আল্লাহতায়ালার দর্শনের জন্য প্রেমিক সাধকের হৃদয় সকল সময়েই উৎকণ্ঠিত

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ দায়েরায়ে হকিকতে সালাতঃ
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার দর্শনের জন্য প্রেমিক সাধকের হৃদয় সকল সময়েই উদ্বেল উৎকণ্ঠিত থাকে। চির আকাংখী চাতক যেরূপ বৃষ্টির পানির জন্য ফটিক জল বলিয়া কাঁদে; বৃষ্টির পানি ভিন্ন অন্য কিছুই তাহার মন আকর্ষণ করে না, তেমনি আল্লাহতায়ালার দর্শন ভিন্ন খোদাতালাশী বান্দার অন্য কোনো কিছুতেই মন ভরে না। সে দুনিয়ার মান সম্ভ্রম, ইজ্জত, হুরমত, রাজত্ব কোনো কিছুই কানা কড়ি তুল্য মনে করে না। আবার বেহেশতের জন্য সে আকর্ষণ বোধ করে না। তাহার হৃদয় এক আল্লাহতায়ালাতেই নিবদ্ধ থাকে, অন্য কাহাতেও তাহার হৃদয় বসে না। অন্য কোনো কিছুতেই তাহার মন টানে না। আল্লাহতায়ালার প্রেমাসক্ত বান্দার মনের অবস্থার কথা কেবল মাত্র তাহার অন্বেষণে নিবেদিত সাধকগণই বলিতে পারেন। আল্লাহতায়ালার প্রেমিক সাধকগণ দুনিয়ার আকর্ষণ হইতে মুক্ত হইয়া মান ইজ্জত ভুলিয়া আল্লাহতায়ালার সন্দর্শন উদ্দেশ্যে তাহাদের হৃদয়কে নিবেদিত করেন। এ জগতের কোনো কিছুই যেমন তাহাদের আকর্ষণ করে না, তেমনই বেহেশতও তাহাদের আকর্ষণ করে না। তাহাদের একটিই খেয়াল থাকে আল্লাহতায়ালার দর্শন, তাহার সান্নিধ্য ও মিলন লাভ। হযরত রাবেয়া বসরী (রঃ) বলিয়াছেন, 'দোযখ নিভাইয়া দাও ও বেহেশত পোড়াইয়া ফেল, তাহা হইলে মানুষ আল্লাহতায়ালার প্রেমী হইবে।'
আল্লাহতায়ালাকে পাইবার জন্য, তাহার দর্শন, তাহার সান্নিধ্য ও তাহার সহিত মিলনের জন্য তাহারা সকল কিছুই এমন কি জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত থাকেন। এমন একজন প্রেমিক সাধক ছিলেন হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব। তিনি তদীয় মছনবী নামক কিতাবে আল্লাহকে বলিতেছেন, "হে আমার প্রিয়তম ও প্রেমাস্পদ! তুমি যদি চাহ, আমার বক্ষ হইতে তুমি রক্ত বহাইয়া আমার প্রাণ তোমার নিজ হস্তে গ্রহণ করিয়া লও। আমি তোমার জন্য তাহা হালাল করিয়া দিলাম। তবুও তুমি আমায় দরশন দান কর। তোমার প্রেমের ফুল ডোঁরে আমাকে অনন্ত কালের জন্য বা হায়াতে আবাদীর জন্য বাঁধিয়া লও। তোমাকে দেখিতে না পারিলে এই জীবনে আর কোনো প্রয়োজন নাই।" প্রেমিক খোদাতালাশীর হৃদয়ে প্রেমাস্পদ করুণাময় আল্লাহতায়ালা তাহার প্রেমের এই হুতাশন নিজেই জালাইয়া দিয়াছেন। সৃষ্টির আদিতে আল্লাহপাকের জাত লাতাইনে যখন প্রেমের উদ্ভব হইল তখনই সৃষ্টি করিবার ইচ্ছা হইল, তিনি প্রেমগ্রহীতা সৃষ্টি করিলেন। প্রেমগ্রহীতা মানুষের হৃদয়ে তিনি আপন প্রেমের আগুন জ্বালাইয়া তাহাকে আপনার দিকে চিরকালের জন্য সূর্য্যমুখী ফুলের মত আকর্ষিত করিয়া রাখিলেন। আপন প্রেমের মরতবা মানুষকে আল্লাহ দান করিয়াছেন বলিয়াই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। কারণ আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠতম গুপ্ত ভান্ডার হইল তাহার হোব্ব বা প্রেম। এই প্রেমই মানুষকে আল্লাহতায়ালাকে দরশন করিবার চক্ষু দান করে। এই প্রেমই মাটীর মানুষকে সাত আসমানের উপরে ঊর্ধ্ব লোকে উরুজ করাইয়া আল্লাহতায়ালার সহিত মিলনের সম্মান দান করে।
আল্লাহতায়ালা মানুষের হৃদয়ে তাহার নিজস্ব গুণ 'প্রেম' দান করিয়াছিলেন বলিয়াই মানুষ আল্লাহতায়ালাকে দরশন করিতে পারে, এই দুনিয়াতে থাকিতেই তাহার সহিত মিলন লাভ করিতে পারে। এই প্রেমের সম্পদ আল্লাহপাক মানুষকে দান করিয়াছিলেন বলিয়াই মানুষের স্থান আল্লাহতায়ালার খাছ ফেরেশতা হইতেও উপরে। আল্লাহপাক মানুষকে এই প্রেম প্রদান করিয়াছিলেন বলিয়াই আল্লাহপাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, মানুষকে তিনি দুনিয়াতে তাহার খলিফা করিয়া পাঠাইয়াছেন। ইনছান তাহার প্রেমের রহস্য। মানুষের মধ্যে আল্লাহপাক প্রদত্ত প্রেম রহিয়াছে। তাই আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রেমাস্পদ। আর আল্লাহপাক যেহেতু তদীয় প্রেম প্রকাশের জন্য মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন, তাই মানুষ একই সাথে তাহার প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালাকে দেখিবার ও তাহার সান্নিধ্য ও প্রগাঢ় মিলনের জন্য মানুষের বাসনা ও কামনা অপ্রতিরোধ্য ও সীমাহীন। আপন স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা যিনি মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন, জন্মের পূর্বেই মাতৃবক্ষে দুগ্ধ রাখিয়া, পৃথিবীকে ফুল-ফল সম্ভারে-সৌন্দর্যে সাজাইয়া পালন করিয়াছেন, যিনি বলিতেছেন 'আমি তোমার হৃদয় গ্রন্থি হইতেও নিকটতর' যিনি বলিতেছেন, 'প্রেমিক ভক্তের হৃদয়েই আমার আবাসস্থল বা গুঞ্জায়েশ' তাহার জন্য পাগল না হইয়াই বা মানুষ করিবে কি? কিন্তু নিজের হৃদয়ের মধ্যে আল্লাহকে দেখিবে কেমন করিয়া লক্ষ যোজন পথ হইলেও তাহাও হয়তো পাড়ি দেবার চেষ্টা করা যাইতে পারে, কিন্তু হৃদয়কে বাহির করিয়া আনিলেতো আর প্রাণ থাকিবে না। তাহা হইলে আল্লাহ হৃদয়ের মধ্যে থাকিয়াও সাধারণ চোখে অদৃশ্যমান। আল্লাহ বলেন, দুনিয়ায় থাকিতেই তোমরা আমাকে চিনিয়া আস: আমার প্রভুত্ব স্বীকার করিয়া আস, আমার সহিত মিলন লাভ করিয়া আস কারণ পরকালে তোমাদের কোনো কর্ম নাই-আমল নাই। তাই তোমরা যদি চিনিয়া না আস তাহা হইলে আর পরকালে আমাকে পাইবে না। তাহা হইলে আল্লাহতায়ালাকে দরশন করিবেন কি করিয়া, আর তাহার সহিত মিলনইবা লাভ করিবেন কি করিয়া। আল্লাহতায়ালার দরশন ও তাহার সান্নিধ্য ও মিলন লাভ কি ইতিপূর্বে কেহ করেন নাই? যিনি এই পরম সৌভাগ্য লাভ করিয়াছেন, তাহার নিকট হইতেই আল্লাহতায়ালাকে দেখিবার উপায় জানা যাইতে পারে, অন্য কাহারও কাছে নয়।
আমরা জানি, ইসলামের নবী, সরোয়ারে কায়েনাত, মোফাখখারে মওজুদাত, হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফাই (সঃ) প্রথম সাধক, যাহাকে আল্লাহতায়ালা তদীয় ফেরেশতা জিব্রাইলকে (আঃ) দিয়া পথ দেখাইয়া বোরাখ ও রফরফের মত আলোর চেয়ে দ্রুত গতি সম্পন্ন বাহনে করিয়া সাত আসমানের ওপরে লইয়া বেহেশত দোযখ পার করাইয়া সিদরাতুল মোনতাহা অতিক্রম করাইয়া আপনার জাতের নূরের নেকাব বা পর্দা উঠাইয়া সাক্ষাত দান করিলেন, হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর সহিত কালাম বিনিময় করিলেন।
সাধক হিসেবে হযরত রাসূলে করীমও (সঃ) আপন মাবুদ ও প্রেমাস্পদ আল্লাহতায়ালাকে দেখিবার জন্য উদ্বেলিত ও আকাংখী ছিলেন। সুদীর্ঘ কাল তিনি সাধনা করিয়াছেন, আল্লাহতায়ালাকে দরশনের আকাংখায় নির্জন বিপদ সংকুল হেরা পর্বতের গুহায় কত রাত্রি দিন অনাহারে কাটাইয়াছেন, পেটে পাথর বাঁধিয়া কাটাইয়াছেন, আপন ঘর বাড়ী ছাড়িয়া দেশান্তরী হইয়াছেন বা হিজরত করিয়াছেন, শুধু আল্লাহতায়ালার মহব্বতে এবং তাহারই আদিষ্ট কর্ম পালনের উদ্দেশ্যে। সেই প্রেমাস্পদকে দেখিবার জন্য, তাহার সহিত মিলন লাভের জন্য, রাসূলে করীম (সঃ) এর হৃদয়ের যে বুক ফাটা ক্রন্দন তাহা সহিতে না পারিয়া হউক অথবা তিনি যে শ্রেষ্ঠ নবী, সেই মরতবা তাহাকে দানের জন্য হউক; আল্লাহপাক তাহাকে নিকটে টানিয়া লইলেন, সাক্ষাৎ দান করিলেন।
বিজ্ঞাপন
সেই নবী করীম (সঃ) দুনিয়ায় ফিরিয়া আবারও কাঁদিতে লাগিলেন। আল্লাহপাক তখন নবী করীম (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে নবী! আবারও আপনি কান্দেন কেন? আপনিতো আমাকে পাইলেন, আমাকে দেখিলেন। আমার সহিত কথা বলিলেন, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম দেখিলেন। আবারও আপনি কান্দেন কেন? রাসূলে করীম (সঃ) তখন আল্লাহতায়ালার নিকট বিনীত ফরিয়াদ জানাইলেন, "হে আল্লাহ! আমাকেতো আপনি দয়া করিয়া দরশন দান করিলেন, কিন্তু আমার উম্মতগণ কি করিবে? তাহারাতো আমার মতই কাঁদিবে; আমার কাছেই কাঁদিবে আপনার দরশনের জন্য। তখন কি হইবে? আল্লাহাতায়ালা তখন যাহার জন্য তিনি এই দুনিয়া ও আখেরাত সৃষ্টি করিয়াছেন, যাহার মাধ্যমে তিনি তাহার গোপন ভান্ডার "হোব্ব” প্রকাশ করিয়াছেন বা যাহার মধ্যে সেই হোব্ব রক্ষিত করিয়াছেন, সেই নবী করীম (সঃ) কে আল্লাহতায়ালার দীদার বা মেরাজের পথ ও সেই পথের কুলুপ বা চাবি কাঠি দিয়া দিলেন। আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে এজাজত লাভকরিয়া রাসূলে করীম (সঃ) বলিলেন,
الصَّلوةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ- 'নামাজ মোমীনদের জন্য মে'রাজ'। মোমিনগণ সালাতের মাধ্যমে আল্লাহকে দরশন করিতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
প্রশ্ন হইতে পারে, সালাত বা নামাজ মাত্র কয়েক মিনিটের, ইহার মাধ্যমে সেই সাত আসমান দূরে আল্লাহতায়ালার দরশন কি রূপে লাভ হইবে?
ইহার উত্তরে বলা যাইতে পারে, হযরত রাসূলে করীম (সঃ) সাত তলা আসমানেরও দূরে দোযখ, বেহেশত, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম রাখিয়া আপন প্রভু পরোয়ারদেগারের সাক্ষাৎ লাভ করিয়া আবার সেই মাটীর পৃথিবীতে ফিরিয়া আসেন। এই যাওয়া আসায় তিনি যে পথ অতিক্রম করিয়াছিলেন তাহা অতিক্রম করিতে যে সময় লাগিয়াছিল, সেই সময়ের হিসাব যদি পৃথিবীর সময়ের হিসেবে করা যাইতো, তাহা হইলে ২৭ বছরের সময়ের সমান হইতো। কিন্তু হযরত রাসূলে করীম (সঃ) মেরাজে গমন করিয়া ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন, যে-স্থানে তিনি ওজু করিয়াছিলেন, সেই স্থানে ওজুর পানি মরুভূমির বালুতে তখনও শুখায় নাই, ঘরের দরজার কড়া বা শিকল তখনও নড়িতেছে। বিছানায়
ফিরিয়া দেখিলেন, মেরাজে যাইবার সময়ে তদীয় দেহ মোবারকের উত্তাপে বিছানা যেমন গরম ছিল তদরূপই গরম রহিয়াছে। ইহার পরও হযরত নবী করীম (সঃ) আজান দেবার জন্য আহ্বান করিবার সময়ে "বেলাল আজান দাও" না বলিয়া বলিতেন, "বেলাল! আমার হৃদয়ে শান্তি দাও।" ইহা হইতে বোঝা যায়, হযরত রাসূলে করীম (সঃ) হযরত জীব্রাইল (আঃ) এর সহিত মেরাজে গমন করিয়া আল্লাহতালার দরশন লাভ করিয়াছিলেন, সালাত বা নামাজের মধ্যেও তিনি তৎরূপ আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য লাভ করিতেন। তাই তিনি বলিতেন, "নামাজ আমার হৃদয়ের শান্তি।" আর সেই শান্তি পাইবার জন্য আজান দেবার আহ্বান জানাইয়া হযরত বেলাল (রাঃ) কে বলিতেন, "বেলাল! আমার হৃদয়ে শান্তি দাও।"
বিজ্ঞাপন
নামাজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার দরশন লাভ করা যায়। নামাজের মত এত বড় নেয়ামত ও রহমত আল্লাহপাক মানুষকে আর দান করেন নাই। কারণ নামাজই প্রেমিক সাধককে আল্লাহতায়ালার প্রেমের হেরেমের গোপনতম কুঠরিতে লইয়া যায়-সেখানে প্রেমিক সাধককে তিনি নূরের পর্দা উন্মোচন করিয়া আপন জাত পাকের দর্শন দান করেন-এমন সৌভাগ্য অন্য কোনো আমল মানুষকে দেয় না বা অন্য কোনো আমলের মধ্যে মানুষ লাভ করিতে পারে না। তাই সকল আমলের মধ্যে নামাজই শ্রেষ্ঠতম আমল। তাই বলা হয়, 'মানুষকে প্রভুর নিকটবর্তী করে এই সালাত।'
হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর পূর্বে অন্য কোনো নবী (আঃ) বা ফেরেশতা এই মরতবা লাভ করেন নাই। তাই হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বলিয়াছেন, "আল্লাহতায়ালার সহিত মিলিত হইবার এমন নিকটতম অবস্থা অন্য কোনো নিকটতম ফেরেশতা ও নবী দিগের পক্ষেও সম্ভব হয় নাই।” আর এই যে সৌভাগ্য অর্থাৎ পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) ও সকল ফেরেশতা অপেক্ষাও আল্লাহতায়ালার নিকটবর্তী হইবার সুযোগ প্রেমিক সাধককে প্রদান করে সালাত বা নামাজ। তাই সালাত বা নামাজের মাহাত্ম ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা অসম্ভব। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) মেরাজে আল্লাহতায়ালার যে পরিচয় ও তাহার সন্দর্শনের পথে যে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন ও যে সকল স্তর বা দায়েরা সমূহ অতিক্রম করেন, তাহা আল্লাহতায়ালার তত্ত্বজ্ঞানী সূফী আরেফগণ কয়েকটি ভাগে ভাগ করিয়াছেন। তন্মধ্যের পাঁচটি ভাগ হইলঃ (১) হোব্বে ছেরফা, (২) মাবুদিয়াতে ছেরফা, (৩) দায়েরায়ে হকিকতে সালাত, (৪) দায়েরায়ে হকিকতে কাবা, (৫) দায়েরায়ে হকিকতে কুরআন। তবে ছালেক যেহেতু আল্লাহতায়ালার দয়ায় নিম্ন হইতে ঊর্ধ্বে উরুজ করেন; তাই তাহার শুরু হয় দায়েরায়ে হকিকতে কুরআন, দায়েরায়ে হকিকতে কাবা, দায়েরায়ে হকিকতে সালাত ও তাহার ঊর্ধ্ব আরোহন শেষ হয় মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্ব ছেরফার মাকামে।
ইহার প্রথম দুই দায়েরা দায়েরায়ে হকিকতে কুরআন ও দায়েরায়ে হকিকতে কাবা-হৃদয়ের পবিত্রতা আনয়ন করে, যাহাতে ছালেকের হৃদয়ে আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ স্থল হইতে পারে। এই দুই দায়েরায় উরুজ হইলে ছালেকের হৃদয় আল্লাহতায়ালার সিফাত ও জাতের ইতেবারের নূরে পবিত্র হইয়া যায়। হকিকতে সালাতের মাকামে ছালেক আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ স্থল বা আবাসস্থলের গুণাগুণ লাভ করে। কাবা হইল "বায়তুল্লাহ" বা আল্লাহর ঘর। হকিকতে কাবা হইল সেই ঘরের গুণ বা বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি। যে হৃদয় আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ স্থল বা আবাসের চিরস্থায়ী ঠিকানা হইয়া যায়, সেই হৃদয় আল্লাহতায়ালার আরশের গুণ অর্জন করে। এই হকিকতে কাবার মর্যাদা হকিকতে মুহাম্মদী অপেক্ষাও অধিকতর উচ্চতর, কারণ হকিকতে মুহাম্মদীর ছুরাত হযরত নবী করীম (সঃ) হকিকতে কাবার ছুরাত মক্কা মোয়াজ্জামার দিকে ফিরিয়া আল্লাহকে সেজদা করিয়াছেন। এই দুর্লভ সম্মান মানুষ নামাজের পথে বা সালাতের দায়েরা অতিক্রম করিবার পথে অর্জন করে। তাহার পর তাহার হৃদয় চিরদিনের জন্য আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল হইয়া যায়। আর তাহার পর লাভ হয় আল্লাহতায়ালার মেরাজ বা সন্দর্শন। তাই আমল হিসেবে নামাজের মর্তবা যে কত ঊর্ধ্বে; তাহা সাধারণ লোকে বুঝিতে পারে না। আর যে সাধকের হৃদয় আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল, সেই হৃদয় যে কত পবিত্র, তাহা কে বলিতে পারিবে? সেই সাধককে আল্লাহপাক সকল দোষ-ত্রুটি হইতে রক্ষা করেন; তাহার দ্বারা আর কোনো শরীয়ত বিরোধী কাজ হয় না। এমন উচ্চস্তরে কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালার নির্বাচিত সাধকগণই উন্নীত হন। সাধারণ মানুষ ঐ স্তরে নিজ চেষ্টায় উন্নীত হইতে পারেন না। আল্লাহপাক যাহাকে ঐ মর্তবা দান করেন, তিনিই কেবল ঐ গুণাগুণ ও মর্তবা লাভ করেন। তাই আল্লাহতায়ালা বলেন,
বিজ্ঞাপন
إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ
অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই নামাজ সকল নিন্দনীয় ও অপবিত্র কাজকে দূর করিয়া দেয়।' (সূরা আনকাবুতঃ ৪৫)
কারণ আল্লাহতায়ালার জাতি নূর সালাতের মাধ্যমে ছালেকের হৃদয়ে প্রবেশ করে। ছালেকের হৃদয় তাই তখন ঐ নূরের পবিত্রতা লাভকরে। আল্লাহপাক তাই তাহার অনুগ্রহ লাভের জন্য শান্তি প্রাপ্ত বা নাফসে মোৎমাইন্না প্রাপ্ত ছালেকের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা জড়জগত, নূরের জগত, সিফাতের রাজ্য পার হইয়া বসিয়া থাকিও না বা আল্লাহপ্রাপ্তির সাধনা শেষ করিও না; আল্লাহতায়ালার জাতের রাজ্যে বা তদীয় প্রেমের হেরেমের রাজ্যে আসিতে চেষ্টা কর ও আল্লাহতায়ালার রহমত ও অনুগ্রহের দরজায় উমেদার হইয়া অপেক্ষা কর। কারণ আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ না হইলে জাতের রাজ্যে পৌঁছানোও যায় না। আল্লাহপাক বলেন,
বিজ্ঞাপন
يَأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
অর্থাৎ- 'হে প্রশান্ত আতা! তুমি তোমার রবের দিকে ফিরিয়া যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন অবস্থায় এবং তুমি আমার বান্দাদের মধ্যে প্রবেশ কর এবং আমার জান্নাতে দাখিল হও।' (সূরা ফাজরিঃ ২৭-৩০)
হযরত মওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব ইহার তাফসির করিয়া বলেন, আল্লাহপাক মোৎমাইন্নাহ প্রাপ্ত আত্মার অধিকারীদের তাহার দিকে তাহার পূর্ণ মারেফাত অর্জনের জন্য ছুাটিয়া যাইতে বা আবেগাকুল হইতে আহ্বান জানাইয়াছেন। আল্লাহতায়ালার পূর্ণ মারিফতের জ্ঞানই হইল এই বেহেশত। তরীকতের পীরানে পীরগণ বলেন, কেয়ামতের মাঠে বিচার কার্য সমাধা হইয়া যাইবার পর আল্লাহতায়ালা দেখিবেন তাহার প্রেম আকাংখী বান্দাগণ তাহাকে ছাড়িয়া বেহেশতেও যায় নাই, দোজখেও যায় নাই। আল্লাহপাক তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিবেন, "হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! কেহবা বেহেশতে গেল, কেহবা দোযখে গেল, তোমরা এখনও এখানে বসিয়া আছ কেন? উত্তরে সাধকগণ বলিলেন, "হে মহান আল্লাহপাক! আমরা আপনার বেহেশতের লোভে বা দোযখের ভয়ে বন্দেগী করি নাই। আমরা বন্দেগী করিয়াছি আপনারই প্রেমে। আমরা আপনাকে ছাড়িয়া কোথাও যাইব না।" তখন আল্লাহতায়ালা বলিবেন, 'তোমাদের জন্য বেহেশত হইল আমার আরশের নীচে "দিদারে এলাহিয়ার মাকাম।" সেই স্থান হইতে অনাদি অনন্ত কাল তোমরা আমাকে দেখিতে পাইবে।" বেহেশতে যেমন আল্লাহপাককে দেখা মারেফাত জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ করা যায়; যাইবে, তেমনি দুনিয়া হইতেও আল্লাহপাককে দেখা যায়, আল্লাহতায়ালার হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব এই মারেফাত জ্ঞানকে দুনিয়ায় থাকিয়াই বেহেশত দেখিবার ও আল্লাহতায়ালাকে দেখিবার চাবি কাঠি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই জান্নাতে কোনো দুধের নহর বা প্রাসাদ নাই, এই জান্নাতে আছেন শুধু আল্লাহতায়ালা। এই জান্নাতের যাহারা সন্ধান পান, তাহারা কোনো অবস্থাতেই নামাজের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার দিদার বা মেরাজ লাভ না করিয়া তৃপ্ত হইতে পারেন না।
বিজ্ঞাপন
একটি ছহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, একদা হযরত রাসূলে করীম (সঃ) কয়েকজন ছাহাবীর সহিত একটি ঘরে বসিয়া আলাপ করিতেছিলেন। ছাহাবীগণ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, নামাজ না পড়িলে কি হয়? ইহার উত্তরে তিনি বলিলেন, "তোমরা এই ঘরে বসিয়া থাক।” এই কথা বলিয়া তিনি বাহির হইয়া গেলেন। যাইবার সময়ে তিনি ঐ ঘরের দরজা বাহির হইতে বন্ধ করিয়া গেলেন। ইতিমধ্যে নামাজের আজান পড়িল। সাহাবীগণ নামাজের জন্য বাহির হইতে চেষ্টা করিলেন। তাহারা হযরত নবী করীম (সঃ) এর সহিত মিলিত হইতে পারিতেছিলেন না। ফলে ছটফট করিতে লাগিলেন। অবশেষে ঐ ঘরের ছাউনি ভাংগিয়া তাহারা নামাজে গমন করিলেন। হকিকতে সালাত হাসিল হইলে অর্থাৎ নামাজের পূর্ণতা হাসিল হইলে যাহা হয়, তাহা হইল নামাজী তাহার সালাতের মধ্যে আলমে আখেরাতে নিমিষের মধ্যে চলিয়া যান। যে স্থানে যাইয়া তাহারা আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ করিয়া অনাবিল শান্তি পান। নামাজী ইহলোকে থাকিয়া আল্লাহতায়ালার সহিত মিলিত হইবার সৌভাগ্য লাভ করেন, যাহা জান্নাত বাসীরাও সকল সময় লাভ করিবেন না।
স্বয়ং হযরত রাসূলে করীম (সঃ) কে যে স্থানে যাইতে হযরত জীব্রাইল (আঃ) এর সংগী হইতে হইয়াছিল, রফরফ ও বোরাকে সওয়ার করিতে হইয়াছিল; নামাজ এমনই এক মোর্তবাময় মাধ্যম, যাহার দ্বারা নামাজী পরলোকে যাইয়া আল্লাহতায়ালার দরশনের ও তাহার সহিত মিলনের বেহেশতি শান্তি লাভ করিয়া আবার দুনিয়ায় আসিতে পারেন। নামাজের এই পূর্ণতা হকিকতে সালাতের মাধ্যমেই লাভ হয়। তরীকতের পীরানে পীরগণ বলেন, নিশ্চয়ই নামাজ অতি কঠিন সাধনা কিন্তু যাহাদের হৃদয় নামাজে বিগলিত হয়, তাহাদের জন্য নহে। যাহারা আল্লাহতায়ালাকে সামনা সামনি দেখিতে চাহেন, তাহার সহিত প্রেমময় মিলনে মিলিত হইতে চাহেন, তাহারা কোন বাধা দেখিয়াই থামিয়া যাইতে চাহেন না। বরং আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভের আশায় তাহারা আরও ব্যাকুল হন, আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ লাভের জন্য অপেক্ষা করেন। এই নেয়ামত আল্লাহতায়ালা যাহাকে দয়া করিয়া দান করেন, তিনিই পাইতে পারেন। আর মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহর পক্ষে কোন প্রেমিক সাধককে মুহূর্তে পরলোকে লইয়া নিজ সত্তার দর্শন দান পূর্বক আবার ফেরত পাঠানো অসম্ভব নয়। কারণ আল্লাহ বলেন-"নাহনু আকরাবো এলাইহে মিন হাবলিল ওয়ারিদ" অর্থাৎ-আমি তোমাদের প্রাণরগের চেয়েও নিকটে অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রতি তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বিদ্যমান। তাই তাহার ইচ্ছা হইলে তিনি যাহাকে খুশী দরশন দিতে পারেন, নিবিড়তম সান্নিধ্য দান করিতে পারেন-ইহাতে অস্বাভাবিকতা কিছুই নাই। কারণ আল্লাহতায়ালা আসমান ও জমিনের সর্বত্র বিরাজিত।
নাফসে মোৎমাইন্না ও আকরাবিয়াতের মাকামে উন্নীত হইবার পর মহব্বতের দায়েরা, বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা, শারহে ছদরের দায়েরা, কামালাতের দায়েরা, হকিকতে এলাহিয়া ও হকিকতে আম্বিয়ার দায়েরা সমূহ পার হইয়া, পূর্ণ ফানা লাভের পর ইহার সর্ব শীর্ষ বিন্দু "হোব্বে ছেরফা"-যে মাকামে ছালেক আল্লাহতায়ালার নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করে।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহপাক বলেন, তোমরা জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত পার হইয়া জাতের রাজ্যে আস; সেখানে আমি তোমাদের প্রেমময় সান্নিধ্য বা মিলন দান করিব। অর্থাৎ সেই স্তরের সাধক আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদার দরশন লাভ করিতে পারেন। আল্লাহতায়ালার জাতের উদ্দেশ্যে গমন করিতে হইলে তাই কামালাতে নবুয়তের দায়েরা সমূহে জড় দেহের সকল মালিন্য দূর করিবার পর হকিকতে কুরআন ও হকিকতে কাবার স্তরে সিফাতি ও জাতের ইতেবারের পরদা ভেদ করিয়া গমন করিতে হয়।
হকিকতে কুরআন আল্লাহতায়ালার কালাম সিফাতের একটি প্রকাশ, যাহা নিম্নে আসিয়া লওহে মাহফুজে রক্ষিত আছে। যে নির্বাচিত ছালেককে আল্লাহপাক দয়া করিয়া তদীয় সিফাতের রাজ্যে উন্নীত করেন, তাহার হৃদয় আল্লাহতায়ালা কালাম সিফাতের তাজাল্লিতে নূরময় বা আলোকিত করেন। কুরআন মজীদ কালাম সিফাতের ছরাতই শুধু নয়; ইহা লওহে মাহফুজে যেমন রক্ষিত আছে, তেমনি ইহা আল্লাহতায়ালার আদেশও বা হুকুমও বটে। বস্তুতঃ কুরআন মজীদ যদিও লওহে মাহফুজে রক্ষিত, তাহার মূল আল্লাহতায়ালার লার আমর বা আদেশ হিসেবে হাকীকী সিফাতের সিফাতে কালামের সহিত সংরক্ষিত। কুরআন মজীদ হইল আল্লাহতায়ালার নির্দেশ যাহা শরীয়তকে বর্ণনা করিয়াছে এবং এই কুরআন মজীদের নূরের বরকতে আমরা জানি তৎকালীন আরব জাহান ইতে আইয়ামে জাহেলিয়াত' যুগের অন্ধকার অবসান হয়। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহে তিনি তাহার যে পছন্দনীয় ব্যক্তির হৃদয়কে তদীয় হাকীকী সিফাতের আলোতে আলোকিত করিয়া দেন; তিনি হকিকতে কুরআনের স্তরের সাধক হিসেবে পরিগণিত হন। সাধক এই স্তরে উন্নীত হইলে যখন তিনি কুরআন মজীদ বা নামাজে কুরআন মজীদের আয়াত সমূহ তেলাওয়াত করিতে থাকেন, তখন কুরআন মজীদের অক্ষর সমূহ হইতে আল্লাহতায়ালার সিফাতের নূর তিনি তাহার আত্মিক দর্শনে দেখিয়া থাকেন। নামাজে দাঁড়াইলে তখন তিনি কুরআন মজীদের নূরের ধারা তাহার উপর পতিত হইতে দেখেন। ইহাতে আল্লাহতায়ালার সিফাতে কালামের পবিত্রতা সালেকের হৃদয় লাভ করে।
হকিকতে কাবাঃ নিছক জাতের দরশন দানের পূর্বে আল্লাহপাক ছালেকের হৃদয়কে কাবার হকিকতের গুণে গুণান্বিত ও উন্নীত করেন। হকিকতে কাবা হইল আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবারের নূরের পর্দা। আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহ হইতে সৃষ্টি রূপলাভ করিয়াছে ও বিরাজমান রহিয়াছে। ছালেকের হৃদয় যখন সমগ্র সৃষ্টি তথা আল্লাহতায়ালার সিফাতের জগতের আকর্ষণ হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব ভিন্ন অন্য সকল কিছু বিস্মৃত হয়, তখনই আল্লাহপাক ছালেকের হৃদয়কে হকিকতে কাবার স্তরে উন্নীত করেন। আল্লাহতায়ালা সকল প্রকার পার্থিব বস্তু তথা সৃষ্টি জগত হইতে পাক। আর যাহা আল্লাহতায়ালার আবাসস্থল হইবার যোগ্য-সে হৃদয়, সৃষ্টি জগত ও আল্লাহতায়ালার সমস্ত সিফাত সমূহের এমন কি আল্লাহতায়ালার সকল রহমত ও নেয়ামতের আকর্ষণ হইতে মুক্তি লাভ করিয়া কেবল আল্লাহতায়ালার জাতের আকর্ষণে হৃদয়কে নিবদ্ধ করে। তখন ছালেকের হৃদয় হকিকতে কাবার মর্যাদা লাভ করে। আল্লাহ বলেন, "আসমান জমিনে কোথাও আমার গুঞ্জায়েশ হয় না, আমার গুঞ্জায়েশ হয় কেবলমাত্র মোমিন লোকের কালবে- "কুলুবুল মোমিনীনা আরশুল্লাহ।"
বিজ্ঞাপন
পরিষ্কার করিয়া বলা যায়, যে সাধকের হৃদয় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুরই প্রতি আর কোনো আকর্ষণ নাই, সেই হৃদয় তখন আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশের গুণে গুণান্বিত হয়, আল্লাহতায়ালার আবাসস্থলের গুণে গুণান্বিত হয়। সেই হৃদয়কে তখন আল্লাহপাক তদীয় জাতের ইতেবারের পর্দার নূর দ্বারা সকল অপবিত্রতা হইতে মুক্ত করেন। সেই হৃদয়কে তখন আল্লাহপাক হকিকতে কাবার মর্যাদা দান করেন বা নিজের আবাস স্থল বলিয়া মনোনীত করেন। এই হৃদয় আল্লাহতায়ালার আমর শুনিবার স্থল হয় ও আল্লাহতায়ালার আবাসস্থলের পবিত্রতা অর্জন করে। মক্কা মোয়াজ্জমার কাবা ঘরের স্থিতি এই পৃথিবীর ধ্বংসের সহিত শেষ হইয়া যাইবে। কিন্তু কালব যখন হকিকতের কাবার অর্থাৎ কাবার গুণ লাভ করিয়া বায়তুল্লাহ বা আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশের মর্যাদা লাভ করে, সেই কালব তখন এমন এক অবিনাশী সত্ত্বা লাভ করে যাহার মহিমা মাটীর পৃথিবীর কাবা হইতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ হইয়া যায়। যে সাধকের হৃদয় আল্লাহতায়ালার রহম, করম ও একান্তই করুণাময়ের প্রেমে ঐ গুণ লাভ করে, ঐ স্তরের কালবের অধিকারী তখন আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নৈকট্য লাভ করেন। ইহার পর আসে হকিকতে সালাতের স্তর, যে স্তরে আল্লাহতায়ালার দিদার বা মেরাজ লাভ হয়। এই অবস্থা সর্ম্পকেই হযরত নবী করীম (সঃ) বলিয়াছেন তাঁহার পূর্বে অন্য কোনো নবী (আঃ) বা ফেরেশতা তাহা লাভ করেন নাই। এই দায়েরায় আসিলে হৃদয় আল্লাহতায়ালার প্রেমে ডুবিয়া থাকে-এই দায়েরায় আসিলে ছালেক নামাজের সময়ে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা ও হকিকতে সালাত-এই তিন দায়েরার নূর একই সাথে তিনটি উচু চূড়া বিশিষ্ট গুম্বুজের উপর হইতে তাহার উপর পতিত হইতে দেখে। ছালেক তখন তাহার নিজের সর্ব শরীরের প্রতি রেণুতে রেণুতে আল্লাহতায়ালার নূর দেখিতে পায়। তাহার প্রতি অংশ তখন আল্লাহপাকের জাতের সহিত বিলুপ্ত হইতে দেখিয়া থাকে। ইহাই মে'রাজতত্ত্ব। হযরত নবী করীম (সঃ) ইহাকেই 'আসসালাতু মে'রাজুল মোমিনীন' বলিয়াছেন। এই মাকামে নবী করীম (সঃ) এর যেমন মেরাজে খোদাপ্রাপ্তি হইয়াছিল, সেইরূপ নামাজের মধ্যেও যোগ্য উম্মতের খোদাপ্রাপ্তি সম্ভব হইয়া থাকে। আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া নির্বাচিত সাধককে আরও নৈকট্য দান করিলে সাধক পবিত্র জাত মোজাররাদাকে নিজ ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়া দ্বারা দর্শন করেন। ঐ স্তরের মাটীর দেহধারী সাধক আর দেহ লইয়া অগ্রসর হইতে পারে না। খোদাদত্ত শরীরের অর্থাৎ জাত মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার দ্বারাই সাধক পবিত্র জাত মোজাররাদার দর্শন লাভ করেন। এই স্তরে সাধক যে মাটীর দেহ লইয়া আর অগ্রসর হইতে পারেন না তখন সাধকের মনে পড়িয়া যায়, সাধক নিজে সৃষ্টির অন্তর্গত আর মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহতায়ালা স্বয়ং স্রষ্টা। তিনি তখন মাবুদের মহত্ব সম্পর্কে নতুনভাবে সচেতন হন; আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ সত্ত্বেও পরিপূর্ণ রূপে নিজেকে বান্দা বা দাস হিসেবে মনে করেন। তাই এই মাকামকে বলা হয় মাবুদিয়াতে সেরফা। এই মাকামে যেহেতু সাধক আল্লাহতায়ালাকে একক প্রভু হিসেবে দেখিতে পান তাই এই স্তরকে কলেমা ছাবেতের স্তরও বলা হয়। সাধক তখন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" স্বগতঃভাবেই বলিয়া উঠেন। এই রূপে জাত মোজাররাদার দরশন লাভ করিবার পর সাধক আবার নতুন করিয়া প্রেমার্ত হন আল্লাহতায়ালার জাত মোবারককে দেখিবার জন্য, আল্লাহতায়ালার অধিকতর নিবিড় সান্নিধ্য পাইবার জন্য আরও বেশী আকাংখী হইয়া ওঠেন। সেই পিপাসা বারংবার নামাজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিয়াও মেটে না, তাহা মিটিবার নয়।
আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদার দর্শন লাভ করিবার ও আল্লাহপাকের জাতের ইতেবারে পৌঁছানোর পূর্বে অর্থাৎ হকিকতে কাবার গুণে পৌঁছাইবার পূর্বে সাধককে আর একটি বিশেষ মাকাম দেয়া হয়। তাহা হইল হকিকতে মুহাম্মদী। এই হকিকত লাভ করিবার পর হকিকতে কাবার স্তরে পৌঁছাইতে হয়। এই হকিকতে মুহাম্মদীর অভ্যন্তরে আল্লাহপাক তদীয় গোপনভেদ বা তাহার প্রেম সংরক্ষিত করিয়াছেন। ঐ রূপে হযরত রাসূলে করীমও (সঃ) যখন আল্লাহতায়ালার প্রেমের কোর্বে ডুবিয়া জগত সংসার ভুলিয়া যাইতেন, তখন আল্লাহপাক দুনিয়ার দিকে ফিরাইয়া দিতেন। বলিতেনঃ হে আমার হাবিব! আপনি বলুন "আমিও তোমাদের মত মানুষ; তোমাদের সহিত আমার পার্থক্য হইল আমার নিকট ওহী আসে তোমাদের নিকট আসে না।"
এই যে কুল অর্থাৎ "বলুন" শব্দ ইহা একটি বিশেষ অবস্থা ও আমানত। এই "বলুন” শব্দের মাধ্যমে আল্লাহপাক হযরত রাসূলে করীম (সঃ) কে বলিয়া দিতেছেন, শুধু তোমার নিজের মধ্যে আমার কথা ভাবিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না-দুনিয়ার মানুষকে আমার পথে ডাকিয়া আনো। এই যে আল্লাহতায়ালার প্রতি সৃষ্টি জগতকে আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে আহবান ও আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে হেদায়েতের দায়িত প্রাপ্তি ইহাই হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর মধ্যে আল্লাহতায়ালার বিশেষ আমানত। এই আমানত হইল আল্লাহতায়ালার বিশেষ প্রেম বা হোব্বে ছেরফা। ইহা সর্ব প্রথম আল্লাহতায়ালার জাত পাকের মধ্যে উদ্ভত হইয়াছিল। এই হোব্বে ছেরফার উৎপত্তি স্থল "জাত লাতাইন”। এই জাত লাতাইনের দিকে আল্লাহতায়ালার প্রেমিক আরেফ চাহিয়া থাকেন, কিন্তু তিনি কিছুই বুঝিতে পারেন না। এই অক্ষমতার হাহাকার সাধক সারা জীবন বহিয়া বেড়ান। বারংবার আল্লাহতায়ালাকে নিবিড়ভাবে পাইবার জন্য সাধক অগ্রসর হইতে থাকেন। আর বারংবার আল্লাহপাক সাধককে সৃষ্টির প্রতি তাহার পক্ষ হইতে হেদায়েতের দায়িত্ব পালনের জন্য দুনিয়ায় দিকে ফিরাইয়া দেন। যেরূপ আল্লাহতায়ালা নিজেকে প্রকাশ করিবার জন্য সৃষ্টি করিয়াছিলেন, নিজের পরিচয় দানের জন্য সৃষ্টি করিয়াছিলেন, সেই রূপ আল্লাহতায়ালার পরিচয় প্রকাশ করিবার জন্য ঐ সাধক তখন আল্লাহপাকের পক্ষ হইতে দায়িত্ব পালন করেন। এই যে আমানত লাভ-ইহাই হোব্বে ছেরফা বা নিছক প্রেম বা অবিমিশ্র প্রেমের মাকাম।
এই হোব্বে ছেরফার আমানত প্রাপ্ত সাধকগণই আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে মানুষকে হেদায়েত করিয়া আল্লাহতায়ালার জাতে পৌঁছাইয়া দিবার কামালাত আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে লাভ করেন। এই রূপ হোব্বে ছেরফার মাকামে যে সাধক উন্নীত হন, তিনি আল্লাহতায়ালার মাহবুব বা প্রিয়তম হইয়া যান।
ঐ রূপ হোব্বে ছেরফার স্তরের সাধক ব্যতীত অন্য কেহই মাটীর পুতুলকে আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদার দর্শন দান করাইতে পারেন না। বর্তমান জামানায় নবী (আঃ) গণ নাই। আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে কোনো কিতাব পাঠানো হয় না। তাই ফেরেশতা জীব্রাইল আগমন করেন না। কিন্তু হোব্বে ছেরফার মাকামে উন্নীত সাধকগণ আল্লাহতায়ালার বিশেষ আমানত প্রাপ্ত হইয়া জীব্রাইলের মত দায়িত্ব পালন করিয়া মাটীর পুতুল তথা মানুষকে আল্লাহতায়ালার নিছক জাতের স্তরে লইয়া যান। তবে ঐ স্তরের সাধকের মাকাম জীব্রাইল (আঃ) এর বহু ঊর্ধ্বে কারণ জীব্রাইল (আঃ) সিদরাতুল মোন্তাহা অতিক্রম করিতে পারেন নাই। কিন্তু ঐ স্তরের সাধকগণ আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভকরিতে পারেন।
হে জাকেরান! তোমরা জানিয়া রাখ, আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন এমনি হোব্বে ছেরফার মাকামে উন্নীত সাধক যিনি তদীয় তাওয়াজ্জহ এত্তেহাদী দ্বারা খোদাতালাশীকে এক মুহূর্তে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখিতেন। বর্তমান জামানার মানুষের জন্য তিনি সেই কামালত রাখিয়া গিয়াছেন। যদি তোমরা হকিকতে কাবার মর্যাদা লাভ করিতে চাও, তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদার দর্শন লাভ করিতে চাও, তবে আমার দয়ালপীর, দস্তগীর, মহান পীর কেবলাজান হুজুর হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কামালাতকে বুঝিবার চেষ্টা কর। সেই কামালাতের মর্তবা অন্বেষণ করিবার চেষ্টা কর। তোমরা আমার দয়ালপীর দস্তগীর হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের পাক দেল মোবারকের সহিত দেল মিশাইতে চেষ্টা কর ও তাহার করুণা, দয়া ও মহব্বত লাভের জন্য জান মাল নেছার করিয়া কোর্বে এলাহী তথা জাত মোজাররাদার দর্শন ও সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা কর, তাহা হইলেই জীবন মরণ জয় করিয়া আল্লাহতায়ালার অমিয় প্রেম সূধা পান করিতে ও হায়াতে আবাদী লাভ করিতে পারিবা। হায়াতে আবাদী হইল এমন হায়াত যাহার শেষ নাই। কোনো সাধনাই ব্যর্থ হয় না। আল্লাহতায়ালার কাছে তাহার প্রেমের জন্য রোদন ও ক্রন্দন ব্যর্থ হইবার নয়। তাই আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ ও তাহার পক্ষ হইতে হেদায়েতকারী আমার দয়ালপীর দস্তগীর হযরত এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেবের মহব্বত ও অনুগ্রহ লাভের জন্য ক্রন্দন কর। হযরত রূমীর মত বল, "আমার জীবন আপনার হস্তে লইয়া লন কিন্তু হে মাবুদ! আপনার জাতের দর্শন হইতে আমাকে কখনও বঞ্চিত করিবেন না।" আল্লাহতায়ালার প্রেমে চোখের পানি আল্লাহতায়ালা ব্যর্থ হইতে দেন না।







