Logo

স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাদীগণের কর্মকান্ড সম্পর্কে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:২৮
স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাদীগণের কর্মকান্ড সম্পর্কে আলোচনা
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কামালাতে নবুয়তের মর্যাদাপ্রাপ্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাদী (নবী-রাসূল ও কামেল ওলী) গণের কর্মকান্ড সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

'কামালাতে নবুয়ত' শব্দের শাব্দিক অর্থ নবুয়তের যোগ্যতা। নবী (আঃ) গণের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহপাক কোরান মজীদে বলেন, "তিনিই উম্মীদের হইতে একজন পাঠান রাসূলরূপে যিনি তাহাদিগের সামনে আল্লাহতায়ালার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন।" (সূরা জুমু'আঃ ২)

কুরআন মজীদে আল্লাহপাক আরও ফরমান, “এবং ইহা আমারই দলিল যা' আমি ইব্রাহিমকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের বিরুদ্ধে প্রদান করেছিলাম এবং আমি যাকে চাই তার মর্তবাকে সমুচ্চ করে দেই। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক বিজ্ঞানময়, মহাজ্ঞানী এবং আমি তাঁকে, ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাদের সকলকেই হেদায়েত দান করেছি। তপূর্বে নূহকেও আমি হেদায়েত দান করেছিলাম এবং তাঁর বংশধরদের মধ্যে দাউদ, সোলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা এবং হারুনকেও হেদায়েত দান করেছিলাম। এ ভাবেই আমি পুণ্যবানদের বিনিময় প্রদান করি এবং এ প্রকারেই জাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা ও ইলিয়াসকেও; তাঁরা সবাই ছিলেন আমার পুণ্যবান বান্দা। ইসমাইল, ইয়াসায়া, ইউনুস ও লুতকে; তাঁদের সবাইকেও আমি বিশ্ববাসীর উপর ফজিলত দান করেছিলাম। এমনকি তাঁদের পিতৃপুরুষগণ, ছেলে সন্তানকেও এবং ভ্রাতাগণকেও মনোনীত করেছিলাম এবং তাদেরকে হেদায়েতের সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম। ইহা আল্লাহর হেদায়েত। এর দ্বারা আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন। যদি তারা শিরক বা অংশী স্থাপন করত, তাহলে আমি তাদের সকল কাজকর্মকে মিটিয়ে দিতাম। তাঁরাই ঐ সকল বান্দা যাদেরকে আমি কিতাব, হেকমত, নবুয়ত প্রদান করেছি। যদি তারা এর সাথে কুফরি করে তা হলে আমি অবশ্যই এমন এক কওমকে দান করব যারা এগুলো প্রত্যাখান করবে না। তারাই ঐ সকল লোক যাদের আল্লাহ হেদায়েত দান করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের পথ ধর।" (সূরা আন'আমঃ ৮৩-৯০)

উল্লিখিত আয়াতগুলোতে আল্লাহপাক নবী (আঃ) গণের যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করিয়াছেন। উপরের আয়াতগুলো ব্যাখ্যা করিয়া হযরত আল্লামা শিবলী নোমানী (রঃ) ছাহেব নবী (আঃ) গণের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

নবী (আঃ) গণ আলমে মালাকুতের জ্ঞানে জ্ঞানী হন-যেমন আল্লাহ বলেন, "ইব্রাহিমকে আমি দলিল দান করেছিলাম।"

আল্লাহ বলেন, "তাদেরকে আমি সোজা রাস্তায় পরিচালিত করেছি এবং তাঁরা সকলেই ছিলেন পুণ্যবান।" ইহার দ্বারা বোঝা যায়, তাহারা ছিলেন আল্লাহপাক দ্বারা সুরক্ষিত। তাই গোনাহ হইতে নিস্পাপ।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক বলেনঃ "তাঁদের আমি ইচ্ছা অনুযায়ী প্রিয় হিসাবে গ্রহণ করেছি এবং স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হেদায়েত প্রদান করেছি।" এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায় ইহা আল্লাহতায়ালার দান এবং তাঁহারা আল্লাহর দ্বারা নির্বাচিত।

আল্লাহপাক তাঁহাদেরকে গায়েবের জ্ঞান, সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী জ্ঞান ও হেকমত দান করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

নবী (আঃ) গণ মানুষকে পবিত্র করিতে সক্ষম এবং তাদেরকে আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী করিতে সক্ষম হন।

হযরত মাওলানা শিবলী নোমানী (রঃ) ছাহেব আরও বলেন, নবুয়ত ও রিসালতের সম্পর্ক রহস্যপূর্ণ অদৃশ্য জগতের সহিত। নবী (আঃ) গণ গায়েবের ধ্বনি শ্রবণ করেন, অদৃশ্য বস্তুরাজি অবলোকন করেন, অদৃশ্য জগত হইতে জ্ঞান আহরণ করেন। নবী (আঃ) গণ আলমে মালাকুত বা ফেরেশতাগণের সাহায্য লাভ করেন এবং রুহুল কুদ্দুস বা পবিত্র আত্মা জিব্রাইল (আঃ) নবী (আঃ) গণের সবার সাথী ও প্রিয় বন্ধু রূপে আবির্ভূত হন। তাঁহাদের এই জ্ঞান ও মানবাত্মাকে পবিত্র করিবার ক্ষমতার জন্য তাঁহারা সুমহান মর্যাদার আসন অলংকৃত করেন যাহা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নহে। তাই নবী (আঃ) গণের দ্বারা অনেক অভাবনীয়, অচিন্তনীয়, অলৌকিক ও বিস্ময়কর কর্মকান্ড সাধিত হয়-যাহা প্রচলিত বিজ্ঞানের জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তিদের বোধের অগম্য থাকিয়া যায়। নবী (আঃ) গণ অদৃশ্য জগতের উপর বিশ্বাস করিবার আহ্বান জানান এবং মানবের প্রবৃত্তি ও চরিত্র সংশোধনের কার্যে রত থাকেন। অপরিস্কার হাতে কাপড় কাচিলে যেমন কাপড় পরিস্কার হয় না, তেমন কোনো অপবিত্র ব্যক্তি দ্বারা মানুষের কুপ্রবৃত্তি সংশোধন করাও অসম্ভব। নবী (আঃ) গণও তাই এমন পবিত্র থাকেন যে, তাঁহারা মানব চরিত্রকে পবিত্র করিতে পারেন। তাঁহাদের মধ্যে এমন শক্তির বিকাশ ঘটে যাহার দ্বারা তাঁহারা যাবতীয় কদর্য ও অনিয়ম নীতির বন্ধনকে দূরীভূত করেন এবং সমাজে সুশৃংঙ্খল জীবন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। পথভ্রষ্টদের সহজ সরল রাস্তা প্রদান করেন। যাহারা আল্লাহপাকের বিধান হইতে দূরে তাহাদেরকে আল্লাহপাকের মনোনীত পথে আনয়ন করেন।

বিজ্ঞাপন

এই গায়েবের জ্ঞান এবং পবিত্রতা-যাহা সাধারণ মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় না তাহা নবী (আঃ) পান কোথা হইতে? আল্লাহপাক স্বয়ং যে নবী (আঃ) গণের শিক্ষার দায়িত্ব নেন এবং তাহার নিজস্ব জ্ঞানে অর্থাৎ গায়েব ও সমস্ত মাখলুকাত বা সৃষ্টির জ্ঞানে নবী (আঃ) গণকে যে জ্ঞানী করিয়া তোলেন সে সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান-"আমি আপনাকে পাঠ করাইব ফলে আপনি তাহা বিস্মৃত হইবেন না বা ভুলিয়া যাইবেন না-আল্লাহপাক যাহা চান তাহা ছাড়া। নিশ্চয়ই তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল বিষয় বস্তুই অবগত।"

এই আয়াতপাকে আল্লাহতায়ালা পরিস্কার ও প্রাঞ্জল ভাষায় ঘোষণা করেন, তিনিই স্বয়ং নবী (আঃ) গণের রূহানী শিক্ষক এবং তিনি নবী (আঃ) গণের জন্য এই শিক্ষা সহজ করিয়া দেন। অর্থাৎ আল্লাহপাক তাঁহাদেরকে জ্ঞানের পূর্ণতা দান করেন-যাহাতে তাঁহাদের মধ্যে আল্লাহতায়ালার নিজস্ব গুণাগুণ বিকশিত হয়। তাহার ফলে নবী (আঃ) গণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সকল কার্য ও অনুষ্ঠানাদি পবিত্র হইয়া উঠে। অর্থাৎ তাঁহাদের মধ্যে আর প্রবৃত্তিগত কোনো আকর্ষণ থাকে না এবং প্রবৃত্তি দ্বারা তাঁহারা পরিচালিত না হইয়া আল্লাহতায়ালা দ্বারা পরিচালিত হইয়া থাকেন। আল্লাহতায়ালার পবিত্রতার উৎস "মাকামে ছালাম" ও "মাকামে কুদ্দুস"-এর নূর দ্বারা তাঁহারা পরিচালিত হন। তাই তাঁহাদের সকল কর্ম পবিত্র ও শান্তিময় হইয়া থাকে।

নবী (আঃ) গণ যে শিক্ষা পান তাহা স্বয়ং আল্লাহপাকের দ্বারা লাভ করেন তাই তাঁহাদের জ্ঞান হয় অভ্রান্ত ও চিরস্থায়ী। পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষ হিসাবে আমরা যে জ্ঞান আমাদের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও প্রাপ্ত তথ্য দ্বারা লাভ করি তাহা অধিকাংশই ভ্রান্তিময়। কারণ একেক জনের অভিজ্ঞতাও পৃথক, তাহাদের দর্শনের নিরিখও পৃথক, তাই তাহারা তথ্যসমূহের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাহাও পৃথক। বস্তুজগত সম্বন্ধেও চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া গিয়াছে একথাও কেহ হলফ করিয়া বলিতে পারেন না।

বিজ্ঞাপন

নবী (আঃ) গণের চরিত্র, কর্মকান্ড ও মাহাত্মের প্রতি গভীর ভাবে দৃষ্টি নিবন্ধ করিলে দেখা যায় যে, যখনই তাঁহারা এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, তখনই তৎকালীনের জন্য এক নতুন ভবিষ্যতের ইংগিত প্রদান করেন-তাহাদের স্বভাব ও কর্মের মধ্যে মানুষ বিশেষ-বিশেষ গুণসমূহ দেখিতে পায়-যেমন পবিত্রতা, আল্লাহতায়ালার জ্ঞান ও হেকমত ইত্যাদি। যাহার ফলে মানুষ সহজেই স্বতস্ফূর্তভাবে তাঁহাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। পক্ষান্তরে মানুষ সমাজের দার্শনিক বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যে আনুগত্য প্রকাশ করে, তাহা হয় সাময়িক বা ব্যক্তিগত সুযোগ ও স্বার্থের জন্য। দার্শনিক বা রাজনৈতিক নেতৃবর্গ আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী নহেন, তাই তাহারা যাহা প্রচার করেন তাহার আবেদন হয় সাময়িক। তাহাদের পবিত্রতা আল্লাহতায়ালার পবিত্রতার নূর দ্বারা সুরক্ষিত নহে, তাই তাহাদের সংস্পর্শে আসিয়া কেহ পবিত্রতা অর্জন করিতেও পারে না; আর তাই সমাজের প্রকৃত বিধান কেবলমাত্র রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা নিশ্চিতও করা যায় না।

নবী (আঃ) গণ এই যে পবিত্রতা ও আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী হন; সেই যোগ্যতা যাহাদের মধ্যে রহিয়াছে তাঁহারাই প্রকৃত কামালাতে নবুয়তের মাকামের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হেদায়েতকারীগণ। বর্তমান জামানায় যেহেতু মানুষ ও সমাজ রহিয়াছে, তাই হেদায়েতেরও প্রয়োজন রহিয়াছে। এই জন্য নবী ও রাসূল (সাঃ) এর পরেও আল্লাহতায়ালার মনোনীত হেদায়েতকারী রহিয়াছেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, তিনি তদীয় ছিনার আল্লাহপাক প্রদত্ত জ্ঞান হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের ছিনায় রাখিয়া গিয়াছেন। ঐ জ্ঞান আত্মা পরম্পরায় বর্তমান কালেও প্রবাহিত হইতেছে। ঐ জ্ঞানের অধিকারীই প্রকৃত হেদায়েতের অধিকারী। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আরও বলিয়াছেন, "আমার পরে কেহ নবী হইলে তিনি হইতেন হযরত উমর ফারুক (রাঃ)।" হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) উক্ত ঐ দুই হাদীস শরীফ হইতে বোঝা যায় যে, রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরেও তাহার কামালাতের যোগ্যতাসম্পন্ন তথা হেদায়েতের যোগ্যতাসম্পন্ন উত্তরাধিকারী তিনি রাখিয়া গিয়াছেন।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফছানী (রাঃ) তদীয় "মা'আরিফে লাদুন্নিয়া" নামক কিতাবে বলিতেছেন-আকতাবে এরশাদের মাকামে উন্নীত খোদাতত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী সব চাইতে বেশী পূর্ণতার অধিকারী-তিনি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর কদমের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন এবং ঐ ব্যক্তির কামালাত হুজুরে আকরাম (সাঃ) এর কামালাতের অনুরূপ হয়। হুজুরে আকরামও (সাঃ) আকতাবে এরশাদের মাকামে উন্নীত সাধক। তবে রাসূলে পাক (সাঃ) এবং উক্ত মাকামে উন্নীত সাধক-এই দুই জনের মধ্যে পার্থক্য হইল আসল ও তাহার পূর্ণ অনুসারীর ন্যায়। এই প্রসংগে খোদাতত্ত্বজ্ঞানী সাধক সৃষ্টি জগতের জন্য কি ভূমিকা পালন করেন সে প্রসংগে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, জ্ঞানের পার্থক্য অনুযায়ী সাধকদের মধ্যে বিভিন্ন মর্যাদা রহিয়াছে; যেমন-কুতুবে আবদাল ও কুতুবে এরশাদ।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব ফরমান, কুতুবে আবদাল ঐ সমস্ত ফয়েজ ও বরকত পৌঁছানোর মাধ্যম যাহা সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বের সহিত সম্পর্কযুক্ত। আর কুতুবে এরশাদ ঐ সমস্ত ফয়েজ ও বরকত পৌঁছানোর মাধ্যম যাহা হেদায়েত ও এরশাদের সহিত সম্পর্কযুক্ত। সৃষ্টির রিজিক পৌঁছানো, বালা মুছিবত দূরীকরণ, ব্যাধি দূরীকরণ, কল্যাণ ও রহমত লাভ ইত্যাদি কুতুবে আবদালের সহিত সম্পর্ক যুক্ত। অপর পক্ষে ঈমান ও হেদায়েত এবং পবিত্রতা অর্জন ইত্যাদি কুতুবে এরশাদের ফয়েজের উপর নির্ভরশীল। কুতুবে আবদাল ও কুতুবে এরশাদের মধ্যেকার পার্থক্য হয় বেলায়েত লাভের পর। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর যুগে তিনিই ছিলেন কুতুবে এরশাদ, আর সেই সময়ে কুতুবে আবদাল ছিলেন হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ও হযরত ওয়ায়েস করণী (রাঃ)। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, কুতুবে এরশাদ দুনিয়ায় আল্লাহতায়ালার ফয়েজ পৌঁছানোর বা হেদায়েতের মাধ্যম হিসেবে জামীয়া বা সমষ্টি হিসেবে কাজ করেন। কুতুবে এরশাদ ফয়েজের উৎস স্থলের জন্য, ছুরত ও ছায়ার অনুরূপ হইয়া যান আর সমস্ত দুনিয়া ঐ কুতুবে জামিয়ার ব্যাখ্যা স্বরূপ বর্তমান থাকে। কোনো মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহতায়ালার হাকীকী জগত হইতে ঐ কুতুবে এরশাদের ছুরতের উপর ফয়েজ পৌছায় এবং ছুরতে জামিয়া হইতে দুনিয়া পর্যন্ত ঐ ফয়েজ পৌঁছায়। প্রকৃত ফয়েজের উৎস আল্লাহপাক স্বয়ং; কিন্তু কুতুবে এরশাদ তাহার মধ্যস্থতা হিসাবে বর্তমান থাকেন। কখনও এই রূপও হইয়া থাকে যে মধ্যস্থতাকারী কুতুব এই ফয়েজ পৌঁছানোর ব্যাপারে সম্যক অবগত থাকেন না।

কুতুবে এরশাদের মাধ্যমে যে ফয়েজ বরকত পৌছায় ও দুনিয়া ব্যাপী বিস্তৃত হয় তাহার সকল কিছুই মঙ্গলময়, ঈমান ও হেদায়েত। মন্দ ও অকল্যাণ সেখানে নাই। তবে গোমরাহীর কারণে মানুষ সেই ফয়েজের মঙ্গল গ্রহণ করিতে পারে না-ইহা মানুষের কলুষতা; ফয়েজের নহে। আত্মিক রোগের কারণেই কোনো কোনো মানুষের মধ্যে গোমরাহী সৃষ্টি হয়। যেমন নীল দরিয়ার পানিকে ফেরাউন রক্ত হিসেবে দেখিয়াছিল কিন্তু হযরত মুসা (আঃ) তাহা পানি হিসেবেই দেখিয়াছিলেন। প্রকৃত পক্ষে উহাতো পানিই ছিল; আদৌ দূষিত ছিল না।

এখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে, কুতুবে এরশাদ বা কুতুবে আবদালগণ আল্লাহতায়ালার জ্ঞানের পরিপূর্ণতা লাভ করেন কি উপায়ে? আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান, "আমার নিদর্শনতো তোমাদের ভিতরেই আছে, দেখ না কেন?” (সূরা জারিয়াতঃ ২১) আল্লাহতায়ালার এই নিদর্শন সমূহ যাহা প্রতি মানুষের ভিতরেই আছে-তাহা কি?

বিজ্ঞাপন

মানুষের দেহ দুই শ্রেণীর উপাদানে গঠিত। এক শ্রেণীঃ সৃষ্টি জগতের উপাদান; অপর শ্রেণী হইল আল্লাহতায়ালার আমরের জগতের বা হুকুমের জগতের বা সূক্ষ্ম জগতের। সৃষ্টি জগতের উপাদান সমূহ হইল আগুন, পানি, মাটি, বাতাস; আর সূক্ষ্ম জগতের উপাদান সমূহ হইল কালব, রুহ, সের, খফি ও আখফা। হেদায়েতের অধিকারী কামেল পীর যিনি নবুয়তের যোগ্যতার অধিকারী তিনি তাহার আত্মিক শক্তি দ্বারা কালব, রুহ, সের, খফি ও আখফা লতিফাকে জাগ্রত করান। এই লতিফাসমূহ পূর্ণরূপে জাগ্রত হইলে তাহারা তাহাদের উৎস স্থলে অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার আমরের জগতে যাইয়া মিশে। আলমে আমরের জগতেও প্রতি লতিফার নিজ নিজ উৎস মূল ও মূলের মূল স্থল রহিয়াছে। যেমন কালবের মূল আরশ ও আরশের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়াল। রূহের মূলের মূল আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের সিফাতে এরাদত। সেরের মূলের মূল আল্লাহতায়ালার শান। খফির মূলের মূল সিফাতে ছবিয়া-যাহা আল্লাহতায়ালার পবিত্রতার মানদন্ড হিসেবে বিবেচিত। আখফার মূলের মূল তাইয়্যুনে আউয়াল। যখন কোনো খোদাতত্ত্বজ্ঞানী সাধকের এই পাঁচটি আলমে আমরের লতিফা তাহাদের নিজ নিজ আসলের আসল স্থানে যাইয়া মিলিত হয় তখন তিনি আল্লাহতায়ালার পবিত্রতা, তদীয় জ্ঞান ও গুণ সমূহ পরিপূর্ণ রূপে লাভ করিতে পারেন। ইহার ব্যাখ্যা সমূহ হযরত পীর কেবলাজান নিম্নরূপে দিয়াছেন।

প্রথমে পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা লতিফায়ে কালব জাগ্রত হয়। অতঃপর রূপ জাগ্রত হয়, সের জাগ্রত হয়। কালব যখন তাহার মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের সহিত মিলিত হয় তখন তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূর কালবের পর্দায় ভাসিয়া উঠে। এই তাজাল্লীয়াতে আফয়াল হইল সমগ্র সৃষ্টি জগতের ক্রিয়া কর্মের উৎস। এই তাজাল্লীয়াতে আফয়াল দ্বারাই গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য স্ব স্ব কক্ষ পথে পরিভ্রমণ করে। সেই কক্ষপথের আবর্তনের প্রক্রিয়ায় ঋতু পরিবর্তন হয়। এই তাজাল্লীয়াতে আফয়ালকে কেন্দ্র করিয়া রহিয়াছে সৃষ্টি জগতের সকল কিছুই; যেমন আল্লাহতায়ালার আরশ-কুরছি, লওহ-কলম, বেহেশত-দোযখ, আসমান-জমিন। এই তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের উপর পূর্ণ অধিকার জন্মিলে সাধক তাই তাহার আপন প্রশস্ত ছিনায় আল্লাহতায়ালার আরশ-কুরছি, লওহ-কলম, বেহেশত-দোযখ আসমান জমিন সকল কিছুই দেখিতে পান। এই দরশন কালবী নেত্রে দরশন। লওহে মাহফুজের মধ্যে সৃষ্টি জগতের প্রথম হইতে সকল ঘটনাই লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। তাই ঐ তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূর পরিপূর্ণ রূপে ধারণকারী সাধক অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত-এই ত্রিকাল জ্ঞাত সাধক হিসেবে পরিচিত হন। রূহ যখন তাহার উৎসের উৎস বা আসলের আসলের সহিত মিলিত হয় তখন আল্লাহতায়ালার অবিনশ্বর হাকীকী সিফাত 'এরাদত' বা ইচ্ছা শক্তির সহিত মিলিত হয়-তখন আর আরেফ বা খোদাতত্ত্বজ্ঞানীর নিজ ইচ্ছা শক্তি থাকে না। রূহে তখন অবিরাম ধারায় আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের তাজাল্লী বা নূরের স্রোত আসিতে থাকে। রূহ ও কালব হইয়া ঐ ধারা তখন নাফস ও নাফস হইয়া আব, আতশ, খাক, বাদ বা আগুন, পানি, মাটি বাতাসের উপর পড়িতে থাকে, তখন ছালেকের অপবিত্রতার খোলস খসিয়া পড়ে। লতিফায়ে ছেরের মূলের মূল আল্লাহতায়ালার শান জগত। শান জগত হইল আল্লাহতায়ালার চিরস্থায়ীগুণ বা হাকীকী সিফাতের মূল বা কেন্দ্র। ছের লতিফা যখন আল্লাহতায়ালার শান জগতে যাইয়া মিলিত হয় তখন হায়াত, এলেম, কোদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তাকবীন অর্থাৎ জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছাশক্তি, দর্শন, শ্রবণ, কথন ও সৃজন গুণের অধিকারী হইয়া যায়।

লতিফায়ে খফি যখন তাহার মূলের মূল সিফাতে ছলবিয়া বা আল্লাহতায়ালার পবিত্রতার মানদন্ডের সহিত মিলিত হয় সে তখন বুঝিতে পারে আল্লাহতায়ালা লয়হীন, ক্ষয়হীন ও কোনো প্রকার পরিবর্তন হইতে পবিত্র।

বিজ্ঞাপন

লতিফায়ে আখফা যখন তাহার মূলের মূল হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকাম তথা জাত মোজাররাদা ও জাত মতলকের সহিত মিলিত হয়, তখন সাধক আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভ করিয়া পরিপূর্ণ খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী বা আরেফে বিল্লাহ হন। এই জ্ঞানই রাসূলে করীম (সাঃ) এর জ্ঞান তথা কামালাতে নবুয়তের জ্ঞান। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, কামালাতে নবুয়তের অধিকারী ব্যক্তিগণ সব সময়ই সৃষ্টি জগতের সহিত ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থাকেন। তাহারা তাহাদের মকসুদকে সৃষ্টি জগতের মধ্যে গুপ্ত বা সৃষ্টি জগতের বাহিরে মনে করেন না। তাহারা সৃষ্টি জগতে থাকিয়াই আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করেন। কামালাতে নবুয়তের অধিকারীগণ দুনিয়াতে থাকিয়াই আপন নাফসের মধ্যে আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করেন এবং আল্লাহতায়ালার জ্ঞান, গুণ, শান, পবিত্রতা ও জাতের তাজাল্লী বা নূরের ধারা নিজের মধ্যে ধারণ করেন। এই রূপে নিজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের পরিপূর্ণতা লাভ করেন-তখন তিনি শুধু "আল্লাহপাকই ছিলেন আর কিছুই ছিল না"-সৃষ্টির প্রারম্ভের এই স্তরের অবস্থা ও 'আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি অল আরদ'-অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নূর আসমান জমিন ব্যাপী, ওয়াছিয়া কুরছিয়্যুহুছ সামাওয়াতি অল আরদ অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার কুরছি আসমান জমিন ব্যাপী-এই সকল আয়াতপাকের হকিকত অনুধাবন করিতে সক্ষম হন। হাদীসে কুদসিতে বর্ণিত বাণী "আল্লাহর ভেদ মানুষ, মানুষের ভেদ আল্লাহ" এই বাণীর মর্মার্থ তখন তিনি অনুধাবন করিতে পারেন।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, “কামালাতে নবুয়তের অধিকারী সাধকদের দৃষ্টি যখন সৃষ্টির দিকে থাকে তখন তাহাদের বাতেন আল্লাহপাকের দিকে নিবদ্ধ থাকে। তাহাদের দৃষ্টি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে সৃষ্টিজগতকে অবলোকন করে। আর তাহাদের বাতেন আল্লাহতায়ালার দিকে রুজু থাকে ও আল্লাহপাককে দরশন করিতে থাকে। এই ভাবে কামালাতে নবুয়তের মাকামের সাধকগণ একই সাথে আল্লাহপাক ও সৃষ্টি জগতের দিকে মোতাওয়াজ্জুহ থাকেন। পক্ষান্তরে বেলায়েতে নবুয়তের অধিকারীগণের বাতেন সকল সময় স্ব স্ব গোপন অবস্থার দিকে নিবদ্ধ থাকে।

একই সাথে আল্লাহতায়ালাকে দরশন যাহাকে শহুদে হক ও সৃষ্টি জগতকে দরশন যাহাকে শহুদে খাল্ক বলে-তাহাই মাকামে তাকর্মীল বা পরিপূর্ণতার মাকাম।

বিজ্ঞাপন

কামালাতে নবুয়তের অধিকারী ছালেকগণ আল্লাহপাককে সৃষ্টি জগতের বাহিরেও দেখেন না, ভিতরেও দেখেন না, আল্লাহপাককে সৃষ্টির সহিত মিশ্রিত দেখেন না, অবিমিশ্রিতও দেখেন না। ইহাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ও ওলামায়ে আহলে হকের অভিমত।

হে জাকেরান ও আশেকানগণ! তোমরা জানিয়া রাখ, আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ জ্ঞান, গুণ, শান, শয়ুনাত ও পবিত্রতার নূরের অধিকারী, কামালাতে নবুয়তের মর্যাদাধারী, আল্লাহতায়ালার মনোনীত সত্য পথে হেদায়েতকারী। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের ও হেকমতের পরিপূর্ণ অধিকারী। যদি তোমরা আল্লাহপাকের জ্ঞান, গুণ, শয়ুনাত, পবিত্রতা ও হেকমতের পরিচয় পাইতে চাও তবে পীর কেবলাজানের কামালাত অনুধাবন করিতে চেষ্টা কর। আল্লাহতায়ালা তোমাদের দয়া করুন ও মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইয়া দেন। ইহাই দু'আ!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD