Logo

পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ শক্তির বলে মুরীদের কালব জিন্দা হয়

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৪ জুলাই, ২০২৬, ২০:২০
পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ শক্তির বলে মুরীদের কালব জিন্দা হয়
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত সুলতানুল আজকার ও নাফী-এসবাত জেকের بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কালবী জেকের ও ইহার গুরুত্বঃ

বিজ্ঞাপন

জেকের আরবী শব্দ। ইহার অর্থ স্মরণ করা। ইসলামী পরিভাষায় খোদাতায়ালাকে স্মরণ করার নামই জেকের। আর স্মরণকারীকে বলা হয় জাকের। পীরে কামেল খোদাতায়ালাকে চিনিবার পথে স্বীয় মুরীদবর্গকে দুই প্রকারের জেকের শিক্ষা দিয়া থাকেন। যথাঃ জেকেরে এমে জাত এবং নাফী-এসবাত।

আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন শরীফের সূরায়ে জারীয়াতে (আয়াত নং-৫৬) বলেন,

وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমারই ইবাদত বন্দেগীর জন্য সৃষ্টি করিয়াছি।" সূরা নূরে (আয়াত নং- ৩৭) আল্লাহপাক বলেন,

رِجَالٌ لا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةً وَّ لَا بَيْعِ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ

অর্থাৎ- "এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যাহাদিগকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর জেকের হইতে গাফেল করিতে পারে না।"

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ী তাহার বাণিজ্য কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় বা ক্রেতার সাথে বিক্রেতা দামদস্তুর করিবার সময় কিভাবে জেকের করেন? জাহেরী জিহ্বাতো একটাই। ইহা দ্বারা কেনাবেচার সময় কথাবার্তা বলিবে, না জেকের করিবে? আবার আল্লাহপাক বলেন, তোমাদেরকে শুধুই বন্দেগী করিবার জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। শুধুমাত্র বন্দেগী বা ইবাদত করিবার জন্যই যদি মানুষ সৃষ্টি হয় তাহা হইলে দুনিয়াবী কাজ কিভাবে করা যাইবে? তাহা ছাড়া জীবনের তিন ভাগের প্রায় এক ভাগ সময়তো মানুষ নিদ্রায় অতিবাহিত করে। তবে কি আল্লাহপাক সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা মানুষের কাঁধে চাপাইলেন? তাহাইবা কি করিয়া সম্ভব? একজন ন্যায়পরায়ন বাদশাহ-ই যেখানে প্রজার উপর সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না, সেখানে সমস্ত বাদশাহের বাদশাহ মহান স্রষ্টা কি করিয়া দুর্বল মানবজাতির উপর সাধ্যাতিরিক্ত বোঝা চাপাইবেন? আসলে সার্বক্ষণিক যে ইবাদত বন্দেগীর কথা আল্লাহপাক উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা হইল 'কালবী জেকের'। পীরে কামেল তাহাদের মুরীদদিগকে এই কালবী জেকের শিক্ষা দিয়া থাকেন। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ শক্তির বলে মুরীদের কালব জিন্দা হইয়া তথায় আল্লাহ আল্লাহ জেকের জারী হয়।

একবার এই জেকেরে-কালবী জারী হইলে তাহা আর বন্ধ হয় না। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে, চলিতে, ফিরিতে, উঠিতে-বসিতে, পাকে-নাপাকে, সর্বাবস্থায় এই জেকের চলিতে থাকে। মউতে, কবরে, মীযানে, পুলসিরাতে, হাশরে সর্বক্ষেত্রেই সেই জেকের চলিতে থাকিবে। যে ব্যক্তির এই 'কালবী জেকের' সিদ্ধ হইয়াছে, তাহার দ্বারাই আল্লাহপাকের সেই বাণী-

وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমারই বন্দেগীর জন্য সৃষ্টি করিয়াছি-এই আয়াত প্রমাণিত হয়। সার্বক্ষণিক জেকের করার এক অপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী সে হয়। যে ব্যবসায়ীর কথা কুরআন পাকে উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহাকে ক্রয়-বিক্রয় (এমন কি সোনা রূপার ক্রয় বিক্রয়ও) আল্লাহর জেকের হইতে গাফেল করে না, সে ঐ ব্যক্তি যাহার অন্ততঃ 'জেকেরে কালবী' হাসিল হইয়াছে। সে জাহেরী জিহ্বায় দামদস্তুরে ব্যস্ত থাকে, অপর দিকে কালবে সদা-সর্বদা তাহার জেকের হইতে থাকে। কথিত আছে, একদা হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রাঃ) ছাহেব এক মিনা বাজারে গিয়াছিলেন। সেই মিনা বাজারে তিনি লক্ষ্য করিলেন যে, এক ব্যক্তি প্রতিদিন লক্ষ দেরহামের ব্যবসা করিতেছে অথচ এক মুহূর্তের জন্যও তিনি আল্লাহকে ভুলেন নাই। উক্ত ব্যবসায়ী এত বেচাকেনার মধ্যেও প্রতি মুহূর্তে খোদাতায়ালাকে স্মরণ করিয়াছেন শুধুমাত্র 'জেকের কালবী' সিদ্ধ থাকার কারণে।

সহীহ মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফ হইতে জানা যায় যে, রাসূলে করীম (সঃ) প্রত্যেক অবস্থায় এবং প্রত্যেক মুহূর্তে আল্লাহর জেকের করিতেন। প্রত্যেক মুহূর্তে জেকের করিবার যে পদ্ধতি বা কালবী জেকের রাসূলে করীম (সঃ) এর সময় চালু ছিল, তাহা সাহাবাগণ, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী, তৎপর তরীকতের ইমামগণ এবং পীরে কামেলগণের মাধ্যমে আজও বর্তমান রহিয়াছে। পীরে কামেল এই কালবী জেকের শুরুতেই খোদা তালাশী ব্যক্তিদের শিক্ষা দিয়া থাকেন।

কালব মানব দেহ অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র এক লতিফা। যাহা বামস্তনের দুই অংগুলী নীচে বুকের মধ্যে অবস্থিত। কালব আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগতের লতিফা। নাফসে আম্মারার সংস্পর্শে আসাতে কালব তাহার স্বচ্ছতা হারাইয়া ফেলে। কালব যদিও আল্লাহতায়ালার ভেদের এক মহা জ্ঞানভান্ডার তথাপিও নাফসের কুপ্রভাবে কালবের জ্ঞান ধারণ ক্ষমতা বিনষ্ট হয়। কালবী নেত্রে কাল পর্দা পড়ে। নাফসের কুপ্রভাব হইতে, নাফসের গোলামী হইতে কালবকে রক্ষা করিতে না পারিলে মানব জনমই বৃথা। কালবের উপরে পুঞ্জীভূত ময়লা পরিস্কার করিবার জন্য সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। আর কালব পরিস্কার করিবার অস্ত্র বা যন্ত্র আত্মা পরম্পরায় বর্তমান ওলীয়ে কামেলগণের নিয়ন্ত্রনে। এই জন্যই ওলীয়ে কামেলের সাহচর্যে বা সান্নিধ্যে যাওয়ার তাগিদ ইসলামে রহিয়াছে।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক তাহার বান্দাদের বন্দেগীর নিমিত্ত যে সকল স্তম্ভ বা শাখা নির্ধারিত করিয়া দিয়াছেন, সেই গুলির মধ্যে নামায অগ্রগণ্য। কারণ নামাযের মাধ্যমেই বান্দা খোদাতায়ালার সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করিতে পারে। নামাযকে রাসূলে করীম (সঃ) মুমিনের জন্য মেরাজ হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। আবার পবিত্র কুরআন শরীফের সূরায়ে ত্বহা'য় (আয়াত নং- ১৪) আল্লাহপাক বলেন,

أَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِي

অর্থাৎ- "তোমরা সালাত কায়েম কর আমার জেকেরের উদ্দেশ্যে।"

বিজ্ঞাপন

এখানে দেখা যায় যে, জেকের হইল উদ্দেশ্য আর সালাত বা নামায হইল উপলক্ষ্য। অর্থাৎ সালাতের চেয়ে জেকের শ্রেষ্ঠ ইবাদত। সহীহ হাদীস শরীফেও পাওয়া যায় রাসূলে করীম (সঃ) ফরমান,

الا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَ أَرْكَهَا عِنْدَ مَلِيْكِكُمْ وَ أَرْفَعِهَا

فِي دَرَجَاتِكُمْ وَخَيْرٍ لَكُمْ مِّنْ إِنْفَاقِ الذَّهَبِ وَالْوَرَقِ وَ خَيْرٍ لَكُمْ

বিজ্ঞাপন

مِّنْ أَنْ تَلْقُوا عَدُوكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ وَ يَضْرِبُوا

أعْنَاقَكُمْ قَالُوا بَلَى قَالَ ذِكْرُ اللَّهِ

অর্থাং-"আমি কি তোমাদিগকে তোমাদের শ্রেষ্ঠ ইবাদত বা আমল কি তা বলবো না যা তোমাদের প্রভুর নিকট অধিক প্রিয় ও পবিত্র এবং যা তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তোমাদের পক্ষে সোনা, রূপা দান করা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং এ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ যে (জেহাদে) তোমরা শত্রুর মোকাবেলা করবে ও তাদের গর্দান কাটবে আর তারাও তোমাদের গর্দান কাটবে (অর্থাৎ জেহাদে শহীদ হবে)। তারা উত্তর করলেন, হাঁ হুজুর (অবশ্যই বলবেন)। তখন রাসূলে করীম (সঃ) ফরমান, তা হলো "আল্লাহর জেকের।" (তিরমিযী ও মিশকাত শরীফ) কাজেই বুঝা যায় যে আল্লাহর জেকেরই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। জিহবা দ্বারা বেশীক্ষণ জেকের করা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণেই জিহবা আড়ষ্ঠ হয়। কাজেই 'জেকেরে কালবী' অর্জন করার চেষ্টা সকলের করা উচিত। আর এই জেকেরে কালবী হাসিলের একমাত্র উপায় পীরে কামেলের খেদমত করা এবং তাহার কদমে নেছার হইয়া যাওয়া।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন লতিফার জেকের ও সুলতানুল আজকারঃ

মানবদেহে দশটি লতিফা আছে। যথাঃ কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাক্স, আব, আতস, খাক ও বাদ। পীরে কামেল সর্বপ্রথমে মুরীদের কালবে সবক দেন। ফলে কালব জিন্দা হয় এবং আল্লাহ আল্লাহ (এমে জাত) জেকের জারী হয়। সদা সর্বদা এই কালবী জিহবায় এমে জাত জেকের চলিতে থাকে। পরিচ্ছন্ন ও জেকেরসিদ্ধ কালবে খোদাতায়ালার নূর প্রতিফলিত হয়। লতিফায়ে কালব মহাকালবের ক্ষুদ্রতম অংশ বিধায় মহাকালব হইতে তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূর কালবের পরিচ্ছন্ন আয়নায় প্রতিবিম্বিত হয়। এই নূরের সাহায্যে মুরীদ খোদাতায়ালার সমগ্র সৃষ্টি জগত তথা আরশ-কুরছি, লওহ-কলম, বেহেশত-দোযখ, সাততলা আসমান হইতে সাততলা জমীনের নীচে তাহাতাস সারা পর্যন্ত সব কিছুই দেখিতে পায়। হযরত মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলেন,

عرش کرسی در دل اوست لوح قلم

বিজ্ঞাপন

هر که دلرا یافته ارا نیست گم

উচ্চারণঃ-

"আরশ কুরছি দর দেলে উস্ত লওহ কলম

বিজ্ঞাপন

হরকে দেলরা ইয়াফত্যা আরা নিস্ত গোম।"

অর্থাৎ- আরশ-কুরছি, লওহ-কলম, বেহেশত-দোযখ সবই তোমার দেলের মধ্যে পরিলক্ষিত হইবে। জিন্দা কালবে প্রতিফলিত নূরের সাহায্যে শুধুই যে বিশ্বব্রহ্মান্ড দেখা যায় তাহা নহে; বরং খোদাতায়ালাকেও দেখা সম্ভব। জাগ্রত কালবওয়ালা সার্বক্ষণিকভাবে একমুখে তথা জিন্দা কালবে জেকের করিতে থাকে।

অতঃপর পীরে কামেল মুরীদকে 'লতিফায়ে রূহে' সবক দেন। ফলে রূহ জাগ্রত হয় ও এমে জাত জেকের জারী হয়। তখন মুরীদ দুই মুখে তথা কালব ও রূহের মাধ্যমে অবিরাম জেকের করিতে থাকে।

অতঃপর পীরে কামেল মুরীদের 'সের' লতিফায় সবক দেন। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে লতিফায়ে সের জাগ্রত হয় ও আল্লাহ আল্লাহ জেকের জারী হয়। তখন মুরীদ তিন মুখে তথা জিন্দা কালব, রূহ ও সেরের মাধ্যমে জেকের করিতে থাকে।

তৎপর পীর মুরীদের 'খফি' লতিফায় সবক দেন। ফলে মুরীদের লতিফায়ে খফি জিন্দা হয় ও এমে জাত জেকের জারী হয়। তখন মুরীদ একই সাথে চার মুখে অবিরাম জেকের করিতে থাকে।

অতঃপর পীরে কামেল মুরীদের 'লতিফায়ে আখফায়' সবক দেন। ফলে আখফা লতিফা জিন্দা হয় ও এমে জাত জেকের জারী হয় তখন মুরীদ একই সাথে পঞ্চ মুখে জেকের করিতে থাকে।

অতঃপর সবক দেওয়া হয় মুরীদের 'লতিফায়ে নাফসে'। পীরের আত্মিক তাওয়াজ্জুহতে মুরীদের লতিফায়ে নাফস জিন্দা হয় ও এমে জাত জেকের সিদ্ধ হয়। তখন মুরীদ অবিরাম ছয় মুখে জেকের করিতে থাকে। মুরীদের জাগ্রত ও পরিচ্ছন্ন ছয় লতিফায় (কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা ও নাফস) নূরের বিরামহীন স্রোত আসিতে থাকে। মুরীদ ছয় মুল্লুকের বাদশাহ্ হয়। অতঃপর পীরে কামেল সবক দেন মুরীদের অবশিষ্ট চার লতিফা আব, আতস, খাক ও বাদ-এ। উল্লেখ্য যে, প্রথম ছয় লতিফায় পীরে কামেল তদীয় শাহাদত অংগুলী স্পর্শের মাধ্যমে সবক দেন, কিন্তু পরবর্তী লতিফাসমূহে অংগুলী স্পর্শ করেন না। পরবর্তী লতিফাসমূহে সবক দেওয়া হয় আদেশ-উপদেশের মাধ্যমে। পীরের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালন ও অনুশীলনের মাধ্যমে মুরীদের পরবর্তী লতিফাসমূহ জাগ্রত হয়। তখন দশ লতিফায় এমে জাত জেকের চলিতে থাকে। ছয় বা দশ লতিফায় এমে জাত জেকের জারী হওয়ার পর পীরে কামেল সংযোজন করান নাফী-এসবাত জেকের।

অতঃপর পীরে কামেল মুরীদের সর্ব শরীরে সবক দেন। ফলে মুরীদের সর্ব শরীরে জেকের হইতে থাকে।

উপরে যে দশটি লতিফার কথা বলা হইল তাহা ব্যতীত আরও একটি লতিফার সংবাদ তরীকতের পুস্তকে পাওয়া যায়। তাহা হইল "লতিফা কালেব।" আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের তৈরী মানুষের সমুদয় শরীরকে 'লতিফা কালেব' বলা হয়। মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত সমস্ত লোম, কেশ, লোমকূপ, হাড্ডি-মজ্জা, চামড়া, মাংশপেশী, রক্ত কনিকা তথা মানব শরীরের সমুদয় অনু-পরমাণু লতিফা কালেবের অন্তর্ভুক্ত।

এখানে উল্লেখ্য, লতিফা কালেব সম্পর্কে সমস্ত সাধক সমানভাবে জ্ঞাত নহেন। যে সমস্ত সাধক কামালাতে নবুয়ত ও বেলায়েতে নবুয়তের মর্যাদাপ্রাপ্ত তথা স্বীকৃত ওলীয়ে কামেল, যাহারা বেলায়েত ও কামালাতের সমুদয় মাকাম অতিক্রম করিয়াছেন অর্থাৎ যাহারা বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া, মুরাকাবায়ে শরহে ছদর, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়ার মাকামসমূহ অতিক্রম করিয়া সর্বশেষ মাকামদ্বয় তথা হোব্বে সেফা ও মাবুদিয়াতে সেরফা পর্যন্ত উপনীত হইয়া তথা হইতে ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরের মাধ্যমে পবিত্র জাতে ফানা ও বাকা লাভ করিয়াছেন কেবলমাত্র তাহারাই লতিফা কালেব সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন এবং যোগ্য মুরীদের লতিফা কালেবে তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করিতে পারেন।

স্বীকৃতপ্রাপ্ত ওলীয়ে কামেল তদীয় যোগ্য মুরীদানের উপর শক্তিশালী আত্মিক তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন। ফলে ভাগ্যবান মুরীদের দৈহিক ৩৩ কোটি লোমকূপে, দেহের প্রত্যেক তন্ত্রিতে, প্রত্যেক রক্তকনিকায় আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতে থাকে। সেই জেকেরের বাজনা মুরীদের কানে ভাসিয়া আসে। শুধু নিজ দেহের জেকেরের শব্দ নহে; আসমান-জমীন, গ্রহ-নক্ষত্র, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, কিট-পতঙ্গ তথা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সবকিছুই যে অহর্নিশ আল্লাহ আল্লাহ জেকের করিতেছে তাহাও মুরীদের কানে ভাসিয়া আসে। জেকেরের বাজনা ছাড়া তাহার কানে আর কিছুই আসে না। কালামুল্লাহ শরীফের প্রকাশঃ

يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوتِ وَ مَا فِي الْأَرْضِ

অর্থাৎ-"আসমান জমীন এবং এর মধ্যে যাহা কিছু আছে সবই আল্লাহর জেকের করিতেছে।" (সূরা জুমু'আঃ ১)

মুরীদের শরীরস্থিত আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সাথে মিশিয়া অসংখ্য কোটি মুখে জেকের করিতে থাকে। এ সময়

মুরীদের সত্ত্বা এত অধিক ব্যপ্তি ও বিস্তৃতি পায় যে, আকাশের তারকারাজি হইতে পাতালের বালুকনা পর্যন্ত সবকিছুই সে যেমনি নিজের মধ্যে দেখিতে পায় তেমনি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সমুদয় সৃষ্টির জেকের ধ্বনি নিজ হইতে উদ্‌গত বলিয়া মনে হয়।

মেঘের গর্জন, তরংগের কলনাদ, পাখীর কোলাহল, পতংগের গুঞ্জন, ঘন্টার ধ্বনি, ঘড়ির টিক্ টিক্ আওয়াজ, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, ঝি ঝি পোকার রব- সবকিছুই মুরীদের নিকট আল্লাহর জেকের বলিয়া মনে হয় এবং সমুদয়ই নিজ হইতে নির্গত বলিয়া অনুভূত হয়।

এমন মুরীদের সত্ত্বা হইতে নির্গত আসমান-জমীন ব্যাপী এই যে জেকেরের নাদ, জেকেরের বাজনা; পীরানে পীরগণ ইহাকে "সুলতানুল আজকার" বলিয়াছেন।

উল্লিখিত জেকেরকারী সাধক সম্পর্কেই হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) ছাহেব বলেন,

حساب عمر صد عاقل با محشر گذرد يك دم

حساب يك دم عاشق با صد محشر نمی گنجد

উচ্চারণঃ

"হেছাবে ওমরে ছাদ আকেল্ বমাহশার গুজারাদ একদোম, হেছাবে একদোমে আশেক বছাদ মাহশার নামি গুঞ্জাদ।"

অর্থাৎ-'শত শত জ্ঞানী ও বিদ্যানের সমস্ত জীবনের পাপ-পুণ্যের হিসাব হাশরের দিন এক নিঃশ্বাসে শেষ হইবে কিন্তু আশেকের এক নিঃশ্বাসের নেকীর হিসাব ঐ রকম শত হাশরেও শেষ হইবে না।' কারণ আশেক এক নিঃশ্বাসে যত সংখ্যক জেকের করেন, পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞানী-গুণী একত্রে সারা জীবনেও তত পরিমাণে জেকের করিতে পারেন না। তাই হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব তদীয় কিমিয়ায়ে সা'দাত- নামক পুস্তকে বলেন, "তামাম জাহানের ইবাদত একজন ওলীর ইবাদতের ছায়ামাত্র। কোন ব্যক্তি পঞ্চাশ হাজার বছর ইবাদত করিলে একজন ওলীর ইবাদতের আদনা দরজায় পৌঁছাইতে পারিবে।"

উক্তরূপ অসংখ্য কোটি মুখে জেকের আশেকের দেলে অপূর্ব এক শান্তিময় অনুভূতির পয়দা হয়। তাই হয়তো আল্লাহপাক বলেন,

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

অর্থাৎ-"তোমরা জানিয়া রাখ, আল্লাহর জেকেরেই দেলে শান্তি।” (সূরা রা'আদঃ ২৮)

এমন আশেক যে দিকেই তাকায় সেই দিক হইতেই সৃষ্ট পদার্থ সমূহ তাহাকে খোদাতায়ালার ইচ্ছায় জ্ঞান দান করিতে থাকে। সকল সৃষ্ট প্রাণী, জীব, জন্তু, গাছ-পালা, বৃক্ষলতা খাট-পালংক সকল কিছুই তাহাকে খোদাপ্রাপ্তির দিকে আগাইয়া লইয়া যায়। কথিত আছে, একদা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কোথাও যাইতেছিলেন। একটা কুকুর তাহার পিছু পিছু চলিল। কুকুরটি তাহার নিকটবর্তী হইলে তিনি স্বীয় কাপড়ের আচল কুকুরের গায়ে লাগিয়া অপবিত্র হওয়ার আশংকায় উপরের দিকে উঠাইয়া ধরিলেন। কুকুরটি তৎক্ষণাৎ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কে উদ্দেশ্যে করিয়া বলিল, "হে বায়েজীদ! বলুন তো আপনি আমাকে দেখিয়া নিজের কাপড় গুটাইলেন কেন? আমার শরীর শুষ্ক থাকিলে তো আপনার কাপড় অপবিত্র হওয়ার কোন আশংকা নাই। আর যদি শরীর ভিজাও হয়, তবুও আমার শরীরের সংস্পর্শে আপনার দেহ বা কাপড় অপবিত্র হইলে পানি দ্বারা পবিত্র করা যাইত।

কিন্তু যে অহংকারের কারণে আপনি আপনার কাপড় গুটাইলেন, ইহার অপবিত্রতাতো সাত সমুদ্রের পানি দ্বারাও দূর করা সম্ভব নহে।" হযরত বায়েজীদ বলিলেন, তুমি সত্যই বলিতেছ। তুমি তোমার দেহের বহির্ভাগে অপবিত্রতা ধারণ করিতেছ; আর আমি আমার অভ্যন্তরে অপবিত্রতা পোষণ করিতেছি। আস তুমি আমি এক সংগে মিলিত ভাবে বাস করি, যেন এই একত্র বসবাসের ফলে আমার মধ্যেও কিছু পবিত্রতা উৎপন্ন হয়। কুকুর বলিল, আপনার পক্ষে আমার সংগে বসবাস করা সম্ভব হইবে না। কারণ আমি সৃষ্ট জীবের মধ্যে একটি অভিশপ্ত ও বিতাড়িত প্রাণী, যে কেহ আমার কাছে আসে, সে আমার পাজরে প্রস্তর খন্ড নিক্ষেপ করে। পক্ষান্তরে আপনি হইলেন সৃষ্ট জীবের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয়। যে কেহ আপনার নিকট আসে, সুলতানুল আরেফীন আসসালামু আ'লাইকুম, বলিয়া আপনাকে সালাম করে। এতদ্ব্যতীত আমি কোন সময় যদি খাওয়ার জন্য হাড় প্রাপ্ত হই, তাহা হইলে আগামী কল্যের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখি না। আর আপনি ভবিষ্যতের জন্য জালায় ভর্তি করিয়া গম মওজুদ রাখিয়া দেন।" ইহা শুনিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব মনে মনে বলিলেন, আফসোস! আমি যখন একটা কুকুরের সংগে থাকিবার যোগ্য হইতে পারিলাম না, তখন আমি অনাদী অনন্ত আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের যোগ্য কেমন করিয়া হইতে পারি?

জেকেরের সমুদয় সবক হাসিল করিবার পর মুরীদ পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলে ঊর্ধ্ব দিকে বহু মাকাম ও দায়েরা (দায়েরায়ে এমকান, দায়েরায়ে বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা....... ইত্যাদি) উরুজ ও ছায়ের করিয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা নৈকট্যের মাকামে উন্নীত হয়।

হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন, সাত তলা আসমান ও সাত তলা জমিন এবং এর মধ্যে যাহা কিছু আছে সবই মহা ধুমধামের সাথে আল্লাহর জেকের করিতেছে। অন্ধের সম্মুখে আয়না ধরিলে অন্ধ যেমন দেখে না, অজ্ঞ লোকেরাও তেমনি বুঝিতে পারে না। মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেবের দৃষ্টিতে তাহারাই অজ্ঞ যাহারা জাহেরা বিদ্যায় পন্ডিত হওয়া সত্ত্বেও উল্লিখিত তত্ত্বে অপরিচিত। মহা কবি হাফেজ বলেন, তুমি যত বড়ই জ্ঞানী-গুণী হও না কেন, তোমার পীরের কাছে তুমি কিছুই না। যদি দুর্বিপাকের তুফান থেকে বাঁচিতে চাও, তবে পীরের কদমকে নূহের তরী মনে করিয়া শক্ত করিয়া ধর। নচেৎ দুর্বিপাকের এমনি তুফান আসিবে, যাহা তোমার সবল ভিত্তিকে ভাংগিয়া মেছমার করিয়া ফেলিবে।

তোমরা যদি খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাসিল করিতে চাও, সুলতানুল আজকারের লজ্জত যদি তোমরা লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে বর্তমান জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ, হযরত মাওলানা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের তরীকাকে শক্ত করিয়া ধর। কঠিন খেদমতের মাধ্যমে দেহের তেত্রিশ কোটি লতিফায় এসমে জাত জেকেরের নূর পয়দা কর। তাহা হইলে তোমরা খোদাতায়ালার নিকট শ্রেষ্ঠ বান্দা রূপে এবং রাসূলে করীম (সঃ) এর উম্মতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উম্মত বা হাকিমুল উম্মত রূপে মর্যাদা লাভ করিবে। আর যদি উল্লিখিত তত্ত্ব উপলব্ধি করিতে না পার, তবে তোমরা পশুতুল্য। আল্লাহপাক কুরআন শরীফে বলেন,

لَهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِهَا وَ لَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَ لَهُمْ إِذَانَ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا طَ أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَفِلُونَ

অর্থাৎ-"তাহাদের হৃদয় আছে কিন্তু তদ্দ্বারা তাহারা উপলব্ধি করে না, তাহাদের চোখ আছে তদ্দ্বারা তাহারা দেখে না, তাহাদের কান আছে তদ্দ্বারা তাহারা শ্রবণ করে না, তাহারা পশুর ন্যায় বরং উহা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত। তাহারাই গাফিল।" (সূরা আরাফঃ ১৭৯)।

কাজেই তোমরা সর্বদা তোমাদের নাফসের সাথে জেহাদে রত থাক। নাফস তোমাদের দেহে এক ফেরাউন। এই ফেরাউনকে পরাস্ত করিতে না পারিলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব তোমরা লাভ করিতে ব্যর্থ হইবে। একটি উপদেশপূর্ণ কাহিনী তোমাদের শুনাই। হযরত ইউসুফ (রঃ) ছাহেব নামক একজন ওলীয়ে কামেল, লক্ষ লক্ষ মুরীদের সর্দার ছিলেন। তাহার ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্ব হইতেই তিনি শারীরিক অসুস্থতায় পতিত হন। দুনিয়া ত্যাগের মাত্র তিন দিন পূর্বে এমনই অসুস্থ হন যে ক্ষণে ক্ষণে তিনি বেহুশ বা জ্ঞানশূন্য হইতেন। তাহার শয্যাপার্শ্বে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞ আলেম উপস্থিত ছিলেন। তাহারা হযরত ইউসুফ (রঃ) কে অতীব আদবের সাথে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হুজুর! আপনার শারীরিক অবস্থা আমাদের নিকট ভাল মনে হইতেছে না। খোদা না করুন, আল্লাহপাক যদি আপনাকে দুনিয়া হইতে তুলিয়া লন তাহা হইলে আপনার পরে কে আমাদের খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দান করিবে?" উত্তরে তিনি বলিলেন, "তোমরা শাদে দেলকে ডাক। আমি তাহাকে বলিয়া দেই। সে-ই তোমাদেরকে আমার পরে উপদেশ দান করিবে।" এই কথা শুনিয়া সকলেই আশ্চার্যান্বিত হইলেন। কারণ শাদে দেল একজন অগ্নী পূজক। তবে সে হযরত ইউসুফ (রঃ) ছাহেবের প্রতি অতিশয় ভক্তি ও শ্রদ্ধা রাখিত। দীর্ঘদিন সে হযরত ইউসুফ (রঃ) ছাহেবের খেদমত করিয়াছিল।

যাহাই হোক, যখন বলা হইল তোমরা অগ্নি পূজক শাদে দেলকে ডাক তখন বিজ্ঞ আলেমদের সকলেই অবাক হইয়া পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিল, "হুজুর অসুস্থতার চাপে হয়তো এমন বলিয়াছেন।" কিছু সময় পরে পুনরায় যখন তাহাকে একই প্রশ্ন করা হইল, উত্তরে তিনি আবারও শাদে দেল নামক সেই অগ্নিপূজককে ডাকিতে বলিলেন। কাল বিলম্ব না করিয়া শাদে দেলকে ডাকিয়া আনা হইল। হযরত ইউসুফ (রঃ) ছাহেব শাদে দেলকে নিকটে বসাইয়া উপদেশ প্রদান কালে বলিলেন, "বাবা আমি আর ২/১ দিনের মধ্যেই দুনিয়া ছাড়িয়া মহান খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে চলিয়া যাইব। আমার ইন্তেকালের তিনদিন পরে যে মঞ্চে দাঁড়াইয়া আমি সকলকে উপদেশ দান করিতাম, সেখানে দাঁড়াইয়া তুমিও তাহাদেরকে উপদেশ দান করিবে।"

নির্ধারিত সময়ে হযরত ইউসুফ (রঃ) ছাহেব দুনিয়া ত্যাগ করিয়া দারুল বাকায় তাশরীফ নিলেন। তিনদিন অতিবাহিত হইল। সকল মুরীদের হৃদয়ে একই ভাবনা! একজন অগ্নিপূজক যিনি এখনও কাফেরী পৈতা ও কাফেরী টুপী ত্যাগ করেন নাই তিনি আজ মঞ্চে দাঁড়াইয়া লক্ষ লক্ষ জাকের ভাইদের উদ্দেশ্যে নসিহত দান করিবেন। সকলেই ভারাক্রান্ত মনে ওয়াজের মাঠে প্রতীক্ষায় আছেন সেই অগ্নি পূজকের উপদেশ শুনিবার জন্য। ঠিক সময়ে শাদে দেল ধীর পদক্ষেপে মঞ্চে উঠিলেন। তাহার শরীরে তখনও পৈতা এবং মাথায় কাফেরী টুপী। সমস্ত মাঠ নীরব নিস্তব্ধ। কোন সাড়া শব্দ নাই। সকলেরই হৃদয় সেই অগ্নি পূজকের দিকে। কি বলিবেন তিনি আজ, তাহাই শুনিবার প্রতীক্ষায় সবাই। শুরুতেই অগ্নিপূজক বলিলেন, "মাত্র তিনদিন গত হইল, আমরা আমাদের আধ্যাত্বিক গুরুকে হারাইয়াছি। তিনি আর আমাদের মধ্যে নাই, দারুল বাকায় তশরীফ লইয়াছেন। তাই সকলের হৃদয়ই ভারাক্রান্ত, আপন পীরের বিচ্ছেদ ব্যথায় কাতর, কাজেই আমি আজ মাত্র দু-একটা কথা বলিব। আমার দিকে আপনারা তাকাইয়া দেখেন। আমি এখনও মুসলমান হই নাই। আমার গলায় পৈতা, মাথায় বিধর্মীদের টুপী। আমি আপনাদের সকলকে সাক্ষী রাখিয়া এই মুহূর্তেই মুসলমান হইতেছি। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, অহদাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। কলেমা শাহাদাত পাঠান্তে তিনি তাহার শরীরের পৈতা ছিড়িয়া ফেলিলেন এবং কাফেরী টুপী দূরে নিক্ষেপ করিলেন। তৎপর উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যেই বলিলেন, আপনারা যদি হাশরের মাঠে খোদাতালায়ার সাথে সাক্ষাৎ করিতে চান, তাহা হইলে আমি যেমন পৈতা এবং টুপী দূরে নিক্ষেপ করিলাম, তেমনি আপনারা আপনাদের প্রত্যেকের দেলের পৈতা এবং কাফেরী টুপীকে দূরে নিক্ষেপ করুন। ইহা শুনিয়া সকলেই অঝর নয়নে কাঁদিতে লাগিলেন।

কাজেই তোমরা যদি খোদাতালায়াকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার রেজামন্দি লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে হযরত খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কদমকে শক্ত করিয়া ধর। তাহার নির্দেশিত পথে কঠোর রিয়াজত করিয়া তোমাদের অন্তরের ফেরাউনী স্বভাব রূপ পৈতা এবং কাফেরী টুপীকে দূরে নিক্ষেপ কর। তাহা হইলে তোমরা মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইতে পারিবে।

আমার পীর কেবলাজানকে দুনিয়ার মানুষ চিনিতে পারে নাই। তিনি যে কত বড় দরজার ওলী ছিলেন, তাহা মাপকাঠিতে আনাও সম্ভব নয়। একদিনের একটি ঘটনা তোমাদের বলি। একবার আমি আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কদমে বেশ কয়েকদিন যাবৎ খেদমতে ছিলাম। মাঝে মাঝে পীর কেবলাজান আমাদেরকে তরীকত, হকিকত এবং মারেফাত প্রসংগে নসিহত প্রদান করিতেন। একদিন পীর কেবলাজানের চতুপার্শ্বে আমরা দন্ডায়মান অবস্থায় আছি। এমন সময় একজন লোক এক ঝাঁকা ফজলি আম মাথায় করিয়া হুজুর কেবলাজানের কদমে হাজির হইলেন। হুজুর কেবলাজান জিজ্ঞাসা করিলেন, "বাবা, এতগুলো আম আপনি আমার জন্য আনিলেন। আপনি কি আমার মুরীদ?" আগন্তক লোকটি উত্তরে বলিলেন, হুজুর! আমি আপনার মুরীদ নই। তবে যে এই আমগুলো নজরানা স্বরূপ আপনার কদমে হাজির করিয়াছি, তাহার কারণ ব্যাখ্যা করিতেছি, শুনুন। আগন্তক বলিলেন, আমাদের বাড়ীতে বিরাটাকৃতির একটা আম গাছ আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই গাছে কোন আম ধরিতে দেখি নাই। বহু মাজারে, বহু দরবারে মানত করিয়াছি। কিন্তু গাছে ফল আসে নাই। অবশেষে মনে মনে বলিলাম, "হে মহান রাব্বুল আ'লামীন! আমাদের এই গাছটিতে যদি ফল ধরে, তবে তোমার বন্ধু, হযরত খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কদমে কিছু আম নজরানা স্বরূপ লইয়া যাইব। আল্লাহপাক দু'আ কবুল করিয়াছেন। আপনার অছিলায় আল্লাহপাক সেই গাছটিতে এত আম দান করিয়াছেন যে মনে হইতেছে, গাছের ডালগুলো ভাংগিয়া পড়িবে। ইহা শুনিয়া পীর কেবলাজান আমাকে নিকটে ডাকিয়া বলিলেন, "বাবা! গাছেও ওলী-আল্লাহদের চিনে, কিন্তু মানুষে চিনে না।"

তোমরা যদি খোদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিতে চাও, খোদাতায়ালার নূরে তোমাদের হৃদয়কে আলোকিত করিতে চাও, তবে হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কদম শক্ত করিয়া ধর। তিনি যে সমস্ত নেয়ামত তোমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন সেই সকল নেয়ামত লাভের জন্য কঠিন রেয়াজত কর, তাহা হইলে মাঞ্জিলে মাছুদে তোমরা পৌঁছাইতে পারিবে; সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। বিনা চেষ্টায় খোদাতায়ালাকে কেউ পায় নাই; কেউ পাবেও না। তোমরা অবিরাম চেষ্টা সাধনা করিতে থাক তোমাদের তৌহিদে অজুদীকে বুঝিবার জন্য। 'তৌহিদে অজুদী' কোটি কোটি নূরের বাল্ব প্রজ্জলিত এক দেহ। এই জড় দেহ ধ্বংস হওয়ার পর তৌহিদে অজুদীর দেহ প্রাপ্ত হওয়া যায়। তবে ইহার জন্য কঠিন পরিশ্রমের প্রয়োজন। তোমরা জেকের, রাবেতা, মুরাকাবা, শোগল ও মুহাসাবা ঠিক ঠিক মত প্রতিপালন কর। পীরে কামেলের দু'আর বরকতে, তাঁহার তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে তোমাদের মুর্দা দেল জিন্দা হইয়া আল্লাহর দিক হইবে। তোমরা নিদ্রামগ্ন অবস্থায় স্বপ্নে বিচরণ কর। কত দেশ ঘুরিয়া বেড়াও। কত কি কাজ কর। কিন্তু ঘুম হইতে জাগিয়া বুঝিতে পার যে এতক্ষণ তুমি স্বপ্ন দেখিয়াছ। স্বপ্নের মধ্যে তুমি যে শরীর লইয়া ভ্রমণ করিলে, কত কি কাজ করিলে, উহা কোন্ শরীর? এই শরীরকে তোমরা বুঝিতে পারিবে যখন তৌহিদে অজুদীকে বুঝিবে। আশেক কবি বলেন,

"মানুষেরই ভিতরে মানুষ

তার ভিতরে আছেন সাঁই।"

আল্লাহপাক তৌহিদে অজুদীর রাজ্যে কোটি কোটি লতিফা দ্বারা সুসজ্জিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত এক দেহ তৈরী করিয়া রাখিয়াছেন। এই দেহ যদি তোমরা লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে মহা ওলী খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের সত্য তরীকাকে শক্ত করিয়া ধরিয়া তাহাকে ধ্যান-ধারণার পথে অনুসন্ধান কর। "আলা ইন্না আউলিয়াল্লাহে লা ইয়া মুতু।" সাবধান! নিশ্চয় ওলী-আল্লাহদের মৃত্যু নাই। তাহার তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলে তোমাদের আত্মা জিন্দা হইয়া অমরত্ব লাভ করিবে। চিরদিনই জিন্দা থাকিবে। এই আত্মার আর মৃত্যু নাই।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD