Logo

জ্ঞানের স্বরূপ, জ্ঞানের প্রকারভেদ, সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞানের বিশ্লেষণ

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৭ জুলাই, ২০২৬, ২০:০৭
জ্ঞানের স্বরূপ, জ্ঞানের প্রকারভেদ, সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞানের বিশ্লেষণ
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত সুলতানুল আজকার ও নাফী-এসবাত জেকের بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ জ্ঞানের স্বরূপ, জ্ঞানের প্রকারভেদ এবং সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞানের বিশ্লেষণ। তদুপরি হযরত শেখ ছাদী (রাঃ) ছাহেবের বাণী "বর্গে দারাখতানে ছবজে দার নজরে হুশিয়ার; হর ওয়ারাকে দাফতরিস্ত মারেফতে কেরদেগার।" এর তাৎপর্য ব্যাখ্যাঃ

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীখ্যাত সূফী সাধক ও আধ্যাত্মিক কবি হযরত শেখ ছাদী (রঃ) ছাহেব তৎপ্রণীত কিতাবে লিখিয়াছেন-

برگ درختان سبز در نظر هوشیار

هر ورق دفتر يست معرفت کردگار

বিজ্ঞাপন

উচ্চারণঃ

"বর্গে দারাখতানে ছবজে দার নজরে হুশিয়ার;

হর ওয়ারাকে দাফতরিস্ত মারেফতে কেরদেগার"

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-হে প্রভু! তোমাকে চিনিবার জন্য সহস্র খন্ড হাদীস বা দর্শনশাস্ত্র অধ্যায়নের কোন প্রয়োজনই নাই। ঐ যে সবুজ বৃক্ষের সবুজ পত্রের অসংখ্য রেণু-পরমাণু, যাহা সর্বদাই তোমার তাসবীহ পাঠে রত; যাহাদের দিব্য চক্ষু বা জ্ঞান চক্ষু খুলিয়াছে, তাহাদের জন্য তোমাকে চিনিবার পথে পত্রস্থিত প্রত্যেকটি রেণু-পরমাণুই এক একটি গ্রন্থ তুল্য।

হযরত শেখ ছাদী (রঃ) ছাহেবের এই বাণীর তাৎপর্য কি? জ্ঞানের কোন স্তরে উপনীত হইলে উল্লিখিত কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করা যায়?

আলোচনার প্রারম্ভে জ্ঞানের স্বরূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। জ্ঞান কি? অচেনাকে চেনা, অজানাকে জানা, অদেখাকে দেখিবার প্রচেষ্টাই জ্ঞান। অচেনাকে চিনিবার বা অদেখাকে দেখিবার প্রচেষ্টার যাবতীয় উপকরণ দিয়া আল্লাহপাক মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন। খোদাপ্রদত্ত উপকরণাদির উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে, আল্লাহ ও রাসূলের প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীমের পথে চলিয়া মানুষ যাহাতে জ্ঞানের পূর্ণতা অর্জন করিয়া স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছাইতে পারে, সেই জন্য তদীয় হাবীবের চরিত্রে চরিত্রবান করিয়া আল্লাহপাক যুগে যুগে ওলীয়ে কামেলসকলকে প্রেরণ করিতেছেন। আল্লাহপাক নিজ পরিচয় প্রদানের জন্য, নিজের মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব, গৌরব, মহিমা, গরিমা ও প্রভুত্বকে প্রকাশের জন্য মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। মানুষের কর্তব্য খোদাতায়ালার পরিচয় গ্রহণে সচেষ্ট হওয়া ও নিজেকে পরিচয় গ্রহণের যোগ্য করিয়া তোলা।

বিজ্ঞাপন

সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব, পবিত্র আল-কুরআনে সর্বপ্রথম যে পাঁচটি আয়াত নাযিল হয়, সেই আয়াতগুলি হইল-

اقْرَا بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَ رَبُّكَ الأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَالَمْ

يَعْلَمْ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"পাঠ কর, তোমার সেই প্রভুর নামে-যিনি সমস্ত সৃষ্টি করিয়াছেন। যিনি এক বিন্দু রক্ত হইতে মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন। পাঠ কর-তোমার সেই মহামহিম প্রভুর নামে, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়াছেন। যিনি মানুষকে অনুগ্রহ করিয়া অজ্ঞাতপূর্ব জ্ঞান দান করিয়াছেন।"

উপরোক্ত এই আয়াতসমূহের তাৎপর্য ব্যাপক। আয়াত কয়টিতে মূল তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। ১। স্রষ্টা ২। জ্ঞান ও ৩। মানুষ। অর্থাৎ আল্লাহপাক মানুষকে জ্ঞান দান করিয়াছেন। কিন্তু কেন? কারণ, এই জ্ঞানের বাহনে চড়িয়া মানুষ স্রষ্টার নিকট থেকে নিকটতর হইবে, পরিচিতি লাভ করিবে। পবিত্র কুরআনে সর্বপ্রথম যে শব্দটি আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট নাযিল করিলেন, তাহা হইল 'ইক্করা' অর্থাৎ পাঠ কর। যাহার তাৎপর্য হইল জ্ঞান অর্জন কর। মহা পবিত্র গ্রন্থের মাধ্যমে সর্বপ্রথম আল্লাহপাক জ্ঞান অর্জনের তাগিদ দিলেন এই জ্ঞানের কারণেই মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত'।

আল্লাহপাক মানুষ সৃষ্টির প্রাক্কালে ফেরেশতাদের লইয়া বৈঠক করিলেন। সেই বৈঠকে ফেরেশতাসকল মানব সৃষ্টিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করিল। ইহাতে আল্লাহপাক তাহাদের উদ্দেশ্যে ব্যক্ত করিলেন, "আমি যাহা জানি, তোমরা তাহা জান না।" তৎপর আল্লাহপাক হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করিয়া তদীয় দেহে রূহ ফুকিয়া দিলেন এবং সিফাতে এলেমের নূরে বা জ্যোতিতে হযরত আদম (আঃ) এর কালব আলোকিত করিলেন। শুধু কালব নয়, হযরত আদম (আঃ) এর সমস্ত সত্ত্বা, সারা দেহ, খোদাতায়ালার সিফাতে এলেমের দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হইল। সেই এলেম সিফাতের নূর দর্শনে ফেরেশতারা হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা করিলেন। হযরত আদম (আঃ) শ্রেষ্ঠতম সম্মানে ভূষিত হইলেন, খোদাপ্রদত্ত এই জ্ঞান সম্পদেরই কারণে।

বিজ্ঞাপন

জ্ঞানই আল্লাহপাকের শ্রেষ্ঠতম দান। জ্ঞানের প্রশংসায় মহাকবি ফেরদৌসী বলেন,

"বিশ্ব প্রভুর দানের মধ্যে জ্ঞান সবচাইতে বেশি মূল্যবান, জ্ঞানের গুণ কীর্তন বদান্যতার পথে শ্রেষ্ঠ উপায়ন।

জ্ঞান সম্রাটের সম্রাট।

বিজ্ঞাপন

জ্ঞান সম্মানিতগণের অলংকার।

জেনে রাখ, জ্ঞান জীবনের পুঁজি।

জ্ঞান পথের দিশারী ও হৃদয় মুক্তকারী।"

বিজ্ঞাপন

যুগে যুগে পাপাসক্ত, অন্ধকারে নিমজ্জিত, আল্লাহ বিস্মৃত, দুনিয়ার মোহমায়ায় বন্দী মানব সমাজের হেদায়েতের জন্য হাজার হাজার নবী-রাসূল দুনিয়ায় আগমন করিয়া জ্ঞান প্রদীপের আলো দ্বারাই দুনিয়াবাসীদের পথ প্রদর্শন করিয়াছেন। প্রত্যেক নবী ও রাসূলকেই মহান খোদাতায়ালা আপন আপন পদ মর্যাদার ভিত্তিতে জ্ঞান প্রদান করিয়াছেন কিন্তু জ্ঞানের পরিপূর্ণতা দান করেন নাই। জ্ঞানের পরিপূর্ণতা, জ্ঞানের সমুদয় শাখায় বিচরণ করিবার ক্ষমতা, জ্ঞানের সমস্ত গুপ্ত কোঠায় অবাধ বিচরণের পারদর্শিতা মহান খোদাতায়ালা দয়া করিয়া তদীয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) কে দান করিয়াছেন। হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব বলেন, "অতি গুপ্ত ৩০ হাজার এলেম মেরাজ শরীফে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর কালব মুবারকে আমানত রাখা হইয়াছে।"

এলেমের এই অতি গুপ্তাংশ যাহা পূর্বের কোন নবী-রাসূলকে প্রদানমকরা হয় নাই; কেবলমাত্র নবী সম্রাট হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর মধ্যে সেই জ্ঞান গচ্ছিত রাখা হয়। কিন্তু রাসূলে পাক (সাঃ) সেই জ্ঞান তদীয় অত্যাধিক প্রিয় সাহাবা ও আসহাবে সোফাগণের কালবে রাখিয়া যান। আসহাবে সোফাগণ হইতে উক্ত জ্ঞান তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন, তরীকতের ইমামগণ, ওলীয়ে কামেল সকলের আত্মা পরম্পরায় আজও বর্তমান রহিয়াছে।

এই জ্ঞান বা এলেম বহুভাগে বিভক্ত। সমুদয় ভাগকে দুইটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হইয়াছে।

বিজ্ঞাপন

▶ সৃষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান বা এলমে হুছুলী।

▶ স্রষ্টা সম্পর্কিত জ্ঞান বা এলমে হুজুরী।

সৃষ্টিতত্ত্ব জ্ঞানের ক্ষেত্রঃ

বিজ্ঞাপন

সৃষ্টি জগত দুইভাগে বিভক্ত।

আলমে খালক বা স্কুল জগত এবং আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগত বা নূরের জগত। আলমে খালক ও আলমে আমরের মধ্যখানে বিভেদকারী পর্দা হিসাবে আরশ অবস্থিত। আরশ হইতে শুরু করিয়া নিম্ন দিকে কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত, দোযখসহ সাত তলা আসমান হইতে সাত-তলা জমীনের নীচে তাহাতাছ ছারা পর্যন্ত স্থূল জগতের ক্ষেত্র। আর আরশ হইতে উপরের দিকে সূক্ষ্ম জগত বিদ্যমান। এই সূক্ষ্ম জগতের মধ্যে, আলমে আরওয়াহ বা রূহানী জগত বর্তমান। উভয় জগতকে একত্রে সৃষ্টজগত বলা হয়। এই উভয় জগতস্থিত সমুদয় ব্যক্তি, বস্তু বা অবস্থার প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত তথ্যাবলী সংক্রান্ত জ্ঞানকে এলমে হুছুলী বলা হয়। দুনিয়ার বুকে যত প্রকার বা বিষয়ের জ্ঞান পরিলক্ষিত হয় যথাঃ ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, চারুকলা, কারুকলা, শিল্পকলা ইত্যাদি সমুদয় এলমে হুছুলীর একাংশ মাত্র।

বর্তমান কাল বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগ। বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ চন্দ্র বিজয় করিয়াছে, মংগল গ্রহে যাওয়ার প্রচেষ্ঠা চালাইতেছে। একদিন হয়তো মানুষ সূর্যকেও জয় করিবে। এমনকি নিজস্ব সৌর জগত অতিক্রম করিয়া ভিন্ন সৌর জগতে যাওয়ার ক্ষমতাও বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ লাভ করিতে পারে। ইহাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই। কারণ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, "আসমান ও জমিনকে মানুষের অধীন করিয়া দেওয়া হইয়াছে।" কিন্তু ইহার পরেও বিজ্ঞানের ক্ষেত্র এলমে হুছুলীর অতি ক্ষুদ্র অংশই থাকিবে। কারণ-এই বিশ্বজগতে অযুত কোটি নিহারিকাপুঞ্জ ও লক্ষ লক্ষ ছায়াপথ বিদ্যমান। আর এক একটি ছায়াপথে আমাদের সৌরজগতের মত কোটি কোটি সৌরমন্ডল বিদ্যমান।

সমস্ত সৌরজগত, নক্ষত্ররাজি, গ্যালাক্সি, ছায়াপথ সবই প্রথম আসমানের নীচে। উক্ত সব গ্যালাক্সি, ছায়াপথ ও কোটি কোটি নক্ষত্র দ্বারা সুন্দরের স্রষ্টা মহান খোদাতায়ালা আসমানের প্রথম স্তবককে সুষমামন্ডিত করিয়াছেন। তঊর্ধ্বের আসমানসমূহকে কি সব নেয়ামত দ্বারা পূর্ণ করিয়াছেন, তাহা মহান খোদাতায়ালাই ভাল জানেন।

মানুষ বিজ্ঞানের সাহায্যে শত শত, হাজার হাজার বৎসর সাধনা ও গবেষণার দ্বারা যেখানে যাইতে সক্ষম, লতিফা কালবের (যাহা জ্ঞান অর্জনের খোদাপ্রদত্ত শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম বা আসবাব) মাধ্যমে, রাসূল (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথে, সিরাতুল মোস্তাকীমের রাস্তায় চলিয়া তথা কামেল মুকাম্মেলের খেদমতে থাকিয়া লতিফা কালবের পরিচ্ছন্নতা অর্জনের মাধ্যমে খোদাতায়ালার নূর বা জ্যোতির সাহায্যে এক মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে যাইতে সক্ষম।

পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে জ্ঞান অন্বেষী তালেবের কালব পরিচ্ছন্ন হয়। কালব কি? কালব আল্লাহর ভেদের এক মহা জ্ঞান ভান্ডার। ইহা সূক্ষ্ম জগতের উপাদান। কিন্তু জড় জগতের সংস্পর্শে আসিয়া পাপ পংকিলতায় জড়াইয়া স্বীয় পবিত্রতাকে বিনষ্ট করে। ফলে তথায় খোদাতায়ালার নূর প্রতিফলিত হয় না। কালবকে ইহার পতন থেকে উদ্ধারের একমাত্র পথ পীরে কামেলের খেদমত। পীরে কামেল তদীয় তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রয়োগে মুরীদ বা ছালেকের কালবের ময়লা মুহূর্তের মধ্যে দূর করিতে সক্ষম। পুঞ্জীভূত ময়লা বা আবর্জনা অপনোদিত হওয়ার পর কালব আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হয়। এমতাবস্থায় কালব আল্লাহ নূরে সৃষ্টি জগতের সমুদয় ব্যক্তি ও বস্তুর প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। পরিচ্ছন্ন কালবের সাথে মহাকালবের যোগসূত্র স্থাপিত হওয়ার পরে কালব মহাকালব হইতে আগত নূরের সাহায্যে সমগ্র সৃষ্টিজগত তথা সূক্ষ্ম জগত, আরওয়াহ জগত, স্থূল জগত তথা আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত-দোযখ, সাত স্তবক আসমান, সাত স্তবক জমিন, মধ্যবর্তী সমুদয় ব্যক্তি ও বস্তু এবং সর্ব নিম্নে তাহাতাছ ছারা পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করিতে সক্ষম।

যাহার এক অংশ অর্থাৎ প্রথম আসমান পর্যন্ত প্রচলিত বিজ্ঞানের দ্বারা জয় করিতে কোটি কোটি বৎসর বা ততোধিক সময়েও সম্ভব হইবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু বস্তু জ্ঞান চর্চার এই উৎকর্ষতায়, বিজ্ঞানের এই অগ্র যাত্রায়, চক্ষু ঝলসানো নব নব আবিষ্কারে মানুষের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হইয়াছে। মানুষ আধ্যাত্মিকতা চর্চাকে নিষ্প্রয়োজন ভাবিয়া উপেক্ষা করিতেছে, ধর্মকে অবজ্ঞা করিতেছে, খোদাতায়ালার অস্তিত্ব অস্বীকার করিবার মত ধৃষ্টতা প্রদর্শন করিতেছে। অথচ বিংশ শতাব্দিতে আসিয়া বিজ্ঞান আমাদেরকে যাহা দিল, সেই সকল আবিস্কারের ইশারা ১৪০০ বছর পূর্বেই মহান খোদাতায়ালা কুরআনের মাধ্যমে মানব জাতিকে প্রদান করিয়াছেন। পবিত্র কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াত চির সত্য। কিন্তু বিজ্ঞানের আবিস্কার, বিজ্ঞানের সূত্র বা পদ্ধতি চূড়ান্ত সত্য নয়। ইহা আপেক্ষিক এবং পরিবর্তনশীল।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, প্রাচীন কালে বিজ্ঞানীরা মতামত দিলেন যে, এই পৃথিবী পঞ্চভূতে গঠিত তথা ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোমে-পাঁচ উপাদানে পৃথিবী রচিত। কিন্তু পরবর্তী কালের বিজ্ঞানীদের নিকট এই সিদ্ধান্ত টিকিল না। তাহাদের গবেষণার ফল-৭২ প্রকারের উপাদান দ্বারা এই জগত গঠিত। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা বলিলেন যে, ৯২ প্রকারের উপাদান দ্বারা পৃথিবী রচিত। তৎপর বিজ্ঞানীরা বলিলেন যে, ১১২ প্রকারের উপাদান দ্বারা এই জগত গঠিত। এরপর বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করিলেন অনুবাদ বা মলিকুলার থিউরী।

সেই থিউরীও বিজ্ঞানী ডালটনের নিকট টিকিল না। ডালটন আবিস্কার করিলেন পরমাণুবাদ বা এটোমিক থিউরী। ডালটন বলিলেন যে, দুই বা ততোধিক পরমাণু দ্বারা এক একটি অনু বা মলিকুল গঠিত। এই এটম বা পরমাণুই পদার্থের সর্বশেষ অবস্থা। কিন্তু না, এ আবিস্কারও শেষ পর্যন্ত টিকিল না। পরবর্তীতে থমসন, রাদার-ফোর্ড নামক খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করিলেন যে, এটম বা পরমাণুই পদার্থের শেষ অবস্থা নয়। এই পরমাণুকে বিভক্ত করিলে ইলেকট্রন, নিউট্রন ও প্রটোন পাওয়া যায়। ইহাদের মধ্যে নিউট্রন হইল নিরপেক্ষ কণা। আর ইলেকট্রন ও প্রটোনের মধ্যে একটি নেগেটিভ ও অপরটি পজেটিভ বিদ্যুৎ কণা। কাজেই পদার্থ সংক্রান্ত গবেষণার সর্বশেষে যাহা পাওয়া গেল; তাহা হইল, পদার্থের মূলে আছে বিদ্যুত বা ইলেকট্রিসিটি। কাজেই বুঝা যায় যে, আমাদের দেহের ভিতরেও বিদ্যুত, বাহিরেও বিদ্যুত; সমগ্র বিশ্ব জগত ব্যাপী বিদ্যুতেরই লীলাখেলা চলিতেছে। আর বিজ্ঞানের এই আবিস্কারের সাথে পবিত্র কুরআনের কি চমৎকার মিল! আল্লাহপাক বলেন,

اللَّهُ نُورُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ

অর্থাৎ-"আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর বা জ্যোতি।” (সূরা নূরঃ ৩৫) এইবার জ্ঞানের সর্বোত্তম স্তর যাহা এলমে হুজুরী হিসেবে পরিচিত সে সম্পর্কে কিছু বলি।

এলমে হুজুরী বা খোদাতত্ত্বজ্ঞান-যে জ্ঞান চর্চা বা অনুশীলনের মাধ্যমে খোদাতায়ালার জাত, সিফাত ও আফয়াল বা ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায় তাহাই স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান বা এলমে হুজুরী হিসেবে পরিচিত।

তিন প্রকার তাজাল্লীর দ্বারা এই বিশ্বজগত অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও শৃংখলার সাথে পরিচালিত হইতেছে এবং সমদুয় কর্মকান্ড সম্পন্ন হইতেছে। যথাঃ তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাত।

স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের পথে খোদাঅন্বেষী ব্যক্তি উল্লিখিত তিন প্রকারের তাজাল্লী বা জ্যোতির সহিত পরিচিত হয় এবং এই ত্রিবিধ তাজাল্লীর প্রভাবে ধীরে ধীরে ছালেকের পশুত্ব স্বভাব মনুষত্বে রূপ নেয়, অন্তর্নিহিত সুকুমার বৃত্তি জাগ্রত হয়, নাফস দুর্বল হয়, নাফস স্বীয় স্বভাব পরির্বতন করিয়া খোদাতায়ালার চরিত্রে চরিত্র গঠনে সচেষ্ট হয়, ধীরে ধীরে দীর্ঘ সাধনার পর খোদাতায়ালার চরিত্রে চরিত্রবান হয়। খোদাতায়ালার উপর সে রাজী হয়, খোদাতায়ালাও তাহার উপর রাজী হয়।

সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্টাসম্পর্কিত জ্ঞানের মধ্যে স্রষ্টাসম্পর্কিত জ্ঞানের ব্যাপকতা এত বেশী যে, তাহা সাধারণ মানুষের কেন, বহু ওলী আল্লাহর জ্ঞান বহির্ভূত। সাধারণ বুঝের জন্য শুধু এতটুকু বলা যায় যে, এক বিন্দুর তুলনায় এক সাগর পানির ব্যপ্তি ও প্রসারতা যত বেশী, এলমে হুছুলী তথা সৃষ্টিসম্পর্কিত জ্ঞানের তুলনায় স্রষ্টা সম্পর্কিত জ্ঞান বা আল্লাহর জাত, সিফাত ও ক্রিয়াকলাপ সংক্রান্ত জ্ঞানের ব্যাপকতা তত বেশী।

অন্যকথায়, বিজ্ঞান, এলমে হুছুলীর এক ক্ষুদ্র অংশ। বিজ্ঞানের তুলনার এলমে হুছুলীর সামগ্রিক রূপের ব্যাপকতা যত বেশী; এলমে হুছুলীর তুলনায় এলমে হুজুরীর ব্যাপকতা ততোধিক বেশী।

এতক্ষণ জ্ঞানের স্বরূপ, প্রকারভেদ, ব্যাপকতা ও প্রসারতা সম্পর্কে অতি সংক্ষিপ্ত এক আলোচনাচিত্র তুলিয়া ধরা হইল। এইবার হযরত শেখ ছাদী (রঃ) ছাহেবের বাণী, "সবুজ বৃক্ষের প্রতি পত্রের প্রত্যেকটি রেণু-পরমাণুই খোদাকে চিনিবার পথে এক একটি গ্রন্থতুল্য।"- ইহার তাৎপর্য সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করি।

উপরোক্ত বাণীর তাৎপর্য বা মর্মার্থ উপলব্ধি বা হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান বা এলমে হুজুরী বা খোদাপ্রদত্তজ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। এলমে হুজুরী অর্জনের উপায় উক্ত জ্ঞানে জ্ঞানী কোন কামেল মুকাম্মেলের কদমে নেছার হওয়া। একমাত্র কামেল মুকাম্মেল পীরই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিতে পারেন; এই বিদ্যা অর্জনের দ্বিতীয় কোন পথ নাই। কামেল পীর তদীয় তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে প্রথমে মুরীদের কালব জিন্দা করান। কালবে জেকের জারী হয়। মহা কালব হইতে খোদাতায়ালার তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূর কালবে প্রতিফলিত হয় এবং প্রতিফলিত নূরের সাহায্যে সমুদয় সৃষ্টির রহস্যজ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান খোদাতালাশী ব্যক্তি অর্জন করিতে থাকে।

পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে ধীরে ধীরে মুরীদের অন্যান্য লতিফা তথা রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক ও বাদ জিন্দা হয় এবং প্রত্যেক লতিফায় আল্লাহ আল্লাহ জেকের জারী হয়। এমনি করিয়া এক পর্যায়ে পীরের দয়ায় মুরীদের মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত তেত্রিশ কোটি লতিফা জাগ্রত হয় এবং আল্লাহ নামের জেকের হইতে থাকে। এই দিকে প্রথম ছয় লতিফায় এসমে জাত জেকের জারী হওয়ার সাথে সাথে পীরে কামেল তদীয় মুরীদের কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক, বাদ-এ নাফী-এসবাত জেকের "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" সংযোগ করান। তৎপর মুরীদের সমস্ত লতিফায় এসমে জাত ও নাফী-এসবাত জেকের মহা ধুমধামে চলিতে থাকে। মুরীদ বা ছালেক সেই জেকেরের শব্দ নিজ কর্ণে শুনিতে পায়।

আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব যখন আমাকে নাফী-এসবাত জেকেরের সবক প্রদান করিলেন, তখন আমার মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত দেহের প্রত্যেক লোমকুপ হইতে জেকেরের এমনি মুহুর্মুহঃ শব্দ আমি শুনিতে পাইতাম যেমন করিয়া পানাপুকুরে মৎসকুল শেওলা খাওয়ার নিমিত্ত দলবদ্ধভাবে পানির উপরিভাগে উঠিয়া চপচপ শব্দ করিতে থাকে। এমনিভাবে দেহের তেত্রিশ কোটি লতিফার জেকের আমি শুনিতে পাইতাম। আবার কখন কখনও আমার মনে হইত যে, ভূমিকম্প হইতেছে। সত্যিই ভূমিকম্প হইতেছে কিনা, যাচাই করিবার জন্য অন্যের চেহারার দিকে তাকাইয়া থাকিতাম। কিন্তু তাহারা কেহই ভূমিকম্পের কথা ব্যক্ত করিত না। আসলে শুধুমাত্র আমার দেহই ভূমিকম্পের মত কাঁপিত। সেই অবস্থায় কখনও কখনও আমার মনে হইতো যে, এখনই বুঝি আমি মারা যাইব।

ঐ অবস্থায় শারীরিক দুর্বলতা এত বেশী অনুভব করিতাম যে এস্তেঞ্জায় বসিবার সময়ও শক্ত কোন কিছু ধরিয়া বসিতে হইত। ইহা সমুদয়ই ছিল জেকেরে নাফী-এসবাতের হাল বা অবস্থা। যে মুরীদ বা ছালেক এই দরজায় পৌঁছায়, সেও ঐ রকম বিভিন্ন হাল বা অবস্থার সম্মুখীন হয়। সে যে শুধু নিজ দেহের কোটি কোটি লতিফা হইতে উত্থিত জেকেরের শব্দ শুনিতে পায় তাহা নহে। সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের প্রত্যেক রেণু-পরমাণু যে মহা ধুমধামের সহিত জেকের করিতেছে, ছালেক বা মুরীদ তাহাও নিজ কর্ণে শুনিতে পায়। আল্লাহপাক বলেন,

يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوتِ وَ مَا فِي الْأَرْضِ

অর্থাৎ-"সাত আসমান, সাত জমীন এবং ইহাদের মধ্যে যাহা কিছু আছে, সবই আল্লাহর জেকের করিতেছে।" (সূরা জুমু'আঃ ১)

এই আয়াত পাকের তাৎপর্য ও মর্মার্থ ছালেকের নিকট পরিচ্ছন্ন হয়। এই অবস্থায় ছালেক বা মুরীদ যে দিকেই তাহার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, সেই দিকেই কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" অংকিত দেখিতে পায়। আকাশে-বাতাসে, গ্রহে-নক্ষত্রে, গাছে-মাছে, জলে-স্থলে, এমনকি নিজের দেহের প্রতি রেণু-পরমাণুতে কলেমা, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" সীল বা ছাপ মারা দেখিতে পায়। হযরত শেখ ছাদী (রঃ) যখন এই দায়েরায় উপনীত হইয়া যেই মাত্র গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন, তখন তখনি তদীয় দৃষ্টির সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল যে, গাছ-পালা, বৃক্ষ, লতা-গুল্মের প্রতি রেণু-পরমাণুতে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-এই কলেমার মোহর অংকিত। ইহা দৃষ্টে আবেগাপ্লুত হইয়া তিনি বলিলেন,

برگ درختان سبز در نظر هوشیار هر ورق دفتر پست معرفت کردگار

উচ্চারণঃ

"বর্গে দারাখতানে ছবজে দার নজরে হুশিয়ার

হর ওয়ারাকে দাফতরিস্ত মারেফতে কেরদেগার।"

যার ভাবার্থ দাঁড়ায়ঃ-

হে খোদা! কি দরকার কিতাবের, কি দরকার দর্শন শাস্ত্রের, বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তকাদি অধ্যয়নের মূল উদ্দেশ্যই তোমার একত্ব সম্পর্কিত জ্ঞানের দৃঢ়তা অর্জন বা তাওহীদ জ্ঞানের মজবুতীকরণ। কিন্তু যে দিকেই তাকাই, সেই দিকেই প্রত্যেক পদার্থের প্রতি রেণু-পরমাণুর উপরেইতো তোমার তাওহীদের মূলমন্ত্র "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"- সীল অংকিত দেখিতেছি। প্রত্যেক অনু পরমাণুই এই ক্ষেত্রে এক একটি হাদীস গ্রন্থ, এক একটি দর্শন শাস্ত্র।

কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ। আল্লাহপাক তদীয় হাবীবের নাম নিজ নামের সাথে প্রেমের রশিতে বাঁধিয়াছেন। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

أَن نُوْرُ اللَّهِ وَ الْخَلْقُ مِنْ نُوْرِي

অর্থাৎ-"আমি আল্লাহর নূর এবং সমুদয় বস্তু আমার নূর হইতে সৃষ্ট।"

তাহা হইলে বুঝা যায় যে, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সমস্ত কিছুই দুই ধাপে অস্তিত্ব লাভ করিয়াছে। প্রথমে আল্লাহ হইতে নূরে মুহাম্মদী এবং তৎপর নূরে মুহাম্মদী হইতে সমগ্র সৃষ্টি জগত বা ১৮ হাজার আলম। আর এই কারণেই হয়তো সমগ্র সৃষ্ট জগতের প্রতি বস্তুর রেণু পরমাণু স্বীয় সত্ত্বায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" অর্থাৎ-আল্লাহ ও রাসূলের যৌথ নাম সম্বলিত কলেমা শরীফ ধারণ করিয়া মহান খোদাতায়ালা এবং তদীয় হাবীবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছে।

রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

أوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ نُورِى

অর্থাৎ-"আল্লাহ সর্ব প্রথম যাহা সৃষ্টি করেন, তাহা আমার নূর।"

আবার রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন,

أوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْعَقْلُ

অর্থাৎ-"আল্লাহ প্রথমে যাহা সৃষ্টি করেন, তাহা জ্ঞান।" কাজেই বুঝা যায় যে নূরে মুহাম্মাদীই জ্ঞান, জ্ঞানই নূরে মুহাম্মদী।

কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" যেন খোদা প্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের অতি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ। কলেমার প্রথম অংশ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু"- বেলায়েতের ইশারা; আর দ্বিতীয় অংশ-"মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"- কামালাতের ইংগিত। সুতরাং কলেমার উভয় অংশের সমষ্টি যেন বেলায়েত ও কামালাতের সমষ্টি। লা ইলাহা-অর্থ মাবুদ নাই; ইল্লাল্লাহ-অর্থ আল্লাহ ব্যতীত। কলেমার প্রথম অংশের "লা" যেন বেহেশতের সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষ, যেখানে হযরত আদম (আঃ) এর গমন নিষিদ্ধ ছিল। 'লা' এর মধ্যে অবস্থান করিও না। অর্থাৎ আল্লাহ ভিন্ন অন্য যাহা কিছু আছে, তথা যত ব্যক্তি, বস্তু, যত সৌন্দর্য বা সুষমামন্ডিত জগত আছে, সমস্ত কিছুকে ত্যাগ করিয়া এক খোদাতায়ালার নূরে ফানা হওয়ার উপদেশ কলেমার প্রথম অংশ খোদাঅন্বেষী ব্যক্তিকে দান করে। অন্য কথায় 'লা' এর তলোয়ারে সমুদয় বাতেল উপাস্যতুল্য উদ্দেশ্যসমূহকে কাতেল করিয়া এক আল্লাহতে স্থিত হওয়ার সুপরামর্শ কলেমার প্রথম অংশে নিহিত। ছালেক যখন আল্লাহ ভিন্ন সমুদয় ব্যক্তি ও বস্তুর আকর্ষণ হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহর নূরে ফানা প্রাপ্ত হয়, তখন তাহার উপর খোদাতায়ালার নূরের পতন এত অধিক হয় যে, ছালেক খোদাতায়ালার নূর ভিন্ন আর কিছুই দেখে না, এমন কি নিজেকেও না। এই দায়েরাকে বেলায়েতে ছোগরা বলা হয়। এই দায়েরায় আসিয়া হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) বলিলেন,

"চে তদবীর আয় মুসলমান কে মান খোদরা নামি ইয়া নাম তা তরসাম ইয়াহুদিয়াম নাগেররাম না মুসলমান।

না সরকিয়াম না গারবিয়াম না বাহরিয়াম

না আজ মূলকে এরাকিয়াম না আজ খাকে খোরাছামান। মোকানাম লা মোকাঁন বাশদ নেশানাম বানেশাম বাশদ

না জানাম না তনাম বাশদ নাবাশদ এস্কে জানানাম।"

অর্থাৎ-"হে মুসলমান ভাই সকল! এখন আমার উপায় কি? আমি তো এখন আমাকে চিনি না, আমি যে কে তাও জানি না, আমি কোন জাতি? মুসলমান, না ইয়াহুদী, না অগ্নীপূজক, তাও বলতে পারি না। আমার বাড়ী কি পশ্চিম অঞ্চলে, না পূর্ব অঞ্চলে, পানিতে না তটে, কিছুই জানি না। এখন আমার মাকান হইয়াছে লামাকান, আমার চিহ্ন বলিতে কিছু নাই। আমার জীবনও নাই, আমার শরীরও নাই। এমন কি আমার মাশুকের এস্কও এখন ভুলিয়া গিয়াছি। আমার বলিতে আমার এখন কিছুই নাই।"

এই দায়েরাতে স্রষ্টা হইতে সৃষ্টিকে পৃথক করিতে না পারিয়া অনেক সাধকই শরীয়তের খেলাফ অনেক কথাই বলিয়া ফেলেন। পরবর্তী দায়েরা আকরাবিয়াত হইতে তাই প্রকৃত মারেফাত শুরু হয়। আকরাবিয়াত হইতে ঊর্ধ্বে সমুদয় দায়েরায় যে জ্ঞান ছালেক হাসিল করে তাহাতে সৃষ্টিকে স্রষ্টা হইতে পৃথক করিয়া দেখিবার ক্ষমতা জন্মে।

বেলায়েতে ছোগরার দায়েরাতে ছালেক সমস্ত বাতেল উপাস্যতুল্য উদ্দেশ্য সমূহকে 'লা' এর তলোয়ারে কাতেল করিয়া খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরে ফানা হয়। কলেমার প্রথম অংশের মর্মার্থ ছালেক দেলে এবং দেহের প্রতি অনু-পরমাণুতে উপলব্ধি করে।

কলেমার দ্বিতীয় অংশ প্রথম অংশের তুলনায় এত প্রশস্ত যে তুলনায় করা চলে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, কলেমার দ্বিতীয় অংশ কুলশূন্য সমুদ্রের ন্যায় মনে হয়। যাহার তুলনায় প্রথম অংশ একটি বিন্দুর ন্যায় দৃষ্ট হয়। কামালাতে নবুয়তের তুলনায় কামালাতে বেলায়েত সাগরের তুলনায় এক বিন্দু পানির মত।

কাজেই ইহা প্রতীয়মান হয় যে, খোদাপ্রদত্ত সমুদয় জ্ঞানের নিশান এই কলেমা শরীফ, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"; যে কলেমাকে গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, আকাশ-বাতাস তথা সমুদয় সৃষ্ট বস্তুর প্রতি রেণু-পরমাণু স্বীয় বক্ষে ধারণ করিয়া মহা গ্রন্থের কাজ করিতেছে।

এই জ্ঞান রাসূলে পাক (সাঃ) এবং তদীয় উম্মতকুলের প্রতি আল্লাহপাকের অশেষ দান। এই জ্ঞানই শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান। এই জ্ঞানের মাধ্যমে নিজেকে চেনা যায়, আত্মশুদ্ধি লাভ করা যায়, নাফসের দাসত্ব হইতে নিজেকে মুক্ত করা যায়; খোদা প্রদত্ত মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ সাধন হয়, খোদার চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া যায়, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা রেজামন্দী লাভ করা যায়। এই জ্ঞানের সাহায্যে শয়তান ও নাফসের সহিত যুদ্ধে তাহাদেরকে পরাস্ত করা যায়। এই জ্ঞান যিনি প্রাপ্ত হইলেন তাহার উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন,

يُؤْتَى الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ - وَ مَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِي خَيْرًا كَثِيرًا - وَ مَا يَذَكَّرُ إِلا أُولُوا الأَلْبَابِ

অর্থাৎ-"তিনি যাহাকে ইচ্ছা জ্ঞান দান করেন এবং যাহাকে জ্ঞান দেওয়া হয়, তাহাকে প্রভূত কল্যাণ দেওয়া হয় এবং জ্ঞানবান লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।" (২ঃ ২৬৯) এই জ্ঞানকে উদ্দেশ্য করিয়াই রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন-

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ وَ مُسْلِمَةٌ

অর্থাৎ- "প্রত্যেকটি মুসলিম নর নারীর জন্য জ্ঞানার্জন ফরজ।"

اطْلُبُوا الْعِلْمَ وَلَوْ كَانَ بِالصَّيْنِ

অর্থাৎ-"জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীনদেশ হইলেও যাও।"

النَّظْرُ إِلَى وَجْهِ الْعَالِمِ عِبَادَةُ

অর্থাৎ-"জ্ঞানী ব্যক্তির চেহারা দর্শন করা ইবাদত তুল্য।"

রাসূলে করীম (সাঃ) কে আল্লাহপাক জ্ঞানের পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। জ্ঞান সমুদ্রের সর্বত্র তিনি অবাধ বিচরণ করিয়া জ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখার পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন। আজ পর্যন্ত যত দার্শনিক, যত বিজ্ঞানী, যত গুণী জ্ঞানী পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করিয়াছেন, তাহাদের কেহই জ্ঞান সমুদ্রের গভীরে প্রবেশ করিতে পারেন নাই। বিজ্ঞানী নিউটন বলেন, "আমি জ্ঞান সমুদ্রে প্রবেশ করিতে পারি নাই, যতটুকু জ্ঞান অর্জন করিয়াছি তাহা জ্ঞান সমুদ্রের তীরে কিছু নুড়ি পাথর বা উপলখন্ড সংগ্রহের অনুরূপ।" একমাত্র রাসূলে পাকই (সাঃ) জ্ঞান সমুদ্রের গভীরতম প্রদেশ-হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়া পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হন। তাই তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠতম ইসলামী দার্শনিক। রাসূলে পাক (সাঃ) সেই জ্ঞানের ধারা দুনিয়ার বুকে তদীয় বিশেষ বিশেষ উম্মতের মাধ্যমে চালু রাখিয়াছেন। রাসূলে পাক প্রদত্ত ও প্রদর্শিত সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। ইহা ব্যতীত দুনিয়াতে প্রচলিত বহু জ্ঞান, বহু শিক্ষা পদ্ধতি আছে; তাহাদের মধ্যে যে সমস্ত রীতি বা ধারা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের অনুকূলে থাকে, তাহা উত্তম। কিন্তু জ্ঞানের যে সমস্ত ধারা বা শাখা মানুষের ঈমানের জ্যোতিকে বিনষ্ট করে, মানুষকে খোদাবিমুখ করে, পাপে ও অন্ধকারে নিমজ্জিত করে, সভ্যতার নামে নগ্নতা আনে, মানবতাকে বিনষ্ট করে, তাহা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কারণ ইহা আবু জেহেল, নমরূদ বা ফেরাউনের জ্ঞানের প্রতিবিম্ব বই কিছু নয়।

মানুষ আজ বস্তুু জ্ঞান চর্চায় চরম উৎকর্ষতা লাভ করিয়াছে, জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতির শিখরে আরোহন করিয়াছে। ঠিক যে গতিতে বস্তু জ্ঞান চর্চায় উন্নতি হইয়াছে, তদাপেক্ষা দ্রুতগতিতে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় হইয়াছে, মনুষত্ব বিনষ্ট হইয়াছে, মানবতা নিশ্চিহ্ন হইয়াছে। আজ দিবালোকে মানুষ মানুষকে খুন করে, মানুষকে হত্যা করিয়া মানুষেরই দেহের হাড্ডি-মজ্জা, মগজ, কংকাল বা দেহের অন্যান্য ভাইটাল অরগান লইয়া মানুষ ব্যবসা করে। মানবতার এহেন সংকট পৃথিবী সৃষ্টির পর হইতে আজ পর্যন্ত আর হয় নাই। এর কারণ কি?

কারণ-মানুষ ধর্মকে অবজ্ঞা করিতেছে, খোদাপ্রাপ্তিজ্ঞান চর্চা বা অনুশীলন অনর্থক মনে করিয়া ত্যাগ করিতেছে; ফলে মানুষ পশুর স্বভাবে স্বভাবিত হইতেছে, মানুষের মানবীয় গুনাগুণ বা সুকুমার বৃত্তি ধ্বংস হইতেছে। মাবনতার এই সংকট হইতে মুক্তির একমাত্র পথ বস্তু জ্ঞান চর্চার সাথে সাথে স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান চর্চা বা অনুশীলন করা; নিজেকে চেনা বা আত্মতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে খোদাতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করা। সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান ও স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান-এই উভয় জ্ঞানে জ্ঞানী হইলেন জামানার কামেল ওলী সকল। কাজেই তাহাদের নিকট হইতে উক্ত জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। পীরে কামেলের খেদমতে মানুষের আমিত্ব ধ্বংস হয়, অহংকার, গর্ব, দাম্ভিকতা দূর হয়। মাটির স্বভাব ও নম্রতা অর্জন করিতে মানুষ সক্ষম হয়। তাই হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন, "তোমরা অহংকারকে বিদূরীত কর। মৃত্তিকা হও। তবেই বিচিত্র বর্ণের পুষ্পরাজিতে তুমিও সুশোভিত হইবে। নিরস পাথরের মত বৃথাই তুমি সময় অতিবাহিত করিতেছ। একবার শুধু মাটি হইয়া দেখ, জীবন কত কল্যাণকর।"

কাজেই তোমরা যদি অহংকার, গর্ব পরিত্যাগ করিয়া মাটির স্বভাব অর্জন করিতে চাও, তাহা হইলে যামানার মুজাদ্দেদ হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) এর পাক দেলে দেল মিশাও। তাহার মহব্বত নিজ দেলে পয়দা কর। তাহা হইলে তোমরা জ্ঞানের এমন এক দরজায় উপনীত হইতে পারিবে, যেখানে তোমরা সৃষ্টির প্রতি রেণু-পরমাণুতে কলেমা "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-কে সীল বা মোহর অঙ্কিত দেখিতে পাইবে। সৃষ্টিরাজ্যের সমুদয় সৃষ্টিই তখন তোমাদের সাথে কথা বলিবে, তোমাদিগকে প্রেমতত্ত্ব শিখাইবে। হযরত শেখ ছাদী (রঃ) ছাহেব বলেন, একদা এক গভীর রাত। ঘরে মোমবাতী জ্বালানো। একটি পতঙ্গ দ্রুত আসিয়া মোমবাতীর শিখায় ঝাপাইয়া পড়িল। সংগে সংগে পতঙ্গটির পাখা পুড়িয়া যাওয়ায় ইহা মাটিতে পড়িয়া ছটফটানি শুরু করিল। তিনি বলেন যে, এমন সময় লক্ষ্য করিলাম, মোমবাতী পতংগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছে, হে পতংগ! প্রেম তোমার কাজ নয়, সামান্য একটু পাখা পুড়িল, আর তাহাতেই ছটফটানি শুরু করিলে, ইহাতো প্রেমের ধর্ম নয়। ইহা প্রেমিক প্রেমিকার কাজ নয়; আমার দিকে তাকাইয়া দেখ, আমার মাথা হইতে পুড়া শুরু হইয়াছে, পা পর্যন্ত পুড়িতেছে, কিন্তু আমি একটুও নড়াচড়া করিতেছি না। ইহাই প্রেমিক বা প্রেমিকার ধর্ম।

আমার জীবনের দু'টি কাহিনীঃ

আমার জীবনের দুই একটি ঘটনা তোমাদেরকে উপদেশ হিসেবে শুনাই। বহুদিন পূর্বের একটি ঘটনা। তখন তোমাদের আম্মাজান জীবিত আছেন। একদিন আনুমানিক সকাল নয় (৯) টার দিকে তোমাদের আম্মাজান খাওয়ার জন্য একটি সুন্দর কলা আমার হাতে দিলেন। কলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া আমি কলাটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "হে কলা! কে তোমাকে এমন অপরূপ রূপে সৃষ্টি করিয়াছেন? কি চমৎকার সুগন্ধময় হালুয়া, শোভাময় হরিদ্রাবর্ণের কোমল আবরণে আবৃত। কোন্ মহৎ ব্যক্তির আহার্য হইয়া তুমি দুনিয়ায় আসিয়াছ? জবাবে কলাটি বলিল, মহান খোদাতায়ালা এই পৃথিবীতে মানুষ পাঠানোর পূর্বে পৃথিবীস্থিত গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতার উদ্দেশ্যে বলিলেন, "হে দুনিয়ার ফলপ্রসু গাছ-পালা-বৃক্ষ! আমার পেয়ারা সকল দুনিয়ায় যাবেন, বাণী বাহক নবী ও রাসূল দুনিয়ায় তশরিফ রাখিবেন, আমার বন্ধুগণ, ওলীয়ে কামেল সকল দুনিয়ার উপর আমার গুণগান করিবেন; তাই তোমরা তাহাদের খেদমত করিবার জন্য প্রস্তুত হও, ফল ও ফুলে সুশোভিত হও।

তোমাদের সেই উপাদেয় ফল ভক্ষণ করিয়া আমার সকল নবী-রাসূল, আশেকান, জাকেরান ও ওলী আমার জেকের করিবে। তোমাদের ফল-ফলাদি আহার পূর্বক যে শক্তি তাহাদের দেহে পয়দা হইবে, সেই শক্তি দিয়া তাহারা আমার জেকের করিবে তাহাদের জিহ্বা দ্বারা, দেল দ্বারা, এমন কি কোটি কোটি লতিফা দ্বারা। কাজেই তোমরা ফলবান হও। মহান খোদাতায়ালার সেই নির্দেশে এই ধরণী ফুলে ফলে সুশোভিত হইল। আম গাছে আম, জাম গাছে জাম, কদলী গাছে কলা ধরিল। নারিকেল গাছ সুপেয় পানি মস্তকে ধারণ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এমনিভাবে গাছ-পালা-বৃক্ষ আপন আপন মস্তকে ফল ধারণ করিল।

কলা বলিল, "আমাদের একান্ত বাসনা আমরা আল্লাহর পেয়ারাদের আহার হইব, আল্লাহর বন্ধুদের খোরাক হইব। আমাদেরকে আহার পূর্বক তাহাদের দেহে যে শক্তি বা এনার্জী উৎপন্ন হইবে, সেই শক্তি দ্বারা তাহারা অসংখ্য মুখে মহান খোদাতায়ালার জেকের করিবে। তাহাদের ইবাদত কাজে যৎসামান্য হইলেও আমরা সাহায্য করিতে পারিব। ইহাই হইবে আমাদের পৌরুষত্ব বা বীরত্ব।

কিন্তু আজ আমি যাহার আহার হইতেছি, তাহার মুখে জেকের নাই, দেল স্তব্ধ; অধিকন্ত সে দেও (দানব)।"

কলাটির এহেন তিরস্কারে আমি ভীষণ লজ্জিত হইলাম। কলাটিকে না খাইয়া বরং ফেরত পাঠাইলাম। নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মিল।

আর একটি ঘটনা বলি। একদিন নকশাখচিত একটি পালংককে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, "হে পালংক! তুমি এত সুন্দর নাম বা উপাধী কি করিয়া লাভ করিলে?” আমার প্রশ্ন শুনিয়া পালংক কাঁদিতে কাঁদিতে আমাকে বলিল, "এই পালংক নাম ধারণ করিতে আমাকে কত যে দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা, ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করিতে হইয়াছে, ইহার ইয়ত্বা নাই। আমি ছিলাম বৃক্ষ বনের সর্বাপেক্ষা সুন্দর বৃক্ষ। সমস্ত গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতার উপর দিয়া মাথা উচু করিয়া আমি আকাশের সৌন্দর্য দেখিতাম। আমার ডালে পাখীরা বাসা করিত, ডিম পাড়িত, বাচ্চা ফুটাইত, বাচ্চার কিচিরমিচির শব্দে আমার প্রাণ ঠান্ডা হইত। কত রংবেরং-এর নাম না জানা পাখী আমার শাখা প্রশাখায় বসিত, মনের আনন্দে প্রাণ খুলিয়া গান গাহিত। তাহাদের গান শুনিয়া আমার সকাল-সন্ধ্যা অতিবাহিত হইত। কিন্তু একদিন কয়েকজন সহকর্মীসহ এক করাতি আমার সুখের ঘরে আগুন দিল। সে তাহার বহু দাঁত বিশিষ্ট করাত দ্বারা আমার দেহ চেরাই করিল।

আমি কত যে চিৎকার করিলাম, কত যে রোদন, ক্রন্দন, আহাজারী করিলাম; কিন্তু করাতির পাষাণ হৃদয় ইহাতে গলিল না। আমাকে কাটিয়া মাটিতে ফেলিল। তৎপর খন্ড খন্ড করিল। তারপর লম্বালম্বি বহুবার করাত চালাইয়া আমার বক্ষ বিদারণ করিল; আমাকে বহু তক্তায় পরিণত করিল। তৎপর সেই তক্তা সমূহের উপর হাতুড়ী বাটালী চালাইয়া মিস্ত্রী আমাকে তাহার মনের মত আকার দিল। কত লৌহ কাঁটা বা পেরেক যে আমার দেহে বিদ্ধ করিল, তাহার হিসাব নাই। আজও আমার দেহের ভিতরে মোটা মোটা স্ক্রু রহিয়াছে। কি যে দুঃখ! কি যে যন্ত্রণা! তাহা প্রকাশের ভাষা নাই। আর ভুক্তভোগী ছাড়া আমার দুঃখ বুঝিবারও কেউ নাই। এত দুঃখ কষ্টের পরেই আমি মানুষের ব্যবহার উপযোগী হইয়াছি, পালংক উপাধিতে ভূষিত হইয়াছি। একজন মানুষের পালংক হওয়ার জন্য আমাকে এত দুঃখ, জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইয়াছে, আর তুমি নাকি মহান খোদাতায়ালাকে তোমার কালবে ধারণ বা বহন করিতে চাও। হুশিয়ার! বহু চড়াই-উৎড়াই, ঘাত-প্রতিঘাত তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। এমনি ভাবে পালংক আমাকে উপদেশ প্রদান করিল। পালংক তদীয় এই করুণ আত্ম কাহিনী বলিবার সময় কাঁদিতেছিল। তাহার এই দুঃখ বিজড়িত কাহিনী শুনিয়া আমারও কান্দা আসিল।

হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি এমন এক স্তরে উপনীত হইতে চাও, যেখানে সৃষ্টির সব কিছুই তোমাদের সহিত কথা বলিবে, খোদাতায়ালার দিকে দ্রুত অগ্রসর হইতে অনুপ্রাণিত করিবে, উপদেশ দান করিবে; তাহা হইলে আপন পীরের কঠিন খেদমত কর এবং তদীয় মহব্বত দেলে পয়দা করিবার জন্য প্রাণপন চেষ্টা কর। তিনি যদি দয়া করিয়া কবুল করেন, তাহা হইলে মহান খোদাতায়ালা তোমাদেরকে কবুল করিবেন, তোমাদের জীবন ধন্য হইবে।

আমি আমার পীর কেবলাজানের কদমে বহুকাল খেদমত করিয়াছি। কত দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণার ঝড় আমার উপর দিয়া বহিয়া গেল, কিন্তু আমি পীর কেবলাজানের কদম ছাড়ি নাই। তাই পীর কেবলাজান আমাকে কবুল করিলেন এবং দয়া করিয়া তদীয় কদমের নীচে আমাকে জায়গা দিলেন। যেই দিন তিনি আমাকে বলিলেন, "তোর দাদাপীর আমাকে যেমন তাঁর কদমের নীচে জায়গা দিয়েছিলেন; আমিও তেমন তোকে আমার কদমের নীচে রেখে দিলাম" সেইদিন হইতে আমি দেখিতে পাইলাম যে, সসাগরাধরিত্রী যেন আমার হাতের মুঠোয়।

কাজেই, তোমরা পীরের কদমে কঠিন খেদমত করিতে থাক। এই পথে দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা প্রচুর। অসংখ্য কাটার আঘাত সহ্য করিতে হয়। তোমরা ভয় করিও না। অদম্য সাহসে বুক বাঁধিয়া পীরের কদমে খেদমত কর। তদীয় দয়ায় যদি সুলতানুল আজকারের দরজায় উপনীত হইতে পার, তাহা হইলে তোমাদের দেল ও দেহ আলোকিত হইবে; তেত্রিশ কোটি লতিফায় আল্লাহর নূরের সংযোগ হইবে। আকাশে বাতাসে আল্লাহর তাজাল্লীর খেলা দেখিতে পারিবে। যেখানেই থাক না কেন, যে দিকেই অবস্থান কর না কেন, সেখানেই, সেদিকেই আপন পীরকে দেখিতে পাইবে এবং তাহার নিকট হইতে মদদ' পাইবে। তোমাদের রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাসিল হইবে। আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের সাথে পথ চলিতে থাক। নিশ্চয় একদিন মাঞ্জিলে মাঞ্জুদে পৌঁছাইতে পারিবে। আল্লাহ তোমাদের কবুল করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD