Logo

হকিকতে ইব্রাহিমী বন্ধুত্ব বা খোল্লাতের মাকাম

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১১ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৩৭
হকিকতে ইব্রাহিমী বন্ধুত্ব বা খোল্লাতের মাকাম
ফাইল ছবি।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী ও হকিকতে মুহাম্মদীর বিভিন্ন হাল ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা। এতদ্ব্যতীত হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর বিভিন্ন গুণাগুণ সম্পর্কেও আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

"হকিকতে ইব্রাহিমী" আল্লাহতায়ালার জাতে পৌঁছাইবার পথে একটা বিশেষ মাকাম। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব খোদাপ্রাপ্তির পথে যে সকল মাকাম-মঞ্জিলের কথা উল্লেখ করিয়াছেন, তাহাতে বোঝা যায়, আল্লাহতায়ালার জাতপাকে পৌছাইতে হইলে হকিকতে এলাহিয়া ও হকিকতে আম্বিয়া-এই উভয় পথেই সাধনার প্রয়োজন। হকিকতে ইব্রাহিমী হইল হকিকতে আম্বিয়া অধ্যায়ের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মাকাম।

আল্লাহতায়ালার জাতপাকের অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য অবস্থার নিম্নে প্রথম স্তরকে মুজাদ্দেদীয়া তরিকার সূফী-সাধকগণ "তাইনে আউয়াল” বলিয়া অভিহিত করেন। তাইনে আউয়ালকে একটি বৃত্তের সহিত তুলনা করিয়া মুজাদ্দেদিয়া তরিকার সূফী-সাধকগণ ঐ বৃত্তের বেষ্টনীকে হকিকতে ইব্রাহিমী ও বৃত্তের কেন্দ্রকে হকিকতে মুহাম্মদী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।

হকিকতে মুহাম্মদীর দুইটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। যথাঃ- মহব্বত বা প্রেমিকত্ব এবং মাহবুবিয়াত বা প্রেমাস্পদত্ব। আর হকিকতে ইব্রাহিমীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হইল খোল্লাত বা বন্ধুত্ব। হকিকতে মুহাম্মদী হইল আল্লাহতায়ালার জাতি মহব্বত ও মাহবুবিয়াতের নির্দেশক ও হকিকতে ইব্রাহিমী সিফাতে মাবুবিয়াতের নির্দেশক। হকিকতে মুহাম্মদী যেমন জাতের মাহবুবিয়াতের প্রকাশ, তেমনি হকিকতে ইব্রাহিমী আল্লাহতায়ালার সিফাতে মাহবুবিয়াত বা প্রেমাস্পদত্বের প্রকাশ। জাতের সহিত হকিকতে মুহাম্মদীর যে সম্পর্ক, তাহা মহব্বত বা প্রেমের; আর হকিকতে ইব্রাহিমীর যে সম্পর্ক তাহা বন্ধুত্বের।

বিজ্ঞাপন

মহব্বত ও বন্ধুত্ব বা খোল্লাত-উভয়ের মধ্যে অর্থের মিল থাকিলেও সম্পর্কের তীব্রতা ও ঘনিষ্ঠতার পার্থক্য রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাত-এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক এমনই ঘনিষ্ঠ যে, পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। জাতের সহিত সিফাতের যে সম্পর্ক, তেমনিই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রেম ও বন্ধুত্বের মধ্যে তথা হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে ইব্রাহিমীর মধ্যে।

আল্লাহতায়ালা যখন কাহাকেও তাহার বন্ধুত্বের মর্যাদা দান করেন, তখন তিনি তাহাকে নিজের সভাসদ করিয়া লন। ক্রমে ক্রমে তাহাকে সভাসদগণের মধ্য হইতে মোহেব বা প্রেমিক ও মাহবুব বা প্রেমাস্পদের সম্মানে ভূষিত করেন। দুই বন্ধুর মধ্যে যে সম্পর্ক থাকে, তাহা বন্ধুর গুণাবলীর জন্যই বর্তমান থাকে। এক বন্ধু অন্য বন্ধুর গুণে মুগ্ধ থাকে। একে অন্যের দোষ ত্রুটির দিকে নজর না দিয়া গুণের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া থাকেন।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মধ্যে এই গুণাগুণ পরিপূর্ণরূপে বিরাজমান ছিল। আল্লাহতায়ালা তাহাকে যতই দুঃখ কষ্ট প্রদান করুন না কেন, তাহার চোখে আল্লাহপাকের গুণাবলী ছাড়া আর কিছুই আসিত না। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) জাতপাককে পূর্ণভাবে বিশ্বাস করিতেন ঠিকই, তবে তিনি আল্লাহতায়ালার গুণাগুণের দিকে আকৃষ্ট ছিলেন বেশী, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যেহেতু আল্লাহতায়ালার সিফাতসমূহ বা গুণাগুণের প্রতি বেশী আকৃষ্ট ছিলেন; মাকামগত দৃষ্টিকোণে তাই তাঁহার মধ্যে সিফাতযুক্ত প্রেমাস্পদত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল সমধিক। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর বিশেষ লক্ষ্য বস্তু হইল আল্লাহতায়ালার জ্ঞান, ক্ষমতা, ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি। মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা দেখিবার প্রার্থনার মধ্য দিয়া তিনি আল্লাহতায়ালার গুণের প্রতি তাহার আগ্রহ ও আকর্ষণের প্রমাণ রাখিয়াছেন। পক্ষান্তরে হযরত মুসা (আঃ) এর ইতিহাস স্মরণ করিলে দেখা যায়, তিনি স্বয়ং আল্লাহপাকের দীদার কামনা করিয়াছেন অর্থাৎ তিনি আল্লাহপাককে দেখিতে চাহিয়াছেন। ইহা দ্বারা বলা যায় যে আল্লাহতায়ালার গুণাগুণ, ক্ষমতা ও ক্রিয়াকলাপ অপেক্ষা স্বয়ং আল্লাহতায়ালার প্রতিই হযরত মুসা (আঃ) এর আকর্ষণ ও দৃষ্টি ছিল অপেক্ষাকৃত বেশী। এই জন্য হযরত মুসা (আঃ) স্বয়ং আল্লাহকেই দেখিতে চাহিয়াছিলেন; তাহার ক্ষমতা বা জ্ঞান দেখিতে চাহেন নাই।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহতায়ালার জাতপাকের প্রতি বেশী আকৃষ্ট ছিলেন। তাই আমাদের দয়াল নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর পরেই শাফায়াতকারী হিসেবে হযরত মুসা (আঃ) এর স্থান। হযরত মুসা (আঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর চেয়ে বেশী সংখ্যক উম্মতকে শাফায়ার করিবার সম্মান লাভ করিবেন। অবশ্য আমাদের নবী করীম (সাঃ), সকল নবী (আঃ) এর চেয়ে বেশী উম্মত শাফায়াত করিবেন।

হকিকতে ইব্রাহিমী বন্ধুত্ব বা খোল্লাতের মাকাম। দোষ ত্রুটি ধরিলে বন্ধুত্ব স্থায়ী হইতে পারে না। একে অন্যের সমালোচনা করিলে বন্ধুত্ব টিকিয়া থাকে না। তাই হয়তো অনেকের ধারণা হইতে পারে, এই মাকামে যাহারা উন্নীত হয়, তাহাদের মধ্যে আর দোষত্রুটি থাকে না। কিন্তু তাহা নয়। আল্লাহপাক কেবল মাত্র নবী (আঃ) গণ ও ফেরেশতাগণকেই দোষ ত্রুটি মুক্ত করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। এই মাকামে যাহারা আল্লাহতায়ালার দয়ায় উন্নীত হন, তাহারা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর কামালাত অর্জন করেন সত্যি, কিন্তু তাই বলিয়া কি তাহারা দোষ-ত্রুটি হইতে মুক্ত হইয়া যান? ব্যাপারটি তাহা ঘটে না। বন্ধুত্বের গভীরতার জন্য বন্ধুর দোষ-ত্রুটি তখন আর চোখে পড়ে না। আল্লাহও বান্দার দোষ-ত্রুটি ধরেন না বা ক্ষমা করিয়া দেন। আর আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে বান্দার প্রতি যে সকল দুঃখ কষ্ট আসে, বান্দাও তাহা হাসি মুখে সহ্য করিয়া লন।

আবার ইহাও বলা যাইতে পারে যে, কোনো ব্যক্তিই সম্পূর্ণ শুধু দোষ-ত্রুটির অন্ধকারে ঢাকা নয়। প্রত্যেক জিনিষের মধ্যেই ভাল ও মন্দ-উভয় দিকই রহিয়াছে। সাপের বিষ যাহা সাধারণতঃ মানুষের জন্য এমন ক্ষতিকর যে, মৃত্যু পর্যন্ত ডাকিয়া আনিতে পারে। সেই সাপের বিষেরও উপকারী দিক রহিয়াছে। সাপের বাঁচিয়া থাকার জন্য ইহা অতি প্রয়োজনীয়। আবার মানুষেরও কোনো কোনো রোগের চিকিৎসার জন্য সাপের বিষ হইতে প্রস্তুত ঔষধই একমাত্র নিরাময়কারী। সৃষ্টিকর্তা কল্যাণময় ও সকল শুভ গুণের উৎস। তাই তাহার সৃষ্ট যে কোনো ব্যক্তি ও বস্তুর মধ্যে কোনো না কোনো শুভ গুণ রহিয়াছে।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান,

أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ

অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালার দলই হইবে সফলকাম।' (সূরা মুজাদালাঃ ২২)।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার সৌন্দর্য, মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত অসীম। পক্ষান্তরে সৃষ্টি অশুভও সীমাবদ্ধ। আল্লাহতায়ালার সীমাহীন সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দ্বারা সৃষ্টির ক্ষুদ্র দোষ ও ত্রুটি তিনি ঢাকিয়া দিতে পারেন। আল্লাহতায়ালার এই শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের প্রমাণ ও পরিচয় ইতিহাসে রহিয়াছে অসংখ্য ঘটনায় বর্ণিত। একটি ঘটনা এই প্রসংগে তোমাদের বলি, হযরত বশর ইবনে মার্ত্তনগর ছিল তাহার জন্মভূমি। তিনি বাগদাদের বসর নামক এলাকার হারেছ হাফী (রঃ) নামক বিখ্যাত একজন ওলীয়ে কামেল ছিলেন। অধিবাসী ছিলেন। কিতাবে পাওয়া যায়, যৌবনে তিনি প্রচুর মদ্য পান করিতেন। একজন সুরাপায়ী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। তরিকত জগতে প্রবেশের পূর্বের একদিনের একটি ঘটনা। সুরাপান করিয়া মাতাল অবস্থায় গৃহে ফিরিবার পথে পথিমধ্যে এক টুকরা কাগজ রাস্তায় বাতাসে নড়িতে দেখিয়া তিনি উঠাইলেন। কাগজটিতে লেখা ছিল, পবিত্র কালেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।" পবিত্র কলেমা লিখিত কাগজটিকে তিনি অতীব যত্ন, তাযীম ও মহব্বতের সহিত মাথায় করিয়া গৃহে ফিরিয়া বিবিকে বলিলেন একটি নতুন মাটির তৈরী পাতিল আনিয়া দিতে। মাটির একটি নতুন পাতিল আনা হইল। মদ্যপ যুবক বশর হাফী পবিত্র কলেমা শরীফ লিখিত কাগজটিকে পাতিলের মধ্যে রাখিয়া আতর গোলাপের সুগন্ধি মাখাইয়া পাতিলটিকে নিজ মাথার উপরে ছিকায় রাখিয়া দিলেন। "কাশফুল মাহযুব" নামক কিতাবে দেখা যায় যে, সেই রাত্রিতে মদ্যপ বশর হাফী স্বপ্নে দেখিলেন যে, আল্লাহপাক তাহাকে বলিতেছেন, "হে বশর হাফী! তুমি আমার ও আমার হাবীবের নামকে অত্যন্ত মহব্বত, তাযীম ও সুগন্ধিযুক্ত করিয়াছ। আমার ইজ্জতের কছম! আমি তোমার নামকে ইহলোক ও পরলোকে সুগন্ধিযুক্ত করিব। যে কেহ তোমার নাম শুনিবে, সে শান্তি পাইবে।"

তৎকালীন সময়ে যুগের শ্রেষ্ঠতম ওলীয়ে কামেল ছিলেন হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব। মানব সমাজের হেদায়েতের দায়িত্ব তাহার উপর ন্যস্ত ছিল। এক রাত্রিতে তাহার উপর এলহাম হইল, তিনি যেন সেই মদ্যপ বশর হাফীকে মুরীদ করিয়া তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগে ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দেন। এই এলহাম প্রাপ্তিতে হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব দুশ্চিন্তায় পড়িলেন। তিনি মদ্যপ বশর হাফীর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে জানিতেন। তিনি ভাবিলেন, হয়ত ভুল এলহাম আসিয়াছে। তাই বশর হাফীকে মুরীদ করা হইতে তিনি বিরত থাকিলেন। পরবর্তী রাত্রিতে আবারও তিনি একই এলহাম প্রাপ্ত হইলেন। এবারও কি করিবেন তাহা ভাবিয়া চিন্তিয়া ঠিক করিতে না পারিয়া বশর হাফীকে মুরীদ করা হইতে বিরত থাকিলেন এবং দুশ্চিন্তার মধ্যেই সেই দিন অতিবাহিত করিলেন।

কিন্তু পরবর্তী রাত্রিতে আল্লাহপাক একটু ধমকের সুরে হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেবের প্রতি এলহামের মাধ্যমে বলিলেন, হে হাছান বছরী (রঃ)! পরবর্তী দিন সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি বশর হাফীকে মুরীদ করিয়া ওলীর দরজায় না পৌঁছান, তবে বেলায়েতের দফতর থেকে আপনার নাম কাটিয়া দেওয়া হইবে।” এই হুশিয়ারী বাণী শুনিয়া হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব নগ্নপদেই বশর হাফীর বাড়ীর পানে দৌড়াইতে লাগিলেন। সন্ধ্যা হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে বশর হাফির বাড়ীর নিকটে পৌঁছাইয়াই দেখিতে পাইলেন যে, মদ্যপ যুবক বশর হাফী মাতাল অবস্থায়ই টলিতে টলিতে গৃহে ফিরিতেছে। মাতাল বশর হাফী যুগশ্রেষ্ঠ ও খ্যাতনামা ওলীয়ে কামেল হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেবকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া এক দৃষ্টে তাঁহার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বাবা, তুমি কি আমাকে চিনিতে পারিয়াছ? বশর হাফী বলিলেন, "হুজুর, আপনাকেতো বিখ্যাত সেই আলেম হযরত হাছান বছরীর (রঃ) মত মনে হয়। আপনি এই সুরাপায়ী ও চরিত্রহীন বশর হাফীর বাড়ীতে কেন।" হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব পূর্বাপর সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করিয়া তাহাকে পাক পবিত্র হইয়া আসিতে বলিলেন। পবিত্র হইয়া আসিলে হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব বশর হাফীকে মুরীদ করিয়া তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিয়া ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত ওলী-আল্লাহ হিসেবে জগতবাসীর নিকট পরিচিত হন। কিতাবে দেখা যায়, তিনি যেইদিন ওলীর দরজায় পৌঁছালেন, সেইদিন তদীয় পীর হযরত হাছান বছরী (রঃ) ছাহেব নগ্নপায়ে ছিলেন বিধায় মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত তিনি কোন জুতা সেন্ডেল পায়ে দেন নাই। যে সমস্ত রাস্তা দিয়া তিনি হাটিতেন, সেই সকল রাস্তার উপর পশু-পাখী কখনও বাহ্য প্রস্রাব ত্যাগ করে নাই।

বিজ্ঞাপন

আর একটি ঘটনা, কোনো একজন কুলটা রমনী একদিন পিপাসায় কাতর একটি কুকুরকে আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট জীব হিসেবে মহব্বত করিয়া কুয়া হইতে পানি তুলিয়া পান করাইয়াছিলেন। কুকুরটিকে আল্লাহতায়ালার জীব হিসেবে তিনি মহব্বত করিয়াছিলেন, আল্লাহতায়ালা ঐ রমনীকেও ওলী-আল্লাহর মর্যাদা বা আসন দান করিয়াছিলেন।

এই স্তরের সাধকগণকে তাহাদের কোনো একটি নিঃস্বার্থ শুভ কাজকে করল করিয়া তাহার দয়া ও রহমত দান করিয়া আল্লাহপাক তাহাদের আপন করিয়া লন ও আপন গুণে গুণান্বিত করিয়া লন। ঐ রূপ সাধকগণের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

فَأَوْ لَئِكَ يُبَدِّلُ اللهُ سَيِّاتِهِمْ حَسَنَت

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-'অতঃপর তাহাদের পাপকে নেকীর দ্বারা আল্লাহতায়ালা বদলাইয়া দেন।' (সূরা ফুরকানঃ ৭০)

আল্লাহপাক কুরআন মজীদে আরও বলেন, "আমি কেতাবের ওয়ারেশ বা উত্তরাধিকারী ঐ সব লোকদিগকে করিয়াছি, যাহাদিগকে আমি আমার বান্দাগণের মধ্য হইতে বাছিয়া লইয়াছি, তাহাদের কেহ নিজ নাফছের উপর অত্যাচারী, কেহ মধ্যপথগামী, আবার কেহবা আল্লাহর আদেশে নেক কাজে সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী।" এই আয়াতসহ পবিত্র কুরআন মজীদের আরও কয়েকটি আয়াত শরীফের মর্মার্থ হকিকতে ইবাহিমীর তাৎপর্য বুঝিবার জন্য অনুধাবন করা প্রয়োজন। যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান "আমার আমানতকে আমি পাহাড়, আসমান ও জমিনের নিকট রাখিলাম; তাহারা উহা উঠাইয়া লইতে অস্বীকার করিল। মানুষ উহা উঠাইয়া লইল। তাহারা বড় মুর্খ ও অত্যাচারী।" কবিবর হাফেজ শিরাজীর ভাষায়,

"তুলিতে নারিল আসমান আমানত ভার

বিজ্ঞাপন

পড়িল ন্যস্ততার দাঁও ভাগে পাগলার।"

আবার আল্লাহপাক ইহাও বলিয়াছেন যে, আদমকে আমি আমার নিজের ছুরাত অর্থাৎ গুণ দ্বারা তৈরী করিয়াছি। আল্লাহপাক ইহাও ফরমান, "আমি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলাম, নিজেকে প্রকাশিত করিবার জন্য এই বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করিলাম।" উপরের আয়াত সমূহ এবং হাদীসে কুদছী হইতে ইহাই বোঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা মানুষকে অতি উচ্চ মর্যাদা দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, "আল্লাহতায়ালা মানুষকে অতি সুন্দর ছুরাতে সৃজন করিয়াছেন।" আল্লাহ বলেন, 'তিনি মানুষকে তাহার খলিফা হিসেবে সৃজন করিয়াছেন।' যাহারা আল্লাহতায়ালার বাণী-বাহক, আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতকারী; একদিক দিয়া তাহারা তেমনি অন্য দিক দিয়া তাহারা আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ দ্বারা বা যেমন মানুষ, সাধারণ মানুষের মতই চলা ফেরা, ওঠা বসা করেন, কামালত দ্বারা সজ্জিত হন। তাই দেখা যায়, মানুষের যেমন দেহ রহিয়াছে, তেমনি তাহাতে এমন কিছু গুণ রহিয়াছে যাহাকে পার্থিব বলা যায় না। তাই আল্লাহতায়ালা যে সকল সাধককে তাহার যেমন পার্থিব বন্ধু হিসেবে কবুল করেন ও তাহার পক্ষে হেদায়েতকারী ও তাহার বাণী-বাহক হিসেবে কবুল করেন, তাহাদের ওজুদ বা আল্লাহতায়ালার গুণ সমৃদ্ধ ছরাতকে আল্লাহতায়ালার ছরাত বলিলে যেমন বাড়াইয়া বলা হইবে বা অতি কথন করা হইবে, তেমনি তাহাদেরকে সাধারণ মানুষ বা আরেকজন আদম সন্তানের মত চিন্তা করিলে খুবই ছোট করা হইবে বা তাহাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হইবে না।অতিকথন করাকে আরবী ভাষায় এফ্রাত বলা হয়, আর কমাইয়া বলা বা ছোট করিয়া দেখাকে বলা হয় তফ্রীত। শরীয়াতে এফ্রাত ও তফরীত উভয়ই দোষণীয় বলা হইয়াছে।

উল্লিখিত আয়াত পাক সমূহের একটিতে আল্লাহপাক মানুষ সম্পর্কে বলিয়াছেন, 'তাহারা মুর্খ বা অজ্ঞ ও জুলুমকারী।' তাহারা 'মুর্খ' কথাটি আল্লাহপাক এই অর্থে ব্যবহার করিয়াছেন যে, মানুষ আল্লাহপাকের জাত পাককে বুঝিতে পারে না। আল্লাহতায়ালাকে বুঝিতে না পারার অবস্থাই তাহার মারেফাতের চরম অবস্থা। যিনি মারেফাতের চরম অবস্থায় যতবেশী অক্ষম, কামালতের দিক দিয়া তিনি সেই পরিমানে বেশী কামেল। আল্লাহকে বুঝিতে না পারার অবস্থাই সাধককে মারেফাতের চরম প্রান্তে পৌঁছাইয়া দেয়। এইরূপ ব্যক্তিকে ক্রমে ক্রমে কাইয়্যুমিয়াত'-এর মাকামে আল্লাহতায়ালা উত্তীর্ণ করেন। এই মর্যাদাপূর্ণ কামালত আল্লাহতায়ালার উলুল আজম পয়গম্বর (আঃ) দিগের জন্য নির্ধারিত। পয়গম্বর (আঃ) গণের অনুসরণ ও উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু শ্রেষ্ঠ উম্মত এই সম্পদ লাভ করিয়া থাকেন। উপরে উদ্ধৃত কুরআন মজীদের আয়াত পাকে যে স্থানে বলা হইয়াছে, আমি আমার বান্দাগণের মধ্যে হইতে বাছিয়া লইয়া কিতাবের উত্তরাধিকারী করিয়াছি। যাহারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হইলেন, তাহারা হইলেন আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ মকবুল বান্দা। এই শ্রেণীর কামেলবান্দাগণই কাইয়্যুমিয়াতের অধিকারী অর্থাৎ যাহাদের অছিলায় আল্লাহপাক সৃষ্টি জগতে রহমত বিতরণ করেন। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর বুজর্গগণ বন্ধুত্বের সম্মানে সম্মানিত। আল্লাহপাকের গোপন ভেদসমূহ তাহারা বুঝিতে পারেন, তাই তাহারা আল্লাহতায়ালার সভাসদ শ্রেণীভুক্ত। আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে কাইয়্যুমিয়াত যাহারা লাভ করেন, তাহারা উজীর শ্রেণীভুক্ত। আর আল্লাহপাকের গোপন ভেদ সমূহ যাহারা বুঝিতে পারেন, তাহারা বন্ধুত্বের সম্মান-প্রাপ্ত। যদিও আল্লাহপাক তাহার উজীরের দ্বারা তাহার কর্ম করাইয়া লন, তথাপিও দোস্ত ও বন্ধুদের একান্ত দরকার। সেই জন্য দোস্ত ও বন্ধুদের মর্যাদা উজিরের মর্যাদা অপেক্ষা বেশী। নিজের গোপন কথা, বাদশাহ্ তাহার বন্ধুদের নিকটই ব্যক্ত করে, তাহার প্রধান উজিরের নিকট নয়। আল্লাহতায়ালার এই ধরণের বন্ধুবর্গের নেতা হইলেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। বন্ধুত্বের মর্যাদা হইতে আরও এক শ্রেষ্ঠ মাকাম আছে, যাহা মহব্বতের সহিত জড়িত। ইহারা প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। দোস্ত ও বন্ধুর সম্মান এক রকম কিন্তু প্রেমাস্পদের মর্যাদা ভিন্ন। প্রেমাস্পদ ও প্রেমিকের যে সম্পর্ক, তাহাতে দোস্ত ও বন্ধুর প্রবেশ অধিকার নাই। তবে উচ্চ মর্যাদাধারী দোস্ত ও বন্ধুদের নিকট প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যেকার সম্পর্কের কিছু অংশ প্রকাশ পাইয়া থাকে। আল্লাহতায়ালার বন্ধুবর্গের শ্রেষ্ঠতম নেতা হইলেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ), প্রেমিকদিগের প্রতীক হইলেন হযরত মুসা (আঃ) এবং প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ-উভয় অবস্থার সমষ্টিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হইলেন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)। এখানে বিবেচনার বিষয় হইল, বন্ধুত্ব সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়, প্রেম গভীর অর্থে ব্যবহৃত হয়। বন্ধুত্ব হইল আম, আর প্রেম হইল খাছ। বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো হাহাকার, হা-হুতাশ নাই। একজন শুধু আর একজনের গুণের প্রতিই আগ্রহী ও গুণের প্রশংসাকারী। আর মহব্বতের সম্পর্কের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া, আদান-প্রদানের হিসাব নাই; তাহা সত্ত্বেও দুঃখ-জ্বালা, বিরহ রহিয়াছে। হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ ও প্রেমিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আর জানা যায় যে, তিনি সর্বদা চিন্তিত থাকিতেন। আরাম-আয়েস কিছুই তিনি ভোগ করেন নাই; যদিও শরীয়তে তিনি যেমন নবী ছিলেন, তেমনি তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক ক্ষমতার পূর্ণ অধিকারী ও নেতা ছিলেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ছিলেন আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ ও প্রেমিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম; তবুও তিনি বলিতেছেন, দুঃখ ও মনবেদনা তাহার চিরসাথী; তাহার ন্যায় দুঃখ ও বেদনা কেহ ভোগ করেন নাই। আল্লাহতায়ালা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) কে সকলের চেয়ে বেশী ভালবাসিতেন, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফাও (সাঃ) তাহাকে বেশী ভালবাসিতে চাহিয়াছেন। কিন্তু সৃষ্টি হিসেবে মানুষের এমন ক্ষমতা নাই যে, কেহ আল্লাহতায়ালাকে পূর্ণভাবে ভালবাসিতে পারে। তাই বেদনা ও অক্ষমতা ছাড়া সৃষ্টির জন্য আর কিছুই নাই। আর ইহাই মনবেদনার কারণ হইয়া দাঁড়ায়।

বিজ্ঞাপন

খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের পথিকগণ জানেন, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) মেরাজের সময়ে আল্লাহপাকের অতি নিকটবর্তী হইয়াছিলেন। তিনি পবিত্র হাদীছে এ কথাও বলিয়াছেন যে, "আল্লাহ ও তাহার মধ্যে কখনও কখনও এমন সম্পর্ক আসে যাহা নিকটতম ফেরেশতাগণ ও অন্য কোনো নবী অর্থাৎ নূরের প্রতিবিম্ব ও ঝলকের আবেশ হইতে মুক্ত হইয়া যান। (আঃ) লাভ করেন নাই।" এই স্তরে আসিলে প্রেমিক জেল্লিয়াতের এমন কি সিফাতের প্রকাশও আর থাকে না। এই অবস্থায় পৌঁছাইলে কাহারও আর আল্লাহপাককে বুঝিবার মত ক্ষমতা থাকে না। নবী করীম (সাঃ) এরও ছিল না। আল্লাহতায়ালাকে নিকটতম বা নিবিড়তম অবস্থায় পাইবার পরও তাহাকে না বুঝিবার এই যে বেদনা, ইহা এক অসহনীয় অবস্থা। ইহাই প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের অবস্থা-যাহা আল্লাহতায়ালা ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বন্ধুদের মধ্যে এইরূপ বিরহ-বেদনা নাই। বন্ধুত্বের মধ্যে রহিয়াছে শুধুই শান্তি, শুধুই আনন্দ। ইহার নিজস্ব পৃথক অবস্থার জন্য ইহাকে বন্ধুত্বের মাকাম বা খোল্লাতের মাকাম বলা হয়। খোল্লাত আল্লাহপাকের নিখুঁত বন্ধুত্বের প্রতীক। সৃষ্টির সহিত আল্লাহতায়ালার যে নিখুঁত বন্ধুত্ব রহিয়াছে, তাহারই প্রকৃত পরিচয় হইল খোল্লাত। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এই মাকামে খোল্লাতের বা আল্লাহতায়ালার বন্ধুত্বের পূর্ণ প্রকাশ। আল্লাহপাক ও হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-উভয়েই উভয়ের কার্যাবলীর জন্য খুশী ছিলেন।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর পিতা আজর, নমরূদের ভয়ে আপন পুত্র ইব্রাহিমকে জন্মের পর হইতে সাত বৎসর পর্যন্ত পাহাড়ের গুহায় লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন। তাই শৈশবে তিনি পিতার স্নেহ হইতে, আপন পিতা-মাতা, ভ্রাতঃভগ্নি পরিবেষ্টিত পরিবারের স্নেহ মায়ার পরিবেশ হইতে বঞ্চিত ছিলেন। কৈশর অতিক্রম করিতেই তিনি এক আল্লাহর বাণী প্রচার করিতে শুরু করেন। যৌবনে এই বাণী প্রচার করিতে যাইয়া তিনি নমরূদের আগুনে নিক্ষিপ্ত হন। পরবর্তীতে মিশরের ফেরাউনের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। দীর্ঘদিন পুত্রহীন থাকা অবস্থার পরে তিনি যখন পুত্র লাভ করেন, আল্লাহতায়ালার আদেশে সেই পুত্র রাখিয়া ইসমাঈল (আঃ) কে শিশু অবস্থায় পর্বতবেষ্টিত নির্জন মরু প্রান্তরে ঘ। সংগে তাহাদের জন্য পান করিবার পানি ও খাদ্যও খিয়া আসিলেন। রহিল না। একান্তই আল্লাহতায়ালার উপর নির্ভর করিয়াই তিনি তাহাদের সেই পাহাড় বেষ্টিত মরু প্রান্তরে রাখিয়া আসিলেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর পদাঘাতে জম জম কূপ আল্লাহতায়ালার দয়ায় প্রকাশ লাভকরিল। হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও তদীয় মাতা বিবি হাজেরার সাহায্যের জন্য স্বয়ং আল্লাহপাক জিব্রাইল (আঃ) দ্বারা বেহেশতী খেজুর পাঠাইলেন। পবিত্র জম জম কূপের তীরে সেই খেজুরের বীচি হইতে গাছ অংকুরিত হইল। ধীরে ধীরে মক্কা নামক স্থানে মরুদ্যান বাড়িয়া উঠিল। ক্রমে সেখানে জনপদ সৃষ্ট হইল। আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কাবা শরীফ সংস্কার করেন।

সৃষ্টির প্রতি আল্লাহতায়ালার যে সকল প্রকাশ্য নিদর্শন ও করুণাধারা, যেমন পবিত্র কাবা শরীফ, জম জম কূপ, পবিত্র মক্কা নগরী-যে নগরীর পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহতায়ালার কর্তৃক সুরক্ষিত, তাহার প্রকাশ হইয়াছে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অছিলায়। আবার স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টি হিসেবে মানুষের প্রেমের ও নিষ্ঠার প্রকাশ হিসেবে মহাপবিত্র কোরবানীর প্রবর্তনও হইয়াছে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অছিলায়। আল্লাহতায়ালার প্রেমের একাগ্রতা ও নিষ্ঠার প্রতি যে কোনো আঘাত প্রতিহত করার মানসিক শক্তির মহিমা রহিয়াছে হযরত ইসমাঈল (আঃ) কর্তৃক মিনা নামক স্থানে শয়তানের প্রতি কংকর নিক্ষেপের ঘটনায়। মানুষের প্রতি আল্লাহতায়ালার করুণা ও আল্লাহতায়ালার প্রতি সৃষ্টি জগতের মধ্যে আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ বন্ধু হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর আত্মত্যাগের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলিকে কেন্দ্র করিয়াই গড়িয়া উঠিয়াছে ইসলামের আরকান সমূহের অন্যতম হজ্বব্রত। এই দিক দিয়া বিবেচনা করিলে সৃষ্টির প্রতি আল্লাহতায়ালার প্রেমের ও করুণার প্রবাহমান ধারা ও পরম দয়ালু স্রষ্টা আল্লাহতায়ালার প্রতি মানুষের একনিষ্ঠ প্রেমের ও আত্মত্যাগের মহিমারই জয়গান যাহা হজ্বের মর্মকথা। স্রষ্টা ও সৃষ্টির পরস্পরের প্রতি এই যে প্রেম ধারা, তাহাই বন্ধুত্বের মাকাম বা খোল্লাতের মাকামের মূল কথা। তাহাই প্রকাশ হইয়াছে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মধ্য দিয়া। আর এই বন্ধুত্বের মাকামের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ পাক কর্তৃক কুরআন মজীদে সূরা বাকারায় বর্ণিত হইয়াছে। আল্লাহপাক হযরত ইব্রাহিমকে বলিয়াছিলেন, "নিশ্চয়ই আমি তাহাকে মানবগণের নেতা বানাইব। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, আমার সন্তানগণের মধ্য হইতেও। আল্লাহ বলিলেন, বানাইব: তবে আমার অংগীকার অত্যাচারীদের জন্য প্রযোজ্য হইবে না।"

বিজ্ঞাপন

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে আল্লাহপাক আরও জানাইয়াছিলেন "হে ইব্রাহিম! আমি তোমার এবং তোমার পূর্ব পুরুষের প্রতিপালক। তোমাকে প্রাচুর্যে ভরিয়া দিব। তুমি জাতির জনক হইবে। তোমার বংশাবলীকে ফেলানের সমগ্র ভূখন্ড দান করিব। তাহাদের বংশধর সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া যাইবে। তোমার পুত্র ইসমাঈল নিশ্চয়ই আমার প্রিয় বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত হইবে। তাহাকে আমি বিশেষ কল্যাণ ও অশেষ সম্মানের অধিকারী করিব। তাহার বংশধরগণ সমগ্র দুনিয়ায় খ্যাতি ও বিস্তৃতি লাভ করিবে।"

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "হকিকতে ইব্রাহিমী অত্যন্ত বরকতময় মাকাম। সৃষ্টি জগতে মানুষের মধ্যে যে পরস্পরের প্রীতি, ভালবাসা, নিঃস্বার্থপরতা, বন্ধুত্ব, শান্তি, ও তৃপ্তি, তাহা সকলই এই খোল্লাতের মাকামের বা হকিকতে ইব্রাহিমীর প্রতিবিম্ব। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ভ্রাতা-ভগ্নীর মধ্যে যে ভালবাসা, স্নেহ-মায়া-মমতা রহিয়াছে-তাহা উক্ত খোল্লাতের মাকামের প্রতিচ্ছায়া। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) কর্তৃক উল্লিখিত হইয়াছে, সৃষ্টির প্রীতি ও সৌহার্দ উদ্ভূত হইয়াছে ঐ মাকামে ইব্রাহিমী হইতে। মোহব্বত ও বন্ধুত্ব ভিন্ন বস্তু। উহাদের উৎপত্তিস্থানও বিভিন্ন। যদি বন্ধুত্ব বা খোল্লাত এবং স্নেহ মমতা ইহজগতে না থাকিত, তবে কোন মিলনই সংঘটিত হইত না। বিশেষতঃ বস্তু বা জীবের মধ্যে পরস্পরের বিপরীতের মিলন হইত না। "হোব্ব" বা প্রেম সৃষ্টির শৃংখল আলোড়িত করিয়াছে বলিয়াই সৃষ্টির কারণ ঘটিয়াছে। হাদীছে কুদছীতে আল্লাহ ফরমান, "তৎপর আমার পরিচিত হইতে ইচ্ছা হইল, তাই সৃষ্টি করিলাম।" হোব্ব বা প্রেম যাহা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর মধ্যে পূর্ণ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাই খোল্লাতের মাকামের পূর্ণতা। সৃষ্টি জগতে আসিয়া প্রেম সৃষ্টি হয় পরস্পরের আকর্ষণের মাধ্যমে, যাহা খোল্লাতের মাকামের প্রতিফলন। তাই সৃষ্টি জগতে পরস্পরের বিপরীতের মধ্যে যে প্রেম, যাহা সৃষ্টিকে প্রবাহমান রাখে, তাহা এই খোল্লাতের মাকামের প্রতিবিম্ব। পৃথিবীতে পরস্পরের প্রতি যে প্রেম তাহা খোল্লাত মাকাম হইতে আসে। কোন বস্তুও অস্তিত্বলাভ করিত না, এক ব্যক্তি আর এক ব্যক্তির সাক্ষাতে আনন্দ লাভ করিত না, যদি না খোল্লাতের মাকাম থাকিত। পৃথিবীতে শান্তি বলিয়া কিছুই থাকিত না। জগতের অস্তিত্ব এই খোল্লাতের উপর বা পরস্পরের প্রীতি ও সোহার্দের উপর নির্ভরশীল। তাই সৃষ্টি ও স্রষ্টা উভয়ের জন্যই এই খোল্লাত অতীব গুরুত্বপূর্ণ। স্রষ্টার জন্যও ইহা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ সৃষ্টি ব্যাতিরেকে তাহার প্রেম ও গুণ আস্বাদনের কেহ থাকিত না। খোল্লাতের মাকামের কামালাতের দ্বারাই অস্তিত্বের বন্ধুত্ব লাভ করিয়া নীস্তি স্রষ্টার দর্পণ তুল্য হইয়াছে। তাই খোল্লাত যাবতীয় বস্তু হইতে অতীব বরকত যুক্ত। এই খোল্লাতের মাকাম হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সহিত যুক্ত এবং উহার বেলায়েতকে বেলায়েতের ইব্রাহিমী বলে।

খোল্লাতের মাকামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হইল সর্বদা ও সর্বাবস্থায় আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী থাকা, আল্লাহতায়ালার আদেশ-নির্দেশ পালনে সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা। এই মাকামের নেতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে তাই দেখা যায় আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার কাছে সর্ব অবস্থায় আত্ম সমর্পণ করিতে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) যখন তাহার একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন, তখনও তাহাকে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় কোরবানী দানের ঘটনা-আল্লাহতায়ালার প্রতি তাহার ঐকান্তিক আনুগত্য ও প্রভু পরওয়ারদেগারের রাজীতে রাজী থাকার জন্য তিনি কি পরিমাণ ত্যাগ করিতে পারিতেন, তাহারই হৃদয় বিদারক স্মৃতি বহন করিয়া আসিতেছে।

পবিত্র হাদীস শরীফে আছে যে, এক রাত্রে হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আঃ) স্বপ্নে দেখিলেন, কেহ তাহাকে বলিতেছেন, "হে ইব্রাহিম! উঠ, কোরবানী কর।" হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ফজরের সময়ে উঠিয়া দুই শত উট কোরবানী করিলেন। পরের দিনও তিনি অনুরূপ স্বপ্ন দেখিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এইবারও ঐরূপে দুইশত উট কোরবানী করিলেন। এই ভাবে তিন রাত্রে একই স্বপ্ন দেখিলেন। চতুর্থ রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন যে, তিনি পুত্র ইসমাঈলকে কোরবানী করিতেছেন। পরগম্বর (আঃ) গণের স্বপ্নও অহী। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) মন স্থির করিলেন। আল্লাহতায়ালার নির্দেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করিবেন। তিনি বিবি হাজেরার নিকট গেলেন। তখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর বয়স নয় বৎসর ছিল। কোনো কোনো বর্ণনায় বয়স এগার বৎসর বলিয়াও উল্লেখ করা হইয়াছে।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বিবি হাজেরাকে বলিলেন, হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে লইয়া তিনি জেয়াফতে যাইবেন। তাই তিনি হযরত ইসমাঈলকে গোসল করাইয়া, সুন্দর পোশাক পরাইয়া, চুল আচড়াইয়া। মেশক আম্বরের সুগন্ধি লাগাইয়া দিতে বলিলেন। বিবি হাজেরা তাহাই করিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পূর্বেই ছুরি ও রশি নিজের দেহে জামার আড়ালে লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন। ইতিমধ্যে শয়তান বিবি হাজেরার নিকটে উপস্থিত হইয়া বলিল, ইসমাঈলের পিতা তাহাকে কোরবানী করিবার জন্য লইয়া গিয়াছে।" বিবি হাজেরা বলিলেন, "এমন কথা কেহ কি কখনও শুনিয়াছে, পিতা পুত্রকে জবেহ করে? শয়তান তখন বলিল, "আল্লাহ তাহাকে হুকুম দিয়াছেন।” বিধি হাজেরা বলিলেন, "যদি আল্লাহ তাহাকে ঐরূপ হুকুম দিয়া থাকেন, তাহাতে আমি রাজী আছি।" শয়তান বিবি হাজেরা (রাঃ)-এর ঈমান নষ্ট করিতে ব্যর্থ হইয়া হযরত ইসমাঈলের নিকটে গেল। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তখন একটু পিছনে থাকিয়া আপন পিতাকে অনুসরণ করিতেছিলেন। শয়তান তাহাকে বলিল, "তোমাকে তোমার পিতা জবেহ করিতে লইয়া যাইতেছে।" হযরত ইসমাঈল (আঃ) উত্তর দিলেন, "কোনো পিতা কি কখনও আপন পুত্রকে জবেহ করেন? ইবলিস বলিল, "ইহা খোদার হুকুম।" তখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলিলেন, যদি আল্লাহতায়ালার হুকুমই হইয়া থাকে তাহা হইলে আমার মত হাজার জীবন আল্লাহতায়ালার রাস্তায় কোরবানী হউক। ইহার পর আরও বেশ কিছু দূরে যাইয়া হযরত ইসমাঈল (আঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আব্বাজান, আমাকে কোথায় লইয়া যাইতেছেন?” তখন ইসমাইল (আঃ) কে সকল ঘটনা তিনি খুলিয়া বলিলেন। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে। "ইসমাঈল (আঃ) যখন ইব্রাহিম (আঃ) এর সহিত ভাল করিয়া দৌড়াইবার বয়সে পৌঁছাইলেন, অর্থাৎ তিনি দৌড়াদৌড়ি করিতে পারেন ও দূরের পথ অতিক্রম করিতে পারেন, তখন ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “হে প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি, আমি তোমাকে কোরবানীর উদ্দেশ্যে জবেহ করিতেছি; ইহাতে তোমার কি মত?" হযরত ইসমাইল (আঃ) উত্তরে বলিলেন, "হে পিতা! আপনাকে যাহা আল্লাহপাকের তরফ হইতে আদেশ করা হইয়াছে, তাহাই করুন। ইনশাল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলগণের মধ্যে পাইবেন।" বর্ণিত আছে, জিলহজ্ব মাসের আট তারিখের রাত্রিতে ইব্রাহিম (আঃ) প্রথম কোরবানীর স্বপ্ন দেখেন ও দশম তারিখে হযরত ঈসমাইলকে (আঃ) কোরবানী করিবার নিয়তে বাহির হন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) পিতাকে বলিলেন, "হে আমার পিতা! আপনি আল্লাহতায়ালার আদেশ পালনে বিলম্ব করিবেন না। কারণ শয়তান আদেশ পালনের পথে ওয়াসওয়াসা বা কু-মন্ত্রণা দিতে পারে।" ইহাতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, "তুমি শয়তানকে পাথর মারিয়া তাড়াইয়া দাও।" হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাহাই করিলেন। হাজ্বীগণ এখনও হজ্বের সময়ে ঐ সুন্নত পালন করেন।

কোরবানী সম্পন্ন করিবার জন্য হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পুত্রকে উপুড় করাইয়া শোয়াইলেন, যেন তাহার মুখ দেখিয়া তাহার মধ্যে স্নেহ বা মহব্বত সৃষ্টি না হয়। ইসমাঈল (আঃ) বলিলেন, "আপনি আমার তিনটি কথা রাখিবেন, (১) আমার হাত পা মজবুত করিয়া বাঁধিবেন, যাহাতে জবেহ করিবার সময় আমি বেশী ছটফট করিতে না পারি। (২) আমাকে উপুড় করিয়া রাখিবেন, যাহাতে আপনি আমার সম্মুখ দেখিয়া স্নেহের কারণে আল্লাহর হুকুম পালনে গাফেল না হন এবং (৩) আমার রক্ত মাখা জামাটি আমার দুঃখিনী মাতাকে প্রদান করিবেন।

অতঃপর হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ছুরি চালাইলেন। কিন্তু ছুরি একটি পশমও কাটিল না। ইসমাঈলের অনুরোধে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আরও জোরে ছুরি চালাইতে লাগিলেন। তখনও তাহাকে কিছু করিতে পারিলেন না। ইব্রাহিম (আঃ) রাগ করিয়া ছুরি ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। ছুরি বলিল, "হুজুর, আল্লাহ আমাকে কাটিতে নিষেধ করিয়াছেন। আপনাকে তিনি একবার আদেশ করিয়াছেন। আর আমাকে তিনি দশবার নিষেধ করিয়াছেন। আপনার আদেশ হইতে আল্লাহতায়ালার আদেশ উত্তম।” এই অবস্থায় হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেলেন। এমন সময়ে ঊর্ধ্ব হইতে আওয়াজ হইল, যাহা কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে।

"আমি ডাক দিয়া বলিলাম, হে ইব্রাহিম! তোমার স্বপ্নকে তুমি সত্য সত্যই বাস্তবায়িত করিয়াছ। আমি এমনভাবেই সৎ কর্মীদের প্রতিদান দিয়া থাকি। নিশ্চয়ই ইহা একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা। আমি ইসমাঈলের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানী দিয়াছি। বেহেশত হইতে একটি দুম্বা আসিয়া ছুরির নীচে কোরবানী হইয়া গেল এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে ইব্রাহিমের সুন্নত চালু রাখিয়াছি। ইব্রাহিম যখন চক্ষু বন্ধ করিয়া ছুরি চালাইতেছিল, তখন হযরত জীব্রাইল (আঃ) একটি দুম্বা আনিয়া ছুরির নীচে রাখিয়া দিলেন। আর ইসমাঈলকে সরাইয়া দিলেন।" এই রূপে নিজের একমাত্র পুত্রকে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে কোরবানী করিয়া আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনে কি ভাবে ত্যাগ স্বীকার করিতে হয়, খোল্লাত মাকামের নেতা তাহার উদাহরণ রাখিয়া গিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করা, ইহ ও পরকালের সকল কিছুর বিনিময়ে কেবল আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী থাকাই খোল্লাতের মাকামের শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য। এই মাকাম যেমন আল্লাহতায়ালার মহব্বতের সহিত সংযুক্ত, তেমনি তাহার জন্য ত্যাগ ও তাহার প্রতি সার্বিক আনুগত্যের নিদর্শক। তাই এই মাকাম অতিক্রম করিয়াই আল্লাহতায়ালার জাতপাকে পৌঁছাইতে হয়। ইহার অন্য কোনো বিকল্প নাই। আর এই ত্যাগ ও তিতিক্ষার পথে আল্লাহতায়ালার জাতে পৌঁছাইতে হয় বলিয়াই ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহতায়ালার পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) কে অনুসরণ করিয়া যে সকল সাধক আল্লাহতায়ালার জাত পর্যন্ত পৌঁছাইবার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছেন; তাহারাও তাহাদের নিজ নিজ জীবনে আল্লাহতায়ালার পথে অপরিসীম দুঃখ, ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করিয়াছেন। এই ত্যাগ ও তিতিক্ষা তাই হযরত নবী করীমকে (সাঃ), তদীয় অনুসারী ছাহাবাগণকে ও তাহার এত্তেবা করিয়া যাহারা খোদার জাতে পৌঁছাইবার সাধনায় সাফল্য লাভ করিয়াছেন তাহাদেরকে মহৎ হৃদয়ের অধিকারী করিয়াছে; সকল ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকিয়া তাহারা মানবতার সেবা ও কল্যাণ করিয়াছেন। তাহাদের ত্যাগের দ্বারাই তাহারা মানবের ভক্তি ও ভালবাসা অর্জন করিয়া মানুষকে আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েত করিয়াছেন। খোল্লাতের মাকাম বা যে মাকামে হরিষে বিষাদ নাই, সেই মাকাম তাই আল্লাহতায়ালার জাতে পৌঁছাইবার পথে যেমন এক অধ্যায়, তেমনি মানবতার মধ্যে আল্লাহতায়ালার ক্ষমা ও ত্যাগের গুণ প্রকাশের মাকাম।

হে জাকেরান সকল! তোমরা জানিয়া রাখ, আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেব ছিলেন প্রেম মুল্লুকের যাবতীয় হকিকতের জ্ঞানে জ্ঞানী। তিনি যেমন খোল্লাতের মাকামের জ্ঞানধারী ছিলেন, তেমনি তিনি প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পত্বের জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন।

তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার জাত পাকের জ্ঞান লাভ করিবার বাসনা রাখ ও সেই উদ্দেশ্যে হকিকতে ইব্রাহিমী তথা খোল্লাতের মাকাম অতিক্রম করিতে চাও, তাহা হইলে তোমরা আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর, হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসুফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের পাক দেলে দেল মেশাও, তাহার এত্তেবা ও অনুসরণের জন্য, তাহার মহব্বত হাসিলের জন্য, তাহার কবলিয়াত লাভের জন্য, তাহার কদমে নেছার হইয়া যাও। আল্লাহর রহমত তোমাদের উপর বর্ষিত হউক। দু'আ, ইতি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD