আল্লাহ পাকের দিদার বা মেরাজ ইসলামের নিগুঢ়তত্ত্ব

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত লতিফাসমূহের পরিচিতি بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় কালব ও রূহকে নাফসে আম্মারার প্রভাব মুক্তকরণে এবং নাফসের পরিশোধনে পীরে কামেলের ভূমিকাঃ
বিজ্ঞাপন
বর্তমান জামানার হাদী, আল্লাহ ও রাসূলের এশক মহব্বতের সূর্য, শ্রেষ্ঠতম আরেফে বিল্লাহ্, দয়ালপীর, দস্তগীর, হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ফরমান, "আল্লাহ পাকের দিদার বা মেরাজ ইসলামের নিগুঢ়তত্ত্ব। রাসূলে করীম (সাঃ) মেরাজে আল্লাহপাকের দিদার লাভ করিয়াছিলেন। তিনি এই দিদারের সুসংবাদ তদীয় উম্মতগণের জন্য দান করিয়া গিয়াছেন।" হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান যে,
الصلوةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ - "সালাত বা নামাজ মুমিনদের জন্য মে'রাজ।" আল্লাহপাকও বলিতেছেন,
বিজ্ঞাপন
وَ فِي أَنْفُسِكُمْ ط أَفَلَا تُبْصِرُونَ -
অর্থাৎ-"আমিতো তোমাদের ভিতরেই আছি; দেখ না কেন?" (সূরা জারিয়াতঃ ২১)
আল্লাহপাকের দিদার বা মেরাজ লাভ করাই তাই পূর্ণাংগ মুমিন হবার শর্ত। হাদীসে কুদসীতে রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, "আল্লাহপাক বলেন, আসমান জমিনে কোথাও আমার গুঞ্জায়েশ হয় না; মুমিন বান্দার দেল ব্যতীত।" ইসলামের মধ্যেই রহিয়াছে আল্লাহপাকের এই পরিপূর্ণ আহ্বান-"আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, আমাকে দেখ না কেন?" অন্য কোন ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে আল্লাহপাক মানুষকে এই আহ্বান জানান নাই।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহপাক ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন মাজীদে বান্দার উদ্দেশ্যে যেমন এই আহ্বান জানাইয়াছেন; তেমনি ইসলামের নবী (সাঃ) কে মে'রাজের মাধ্যমে নিজ দিদার ও সান্নিধ্য দান করিয়াছেন। ইসলামের নবী (সাঃ)-ই প্রথম পয়গম্বর, যিনি আল্লাহময় জগত এবং সাততলা আসমানের উপরে আরশ হইতে সাততলা জমিনের নীচে তাহাতাস সারাহ পর্যন্ত; এমন কি বেহেশত ও দোযখ পরিভ্রমণ করিয়া আল্লাহতায়ালার ও তাঁহার সৃষ্টির পূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন।
আল্লাহতায়ালার দর্শন ও তাঁহার সৃষ্টিজগতের পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ না হইলে আল্লাহতায়ালার পরিচয়ও লাভ হয় না, তাঁহার বিশালতা ও ব্যাপকতা তথা আল্লাহর শক্তির সহিত পরিচিত হওয়া যায় না। তাই সাধারণার্থে মুমিনও হওয়া যায় না।
পূর্ণ মুমিনদের মর্যাদা ও মর্তবা অনেক উচ্চে; কারণ রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান যে, আল্লাহপাক এরশাদ করেন, "আমার গুঞ্জায়েশ আসমান জমিনে কোথাও হয় না, মুমিন বান্দার দেল ব্যতীত"-"কুলুবুল মু'মিনীনা আরশুল্লাহ"। যে দেলে আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ সেই দেলের মরতবা কতখানি তাহা সাধারণের কল্পনার বাইরে। তাই ইসলামের মধ্যে শুধু আল্লাহপাকের মে'রাজ-দিদার বা দর্শন লাভের ও তদীয় সৃষ্টির সহিত সামগ্রিক ভাবে পরিচিত হইবার সুসংবাদই বর্তমান নয়, এমনকি এই ধর্মে মুমিনদের দেলে আল্লাহপাকের গুঞ্জায়েশের সংবাদও দেয়া হইয়াছে।
বিজ্ঞাপন
ইসলাম ছাড়া আল্লাহপাক অন্য কোন ধর্মের অনুসারীদের তাঁহার দিদারের পথও বাৎলাইয়া দেন নাই বা মুমিনের দেলে তাঁহার গুঞ্জায়েশের সংবাদও দান করেন নাই। আল্লাহপাক ও তদীয় সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে পূর্ণাংগ জ্ঞানের সুসংবাদ কেবল ইসলামেই রহিয়াছে; তাইই ইসলাম পূর্ণাংগ ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এই জন্যই পূর্বতন যুগের পয়গম্বরগণ আফসোস করিয়া বলিয়াছেনঃ নবী না হইয়া তাঁহারা যদি রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মত হইতেন তাহা হইলে তাঁহারা নিজেদের অধিক ভাগ্যবান মনে করিতেন।
তাই বলা যায় ইসলামের মধ্যে আল্লাহপাক মানব জাতিকে দুইটি মহা নেয়ামত বা সুসংবাদ প্রদান করিয়াছেন-ইহার একটা হইল, আল্লাহতায়ালার সহিত পরিচিতি; দ্বিতীয় হইল, মানব দেলে আল্লাহপাকের গুঞ্জায়েশ।
রাসূলে করীম (সাঃ) কে আল্লাহপাক যে নেয়ামত দান করিয়াছিলেন; তিনি তদীয় আসহাবে সুফফাগণকেও সেই নেয়ামত দান করিয়া যান। আসহাবে সুফফাগণ হইতে তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন, তরিকতের ইমামগণ ও মুর্শিদে কামেলের আত্মা পরস্পরায় সেই জ্ঞান ও রহমতের ধারা আজও বর্তমান রহিয়াছে। অধুনাকালের শ্রেষ্ঠতম আরিফে বিল্লাহ বা খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী সাধক দয়ালপীর দস্তগীর হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বর্তমান জামানার মানুষের জন্য এই নেয়ামত ও সুসংবাদের সন্ধান লইয়া আসিয়াছিলেন। সেই জ্ঞানের নেয়ামত তিনি মানব জাতির জন্য রাখিয়া গিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
যে দুইটি নেয়ামত ইসলামে রহিয়াছে অর্থাৎ প্রথমে আল্লাহ ও তাঁহার সামগ্রিক সৃষ্টি জগতের সহিত পরিচয় লাভ ও দ্বিতীয়তঃ দেলে মহান আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ লাভ-তাহা অর্জনের পথ কি?
এই পথের সন্ধান রহিয়াছে একমাত্র খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী মুর্শিদে কামেলের নিকটে, যিনি আল্লাহপাকের ও তাঁহার সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞানে জ্ঞানী, যিনি আল্লাহপাকের সান্নিধ্য অর্জনকারী ও আল্লাহপাকের নৈকট্যের গুণে গুণী। মুর্শেদে কামেলগণ সম্পর্কেই আল্লাহপাক বলিতেছেন,
وَمِمَّنْ خَلَقْنَا أُمَّةً يَهْدُونَ بِالْحَقِّ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"আমার সৃষ্টদের মধ্যে একদল আছেন যাহারা সত্য সহ পথ প্রদর্শন করেন।" (সূরা আ'রাফঃ ১৮১)
আল্লাহপাকই সত্য। মুর্শিদে কামেলগণ সত্যসহ পথ প্রদর্শন করেন অর্থাৎ মুর্শিদে কামেলগণ আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ও নির্দেশ সহ পথ প্রদর্শন করেন। 'মুমিন আল্লাহতায়ালার আলোতে দেখে'-রাসূলে করীম (সাঃ) এর এই হাদীস উদ্ধৃত করিয়া হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) ছাহেব ফরমান, "যিনি আল্লাহতায়ালার আলোতে দেখেন, তিনি জানা-অজানা, প্রকাশ্য-গোপন সকল বিষয়ই জানেন।"
ছহীহ বোখারী শরীফে হাদীসে কুদ্স্সী হিসেবে উল্লেখ আছেঃ আল্লাহপাক এরশাদ ফরমান, "আমার বান্দা যখন নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য হাসিল করে, তখন আমি তাহার এত নিকট হইয়া যাই যে, আমি তাহার জিহ্বা হই যাহার দ্বারা সে কথা বলে; তাহার চোখ হই যাহার দ্বারা সে দেখে; তাহার কর্ণ হই যাহার দ্বারা সে শ্রবণ করে; তাহার হস্ত হই যাহার দ্বারা সে ধরে এবং তাহার পদ হই যাহার দ্বারা সে চলে।" হযরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রঃ) ছাহেব বলেন, "এই স্তরে পৌঁছাইলে মানুষ তাহার আমিত্ব বা নিজ অস্তিত্ব আল্লাহপাকের সহিত বিলীন করিয়া দেন-তিনিই হন ইনসানে কামেল বা পীরে কামেল।" তাই আল্লাহর সহিত স্বীয় সত্ত্বা বিলীনকারী মুর্শিদে কামেলই কেবল আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভের পথ বাৎলাইয়া দিতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
পীরে কামেল আল্লাহপাকের সহিত মুরীদের বা ছালেকের দর্শন দান করান মুরীদের লতিফায়ে কালব ও লতিফায়ে রূহকে জেন্দা করাইয়া। কালব ও রূহ মানব দেহে বুকের বাম ও ডান পাশে দুইটি লতিফা বা উপাদান। এই দুইটি উপাদান মানব দেহে আরশের উপরে আল্লাহতায়ালার নূরময় জগতের নিদর্শন।
এই দুইটি নিদর্শন মানব দেহে সুপ্ত অবস্থায় থাকে; সাধারণ শরীর বিদ্যায় ইহাদের অস্তিত্বও নিরূপণ করা যায় না। কারণ তাহারা নিরাকার। আর তাই সাধারণ জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তি সুপ্ত রূহ ও কালবকে জাগ্রত বা জেন্দাও করিতে পারেন না। কেবলমাত্র মুর্শিদে কামেলই তাহা পারেন।
এখানে জানা প্রয়োজন হয়, সৃষ্টিতত্ত্ব ও স্রষ্টাতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভকরা বলিতে বোঝা যায়- (১) সৃষ্টি জগত বা আলমে খালক, (২) সৃষ্টিজগতের উপরে আল্লাহতায়ালার আমর বা হুকুমের জগত, (৩) আল্লাহতায়ালার সিফাত বা ক্রিয়াগুণ সমূহের জগত এবং (৪) আল্লাহপাকের জাত বা সত্ত্বা সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন।
বিজ্ঞাপন
আলমে খালক, আলমে আমর ও সিফাতে এজাফিয়া বা ক্রিয়াগুণ সমূহের প্রতিবিম্ব রহিয়াছে মহাকালবে। মহাকালব আরশের উপরের জগতে রহিয়াছে। আরশ হইল সৃষ্টি জগৎ বা আলমে খালক ও হুকুমের জগৎ বা আলমে আমরের মধ্য পর্যায়ে অবস্থিত। মহাকালব হইতে সিফাতে এজাফিয়া এবং সিফাতে হাকীকীর নূর আসিয়া মানব দেহের কালব রূপ আয়নায় পড়ে। তাই এই জগতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকিয়াও মানুষ সমগ্র সৃষ্টি জগৎ, আল্লাহতায়ালার হুকুমের জগৎ এবং আল্লাহতায়ালার নূরের জগতের জ্ঞান রূহ ও কালবের মাধ্যমে লাভ করিতে পারে।
এখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে, কালব মানব দেহে আগেই রক্ষিত হইলেও সকল মানুষ কেন আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে পরিচিত হয় না, কেন সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূরের সহিত পরিচিত হয় না?
ইহার কারণ মানব দেহে কালব আগেই রক্ষিত থাকিলেও কালব তাহার আলমে আমরের বৈশিষ্ট্য সমূহ দেহের জড় জগতের বৈশিষ্ট্য সমূহের প্রভাবে হারাইয়া ফেলে। মানব দেহে জড় জগতের কলুষতা রহিয়াছে। জড় জগতে বসবাস করিতে করিতে ও দীর্ঘকাল আলমে আমরের জগৎ হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার কারণে মানুষ তাহার মূল উৎপত্তি স্থলের সহিত যোগসূত্র হারায়। জড় জগতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়িতে থাকে। তাই কালবের আয়না অকার্যকর হইয়া পড়ে-সেখানে আর আল্লাহতায়ালার নূর ও তাঁহার সিফাতের জিলাল প্রতিফলিত হয় না। এই অকার্যকর অবস্থা হইতে কালবকে আবার কার্যক্ষম করিতে পারেন একমাত্র মুর্শিদে কামেল। তিনি কালবে আলমে আমরের গুণ পুনরুজ্জীবিত করেন।
বিজ্ঞাপন
এই জন্য মুর্শিদে কামেল আলমে আমরের লতিফা কালবকে তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগে কার্যক্ষম করেন। আল্লাহপাক যে জ্ঞান ভান্ডার মহাকালবে রক্ষিত করিয়াছেন, সেই জ্ঞান ভান্ডারের জেলাল আবার কালবে আসিয়া পড়ে। তখন মানুষ আবার কালবের মাধ্যমে সমগ্র সৃষ্টি জগৎ, আলমে আমর বা হুকুমের জগৎ এবং আল্লাহতায়ালার নূরের জগতের জেলাল দেখিতে পায়। আল্লাহপাকের জাত-আদিয়াতের নূর যখন কালবে আসে, তখন আল্লাহর নূরের প্লাবন এত বেগে প্রবাহিত হয় যে, কালব ও রূহ এক হইয়া যায়। এমনি জোরে ছয় দিক বা দশ দিক হইতে তখন আল্লাহতায়ালার নূরের জেলাল প্রবাহিত হইয়া তামাম আকাশ-বাতাস আচ্ছাদিত করিয়া দেয়। তখন মুরীদ আল্লাহতায়ালার নূর ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পায় না। সাগরের মধ্যে শৈবাল, পাহাড়-পর্বত, হাঙ্গর, তিমি থাকিলেও দর্শকের নিকট কেবলমাত্র পানি বিশিষ্ট সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। সেইরূপ ঐ স্তরে মুরীদ জগতের সমস্ত কিছু বিস্মৃত হইয়া কেবল আল্লাহতায়ালার নূরের জেলাল দেখিতে পায়।
হযরত মনছুর হাল্লাজ (রঃ) ছাহেব যখন ঐ দরজায় পৌঁছান, তিনি শুধু আল্লাহতায়ালার নূরের সাগর দেখিতে পান যে সাগরের মধ্যে তিনি তাঁহার নিজের অস্তিত্ব হারাইয়া ফেলেন। ঐ অবস্থায় তিনি বলিয়াছিলেন "আনাল হক"। প্রকৃত প্রস্তাবে মনছুর হাল্লাজ (রঃ) ছাহেব নিজেকে নূরের দ্বারা আচ্ছন্ন দেখিয়া নিজেকে আল্লাহপাক হইতে পৃথক করিতে পারেন নাই।
কালব ও রূহের যোগাযোগের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নূরের সাগর তথা সমগ্র সৃষ্টিজগতের যে জ্ঞান ও মর্তবা পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ মারফত মুরীদ লাভ করেন, সেই স্তরকে তরিকতের পরিভাষায় বলা হয়, "বেলায়েতে ছোগরা" বা "মা'ইয়াতের মাকাম"।
বিজ্ঞাপন
উপরের আলোচনা হইতে ইহা সুস্পষ্ট যে, কালব বা দেলকে জড় জগতের কলুষতা মুক্ত রাখিতে না পারিলে কালবের মধ্যে আল্লাহতায়ালার অবস্থিতি বা তাঁহার সৃষ্টি জগতের জ্ঞান আসিবে না। তাহা হইলে কালবকে কলুষতা মুক্ত রাখিবার পদ্ধতি কি-তাহা জানা প্রয়োজন।
কালবকে কলুষতা মুক্ত করিবার জন্য নাফসকে কলুষতা মুক্ত করা প্রয়োজন। যতক্ষণ নাফস তাহার কুস্বভাব হইতে মুক্ত না হইবে ততক্ষণ কালব ও রূহকে নাফস কুমন্ত্রণা দিতে থাকিবে। তাই নাফসকে পবিত্র করিতে না পারিলে, কালব ও রূহ তাহার খপ্পর মুক্ত হইবে না; আর কলুষতাপূর্ণ কালবে আল্লাহতায়ালার পরিচিতি, তাঁহার সৃষ্টির পরিচিতি বা আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশও হইবে না। তাই প্রশ্ন নাফস কে দুষণ মুক্ত করিবার পথ কি?
নাফসকে পবিত্র করিবার পথ অপেক্ষাকৃত কঠিন। কারণ নাফস বা মানব দেহের উপাদান হইল আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস। ইহারা আরশের নিম্ন জগতের উপাদান। তাই এই উপাদানগুলিতে আরশের উপরের জগতের উপাদানগুলির অর্থাৎ কালব ও রূহের যে পবিত্রতা ও সূক্ষ্মতা রহিয়াছে তাহা নাই। উপরন্তু আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের বৈশিষ্ট্য পরস্পরের বিপরীত। বায়ু হালকা, মাটি ভারী। পানির গুণ আর্দ্রতা। আগুনের গুণ দহন কারক।
মানব দেহ স্কুল, কিন্তু মানব দেহের শক্তিসমূহ যেমন শুনিবার বা দেখিবার শক্তি সূক্ষ্ম। সুতরাং পরস্পরের বিপরীত বৈশিষ্ট্য মন্ডিত মানব দেহের উপাদান দিয়া গঠিত নাফসকে দুষণ মুক্ত ও পবিত্র করা কঠিন।
নাফসকে পাক করিবার দুইটি রাস্তা রহিয়াছে-যথা:
এনাবত ও এজতেবা।
এনাবত হইল কঠিন রেয়াজত ও পরিশ্রমের রাস্তা। এই রাস্তায় খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় ছালেক বা মুরীদকে নিজে কষ্ট করিয়া অগ্রসর হইতে হয়।
এজতেবার রাস্তা হইল মহব্বতের পথ। ইহা মোরাদ ফকির বা আল্লাহতায়ালার পথের নির্ধারিত পথিকদের যাবার রাস্তা। আল্লাহপাক যাহাদের দয়া করিয়া পছন্দ করেন, তাহাদেরই কেবল মুর্শিদে কামেলের আত্মার যোগাযোগে এজতেবার রাস্তা দিয়া মাঞ্জিল-এ-মাকছুদে লইয়া যান। "এনাবত" হইল বেলায়েতের এবং "এজতেবা" হইল নবুয়তের। এনাবতের রাস্তা দিয়া যাহারা অগ্রসর হন, তাহারা কঠোর পরিশ্রমের পর তাহাদের কালব জারী হইয়াছে বলিয়া বুঝিতে পারেন নাকিনিতে
এজতেবার রাস্তার পথিকদের প্রথমেই কালব জারীর ব্যবস্থা করা হয়। মুজাদ্দেদীয়া তরিকায় প্রথমেই মুর্শিদে কামেল মুরীদের কালব জারী করাইয়া দেন। ইহাতে প্রথমেই গৃহীত হইয়া যাইবার নিদর্শন রহিয়াছে।
প্রথমেই কালব জারী হইবার কারণে একই সাথে মুরীদের বাতেন সাফ হয় এবং কালব জারী (জেকের) হইবার কারণে মুরীদের মনে আল্লাহভীতি জন্ম নেয়। আল্লাহভীতি বা লেবাসুত তাকওয়া" খোদাপ্রাপ্তি সাধনার পথের লেবাস বা পোষাক। সর্বশক্তিমান ও সকল করুণার আধার আল্লাহপাকের দিদারের জন্য তাঁহাকে ভালবাসা যেমন প্রয়োজন, তাহার চেয়ে অধিক প্রয়োজন তাকওয়া বা ভীতি। তাকওয়া বা ভীতিই খোদাপ্রাপ্তি সাধনার পথে মুরীদকে নিবিষ্ট থাকিতে সাহায্য করে। নাফসকে পাক সাফ করিতে হইলে নাফস সম্পর্কে ধারণা থাকিলে ভাল হয়।
আল্লাহপাক ফরমান, তিনি ছিলেন গুপ্ত ধন ভান্ডার। তিনি পরিচিত বা প্রকাশিত হইতে চাহিলেন। তিনি যে প্রকাশিত হইবেন বা পরিচিত হইবেন, তাহার জন্য তাঁহাকে অবলোকন করিতে পারে এমন অস্তিত্ব প্রয়োজন। তাঁহার যে সকল গুণ তাহাও প্রকাশের প্রয়োজন-তাই আল্লাহ বলিলেন "কুন" বা হও। আল্লাহপাক এইভাবে যাহা প্রকাশ করিলেন তাহা তাঁহার কামালিয়াত বা সিফাতের প্রতিবিম্ব। অর্থাৎ শুভ গুণ। কিন্তু কোনও গুণের বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয় না তাহার বিপরীত অবস্থা না থাকিলে। অন্ধকার না থাকিলে আলো বোঝা যায় না। তাই প্রয়োজন হয় একই সাথে শুভ ও অশুভের সৃষ্টি। শুভকে প্রকাশিত ও পূর্ণাংগরূপে পরিস্ফুট করিবার জন্য অশুভের সৃষ্টি।
আল্লাহতায়ালার শুভমূলক গুণ বা সিফাত সমূহের নাম ওয়াজেবুল ওজুদ। ইহার বিপরীত হইল আদামাত বা মানব দেহ। এই মানব দেহেই আল্লাহতায়ালার শুভ ও অশুভ গুণের বা অজুদ ও আদামতের একই সাথে সহঅবস্থান রহিয়াছে।
একদিকে রহিয়াছে আল্লাহপাকের শুভ শক্তি কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফার অবস্থান। ইহার বিপরীতে রহিয়াছে নাফস, আব, আতশ, খাক, বাদ। শুভ শক্তির নিদর্শন সমূহ অর্থাৎ কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফার মধ্যে রূহ হইল প্রধান। মানব দেহে আল্লাহপাক রূহকে তাঁহার নিদর্শন হিসেবেই ফুঁকিয়া দিয়াছেন। অপর দিকে নাফস হইল আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সমন্বয়ে গঠিত বিপরীত শক্তি। এই বিপরীত শক্তির কেন্দ্র নাফস। এখানেই আল্লাহপাকের বিপরীত শক্তি শয়তানের কেন্দ্র। রূহ আল্লাহপাকের পবিত্র গুণের শক্তি সমূহের কেন্দ্র। আর নাফস হইল বিপরীত আদামাত বা শয়তানের কেন্দ্র।
যদিও মানব দেহে আল্লাহপাকের শুভ শক্তি সমূহ ও বিপরীত শক্তি সমূহ সহ-অবস্থান করে; জড় জগতের প্রভাব প্রবল হইবার কারণে শুভশক্তি সমূহ অর্থাৎ কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এখানে বুঝিবার বিষয় এই যে, মানুষের স্কুল ও জড় দেহই আল্লাহপাকের বিপরীত শক্তি শয়তানের কেন্দ্র, এই দেহই আল্লাহপাকের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেয়। তাই আল্লাহপাক ফরমানঃ তোমরা নাফসের বিরুদ্ধে জেহাদ কর, কারণ নাফস আমার বিরুদ্ধাচারণ করে। আল্লাহপাক যখন মানুষ তথা সর্ব জগৎ সৃষ্টি করিয়াছিলেন তখন আদেশ করিয়াছিলেন "কুন” অর্থাৎ হও। এই "কুন" বা হও শব্দ কার্যে পরিণত হইতে অনেকগুলি স্তর পার হইতে হইয়াছে।
প্রথমে কুন আদেশের সংগে সংগে আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগতের সৃষ্টি হয়। আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগৎ প্রকাশিত হইবার জন্য আলোকের প্রয়োজন হয়। তখন যে আলোর জগৎ আসিয়া আলমে আরওয়াহকে প্রকাশ করিল তাহা "নূরে মুহাম্মদী"। এই "নূরে মুহাম্মদীর" মাধ্যমে মানুষের সত্ত্বা সমূহ যখন সূক্ষু অবস্থায় ছিল তাহাই ছিল "রূহ"। সেই সূক্ষ্ম অবস্থা হইতে মানব যখন জড় দেহের আকার ধারণ করিল তাহা হইল নাফস।
পীরে কামেল তদীয় পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা মানব দেহে সুপ্ত রূহকে জাগ্রত করান ও নাফসের পবিত্রতার বিপরীত গুণ দূর করাইয়া নাফসকে রূহের পবিত্রতার গুণ বা আল্লাহতায়ালার আমরের গুণ দান করেন। তখন মুরীদের যে জাত জড় জগতের আদামাতের মধ্যে নিহিত ছিল সেই জাত মিলাইয়া বা অন্তর্হিত হইয়া যায়। মুরীদ তখন বুঝিতে পারে যে, সমস্ত মংগল ও মর্তবা অজুদ বা আল্লাহতায়ালার সিফাতের প্রতিবিম্ব হইতে আসিতেছে।
মুরীদ তখন বুঝিতে পারে তাহার অস্তিত্ব প্রথমে নিহিত ছিল আল্লাহতায়ালার কল্পনায়, তাহার পরে আলমে আমরে, তাহার পরে নূরে মুহাম্মদী ও আলমে আরওয়াহতে বা রূহের জগতে এবং সর্বশেষে জড় জগতে। মুর্শিদে কামেল মানব দেহে সুপ্ত রূহকে তদীয় পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা জাগ্রত করাইবার পর নাফস ও তাহার অন্যান্য উপাদান আগুন, পানি, মাটি, বাতাসকে পবিত্র করান। ইহার ফলে মানুষের নাফস তাহার দুষ্ট স্বভাব ছাড়িয়া পবিত্রতা লাভ করে, রূহের চরিত্র লাভকরে-যে রূহ আলমে আরওয়াহতে "আমি কি তোমাদের প্রভু নই?" আল্লাহপাকের এই প্রশ্নের জবাবে বলিয়াছিল "বালা" অর্থাৎ "বেশখ তুমি আমাদের প্রভু।" মুর্শিদে কামেল তদীয় মুরীদ সন্তানের সুপ্ত রূহকে জাগ্রত করাইয়া, সেই জাগ্রত রূহের সাহায্যে মুরীদের নাফসের ও তাহার সহচর আব, আতস, খাক, বাদের স্বভাব পরিবর্তন করাইয়া সমস্ত মানব সত্ত্বাকে পরিবর্তন করাইয়া দেন। মানুষ তখন আল্লাহতায়ালার গুণ লাভ করে। এই পবিত্রতা অর্জনের জন্য মুর্শিদে কামেল মুরীদ সন্তানকে নাফী এসবাত জেকেরের তাওয়াজ্জুহ ও তালিম প্রদান করেন। এই নাফী এসবাত জেকের হইল কালেমা শরীফ "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"। এই জেকেরের মাধ্যমে কালব কালেমা শরীফ স্বীকার করিয়া লয় ও ইহার তাৎপর্য অনুধাবন করে।
কলেমার প্রথম অক্ষর "লা"। ইহা যেন বেহেশতের নিষিদ্ধ বৃক্ষ। অর্থাৎ কালেমার "লা" শব্দে অবস্থান করিও না। যেখানে আল্লাহ নাই সেখানে মুমিন থাকিতে পারে না। আল্লাহ নাই কোথায়? মানুষ তাহার নিজের স্বার্থ, লোভ, কামনা, বাসনা দিয়া নিজের নাফসকে পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে। তাই নাফসে গায়রুল্লাহ বর্তমান হইয়া গিয়াছে। এই লোভ, মোহ, স্বার্থ ও মানুষের সত্ত্বা এক হইয়া যায়। তখন মানুষের আর হুশ বা হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। নাফী এসবাত জেকেরের মাধ্যমে আদামতের স্বভাব ঝাড়িয়া ফেলিয়া আল্লাহতায়ালার হাকীকী জগতে ফিরিয়া যাইয়া মুরীদ আকরাবিয়াতে প্রবেশ করে।
নাফী এসবাত জেকেরের প্রথম অংশ "লা" তাই নাফস অর্থাৎ নাভি হইতে শুরু হয়। নাফস পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুকে "লা" বা অস্বীকার করে অর্থাৎ তাহার সকল মোহ ও স্বার্থ ত্যাগ করে। কালেমা শরীফের বাকী অংশ কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফাতে জেকের করা হয় ও সমগ্র কালবকে কালেমা শরীফ বেষ্টন করিয়া থাকে। এই নাফী এসবাত জেকের সাত তলা আসমান জমিন লইয়া হইতে থাকে। নাফী এসবাত জেকের 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ লা মাকছুদা ইল্লাল্লাহ-কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফা-অর্থাৎ সমগ্র আলমে আমরের লতিফা সমূহকে বেষ্টন করিয়া রাখে। তখন কালব কালেমা সিদ্ধ হয়। সেই কালেমা সিদ্ধ কালবেই আল্লাহপাকের সেফাতের নূরের দর্শন মিলে। তখন মানুষ পুরাপুরি ঈমানদার হয়। ঈমানের পরিপক্কতা আসে। তখন আল্লাহ বলেন, "অহুয়া মা'আকুম আয়নামা কুনতুম" অর্থাৎ তুমি যেখানেই থাক আমি তোমার সংগেই আছি-মুরীদ এই জ্ঞানে জ্ঞানী হয়। তখন মুরীদ যে দিকে তাকায় সে দিকেই আল্লাহপাকের নূর দেখিতে থাকে। সর্ব দিক হইতে আল্লাহপাকের জেকের তাহার কানে আসিতে থাকে। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) ফরমান,
"বজেকরাশ হারছে বিনি দার খোরুশাস্ত
ওয়ালে দানাদ দরি মা'নী কে গোশাস্ত"
অর্থাৎ-"আকাশে বাতাশে গ্রহে নক্ষত্রে প্রতি রেণু পরমাণুতে আল্লাহর জেকের হইতেছে। যদি তুমি শুনিতে চাও, তোমার দেলের কানকে পরিস্কার কর।"
তাই বলা হইতেছে হে জাকেরগণ! তোমরা যদি অপূর্ব নেয়ামতের অধিকারী হইতে চাও, তবে আখেরী জামানার শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ হযরত খাজা শাহ্ সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের পাক দেলের সংগে দেল মিশাও। তবেই তোমাদের দেলের ভিতরে এই সকল হালাত আস্তে আস্তে খুলিতে থাকিবে। আল্লাহতায়ালার কুর্বের সমুদ্রের মধ্যে তোমরা নিমজ্জিত হইতে পারিবে। আমীন!








