এলমে হুসুলী ও এলমে হুজুরী সাধনায় কালবের গুরুত্ব

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত লতিফাসমূহের পরিচিতি بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এলমে হুসুলী বা সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও এলমে হুজুরী বা খোদাতত্ত্বজ্ঞান সাধনায় কালবের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
রাসূলে করীম (সাঃ) কে আল্লাহ্পাক দুইটি বিদ্যা দান করিয়াছেন। এই দুইটি বিদ্যা হইল এলমে হুসুলী বা সৃষ্টি তত্ত্বজ্ঞান ও এলমে হুজুরী বা খোদাতত্ত্ব জ্ঞান। এলমে হুসুলী কালব ও মস্তিষ্কের যোগাযোগে তাফাকুর বা গবেষণার ভিত্তিতে গঠিত।
تَفَكَّرُ سَاعَةٍ خَيْرٌ مِّنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سَنَةً.
অর্থাৎ-"এক মুহূর্ত চিন্তার সমুদ্রে ডুবিয়া থাকা ষাট বছর নফল বন্দেগীর চেয়ে উত্তম।"
বিজ্ঞাপন
কালব আল্লাহপাকের ভেদের বিরাট মহাসমুদ্র বা জ্ঞানকেন্দ্র নামে অভিহিত। দুনিয়াতে মানুষ যাহা কিছু করিতেছে, তাহার সকলই এই এলমে হুসুলীর অর্ন্তগত। উহার সকলই কালব দ্বারা পরিচালিত। দুনিয়ার একপ্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে সংবাদ পাঠানো, বিশ্বব্যাপী রেডিও, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রচার ও শোনা, কলকারখানা পরিচালনা বা বৈজ্ঞানিক আবিস্কার-সবই এলমে হুসুলী বা পার্থিব জ্ঞানের অধীনে। এই জ্ঞান কালবের মহাসমুদ্রের সহিত মস্তিষ্কের যোগাযোগ দ্বারা অর্জিত হয়। ইহা আল্লাহতায়ালার এক অপূর্ব দান; যাহার দ্বারা মানুষ দুনিয়ার সকল কিছুই ধরিতে পারে, বুঝিতে পারে বা অনুধাবন করিতে পারে। কালব বা জ্ঞান কেন্দ্র দ্বারা দুনিয়ার সকল কিছুই ধরা যায় বা বোঝা যায়। এই কালব নামক জ্ঞানকেন্দ্র দ্বারাই জাহাজ, এরোপ্লেন চলিতেছে ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিস্কার বা চালান হইতেছে।
রাসূলে করীম (সাঃ) কে আল্লাহতায়ালা তাঁহার সাথে যোগসূত্র স্থাপনের জন্য যে এলম বা জ্ঞান দান করিয়াছেন, তাহা হইল এলমে হুজুরী। এলমে হুসুলী ও এলমে হুজুরী-এই দুই জ্ঞানের পরিধি বিশাল ও অতুলনীয়। আল্লাহ্পাক ও তদীয় হাবীব (সাঃ) দ্বারা এই দুই জ্ঞানভান্ডার পরিচালিত।
এলমে হুসুলীর ভিতরে আল্লাহতায়ালার অশেষ দান- চিন্তন, কল্পন, বর্ণন, শ্রবণ, সৃজন ও আত্মদর্শনের গুণ বর্তমান, যাহার মূল এই এলমে হুজুরী বা খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের ভিতরই রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার অপূর্ব জ্ঞান দ্বারা মানুষের মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার ভেদতত্ত্বে পরিপূর্ণ। মানব শরীরে আল্লাহ্পাকের এই বিশাল দান জ্ঞান-কেন্দ্র বা কালব দ্বারা পরিচালিত হয়। এই সকল দান কালব বা মানব দেহের জ্ঞান কেন্দ্রের মধ্যেই নিহিত। কিন্তু এই জ্ঞান দ্বারা দুই ফুট মাটির নীচে কবরে শায়িত মৃত আত্মীয়ের খবর আনা সম্ভব নয়; যদিও এই জ্ঞান দ্বারা পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সংবাদ আদান-প্রদান করা যায়। কিন্তু এক মৃত ব্যক্তি যিনি কবরে শুইয়া আছেন, তাহার সম্পর্কে এই জ্ঞান দ্বারা জানা যায় না।
বিজ্ঞাপন
এলমে হুজুরী আল্লাহতায়ালার সংগে যোগসূত্র স্থাপন করার জন্য এক বিরাট ও ব্যাপক লাইন। এই লাইন পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা কার্যকর হয়; অন্য কোন বিকল্প পথ নাই। তাই মুর্শিদে কামেলের পাক দেলের সংগে দেল মিশাইয়া, লতিফায়ে কালবে এই অপূর্ব নেয়ামত হাসিল করিতে হয়। মুর্শিদে কামেলের পাক দেল আল্লাহতায়ালার ভেদের সাবস্টেশন। বর্তমান জামানায় আল্লাহতায়ালার ভেদের অপূর্ব শক্তিশালী সাবস্টেশন আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কূঃ ছিঃ আঃ) ছাহেব, সেই মুর্শিদে কামেলের পাক দেলের সাথে যোগসূত্র স্থাপন হইলে ছালেক থাকিবে নাফসে মুৎমাইন্নার পর্যায়ে। তখন ছালেক আল্লাহ্পাকের সান্নিধ্য লাভকরিবে। আল্লাহপাকের রেজামন্দি লাভ করিবে। পৃথিবীতে কি হইতেছে, না হইতেছে তাহাও আল্লাহপাক ছালেককে জানাইবেন। এই বিরাট তত্ত্ব রাসূলে করীম (সাঃ) এর দেল হইতে মুরশিদে কামেলগণ দেল পরম্পরায় লাভ করেন। এই বিরাট তত্ত্ব এলমে হুজুরী অর্থাৎ খোদাতত্ত্ব জ্ঞান পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ ছাড়া কেহই লাভ করেন নাই, করিতেও পারিবে না, কেউ লাভ করিতে পারেও না। এই এলমে হুজুরীর জ্ঞান তিনিই অর্জন করিতে পারেন, যিনি কঠিন খেদমত দ্বারা পীরে কামেলকে বাধ্য করেন। কঠিন খেদমতের দ্বারা পীরে কামেলের পাক দেলের সংগে দেল মিশাইলে এই অপূর্ব নেয়ামত হাসিল হয়।
কালব নাফসের সাথে বিশেষভাবে জড়িত। তাই নাফসের সহব্বতে কালব দুনিয়ার খারাপ বিষয়ের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া পড়ে। তখন কালবের ভিতরে আবার নাফসের স্বভাব দেখা দেয়। কালব দুনিয়ার দিকে ঘুরিয়া যায়। তখন কালবও দুনিয়ার খারাপ কাজে মন দেয়, আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে দূরে সরিয়া যায়। দুনিয়ার খারাপ কর্মের দিকে ঝুঁকিয়া যায়। কিন্তু তবুও কালব আলমে আমর বা নূরের জগতের সৃষ্টি। কালবকে তাই ভাল করা যায়। নাফসকে ভাল করা দুঃসাধ্য, কারণ ইহার জন্ম আদামাত বা অন্ধকারে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা, বাসনা-ইহাদের ভিতরেই নাফসের কর্মসূচী। ইহাদের মধ্যেই নাফসের জন্ম। আর নাফস এই সকল রিপুর বৈশিষ্ট্য দ্বারাই পরিপূর্ণ।
তাই পীরে কামেল তদীয় আত্মিক শক্তির প্রভাবে কালবের সেই সকল দোষসমূহ ধ্বংস করিয়া আল্লাহর নূরের দিকে কালবকে ঘুরাইয়া দেন। তখন কালব আল্লাহতায়ালার প্রেমের সমুদ্রে ডুবিয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
নাফসকে সংশোধন করিবার জন্য পীরে কামেলের কাছে চারিটি অস্ত্র আছে। ইহাদের মধ্যে প্রথম অস্ত্র "তাওয়াজ্জুয়ে এনেকাছী", দ্বিতীয় অস্ত্র তাওয়াজ্জুয়ে এলকায়ী, তৃতীয় অস্ত্র "তাওয়াজ্জুয়ে এসলাহী" এবং চতুর্থ অস্ত্র "তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী"। এই "তাওয়াজ্জুয়ে-এত্তেহাদীর" দ্বারা পীরে কামেল তদীয় মুরীদের কালব বা দেলকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ঘুরাইয়া আল্লাহতায়ালার গুণে গুণান্বিত করাইয়া দিতে পারেন; আল্লাহর চরিত্রে চরিত্র গঠন করাইয়া দিতে পারেন। তোমরা জান, এক রাত্রিতে গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) ছাহেবের গৃহে এক চোর চুরি করিবার জন্য গিয়াছিল। কিন্তু গাউসুল আজম (রাঃ) ছাহেবের গৃহে প্রবেশ করিয়াই সেই চোর তাহার দৃষ্টি হারাইয়া ফেলে ও অন্ধ হইয়া যায়। সে আর চোখে দেখিতে পাইল না। তাই সে আর বাহিরে বাহির হইবার পথ খুঁজিয়া পাইল না। এমতাবস্থায় সেই চোর এক কোনে বসিয়া ভয়ে বিহবল হইয়া কাঁদিতে লাগিল ও আল্লাহতায়ালার জেকেরে নিমগ্ন হইল। সারা রাত ধরিয়া সেই চোর আল্লাহর নিকট ক্রন্দন করিতে লাগিল।
নিশীর শেষভাগে আল্লাহপাক গাউসুল আজম (রাঃ) ছাহেবকে জানাইলেন, " হে গাউসুল আজম! আজ রাত্রিতে এই বাগদাদ শহরে যে ব্যক্তি ঘুমায় নাই ও সারা রাত্রি ধরিয়া আল্লাহতায়ালার জেকেরে কাটাইয়াছে; তাহাকে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা আপনি ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দিন।" হযরত গাউসুল আজম (রাঃ) ছাহেব তদীয় অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা দেখিলেন, সমগ্র বাগদাদ শহরে সকল ব্যক্তিই ঘুমন্ত ও আল্লাহর জেকের হইতে গাফিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ঐ আগন্তক। তখন হযরত গাউসুল আজম (রাঃ) ছাহেব এক খাদেমকে বলিলেন, "আমার ঘরে একটা চোর চুরি করার জন্য ঢুকিয়া অন্ধ হইয়া গিয়াছে। সেই চোর এখন আল্লাহর জেকেরে মত্ত। তাহাকে তুমি ধরিয়া নিয়া আস।" সেই ব্যক্তিকে যখন হযরত গাউসুল আজমের নিকট আনা হইল; সে ক্ষমা চাইয়া বলিল, আমি ভুল করিয়াছি, আমি না বুঝিয়া আপনার গৃহে চুরি করিতে আসিয়াছিলাম। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমি জীবনে আর চুরি করিব না।
হযরত গাউসুল আজম (রাঃ) ছাহেব বলিলেন, "আপনি অজু করিয়া আসেন।” তিনি অজু করিয়া আসিলে হযরত গাউসুল আজম (রাঃ) ছাহেব তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদী দ্বারা তাহার দেলকে জিন্দা করিয়া আল্লাহপাকের দিকে ঘুরাইয়া দিলেন। সেই দেল আল্লাহপাকের প্রেমে পাগল হইল। তাই একজন আশেক কবি গাহিয়াছেনঃ-
বিজ্ঞাপন
"যাহার কৃপায় চোর সাধু হয়
তুমিতো মহাজ্ঞানী,
হস্তে দুরাচার, পাইল নিস্তার
বিজ্ঞাপন
ব'লেগো সত্য বাণী,
গাউসুল আজম, পীরে মাজম মহীউদ্দিন জিলানী।
ওলী-আল্লাহ সকলের রূহানী তাওয়াজ্জুহ তাহা হইলে কত শক্তিশালী যে, গাউসুল আজম জিলানী (রাঃ) ছাহেব তদ্বারা এক মুহূর্তে একজন মাটির মানুষকে আল্লাহপাকের সন্ধান লাভ করাইয়া দিলেন। ওলী-আল্লাহগণ একটা মুহূর্তে শুধু একজন ব্যক্তিকে নন, দুনিয়ার তামাম মানুষকে আল্লাহর দিকে ঘুরাইয়া দিবার ক্ষমতা রাখেন। এই রকম শক্তিশালী ওলী-আল্লাহ ছিলেন খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কূঃ) ছাহেব, যিনির পাক তাওয়াজ্জুহতে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষের মুর্দা দেল জিন্দা হইয়া আল্লাহর দিকে ঘুরিতেছে, আল্লাহপাকের জেকেরে মাতোয়ারা হইতেছে, এই দরবারে আসিয়া কষ্ট করিয়া আল্লাহপাকের জেকেরে মত্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীতে দেল রওশন করিতেছে। এই ভাবে ওলী-আল্লাহগণ তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী দ্বারা কালব বা দেলকে ঘুরাইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর পাক দেলের সহিত মুরীদের দেলের যোগ সূত্র স্থাপন করিয়া দেন, সেই যোগসূত্র বলে নবী করীম (সাঃ) এর হুজুরী হাসেল হয় এবং পীরে কামেলের যোগাযোগে নবী করীম (সাঃ) এর পাক দেলের সহিত মুরীদের দেল মিশিয়া যায় বা ফানা হয়। এই মাকামকে ফানা-ফির-রাসূলের মাকাম বলা হয়। এই মাকাম যখন হাসিল হয়, তখন ছালেক রাসূলে করীম (সাঃ) এর পাক দেলের সহিত সম্পূর্ণ মিশিয়া যায় এবং তাঁহার পূর্ণ মহব্বতের অধিকারী হন।
বিজ্ঞাপন
পীরে কামেল মুরীদের কালব বা দেলকে তদীয় পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা ঘুরাইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর পাক দেলের সহিত যোগসূত্র স্থাপন করিয়া দিবার পর আসে বিশ্ব আত্মার সান্নিধ্য। বিশ্ব আত্মার সান্নিধ্য মানে আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া। ইহা কঠিন রেয়াযতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার রেজামন্দি হাসিলের ব্যাপার। কঠিন খেদমত ছাড়া এই দরজা কেহই লাভ করিতে পারে নাই, পারিবেও না। তোমরা হয়তো শুনিয়া থাকিবে, হযরত শায়খ ফরিদ (রঃ) ছাহেব ৩৬ বৎসর অজ্ঞাত সাধনার দ্বারা বহু চেষ্টা করিয়াও আল্লাহতায়ালার রেজামন্দি হাসিল করিতে পারেন নাই। শেখ ফরিদ (রঃ) ছাহেব ১২ বছর না খাইয়া একটা কাঠের রুটি বানাইয়া নাফসকে ভাঁড়াইলেন, নিজের চক্ষু কাককে খাওয়াইলেন, পা উপরের দিকে বাঁধিয়া মাথা নীচের দিকে ঝুলাইয়া একটি কুয়ার ভিতরে ১২ বছর আল্লাহর জেকেরে রত রহিলেন, কত শ্মশানে-মশানে ঘুরিলেন, তবুও তাঁহার মাকছুদ পুরা হইল না, আল্লাহতায়ালার নিকট পৌঁছাইতে পারিলেন না। তখন নিরাশ হইয়া তিনি হযরত শাহ্ কুতুবউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের কাছে মুরীদ হন এবং ১৪ বছর কঠিন খেদমতের পরে তিনি আপন পীরের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা এই অপূর্ব নেয়ামতের অধিকারী হন। তখন তিনি পীরের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা নাফসে আম্মারার সহিত জিহাদে জয়ী হন এবং নাফসে লাওমাকে অতিক্রম করিয়া মুৎমাইন্নার পর্যায়ে উপনীত হন এবং আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হন।
তাই, হে জাকেরগণ ও আশেকান সকল! তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভের অপূর্ব নেয়ামত লাভ করিতে চাও, আল্লাহতায়ালার প্রেম সমুদ্রের ভেতর যদি সাঁতার কাটিতে চাও, তবে খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কূঃ) ছাহেবের পাক কদম জড়াইয়া ধর। তদীয় পাক দেলের সাথে তোমরা নাপাক দেল মিশাও।
যেমন ইলেকট্রিক কারেন্ট মূল স্রোতের সাথে কানেকশন লাগাইয়া যেখানেই তুমি বাল্ব ফিট কর না কেন, সুইচে একটি টিপ দিলেই সমস্ত বাল্ব জ্বলিয়া উঠিবে; এক টিপ দিলে এমনকি লক্ষ বাতি জ্বলিয়া উঠিবে। তেমনি পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা মানব দেহের মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত কোটি কোটি লতিফা আল্লাহতায়ালার জেকেরে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিবে। কেবলমাত্র পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ ব্যতীত এই অপূর্ব নেয়ামত অর্জন করিবার আর কোন পথ নাই। তাই পীরে কামেলের তরফ হইতে যখন যে আদেশ হয়, সেই আদেশ বিনা দ্বিধায় তোমরা পালন কর। মহা কবি হাফেজ বলিয়াছেন,
বিজ্ঞাপন
"ব মায়ে সাজ্জাদা রংগীকুন গারব পীরে মগা গুইয়েদ
কে ছালেক বে খবর না বুয়াদ যে রাহ্ ও রেসমে মঞ্জেল হা।”
অর্থাৎ-"তোমার পীর যদি বলেন শরাব দিয়া জায়নামাজ ধুইয়া নামাজ পড়। তুমি তাহাই কর। যেহেতু মাকাম মাঞ্জিলের খবর তোমার চেয়ে তোমার পীরই ভাল জানেন।" অতএব তিনি যাহা বলেন, বিনা দ্বিধায় তুমি তাহাই কর। তাই তোমরা যদি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করিতে চাও, আল্লাহতায়ালার রেজামন্দি হাসিল করিতে চাও, তবে আপন পীরের দেলের সংগে দেল মিশাও। তবেই তোমরা নাফসে আম্মারার সাথে জিহাদে জয়ী হইতে পারিবে। তোমাদের নাফস মুসলমান হইবে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, রিয়া, কিনা, কামনা, বাসনা প্রভৃতি রিপু হইতে তোমাদের দেল পাক হইয়া নাফসে মুৎমাইন্নায় পৌঁছাইবে। তখন পাপ কাজে আর মন যাইবে না। নাফস ইসলামি ফেরাতে আসিবে। সত্যিকার মুসলমান হইবে। তখন আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভ হইবে। 'আল্লাহর ভেদ মানুষ আর মানুষের ভেদ আল্লাহ' এই দরজায় পৌঁছাইতে পারিবে। তখন তোমরা আল্লাহর জন্য পাগল হইবে। আল্লাহর সান্নিধ্য তোমাদের নছিব হইবে।
বিজ্ঞাপন
তাই পীরে কামেলের হুকুম মোতাবেক তরিকতের নীতি পদ্ধতি শক্ত করিয়া ধর; কম খুরদান, কম খুফতান, কম গুফতান, অর্থাৎ কম খাওয়া, কম ঘুমান, কম কথা বলা এই নীতিতে নির্ভর হও। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেনঃ আদনের মুক্তার মতোও যদি তোমার কথা মূল্যবান হয়, তাহা হইলেও তুমি যদি বেশী কথা বল; তবে তোমার দেল মারা যাইবে। তাই হে জাকেরানগণ! তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভের অপূর্ব নেয়ামত হাসিল করিতে চাও, তবে খাজাবাবার পাক দেলের সহিত দেল মিশাইয়া নাফসে আম্মারার সহিত জেহাদ কর। পীরে কামেল মুরীদকে সকল আপদ-বিপদ, বালা-মুসিবত, তকদীরের বুরাঈ হইতে বাঁচাইবার ক্ষমতা রাখেন। যেমন একটা মুরগী তাহার নিজের পাখনার নীচে রাখিয়া তাহার বাচ্চাকে কাক-চিল প্রভৃতি দুশমনের হাত হইতে বাঁচায়, তেমনি পীরে কামেলও তাহার তাওয়াজ্জুর পাখনার নীচে রাখিয়া আপন মুরীদ সন্তানদের শয়তানরূপ দুশমনের হাত হইতে বাঁচাইতে পারেন। পীরে কামেলের কাছ হইতে মুরীদ যত দূরেই থাকুক না কেন, যে দেশেই থাকুক না কেন, পীরে কামেল তদীয় তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে শয়তানরূপ দুশমনের হাত হইতে মুরীদকে বাঁচাইতে সমর্থ হন। তাই শেখ সাদী (রঃ) বলেনঃ-
"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল
হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- যেদিন তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে রাসূলে করীম (সাঃ) সেদিন তোমাকে উম্মত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন, আল্লাহ তোমাকে সেই দিন বান্দা হিসেবে কবুল করলেন। আল্লাহ ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর স্বীকৃতি সেই মুহূর্তে তুমি পাইলে, যে মুহূর্তে তোমার পীর তোমাকে স্বীকৃতি দিলেন। তাই আল্লাহপাক ফরমান,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ
অর্থাৎ- "হে ঈমানদার সকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মধ্যস্থ অসিলা অন্বেষণ কর।" সেই অসিলাই জামানার কামেল ওলীসকল।
বর্তমান জামানার শ্রেষ্ঠতম অসিলা হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ), যাহার তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে আল্লাহতায়ালার প্রেমের উন্মাদনা সৃষ্টি হইতেছে। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেনঃ-
"দেখ না কি আরবের ঊষর সে দেশে
সংগীতে নাঁচেরে উট ভাবেরই আবেশে
তোমাদের মধ্যে যদি না থাকে উন্মাদনা
গর্দভ তোমরা, নর কভুতো না।"
তোমার কি দেখ নাই আরবের মরু প্রান্তরে উটগুলি আল্লাহর প্রেমের গান শুনিয়া, আনন্দে নাঁচিয়া নাঁচিয়া যাইতে থাকে। আর আল্লাহপাকের প্রেমের গান শুনিয়া তোমাদের মধ্যে যখন প্রেমের উন্মাদনা সৃষ্টি হইল না, তোমরা মানুষ নও; উপরন্তুু গাধা।
তাই হে আশেকান সকল! হে জাকেরগণ! অমূল্য সময় চলিয়া যায়। তোমরা আল্লাহতায়ালার রেজামন্দি হাসিলের জন্য দেলে পীরের মহব্বত কায়েম কর। পীরের মহব্বত যখন দেলে আসিবে সেই সময় আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত তোমাদের দেলে আসিবে। পীরের মহব্বতই খোদাপ্রাপ্তি সাধনার প্রথম দরজা। পীরের মহব্বত তোমাদের দেলে আল্লাহ রাসূলের মহব্বত সৃষ্টি করিবে। চৌদ্দই রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের মত দেলকে উজ্জল ও রওশন করিয়া দিবে। মুর্দা দেল জিন্দা হইয়া আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতে থাকিবে। মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত দেহের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে আল্লাহতায়ালার জেকেরের বাজনা বাজিতে থাকিবে। দেল আল্লাহতায়ালার জেকেরে পরিপূর্ণ হইবে। তখন লতিফায়ে কালব জাত আদিয়াতের নূরে পরিপূর্ণ হইবে। সেই লতিফায়ে কালব মহা কালবের সন্ধান পাবে। "লা সালাতা ইল্লা বে হুজুরেল কালব" কি তাহা নিজ অভিজ্ঞতায় আস্বাদন করিতে পারিবে। পীর ছাড়া এই অমূল্য নেয়ামত কোনদিন কেউ হাসিল করতে পারেন নাই। অন্য কোন উপায়ে হাসিল হইবেও না। তাই বুযুর্গানে দীন বলিয়াছেন,
مَنْ لَيْسَ لَهُ شَيْخَ فَشَيْخَهُ شَيْطَانَ
অর্থাৎ-"যাহার পীর নাই তাহার পীর শয়তান।" শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।
শয়তানের পক্ষ হইতে তোমাদের নাফস ওজুদ রাজ্যের সিপাহসালার। অতএব নাফসকে বাধ্য করিয়া আল্লাহর পথে আনা খুবই কষ্টকর। তাই পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা নিজের নাফসকে সংশোধন কর, নিজের কালবকে জিন্দা করিয়া নাফসকে সংশোধন করিয়া লও। তাহা হইলে নাফস, রূহ ও কালব জিন্দা হইয়া আল্লাহতায়ালার প্রেমের সমুদ্রে সাঁতার কাটিবে। দুনিয়া ও আখেরাতের হাসানাত পুরোপুরিই আল্লাহ তখন তোমাদেরকে দান করিবেন। মহাসমুদ্রের মধ্যে কত হাংগর, কুমীর, শৈবাল আছে। কিন্তু দর্শকের চোখে একমাত্র পানি বিশিষ্ট সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) ছাহেব যখন ঐ সমুদ্রে নিমজ্জিত হইলেন, তখন আল্লাহ ছাড়া তিনি আর কিছুই দেখিলেন না। তিনি দেখিলেন শুধু আল্লাহই আল্লাহ। এমনকি তাঁহার নিজের সম্পর্কেও জ্ঞান হারাইয়া ফেলিলেন। তাঁহার এই অনুভূতির মধ্যে তখন কোন দুনিয়ার খেয়াল ছিল না। অতএব অমূল্য সময় বহিয়া যায়। যে সময় একবার যায়, তাহা আর ফিরিয়া আসে না। তুমি যত বড়ই জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিমান, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক হও না কেন, শেষের ডাক আসিলে আর এক মুহূর্ত দেরী করিতে পারিবে না। শেষের ডাক কেহই ফিরাইয়া রাখিতে পারে না। অতএব পীরের সহব্বতে থাকিয়া এই দেলকে পরিস্কার করাইয়া লও। দিন থাকিতে শেষের ডাকের জন্য প্রস্তুত হও। নিজেকে চিনিলে, আল্লাহকে চিনিতে পারিবে। মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু। তখন আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য তোমাদের নসিব হইবে।








