নবী বংশের প্রতি উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের বিবরণ

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘মুহারাম’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ নবী বংশের প্রতি উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার-নির্যাতনের সংক্ষিপ্ত বিবরণঃ
বিজ্ঞাপন
মারোয়ান-পুত্র আব্দুল মালেক যখন মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিপতি, তখন ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের যশ-খ্যাতি, প্রভাব-প্রতিপত্তি সর্বোচ্চে। ইমাম ছাহেবের জনপ্রিয়তায় খলিফা মালেক ভীত হয়। সে কৌশলে ইমাম-তনয়ের জনপ্রিয়তাকে নিজ স্বার্থে লাগানোর চেষ্টা করে। ইমাম জয়নাল আবেদীনের সাথে সম্পর্কের উন্নতিকল্পে সে বিবিধ পন্থা অবলম্বন করে।
একদা খলিফা মারোয়ান-পুত্র মালেক হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় যায়। কাবাঘর তাওয়াফের সময় সে লক্ষ্য করে যে ইমাম-নন্দনও অত্যন্ত তন্ময়তার সাথে কাবা ঘর তাওয়াফ করিতেছেন। মালেক ইবনে মারোয়ান নিজেকে ইমাম-তনয়ের দৃষ্টিপথে আনিতে চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) এত গভীর মগ্নতার সাথে তাওয়াফ করিতেছেন যে অন্য কোন দিকেই তাহার কোন খেয়াল নাই। তাওয়াফ শেষে আব্দুল মালেক নিজের বিশ্রামাগারে যায়। বহু লোক তাহার সাথে দেখা করিতে আসে। মালেক ইবনে মারোয়ানের ধারণা ছিল যে, অন্যান্যদের মত ইমাম জয়নাল আবেদীনও তাহার সহিত দেখা করিতে আসিবেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকিয়া ইমাম-তনয়কে না দেখিয়া সে বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে ডাকিয়া আনিবার জন্য লোক পাঠায়।
ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) আসিলে খলিফা মালেক ইবনে মারোয়ান তাহাকে বলে, "হে হোসেন-তনয়! আমিতো আপনার পিতার ঘাতক নই, তবু আপনি আমার প্রতি হিংসা পোষণ করেন বলিয়া মনে হয়। সকলেই আমার সহিত দেখা করিল। কিন্তু আপনি আমার সহিত দেখা করিলেন না কেন?"
বিজ্ঞাপন
এই হিংসাত্মক কথা শুনিয়া নির্ভীকচিত্তে জয়নাল আবেদীন জবাব দেন, "দেখুন, আমার পিতার ঘাতকগণ আমাদের দুনিয়াবী জীবন দুঃখময় করিয়াছে। আর আমার পিতা শ্রদ্ধেয় ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব নিপীড়িতাবস্থায় শাহাদাত বরণ করিয়া তাহাদের পারলৌকিক জীবন বরবাদ করিয়া দিয়াছেন। এখন আপনিও যদি অকারণে আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিয়া আপনার আখেরাতকে নষ্ট করিতে চান, তাহাতে আমার পক্ষ হইতে আপনি কোনই বাঁধার সম্মুখীন হইবেন না।"
ইমাম-তনয়ের এহেন নির্ভীক জবাবে মালেক ইবনে মারোয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হইয়া বলিয়া উঠে, "হে হোসেন-তনয়! আপনি এমন কথা বলিতেছেন কেন? আমি কেন আপনার সহিত হিংসা পোষণ করিতে যাব? অবশ্য আপনারতো উচিৎ আমার সাথে কিছুটা সুসম্পর্ক রক্ষা করিয়া চলা। আপনার যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়, আমাকে তো আপনি জানাইতে পারেন? আমি তাহা পূরণ করিয়া দেব।"
আসলে ইহা ছিল ইমাম-তনয়ের জনপ্রিয়তাকে নিজের রাজনৈতিক সার্থসিদ্ধি হাছিলের অনুকুলে মালেকের অপচেষ্টা মাত্র। খলিফা মালেকের উপরোক্ত প্রস্তাবে জয়নাল আবেদীন বলিলেন, "ওহে আব্দুল মালেক! সবকিছু পূরণ করার মালিক আল্লাহতায়ালা। সুতরাং কাহারো কিছু প্রয়োজন হইলে তাহা আল্লাহতায়ালার নিকটেই জানানো উচিৎ।"
বিজ্ঞাপন
ইমাম-তনয়ের এহেন জবাবে মালেক ইবনে মারোয়ান অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয় কিন্তু সে সমস্ত ক্রোধকে মনের মধ্যে গুপ্ত রাখে। তারপর ইমাম জয়নাল আবেদীনের উপর বিভিন্ন মানসিক চাপ প্রয়োগের জন্য হীন কৌশলের আশ্রয় নেয়। সেই সময় মালেক ইবনে মারোয়ানের পক্ষে মদীনার গভর্ণর ছিলেন হযরত ওসমান (রাঃ) এর তনয় আবান। আবান ছিলেন অত্যন্ত সৎ, কোমল ও আহলে বায়েত হিতাকাংখী। তিনি ইমাম-তনয়কে অতিশয় শ্রদ্ধা করিতেন। মালেক ইবনে মারোয়ান ইমাম-তনয়ের উপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রথমেই বিনা কারণে মদীনার গভর্ণর আবান ইবনে ওসমান গণি (রাঃ) কে পদচ্যুত করিয়া তদ্স্থলে নিষ্ঠুর ও কঠোর বলিয়া পরিচিত হিশাম ইবনে ইসমাইল মাখযুমীকে নিযুক্ত করে। নিষ্ঠুর হিশাম মদীনায় আসিয়াই ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ও তাঁহার অনুসারীদেরকে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করিতে থাকে। সে মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়াইয়া ইমাম-নন্দনকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করিতেও দ্বিধাবোধ করে না। হিশামের ধৃষ্টতা ও রূঢ় আচরণে ইমাম-নন্দনের অনুসারীগণেরা ক্রুদ্ধ হন। তাহারা হিশামকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার সমুদয় প্রস্তুতি লইয়া ইমাম জয়নাল আবেদীনের নিকট অনুমতি প্রার্থনার জন্য যান। কিন্তু ইমাম-নন্দন সংঘর্ষের পথকে পরিহার পূর্বক অনুসারী ও ভক্তদেরকে ধৈর্যধারণ করিতে পরামর্শ দেন ও মহান বিচারক আল্লাহতায়ালার হাতে বিচারের ভার ছাড়িয়া দিতে বলেন। ইমাম জয়নাল আবেদীনের নির্দেশে তদীয় অনুসারীগণ সংঘর্ষের পথ পরিহার করেন। এদিকে হিশাম তাহার ইচ্ছামত ইমাম ভক্তদের উপর নিগ্রহ চালাইতে থাকে।
ইহার কিছুদিন পরেই আব্দুল মালেকের পুত্র হিশাম হজ্জ পালন উপলক্ষে বহু বন্ধু-বান্ধব ও লস্করসহ মক্কায় আসে। এবার কাবাশরীফে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। কাবাঘর তাওয়াফকালে যুবরাজ হিশাম ইবনে মালেক বন্ধু-বান্ধবসহ তাওয়াফ করিতেছে। সরকারী কর্মকর্তারা যথাসাধ্য ভীড় কমাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেছে। বহুকষ্টে যুবরাজ তাওয়াফ করিল। তারপর "হাজরে আসওয়াদ" চুম্বন করিতে চেষ্টা করিল। কিন্তু প্রচন্ড ভীড়ের কারণে চুম্বন করিতে ব্যর্থ হইয়া বন্ধু-বান্ধবসহ যুবরাজ হিশাম এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া রহিল।
কিছুক্ষণ পরেই হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক লক্ষ্য করিল যে ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) কিছু বুজুর্গ অনুসারী কর্তৃক পরিবেষ্টিত হইয়া "হাজরে আসওয়াদ" চুম্বনের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হইতেছেন। সংগে সংগে হাজীদের ভীড় আপনা থেকেই হ্রাস পাইতেছে। ফলে বিনাক্লেশে ইমাম-তনয় "হাজরে আসওয়াদ" চুম্বন করিলেন। ইহা দৃষ্টে যুবরাজ হিশাম ইবনে আব্দুল মালেকের গায়ে জ্বালা শুরু হইল। সে অপমানে, লজ্জায় ও ক্ষোভে দ্রুত স্থান ত্যাগ করিতে উদ্যত হইল। এমন সময় তাহার একজন বন্ধু হিশামের নিকট জানিতে চাহিলেন যে, সম্মানিত ফকিরকে তিনি চেনেন কিনা? ক্ষুব্ধ ও অপমানাহত হিশাম তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দিল, কে জানে কোথাকার ফকির, তাহাকে চিনিতে হইবে নাকি?
বিজ্ঞাপন
এই সময়ে তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি, ইমাম-নন্দনের ভক্ত, আশেকে রাসূল, আবুল ফারাস ফেরাজদাক নিকটেই ছিলেন। যুবরাজ হিশামের অবজ্ঞাপূর্ণ কথা শুনিয়া তিনি আর ধৈর্য ধারণ করিতে পারিলেন না। তৎক্ষণাৎ কবিতার সুরেই বলিষ্ঠ ভাষায় তিনি প্রতিবাদ করিলেল। বলিলেন,
"ওহে অন্ধ পাপীরা! তোমরা চেন না তারে!
তিনি সে মহান সত্তা, যাহার পদক্ষেপগুলো মক্কাও চিনিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ইনি সে মহান পুরুষ, খোদ বায়তুল্লাহ জানে যার পরিচয়। হেরেম ভূমির কোন বালুকনার কাছেও তার কথা অবিদিত নয়।
ইনি জগতের সেরা মানুষের সেরা ইমামের সন্তান,
অন্তর যার পাপ লেশহীন পুত পবিত্র মহান।
বিজ্ঞাপন
হৃদয় যাহার জ্ঞানের সাগর আর এলেমের ভান্ডার;
তাকেই চিনে না-একথা যে বলে লজ্জা নাই কি তার?
যিনি পবিত্র কাবার হাতীমে-পাথরে চুম্বন দিতে গেলে,
বিজ্ঞাপন
তাঁর পবিত্র সুরভীতে তারা উল্লাসে উঠে ছলে।
শালীনতায়, আভিজাত্যে তাঁর তুল্য কে আছে ভাই,
মানুষের সব সেরাগুণ শেষ এখানে আর কিছু বাকী নাই।
বিজ্ঞাপন
অজ্ঞ মুর্খেরা! এই মহৎ জনের পরিচয় যদি এখনও না জেনে থাক,
তবে আমি আজ বলি তার কথা সবে কান পেতে শুনে রাখ।
ইনি রাসূল-দুহিতা ফাতেমার সুযোগ্য পুত্রের সন্তান।
বিজ্ঞাপন
যার জনকের মাতামহ নবী রাসূলগণের সর্বশ্রেষ্ঠ জন।
শালীনতা ও বিনয়াধিক্যে সদাই দৃষ্টি আনত যার,
তবু তার চোখে চোখ রেখে কথা বলে,
বিজ্ঞাপন
এমন শক্তি কার?
তাঁর পেশানীর হেদায়েতী নূর জাহেলী এমনি করে বিনাশ, যেমনি সূর্য নিজ আলো দ্বারা করে দেয় সব আধার নাশ।"
(আবুল ফারাসের কবিতার বংগানুবাদ মাওলানা আবদুর রহমান রচিত "জয়নাল আবেদীন" পুস্তিকা থেকে নেওয়া হইয়াছে)
আবুল ফারাসের নবী-প্রেমসিক্ত কবিতা শুনিয়া ইমাম-তনয়ের অনুসারী ও ভক্তরা আনন্দে-উল্লাসে তাকবির ধ্বনি দিতে থাকে। আর এই দুঃসাহসিক কবিতা আবৃতি শুনিয়া অপমানাহত যুবরাজ বন্ধু-বান্ধবসহ দ্রুত সেস্থান ত্যাগ করে।
এই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাংখিত ঘটনায় ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) চিন্তিত হন। তাঁহার চিন্তা হয় আবুল ফারাসকে নিয়ে। তাহার কবিতাবৃত্তিতে যুবরাজ হিশাম যে অতিশয় অপমানিত ও লাঞ্ছিত হইয়াছে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। আর অপমানাহত হিশামের পিতা নিষ্ঠুর আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ান যে ইহার প্রতিশোধও লইবে; তাহাতেও কোন সংশয় নাই।
হজ্জের সমুদয় পর্ব সমাপ্ত করিয়া আবুল ফারাস মদীনায় ফিরিবার পথে আব্দুল মালেকের সৈন্যগণ কর্তৃক বন্দী হন। বন্দীবস্থায় তিনি দামেস্কে নীত হন। আব্দুল মালেক তাহাকে কারাগারে বন্দী করিয়া রাখে। পুত্রের অপমানে পিতা আব্দুল মালেক ভীষণ ক্রুদ্ধ হন। তাহার ধারণা হয়-আবুল ফারাসের কবিতাবৃত্তির পিছনে জয়নাল আবেদীনের প্রচ্ছন্ন হাত আছে। ইহা তাহারই অপকৌশল ভিন্ন কিছু নয়। পূর্ব হইতেই জয়নাল আবেদীনকে আব্দুল মালেক সন্দেহ করিত। এবার আবুল ফারাসের কবিতাবৃত্তি ও জয়নাল আবেদীনের অনুসারীদের আনন্দ-উল্লাসের কথা শুনিয়া তাহার ক্রোধ চরমে পৌছে। তৎক্ষণাৎ মদীনার গভর্ণর হিশাম ইবনে ইসমাইলকে নির্দেশ দেওয়া হয়ঃ ইমাম-তনয়কে গ্রেফতার করিয়া দুই পায়ে শিকল পড়াইয়া দামেস্কে প্রেরণ করা হউক।
হিশাম ইবনে ইসমাইল মাখযুমী পূর্ব হইতে নবী-বংশ বিদ্বেষী ছিল। মালেক ইবনে মারোয়ানের হুকুম পাওয়া মাত্রই সে ইমাম-তনয়কে বন্দী করিয়া দামেস্কে প্রেরণের ব্যবস্থা করে। ফলে মদীনায় ইমাম-নন্দনের অনুসারীরা বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু মদীনা ত্যাগ করিবার পূর্বে জয়নাল আবেদীন বিক্ষুব্ধ অনুসারীদেরকে শান্ত থাকিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, "বৎসগণ! তোমরা সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয়ের পথ পরিহার কর। কারবালায় যে রক্ত আমি দেখিয়াছি-তাহার পর আর রক্ত দেখিতে চাই না। তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহ পাক যাহা করিতেছেন, নিশ্চয় ইহার মধ্যে মংগল নিহিত।"
ইহার পর তিনি দামেস্কে নীত হন। দামেস্কের দরবার কক্ষে তখন আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ান পারিষদসহ বসিয়া আছে। এমন সময় ইমাম-তনয় কক্ষে বন্দীবস্থায় প্রবেশ করেন। তাহার নূরানী ও তেজদীপ্ত চেহারা দেখিয়া মালেক ইবনে মারোয়ানের হৃদকম্পন শুরু হয়। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া তাৎক্ষণিকভাবে করনীয় কি-তাহা বিজ্ঞ পারিষদগণের নিকট জানিতে চাইলে স্বনামধন্য মোহাদ্দেস মোহাম্মদ ইবনে মুসলিম যুহরী বলেন, "ইমাম জয়নাল আবেদীনের কোন আচরণ রাজদ্রোহিতামূলক বা আপনাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যসূচক-এমন কোন প্রমাণ আপনার হাতে নাই। ইনি ফকির লোক। সর্বদাই এবাদত বন্দেগীতে মগ্ন থাকেন। আমার মতে এমন মহৎ মানুষকে কোনরূপ কষ্ট না দেওয়াই উত্তম।" উক্ত পরামর্শে আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ান তৎক্ষণাৎ জয়নাল আবেদীন (রঃ) কে ছাড়িয়া দেন এবং মদীনায় পৌছাইয়া দেওয়ারও ব্যবস্থা করেন। সংগে মহাকবি আবুল ফারাসকেও মুক্তি দেওয়া হয়।
ইহার কিছুদিন পরেই আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ান প্লেগরোগে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুবরণ করে। তাহার ইন্তেকালের পরে মুসলিম সাম্রাজ্যের মসনদে বসেন আব্দুল মালেকের জ্যেষ্ঠপত্র ওলিদ। শাসন কার্য পরিচালনা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় তিনি পিতার মতই যোগ্য ছিলেন। এতদ্ব্যতীত তাহার মধ্যে আরও কিছু গুণের সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। তিনি সৎ, ন্যায় নিষ্ঠ ও দয়ালু ছিলেন; নবী-বংশের হিতাকাংখী ছিলেন। তাহার পিতা যেমন ইমাম জয়নাল আবেদীনের সাথে শত্রুতা পোষণ করিত, তিনি তেমনটি কখনোই করেন নাই। তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইয়াই পিতা কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার গভর্ণর নিষ্ঠুর হিশাম ইবনে ইসমাইলকে পদচ্যুত করিয়া তদস্থানে পিতৃব্য ভ্রাতা ওমর ইবনে আব্দুল আযীযকে গভর্ণর নিযুক্ত করিয়া মদীনায় পাঠান।
ওমর ইবনে আব্দুল আযীয মদীনায় আসিয়া ইমাম জয়নাল আবেদীনের পবিত্র সান্নিধ্য পাইয়া ধন্য হন। ইমাম-নন্দনের পরশস্পর্শে নিজ চরিত্রকে সুশোভিত করিবার সুবর্ণ সুযোগও মেলে তাহার। তিনি সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। মাঝে মাঝেই তিনি ইমাম-নন্দনের দরবারে যাইতেন। তাহার মুখ-নিঃসৃত আল্লাহ-রাসূল সম্পর্কীয় মিষ্টি মধুর কথা শুনিতেন।
এদিকে মদীনাবাসীগণ পূর্বের অত্যাচারী শাসক হিশাম ইবনে ইসমাইলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলিয়া ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের নিকট বিচার প্রার্থনা করিতে থাকেন। তাহাদের বিচার দাবীতে ওমর ইবনে আব্দুল আযীয হিশাম ইবনে ইসমাইলকে বন্দী করিয়া হাত-পা বাঁধিয়া মারোয়ান ইবনে হাকামের বাড়ীর সম্মুখে রাখিয়া দেন। তিনদিন পর্যন্ত হিশাম উক্তরূপ লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়।
ইতিমধ্যে ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) হিশামের দুরবস্থার কথা শুনিয়া দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন। তাঁহাকে দেখিয়া হিশাম ইবনে ইসমাইলের কলিজার পানি শুকাইয়া যায়। কারণ ইমাম-তনয়ের উপর সে যত অত্যাচার করিয়াছে, এমনতো আর কাহারো উপর করে নাই। কিন্তু ইমাম-নন্দন ঘটনাস্থলে আসিয়া হিশামের হাত-পা খুলিয়া দিয়া তাহাকে বলিলেন, "হিশাম! তুমি চিন্তা করিও না। তোমার কোন ভয় নাই। কোন কিছুর প্রয়োজন হইলে আমাকে বলিও।" ইমাম-তনয়ের নিকট থেকে এমন অকল্পনীয় আচরণ পাইয়া হিশাম আবেগাভিভূত হইয়া পড়ে। সে ইমাম ছাহেবের হাত জড়াইয়া ধরিয়া অঝরে কাঁদিতে থাকে। ইমাম জয়নাল আবেদীন তৎপর ওমর ইবনে আব্দুল আযীযকে বলিয়া হিশামের মুক্তির ব্যবস্থা করাইয়া দেন। জয়নাল আবেদীনের চরিত্র ছিল দয়াল নবী (সাঃ) এর চরিত্রের প্রতিবিম্ব-যাহার প্রমাণ উপরের ঘটনাতে পাওয়া যায়।
জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেব প্রশাসনিক হাজার বাঁধার মোকাবেলা করিয়া রাসূলে পাক (সাঃ) প্রতিষ্ঠিত সত্য ও পূর্ণাংগ ইসলামের আলোতে মুসলিম জাহানের দিক-বিদিক আলোকিত করিয়া লক্ষ লক্ষ খোদাঅন্বেষীদের শোক সমুদ্রে ভাসাইয়া দারুল বাকায় চলিয়া যান।
ইন্তেকালের পূর্বে নিজ দেলে পুঞ্জিভূত এলমে বাতেন বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান জ্যেষ্ঠপুত্র মোহাম্মদ ইবনে জয়নাল আবেদীনের দেলে ট্রান্সফার করেন।
ইমাম জয়নাল আবেদীনের আট জন পুত্র সন্তান ছিলেন। ইহাদের মধ্যে ইমামতের দায়িত্ব তিনি অর্পণ করেন পুত্র মোহাম্মদের উপর। মোহাম্মদ (রঃ) এলমে বাতেন ও দীনের অন্যান্য শাখার কামালিয়াত অর্জন করেন পিতার নিকট থেকে। পিতা ব্যতীত অন্যান্য যাহাদের নিকট থেকে মোহাম্মদ ইবনে জয়নাল আবেদীন ধর্মের বিভিন্ন শাখার বিশেষ করিয়া এলমে হাদীস, এলমে ফিকাহ, এলমে তাফসীরের জ্ঞান অর্জন করেন-তাহারা হইলেন মনীষী হযরত যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রঃ) প্রমুখ।
তিনি মারেফাত দফতরের সমুদয় স্তর তয় করিয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছাইয়াছিলেন। তাই লোকে তাহাকে বাকের উপাধিতে ভূষিত করেন। বাকের তাহাকেই বলা হয় যিনি মারেফাতের সমুদয় স্তর অতিক্রম করিতে সক্ষম।
মোহাম্মদ আল বাকের (রঃ) পিতা জয়নাল আবেদীনের মতই পরিপূর্ণ ও সত্য ইসলামের নূরে মানব সমাজের দেলের ময়লা পরিস্কার করিতেন। মুসলিম জাহানে তাহার যশ-খ্যাতি ও প্রভাব পিতার মতই ছিল। খ্যাতনামা শরিয়তবেত্তা ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ছাহেব ইমাম বাকের, (রঃ) ছাহেবের খেদমত করিয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিয়াছেন। ইমাম জয়নাল আবেদীন (রাঃ) ছাহেবের অপরাপর সন্তানেরাও পিতা কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত ইসলামের সত্য ও পূর্ণ ইসলামের সাত্ত্বিক আদর্শ প্রচার করিতেন।
ইমাম বাকের (রঃ) ছা ছাহেব হিজরী ১১৮ সনে ইনতেকাল করেন। তাঁহার পরে দয়াল নবী (সাঃ) এর সত্য ইসলামের ধারক, বাহক ও প্রচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তদীয় সুযোগ্য সন্তান ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ)। ইমাম জাফর ছাদেক (রাঃ) জনন্মগ্রহণ করেন ১০৮ হিজরীতে। পিতার ইন্তেকালের সময় তাহার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। এই অল্প বয়সেই পিতার নিকট থেকে তিনি এলমে মারেফাতের নেয়ামত প্রাপ্ত হন। তাহার মাতা ছিলেন হযরত আবুবকর ছিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের নাতি কাসেম ইবনে মোহাম্মদ (রাঃ) এর কন্যা।
মারেফাত বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের বহুল প্রচলিত দুইটি ধারার মধ্যে একটি আসে হযরত আবুবকর ছিদ্দিক (রাঃ) এর দেল বাহিত হইয়া। আর একটি আসে হযরত আলী (কঃ) এর দেল বাহিত হইয়া। হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব হযরত আলী (কঃ) এর দেল বাহিত খোদাপ্রাপ্তিজ্ঞানের নূর লাভ করেন নিজ পিতা হযরত ইমাম বাকের (রঃ) ছাহেবের নিকট থেকে এবং হযরত আবুবকর ছিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের দেল বাহিত এলমে বাতেনের নূর লাভ করেন মাতামহ হযরত কাসেম ইবনে মোহাম্মদ (রাঃ) ছাহেবের দেল হইতে। উল্লেখ্য, হযরত কাসেম ইবনে মোহাম্মদ এলমে বাতেনের নূর লাভ করেন হযরত ছালমান ফারসী (রঃ) এর নিকট থেকে এবং হযরত ছালমান ফারসী (রাঃ) ইহা প্রাপ্ত হন হযরত আবুবকর ছিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের নিকট থেকে। উভয় দিক থেকে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের আলো লাভকরিয়া হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব মারেফাত আকাশের সূর্যে পরিণত হন। তাহার তেজদীপ্ত আলোতে আলোকিত হয় গোটা মুসলিম বিশ্ব। তাঁহারই পাক কদমে খেদমত করিয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করেন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ), হযরত দাউদ তাঈ (রঃ), হযরত হাসান বছরী (রঃ) ছাহেব, শরীয়তবেত্তা ইমাম মালেক (রঃ) ছাহেব প্রমুখ জগত বিখ্যাত ওলী-আল্লাহসকল। ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব ছিলেন আহলে বায়েতগণের মধ্যে চন্দ্র তুল্য।
ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবের পরে ইমামবংশের ইমামত ও খেলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তদীয় পুত্র ইমাম মুসা কাজেম (রঃ)। তিনি জ্ঞানে, গুণে ও সত্যাদর্শ প্রচারে পিতার মতই যোগ্য ছিলেন।
ইমাম মুসা কাজেম (রঃ) এর ইন্তেকালের পরে ইমামতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তাহারই যোগ্য পুত্র হযরত ইমাম আলী রেজা (রঃ) ছাহেব। তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। দীনের সকল বিষয়ের কামালিয়াত তিনি পিতা মুসা কাজেম (রঃ) এর নিকট থেকে অর্জন করেন। ইমাম আলী রেজা (রঃ) এর কদমে খেদমত করিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছেন শেখ হাসান বলখী (রঃ), খাজা মারুফ কারখী (রঃ) এর মত জগতবরেণ্য ওলী-আল্লাহ সকল।
এইভাবে ইমাম জয়নাল আবেদীন হইতে নবী-বংশে একজন করিয়া ইমামতীর দায়িত্ব লইয়া সত্য ও পূর্ণাংগ ইসলামের আলো সর্ব সাধারণের মধ্যে বিতরণ করিতেন। নবী বংশের অন্যান্য সন্তানেরাও রাসূলে পাক (সাঃ) এর সত্য আদর্শ প্রচারে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
কিন্তু ইমাম বংশের ধর্ম প্রচার বা শরীয়ত ও তরিকত প্রচার নির্বিঘ্ন ছিল না। প্রায় সকল ইমামই বিভিন্নমুখী বাঁধার সম্মুখীন হইয়াছেন। সমাজের দুনিয়াদার আলেমগণ থেকে যেমন বাঁধা আসিয়াছে; তেমনি আসিয়াছে প্রশাসন কেন্দ্র থেকে।
মারোয়ান-পুত্র আব্দুল মালেক ৬৮৫ খৃঃ থেকে ৭০৫ খৃঃ পর্যন্ত অর্থাৎ দীর্ঘ ২০ বছর মুসলিম রাজ্য শাসন করিয়াছে। সে যদিও বিচক্ষণ ও কর্মঠ শাসক ছিল কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে সে ছিল নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর। তাহার নিষ্ঠুরতা থেকে ইমাম জয়নাল আবেদীনের মত আল্লাহওয়ালা লোকও রক্ষা পান নাই। তাহার দ্বারা ইমাম-তনয় নিগৃহীত হইয়াছেন বারবার। খলিফা আব্দুল মালেকের পরে মুসলিম সাম্রাজ্যের ক্ষমতায় বসেন আব্দুল মালেক-পুত্র ওলিদ। তিনি ৭০৫ খৃঃ থেকে ৭১৫ খৃঃ পর্যন্ত মোট ১০ বছর শাসন করেন। তিনি ধর্মভীরু ছিলেন। তাহার পক্ষ থেকে আল্লাহওয়ালাগণের প্রতি কোন চাপ আসিয়াছে- এমন কোন নজির ইতিহাসে দেখা যায় না। পিতার সাথে তাঁহার নৈতিক চরিত্রের এখানেই তফাৎ ছিল। খলিফা ওলিদের সময়ই স্পেন দেশ মুসলমানদের পদানত হয়।
খলিফা ওলিদের পরে রাজত্ব পরিচালনার ভার পড়ে আব্দুল মালেকের দ্বিতীয় পুত্র ওলিদের ছোট ভাই সোলায়মানের উপর। খলিফা সোলায়মান, ৭১৫ খৃঃ থেকে ৭১৭ খৃঃ পর্যন্ত-মাত্র দুই বছর মুসলিম সাম্রাজ্য শাসন করে। দুই বছর যাইতে না যাইতেই সোলায়মান অধিক শ্রমে অসুস্থ হইয়া প্রাণত্যাগ করে (৭১৭ খৃঃ)।
খলিফা সোলায়মানের পরে আব্দুল মালেক প্রণীত সংবিধান মতে সিংহাসনে বসার কথা তদীয় তৃতীয় পুত্র ইয়াযিদ ইবনে মালেকের। কিন্তু ইয়াযিদ নাবালক হওয়ায় তাহার বয়ঃপ্রাপ্তির সাপেক্ষে সিংহাসনে বসানো হয় মারোয়ানের বংশধর আব্দুল মালেকের ভ্রাতুস্পুত্র ওমর ইবনে আব্দুল আযীযকে। ওমর ইবনে আব্দুল আযীয পরম ধার্মিক ছিলেন। তিনি পরিপূর্ণ ইসলামের অনুসারী ছিলেন। আব্দুল মালেকের শাসনামলে তিনি মদীনার গভর্ণর নিযুক্ত হইয়া কিছুকাল মদীনা শাসন করিয়াছিলেন। সেই সময় তিনি মাঝে মাঝেই ইমাম জয়নাল আবেদীনের খেদমতে হাজির হইতেন। ইমাম জয়নাল আবেদীনের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী লাভ করিয়া তিনি উন্নত চরিত্রের উন্নত মানবে পরিণত হন; যেমন দয়াল নবী (সাঃ) এর তাওয়াজ্জুতে পরিবর্তন আসিয়াছিল খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর মধ্যে।
ইমাম জয়নাল আবেদীনের পরশে ওমর ইবনে আব্দুল আযীয সত্যিকার মানুষে পরিণত হন। তিনি বিলাসিতা বর্জন করেন। রাজপুরীকে বিলাসিতামুক্ত করিবার জন্যে শাহী আস্তাবলের অতিরিক্ত অশ্বগুলিকে বিক্রয় করিয়া সেই অর্থ তিনি রাজকোষে জমা দেন। স্বীয় পত্নীর রত্নালংকারসমূহ স্ত্রীর সম্মতিক্রমে সরকারী ধন ভান্ডারে জমা দেন। তাহার পত্নীও তাহারই মত ধার্মিক ছিলেন। ওমর ইবনে আব্দুল আযীয দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) ছাহেবের পদাংক অনুসরণ করিতেন। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ তাহাকে "ধর্মাত্মা ওমর" বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।
শরীয়ত ও সুন্নাহ অনুযায়ী বহু জনকল্যাণকর কাজ তিনি করিয়াছেন। আমির মোয়াবিয়া হইতে শুরু করিয়া খলিফা সোলায়মান পর্যন্ত সকল খলিফার শাসনামলেই প্রতি জুমার নামাজে খোৎবা পাঠ কালে হযরত আলী (কঃ) এর কুৎসা প্রচার করা হইত। যাহা ছিল শরীয়ত অনুযায়ী এক জঘন্য অপরাধ। এই নীতির প্রবর্তন করিয়াছিল পাষন্ড এজিদের পিতা আমির মোয়াবিয়া। কিন্তু ওমর ইবনে আব্দুল আযীয জুমার খুৎবাতে হযরত আলী (কঃ) এর প্রতি কুৎসা প্রচার বন্ধ করিয়া দেন। ফলে বনি উমাইয়ারা তাঁহার প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়। মাত্র আড়াই বছর পরে ৭২০ খৃষ্টাব্দে আততায়ীর বিষ প্রয়োগে তিনি নিহত হন। তাহার শাসনামল ছিল ৭১৭ খৃঃ থেকে ৭২০ খৃঃ পর্যন্ত। ওমর ইবনে আব্দুল আযীয সম্পর্কে গীবন বলিয়াছেনঃ উমাইয়া রাজত্বের ইতিহাসে ওমর
সংক্রান্ত এই ক্ষুদ্র অধ্যায়টি লিখিতে ঐতিহাসিকগণ স্বস্তির নিঃশাস ফেলিয়াছেন। ইহা যেন মরুভূমিতে শান্তিপ্রদ ওয়েসিস। ইহার পরেই আবার সেই অত্যাচার, অবিচার, পক্ষপাতিত্ব ও কাটাকাটির রক্তাত্ব কাহিনী।
ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের পর আব্দুল মালেকের তৃতীয় পুত্র খলিফা দ্বিতীয় ইয়াযিদ সিংহাসনে আরোহন করে। চার বছর শাসন করিয়া সে পরলোক গমন করে। তাহার শাসনকাল ছিল ৭২০ খৃঃ থেকে ৭২৪ খৃঃ পর্যন্ত।.
খলিফা দ্বিতীয় ইয়াযিদের পর সিংহাসনে আরোহন করে আব্দুল মালেকের চতুর্থ পুত্র খলিফা হিশাম ইবনে মালেক। দীর্ঘ ১৯ বছর সে মুসলিম জাহান শাসন করে। তাহার শাসনামল ছিল ইতিহাসে কলংকময় অধ্যায়। তাহার নিষ্ঠুরতা ছিল মোয়াবিয়া পুত্র এজিদের মতই। এজিদের নির্দেশে যেমন কারবালায় ইমাম হোসেন (রাঃ) ও তাঁহার পরিবার-পরিজনের উপর এজিদ-সৈন্যরা অত্যাচারের স্টীম রোলার চালায়; ঠিক তেমনি খলিফা হিশামের নির্দেশে তাহার কুফায় নিযুক্ত গভর্ণর ইউসুফ ইমাম জয়নাল আবেদীনের (রঃ) দৌহিত্র ইমাম যায়েদের উপর অত্যাচারের স্টীম রোলার চালায়।
এখানে উল্লেখ্য, ইমাম পরিবারে ইমাম আলী (কঃ) থেকেই এই নিয়ম চালু ছিল যে, একজন ইমাম তাহার ওফাতের পূর্বে তাহারই সন্তানাদির মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচিত করিয়া তাহাকে ইমামতির দায়িত্ব দিতেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমাম রাসূলে পাক (সাঃ) এর সত্য ইসলাম সাধারণ্যে প্রচার করিতেন। যেমন ইমাম হোসেন (রাঃ) এর পরে ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ), জয়নাল আবেদীনের পরে ইমাম বাকের (রঃ), ইমাম বাকেরের পরে ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ইত্যাদি। কিন্তু নির্বাচিত ইমাম ব্যতীত অন্যান্য সন্তানেরা যে নিষ্ক্রিয় হইয়া বসিয়া থাকিতেন-তাহা নয়। অন্যান্য পুত্ররাও ইসলামী আদর্শের পতাকাকে সমুন্নত রাখিবার জন্য দিক-বিদিক ছড়াইয়া পড়িতেন। ইহাদের মধ্যে একজন ছিলেন ইমাম যায়েদ (রঃ) ছাহেব। যিনি ইমাম জয়নাল আবেদীনের নাতি ছিলেন।
ইমাম যায়েদ (রঃ) কুফা ও বসরাতে সত্য ও পূর্ণাংগ ইসলামের আদর্শ প্রচার করিতেন। তাহার চারিত্রিক বিবিধ গুণাগুণ দর্শনে, অমায়িক ব্যবহারে, সর্বোপরি তাহার তাওয়াজ্জুতে লক্ষ লক্ষ কুফা ও বসরাবাসী তাহার মুরীদ বা অনুসারী হন। ইমাম যায়েদের পবিত্র সান্নিধ্যে আসিয়া অনুসারীগণ আল্লাহ রাসূলের মহব্বত হাছিল করিতেন। ফলে কুফা ও বসরাতে ইমাম যায়েদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল অনেক বেশী। সে সময় কুফার শাসনকর্তা ছিলেন খালেদ। খালেদও মাঝে মাঝে ইমাম যায়েদের দরবারে যাইতেন। প্রয়োজনীয় উপদেশ গ্রহণ করিতেন। কিন্তু উমাইয়া গোত্রের লোকেরা খালেদের ইত্যাকার কর্মকান্ডকে ভাল চোখে দেখিল না। তাহারা কেন্দ্রীয় শাসক খলিফা হিশামের নিকট খালেদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করিল। অভিযোগে ছিল, গভর্ণর ইমাম যায়েদের একজন অনুসারী। সে রাজকোষের বহু অর্থ ইমাম যায়েদ (রঃ) কে নজরানা দেয়।
এই অভিযোগে খলিফা হিশাম গভর্ণর খালেদের উপর রূষ্ট হইয়া তাহাকে পদচ্যুত করিয়া তদস্থলে কঠোর প্রকৃতির শাসক ইউসুফকে কুফার গভর্ণর নিযুক্ত করে। নব নিযুক্ত শাসনকর্তা ইউসুফ ইমাম যায়েদ (রঃ) ও তাহার অনুসারীগণের প্রতি নির্যাতন শুরু করে। ইমাম যায়েদ (রঃ) এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে খলিফা হিশামের নিকট অভিযোগ করেন কিন্তু খলিফা হিশাম এই অভিযোগের গুরুত্ব না দিয়া বরং ইমাম যায়েদকে অপমান করিয়া তাড়াইয়া দেয়। ফলে ইমাম যায়েদের অনুসারীদের সাথে ইউসুফের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইমাম যায়েদ বহু অনুসারীসহ শহীদ হন। কয়েকজন মুরীদ ইমাম যায়েদের মৃতদেহকে গোপনে কবর দেন। কিন্তু উচ্ছৃংখল উমাইয়ারা গোপন কবরও খুঁজিয়া বাহির করিয়া কবর হইতে ইমাম যায়েদের লাশ উত্তোলনপূর্বক শিরোচ্ছেদ করে। অতঃপর তাহার পবিত্র দেহকে আগুনে ভস্মীভূত করে; ভস্মরাশি ফোরাতের পানিতে ভাসাইয়া দেয়। এমনিভাবে হিজরী ১২৪ সনে (৭৪২ খৃঃ) কুফাতে আরেক কারবালা সংঘঠিত হয়। ইমাম যায়েদের শাহাদাতের পরে তদীয় পুত্র ইমাম ইয়াহিয়ার উপর চলে নির্যাতন। ইমাম ইহাহিয়া (রঃ) কিছুদিন গা ঢাকা দিয়া বনে জংগলে ঘুরিয়া বেড়ান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উমাইয়াদের হাতে তিনি বন্দী হন এবং নিহত হন (১২৫ হি, ৭৪৩ খৃঃ)। নিহত ইমাম ইহাহিয়ার মৃতদেহকে শিরোচ্ছেদ করিয়া প্রকাশ্য ময়দানে ফাসিকাষ্ঠে লটকাইয়া রাখা হয়। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের পরে উমাইয়া শাসকগোষ্ঠীর উপর জনগণের সমর্থন হ্রাস পাইতে থাকে এবং চতুর্দিকে বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন আব্বাসীয় বংশের যুবকেরা।
###
উমাইয়া শাসকগণের তালিকা
আমীর মোয়াবিয়া (শাসনকাল, ৬৬১-৬৮১খৃঃ)
এজিদ ইবনে মোয়াবিয়া (শাসনকাল, ৬৮১-৬৮৩খৃঃ)
দ্বিতীয় মোয়াবিয়া ইবনে এজিদ (শাসনকাল, ৬৮৩-৬৮৪খৃঃ)
মারোয়ান ইবনে হাকাম (শাসনকাল, ৬৮৪-৬৮৫খৃঃ)
আবদুল মালেক ইবনে মারোয়ান (শাসনকাল, ৬৮৫-৭০৫ খৃঃ)
ওলিদ ইবনে মালেক (শাসনকাল, ৭০৫-৭১৫ খৃঃ)
সোলায়মান ইবনে মালেক (শাসনকাল, ৭১৫-৭১৭ খৃঃ)
ওমর ইবনে আবদুল আযীয (শাসনকাল, ৭১৭-৭২০ খৃঃ)
দ্বিতীয ইয়াযিদ ইবনে মালেক (শাসনকাল, ৭২০-৭২৪ খৃঃ)
হিশাম ইবনে মালেক (শাসনকাল, ৭২৪-৭৪৩ খৃঃ)
দ্বিতীয় ওলিদ ইবনে দ্বিতীয় ইয়াযিদ (শাসনকাল, ৭৪৩-৭৪৪ খৃঃ)
খলিফা তৃতীয় ইয়াযিদ ও ইব্রাহিম (শাসনকাল, ৭৪৪ খৃঃ)
খলিফা দ্বিতীয় মারোয়ান (শাসনকাল, ৭৪৪-৭৫০ খৃঃ)
৭৫০ খৃষ্টাব্দে উমাইয়াগণের পতন হয়।
খলিফা হিশাম ১৯ বছর রাজত্ব করিয়া ৭৪৩ খৃষ্টাব্দে ইনতেকাল করে। হিশামের শাসন সমাপ্তির পরে উমাইয়ারা আর মাত্র ৭ বছর রাজত্ব করিয়াছিলেন। ৭ বছর অন্তে ৭৫০ খৃষ্টাব্দে উমাইয়াদের পতন হয় আব্বাসীয়দের উত্থানের মাধ্যমে।
উমাইয়াদের শেষ সম্রাট খলিফা দ্বিতীয় মারোয়ানের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয় আব্বাসীয় বাহিনীর। আব্বাসীয়দের হাতে দ্বিতীয় মারোয়ান নিহত হয়। তারপর আব্বাসীয়রা দামেস্কের প্রতি ঘরে ঘরে তল্লাশী করিয়া উমাইয়াদের বাহির করিয়া হত্যা করে। নিহতদের লাশ এক জায়গায় পুঞ্জীভূত করে। শুধু তাই নয়; আব্বাসীয়রা মৃত উমাইয়াদের কবর খুঁড়িয়া অস্থিপাঞ্জর বাহির করিয়া যুদ্ধে নিহত লাশের সহিত একত্র করিয়া আগুনে পোড়ায় এবং ভস্মরাশি বাতাসে উড়াইয়া দেয়। ইহার পরেই বনি-হাশেম ও বনি-উমাইয়াগণের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া বিদ্যমান পুরুষাণুক্রমিক বিবাদের অবসান ঘটে।
কিন্তু দুই গোত্রের বহুদিনের বংশানুক্রমিক বিবাদের অবসান হইলেও নবী বংশের উপর অত্যাচার তেমন হ্রাস পায় নাই। উমাইয়াদের পরে মুসলিম রাজত্ব পরিচালনা করেন আব্বাসীয়গণ।
আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস 'আল সাফফাহ' চার বছর (৭৫০-৭৫৪ খৃঃ) রাজত্ব করার পরে পরলোক গমন করে। তৎপর ৭৫৪ খৃঃ তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আবু যাফর সিংহাসনে আরোহন করিয়া "আল মনসুর" উপাধি গ্রহণ করে এবং দীর্ঘ ২১ বছর রাজত্ব (৭৫৪-৭৭৫খৃঃ) করে।
আল মনসুর শাসক হিসাবে যোগ্য হইলেও ব্যক্তি হিসাবে ছিল খুবই নিষ্ঠুর। ইমাম বংশের নক্ষত্র ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) এবং বিখ্যাত শরীয়তবেত্তা ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ছাহেব আল মনসুর কর্তৃক পুনঃপুনঃ নিগৃহীত হইয়াছেন; লাঞ্ছিত হইয়াছেন বারবার।
আল মনসুর অত্যন্ত নিষ্ঠুর ছিল। যখন তখন যে কোন লোককে হত্যা করিতে তাহার মোটেই বাঁধিত না। একদা আল মনসুর ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) এর বিরাট ব্যক্তিত্ব ও তাহার প্রতি জনসাধারণের অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দেখিয়া নিজ রাজত্ব সম্পর্কে শংকিত হইয়া পড়ে। তাই এক রাত্রে সে গোপনে সৈন্য পাঠায় ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবকে গ্রেফতার করিয়া তাহার সমীপে হাজির করিবার জন্য। এদিকে খলিফা তাহার দরবারের কিছু গোলামকে এই নির্দেশ দিয়া গোপনে দাঁড় করাইয়া রাখে যে, জাফর ছাদেককে দরবারে হাজির করা মাত্রই আমি আমার মাথায় মুকুট নামাইয়া ফেলিব। আর তোমরা আমার এই সংকেত পাওয়া মাত্রই তাহাকে হত্যা করিবে। কিন্তু আল্লাহপাকের লীলা বুঝা বড় কঠিন। ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) যখন আল মনসুরের দরবারে উপস্থিত হইলেন, তখন মনসুর তাহাকে হত্যা করিবেতো দূরের কথা; তাহাকে দেখামাত্রই সন্ত্রস্তভাবে সিংহাসন ছাড়িয়া ইমামকে এস্তেকবালের জন্য দ্রুত তাহার সম্মুখে নতজানু হয় এবং পরক্ষণেই তাঁহাকে অতি সম্মানের সহিত নিজের সিংহাসনে নিয়া বসায়। হত্যা করার জন্য নিযুক্ত গোলামেরা এই দৃশ্য দেখিয়াতো হতবাক। এদিকে মনসুর ইমাম ছাহেবকে নিজের আসনে বসাইয়া বলে, "হে ইমাম ছাদেক (রঃ)! আমার নিকট আপনার কিছু প্রয়োজন থাকিলে বলুন, আমি তাহা এই মুহূর্তে পূরণ করিব।"
ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) নির্ভীকচিত্তে গাম্ভীর্যপূর্ণ জবাব দিলেন, "আপনার নিকট আমার কোন কিছুরই প্রয়োজন নাই। শুধু একটি অনুরোধ আপনি আমাকে আর কখনও ডাকাইয়া আমার এবাদতে বিঘ্ন ঘটাইবেন না।" ইহা শুনিয়া আল মনসুর অতীব সম্মানের সহিত ইমাম ছাহেবকে বিদায় দিলেন। বিদায় দেওয়ার পরক্ষণেই আল মনসুরের দেহে কম্পন শুরু হয়। কাঁপিতে কাঁপিতে সে জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়ে। এই জ্ঞানশূন্য অবস্থায় তিনদিন অতিবাহিত হয়। জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে উজিরেরা তাহাকে কারণ জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) আমার দরবারে প্রবেশ করা মাত্রই আমি দেখিতে পাইলাম তাহার সংগে একটি বিরাটকার অজগর এমন বিকট ভাবে হা করিয়া আছে, তাহার একটি চোয়াল চত্বরের নিম্নে, অপরটি ঊর্ধ্বে। সর্পটি তাহার অবস্থার ভাষায় আমাকে বলিতেছে, "মনসুর সাবধান; যদি তুমি জাফর ছাদেকের একটি কেশও স্পর্শ কর অথবা কোন কষ্ট দাও; তবে তোমাকে এখনই এই চত্বরসহ গিলিয়া ফেলিব।" অজগরের ভয়ে আমি জ্ঞানহারা হইয়া পড়িয়াছিলাম।
ইমাম জাফর ছাদেকের মত ইমাম আবু হানিফাকেও খেলাফত সম্পর্কে স্বাধীন মত প্রকাশ করায় আল মনসুর নির্যাতন করিয়াছিল।
খলিফা আল মনসুরের ত্রাসের শাসন সমাপ্ত হইলে সিংহাসনে আরোহন করে তাহার পুত্র খলিফা মেহেদী। খলিফা মেহদী অবশ্য ওলী-আল্লাহগণের প্রতি বিশেষ করিয়া ইমাম বংশের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি দশ বছর (৭৭৫-৭৮৫ খৃঃ) রাজত্ব করেন। খলিফা মেহেদীর পরে সিংহাসনে আরোহণ করে তদীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র খলিফা হাদী। খলিফা হাদি ছিল নিষ্ঠুর, চরিত্রহীন ও অত্যাচারী। সে মাত্র এক বছর (৭৮৫-৭৮৬ খৃঃ) সিংহাসনে ছিল।
খলিফা হাদীর পরে মসনদে বসেন তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা খলিফা হারুন-অর-রশিদ। খলিফা হারুন-অর-রশিদের নাম শুনে নাই এমন লোক এই দেশে খুবই কম আছে। শৌর্যে, বীর্যে, কর্মক্ষমতায়, রাজনৈতিক কূট কৌশলে, বিচক্ষণতায়, ধর্মের প্রতি আনুগত্যে, তাহার কোন তুলনা নাই। তিনি শরীয়তের প্রতি অতিশয় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জীবনে নয় (৯) বার হজ্জ করিয়াছেন। তিনি রাজ্য পরিচালনায় খলিফা উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেবকে অনুসরণ করিতেন। গভীর নিশীথে শয্যাত্যাগ করিয়া ছদ্মবেশে নগরীর বিভিন্ন মহল ঘুরিয়া ঘুরিয়া প্রজাবৃন্দের অবস্থা দেখিতেন। প্রয়োজনে দুঃস্থ ও অভাবগ্রস্থদের সাহায্য করিতেন।
তাহার স্ত্রী যোবায়দা পরমা ধার্মিক ছিলেন। ৮০২ খৃষ্টাব্দে তিনি একবার স্বামীর সংগে হজ্জে যাইয়া মক্কার অধীবাসীদের দারুণ জলকষ্ট স্বচক্ষে দেখিয়া দেড় লক্ষ দিনার ব্যয়ে দূরবর্তী এক পার্বত্য ঝর্ণা হইতে আরাফাত ও মক্কা পর্যন্ত এক পানির নহর কাটাইয়া দেন-যাহাকে "নহরে যোবাইদা" বলা হয়। এখনও নাকি সেই নহরের ধারা আরাফাতের ময়দান পর্যন্ত প্রবাহিত আছে।
খলিফা হারুন-অর-রশিদ ও তদীয় বিবি যোবায়দা উভয়ে পরম ধার্মিক ও বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। অথচ এই প্রজাবৎসল খলিফা হারুন-অর-রশিদও জগদ্বিখ্যাত ওলী আল্লাহ ও আহলে বায়েতের উজ্জল নক্ষত্র ইমাম মুসা কাজেম (রঃ) কে নির্যাতন করেন।
পূর্বেই বলিয়াছি, ইমাম জাফর ছাদেকের ইন্তেকালের (১৪৮ হি, ৭৬৫ খৃঃ) পরে পরিপূর্ণ ইসলামের ধারক বাহক ও প্রচারকের দায়িত্ব পড়ে ইমাম মুসা আল কাজেমের (রঃ) উপর। অল্প দিনের মধ্যে ইমাম মুসা আল কাজেমের যশ-খ্যাতি ছড়াইয়া পড়ে সর্বত্র। ফলে খলিফার চেয়ে তাঁহাকেই মানুষ সম্মান করিত অধিক। তাঁহার মুরীদ ও অনুসারীগণ বেয়াদবী মনে করিয়া কখনও তাহার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করে নাই। ইমাম আল কাজেমের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রভাব দেখিয়া খলিফা হারুন-অর-রশিদ ভীত হন। তাহার ভাবনা হয়; ইমাম আল কাজেম (রঃ) তাহার মুরীদানসহ বিদ্রোহ করিলে তাহার সিংহাসনই হয়তো হাতছাড়া হবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত লন, ইমাম আল কাজেমকে তাহার মুরীদান থেকে দূরে সরাইয়া রাখিতে।
একদা হজ্জ সমাপন করিয়া তিনি মদীনায় আসেন এবং মদীনা থেকে ইমাম মুসা আল কাজেমকে সংগে করিয়া বাগদাদে লইয়া যান। বাগদাদে তাহাকে এক ইমাম-ভক্ত মহিলার গৃহে নযরবন্দী করিয়া রাখা হয়। এই নযর বন্দী অবস্থায় নির্বাসিত ইমামের বাকী জীবনের অবসান হয়। তিনি হিঃ ১৮৩ সনে (৭৯৯ খৃঃ) বন্দীবস্থাতেই ইন্তেকাল করেন।
উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীয়দের রাজত্ব শুরু হয়। আব্বাসীয়রা একটানা পাঁচশত বছরের অধিককাল (৭৫০ খৃঃ থেকে ১২৫৮ খৃঃ পর্যন্ত) শাসন করেন। আব্বাসীয় বংশে মোট খলিফার সংখ্যা ৩৭জন।
প্রথম পাঁচ জনের তালিকা
আবুল আব্বাস আল সাফফাহ (৭৫০-৭৫৪ খৃঃ)
আবু যাফর আল মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খৃঃ)
আল মেহদী (৭৭৫-৭৮৫ খৃঃ)
খলিফা হাদী (৭৮৫-৭৮৬ খৃঃ)
খলিফা হারুন-অর-রশীদ (৭৮৬-৮৯০ খৃঃ)
ইতিহাস পর্যালোচনা করে একটি বিষয় পরিস্কার হইল, দয়ার নবী (সাঃ) সত্য ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করিতে যেমন নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হইয়াছেন; তেমনি তাহার অনুসারীবর্গ, আহলে বায়েতগণ, ওলীয়ে কামেলগণ যুগে যুগে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হইয়াছেন এবং এখনও হইতেছেন। নিগ্রহ আসিয়াছে দুনিয়াপুজারী আলেমদের থেকে; নির্যাতন আসিয়াছে স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন শাসকগণ থেকে।
৬১ হিজরীতে কারবালায় ইমাম পরিবারের উপর যে নির্যাতন হয়-সেই হইতে আজ পর্যন্ত নবী বংশের উপর ও আল্লাহওয়ালাগণের উপর যে অত্যাচার নির্যাতন ও নিগ্রহ চলিয়াছে ও চলিতেছে তাহা যদি পুঞ্জিভূত করা যায়; তবে সপ্ত আসমান ও সপ্ত জমীনেও স্থান সংকুলান হইবে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া আল্লাহওয়ালা কামেলগণ অত্যাচারিত হইতেছেন। কিন্তু আর নয়। এবার হইবে প্রতিশোধের পালা। প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন রাসূলে পাক (সাঃ) এর বংশধর, এলেমের দরিয়া, আখেরী ইমাম, মারেফাতের সূর্য হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ)। তাহার এক হাতে থাকিবে কুরআন, আর এক হাতে থাকিবে তলোয়ার। তাহার শক্তিশালী আত্মিক তাওয়াজ্জুহ বলে সমগ্র বিশ্বে সত্য ও পরিপূর্ণ ইসলাম কায়েম হবে-যে সত্যের জন্য প্রাণ দিয়াছেন ইমাম আলী (কঃ), ইমাম হাসান (রাঃ) ও ইমাম হোসেন (রাঃ)। যে সত্যের জন্য নির্যাতিত হইয়াছেন ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ), ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ), ইমাম মুসা কাজেম (রঃ) প্রমুখ। জগতের সমুদয় ওলী আল্লাহ তাঁহার আগমন প্রতিক্ষায় রহিয়াছেন। আল্লাহপাকই সব ভাল জানেন।








