হকিকতে কা'বা সম্পর্কীয় আলোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হকিকতে কা'বা সম্পর্কীয় আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
পবিত্র কা'বা শরীফের আর এক নাম "বায়তুল্লাহ" বা আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ স্থলের গুণগত অবস্থা। আল্লাহতায়ালার অবস্থানস্থল কোনটি? ঘর বা গুঞ্জায়েশ স্থল। আর হকিকতে কা'বা অর্থ আল্লাহতায়ালার আল্লাহ বলেন, 'আসমান, জমিন কোথাও আমার গুঞ্জায়েশ হয় না, মোমিন বান্দার দেল ব্যতীত।' তাহা হইলে যে মোমিন বান্দার দেল আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল সেই মোমিন বান্দার দেল ও মক্কার কা'বার মধ্যে মিল ও পার্থক্য কি? উহাদের হকিকতই কি?
আল্লাহপাক পবিত্র কা'বা শরীফ সম্পর্কে বলেন,
وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- 'যে ব্যক্তি এই ঘরে প্রবেশ করিলেন, তিনি শান্তির মধ্যে আসিলেন।' (সূরা আলে ইমরানঃ ৯৭) আল্লাহপাকের এই কথার নিগুঢ় অর্থ কি?
হকিকতে কা'বার তাৎপর্য বুঝিতে হইলে এই কথার তাৎপর্য বুঝিতে হইবে। কা'বা শরীফের ইতিহাস হইতে জানা যায়, ফেরেশতাগণের জন্য যে উপাসনাস্থল বেহেশতে আছে, তাহার নাম "বায়তুল মামুর" সেই "বায়তুল মামুরের" অনুকরণে হযরত আদম (আঃ) এই ঘর তদীয় তওবা কবুলিয়তের পরে নির্মাণ করিয়াছিলেন। হযরত আদমের (আঃ) তওবা কবুলিয়তের স্মারক হিসেবে ফেরেশতাগণ বেহেশত হইতে 'হাজরে আসওয়াদ' নামক পাথর আল্লাহতায়ালার আদেশে এই কা'বা ঘরে আনিয়া স্থাপন করেন। এই পাথর চুম্বন করিলে হযরত আদম (আঃ) এর অনুসরণের খাতিরে গোনাহ মাফ হয় বলিয়া আমরা জানি।
হযরত নূহ (আঃ) এর প্লাবনের সময় এই কা'বা ঘর মাটিতে মিশিয়া যায়। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পুনরায় আল্লাহতায়ালার ইশারায় এই কা'বা ঘর ও 'হাজরে আসওয়াদ' আবিস্কার ও পুনঃ স্থাপন করেন।
বিজ্ঞাপন
আমরা কা'বা শরীফের ইতিহাস হইতে দেখিতে পাইতেছি যে, কা'বা শরীফ ধ্বংস হইতে মুক্ত নয়। বস্তুতঃ সমস্ত সৃষ্ট বস্তুই ধ্বংস হইবে-আল্লাহতায়ালার এই বিধান হইতে কিছুই মুক্ত নয়। কিন্তু মানুষের রূহ: যাহা "আমরে রাব্বি" বা আল্লাহতায়ালার হুকুম; তাহা এই পথিবীর ধ্বংসের সহিত ধ্বংস হইবে না। যে কা'বা ঘর চিরস্থায়ী নয়, সেই কা'বাঘর চিরস্থায়ী রূহকে শান্তি দান করিবে কি করিয়া? কিন্তু মাটীর পৃথিবীর ধ্বংসের সাথে সাথেই মক্কার কা'বা ঘরের বিনাশ হইবে; অতীতে ইহা ধ্বংসও হইয়াছে। সম্প্রতি খোদ মসজিদে হেরেমেই বিশংখলার খবরের কথা আমরা শুনিয়াছি। আর একবার মাত্র প্রবেশ করিলেই এই কা'বা ঘরে স্থায়ী ভাবে থাকা কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। বস্তুতঃ মূল খানা-এ-কা'বাতে সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করিতেও দেয়া হয় না। সাধারণ মানুষ এই ঘর তাওয়াফ করেন ও ইহার চতুঃপার্শ্বস্থ মসজিদে হেরেম শরীফে নামাজ পড়িয়া আসেন। তাহা হইলে এই ঘর যে চিরস্থায়ী শান্তি আনে বা আনিতে পারে তাহা নহে। এই ঘর যদি চিরস্থায়ী শান্তি আনিতে না পারে; তাহা হইলে আল্লাহপাক যাহা বলিলেন, 'যে ব্যক্তি এই ঘরে প্রবেশ করিলেন, তিনি শান্তির মধ্যে আসিলেন'। ইহার অর্থ কি? আল্লাহপাক বলিতেছেন, "তিনি শান্তির মধ্যে আসিলেন"-অর্থাৎ সেই শান্তি বিঘ্নিত হইবে না বা সেই স্থান হইতে আর ফিরিয়া আসিবার কথা নাই। কা'বা শরীফে যেমন স্থায়ী ভাবে থাকিয়া যাওয়া যায় না, সেখান হইতে সকলকেই দৈনন্দিন কাজের জন্য বাহির হইতে হয়, তেমনি ঐ ঘরে একবার প্রবেশ করিলে বা ঐ ঘর তাওয়াফ করিলে চিরস্থায়ী শান্তিতে থাকিতে পারা যায়, তাহাও নহে কারণ বহু ব্যক্তি যাহারা ঐ ঘর তাওয়াফ করিয়াছেন, তাহারা অশান্তির মধ্যে আছেন তাহার দৃষ্টান্তও কম নয়, তাহা হইলে আল্লাহপাক যে কা'বা ঘরকে চিরস্থায়ী শান্তির প্রতীক বা শান্তির আবাস বলিতেছেন, তাহা কি?
তাহা হইলে বোঝা যাইতেছে যে, আল্লাহপাক এই স্থানে কা'বা শরীফের বাহিরের চেহারার কথা বলিতেছেন না, বলিতেছেন কা'বা শরিফের হকিকত বা তাহার নিগুঢ় গুণ সম্পর্কে। সেই গুণ কোথায় রহিয়াছে? সেই স্থানেই হকিকতে কা'বা নিরূপিত আছে। কা'বার সহিত খোদাতায়ালার গুঞ্জায়েশ ওতপ্রোতভাবে সম্বন্ধযুক্ত কারণ কা'বা-আল্লাহর ঘর বা গুঞ্জায়েশস্থল। তাই খোদাতত্ত্বজ্ঞানী কামেল আরেফগণই আল্লাহতায়ালার আবাসস্থলের গুণগত অবস্থা যাহা হকিকতে কা'বা বলিয়া বর্ণিত সে সম্পর্কে অবগত আছেন। কা'বা শরীফের সহিত ইসলামের দুইটা প্রধান রোকন নামাজ ও হজু যুক্ত। হজু ও নামাজের উভয়েরই চরম প্রাপ্তি আল্লাহতায়ালার দিদার। নামাজে নিহিত আছে আল্লাহতায়ালার দিদার বা মিলন। হজ্বের সময়ও কা'বাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিতে হয়: যাহার তাৎপর্য হইল আল্লাহতায়ালার জাতপাকের পর্দা হিসেবে যে সাতটি হকিকত নিরূপিত আছে তাহা অতিক্রম করিয়া আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভ। মক্কার কা'বা প্রদক্ষিণ করিলে বা তাহার চারিপার্শ্বে সাতবার তাওয়াফ করিলে হজ্বের বাহ্যিক নিয়মাবলীর একটি পালন করা হয় কিন্তু হজ্বের যে হকিকত তথা আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভ তাহা অর্জন করা সম্ভব হয় না। তাহা হইলে হকিকতে কা'বার নিগুঢ় অর্থ কি?
খোদাতালাশী ব্যক্তিগণ জানেন, আল্লাহতায়ালার দর্শনের অর্থাৎ মেরাজের বা হকিকতে সালাতের ঠিক পূর্বের স্তর হইল হকিকতে কা'বা অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাতের নিকটতম নূরের যে পর্দা বা “হেজাবুন নূর” তাহাই হকিকতে কা'বা। এই হকিকতে কা'বা নামক নূরের পর্দা অতিক্রম করিয়াই হযরত রাসূলে করীম (সঃ) মহাপবিত্র মেরাজের রাত্রিতে পরম প্রভু দয়াল স্রষ্টা রাহমানুর রাহিমের জাতপাকের দর্শন লাভ করিয়াছিলেন। যিনি আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নূরের পর্দা অতিক্রম করিতে পারিয়াছেন, আল্লাহপাকের জাতের সাক্ষাৎ মাবুদিয়াতের সেরফার মাকাম হইতে 'ওজুদ মাওহুব লাহু'র কুওতে নজরীয়ার দ্বারা লাভ করিয়াছেন, তাহাকে আল্লাহতায়ালা তদীয় জাতপাকের পর্দার নিরাপত্তা দান করিয়া সকল গোনাহ হইতে হেফাজতের আশ্বাস প্রদান করিয়াছেন। যে রূপে তিনি আবরাহার হাত হইত কা'বাকে রক্ষা করিয়াছেন সেই রূপে যে দিল হকিকতে কা'বার স্তর বা আল্লাহতায়ালার জাতের নূরের পর্দার স্তর পর্যন্ত সেই মহীয়ান গরীয়ান প্রভুর দয়ায় উন্নীত হইয়াছে সেই দেলকে সকল গোনাহ ও ধ্বংস হইতে রক্ষা করেন-সেই দেলই আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ করিবার সম্মান লাভকরে ও সেই দেলই আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল হইয়া যায় বা হকিকতে কা'বার গুণ লাভ করে।
বিজ্ঞাপন
হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণ বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে কেবলা করিয়া সালাত বা নামাজ আদায় করিতেন। কিন্তু রাসূলে করীম (সঃ) ই প্রথম কা'বাকে কেবলা করিয়া নামাজ আদায় করিবার আদেশ প্রাপ্ত হন এবং তিনি সানন্দে সেই আদেশ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং আমরাও আমাদের নবী (সঃ) এর অনুসরণ করিয়া এই পৃথিবীর কা'বার দিকে ফিরিয়া সেজদা করি। কিন্তু কা'বার দিকে ফিরিয়া কা'বাকে সেজদা করি না: সেজদা করি আল্লাহপাককে। নামাজের নিয়ত কা'বাতিশ শরিফাতে বলিয়া শেষ হয় না, শেষ হয় কা'বাতিশ শরিফাতে আল্লাহু আকবর বলিয়া। আবার সেজদার সময় দেলকে মোতাওয়াজ্জুহ করি আল্লাহর দিকে। সেজদাও দেই আল্লাহকে। তাহা হইলে কা'বার দিকে ফিরি কেন? আল্লাহর কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নাই। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। তাহার জাত, সিফাত ও আফয়ালও সর্বত্র বিরাজমান।
নামাজের সময় একমাত্র আল্লাহতায়ালার দিকে মোতাওয়াজ্জুহ হইতে হইবে এই কথা মনে করাইয়া দিবার জন্যই এই সুনির্দিষ্ট কা'বা ঘর। কা'বা ঘরকে আল্লাহতায়ালার প্রতীক করা হইলে তাহা হইলে শেরেক আসিয়া পড়িবে। মানুষের সৃষ্ট কোনো বস্তু আল্লাহতায়ালার প্রতীক হইতে পারে না; তাই আল্লাহতায়ালার জাতের নিকটতম নূরের পর্দা যাহা আল্লাহতায়ালার জাতি নূর দ্বারা পবিত্র ও যে স্থানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুই নাই, সেই আল্লাহতায়ালার শুধু মাত্র জাতকে হৃদয়ে স্থান দিয়া হৃদয়কে কা'বার মত পবিত্র করিয়া তাহাকে সেজদা করিবার তাগিদ দিয়া-এই ঘর নির্মাণ করা হইয়াছে। মক্কার কা'বা কা'বার হকিকতের পার্থিব ছুরাত আর হকিকতে কা'বা আল্লাহতায়ালার জাতের নিকটতম অধ্যায়। তাই হকিকতে কা'বার পবিত্রতা এত উচ্চে যে, স্বয়ং রাসূলে করীম (সঃ) পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নিকটতম নূরের পর্দার দিকে তাকাইয়া আল্লাহকে সেজদা করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার সিফাত ও জাতের মধ্যবর্তী যে নূরের হেজাব বা পর্দা সেই স্তরকেই হকিকতে কা'বা বলা হইয়াছে। বস্তুতঃ এই স্তর আল্লাহতায়ালার জাতের নিকটতম অধ্যায়। রাসূলে করীম (সঃ) এর ছুরাত তাই হকিকতে কা'বার ছুরাতের দিকে সেজদা করিতে দ্বিধা বোধ করেন নাই। আর যেহেতু রাসূলে করীম (সঃ) এই জাতের নিকটতম পর্দার দিকে সেজদা করিয়াছেন, তাই মনে করিতে হইবে যে, ঐ স্তর হকিকতে মুহাম্মদী হইতেও উচ্চ স্তরে এবং মাবুদিয়াতে ছেরফার স্তরের সীমানা পর্যন্ত; যে স্থান হইতে খোদা দত্ত শরীর 'ওজুদ মাওহুব লাহু'র কুওতে নজরীয়া দ্বারা আল্লাহপাকের জাতের দর্শন পাওয়া যায়।
জাতপাকের নিকটতম নূরের পর্দা হিসেবে যে হকিকতে কা'বা নিরূপিত আছে তাহার অবস্থান ও ব্যাখ্যা প্রসংগে তরিকতের পীরানে পীরগণ বলিতেছেন, আল্লাহতায়ালার সিফাত রাজ্যের উপরে রহিয়াছে আল্লাহতায়ালার শানের রাজ্য। এই শানের রাজ্য হাকীকী সিফাত সমূহের উপরের স্তরে। হাকীকী সিফাতের নামের মতই শানের রাজ্য সমূহের নামকরণ হইয়াছে। যেমন শানে হায়াত, শানে এলেম, শানে কুদরত, শানে এরাদত, শানে ছামাওয়াত, শানে বাছারত, শানে কালাম, শানে তকবীন। এই শান রাজ্যকে কাবেলিয়াতে ইত্তেছাল' বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
তরীকতের পীরানে পীরগণ বলিতেছেন, আল্লাহপাকের শান সমূহের মধ্যে শানে হায়াত সর্বোচ্চ। তাহা হইলেও শানে এলেমের সহিত আল্লাহপাকের জাতের যে সম্পর্ক; সেই নিবিড় সম্পর্ক অন্য কোনো শানের নাই। আল্লাহপাকের জাতের সহিত তাহার শানে এলেমের এমন এক উচ্চতম সম্পর্ক রহিয়াছে যাহাকে ছেরেফ নূর বা নূরে ছেরেফ ছাড়া আর কিছু দ্বারা বর্ণনা করা যায় না। কিন্তু এই শানে এলেমের নূরময় জগৎ আল্লাহতায়ালার জাতেরই জেলাল। ইতিপূর্বে হকিকতে কুরআনের মাকাম বর্ণনা করা হইয়াছে। কুরআন পাকের হরফ ও কালাম বা আয়াত সমূহের হকিকত এই নূরে ছেরেফের উপর বর্তমান।
কিন্তু শানে এলেমের উপরে আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবার যে নূরে ছেরেফের জগতের কথা উপরে বলা হইয়াছে যাহা হকিকতে কা'বার স্তর, তাহা সৃষ্ট বস্তু নয়। ইহা জাতের কোনো স্তরও নয়। ইহা জাত পাকের নূরের পর্দা যাহা তাইয়ূনে অবস্থিত রহিয়াছে এবং ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার দ্বারা বুঝিতে পারা যায়। আল্লাহতায়ালা আমাদের মকসুদ; তদীয় জাতের নূরের পর্দাও আমাদের কাম্য নয়। তবে এই নূরের পর্দার স্তরের পরই আল্লাহতায়ালার জাত পাক। এই নূরের পর্দা অসংখ্য। এই ছেরেফ নূরের পর্দা আল্লাহপাক বিনা উদ্দেশ্যে রাখেন নাই। এই নূরের পর্দা হইল কা'বায়ে রাব্বানীর হকিকত। মকতুবাত শরীফে এই নূরের পর্দা বা কা'বায়ে রাব্বানীর হকিকত সম্পর্কে বলা হইয়াছে। ইহা যেমন চিন্তা ও দৃষ্টি হইতে বহু দূরে অবস্থিত, সেই রূপ ইহা কাশফ ও শহুদ' হইতেও অনেক দূরে। সহজে ইহার নিকটে পৌঁছানো যায় না। এই কা'বার হকিকত আল্লাহতায়ালার চিরস্থায়ী জাতপাকের হেজাব বা পর্দা। ইহাও চিরস্থায়ী বা কদীম; হাদেস বা বিনাশী নহে। কা'বার এই চিরস্থায়ী হকিকত বুঝিতে হইলে ইট পাথরের কা'বা নয়, আল্লাহতায়ালার চিরস্থায়ী জাতের হেজাব বা পর্দা তথা ছেরেফ নূরকে বুঝিতে হইবে। ইহার হকিকত সাধারণের জ্ঞানের সীমার বাহিরে। মক্কা শরীফে ইহার যে প্রকাশ, তাহা ধ্বংস হইলেও ইহার হকিকতের বা গুণের ধ্বংস নাই। তাই পার্থিব ছুরাতের জ্ঞান দ্বারা পার্থিব ছুরাতের কা'বাকে তওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করা যাইতে পারে; আল্লাহতায়ালা হজ্জ করিবার যে হুকুম দান করিয়াছেন, তাহা বাহ্যিক ভাবে পালন করা যায়। কিন্তু হকিকতে কুরআনের স্তরের জ্ঞান না থাকিলে যেমন কুরআন মজীদের নূর দেখিতে পারা যায় না; তেমনি হকিকতে কা'বার স্তরে না পৌঁছাইলে হকিকতে কা'বা যেমন চিরস্থায়ী শান্তির গুণাগুণ ও গুণগত অবস্থা বহন করে সেই শান্তির স্বাদ পাওয়া যাইবে না-আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নূরের হেজাব বা পর্দা সমূহের মধ্যে যে নিরাপত্তা, সেই নিরাপত্তাও লাভ করা যাইবে না। আর কা'বা যে সর্ব অবস্থার কেবলা তাহাও বোঝা যাইবে না। তাহা হইলে প্রশ্ন কা'বার ছুরাতে যাইয়া হকিকতে কা'বার শান্তি ও নিরাপত্তা যখন পাওয়া যাইবে না; কি উপায়ে হকিকতে কা'বার শান্তি ও নিরাপত্তা লাভকরা যাইতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর হইল হকিকতে কা'বার স্তরে যাহা পৌঁছাইতে পারে তাহা হইল মানুষের হকিকত। আল্লাহপাকের অসীম কুদরত হযরত রাসূলে করীম (সঃ)। তিনি মেরাজে গমন করিয়া আল্লাহতায়ালার নূরের পর্দা ভেদ করিয়া জাতপাকের দর্শন ও আশেক মাশুকের যে মিলন, সেই মিলনের স্বাদ গ্রহণ করিয়াছেন। তাই হকিকতে মুহাম্মদী হকিকতে কা'বার পর্দা অতিক্রম করিয়া জাত পাকের দর্শন যখন লাভকরেন, তখন হকিকতে মুহাম্মদীও মেরাজের গুণে সমৃদ্ধ হইয়া এক নতুন ধনে ধনী হন। আল্লাহতায়ালার জাতপাক ব্যতীত সকল কিছুরই হাকীকীরূপ আলমে মেছালে রহিয়াছে, যাহা ওলী আল্লাহগণ তদীয় ওজুদ মৌহুব লাহুর কুওতের নজরে এবং কালবী নেত্রে দেখিতে পারেন। জাতপাকের ইতেবার বা নিকটতম পর্দারও ঐরূপ একটি হাকীকী ছুরাত আলমে মেছালে রহিয়াছে। হকিকতে কা'বার এই হাকীকী ছুরাত আলমে মেছালে দেখা যায়। তাহার পার্থিব রূপ দেয়া হইয়াছে মক্কার কা'বা শরীফে। ছুরাতে কা'বা যেমন ছুরাতে মুহাম্মদীর "মসজুদ ইলাইহে" বা সেজদা করিবার স্থান অর্থাৎ যাহা সেজদা করিবার দিক নির্দেশ করে কিন্তু সেজদার আরাধ্য বা উদ্দেশ্য নয়, তদ্রুপ হকিকতে কা'বাও হকিকতে মুহাম্মদীর সেজদার স্থান বা মসজুদ ইলাইহে। কা'বা তাই বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালার জাত পাকের নিকটতম নূরের হকিকতে আও আদনা" বলা হইয়াছে। ধনুকের ছিলার সহিত তীরের সম্পর্ক একটা হেজাব যাহার পরই জাতপাক। তাই এই স্তরকে "কা'বা কাওছাইনে যেমন, তেমন হকিকতে কা'বার সহিত জাত পাকের সম্পর্ক।
বিজ্ঞাপন
মক্কার কা'বার হাকীকী গুণে পৌছাইতে হইলে মানুষকেও তাহার হাকীকী গুণে পৌঁছাইতে হইবে। শুধু তাহাই নহে; হকিকতে মুহাম্মদীর গুণও অর্জন করিতে হইবে। তাহা হইলেই মানুষ কা'বার হাকীকী ছুরাতের অভ্যন্তরে পৌছাইতে পারিবে ও আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নূরের পর্দা যেমন সকল পংকিলতা হইতে মুক্ত ও পবিত্র তেমনি মুক্ত ও পবিত্রতা অর্জন করিতে পারিবেন। হকিকতে মুহাম্মদীর গুণ অর্জন করিতে হইলে হযরত রাসূলে করীমের (সঃ) অনুসরণ ও মহব্বত লাভকরিতে হইবে।
হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী, মুজাদ্দেদ আলফেছানী, কাইয়ুমে জামানী, মাহবুবে ছোবহানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাত শরীফের বিভিন্ন মকতুবে ও 'মাবদা ওয়া মায়াদ' নামক গ্রন্থে হকিকতে কা'বার তাৎপর্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
তিনি তদীয় মকতুবাত শরীফে বলিতেছেন, আরশের প্রকাশ সমূহ যদিও সমগ্র তাজাল্লি ও জহুর হইতে উচ্চ কিন্তু বায়তুল্লাহ শরীফের সংগে যে সব অবস্থা জড়িত, তাহা সমস্ত তাজাল্লি হইতে উচ্চ অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাত ভিন্ন অন্য সকল নূর হইতে হকিকতে কা'বার নূরের মর্তবা ও শান বহু উচ্চে।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) আরশ ও হকিকতের কা'বার মধ্যে তুলনা করিয়া বলিয়াছেন, আরশ হইল বৃত্তাকার নূরের জেল্লী যাহাকে দায়েরায়ে মুহিতও বলা হয়। আর হকিকতে কা'বা হইল দায়েরায়ে মুহিত নামক যে নূরের বৃত্ত তাহার কেন্দ্র। বৃত্তের পরিধি প্রশস্ত হইলেও বৃত্তের কেন্দ্র সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের নবীগণের কা'বা বায়তুল মোকাদ্দাস ছিল। তাহা ছিল আরশের বা দায়রায়ে মুহিতের বৃত্তের অনুসরণে। শেষ অবস্থায় তাহার অর্থাৎ বায়তুল মোকাদ্দাসের জহুরাতের কামালাত এই কা'বা মোয়াজ্জামার দিকে অর্থাৎ বৃত্তের কেন্দ্রের দিকে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে এবং তাহার সহিত মিলিয়া গিয়াছে। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর নিকট যখন কা'বার এই হকিকতের মারেফাত প্রকাশিত হইল, তখন তিনি তদীয় কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস হইতে খানায়ে-কা'বার দিকে প্রবর্তন করিলেন। কেননা কা'বার হকিকত যেহেতু আল্লাহতায়ালার জাতের রোশনী সাদৃশ্য নূরসমূহের কেন্দ্র হিসেবে নিরূপিত, তাই বায়তুল মোকাদ্দাস যাহা আরশের বেষ্টনকত তাজাল্লির বত্তের প্রতীয়মান তাহার কেন্দ্রের সহিত মিলিত হওয়া ছাড়া উপায় নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, আল্লাহপাকের অনুগ্রহে কা'বার হকিকতের সহিত মিলিত হইবার সুযোগ তাহার হইয়াছে এবং তাহার পর অসংখ্য উন্নতি লাভ হইয়াছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের উপরোক্ত বক্তব্য হইতে বোঝা যায় হকিকতে কা'বা বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালার জাতের নিকটবর্তী সর্বোচ্চ নূর। তথাপিও যাহাদের আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভের মাকছুদ তাহাদের গন্তব্য ঐ স্থানে যাইয়াই শেষ নয়; তাহাদের গন্তব্য আল্লাহতায়ালার জাত লাতাইন পর্যন্ত।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, হকিকতে কুরআন ও হকিকাতে কা'বায়ে রাব্বানীর স্থান হকিকতে মুহাম্মদীর উপরে। সুতরাং হকিকতে কুরআন হকিকতে মুহাম্মদীর ইমাম ও পথ প্রদর্শক এবং হকিকতে কা'বায়ে রাব্বানী হকিকতে মুহাম্মদীর সিজদার স্থান হইয়াছে। আরও লক্ষণীয় যে, হকিকতে কা'বায়ে রাব্বানীর দরজা হকিকতে কুরআনের উপরে। ঐ স্থানের অবস্থা সম্পূর্ণ বে-সিফাতি ও রেরংগি, আর এই মাকামে শান ও ইতেবারের কোনো স্থান নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, তাঁহাকে এই মহান মারিফতে ভূষিত করা হইয়াছে ও ইহার সব কিছুই আল্লাহতায়ালা ও তদীয় হাবিবের দানে ও বরকতে তাহার নসীব হইয়াছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আবার বলিতেছেন, কা'বার ছুরাত বা আকৃতি যেমন বস্তুর ছুরাতের সেজদার স্থান তদ্রুপ হকিকতে কা'বাও ঐ সমস্ত বস্তুর হকিকতের সেজদার জায়গা। ইহার পর হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব একটি আশ্চর্য ধরনের কথা বলিয়াছেন, যাহা তৎপূর্বে আর কেহ বলেন নাই। হযরত শায়েখ আহমদ সিরহিন্দী (রাঃ) ছাহেবকে আল্লাহপাক এলহামের মাধ্যমে জানান যে, হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর ওফাতের এক হাজার বছর পর এমন এক জামানা আসিবে, যখন হকিকতে মুহাম্মদী স্বীয় মাকাম হইতে ঊর্ধ্বগমন করিয়া হকিকতে কা'বার সহিত মিলিত হবে। এই সময়ে হকিকতে মুহাম্মদীর নাম হইবে হকিকতে আহমদী এবং তাহা আল্লাহতায়ালার একক জাতের জাল্লা সুলতানুহুর প্রকাশ স্থল হইবে। তখন উভয় মোবারক নাম মুহাম্মদ ও আহমদ হকিকতে কা'বা ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যস্তিত হইবে। এই সময়ে হকিকতে মুহাম্মদীর প্রথম মাকাম খালি থাকিবে এবং তা' ততোদিন খালি থাকিবে যদ্দিন না হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করিবেন। তিনি অবতরণের পরে শরীয়তে মুহাম্মদীর উপর আমল করিবেন। এই সময়ে হকিকতে ঈসুবী স্বীয় মাকাম হইতে উরুজ করিয়া হকিকতে মুহাম্মদীর শূন্য স্থানে অবস্থান গ্রহণ করিবেন।
হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, কা'বার হকিকতের অর্থ আল্লাহতায়ালার প্রকার বিহিন জাত যাহা মসজুদ হইবার যোগ্য এবং যে দিকে এই গুণ বা যাহার মধ্যে এই গুণ ধারনকৃত তিনি মাবুদ হইবার যোগ্য। এই হকিকত তাই রাসূলে করীম (সঃ) এর সেজদার দিক নির্দেশক হইয়াছে যদিও হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ) বিশ্ব জগতের অন্য সকলের হকিকত হইতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কা'বার হকিকত সৃষ্ট জগতের নহে। তাই তাহা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মকছুদ বা সেজদার দিক নির্দেশক হইতে কোনো বাধা নাই।
তরিকতের ওলীগণ বলিতেছেন, এই কা'বার হকিকতের মধ্যে প্রবেশ না করিলে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা আসিতে পারে না। ছুরাত লইয়া ছুরাতী কা'বার তাওয়াফ করিলে আল্লাহতায়ালা যে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার কথা বলিয়াছেন, তাহা পাওয়া যাইবে না। আর হকিকতের স্তরে ফিরিয়া না গেলে হকিকতে কা'বার স্তরে যাওয়া যাইবে না। অর্থাৎ রাসূলে করীম (সঃ) এর হকিকত বা হকিকতে মুহাম্মদীর যে গুণ তাহা অর্জন না করিলে হকিকতে কা'বার স্তরে বা তাহারও পরে পরম প্রভুর সহিত মিলনের স্তরে যাওয়া যাইবে না। এই হকিকত কি রূপে অর্জন করিবেন?
বিজ্ঞাপন
হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব কুরআন মজীদের একটি আয়াতের তাফসির করিয়া তাহার ব্যাখ্যা দিয়াছেন। আল্লাহপাক কালামুল্লাহ শরীফে বলিতেছেন,
بأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً
فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
বিজ্ঞাপন
এই আয়াতপাকের দুই বা ততোধিক তাফসির রহিয়াছে, ইহার নিগুঢ় অর্থ হইল, "হে আল্লাহতে শান্তি প্রাপ্ত আত্মা! তোমার রবের দিকে ফিরে যাও খুশী ও সন্তুষ্টচিত্তে: আমার বান্দাগণের শামিল হও এবং দাখিল হও আমার জান্নাতে।" (সূরা ফাত্রিঃ ২৭-৩০)
হযরত মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, ঐ আয়াতের শেষ অংশে "দাখিল হও আমার জান্নাতে" অর্থ আল্লাহতায়ালার মারেফাত লাভ করা। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেবের এই ব্যাখ্যার পক্ষে অতি জোরালো বক্তব্য রহিয়াছে। শরীয়তে বলা আছে, এমন একটি জান্নাত রহিয়াছে যেখানে হুর, মধু বা প্রাসাদ নাই, আছেন শুধু আল্লাহ। আল্লাহপাক এই বাক্যে "ওয়াদ খুলী জান্নাত।” অর্থাৎ আমার জান্নাতে প্রবেশ কর বলিতে ঐ হুর ও প্রাসাদ বিহীন শুধু আল্লাহময় জান্নাতের কথাই বলিয়াছেন। তাই হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, শুধু আল্লাহময় বেহেশতে প্রবেশ অর্থ আল্লাহতায়ালার মারেফাত ও মহব্বতের জান্নাত। ইহার পর হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "আল্লাহতায়ালার প্রকৃত বান্দা আল্লাহকে রাখিয়া কখনও প্রাসাদ বা হুরের জন্য যাইতে পারেন না। আর খাঁটী বান্দাদের দলভুক্ত হইবার অর্থ যাহারা আল্লাহতায়ালার মারেফাত ও মহব্বত লাভকরিয়াছেন, তাহাদের দলভুক্ত হওয়া। তাই হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব কুরআন মজীদের উদ্ধৃতি করিয়া বলেন, "আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন মজীদে বলেন, 'হে আমার বান্দা! তোমরা আমার খাঁটী বান্দাদের সাহচর্যে উপস্থিত হও। তাহা হইলেই তোমরা বেহেশতের সর্ব শ্রেষ্ঠ নেয়ামত আমার সাক্ষাৎ লাভ করিতে পারিবে।' হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেবের উপরের বক্তব্যে যে কুরআন মজীদের নিগুঢ় অর্থ প্রকাশিত হইয়াছে; তাহা বলাই বাহুল্য। আল্লাহপাককে লাভ করিতে হইলে যে কামেল আরেফগণের কালবে প্রবেশ করিতে হইবে বস্তুত তাহাই আল্লাহপাক বলিতেছেন। আল্লাহ বলেন, "আসমান-জমিন, আরশ-কুরছি, লওহ-কলম আমাকে ধারন করিতে পারে না; মুমিন বান্দার দেল ব্যতীত।" আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিতেছেন-'অফি আনফুছিকুম আফালা তুবছিরুন' অর্থাৎ- 'আমিতো তোমাদের ভেতরেই আছি, তোমরা কেন আমাকে দেখ না?' আল্লাহপাক আরও বলেন,
'আনা ছিরুরুল ইনসানু; আল ইনছানু ছিররী অর্থাৎ- 'আমি মানুষের আদামা আলা ছরাতেহি।' অর্থাৎ- 'আল্লাহপাক আদম (আঃ) কে তাহার ভেদ, মানুষ আমার ভেদ।' তিনি আবার বলেন, 'ইন্নাল্লাহা খালাকা নিজ গুণসমূহ দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছিলেন।' বস্তুতঃ মানবদেহে আল্লাহতায়ালা তদীয় আরশের উপরের জগতের উপাদান কালব, রূহ, ছের, খফি ও হইলে আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের নূরসমূহ যেমন হায়াত, এলেম, আখফা লতিফাসমূহ দ্বারা সজ্জিত করিয়াছেন: যে লতিফাসমূহ জাগ্রত কুদরত, এরাদত, ছামাওয়াত, বাছারত, কালাম প্রভৃতি আল্লাহতায়ালার নিজস্ব গুণের নূর হইতে খোদাতালাশী ব্যক্তি নূর লাভ করিতে পারে এবং নিজেকে আল্লাহতায়ালার নূরের গুণে গুণান্বিত করিতে পারে। আল্লাহতায়ালা এই গুণ সযত্নে রাখিয়াছেন মাটির দেহে যে মাটী আল্লাহতায়ালার ধৈর্য গুণের প্রতীক।
এই গুণ ইনছানকে বা মানুষকে আল্লাহতায়ালা তদীয় হাকীকী সিফাতসমূহ হইতে দান করিয়াছেন। এই গুণ মানুষের মধ্যে গুপ্ত রহিয়াছে। তাহা জাগ্রত করাইতে হইলে আল্লাহতায়ালাকে যাহারা চিনিয়াছেন, আল্লাহতায়ালার গুণাগুণ নিজেদের মধ্যে অর্জন করিয়াছেন; এমন কামেল আরেফ বা খোদা তত্ত্বজ্ঞানী অর্থাৎ যিনি খোদা তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিয়াছেন এবং অন্যকে সেই জ্ঞান দান করিতে পারেন, তেমন খোদাতত্ত্বজ্ঞানীর সাহচর্য ও তত্ত্বাবধানে থাকিতে হইবে, তদীয় কালবের যে গুণ, সেই গুণ অর্জন করিতে হইবে। আল্লাহপাক যেহেতু বলেন, তাহার গুঞ্জায়েশ মোমিন বান্দার দেল তাই মোমিন বান্দার দেলেই হকিকতে কা'বা বা আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থলের গুণাগুণ রহিয়াছে, তিনি দয়া করিয়া হকিকতে কা'বার গুণ অর্জনের পথ শিক্ষা দান করিতে পারেন। এই জ্ঞান যে শিক্ষা দেয়া যায় তাহা হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর হাদীসে আসিয়াছে। মাটীর মানুষের মধ্যে হযরত রাসূলে করীমই (সঃ) প্রথম মানুষ যিনি এই হকিকতে কা'বা অতিক্রম করিয়া আল্লাহতায়ালার জাত মোজারাদার দর্শন লাভ করিয়াছিলেন। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বলিতেছেন, এই জ্ঞান তিনি আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের কালবে রাখিয়া গিয়াছেন। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) হইতে ঐ জ্ঞান আজও সূফী সাধকগণের মধ্যে আত্মা পরম্পরায় চলিয়া আসিতেছে। এই জ্ঞান লাভ করিয়া আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদা ও জাত লাতাইনের জ্ঞান লাভ করিবার পথ তাই খোলা রহিয়াছে। এই জ্ঞানে জ্ঞানী আরেফের নিকট যাইবার জন্যই কুরআন মজীদে তাগিদ রহিয়াছে।
সূরা কাহাফে আমরা দেখিতে পাই হযরত মুসার (আঃ) মত উলুল আজম পয়গম্বরকে আল্লাহতায়ালা মারিফাতের জ্ঞানে জ্ঞানী হযরত খাজা খিজির (আঃ) এর নিকট গমন করিবার নির্দেশ দান করেন। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিতেছেন, 'যাহারা তাহার পথে হেদায়েতকারী ওলীয়ে মোর্শেদের সাক্ষাৎ পান নাই তাহারাই ভুলপথে বহিয়াছে ও আল্লাহতায়ালার হেদায়েত হইতে বঞ্চিত।' ওলীয়ে মোর্শেদ বা আল্লাহতায়ালার পথ প্রদর্শনকারী যাহাদের স্বয়ং আল্লাহপাক ওলী বা বন্ধু বলিয়া সম্মানিত করিয়াছেন, তাহারা আল্লাহতায়ালার জ্ঞান মানুষকে দান করেন কেমন করিয়া? এই প্রসংগে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব পীরজাদা খাজা আব্দুল্লাহ (রঃ) এর নিকট লিখিতেছেন, জ্ঞান, কল্পনাদৃষ্ট ও কাশফ ঘটিত যাহা কিছু, তাহা আফাকী হউক বা আনফুছি হউক; সমস্তই নফি যোগ্য বা আল্লাহতায়ালা হইতে পৃথক করিয়া ত্যাগ করিবার যোগ্য। খোদাতত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী খোদাতালাশী ছালেকের লতিফাসমূহে নফি এছবাত জেকের সংযোজন করিয়া আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছু হইতে তাহার দেলকে জুদা করিয়া দেন। এই যে খোদা ভিন্ন সকল কিছু হইতে মুক্ত দেলের অবস্থা বা খোদা ভিন্ন অন্য সকল কিছুর আকর্ষণ হইতে দেল যখন মুক্ত হয়, সেই দেল তখন হকিকতে কা'বার পবিত্রতা অর্জন করে। সেই দেলে তখন পার্থিব কোন গ্লানি ও পাপ থাকিতে পারে না। তখন সেই পবিত্র দেলে আল্লাহতায়ালার মারেফাত ও মহব্বত আসিতে থাকে। আল্লাহতায়ালার মারিফতের জ্ঞান আসিতে থাকে। যিনি ঐ রূপে আল্লাহভিন্ন অন্য সমস্ত কিছুকে ত্যাগ করিতে পারেন তিনিই আল্লাহতায়ালার মহব্বত ও মারেফাত লাভ করিতে পারেন। তদীয় দেল তখন কা'বার হকিকত বা কা'বার গুণের মর্যাদা লাভ করিয়া আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল হইয়া যায়। সেই দেল তখন এমনই পবিত্রতা লাভ করে যাহা বেহেশতের শান্তি হইতে আরও অধিক শান্তিময় হয়। আল্লাহ ভিন্ন অন্য সকল বস্তুর মারফাতআকাংখা মুক্ত হইবার অবস্থা যদি বিনা কষ্টে লাভ হয়, বা কষ্ট ছাড়াই দেল নফি পর্যন্ত পৌঁছাইয়া যায় অর্থাৎ সকল প্রকার সংকীর্ণতা হইতে মুক্ত হয়, তাহা হইলে দেল তরীকার সংকীর্ণতা হইতে মুক্ত হইল, এলেমের গলি হইতে মুক্ত হইয়া প্রশস্ততার পথে গেল এবং আল্লাহতায়ালার ফানার সহিত সম্মানিত হইল। ইহা আকরাবিয়াতের অতি উপরের অধ্যায়। এই কথা বলা সহজ কিন্তু ঐ পর্যন্ত পৌঁছানো খুবই কঠিন তবে যাহার জন্য আল্লাহপাক সহজ করিয়া দেন তাহার কথা স্বতন্ত্র।
অনুগ্রহে উন্নীত হইয়াছেন, তাহারা জানান, এই মাকামে উন্নীত হইলে দায়রায়ে হকিকতে কা'বার স্তরে যে সকল পীরানে পীরগণ আল্লাহপাকের ছালেক আত্মিক দৃষ্টিতে দেখিতে পান যে, সৃষ্টির প্রতিরেণু রেণু হকিকতে কা'বার দিকে সেজদা করিতেছে। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, যিনি এই হকিকতে কা'বার মোকাম হাসিল করিয়াছেন, তদীয় দেল সর্বত্রই হকিকতে কা'বা অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নূরের দ্বারা পবিত্র ও আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত মিশিয়া যায়। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যে কা'বা তৈরী করিয়াছিলেন, এই হকিকতে কা'বা তাহার চেয়ে অধিকতর পবিত্র।
আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর, হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কূঃ) ছাহেব- যাহার মত ওলী হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেবের পর এই দুনিয়ায় আসেন নাই। তিনি হকিকতে এলাহিয়ার জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন। তিনি নিজেই যে শুধু হকিকতে কা'বার গুণে গুণান্বিত ছিলেন তাহাই নহে, তিনি খোদাতালাশী ছালেককে এই গুণে গুণান্বিত করিতে পারিতেন।
কাজেই, তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার জাতের দর্শন লাভ করিতে চাও, আপন দেলকে কা'বার হকিকতের গুণে গুণান্বিত করিতে চাও, তাহা হইলে আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুরের পবিত্র কদমে নেছার হইয়া যাও। তদীয় পাক দেলে দেল মিশাইবার জন্য ইহ-পরকালের সকল কিছু ত্যাগ কর। তাহা হইলেই তাহার দেল হইতে আল্লাহপাকের মারেফাত ও মহব্বতের ভেদতত্ত্ব তোমাদের দেলে আসিবে-শুধু আল্লাহময় যে জান্নাতের কথা শরীয়তে বলা আছে- সেই জান্নাতের খবর তোমরাও লাভ করিবে। আল্লাহ তোমাদের দয়া করিয়া তাহার মারেফাত লাভের বাসনা দান করুন ও সেই মকছুদ হাসিল করিবার পথ সহজ ও প্রশস্ত করিয়া দিন।





