার কুর্বে তিনিই পৌঁছাইয়া দেন। মুর্শেদে কামেলের এই ক্ষমতা ও দান কোনটিরই তুলনা সৃষ্টি জগতের মধ্যে নাই, হয়ও না। মুর্শেদে কামেলই কেবল মুর্শেদে কামেলের তুলনা বা আয়না হইতে পারেন।

হে জাকেরগণ! তোমরা তাই এই পৃথিবী হইতে যাইবার পূর্বে নিজ নিজ অন্তরে আল্লাহতায়ালার নামের দাগ কাটিয়া লইবার ব্যবস্থা কর। তাহা হইলেই তোমরা পরকালে শান্তি পাইবে। নিশ্বাসের বিশ্বাস নাই। পরবর্তী মুহূর্তে কি আসিবে তাহাও তোমাদের জানা নাই। প্রত্যেককেই মৃত্যুর পেয়ালা পান করিতে হইবে। নির্দিষ্ট সময়ই দুনিয়া ত্যাগ করিতে হইবে। আল্লাহ বলেন,

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ

অর্থাৎ-"জীবন মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে।" (সূরা আলে ইমরানঃ ১৮৫)

তাই দুই দিনের জিন্দেগীর মোহ ত্যাগ কর। নিজ নিজ দেলকে আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীতে রওশন কর। তাহা হইলেই তোমাদের ভিতর আর হিংসা-কীনাহ থাকিবে না।

মানুষ যেদিন হিংসা-বিদ্বেষ ভুলিয়া আল্লাহতায়ালার দিকে ফিরিবে সেই দিন মানুষ শান্তি ফিরিয়া পাইবে, দুনিয়াতেও শান্তি আসিবে।

তোমরা যদি নিজ নিজ নাফসের গোলামী হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার খাঁটী বান্দা হইতে চাও, তাহার তাজাল্লীতে দেলকে রওশন করিতে চাও, নিজের জীবনের শান্তি ফিরিয়া পাইতে চাও, সমাজ তথা দুনিয়াতে শান্তি ফিরাইয়া আনিতে চাও, তাহা হইলে আল্লাহতায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন কর। আল্লাহতায়ালার পথ ঠিক ঠিক ভাবে অনুসরণ ও নিজেকে নাফসের দাসত্ব হইতে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালার এশক মহব্বতের সূর্য, বর্তমান জামানার সর্ব শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের নসিহত অনুযায়ী চল। তাহা হইলেই তোমরা মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদের মঙ্গল করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD