Logo

হকিকতে আহমদীর হাল, বৈশিষ্ট্য ও আত্নিক অনুভূতি নিয়ে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:২৪
হকিকতে আহমদীর হাল, বৈশিষ্ট্য ও আত্নিক অনুভূতি নিয়ে আলোচনা
ছবি: সংগৃহীত

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হকিকতে আহমদীর হাল, বৈশিষ্ট্য ও আত্নিক অনুভূতি নিয়ে আলোচনা। হকিকতে মুহাম্মদীর সাথে হকিকতে আহমদীর পার্থক্য নিরুপণ এবং মুহাম্মদ ও আহমদ নামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণঃ

বিজ্ঞাপন

মানব জীবনের লক্ষ্য তাহার উৎপত্তিস্থলে ফিরিয়া যাওয়া। মানুষের উৎপত্তিস্থল আল্লাহতায়ালার জাতপাক। শরীয়তে বলা আছে, 'এমন একটি সময় ছিল, যখন আল্লাহপাক ছাড়া আর কিছুই ছিল না; কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।' তখন আল্লাহতায়ালার নিছক জাতপাকে প্রেম প্রকাশিত হইল। এই প্রেম প্রকাশের জন্যই তিনি সৃষ্টি জগতকে সৃজন করিলেন। সৃজন করিলেন, তদীয় খলিফা হিসেবে মানুষ। এই মানুষই হইল আল্লাহতায়ালার প্রেমগ্রহীতা ও প্রেম প্রকাশের স্থল। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ বলেন, "তিনি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলেন, প্রকাশিত হইতে ভালবাসিলেন। তাই সৃষ্টি জগত সৃজন করিলেন।" এই গুপ্ত ধনভান্ডার কি? খোদা-তত্ত্বজ্ঞানী সাধকগণ আল্লাহতায়ালার প্রেমকেই তদীয় গুপ্ত ধন ভান্ডার বলিয়াছেন। এই প্রেম বা "হোব্ব" গুণ দিয়াই আল্লাহপাক তদীয় খলিফা, তাহার প্রেমের প্রকাশস্থল ও প্রেমগ্রহীতা মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহ তাই ফেরেশতাদের বলিলেন, "ইন্নি জায়েলুন ফিল আরদে খালীফা" অর্থাৎ তিনি পৃথিবীতে তাহার খলিফা প্রেরণ করিবেন। আল্লাহতায়ালার গুপ্ত ধন ভান্ডার যে মানুষের মধ্যে তিনি রাখিলেন, সেই মানুষকেই তিনি তদীয় খলিফা হিসেবে প্রেরণ করিলেন। মানুষের মধ্যেই রহিল আল্লাহতায়ালার কামালাতের পরিপূর্ণ প্রকাশস্থল। তাই একই সাথে আল্লাহতায়ালার কামালাতের প্রকাশস্থল, তাহার প্রশংসাকারী ও ইবাদতকারী হওয়াতেই মানুষের পরিপূর্ণতা। আল্লাহতায়ালার কল্পনায় এই যে প্রেমগ্রহীতা ও ইবাদতকারীর কথা ভাবিলেন, তাহা হইতে বোঝা যায়, সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহতায়ালার জাতপাকে একই সাথে-একটি প্রেমিক সত্ত্বা ও একটি প্রেম গ্রহীতা, এই দুই সত্ত্বা বর্তমান ছিল। সেই অবস্থায় আল্লাহ ছিলেন নিজেই প্রেমাস্পদ, নিজেই প্রেমিক। তাহার নিজের মধ্যেই ছিল উপাসক ও উপাস্য সত্ত্বা।

আল্লাহতায়ালার কল্পনা জগতের সেই উপাসক সত্ত্বা, প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ সত্ত্বা-সেই সত্ত্বা বিকাশের জন্যই সষ্টিজগত। আল্লাহতায়ালার কল্পনা নিখুঁত। আল্লাহতায়ালার জাতে যে ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী সত্ত্বা, যে প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ সত্ত্বার উৎপত্তি হইয়াছিল, তাহাকে জাতি প্রেমিক সত্ত্বা ও জাতি প্রেমাস্পদ সত্ত্বা অর্থাৎ মাহবুবিয়াতে জাতি ও মহব্বতে জাতি সত্তা বলে। আল্লাহতায়ালার এই মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতি বা জাতি প্রেমিক ও জাতি প্রেমাস্পদ সত্ত্বার গুণ লাভের মাধ্যমেই আল্লাহতায়ালার জাতের জগতের গুণ মানুষ লাভকরিতে পারে-মানুষ তখন তাহার উৎপত্তিস্থল আল্লাহতায়ালার জাতের জগতে ফিরিয়া যাইতে পারে।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, "আল্লাহপাক সকল কিছুর আগে যাহা সৃষ্টি করিলেন, তাহা আমার নূর। সকল কিছুর আগে যাহা সৃষ্টি করিলেন, তাহা আমার রূহ। সকল কিছুর আগে যাহা সৃষ্টি করিলেন তাহা আমার জ্ঞান। সকল কিছুর আগে যাহা সৃষ্টি করিলেন তাহা আমার কালাম। আমার নূর হইতেই তাবৎ জগত সৃষ্টি।" আল্লাহতায়ালা ইহাও ঘোষণা করিলেন, রাসূলে করীম (সাঃ)কে সৃষ্টি না করিলে তিনি এই বিশ্ব জগতের কোনো কিছুই সৃষ্টি করিতেন না। এমন কি নিজ প্রভুত্বও তিনি প্রকাশ করিতেন না।

বিজ্ঞাপন

তাই দেখা যাইতেছে যে, আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি করার যে কল্পনা, তাহার নিখুঁত ও প্রথম প্রকাশ হইল হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর হকিকত। অর্থাৎ রাসূলে করীম (সাঃ)-ই আল্লাহতায়ালার নিখুঁত সৃষ্টি। তিনিই তাহার প্রথম প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ। তাই এই জগতে আসিবার পরও মহা পবিত্র মেরাজের রাত্রিতে আল্লাহতায়ালা তদীয় জাত পাকের সহিত মিলনের জন্য হযরত রাসূল করীম (সাঃ) কে সাত আসমানের ঊর্ধ্বে নিজ সন্নিধানে লইয়া যান। সেই সাক্ষাৎকারের সময়ে আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জীব্রাইল (আঃ) কেও বাহিরে থাকিতে হয়। সিদরাতুল মোনতাহা পার হওয়ার অধিকার তাহারও ছিল না।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পর তদীয় শ্রেষ্ঠ অনুসারী হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব রাসূলে করীম (সাঃ) এর সাধনার মাকাম সমূহ অনুসরণ করিয়া, আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভকরেন। আল্লাহতায়ালার মহা পবিত্র জাতে যে নিখুঁত ইবাদতকারী, প্রেমিক সত্ত্বা ও প্রেমাস্পদ সত্ত্বার সৃষ্টি হইয়া ছিল, সেই সত্ত্বার পার্থিব রূপ হইল হযরত রাসূলে করীম (সাঃ)। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে এবং আল্লাহপাক ও সৃষ্টি জগতের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করিয়া আল্লাহতায়ালার জাতপাকে পৌঁছাইবার গুণ লাভের জন্য সাধনার পথ, মাকাম সমূহ ও হকিকতসমূহ চিহ্নিত করেন। এই সকল গুণাগুণ অর্জন ও সাধনার দ্বারা আল্লাহতায়ালার নিখুঁত ইবাদতকারী, প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ সত্ত্বার গুণ লাভ করা সম্ভব।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) দ্বারা চিহ্নিত এই মাকাম ও খোদাতায়ালার জাত পাকে পৌঁছাইবার পথ অনুসরণ করা খোদাতত্ত্ব সাধনার পথিকদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ। কারণ মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার জাতে পৌঁছাইবার জন্য যে পথ ও মাকাম সমূহ চিহ্নিত করিয়াছেন, তাহার পূর্বে অন্য কোনো ওলী তাহা চিহ্নিত করেন নাই; যদিও সেই জ্ঞান, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) হযরত আবুবকর সিদ্দিকীর (রাঃ) মারফত রাখিয়া গিয়াছেন। বরং হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বের যুগের সূফী সাধকগণ তৌহিদে ওজুদীর স্তরে তাহাদের খোদাতত্ত্বজ্ঞান সাধনা শেষ করিতেন। ইহাতে বস্তুতঃ নূরে মুহাম্মদীর জ্ঞান লাভ হইত। হকিকতে মুহাম্মদী অর্থাৎ যে হকিকত বা গুণবাচক সত্ত্বা লইয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সান্নিধ্য লাভ করিয়াছিলেন সেই হকিকত বা গুণবাচক সত্ত্বা তাহারা লাভ করেন নাই। ওহদাতে ওজুদের দ্বারা আল্লাহতায়ালার যে জ্ঞান লাভ করিতেন তাহা সিফাতে এজাফিয়ার' জ্ঞান। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার গুণসমূহের প্রতিবিম্বের জ্ঞান; আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান নয়। পক্ষান্তরে হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে যে জ্ঞান লাভ হয়, তাহা আল্লাহতায়ালার হাকিকী গুণ সমূহের স্তর ভেদ করিয়া আল্লাহতায়ালার জাত পাকের জ্ঞান। আল্লাহতায়ালার জাত পাক হইতে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মেরাজের রাত্রে যে জ্ঞান লাভকরিয়াছিলেন, সেই জ্ঞান।

বিজ্ঞাপন

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যে গুণগত সত্ত্বার দ্বারা মেরাজে গমন করিয়াছিলেন সেই সত্ত্বা ও গুণাগুণ আল্লাহপাকের তরফ হইতে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব লাভ করিয়াছিলেন। সেই জন্য তদীয় পীর কেবলা হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছিলেন, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ও হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানীর (রাঃ) পীর স্বয়ং আল্লাহ। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর মত পীর আসমানের নীচে আর কেহ আসেন নাই।

এই জ্ঞান তিনি হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর তোফায়েলী ও অনুসরণের দ্বারাই লাভ করেন। শুধু তাহাই নহে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ইহাও খোদাতত্ত্ব সাধকদের স্মরণ করাইয়া দেন যে, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর আহমদ ও মুহাম্মদ-উভয় নামই কুরআন মজীদে রহিয়াছে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উভয় নামের নিজ নিজ কামালাত ও তাৎপর্য আছে। রাসূলে করীম (সাঃ) এর মুহাম্মদ নামের হকিকতকে হকিকতে মুহাম্মদী ও আহমদ নামের হকিকতকে হকিকতে আহমদী বলিয়া তিনি উল্লেখ করিয়াছেন।

রাসূলে করীম (সাঃ) এর মুহাম্মদ নামের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, মুহাম্মদ নামের মধ্যে আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ ও প্রেমিক-এই উভয় মরতবা বিদ্যমান। কখনও আল্লাহতায়ালা নবী (সাঃ) এর প্রেমিক। আবার কখনও নবী (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রেমিক। কখনও আল্লাহতায়ালা নবী (সাঃ) এর প্রেমাস্পদ; কখনও নবী (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ। এই নামের মধ্যে দেখা যায় আল্লাহ ও রাসূলে করীম (সাঃ)-উভয়েই উভয়ের প্রেমিক। আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদত্বকে মাহবুবিয়াতে জাতি এবং প্রেমিকত্বকে মহব্বতে জাতি বলে। সৃষ্টির প্রথমে আল্লাহতায়ালার মহা পবিত্র জাতে মহব্বত প্রকাশ করা ও মহব্বত গ্রহণ করা-এই দুই অবস্থাই বর্তমান ছিল। অর্থাৎ মাহবুবিয়াতে জাতি ও মহব্বতে জাতি-এই দুই অবস্থাই সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহতায়ালার জাতে উদ্ভব হইয়াছিল। জাতপাক যখন পরিচিত হইতে চাহিলেন, তখন প্রেমিক সত্ত্বাকে তাইয়্যুনে আউয়ালে রাখিয়া দিলেন নিজের অসীমতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য। প্রেমিকত্ব বোধকে বাহির করিয়া দেওয়ার সময়ে তাহার মধ্যে প্রেমাস্পদত্বের যে গুণ আসিয়া গিয়াছিল, তাহাও তাহার সহিত নিজের ভেদ হিসেবে দেয়া হইল। এই জন্য জাত হইতে সরাইয়া দেয়া প্রেমিকত্বের সত্ত্বা হইল রূহে মুহাম্মদী বা প্রথম সৃষ্টি। এই হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে প্রেমাস্পদত্ব ও প্রেমিকত্ব উভয় অবস্থা রহিয়াছে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে আল্লাহতায়ালার প্রেমিক সত্ত্বার যে গভীর কেন্দ্র তাহাই প্রেমাস্পদত্বের সত্ত্বা।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ইহাকে হকিকতে আহমদী বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছেন। হকিকতে আহমদীতে আল্লাহ যে অবস্থায় নিজে আশেক বা মোহেব বা প্রেমিক সেই অবস্থা বর্তমান। এই মাকামে সৃষ্টির দিক হইতে কোনোরূপ প্রেমাকর্ষণ আল্লাহতায়ালার দিকে যায় না, বরং আল্লাহতায়ালার দিক হইতে প্রেম সৃষ্টির দিকে আসে। সৃষ্টির প্রেম হইতে আল্লাহতায়ালার প্রেম প্রবাহ অনেক প্রবল, অনেক বেগবান, অনেক নিখুঁত। জাত পাকের তরফ হইতে প্রেম তাহার প্রেমাস্পদের নিকট যতই বেশী আসিয়া জমে, ততই ঐ প্রেমাস্পদ প্রেমিক আল্লাহতায়ালার দিকে উন্মুখ ও নিঃস্বার্থ হইয়া যায়। আল্লাহতায়ালা যখন কাহাকেও ভালবাসেন, তখন তাহার ভিতর হইতে নিজস্ব অস্তিত্ব ক্রমে ক্রমে ধ্বংস করিয়া দেন। এমন কি ছালেকের নিজের উপরও মহব্বত সম্পূর্ণ চলিয়া যায়। যেমন আল্লাহতায়ালা বলিয়াছেন, "হে রাসুল! শুধু আমি আর তুমি। তুমি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে তাহা তোমার জন্যই সৃষ্টি করিয়াছি।" ইহার উত্তরে নবী (সঃ) বলেন, "হে আল্লাহ! শুধু আপনি, আমি নহে। আপনার জন্য আমি আমাকেও ত্যাগ করিলাম।" আল্লাহতায়ালা খোদাতত্ত্ব সাধককে যে পরিমানে ভালবাসেন, খোদাতত্ত্ব সাধকও সেই পরিমানে অন্যকে, এমন কি নিজেকেও কম ভালবাসেন। শুধু তাহাই নহে। সেই সাথে নিজের অজ্ঞতা, অযোগ্যতা ও অক্ষমতাকে তিনি চরমভাবে অনুভব করিতে থাকেন। সাধক সর্ব দিক দিয়া অক্ষম এবং খোদাতায়ালার উপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল হইতে থাকে। এই মাকামে আসিলে খোদাতত্ত্ব সাধক বুঝিতে পারেন, সৃষ্টি বলিতেই কলঙ্ক ও অন্ধকার, দোষ ও ত্রুটিপূর্ণ। এই স্তরে উন্নীত হইলে খোদা তত্ত্ব সাধক বুঝিতে পারেন যে, তাহার নিজস্ব কোনো জ্ঞান বা গুণ নাই। সকল জ্ঞান ও গুণই আল্লাহতায়ালার হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, ছামাওয়াত, বাছারত, কালাম, তাকবীন ইত্যাদি গুণের প্রতিবিম্ব। এই সকল গুণ আল্লাহতায়ালার জাতে যেমন রহিয়াছে, তেমনি রহিয়াছে জাতের পর্দা বা হাকীকী সিফাত সমূহে। আল্লাহতায়ালার এই হাকীকী সিফাত সমূহ হইতেই মানুষ সকল গুণ লাভ করিয়াছে।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব, "হকিকতে আহমদী” মাকামে আপন আত্মিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানাইয়া তদীয় মুর্শিদ কেবলার নিকট যে পত্র প্রদান করেন, তাহাতে উল্লেখ করেন, উক্ত মাকমে উপনীত হইবার পথ গুলি হইল নিম্নরূপঃ- (১) নিজেকে সর্ব নিকৃষ্ট জানা, নিজের নিয়ত ও উদ্দেশ্যসমূহ দোষণীয় মনে করা, (২) আল্লাহতায়ালার আকর্ষণ, (৩) যে মুর্শিদ কেবলা ঐ মাকাম অর্জন করিয়াছেন, তাহার সংগ ও তদীয় মহব্বত লাভ করা।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব অতঃপর বলিতেছেন, তদীয় পীর কেবলার তোফায়েলে আল্লাহপাক তাহাকে নিজেকে অযোগ্য, কোনো আমল করি না কেন, তাহা এত দোষণীয় ও কদর্য মনে হয় যে অক্ষম ও অজ্ঞ ভাবিবার জ্ঞান দান করিয়াছেন। তিনি বলিতেছেনঃ-যে তাহাকে নানা প্রকারে দোষী মনে না করা পর্যন্ত মনে শান্তি পাই না। আমার ধারণা যে, আমি যে নেক আমলই করি না কেন, তাহা আমার দক্ষিণের ফেরেশতা লিখিবার উপযোগী নয়। আমার ধারণা আমার নেকীর আমল নামা শূন্য, নেকী লিখিবার ফেরেশতা যেন বেকার বসিয়া আছেন, কি ভাবে খোদাতায়ালার দরবারের যোগ্য হইব? অতএব নিখিল বিশ্বে যাহা কিছু আছে, বরং ফিরিংগি, কাফের এবং বেদীনও যেন আমার চেয়ে উৎকৃষ্ট। আমি যেন সব চেয়ে নিকৃষ্ট।”

বিজ্ঞাপন

"নাফহাতুল উজুছ" কেতাবের উদ্ধৃতি দিয়া হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেব উল্লেখ করেন, "নাফসের যখন ব্যক্তিত্ব থাকে না, তখন তাহার কোনো আছরও থাকে না।"-এই মাকামে নাফসের ব্যক্তিত্ব হীনতা বলিতে যে অবস্থা বোঝা যায় তাহা সাধকের উপলব্ধিতে আসে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব জানান, আল্লাহতায়ালা এই রহস্য তাহার নিকট প্রকাশ করিলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন, নাফসের ব্যক্তিত্ব বলিতে তখন আর কিছুই থাকে না। তিনি নিজের অবস্থাও ঐরূপ প্রাপ্ত হইলেন। তাই তাহার মনে এই বিষয়ে আর সন্দেহও থাকিল না। উক্ত স্তরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব স্থায়ী হালাত লাভকরেন। ইহা অতি অল্প সংখ্যক লোকের ভাগ্যে ঘটে বলিয়া তিনি জানান।

এই মাকামের আরও কিছু আত্মিক অভিজ্ঞতা জানাইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মোর্শেদ কেবলাজানকে জানান, তিনি লিখিতেছেন "ইচ্ছা শক্তির ফানা হইয়া গেল। যাহা লেখনির বর্ণনার বহির্ভূত সেখানে স্বীয় ইচ্ছা শক্তি বা এরাদার ফানা হইয়া গেল। পূর্বে জানাইয়া ছিলাম, মূল এরাদা বা আকাংখা আছে অথচ উহা কোনো কাম্য দ্রব্যের সহিত সংশ্লিষ্ট নহে। ইদানীং দেখিতেছি যে, এরাদা বা ইচ্ছা সমূলে উদপাটিত, অতএব কোনো ইচ্ছাও নাই, কোনো কাম্য বস্তুও নাই। এই ফানার আকৃতিই পাইলাম। এই মাকামের কতিপয় এলেমও লাভ করিলাম। উক্ত এলেম সমূহ এত সুক্ষ্ম ও গুপ্ত যে তাহা লিখিবার শক্তি আমার নাই।

এই ফানা ও এলেম সমূহ প্রাপ্তির পরে ওয়াহদাতুল অজুদ' এর উপর একটু বিশেষ লক্ষ্য পড়িয়াছিল। যদিও নির্ধারিত আছে যে, ওয়াহদাতের পরে কোনো রূপ নজর চলে না; তথাপি তিনি ঐ স্তরের অনুভূতি নিম্নরূপে ব্যক্ত করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

"উক্ত মাকাম যে ওয়াহদাতের পরে তাহা এই রূপ প্রকাশ্যভাবে দৃষ্ট হইল যেমন আগ্রা দিল্লীর পরে। ঐ অবস্থায় ওয়াহদাত বা তাহার বাহিরেও কিছু দৃষ্টি গোচর ছিল না। কোনো মাকামকে আল্লাহ বলিয়া কিম্বা তিনি তাহার পরে অবস্থিত বলিয়া জানিতাম না। অজ্ঞতা ও হয়রানী পুরাপুরি ছিল। অবস্থা বুঝিতেছি কিন্তু বলিতে পারিতেছি না। বাক্য, কার্য, চিন্তা, দর্শন প্রভৃতির মধ্যে যাহা কিছু আল্লাহতায়ালার অপছন্দীয়, তাহা হইতে আমি তাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি এবং তাহার দিকে প্রত্যাবর্তন করিতেছি। আরও বুঝিতেছি যে পূর্বে যাহাদিগকে সিফাত সমূহের ফানা বলিয়া মনে করিয়াছিলাম, উহা প্রকৃত পক্ষে সিফাতের ফানা নয়; বরং সিফাতের বিশিষ্ট বস্তুর ফানা। খোদাতায়ালার জাতে আহাদতের প্রাবাল্য যেন কিছুই ছাড়িল না, বিস্তৃত এলেম ও সংক্ষিপ্ত এলেমের মধ্যে যে পার্থক্য দৃষ্ট হইত তাহাও রহিল না। খারেছ বা প্রকৃত অনাদি জগতের প্রতি দৃষ্টি পড়িল। হাদীস শরীফে আছে "আল্লাহই ছিলেন, আর কেহই ছিলো না এবং খোদাতায়ালা যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন।" আমারও তদ্রুপ আত্মিক অনুভূতি লাভ হইল। ইতিপুর্বে এই হাদীস পাক সম্পর্কে জানিতাম কিন্তু তদ্রুপ হালাত ছিল না।"---

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হকিকতে আহমদী সম্পর্কে আরও বলিতেছেন যে, হকিকতে মুহাম্মদী নামক যে বৃত্ত জাতে পৌঁছাইবার জন্য নিরূপিত, হকিকতে আহমদী সেই বৃত্তের কেন্দ্র। এই হকিকত আল্লাহতায়ালার বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের উৎপত্তিস্থল। এই হকিকত হইতেই জাতি মাহবুবিয়াতের প্রকাশ পায়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই হকিকতকে বলিয়াছেন-হকিকতে কাবার সমমর্যাদার। তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে এই হকিকত হকিকতে সালাত, হকিকতে কাবা ও হকিকতে কুরআনের সমমর্যাদার। এই মাকামে মোরাকাবা করিতে হইলে নিয়ত করিতে হয় যে বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের প্রকাশস্থল হকিকতে আহমদী হইতে ফয়েজান আসিয়া পড়িতেছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব, তদীয় মোর্শেদ ছালেকের "ওজুদ মাওহুব লাহু" হইয়া হায়াতে ওহাদানীর শরীরে কেবলা হযরত বাকী বিল্লাহকে একটি পত্রে জানান- "অনেক মাকাম দৃষ্টি গোচর হয়, যাহার একটি অন্যটি অপেক্ষা উচ্চ ছিল: যখন তা থেকে অধিকতর উচ্চ মাকামে পৌঁছলাম, তখন বুঝলাম ঐ মাকামটি হযরত উসমান গনি (রাঃ) এর। অন্যান্য খলিফাগণও ঐ মাকাম অতিক্রম করেছেন। ঐ স্থান হইতে অধিকতর উচ্চে হযরত সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর মাকাম জাহির হল এবং আমি ঐ উচ্চ মাকামে উপনীত হলাম। খাজা বুজর্গ হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবকেও প্রত্যেক মাকামে এইভাবে দৃষ্টি গোচর হল। দুজনের মধ্যে কেবল অতিক্রম করার পার্থক্যটুকু বিদ্যমান ছিল। হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর মাকাম অপেক্ষা উচ্চ কোনো মাকাম আমার দৃষ্টি গোচর হয় নি। অবশ্য নবুয়তের মাকাম অনেক বুলন্দ ও উচ্চ ছিল। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) এর বরাবর আর একটি অতি উত্তম ও বহুত নুরানী মাকাম দৃষ্টি গোচর হয়। সেটা অপেক্ষা উত্তম আর কোনো মাকাম দৃষ্টি গোচর হয় নাই। মাকামে সিদ্দিক অপেক্ষা সেটা কেবল এতটুকুই উচ্চ ছিল; যেমন জমিন থেকে সভামঞ্চ কিয়ৎ পরিমানে উচ্চ হয়ে থাকে। আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে, সেটা মাহবুবিয়াতের মাকাম। এই মাকামটি রঙিন ও নকশা খচিত ছিল। সেই মাকামের প্রতিচ্ছায়া পড়ার জন্য ঐ বান্দা নিজেকে রংগিন ও উক্ত নকশা খচিত দেখল। তারপর আমি নিজেকে বড়ই সূক্ষ্ম অনুভব করতে লাগলাম। বাতাস এবং মেঘের টুকরার মতন নিজেকে আকাশের দিগন্ত রেখায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় অনুভব করতে লাগলাম। ঐ অবস্থায় এক প্রান্তে যেয়ে পৌঁছলাম; হযরত বাহাউদ্দিন নশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব মাকামে সিদ্দিকের মধ্যে রইলেন এবং নিজেকে তার অনুরূপ মাকামে উল্লিখিত অবস্থায় দেখলাম।” হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই প্রসংগে এক ব্যাখ্যায় বলেন, 'সূফীদের নিকট ঐ ব্যক্তি সূফী নন, যিনি নিজেকে সৃষ্ট জীবের মধ্যে নিকৃষ্ট কুকুরের চেয়ে ভালো মনে করেন। অতএব আমি নিজেকে কেমন করে সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারি?'

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, পীরের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা ছালেক এক মাকাম থেকে অন্য মাকামে ভ্রমণ করে। ছালেকের উরুজ বা উত্থান ঐ রূপ উচ্চ মাকামে অতি অল্প সময়ের জন্য হইয়া থাকে। যেমন শাহী দরবারে আমীরগণ দিবারাত্র হাজির থাকেন। বাদশাহ প্রয়োজনে কখনও কখনও কোনো সিপাহীকেও তলব করিয়া থাকেন। সিপাহীর কোনো কাজে সন্তুষ্ট হইয়া সিপাহীকেও পুরস্কৃত করেন। কিন্তু সিপাহীর রাজদরবার ভ্রমণ অতি অস্থায়ী ঘটনা। কিছু পরেই বাদশাহের দরবার হইতে সিপাহী ফিরিয়া আসেন এবং বাদশাহ নিজ সিংহাসনেই থাকেন। এই হকিকত উপলব্ধি করার পর নিজেকে সিদ্দিকে আকবরের অপেক্ষা উচ্চ বা শ্রেষ্ঠ মাকামের অধিকারী মনে করার ধারণাও অসম্ভব।

বিজ্ঞাপন

পূর্বেই বলা হইয়াছে, আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাতে পৌঁছাইবার দুইটি পথ-একটি হকিকতে আম্বিয়া ও অন্যটি হকিকতে এলাহিয়ার। এই দুইটি পথে যে সকল মাকাম রহিয়াছে তাহা হইলঃ হকিকতে আম্বিয়ার পথে হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী। হকিকতে এলাহিয়ার দফতরে যে মাকাম সমূহ রহিয়াছে তাহা হইল যথাক্রমে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা ও হকিকতে সালাত। ইহার মধ্যে হকিকতে আম্বিয়ার পথ হইল মহব্বতের পথ। ইহা শেষ হইয়াছে হোব্বে ছেরফার মাকামে। আর হকিকতে এলাহিয়ার পথ হইল ইবাদতের পথ। তাহার সর্বোচ্চ বিন্দু হইল মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকাম। এই আটটি মাকামের সহিত হকিকতে আহমদীর যে সম্পর্ক সে সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) তদীয় "মাব্দা ওয়া মায়াদ" নামক গ্রন্থে বলিতেছেন-

"হকিকতে কাবায়ে রাব্বানী ও হকিকতে কুরআনের স্থান হকিকতে মুহাম্মদী উপরে, সুতরাং হকিকতে কুরআন হকিকতে মুহাম্মদীর ইমাম ও পথ প্রদর্শক। হকিকতে কাবায়ে রাব্বানী হকিকতে মুহাম্মদী (সাঃ) এর সিজদার স্থান নিরূপিত। এই স্থানে লক্ষ্যণীয় যে, হকিকতে কাবায়ে রাব্বানীর দরজা হকিকতে কুরআনের উপর। সেখানকার অবস্থা সম্পূর্ণ বেসিফাতি ও বেরংগি। এই মাকামে জ্ঞান ও এতেবারের কোনো স্থান নাই। এই মাকামের মারেফাত সম্পর্কে কোনো আরেফ মুখ খোলেন নাই। আল্লাহতায়ালা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে এই মারেফতে ভূষিত করেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "কাবার ছুরাত বা আকৃতি যেমন বস্তুর ছুরাতের সিজদার স্থান; তদ্রুপ হকিকতে কাবাও ঐ সকল বস্তুর হকিকতের সিজদার জায়গা।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "আল্লাহপাক তাঁহাকে এলহামের মাধ্যমে জানান, সরওয়ারে কয়েনাত (সাঃ) এর ইন্তেকালের মহাম্মদী স্বীয় মাকাম থেকে উরুজ করে বা ঊর্ধ্বগমন করে হকিকতে এক হাজার বছর পরে এমন এক জামানা আসবে যখন হকিকতে কাবার সাথে মিলিত হবেন। এই সময়ে হকিকতে মহাম্মদীর নাম হবে হকিকতে আহমদী এবং তা জাতে আহাদ বা একক জাতের জাল্লা সুলতানুহুর প্রকাশস্থল হবে। তখন উভয় মোবারক নাম হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী হকিকতে কাবার মধ্যস্থিত হবে। এই সময়ে হকিকতে মুহাম্মদীর প্রথম মাকাম যেখানে তা ইতিপূর্বে ছিল, তা খালি থাকবে এবং তা ততোদিন পর্যন্ত খালি থাকবে যতদিন না হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন। তিনি অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) শরীয়তে মুহাম্মদী (সাঃ) এর উপর আমল করবেন এবং হকিকতে ঈসুবী স্বীয় মাকাম হতে উরুজ করে হকিকতে মুহাম্মদীর শূন্য স্থান পূরণ করবেন।"

বিজ্ঞাপন

হকিকতে আহমদী ও হকিকতে মুহম্মদী-এই দুই মাকামের পার্থক্য নিরূপণ করিতে যাইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লেখ করেন-হকিকতে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির প্রথম বিকাশ এবং যাবতীয় হকিকতের হকিকত। সকল পয়গম্বর (আঃ) গণ ও সকল ফেরেশতাগণের হকিকত এই হকিকতেরই প্রতিবিম্ব। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, 'আল্লাহতায়ালা প্রথম সৃষ্টি করেন আমার নূর। এই নূরে মুহাম্মদী হইতে সমগ্র সৃষ্টি জগত সৃষ্টি।' এই হকিকতে মুহাম্মদী অন্য সকল হকিকত ও আল্লাহপাকের মধ্যস্থ স্বরূপ। তাহার মধ্যস্থতা ব্যতীত আল্লাহতায়ালার জাতপাকে বা মকছুদে পৌছানো সকলের জন্য অসম্ভব। তাই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সকল নবী, রাসূল ও পয়গম্বর (আঃ) গণের নবী এবং তাহার অবতরণ জগতবাসীর জন্য রহমত। এই হেতু উলুল আজম পরগম্বরগণও হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুসরণের আকাংখা প্রকাশ করিয়াছিলেন।

যেহেতু হকিকতে মুহাম্মদী সকল হকিকতের হকিকত, তাই অনেকের মনে প্রশ্ন উঠিয়া থাকে, হকিকতে মুহাম্মদীর ঊর্ধ্বে তাহা হইলে এমন কি কামালাত বা পূর্ণতা আছে যাহা হকিকতে আহমদী নামে উল্লিখিত হইয়াছে? এই প্রশ্নের উত্তরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, হকিকতে মুহাম্মদী সকল হকিকতের হকিকত। ঐ মাকামে উপনীত হওয়া ও উহার পূর্ণ ওয়ারিশ হওয়া বিশিষ্ট উম্মতের ভাগ্যে লাভ হইয়া থাকে। যে পর্যন্ত তাহার উম্মত না হইবে সে পর্যন্ত উক্ত দৌলতে উপনীত হইতে পারিবে না: মধ্যস্ততার ব্যবধানও উঠিয়া যাইবে না, যাহা একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে লাভ হয়। তাই আল্লাহপাক ফরমান তোমরা অর্থাৎ রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মতগণ সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত। তাই হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) প্রত্যেক ফেরেশতা ও প্রত্যেক পয়গম্বর হইতে উন্নত। অধিকন্ত সাফল্য হিসেবেও তিনি শ্রেষ্ঠ। মূলবস্তু শ্রেষ্ঠ, তাহার ছায়া যতই দীর্ঘ ও প্রশস্ত হউক না কেন? হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব জানাইতেছেন, আল্লাহপাকের তরফ হইতে তাহাকে জানানো হইয়াছে, হকিকতে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার হোব্ব বা প্রেমের প্রকাশ যাহা সৃষ্ট বস্তুর সমূহের উৎপত্তির কারণ। হাদীসে কুদসীতে আছে "আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম। পরিচিত হইতে চাহিলাম, তাই বিশ্ব জগত সৃজন করিলাম। আল্লাহতায়ালার গুপ্ত ধন ভান্ডার হইতে প্রথমে যাহা প্রকাশ হইল তাহা হইল প্রেম। বিশ্ব জগত সৃষ্টির কারণ উহাই। যদি হোব্ব বা প্রেম না থাকিত তবে সৃষ্টির দ্বার উন্মোচিত হইত না। বিশ্ব জগত অনস্তিত্বে রহিয়া যাইত। আল্লাহপাক যেরূপ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে জানাইয়াছেন, আপনি না হইলে আমি বিশ্ব জগত সৃষ্টি করিতাম না, আমার প্রভুত্বও প্রকাশ করিতাম না।"

পূর্বে বলা হইয়াছে যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লেখ করিয়াছেন, নিজেকে অক্ষম করিয়া দেয়াই হকিকতে আহমদীতে উন্নীত হইবার পথ। হযরত রাসূলে করীমও (সাঃ) নিজেকে ঐ রূপ অক্ষম জানিতেন। তিনি বলিতেন, 'মুহাম্মদের রব মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করিলেই ভাল করিতেন।' যাহারা নিজেদের পরিপূর্ণ অক্ষম ও পরিপূর্ণ অজ্ঞ জানেন, তাহাদেরকে আল্লাহতায়ালা নিজের কামালাত ও এলেম দ্বারা পূর্ণ করেন এবং তাহাদের মাহবুবিয়াত বা প্রেমাস্পদত্বের মাকাম দান করেন। প্রেমিকের ভালবাসা প্রেমাস্পদের দর্শনের জন্য বর্তমান এবং প্রেমাস্পদের ভালবাসা আল্লাহতায়ালার বন্দেগী ও কৃতজ্ঞতার জন্যেই বর্তমান। যে প্রেমিক আল্লাহতায়ালার প্রেমে পাগল, আল্লাহতায়ালাকে দর্শন করা তাহার কাম্য হইয়া যায়। তিনি তাহাকে দেখিতে পাইলেই তাহার সাধ মিটিয়া যায়। কিন্তু প্রেমাস্পদের অবস্থা অন্যরকম। আল্লাহতায়ালা যাহাদেরকে মাহবুব মনে করেন, তাহারা আল্লাহতায়ালাকে দেখিবার জন্য ব্যস্ত হন না। তাহারা আল্লাহতায়ালার ইবাদত বন্দেগীতে বেশী মনোযোগী হন। হকিকতে আহমদী যে আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদতের বর্ণনা দেয় উহা এই গুণেরই ইংগিতবাহক। আহমদ যেমন নৈকট্যের দিক দিয়া আহাদের নিকটতম তেমনি আহমদ নামের মিম বর্ণ আবদিয়াত অর্থাৎ ইবাদত ও দাসত্ব মখলুক বা সৃষ্টির পরিচয় বাহক। আহমদ সৃষ্টি হিসেবে আহাদকে নিবিড়তম প্রেমের সহিত নিকটতম সান্নিধ্যে যাইয়া ইবাদত করেন। এই মিম কুরআন মজিদের হরফে মোকাত্তায়াতের অন্তর্গত। যেমন আলিফ, লাম, মিম। সাধারণ লোক এই রূপ হরফে মোকাত্তায়াতের অর্থ জানেন না। আর যাহারা জানেন তাহারা উহা আল্লাহতায়ালার গোপন ভেদ বলিয়া প্রকাশও করেন না। ইহা নবী (সাঃ) এর আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ হইবার নির্দশন। আরবী আহাদ শব্দের প্রথম অক্ষর আলিফ বাদ দিলে 'হদ" হয়। এই "হদ” অর্থ সীমা। জাত পাকের তাইয়ূনে আউয়াল লাতাইনের নিম্নে অবস্থিত, লাতাইনের সাথে তাইনে আউয়ালকে তুলনা করিলে আমরা দেখিতে পাই যে, তাইনে আউয়াল একটা সীমানা নির্দেশ করে। সাধারণ ভাবে এই সীমা দেখিবার বিষয় নহে। ইহা অনুভবের বিষয়। "আহাদ" হইতে শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ আলিফ অক্ষর লাতাইনে রহিয়া গেল; তখন "হদ” শব্দকে সীমানা নির্দেশক হিসেবে তাইনে আউয়ালে রাখা হইল। এই "হদ” অক্ষর যে মখলুক তাহা ভালভাবে দেখাইবার জন্য আরবী "হে" অক্ষরের পরে মিম অক্ষর রাখা হইয়াছে। আর তাহাকে যিনি সৃজন করিলেন, সে আহাদের আলিফ অক্ষরকে সকলের প্রথমে রাখা হইয়াছে। ইহাতে বোঝা যায় অসীম আল্লাহপাক মখলুক সৃষ্টি করিয়া তাহাকে সীমার মাঝে প্রকাশ করিয়াছেন। এই আহমদ সসীম মখলুক আল্লাহপাকের সহিত সৃষ্টির দিক দিয়া সর্ব প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পর্কে বিরাজমান।

বিজ্ঞাপন

আমরা জানি, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এমন এক সময়ে এই ধরনীতে আসিয়া ছিলেন যখন আরবে ছিল অন্ধকারের যুগ। এমন কোন পাপ নাই, যে পাপ হইতে আরবের লোক তখন মুক্ত ছিল। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর ৬৩ বা ২৩ বছরের হেদায়েতের জীবনে আমরা দেখিয়াছি, তিনি কাহাকেও অভিসম্পাৎ করেন নাই। নিজের উপর বা ইসলামের উপর আক্রমণ না আসা পর্যন্ত নিজে কাহারও প্রতি আক্রমণ করেন নাই। যে আরবের মানুষ রক্তের বদলে রক্তপাত তাহাদের নৈতিকতা বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল, সেই আরবেরই মানুষ হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব নিজ জীবনের সর্বস্ব তিনি নবী করীম (সাঃ) এর কদমে ইসলামের খেদমতে উজাড় করিয়া দিয়াছিলেন। যে তরবারী লইয়া উমর ইবনে খাত্তাব রাসূলে করীম (সাঃ) কে হত্যা করিতে আসিয়াছিলেন, সেই উমর তাহার সম্মুখে আসিয়া নিজে একজন ভাল মানুষ হইলেন: হযরত উমর (রাঃ) ছাহেব হিসেবে পরিচিত হইলেন। আবার তাহার উপর অত্যাচার আসিয়াছে কম নয়, অত্যাচার করিয়াছে তাহারই রক্তের সম্পর্কের লোক যেমন আবু লাহাব, তেমনই অনাত্মীয় তায়েফবাসীগণ এবং মদীনার ইহুদী ও নাছারা সম্প্রদায় হইতে। কিন্তু তিনি নীরবে আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলের অত্যাচার সহ্য করিয়াছেন। শুধু তাহাই নহে, যখন আল্লাহতায়ালা গজব দিয়া তাহাদের ধ্বংস করিবার জন্য রাসূলে করীম (সাঃ) এর সম্মতি চাহিয়াছেন, তিনি সম্মতি না দিয়া তাহাদেরই হইয়া আল্লাহতায়ালার নিকট ক্ষমা চাহিয়াছেন। বলিয়াছেন, হে আল্লাহতায়ালা! তাহারা বোঝে না, তাই আমার উপর অত্যাচার করে। আমি তাহাদের ক্ষমা করিয়াছি। আপনিও তাহাদিগকে ক্ষমা করুন। তাহারা ধ্বংস হইলে আমি কাহাদের নিকট আপনার তৌহিদের বাণী প্রচার করিব? সৃষ্টির প্রতি এই প্রেম হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে আল্লাহতায়ালার মাহবুবিয়াতের গুণ হইতে আসিয়াছে।

আমরা একইভাবে দেখিতে পাই যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব যখন ইসলামের ঈমান, আকিদা ও সুন্নাহর পরিপন্থী হইবার জন্য সম্রাট আকবর প্রবর্তিত দীন-ই-এলাহির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিলেন, তাহাকে সম্রাটের রোষানলে পড়িতে হইল। সম্রাটের পুত্র জাহাঙ্গীর ক্ষমতায় আসিয়া তাহাকে কারাগারে বন্দী করিলেন। তখন দিল্লীর রাজ দরবারে এবং সম্রাটের সেনা বাহিনীতে মহব্বত খান, খান খানান প্রভৃতি অনেক উচ্চ পদস্থ সেনাপতি ও আমীর উমরাহ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মুরীদ ও অনুসারী ছিলেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে গোয়ালিয়রের কারাগারে অন্তরীণ রাখাতে তদীয় মুরীদ ও অনুসারী সেনাপতি এবং আমীর উমরাহগণ জাহাংগীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিলেন। তাহারা সম্রাটের সৈন্য দলকে পরাস্তও করিয়াছিলেন। কিন্তু গোয়ালিয়রের কারাগার হইতে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব লিখিয়া পাঠাইলেন, সম্রাটের প্রতি তাহার কোনো ক্রোধ বা প্রতিহিংসা নাই। তাহার রাজত্বের কোনো প্রয়োজন নাই। তিনি চাহিয়াছেন ইসলাম বিরোধী কানুনসমূহের অবসান। সম্রাটকে রাজত্ব ফেরত দিয়া তাহাকে দিয়াই ইসলাম বিরোধী

কানুনসমূহ বাতিল করা হউক। সম্রাট জাহাংগীর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের এই আচরণে এতই মুগ্ধ হইলেন যে, তিনি নিজে দীন-ই-এলাহী বাতিলতো করিলেনই: ইসলামের ঈমান, আকিদা ও সুন্নাহ বিরোধী সকল কানুন বাতিল করিয়া ফরমান জারী করিলেন এবং নিজেও স্বয়ং হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের নিকট বয়াত গ্রহণ করিলেন। অন্যান্য আমীর উমরাহ ও সাধারণ মানুষের মত তিনিও মুজাদ্দেদ ছাহেবের একজন আশেক ভক্ত হইয়াছিলেন। এই রূপে বিনা রক্তপাতে, বিনা যুদ্ধে ভারতে ইসলাম পুনঃস্থাপিত হইল।

বিজ্ঞাপন

সম্রাট জাহাংগীর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) কে তদীয় উজির আসফ আলীর পরামর্শে হত্যা করিবার কথা চিন্তা করিয়াছেন, তাহাকে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়াছেন, সেই জাহাংগীরকে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের অনুসারী মহব্বত খান যুদ্ধে পরাস্ত করিলে, তিনি তাহার রাজত্ব ফিরাইয়া দিতে বলিলেন। তাহার ভুল-ত্রুটি সংশোধন করিয়া ইসলামের সুন্নাহর প্রতি তাহাকে শুধু প্রেম, ভালবাসা ও ক্ষমা দিয়াই ফিরাইয়া আনিলেন।

সৃষ্টির প্রতি এই প্রেমই হকিকতে আহমদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ), হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ও ঐ দরজায় উন্নীত ওলী আল্লাহগণের মধ্যে আমার দয়াল পীর কেবলাজানের মধ্যে প্রেম কত গভীর ও কত প্রগাঢ় ছিল যে তাহা বলিয়া বুঝাইবার জন্য তদীয় জীবনের বিচিত্র ঘটনা সমূহ বর্ণনা করা এই ক্ষুদ্র পরিসরে সম্ভব হইল না।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ও হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার জাতের সংবাদবাহী, ইতেবারের নিদর্শক হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদীর মাকামের জ্ঞান ধারণ করিতেন, আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর সেই জ্ঞানের পূর্ণ পরিচয় রখিতেন ও ঐ জ্ঞানের প্রকাশস্থল ছিলেন।

হে জাকেরান! তোমরা যদি ঐ জ্ঞান লাভ করিবার ইচ্ছা রাখ, তাহা হইলে আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুরের প্রেমকে নির্ভর করিয়া পড়িয়া থাক। তাহার কদমে তাহার খাছলত ও আদর্শে জীবন গড়িবার বাসনা রাখ, তাহার পাক মহব্বত একদিন আল্লাহতায়ালার জাতের সংবাদ তোমাদের জন্যও আনিয়া দিতে পারে। আল্লাহতায়ালা নিজে দয়া না করিলে তাহার জাতপাকের জ্ঞান কেহ লাভ করিতে পারে না। কিন্তু এই তরীকার কামেল আরেফগণের মহব্বত হকিকতে আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত আনয়ন করে।

তাই "লা তাকনা তু মির রাহমাতিল্লাহ" আল্লাহতায়ালার রহমত হইতে নিরাশ হইও না। আমার পীর কেবলাজান হুজুরের মহব্বত হাসিল হইলে আশা করা যায়, জাত পাকের সংবাদ ও পরিচয় হইতে তোমাদেরও নিরাশ হইতে হইবে না।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD