Logo

সৃষ্টির আদিতে জাত লাতাইনে আল্লাহতায়ালার হোব্ব প্রথম সৃষ্টি হয়

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৩ জুলাই, ২০২৬, ১৯:৪৪
সৃষ্টির আদিতে জাত লাতাইনে আল্লাহতায়ালার হোব্ব প্রথম সৃষ্টি হয়
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত লতিফাসমূহের পরিচিতি بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞানকেন্দ্র কালবের বিভিন্নমুখী ব্যবহার ও ইহার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আলোচনা। এতদ্ব্যতীত খোদার প্রেম অর্জনের কঠোরতা সম্পর্কিত আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,

كُنتُ كَنْزًا مَخْفِياً فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الْخَلْقَ لأَعْرَفَ

অর্থাৎ-"আমি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলাম। পরিচিত হইবার জন্য বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করিলাম।"

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার এই বাণী হইতে বোঝা যায় যে, পরিচিত হওয়াই তাঁহার সৃজন ও সৃজন বাসনার মুখ্য উদ্দেশ্য। পরিচয় দিতে হইলে দ্বিতীয় বা ততোধিক অস্তিত্ব প্রয়োজন হয় এবং এমন অস্তিত্ব প্রয়োজন হয়, যাহা পরিচয় গ্রহণে সক্ষম।

মানুষ যে আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণের মাধ্যম, আল্লাহতায়ালা তাহা বিভিন্ন ভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন মানুষ "আশরাফুল মাখলুকাত" বা সৃষ্টির মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ। তিনি আবার বলিয়াছেন, "আল ইনসানু সেররী” অর্থাৎ-"মানুষ আমার গুপ্ত ভেদ।” তিনি আরও বলিয়াছেন, "আমি আদমকে আমার নিজ ছুরাতে সৃষ্টি করিয়াছি।"

সৃষ্টির আদিতে জাত লাতাইনে আল্লাহতায়ালার হোব্ব বা প্রেম অনুভূতি প্রথম সৃষ্টি হয়। এই প্রেম অনুভূতি প্রকাশ করিবার জন্যই আল্লাহতায়ালার সৃজন বাসনা হইল। কিন্তু তিনি তদীয় প্রেম অনুভূতিকে প্রথমে আরশের উপর "লা-মাকানে" রাখিলেন। ইহার পরে তিনি নূরে মুহাম্মদী, তাহার পর বিশ্ব জগৎ ও হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করিলেন। লা-মাকান হইতে 'হোব্ব' আল্লাহতায়ালার নিকট আরজ করিল, 'হে আল্লাহ! আমার জন্ম কি বৃথা যাইবে? আমাকে কে গ্রহণ করিবে?" আকাশ, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য কেহই আল্লাহতায়ালার হোব্ব বা প্রেমকে ধারণ করিতে রাজী হইল না। আল্লাহ বলিলেন যে, তাঁহার মুমিন বান্দাই তাঁহার হোব্ব বা প্রেমকে ধারণ করিবার জন্য যথাযথ হইবে।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালা তাই মানুষ সৃষ্টি করিলেন তাঁহার নিজ সত্ত্বা ও গুপ্ত ভান্ডার হোব্ব বা প্রেম প্রকাশ করিবার জন্য। আল্লাহতায়ালা মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন আল্লাহতায়ালার পরিচয় দান করিবার জন্য। মানুষই আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ স্থল। মানুষই তাঁহার পরিচয় প্রকাশের স্থল। আল্লাহপাক তাই বলেন, "আমার গুঞ্জায়েশ কোথাও হয় না মুমিন বান্দার দেল ব্যতীত"-'কুলুবুল মু'মিনীনা আরশুল্লাহ।' মুমিন বান্দার দেল বা কালবই তাই আল্লাহতায়ালার প্রকাশ স্থল। কালবই আল্লাহতায়ালার প্রকাশের আয়না। আল্লাহপাক তাই বান্দাকে স্ব স্ব কালবে তালাশের জন্য বলিয়াছেন।

কালব মানব দেহে আরশের উপরের জগতের উপাদান। এই আরশের উপরের জগতের উপাদানের মাধ্যমেই আল্লাহতায়ালা তাঁহার পরিচয় দান করিবেন, ইহাই স্বাভাবিক। কালব ছাড়াও মানুষের ছিনায় রহিয়াছে, "রূহ"-যাহা আল্লাহতায়ালার 'আমর' বা হুকুম। আর কালব ও রূহকে আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণে সহায়তা করিবার জন্য সের, খফি, আখফা নামক আরশের উপরের জগতের আরও তিনটি লতিফা দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু কোন্ অবস্থায় গেলে মানুষ তাহার কালবে আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করিতে পারে? আল্লাহ বলেন, "তোমরা তোমাদের নিকট রক্ষিত আমানত মালিকের নিকট ফেরত দাও।" "আমি আদমকে আমার নিজের ছুরাতে সৃষ্টি করিয়াছি" আল্লাহপাকের এই বাণীর নিগুঢ় অর্থ এই স্থানে বিশেষভাবে অনুধাবন করিবার প্রয়োজন। এই বাণীর অর্থ এই নয় যে, আদমের মত দেহ আল্লাহতায়ালার আছে বা ছিল। আল্লাহতায়ালার যে হায়াৎ, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াৎ, বাছারত, কালাম, তাকবীন ও হোব্ব গুণ, এই সবের প্রতিবিম্ব তিনি আদমকে দান করিয়াছেন।

আদম আল্লাহতায়ালার এই গুণ সমূহকে প্রকাশ করে। আদমের ছুরাতে আল্লাহতায়ালা এই সকল গুণ দান হিসেবে রখিয়াছেন। তাই আদমের ছুরাত আল্লাহর ছুরাতের অবিকল। এই গুণ সমূহ আদম সন্তান আল্লাহকে ফেরৎ দিলে তাহার কোন গুণ বা শক্তি আর বর্তমান থাকে না। আদম সন্তানের নিকট যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহা হইল তাহার অক্ষমতা, মানুষের এই অক্ষমতার উপর আল্লাহতায়ালা তাঁহার গুণের জামা পরাইয়া দেন। আল্লাহ তাই বলেন, "তুমি আমার চরিত্রে চরিত্রবান হও। আমার গুণে তোমার সত্ত্বাকে সজ্জিত কর, আচ্ছাদিত কর।"

বিজ্ঞাপন

ইহাতে মানুষ যে অন্ধকার, সেই অন্ধকারেই থাকিবে। তবে আল্লাহতায়ালার গুণের সাজে সজ্জিত হইবার সুযোগ পাইবে। এই অবস্থায় আসিতে হইলে "সমস্ত শুভ আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে এবং সমস্ত অশুভ মানুষের আদামত হইতে"- এই আয়াতের মর্মবাণী অনুধাবন করিতে হইবে। মানুষ যখন বুঝিতে পারে, আল্লাহতায়ালার গুণ ব্যতীত তাহার নিজস্ব কোন গুণ নাই অর্থাৎ হায়াৎ, জ্ঞান, বুদ্ধি, দর্শন, শ্রবণ, বর্ণন, কল্পন, সৃজন, শক্তি নাই তখনই সে আল্লাহতায়ালার উপর পরিপূর্ণরূপে নির্ভরশীল হইতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার দয়া গ্রহণের জন্য মানুষ সদা সর্বদা উন্মুখ থাকিতে পারে। ইহা মানুষের জন্য তাঁহার এক অপার দয়া ও রহমত।

আল্লাহপাক বলিয়াছেন, "তিনি আদমকে তাঁহার খলিফা করিয়া জমিনে পাঠাইয়াছেন।" আল্লাহপাক বলিয়াছেন, "আদমকে তিনি পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন।" আদমের মধ্যে আল্লাহতায়ালার খলিফা হইবার ও আল্লাহ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন সমূহ কি?

আমাদের ধারণা হইতে পারে যে, মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি, স্বাধীনতা, ক্ষমতা ইত্যাদি জগতের অন্যান্য সকল জীবের চেয়ে অধিক। তাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। এক অর্থে কথাটি সঠিক হইলেও একটু চিন্তা করিলেই কথাটির অসম্পূর্ণতা ও অগভীরতা বোঝা যায়। আল্লাহতায়ালা মানব দেহে যে সকল গুণ দান করিয়াছেন, যেমন জ্ঞান, বুদ্ধি, ক্ষমতা, কল্পনা, শ্রবণ, দর্শন, বর্ণন, কথন, সৃজন প্রভৃতি; সেই গুলি যদি আমাদের দেহ হইতে বাদ দেয়া যায়, তবে যাহা অবশিষ্ট থাকে তাহা হইল একটি জৈবিক সত্ত্বা। এই জৈবিক সত্ত্বা সকল কিছুরই জন্য আল্লাহতায়ালার উপর নির্ভরশীল। মানব সত্ত্বা তাই আল্লাহতায়ালার দান নির্ভর সত্ত্বা। মানুষের যে দেহ, তাহার দুইটি বৈশিষ্ট্য। প্রথম বৈশিষ্ট্য হইল, মানব দেহ একটি জৈবিক সত্ত্বা মাত্র, যাহা সকল কিছুরই জন্য আল্লাহ পাকের দানের উপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হইল, মানুষের অক্ষম ও জৈবিক সত্ত্বার উপর আল্লাহপাকের গুণের প্রতিবিম্ব যাহা তিনি আমাদের দান করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

মানুষের সকল শুভ গুণ ও কর্ম আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ ও কর্মগুণের প্রতিবিম্ব। মানুষের কথা বলার শক্তি আল্লাহতায়ালার কালাম গুণের প্রতিবিম্ব। জ্ঞানবুদ্ধি এলেম গুণের প্রতিবিম্ব। অর্থাৎ মানুষের সকল গুণই ধার করা। এই ধারণা যখন ছালেকের মনে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, তখন আকরাবিয়াত স্তরের বা আলমে আরওয়াহের ঊর্ধ্বের জগতের গুণাবলী সে ফিরিয়া পাইতে থাকে। তখন নিজে অন্য কাহাকেও কিছু দান করিলে তাহাও নিজের মধ্যে আল্লাহপাকের দয়াগুণের প্রতিবিম্ব প্রকাশিত হইয়াছে-এই ধারণাই কাজ করে। মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ, দ্বেষ, হিংসা, মোহ, লোভ, লালসা, আলমে আরওয়াহ স্তরেই দুরীভূত হইয়া যায়। আলমে আমরে আল্লাহপাক রূহ সমূহকে জিজ্ঞাসা করেন,

الَسْتُ بِرَبِّكُمْ

অর্থাৎ-"আমি কি তোমাদের প্রভু নই?"

বিজ্ঞাপন

সকলেই বলিয়াছিল,

অর্থাৎ-বেশখ তুমি আমাদের প্রভু।

আলমে আমরের জগতে মানুষ "রবকে" রব বলিবার গুণ সহজাত বা স্বভাবজাত হিসেবে প্রাপ্ত হইয়াছে। রবের উপর নির্ভরতার জ্ঞান লাভকরিয়াছে। তাই এই অবস্থান হইতে অর্থাৎ আলমে আমরের জ্ঞান অর্জন করিবার পরই কেবল মাত্র মানুষ আল্লাহতায়ালার জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রস্তুত হয়। সেই স্তরে আল্লাহতায়ালার সহিত মানুষের পরিচয়ের দরজা খুলিয়া যায়। এই স্তরে আসিয়া মানুষ বুঝিতে পারে, মানুষের দেহ ও সত্ত্বা পরিচালিত হইতেছে আল্লাহতায়ালার প্রতিবিম্বিত গুণ সমূহ দ্বারা। এই স্তরে তাই প্রশ্ন দাঁড়ায়, মানুষ বলিতে কি বোঝায়? মানুষের দেহ? মানুষের রূহ? না মানুষের দেহে সংযোজিত আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ?

বিজ্ঞাপন

মানুষের রূহ বা জীবন, মানুষের দেহ ও মানুষের দেহে আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ-এই তিনটি ভিন্নস্তরে মানুষের প্রকাশ। আলমে আমরের স্তরে রূহ ও জীবন, আলমে আরওয়াহের স্তরে রূহ ও গুণ সমূহের সমষ্টি ও আলমে খালকে জীবন, দেহ ও গুণ সমূহের সমন্বিত প্রকাশ। আল্লাহপাকের পরিচয় গ্রহণ করিতে হইলে মানুষকে এই তিনটি স্তর হইতেই করিতে হইবে।

এই তিন ভাগে যে মানুষের অস্তিত্ব পৃথক করা সম্ভব, তাহা একটু চিন্তা করিলেই বোঝা যাইবে। মানুষ মারা গেলেও তাহার দেহ বর্তমান থাকে। কিন্তু তাহার জীবন ও আল্লাহ প্রদত্ত গুণ সমূহ যেমন দর্শন, শ্রবণ, ইত্যাদি গুণ থাকে না। আবার দেখা যায়, রোগ বা অন্যান্য কারণে হয়তো মানুষের শ্রবণ, দর্শন, চিন্তন, বর্ণন গুণ নাই কিন্তু তাহার দেহে জীবন আছে। তাই মানুষের আমি সত্ত্বা, তাহার দেহ ও তাহার দেহের সহিত সংযোজিত আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ এক নয়। জীবন, দর্শন, শ্রবণ, কল্পন, বর্ণন গুণ মানব দেহে তিনি যেমন দান হিসেবে সংযোজিত করিয়াছেন; তাঁহার এলেম গুণ বা জ্ঞান নামক গুণও তিনি মানব দেহে সংরক্ষিত করিয়াছেন, মানব দেহের যে স্থানে এই জ্ঞানের গুণ সংরক্ষণ করিয়াছেন, তাহার নাম কালব। সাধারণ মানুষ জ্ঞান আহরণের জন্য ব্যবহার করে তাহার দর্শন, শ্রবণ, স্বাদ বা অনুভূতি গ্রহণের ইন্দ্রিয় সমূহকে।

কিন্তু আল্লাহতায়ালা মানুষের ইন্দ্রিয় সমূহকে অনুভূতির জন্য বা জ্ঞান গ্রহণে সহায়ক অংগ হিসেবে সৃষ্টি করিলেও আল্লাহতায়ালার মূল জ্ঞানের আধার মানুষের সফিদায়ে কালব। দর্শন বা শ্রবণ ইন্দ্রিয় নিজে জ্ঞান লাভ করিতে পারে না। একই ভাবে হস্ত পদাদিও জ্ঞান আহরণ করিতে পারে না। চক্ষু যাহা দেখে, কর্ণ যাহা শোনে, জিহ্বা যে স্বাদ গ্রহণ করে তাহাদের কেহই নিজে নিজেই তাহার তাৎপর্য অনুভব করিতে পারে না। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, হস্ত, পদ সকল অংগের সহিতই মস্তিষ্ক ও কালব বা দেলের (হৃদযন্ত্রের) যোগাযোগ রহিয়াছে। মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের সহিত যোগাযোগ ছাড়া মানুষের কোন ইন্দ্রিয়ই তাহার নিজ নিজ কর্ম করিতে পারে না। ইন্দ্রিয় সমূহের অনুভূতি মস্তিষ্ক হইয়া হৃদযন্ত্রে গেলেই আমরা যাহা দেখি, শুনি বা করি তাহার ভাল মন্দ বিচার করিতে পারি। মানব দেহের কার্যকরণ পদ্ধতিই আমাদের বলিয়া দেয়, কালব যাহা হৃদযন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত, তাহাই আমাদের দেহে রক্ষিত আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ভান্ডার।

বিজ্ঞাপন

অনুভূতি ও জ্ঞান-দুইটি ভিন্ন জিনিষ। ইন্দ্রিয় সমূহ যাহা দেখে, তাহার দ্বারা মানস লোকে যে ক্রিয়া বিক্রিয়া হয় তাহা ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান। মানুষের দেহের ইন্দ্রিয় সমূহকেও তাই দেখা যায়, মানস লোক বা কালব ছাড়া কার্যকর কোন ভূমিকা রাখিতে পারে না। মানুষের দৈহিক কর্মপদ্ধতি দ্বারাই বোঝা যায়, কালবই মানব দেহে জ্ঞান কেন্দ্র। এই কালবে জ্ঞানের দুইটি উৎস রহিয়াছে। একটি ইন্দ্রিয় গঠিত; অন্য জ্ঞান হইল, আল্লাহপাক কালবের মধ্যে নিজ হইতে যে জ্ঞান সৃষ্টির প্রথমেই রাখিয়া দিয়াছেন।

তাহার নিজ গুণ সমূহ হইতে আল্লাহপাক আমাদের দেহকে শ্রবণ, দর্শন, বর্ণন, প্রভৃতি গুণের জন্য বিশেষ স্থান, কেন্দ্র বা অংগ দ্বারা সজ্জিত করিয়াছেন। জ্ঞানের জন্যও তেমনি একটি বিশেষ অংগ আল্লাহতায়ালা দান করিয়াছেন। এই অংগ হইল কালব। এই কালবই হইল আল্লাহতায়ালার আরশের উপরে রক্ষিত মহা কালবের ক্ষুদ্রতম অংশ। সেই মহাকালবে আল্লাহতায়ালা তাঁহার নিজ জ্ঞান, সৃষ্টির আদি-অন্ত, আরশ-কুরছি, লওহ-কলম, সাত-তলা আসমান-জমিন, মাশরেক-মাগরিব সকল কিছুরই জ্ঞান রাখিয়াছেন। মানব দেহের কালব মহাকালব হইতে জ্ঞান আহরণ করিতে সক্ষম। এই কালব বা আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান কেন্দ্রের জ্ঞানে যখন মানুষ জ্ঞানী হয়, তাহাকে আমরা প্রকৃত জ্ঞানী বলিতে পারি।

কৃত্রিম চক্ষু সজ্জিত ব্যক্তিকে আমরা পরিপূর্ণ দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন বলিতে পারি না। তেমনি অতি সীমিত পরিধির ইন্দ্রিয় লব্ধ জ্ঞানের অধিকারীকে আমরা প্রকৃত জ্ঞানী বলিতে পারি না। মানুষের মধ্যে আল্লাহতায়ালা যে তাঁহার জ্ঞানকেন্দ্র রক্ষিত করিয়াছেন, তাহা না জানিবার জন্য, বা জানিয়াও সেই জ্ঞান কেন্দ্রকে ব্যবহার করিতে ইচ্ছুক না হইবার জন্য মানুষ খোদাতত্ত্বজ্ঞানে নিজেকে জ্ঞানী করিতে পারিতেছে না। মানুষ তাহার আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান কেন্দ্র ব্যবহার না করিয়া অন্যান্য অংগ প্রত্যংগ জ্ঞান আহরণের জন্য ব্যবহার করিতেছে। সে ক্ষেত্রেও তাহারা সেই জ্ঞান বিশ্লেষণের জন্য অজ্ঞাতে আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান কেন্দ্র কালবের সীমিত ব্যবহার করিতেছে। কিন্তু কালব-যাহা মানব দেহে আল্লাহ প্রদত্ত প্রকৃত জ্ঞান ভান্ডার, তাহার সচেতন ব্যবহার মানুষ করিতেছে না। আল্লাহ প্রদত্ত এই জ্ঞান ভান্ডারের ব্যবহার ইসলামের একটি বড় শিক্ষা, যাহা রাসূলে করীম (সাঃ) আমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন। এই কালব বা আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান কেন্দ্রের ব্যবহার শিক্ষাই ইসলামের সূফী দর্শনের অন্যতম শিক্ষা।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালা মানুষকে যে জ্ঞান কেন্দ্র দিয়াছেন, সেই জ্ঞান কেন্দ্রের ৭০,০০০ পর্দার অন্তরালে রহিয়াছে সফিদায়ে কালব। সফিদায়ে কালব অর্থাৎ কালিমা মুক্ত কালব। আল্লাহপাকের পরিচয় জানার জন্য কালব সম্পর্কে জ্ঞান থাকা তাই আল্লাহতায়ালার পরিচয় সন্ধানকারীদের জন্য বিশেষ প্রয়োজন।

লতিফায়ে কালব মানুষের বুকের বামস্তনের সামান্য নীচে পাঁজরার দিকে নিরূপিত। ইহা আরশের উপরের নূরের জগতের লতিফা। মুরশিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহতে এই কালব জিন্দা হয় অর্থাৎ এই লতিফার নূর প্রকাশ পায়। তখন জেকেরে কালবী জারী হয়। জেকেরে কালবী হাসিল হইলে দেল অতি সহজেই আল্লাহর দিকে রুজু হয়। এই কালবের মধ্যে আরবী তোগরা অক্ষরে "আল্লাহ" শব্দ লেখা আছে।

ছালেক যখন কালবে খেয়াল করিয়া জেকের করে, তখন জেকেরের ধ্বনি কালবে প্রতিধ্বনিত হয়। যে আল্লাহ আল্লাহ শব্দ বা জেকের জগতের সর্ব জিনিষের মধ্যে বর্তমান, সেই রূপ শব্দ অর্থাৎ জেকের ও জেকেরের নূর তখন কালবেও ধ্বনিত ও চমকিত হয়। বিশ্বের সকল বস্তুর মধ্যে যে নূর ও জেকেরের শব্দ; অনু পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের যে ঘূর্ণন ও শব্দ তরঙ্গ তাহারাতো ঐ আল্লাহ আল্লাহ শব্দ হইতে উৎগত এনার্জি বা বিদ্যুৎ, নূর বা লাইট।

বিজ্ঞাপন

কালব মানব দেহে আল্লাহ পরিচয়ের ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইহা একাধারে ক্যামেরা, লেন্স, রিফ্লেকটর, রেডিও সেন্টার, রিলে সেন্টার ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও টেলিভিশন বা বায়োস্কোপের পর্দা হিসেবে কাজ করে। আল্লাহতায়ালার জাত, তাঁহার হুকুম ও গুণের সূক্ষ্ম জগৎ হইতে মানুষের স্কুল দেহ পর্যন্ত সর্বত্রই যোগাযোগের জন্য কালবের ভূমিকা রহিয়াছে।

এই কালবের ক্যামেরার লেন্সে সাধকগণ আল্লাহতায়ালার সিফাতের নূরের ও সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর ছবিই ধারণ করিতে পারেন। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ হিসেবে কালব আল্লাহতায়ালা, রাসূলে করীম (সাঃ), মুর্শিদে কামেল তথা পৃথিবীতে বর্তমান বা গত হইয়া যাওয়া যে কোন ব্যক্তির সহিত যোগাযোগ করিতে সক্ষম। ক্যামেরার লেন্স হিসেবে শুধু ছবি ধারণ বা গ্রহণই করে না, টেলিভিশন বা বায়োস্কোপের পর্দা যেমন ক্রমাগত ভাবে ঘটনার পরে ঘটনার ছবি ফুটাইয়া তোলে, কালবের পর্দায় তাহাও সম্ভব হয়। সেই ঘটনা সমূহ অতীত কালেরও হইতে পারে, বর্তমান কালেরও হইতে পারে ও ভবিষ্যতেরও হইতে পারে।

এই কালব আবার মানুষের সকল কর্মেরও ভালমন্দের রেকর্ডার হিসেবে কাজ করে। মানুষ খারাপ কাজ করিলে কালবের পর্দায় সংগে সংগেই কালো দাগ পড়িয়া যায়। আবার ভাল কাজ করিলে বা আল্লাহতায়ালার জেকের করিলে কালবের আয়নায় তাহার চমক বা রৌশনাই বা ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। এই কালব যখন পরিপূর্ণ রূপে কালিমা মুক্ত হয় বা সাধক যদি মূল কালবে বা ৭০,০০০ পর্দার অন্তরালে সফিদায়ে কালবের সন্ধান পান, তাহা হইলে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ তিনি অহরহই পাইতে থাকেন। তাহাতে অসুবিধা হয় না। কালবের পর্দায় আল্লাহতায়ালার ৯৯ নামের তাজাল্লী বা ঝলক আসিতে থাকে। ইহার সত্যতা সাধারণ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন হইতেও বোঝা যায়। কালব যখন জারী হয় বা ছালেকের সর্ব শরীরের জেকের জারী হয়, তখন তাহার জেকের আল্লাহ আল্লাহ শব্দ হইতে নূরের চমক উঠিতে থাকে। সেই নূর বা আলো তখন জগতের সর্ব বস্তুর মধ্যে যে বিদ্যুৎ ও শব্দ তরংগ আছে, তাহার সহিত মিশিয়া বিদ্যুৎ বেগেই আল্লাহতায়ালা ও সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর সহিত যোগাযোগ করিতে পারে।

এক্ষণে প্রশ্ন হইল, কি রূপে এই কালবকে আল্লাহতায়ালার পরিচয়ের ধারক পরিণত করা যায়?

ইহার পথ হইল, আল্লাহ বলেন, 'তোমরা আমার চরিত্রে চরিত্রবান হও।" কামেল মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে থাকিয়া ছালেক যখন সকল প্রকার পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয় এবং তাহার সকল গুণ যে আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে প্রাপ্ত, নিজের কোন গুণ ও ক্ষমতা নাই, ইহা বুঝিতে পারে, তখনই ছালেক আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করিতে পারে। ইহা আকরাবিয়াতের অধ্যায়ে। ইহার পূর্বে কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস ইত্যাদি লতিফা সংযোগে ছালেক আল্লাহপাকের সিফাতে এজাফিয়া ও তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের সহিত পরিচয় লাভ করে। তাহা জেল্লী বা নূরের মাধ্যমে। আল্লাহতায়ালার হাকীকী অর্থাৎ জাত মিশ্রিত সিফাত ও জাতের সহিত পরিচিত হয় আকরাবিয়াতের স্তরে, যখন তাহার মধ্যে এই ভাব উদয় হয় যে, তাহার নিজের বলিয়া কিছু নাই। ছালেক নিজেকে তখন খালি বুঝিতে পারে। এই স্তরে ছালেক সকল কিছুরই জন্য আল্লাহপাকের উপর নির্ভরশীল হয়। দুনিয়া ও আখেরাতের সকল কিছু হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া কেবল আল্লাহতেই ধ্যান ও জ্ঞান নিবদ্ধ করেন, তবে আকরাবিয়াতের মাকামে আল্লাহতায়ালার দয়ায় উন্নীত হইবার পূর্বে, সকল সাধককেই বেলায়েতে ছোগরার মাকাম অতিক্রম করিতে হয় অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নূরের জগতের সহিত পরিচিত হইতে হয়। তাই বেলায়েতে ছোগরা ও আকরাবিয়াত-এই উভয় স্তরের কথাই এখানে বলা হইল।

বেলায়েতে ছোগরার স্তরে কালবের জ্ঞান গ্রহণ করিবার জন্য প্রয়োজন,

প্রথমতঃ গোনাহের কালিমা হইতে মুক্ত হওয়া।

দ্বিতীয়তঃ দেহের দাসত্ব হইতে মুক্ত হওয়া।

তৃতীয়তঃ ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান হইতে কালবের জ্ঞানের পার্থক্য নিরূপণ করা।

চতুর্থতঃ কালবের জ্ঞান সংগ্রহের প্রক্রিয়া আয়ত্ব করা।

দেহের দাসত্ব তথা পার্থিব সকল চাহিদা হইতে মুক্ত হইবার এবং দেলকে গোনাহর কালিমা হইতে মুক্ত করা কালবের জ্ঞান লাভ করিবার প্রথম পদক্ষেপ। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, "বস্তুর ময়লা পরিস্কার করিবার জন্য যেমন রেদ বা উখা আছে, তেমনি কালব বা দেল পরিস্কার করিবার রেদ বা উখা হইল আল্লাহতায়ালার নামের জেকের, যাহাকে জেকেরে এসমে জাত বলা হয়। আর দেলকে পার্থিব চাহিদা হইতে মুক্ত করিবার জন্য প্রয়োজন হয় নাফী এসবাত জেকের বা কালেমা শরীফের জেকের। কালেমা শরীফের জেকেরের মাধ্যমে পার্থিব সকল কিছুরই প্রভুত্ব ও দাসত্ব অস্বীকার করা হয়। আর আল্লাহতায়ালার জ্ঞানের ভাষা হইল নূর

বেলায়েতে ছোগরার স্তরে ছালেক কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা ও নাফসের যোগাযোগে আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূর লাভ করে। রূহ ও কালবের যোগাযোগে ছালেক তখন এক বিশাল নূরের সাগর দেখিতে পায়। সেই নূরের সাগর এতই প্রশস্ত যে, তাহার কোন কুল কিনারা পাওয়া যায় না। ছালেক তখন সকল কিছুর মধ্যেই আল্লাহতায়ালার নূর দেখিতে পায়। সকল কিছুকেই আল্লাহতায়ালার প্রকাশ মনে করে।

কিন্তু বেলায়েতে ছোগরার স্তরে ছালেক নূরের জেল্লীর মাধ্যমে পরিচয় গ্রহণ করেন। আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত তখন পরিচয় লাভ হয় না। আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত পরিচয় হয় আকরাবিয়াতের মাকাম হইতে।

এই মাকামে আসিয়া ছালেক আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত ফানা লাভ করে, যাহা ছালেক আপন মুর্শিদে কামেলের ছুরাতে বেমেছালীর সহিত নিজেকে ফানা বা বিলুপ্ত হিসেবে দেখিতে পায়। আকরাবিয়াতের অধ্যায়ে মহব্বতে আউয়াল ও মহব্বতে ছানী পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার এরাদতের শক্তি দ্বারা ছালেক ছায়ের করিতে পারে। তাহার পর আকরাবিয়াতের অধ্যায়ের শেষ মাকাম অর্ধ দায়েরা কাওছে যাইয়া ছালেক ওজুদ মাওহুব লাহুর সহিত পরিচিত হয়। ### ওজুদ মাওহুব লাহু খোদাদত্ত শরীর যাহা ছালেক নিজের আকৃতির মত দেখিতে পায়।

এই দায়েরার বাকী অর্ধেক অংশ জাত মুজাররাদা। সেখানে ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার দ্বারা ছায়ের করিতে হয়। সেখানে কদমী ছায়ের চলে না। মাটির পুতুলের সেই জাত মুজাররাদায় যাইবার বা কদমী ছায়ের করিবার ক্ষমতা নাই।

যাহা হউক, আল্লাহপাকের জাত পাকের সহিত পরিচয়ের প্রথম পদক্ষেপ হইল আল্লাহতায়ালার প্রদত্ত সকল গুণ সমূহকে আল্লাহতায়ালার দান হিসেবে স্বীকার করিয়া লওয়া। অর্থাৎ দেহে ও দেলে কালেমা প্রতিষ্ঠিত করা। দেহে ও দেলে কালেমা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তাৎপর্য হইল, প্রথমতঃ মানব দেহে আল্লাহপাকের যে সকল নিদর্শন রহিয়াছে সেই নিদর্শন সমূহকে দৈহিক প্রভুত্ব হইতে মুক্ত করা। এই সকল নিদর্শন সমূহ দৈহিক প্রবৃত্তি ও পার্থিব আকর্ষণ মুক্তাবস্থায় আরশের উপরের জগতের নূর ধারণ করিতে পারে। এই সকল নিদর্শন সমূহ হইল কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফা। তাহার পরবর্তী স্তরে নাফস, আব, আতশ, খাক, বাদ, অর্থাৎ আগুন, পানি, মাটি, বাতাস বা তাহাদের সমন্বয়ে যে দুষ্ট প্রবৃত্তি বা নাফসে আম্মারা তৈরী হয়, সেই প্রবৃত্তিকে পরিপূর্ণ রূপে আল্লাহতায়ালার অধীনতা স্বীকার করানো।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD