Logo

খোদা প্রাপ্তির পথে পীরে কামেল এক অমূল্য দান

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৫ জুলাই, ২০২৬, ২০:১১
খোদা প্রাপ্তির পথে পীরে কামেল এক অমূল্য দান
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত সুলতানুল আজকার ও নাফী-এসবাত জেকের بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় নাফী-এসবাত জেকেরের গুরুত্ব, নাফী-এসবাত জেকেরের নিয়মাবলী এবং এই জেকেরের ফয়েয হাসিলে পীরে কামেলের ভূমিকা সম্পর্কিত আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

হে তামাম জাকেরান! তোমরা জানিয়া রাখ, খোদা প্রাপ্তির পথে পীরে-কামেল এক অমূল্য দান, যিনির তাওয়াজ্জুহ বলেতে মুর্দা দেল জিন্দা হয় এবং দেলে আল্লাহর জেকের পয়দা হয়। তাই আরেফে কামেল, মুর্শেদে মুকাম্মেল, হাদিয়ে আগা, দ্বীন-দুনিয়ার রহমত, আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর ভেদের সমুদ্র, যাহার খেদমতের দ্বারা কত লক্ষ লক্ষ মুর্দা দেল জিন্দা হইয়া তাহাতে আল্লাহর জেকের পয়দা হইতেছে, সেই খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) মুরীদবর্গকে কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা ও নাফস-এই ছয় লতিফার জেকের শিক্ষা দিতেন। মুরীদবর্গকে বলিতেন, "তোমরা পীরের ছয় লতিফার সাথে তোমাদের ছয় লতিফা মিশাও, তাহা হইলে দেল জিন্দা হইবে, তদসংগে রূহ, সের, খফি, আখফা ও নাক্স-জিন্দা হইয়া আল্লাহর দিক হইবে। তখন প্রত্যেক লতিফার উরুজ ও ছায়ের তোমরা শিক্ষা করিতে পারিবে।" এই উরুজ পীরে কামেলের দয়া ছাড়া শিক্ষা করা কোন দিনই সম্ভব নয়। তাই পীরে কামেলের দেলের সহিত দেল মিশাইয়া তাহার কালব, রূহ, সের, খফি এবং আখফার সহিত মুরীদের কালব, রূহ, সের, খফি এবং আখফা মিশাইলে প্রত্যেক লতিফাতে আল্লাহর জেকের পয়দা হয়। নিয়মিত পরিশ্রমের দ্বারা এই সমস্ত শিক্ষা করিতে হয়।

তোমরা যদি খোদপ্রাপ্তি তত্ত্ব হাসিল করিতে চাও, হর হর লতিফায় যদি জেকের পয়দা করিতে চাও, তাহা হইলে খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের পাক কদম মুবারক জড়াইয়া ধরিয়া, কঠিন রেয়াজতের দ্বারা এই সমস্ত লতিফা জিন্দা কর। কঠিন রেয়াজত ছাড়া এই সমস্ত লতিফা জিন্দা হওয়া সম্ভব নয়। তাই পীরে কামেল খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাসিলের পথের পথিকদিগকে কঠিন খেদমত ও তদসংগে কম খাওয়া, কম কথা বলা, কম ঘুম পাড়া- এই সমস্ত রেয়াজত শিক্ষা দিয়া থাকেন।

এই ছয় লতিফার জেকের যখন শিক্ষা দেওয়া হয়, তদসংগে সংযোজন করা হয়, আর এক প্রকারের জেকের যাহাকে 'নাফী-এসবাত' জেকের বলা হয়। নাফী-এসবাত জেকের-কলেমা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।" এই জেকের 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'-প্রত্যেক লতিফায় সংযোজন করিয়া দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

নাফী-এসবাত জেকেরের দ্বারা সমস্ত লতিফা অর্থাৎ মাথার চান্দি থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত কোটি কোটি লতিফা জিন্দা হয় এবং আল্লাহতায়ালার তাজাল্লী দ্বারা রৌশন হয়।

নাফী-এসবাত জেকের-প্রথমে নাভি হইতে 'লা' ঊর্ধ্ব দিকে দম টানিয়া সাততলা আসমানের উপর আরশ পর্যন্ত উঠাইতে হয়, তৎপর 'ইলা-হা' রূহে এবং সেরের ভিতরে সংযোগ করিয়া 'ইল্লাল্লাহ' শব্দকে খফি এবং আখফার ভিতর দিয়া 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্' বলিয়া মূল কেন্দ্র কালব-এ দম ফেলিতে হয়। এই ভাবে দম বন্ধ করিয়া তিনবার, পাঁচবার, সাতবার জেকের করিতে করিতে একুশ (২১) বার পর্যন্ত দম বন্ধ করিয়া জেকের করা শিক্ষা করিতে হইবে। তখন কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাক্স এবং তদসংগে পীরে কামেল সংযোগ করিবেন আব, আতস, খাক ও বাদ। তখন দশ লতিফায় নাফী-এসবাত জেকের করিতে হইবে এবং চলিতে থাকিবে। এই নাফী-এসবাত জেকেরের দ্বারা কাল্ব হইতে রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক ও বাদ আল্লাহর জেকেরের গড়ে ডুবিয়া যাইবে। তখন গোনাহর পাহাড়, গোনাহর তাছির, গোনাহ্র অন্ধকার, গোনাহ্ জুলমত কিছুই থাকিতে পারিবে না।

লা মাকছুদা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; লা-ফায়েলা ইল্লাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ; লা-মাহবুবা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; লা মাওজুদা ইল্লাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

বিজ্ঞাপন

তখন পীরে কামেল এক এক সময় এক এক রকম নাফী-এসবাত জেকের শিক্ষা দিয়া মুরীদকে মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইয়া দেন। তাই বলা হয়, পীরের মত দরদী কেউ নাই, আর কেউ হইবেও না। যদি তোমরা খোদা প্রাপ্তি তত্ত্ব হাসিল করিতে চাও, তবে পীরে কামেলের কদমে নেছার হইয়া যাও।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পর হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেবের মত কামেল মুকাম্মেল ওলী আর আসেন নাই। তাই হে জাকেরগণ! সত্য তরীকার রজ্জু শক্ত করিয়া ধর। কঠিন পরিশ্রমের দ্বারা, কঠিন রেয়াজতের দ্বারা পীরের প্রেম এবং তরীকতের ফয়েজ হাসিল কর। মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইবার জন্য বিশেষ চেষ্টাবান হও। খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব তোমাদের জন্য এই অপূর্ব নেয়ামতের ডালা রাখিয়া গিয়াছেন। সেই নেয়ামতের ডালা হইতে অফুরন্ত নেয়ামত তোমাদিগকে শিক্ষা দেওয়া হইতেছে, দান করা হইতেছে।

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, ছয় লতিফার এসমে জাত জেকের সমাপনান্তে নাফী-এসবাতের জেকের শিক্ষা দেওয়া হয়। এই নাফী-এসবাত জেকেরের চাকা যখন ঘুরিতে থাকিবে, তখন আসমান-জমিন আল্লাহর জেকেরে পরিপূর্ণ হইবে এবং আল্লাহর জেকের ছাড়া তোমার কানে আর তখন কিছুই আসিবে না। পাক কালামে প্রকাশঃ

বিজ্ঞাপন

يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوتِ وَ مَا فِي الْأَرْضِ

অর্থাৎ- "সাততলা আসমান ও জমিনের ভিতর যাহা কিছু আছে সকলই মহা ধুমধামে আল্লাহর জেকের করিতেছে।" (সূরা জুমু'আঃ ১) তখন তুমি ইহা বুঝিতে পারিবে। তাই মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন,

بذكرش هر چه بینی در خروش است ولی داند در معنی که گوش است

বিজ্ঞাপন

উচ্চারণঃ

"বজেকরাশ হার চেবিনি দার খোরুশ্ আস্ত,

ওয়ালে দানাত দরি মানি কে গোশ্ আস্ত।"

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- আকাশে, বাতাসে, গ্রহে, নক্ষত্রে, প্রতি রেণু পরমাণুতে আল্লাহর জেকের হইতেছে। যদি তুমি শুনিতে চাও, তোমার দেলের কানকে পরিস্কার কর। তাহা হইলে তুমি শুনিতে পারিবে-মহাধুমধামের সংগে আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্র, প্রতি রেণু পরমাণুতে আল্লাহর জেকের হইতেছে।

নাফী-এসবাত জেকের খোদাপ্রাপ্তির পথে অত্যন্ত উঁচু স্তরের বন্দেগী বা ওজিফা। নাফী-এসবাত ব্যতীত আল্লাহতায়ালার কুর্ব হাসিল করিতে কেহ পারে নাই-কেহ পারিবেও না। এই নাফী-এসবাত জেকের পীরে কামেল তাহার তাওয়াজ্জুহ শক্তি দ্বারা শিক্ষা দিয়া থাকেন।

তাই তাছাউফের যে কোন মাকামে তুমি থাক না কেন, নাফী-এসবাত জেকেরের মাধ্যমে সেই দায়েরা আল্লাহর তাজালী' দ্বারা রৌশন হইবে এবং হর হর মুকামাত এবং ফানা বাকার মাকাম পর্যন্ত আল্লাহর তাজাল্লী দ্বারা রৌশন হইবে এবং সমস্ত মুকামাতের নূর তুমি হাসিল করিতে সক্ষম হইবে।

বিজ্ঞাপন

তুমি ছয় লতিফা হইতে আরম্ভ করিয়া যে কোন দায়েরা' উরুজ-ছায়ের কর না কেন, সেখানে কলেমা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'-এই জেকেরের রজ্জু ধরিয়া তোমাকে গমন করিতে হইবে। ছয় লতিফা হইতে আরম্ভ করিয়া আব, আতস, খাক, বাদ, সর্ব শরীরের ছবক, দায়েরায়ে এমকান, দায়েরায়ে আয়াল, দায়েরায়ে মুনাম্বেভ, আলমে খালক, আলমে আমর, বেলায়েত কোবরা, আকরাবিয়াতের মাকাম, তুমি যেখানেই গমন কর না কেন, এই নাফী-এসবাত জেকেরের দ্বারা তোমাকে গমন করিতে হইবে। ইহার কোন বিকল্প নাই।

তাই নাফী-এসবাত জেকের খোদা প্রাপ্তির পথে বিরাট এক অধ্যায়। উরুজ-ছায়ের, ফানা, বাকা, তুমি যেখানেই যাও, সেখানেই এই নাফী-এসবাত জেকেরের দ্বারা উন্নতি করিতে হইবে। এই নাফী-এসবাত জেকের পীরে কামেলের আদেশ নিষেধ পালনের ভিতর দিয়া কঠিন খেদমতের মাধ্যমে শিক্ষা করিতে হয়।

তাই হে জাকেরান! পীরে কামেল মুকাম্মেল ওলী ব্যতীত এই নাফী-এসবাত জেকের শিক্ষা করিবার কোন উপায় নাই। পীরে কামেলের এই অপূর্ব দানের বদলা দিবারও কাহারোও কোন ক্ষমতা নাই। তাই মহাকবি হাফেজ (রঃ) বলিয়াছেন, "আমার পীরের কপালের একটা কালো তিলের পরিবর্তে আমি সমরখন্দ এবং বোখারার সিংহাসনকে বিলাইয়া দিতে পারি।"

বিজ্ঞাপন

দুনিয়া হইতে যদি খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব জ্ঞান হাসিল করিতে চাও, তাহা হইলে পীরে কামেলের চরণে তোমার জানকে নেছার কর। পীরকে তোমার ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে এমন কি তোমার নিজের চেয়েও বেশী ভালবাস। দুধের সংগে চিনি মিশাইলে যেমন এক উত্তম লজ্জতের সৃষ্টি হয়, তেমনি তুমি তোমার পীরের দেলের সাথে নিজের দেলকে মিশাও, তাহা হইলে এমনি এক উত্তম লজ্জতের সৃষ্টি হইবে, হাফেজ বলেন, "যে লজ্জত বেহেশতেও মিলিবে না।"

তোমরা ওলী-আল্লাহর জীবনী দেখ। ওলী-আল্লাহ সকল পীরে কামেলের কি রকম খেদমত করিয়াছেন তোমরা তাহা বুঝিতে পারিবে।

একজন বার বৎসর পীরে কামেলের খেদমত করিলেন। বার (১২) বৎসর পর পীরে কামেল তাহাকে বলিলেন, "বাবা, তুমি বার বৎসর খেদমত করিলে, তোমাকে কি দিব।" তিনি একটা ছেঁড়া চটি জুতা মুরীদের হাতে দিয়া বলিলেন, "বাবা, তুমি এই ছেঁড়া চটি জুতাটা নিয়ে যাও।" মুরীদ এই ছেড়া চটি জুতাতে খুশী হইল না। সে ইহার মর্তবা উপলব্ধি করিতে পারিল না। চটি জুতাসহ মুরীদ বাড়ীর দিকে রওয়ানা হইল। কিছুদূর যাওয়ার পর পথিমধ্যে তাহার এক পীর ভাইয়ের সাথে দেখা হইল। সেই পীর ভাই ছিলেন এক জমিদার। পীরের অত্যন্ত দেলী মুরীদ ছিলেন তিনি। দরবার শরীফের খাদেমকে দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, "আপনি কোথা হইতে আসিলেন?" সেই খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আমি দরবার শরীফ হইতে আসিলাম।

বিজ্ঞাপন

কেবলাজান আমাকে বিদায় দিয়াছেন।" জমিদার ছাহেব বলিলেন, "কতদিন পর আসিলেন?" খাদেম ছাহেব উত্তর দিলেন, "বার বৎসর পর।" তখন জমিদার ছাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, "বার বৎসর খেদমত করিলেন হযরত পীর কেবলাজান আপনাকে কি দিলেন?" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আমার কপাল মন্দ, পোড়া কপাল আমার। কেবলাজান হুজুর কি দিবেন আমাকে, একটা ছেঁড়া চটি জুতা দিয়াছেন।" জমিদার ছাহেব বুঝিতে পারিলেন যে খাদেম ছাহেব এই জুতার উপর খুশী হইতে পারেন নাই। তখন জমিদার ছাহেব বলিলেন, "ভাই আমার বাড়ী নিকটেই, অল্প একটু দূরে। আপনি যাবেন আমার বাড়ীতে। আমি আপনাকে জিয়াফত করিলাম।" জমিদার ছাহেব তাহাকে বাড়ীতে লইয়া গেলেন এবং অতীব যত্নের সংগে তিনি নিজেই খাদেম হইয়া তাহাকে খাওয়াইলেন। অতিথিসেবার পরে খুবই মহব্বত এবং যত্নের সংগে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, "ভাই, এই ছেঁড়া চটি জুতা মুবারক দিয়া আপনি কি করিবেন? খাদেম ছাহেব বলিলেন, "এই ছেঁড়া চটি জুতা দিয়া আমি কি করিবো।

পীর কেবলাজান দিয়াছেন, তাই ঘরে নিয়া রাখিয়া দিব।" তখন জমিদার ছাহেব বিনীত ভাবে বলিলেন,

"কোন কাজই যদি জুতা মুবারক দিয়া আপনি না করেন, তবে দয়া করিয়া উহা আমাকে দিয়া দেন।" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "লইয়া যান।" জমিদার ছাহেব বলিলেন, "এই জুতা মুবারকের দাম কত দিলে আপনি খুশী হইবেন?" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আপনি যা কিছু দেন রাস্তা খরচ চলিবে।" তিনি একান্ত অনুরোধের সংগে বলিলেন, "ভাই, এই ছেঁড়া চটি জুতা মুবারক আপনার দীর্ঘ বার বছরের খেদমতের ফল। আমি ইহা অল্প দামে গ্রহণ করিব না। যদি আপনি আমার কাছে কিছু চান তবে ভাল হয়।" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আপনার যাহা ইচ্ছা হয় তাহাই দেন। কিই-বা আমি চাইব। কতইবা ইহার দাম। যা ইচ্ছা করে দেন, তাতেই হইবে। আমি জানি এই জুতা অন্য কেউ লইবে না, এর দামও নাই।" জমিদার ছাহেব বলিলেন, "জুতা মুবারক যদি ইচ্ছা করিয়া আমাকে দেন-ই তবে নিজ হাতে উঠাইয়া দেন। আমি নিজ হাতে উঠাইয়া লইব না।

বিজ্ঞাপন

কারণ ইহা আপনার বার বছরের পরিশ্রমের ফল। আপনি দয়া করিয়া আমার হাতে উঠাইয়া দিন।" খাদেম জুতা মুবারক লইয়া জমিদারের হাতে উঠাইয়া দিলেন। জমিদার অতি মহব্বতের সংগে, অতীব আদবের সাথে জুতা মুবারক হাতে লইয়া বহুবার চুম্বন খাওয়ার পর মাথায় করিয়া বাড়ীর ভিতর তাহার শয়ন কক্ষে লইয়া গেলেন এবং বিবিকে বলিলেন, "একটা চাদর বিছাইয়া দাও। আমি জুতা মুবারক চাদরের উপর রাখিব। পীর কেবলাজানের জুতা মুবারক। ইহা যেখানে সেখানে রাখা যায় না।" চাদর বিছানো হইল। সেই জুতা মুবারক আতর গোলাপ দিয়া চাদরের উপর রাখিয়া দিলেন এবং বিবিকে বলিলেন, "বিবি, সিন্দুক খুলিয়া কিছু টাকা দাও।" বিবি বলিলেন, "কত টাকা দিব?” জমিদার বলিলেন, "হাজারী সত্তরটা তোড়া বাহির কর।

কারণ এই জুতা মোবারকের দাম দেওয়ার ক্ষমতা কাহারোও নাই। তামাম পৃথিবী বিক্রয় করিলেও এই জুতার দাম হইবে না।" বিবি সত্তরটা তোড়া বাহির করিয়া তাহার স্বামী জমিদারের হাতে দিয়া দিলেন। জমিদার সেই টাকা লইয়া খাদেম ছাহেবের কাছে গেলেন এবং বিনীতভাবে বলিলেন, "ভাই, এই জুতা মুবারকের দাম দেওয়ার ক্ষমতা তো কাহারো নাই। আমি মিছকিন হালাতে যা দিতেছি দয়া করিয়া গ্রহণ করেন। এই বলিয়া ৭০ হাজার টাকা খাদেম ছাহেবের হাতে দিলেন।" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "এত টাকা কেন আপনি আমাকে দিলেন, এর দাম কি এত হবে?" জমিদার বিনীতভাবে বলিলেন, "আপনি দয়া করিয়া কবুল করেন। তবে এত টাকা লইয়াতো আপনি একা যাইতে পারিবেন না। তাই আমি চারজন সশস্ত্র বরকনদাজ (গার্ড) আপনার সংগে দিতেছি। কারণ পথিমধ্যে দস্যুরা আপনাকে মারিয়া ফেলিতে পারে। খাদেম ভাবিতে লাগিলেন, কিন্তু রহস্য কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। জমিদার ছাহেব কেনই বা এত টাকা তাহাকে দিলেন। কোন বিপদে ফেলিবার অভিসন্ধি আছে কি না কিছুই ভাবিয়া পাইলেন না।

জমিদার ছাহেব চারজন বরকনদাজকে বলিলেন, "যাও আমার পীর ভাইয়ের সংগে। সত্তর হাজার টাকা দিয়া দিলাম। যাট হাজার টাকা দিয়া জমিদারী ক্রয় করিয়া দিও এবং দশ হাজার টাকা দিয়া বাড়ী করিয়া দিও। তাহাকে লইয়া যাও আদবের সাথে। কোন বেয়াদবী যেন না হয়। প্রয়োজন হইলে আরোও ২/১ হাজার টাকা নিও।"

খাদেম ছাহেব চারজন বরকনদাজসহ টাকা লইয়া চলিয়া গেলেন। বাড়ী যাওয়ার পর ষাট হাজার টাকা দিয়া জমিদারী ক্রয় করিলেন এবং ১০ (দশ) হাজার টাকা দিয়া বাড়ী করিলেন। খাদেম দুনিয়া দারিতে পূর্ণ সুখী হইলেন।

অন্য দিকে জমিদার ছাহেব সেই ছেঁড়া চটি জুতা মুবারককে একটা বালিশের ভিতর ভরিয়া রাত্রিতে শয়নকালে ঐ বালিশ শিয়রে দিয়া শুইয়া থাকিতেন। আর হর রাত্রিতে তিনি স্বপ্নে দেখিতেন তাহার পীর কেবলাজানকে। তিনি দেখিতেন তাহার পীর কেবলাজান আসিয়া তাহাকে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তরীকতের নিয়ম কানুন শিখান। মাত্র কয়েক দিনের ভিতর তাহার পীর ছাহেব তাহাকে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তরীকতের নিয়ম-পদ্ধতি শিখাইয়া মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইয়া দিলেন, যেমন বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) ছাহেব একটা চোরকে তাওয়াজ্জু-এ-এত্তেহাদীর দ্বারা অল্পক্ষণের ভিতরে ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দিয়াছিলেন।

এরপর জমিদারের বাড়ীতে লোকজন আসা শুরু করিল। জমিদার মুরীদ করিতে লাগিলেন। মুরীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অল্প দিনের মধ্যেই দরবার বড় হইল যেন সেই পূর্বের পীরের দরবার। কিছুদিন পর খাদেম ভাবিল, "একটা ছেঁড়া চটি জুতার বদলে এতগুলো টাকা আমাকে দিয়া দিল, সেই আহম্মকের অবস্থা কি আমি গিয়া দেখিব।" তাই তিনি গেলেন এবং যাহা দেখিতে পাইলেন তাহাতে আশ্চর্য হইলেন। যেন তাহার পীরের দরবার। দৈনিক হাজার হাজার মানুষ আসিতেছে। হাজার হাজার টাকা নজরানা দিতেছে। মুরীদ হইতেছে। জেকের আজকার করিতেছে। সেই বিশাল কর্মকান্ড যাহা তাহার পীরের দরবারে ছিল। তিনি সত্তর হাজার টাকা দিয়াছিলেন। আর প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা স্রোতের মত আসিতেছে। দেখিয়া খাদেম ছাহেব অবাক হইলেন।

খাদেম ছাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, "ভাই, এই অপূর্ব বাজার আপনি কেমনে মিলাইলেন? যাহা হযরত কেবলাজানের দরবারে দেখিয়াছিলাম তাহা সবই আপনার দরবারেই দেখিতেছি। কি ভাবে আপনি ইহা তৈরী করিলেন?" জমিদার বলিলেন, "ভাই, ইহা তো আপনিই দিয়াছেন। আপনি যে ছেঁড়া চটি জুতা দিয়াছিলেন সেই জুতা মুবারক বালিশের ভিতর ভরিয়া শিয়রে দিয়া শুইয়া থাকিতাম। তখন হযরত পীর কেবলাজান হর রাত্রিতে স্বপ্নযোগে আসিয়া তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তরীকতের নিয়ম পদ্ধতি শিখাইতেন। এই ভাবে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা আমাকে মাঞ্জিলে মাঞ্জুদে পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। তারপর থেকেই আল্লাহপাকের এই বিশাল দান।"

তাই বলি, হে জাকেরগণ! পীরের মহব্বত অর্জন করিয়া কেউবা দ্বীন-দুনিয়ার বাদশাহ হয়। আবার পীরের ইশারা না বুঝিয়া কেউবা দ্বীন ও দুনিয়া-উভয়ই হারায়।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD