Logo

'ওকুফ কালবী' অর্জনে পীরে কামেলের ভূমিকা কি?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৯ জুলাই, ২০২৬, ১৯:০৩
'ওকুফ কালবী' অর্জনে পীরে কামেলের ভূমিকা কি?
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত লতিফাসমূহের পরিচিতি بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ 'ওকুফ কালবী' কি? খোদাতত্ত্বজ্ঞান সাধনায় ইহার গুরুত্ব কি? 'ওকুফ কালবী' অর্জনে পীরে কামেলের ভূমিকা কি? ইত্যাদি সম্পর্কিত আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

খোদাতত্ত্ব সাধনার পথের পথিকদের বা ছালেকের সাধনার প্রথম কাজ নাফসকে পবিত্র করিয়া আল্লাহতায়ালার পথে আনিয়া আল্লাহতায়ালার নৈকট্য বা সান্নিধ্য অর্জন করা। হযরত ইমামে রাব্বানী, কাইয়্যুমে জামানী, মাহবুবে সোবহানী, রাফিউল মাকানী, গাউসে সামদানী হযরত শায়খ আহমদ সেরহিন্দি মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব প্রবর্তিত খোদাতত্ত্ব সাধনার পদ্ধতি তরিকায়ে মুজাদ্দেদীয়াতে নাফসকে পবিত্র ও আল্লাহমুখী করিবার জন্য প্রথমে কালবকে জিন্দা করিয়া তাহার প্রভাবে নাফসকে পবিত্র করার ব্যবস্থা লওয়া হয়। ইহা সম্ভব এই জন্য যে, কালব, নাফস ও রূহ অংগাংগিভাবে জড়িত ও পরস্পর পরস্পরের সহিত সম্পর্কযুক্ত।

কালবকে আল্লাহতায়ালার প্রতি নিবিষ্ট রাখিতে পারিলে কালব আল্লাহমুখী হইবে ও ঐ আল্লাহমুখী কালবের প্রভাবে নাফস পবিত্র হইবে, কালবে জাত আদিয়াতের নূর আসিবার ক্ষেত্র প্রস্তুত হইবে।

কালব মানবদেহে আল্লাহপাকের ভেদের এক মহাসমুদ্র। আল্লাহপাক বলেন,

বিজ্ঞাপন

وَفِي أَنْفُسِكُمْ طَ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

অর্থাৎ-"আমার নিদর্শন তোমাদের ভিতরেই আছে; তোমরা দেখ না কেন?" (সূরা জারিয়াতঃ ২১)

মানবদেহে কালবের ভিতরেই আল্লাহপাকের নিদর্শন। পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুতে মানব দেহের কালব মহাকালবের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করিতে ও আল্লাহপাকের সান্নিধ্য অর্জন করিতে পারে। এই মহাকালবের বিস্তৃতি আরশ, কুরসি, লওহ, কলম-তথা সাত তলা আসমান হইতে সাত তলা জমিনের নীচে তাহাতাস সারা পর্যন্ত। তাই আল্লাহপাক বলেন, "আমার গুঞ্জায়েশ কোথায়ও হয় না; মুমিনের কালব ব্যতীত। তাই কালব আল্লাহপাকের সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভের প্লাটফরম বা সিংহদরজা। এই কালবকে আল্লাহতায়ালার প্রতি নিবিষ্ট রাখা তাই খোদাতত্ত্ব সাধনার প্রথম সোপান। কিন্তু ছালেক বা খোদাতত্ত্ব সাধনার পথিক কালব বা নিজ দেলকে আল্লাহতায়ালার দিকে কি ভাবে নিবিষ্ট রাখিবেন?

বিজ্ঞাপন

ওকুফ কালবঃ-

তরিকায়ে মুজাদ্দেদীয়ার মুর্শিদে কামেলগণ বলেন, "ওকুফ কালবী হইল, "দেলকে কায়েম রাখা ও দেলকে জানা"। দেলের এই অবস্থার দুইটি বৈশিষ্ট্য। যথাঃ

(১) কালব বা দেলকে কায়েম করা,

বিজ্ঞাপন

(২) কালব বা দেলকে জানা।

দেলকে কায়েম করার উদ্দেশ্য এই যে, দেলকে জেকেরের অভীষ্ট আল্লাহতায়ালার প্রতি এমনভাবে নিবিষ্ট রাখা যে, আল্লাহতায়ালা ভিন্ন অন্য কোন চিন্তা কালবে প্রবেশ করিতে না পারে। কালব যেন কোন মতেই আল্লাহতায়ালার জেকের হইতে গাফেল বা বিরত না হয়। দেলকে জানার তাৎপর্য এই যে, দেল বা কালব জেকেরে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় যথা সম্ভব আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে দেলে আগত ভাবনা-চিন্তা বা দেলের হাল সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।

এই ভাবে কালব যখন নাফসে আম্মারার প্রভাব হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার জেকেরে এককালীন ডুবিয়া যায় তাহাকেই 'হুজুরী কালব' বলে। ওকুফ কালবী তাই হুজুরী কালবী অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়। আরবী ভাষায় "তোগরা" অক্ষরে আল্লাহ নাম লিখিলে যে রূপ হয়, কালব যে অবিকল সেই রূপ, এই ধারণা তখন ছালেকের নিকট প্রতীয়মান হয়। যখন কালব আল্লাহর জাতি নামের রূপ লাভ করে এবং নামই যখন "জাতি" নিদর্শন, তখন ঐ কালবরূপ নামকে জানিলে অবশ্যই জাত প্রকাশ পাইবে। এই অবস্থা জেকেরের সহিত কোন সম্পর্ক রাখে না। দেলের এই অবস্থা হাসিল হওয়া নাফস ফানা হওয়ারই একটা অংগ।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, "যদি কেহ দেল দ্বারা জেকের করিতে না পারেন, তবে তিনি নিজের দেলকে জানিবার জন্য ওকুফ কালবী কাজে মনোনিবেশ করিবেন।" ওয়াকেফ অর্থ জানা। ওকুফ অর্থ জ্ঞাত হওয়া। কালব সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াই ওকুফ কালবী হাসিল হওয়া। কালব সম্পর্কে জ্ঞাত হইলে বা ওকুফ কালবী হাসিল হইলে দেল ক্রমে ক্রমে জেকেরে অভ্যস্ত হইবে। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব ওকুফ কালবী হাসিলের জন্য কালবকে জেকেরে নিবিষ্ট রাখিতে যেমন বলিয়াছেন, তেমনি দেল-পদ্ম বা আল্লাহ এস্ম বা আল্লাহর নামরূপ দেলে খেয়াল নিবিষ্ট করিতে বলিয়াছেন।

হযরত মাসুম কামাল (রঃ) "ওকুফ কালব" অর্থ লিখিয়াছেন যে, জেকেরকারী আপন কালব বা দেলের প্রতি এমনভাবে দৃষ্টি রাখিবে যে খোদাভিন্ন অন্য কোন বিষয় বা বস্তুর ধারণা বা নকশা বা আকৃতি তাহার কালবে প্রবেশ করিবে না। সেই জন্য নামাজের পূর্বে নির্দেশ দান করা হয়; খেয়াল কালবে, কালব আল্লাহ পাকের দিকে, আল্লাহ হাজির নাজির; খেয়ালকে এককালীন কালবে ডুবাইয়া আল্লাহকে হাজির, নাজির, ওয়াহেদ জানিয়া সিজদা করাই আস্সালাতু মি'রাজুল মু'মিনীন বা প্রকৃত নামাজ, যে-নামাজে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য ও দর্শন পাওয়া যায়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান,

لا صَلوةَ إِلَّا بِحُضُورِ الْقَلْبِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "নামাজই না, হুজুরী কালব ব্যতীত।"

নামাজে হুজুরী হাসিল না হইলে নামাজই হইবে না। "ওকুফ-কালবী" হাসিল হওয়া "হুজুরী কালবী" হাসিলের প্রাথমিক পর্যায়। "হুজুরী কালবী" অর্জনের জন্যও তাই ওকুফ কালবী হাসিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওকুফ কালবী হাসিল না হয়, তবে নামাজে হুজুরী দেল হাসিল হইবে না। তখন নাফসে আম্মারা নামাজে দুনিয়ার কথা মনে আনিয়া দিবে। বাল্য জীবনের কত পুরাতন বন্ধুর স্মৃতি, কত মামলা মোকদ্দমার কথা নামাজের মধ্যে মনে আসিতে থাকিবে। শুধু মুখে "সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা” বলিবার কি দাম? মৌখিক ভালবাসার দামতো কেহই দিয়া থাকেন না। তাহাকে লিপসিমপ্যাথি (Lip sympathy) বলা হয়। আর মহান প্রতিপালক আল্লাহতায়ালাকে শুধু মুখে মুখে ডাকিলে ফল পাওয়া যাইবে কেন? তিনিতো মানুষের ছিনার খবর রাখেন-আল্লাহু আলীমুম বেজাতিস সুদুর। সুতরাং মন-মুখ এক করিয়া নামাজ পড়িতে হইবে। "ওকুফ কালবী” অর্থাৎ নিবিষ্টতার সহিত কালবে আল্লাহকে স্মরণ রাখা ও ঐ চিন্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ছাড়া "হুজুরী কালবী" অর্জন করা যাইবে না। আর হুজুরী কালবী ছাড়া আসসালাতু মে'রাজুল মু'মিনীনের মারেফাতও হাসিল হইবে না বা আসসালাতু মে'রাজুল মু'মিনীন কি ছালেক তাহা নিজ অভিজ্ঞতায় অনুধাবন করিতে পারিবে না।

ওকুফ কালবীর দিকে দেলকে লইয়া যাওয়াই সঠিক অর্থে মুমিন হইবার, সঠিক অর্থে নামাজ পড়িবার, আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিবার একমাত্র পথ। এই ওকুফ কালবী হাসিল করা তাই খোদাতত্ত্ব সাধনার পথের পথিকদের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

"ওকুফ কালবী" হাসিল করা সম্ভব একমাত্র মুরশিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা। মুরশিদে কামেলই কেবল ছালেকের কালবকে এই পর্যায়ে সর্বক্ষণ আল্লাহতায়ালার জেকেরে নিবিষ্ট থাকার অবস্থায় পৌঁছাইয়া দিতে পারেন।

স্বীয় দেলকে "ওকুফ কালবী" পর্যায়ে লইবার জন্য তাই ছালেকের উচিত মুশিদে কামেলের দয়া ও অনুগ্রহ অর্জন করিবার জন্য তাঁহার কদমের ধুলি হইয়া যাওয়া। কারণ মুর্শেদে কামেল ব্যতীত অন্য কেহই দেলকে ওকুফ কালবীর পর্যায়ে পৌঁছাইতে পারিবেন না-আর সেই পর্যায়ে পৌঁছাইতে না পারিলে নামাজের উদ্দেশ্যও হাসিল হইবে না- মুমিনও হওয়া যাইবে না, মানব জীবনই বৃথা যাইবে। যে মুরশিদে কামেলের দয়া ও অনুগ্রহ ব্যতীত মানব জীবনের সার্থকতা সম্ভব নয়, মুমিন হওয়া সম্ভব নয়, সঠিকভাবে নামাজ পড়া সম্ভব নয়, সেই মুরশিদে কামেলের চেয়ে দরদী কে আছে? পীরের মতন দরদী কেউ নাই, কেউ হইতেও পারেন না। কারণ অন্য কেউই কোন মানুষকে এই গুণ দান করিতে পারেন না। মানব জীবনকে সার্থক করিবার জন্য, হযরত ইব্রাহীম আদহাম বলখী (রঃ) সিংহাসন ও রাজত্ব ত্যাগ করিয়াছেন। পারস্যের মহাকবি হাফেজ বলিয়াছেন, "তাঁহার পীরের সন্তুষ্টি লাভের জন্য সমরখন্দ বোখারার সিংহাসন তিনি ত্যাগ করিতে পারেন।" বাংলার এক আশেক কবি গাহিয়াছেনঃ

"পীরে যদি করেন দয়া, মুর্দা দেল তার জিন্দা হয়,

বিজ্ঞাপন

অকূল দরিয়ার মাঝে ডোবা নৌকা ভেসে যায়।

পীর যে অমূল্য ধন ধর হে তাঁর চরণ,

সে কদমে নেছার হলে পাবে খোদার দরশন।"

বিজ্ঞাপন

কালব, নাফস ও রুহের পারস্পরিক সম্পর্কঃ

মানব শরীরে যে সমস্ত লতিফা আছে, তাহার অর্ধেক আলমে আমর বা র। বাকী অর্ধেক নূরের জগতের, সূক্ষ্ম জগতের বা আলোকময় জগতের। আলমে খালক বা সৃষ্ট জগত বা জড় জগতের লতিফা।

আলমে আমর বা নূরের জগতের লতিফা সমূহ হইল কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা। আলমে খালকের বা জড় জগতের লতিফা সমূহ হইল নাফস, আব, আতশ, খাক, বাদ বা আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস।

বিজ্ঞাপন

আলমে আমর ও আলমে খালক অর্থাৎ নূরের জগত ও স্থূল জগতের মাঝখানে আল্লাহপাকের "আরশ"। আল্লাহপাকের আরশ নূরের জগত হইতে জড় জগতকে বিভক্ত করিয়া আছে। আরশের উপরের জগত নূরের জগত বা আলমে আমর। আর আরশের নীচের জগত হইল জড় জগত বা আলমে খালক।

লতিফায়ে কালব আলমে আমরের বা নূরের জগতের লতিফা হওয়ার কারণে আল্লাহপাকের আরশের উপরের জগত হইতে কালব গুণাগুণ অর্জন করিতে সক্ষম।

আলমে আমর নূরের জগত আর আলমে খালক জড় জগত। আলমে খালক জড় জগত বিধায় ইহা নিজে আলোকিত নয়, আল্লাহতায়ালার নূরের জগত হইতে এই জড় জগতের লতিফা সমূহকে আলোকিত করিতে না পারিলে বা আলমে খালকের লতিফা সমূহ নূরের জগত হইতে আলোক প্রাপ্ত না হইলে চিরদিন ইহা অন্ধকার আচ্ছন্ন থাকে, আল্লাহতায়ালার আলোক রাজ্যের দ্বারা জড় রাজ্যের ঐ সকল লতিফা সমূহ আলোকিত হয় না, জড়রাজ্যের অন্ধকার জগতেই ঐ সকল লতিফা সমূহ আচ্ছন্ন থাকিয়া যায়। নাফসে আম্মারা তাই অন্ধকার জগতে সৃষ্ট, আর অন্ধকার জগতের বৈশিষ্ট্যই তাহার বৈশিষ্ট্য। যত কুকর্ম, কুকাজ করাই নাফসে আম্মারার স্বভাব। সে আল্লাহপাককে বিশ্বাস করে না। নাফসের এই হালাত, অবস্থা বা বৈশিষ্ট্যকে নাফসে আম্মারা বলা হয়। এই অবস্থায় নাফস সকল কুকর্ম, কুচিন্তার উৎসস্থল হয়।

আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত পথের বিরুদ্ধাচারণ করা অর্থাৎ আলোক রাজ্যের পথ ত্যাগ করা তখন নাফসের বৈশিষ্ট্য হইয়া দাঁড়ায়। নাফসের এই-ই যখন বৈশিষ্ট্য তখন ইহাকে বলা হয় নাফসে আম্মারা। ইহা তখন কুকর্মের কুচিন্তার উৎস হিসেবে নামাজ ও জিকিরের সময় কালব বা দেলকে দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দেয়। নাফসের ঐ অবস্থায় কালবকে আল্লাহপাকের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ করা তাই শুধু দুঃসাধ্যই নয়, অসম্ভব হইয়া দাঁড়ায়। এই অবস্থায় নাফস অর্থাৎ নাফসে আম্মারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না।

কালব যদিও নূরের রাজ্যের লতিফা বা উপাদান, নাফসে আম্মারার প্রভাবে কালবও দুনিয়ার দিকে ঘুরিয়া যায়। নাফসে আম্মারার প্রতাবে দুনিয়ার দিকে কালবের আকর্ষণের কারণে আল্লাহকে তখন কালবও আর পছন্দ করে না। কালবের সমস্ত খেয়াল আল্লাহর দিক হইতে সরিয়া যায়। তখন কালব আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট না হইয়া দুনিয়ার প্রতি নিবিষ্ট হয়, নামাজের সময়ে কালবে দুনিয়ার খেয়াল আসে। ইহাকে নাফসে আম্মারার নামাজ বলে। নাফসে আম্মারা বলে, "আমার আল্লাহকে প্রয়োজন নাই। আমি সুখে থাকিতে চাই। আমি দুনিয়াতে জাঁকজমক ধুমধামের সহিত চলিব। দুনিয়ার সুখ শান্তির জন্য যাহা ইচ্ছা, তাহাই করিব। ইহাতে আমি কোন বাধা মানিব না। জড় জগত বা অন্ধকার জগতের এই বৈশিষ্ট্য সমূহ নাফস হইতে কালবের দিকে প্রভাবিত হয়। তখন কালবও নাফসের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তখন হুজুরী কালবীতে নামাজ পড়া আর সম্ভব হয় না। তাই আল্লাহপাক এরশাদ করেন, "তোমরা নাফসের সহিত জেহাদ কর।" আর দয়াল নবী (সাঃ) নাফসের সহিত জেহাদকেই জেহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জেহাদ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।

নাফসের এই দুষ্ট বৈশিষ্ট্য হইতে নাফসকে পবিত্র না করিলে কালবকেও আর পবিত্র করা যায় না, নামাজের উদ্দেশ্যও হাসিল হয় না, আল্লাহতায়ালার নৈকট্য ও সান্নিধ্যও অর্জন হয় না, মানব জীবনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়া যায়। নাফসের এই বৈশিষ্ট্য হইতে নাফসকে পবিত্র করিয়া, কালবকে তাহার নূরের জগতের আলোকময় বৈশিষ্ট্যে ফিরাইয়া হুজুরী কালবীতে নামাজ পড়িবার তখন একমাত্র পথ মুরশিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা লতিফায়ে কালবকে প্রথমে নাফসের প্রভাব হইতে মুক্ত করা ও নাফসকে ক্রমে ক্রমে কালবের আলোকের জগতের গুণে গুণান্বিত করা। এই জন্য মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রঃ) বলেন,

"হিসনা কুশাদ মারেরাজু জাল্লে পীর,

দামনে আ নাফসে কুশরা সাগীর"।

অর্থাৎ "তুমি যদি নাফস রূপ কাল সাপের ছোবল হইতে বাঁচিতে চাও, তবে নাফস-হস্তা মুরশিদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর।" একমাত্র মুরশিদে কামেলই তাঁহার পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা নাফসের সংশোধন করিয়া দিতে পারেন। তাহা ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা নাই।

তাই, হে জাকেরান ও ছালেকগণ! তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন করিয়া মানব জীবনের সার্থকতা অর্জন করিতে চাও; আল্লাহপাকের রেজামন্দি লাভ করিতে চাও তাহা হইলে মুরশিদে কামেলের কদমের তলে জান মাল নেসার করিয়া দাও। তাই আল্লাহপাক এরশাদ করেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও তাঁহাকে পাইবার জন্য মধ্যস্থ অসিলা অন্বেষণ কর।"

শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। শয়তানের পক্ষ হইতে মানব দেহে নাফসে আম্মারাই সিপাহসালার, যে নাফসে আম্মারার স্বভাব কুকর্ম করা ও আল্লাহপাকের বিরুদ্ধাচরণ করা।

মুর্শিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা যখন কালব আল্লাহ মুখী হইতে অগ্রসর হয়; তখন তাহার আল্লাহতায়ালার কথা মনে আসিতে থাকে, খারাপ কর্ম করিতে যাইয়া পাপের ভয়ে কিছু ভীত হয়। এই অবস্থা হইল "নাফসে লাওমা"। তখন কোন কোন সময় ছালেকের খেয়াল কালবে নিবিষ্ট থাকে, কোন কোন সময়ে থাকে না।

নাফস, কালব ও রূহ-মানব দেহের এই তিনটি উপাদান পরস্পর গভীর সম্পর্কযুক্তঃ বলা যায়, তিন জনে গভীর বন্ধুত্ব, কেউ কাউকে ছাড়িতে চায় না। এই কালবকে নাফসে আম্মারার খারাপ প্রভাব হইতে মুক্ত করা মুরশিদে কামেলের তাওয়াজ্জুহ ছাড়া সম্ভব নয়। মুরশিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহতে যদি কোন ছালেকের কালব নাফসে আম্মারার খারাপ প্রভাব হইতে মুক্ত হয় ও পক্ষান্তরে নাফস তখন কালবের নূর দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়া ঊর্ধ্বগতি লাভ করে, জড় জগতের অন্ধকার বৈশিষ্ট্যে আর ফিরিয়া আসিতে না চায়; তখন নাফস যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, তাহাকে "নাফসে মুৎমাইন্না" বলে।

পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তখন আল্লাহপাকের জামালী ও জালালী ফয়েজের স্রোত আসিয়া কালব ও রুহের মাধ্যমে নাফসের উপর পড়িতে থাকে। তখন নাফসের চরিত্র আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হইয়া আল্লাহপাকের দিকে ঘোরে, আল্লাহপাকের মহব্বত তখন নাফসেও পয়দা হয়। তখন নাফস, রূহ ও কালব একই সাথে আল্লাহপাকের প্রেম সমুদ্রে বিচরণ করিতে থাকে, আল্লাহতায়ালার চরিত্র ও গুণে চরিত্র গঠন হয়।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD