কামালাতে নবুয়তের মর্যদাপ্রাপ্ত সাধকেরাই হেদায়েতকারী

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কামালাতে নবুয়তের মর্যদাপ্রাপ্ত সাধকেরাই প্রকৃত হেদায়েতকারীঃ
বিজ্ঞাপন
পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহপাক হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে ফরমান,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرَ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلهُ
واحد -
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- "বলুন, আমিতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ তবে আমার কাছে ওহী আসে, তোমাদের মাবুদ এক আল্লাহ।"
কুরআন মজীদে আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে আরও ফরমান,
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ - اللَّهُ الصَّمَدُ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- "বলুন, তিনি এক; তিনি কাহারও মুখাপেক্ষী নন।"
উপরের দুইটি আয়াতপাক হইতে ইহা বোঝা যায় যে, আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) কে মানব জাতির উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালার পথ অনুসরণ করিতে বলিতেছেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মানব জাতির জন্য আল্লাহতায়ালার রাসূল বা প্রতিনিধি হিসাবে তাহাদেরকে সত্য পথ প্রদর্শন করিতেছেন বা হেদায়েত করিতেছেন। আর প্রথমে উদ্ধৃত আয়াতে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) হেদায়েতকারী হিসাবে নিজ সম্পর্কে বলিতেছেন-আমি তো তোমাদের মত মানুষ, তবে আমার কাছে ওহী আসে।" অর্থাৎ ওহী প্রাপ্ত হওয়া হেদায়েতকারী হিসাবে রাসূলে করীম (সাঃ) এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য; যাহা অন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে নাই। এই ওহী লাভের বৈশিষ্ট্যই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এবং অন্যান্য পয়গম্বর (আঃ) গণকে সাধারণ মানুষ হইতে পহ করিয়াছে। পৃথক
আল্লাহপাক কুরআন মজীদের সূরা মায়েদাতে ফরমান, "অনন্তর আমার প্রেরিত পুরুষগণ অবশ্যই মানবগণের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি লইয়া আগমন করিয়াছে। এই আয়াতপাক দ্বারা বোঝা যায় আল্লাহপাক হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ব্যতীত আরও অনেক প্রতিনিধি বা রাসূল বা পয়গম্বর প্রেরণ করিয়াছেন। "ওহী" আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে পয়গম্বরগণের নিকটে ফেরেশতা মাধ্যমে আসিয়াছে যাহা আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে নাজিলকৃত আসমানী কিতাব হিসাবে উলুল আজম পয়গম্বরগণ রাখিয়া গিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
শরীয়তে বলা আছে, যে সকল উলুল আজম পয়গম্বরগণের নিকট "ওহী" মারফত কিতাব নাজেল হইয়াছিল, সেই সকল পয়গম্বরগণ ব্যতীতও আল্লাহপাক আরও অগনিত পয়গম্বর মানুষের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহারাও আল্লাহতায়ালার নবী বা প্রেরিত পুরুষ হিসাবে স্বীকৃত। এই সকল নবীগণের নিকট "ওহী" নাজেল না হইলে তাহারা মানুষকে হেদায়েত করিয়াছেন কি প্রকারে?
আল্লাহপাক সূরা নাহলে ফরমান-"তাহার ইচ্ছানুযায়ী স্বীয় বান্দাগণের মধ্যে যাহার প্রতি ইচ্ছা হয় তাহার নিকট হুকুমসহ ফেরেশতা প্রেরণ করেন, এই মর্মে যে আমি অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নাই, আমাকে ভয় কর।" এই আয়াত পাকের ব্যাখ্যায় কেহ কেহ আল্লাহতায়ালার আমরকে বা হুকুমকে এলহাম হিসাবে, কেহবা ওহী হিসাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। সূরা নাজমে আল্লাহপাক ফরমান, "অতঃপর তিনি (আল্লাহ) আপন বান্দার সহিত গোপনে অনেক কথাবার্তা বিনিময় করেন।" সূরা নেছাতে আল্লাহপাক ফরমান, "আল্লাহতায়ালা মুছার সহিত কথা বার্তা বলিয়াছেন।" সূরা বাকারাতে আল্লাহপাক বলেন, "সেই সমস্ত নবীর মধ্য হইতে আল্লাহপাক কাহারও সহিত কথাবার্তা বলেন বা কালাম বিনিময় করেন।"
কুরআন মজীদে ব্যবহৃত "ওহী" শব্দের তাফসির করিয়া হযরত আল্লামা শিবলী নোমানী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন-ওহী শব্দের আভিধানিক অর্থ গোপনভাবে অবহিত করা। কুরআন মজীদে "ওহী" শব্দের তিন প্রকার অর্থ ব্যবহৃত হইয়াছে। যথাঃ-
বিজ্ঞাপন
প্রকৃতিগত নির্দেশ-
যেমন সূরা নাহালে আল্লাহ বলেন- তোমার পরওয়ারদিগার মধু-মক্ষিকাকে নির্দেশ দান করিয়াছেন।
কোনো কথা অন্তরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করা-
বিজ্ঞাপন
যেমন সূরা কাছাছে আল্লাহ বলেন, আমি মুছার মাতার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি।
ওহী শব্দের তৃতীয় অর্থ গোপনভাবে কথা বলা-
যেমন সূরা নাজমে আল্লাহ বলেন, "আল্লাহপাক পছন্দনীয় বান্দার সহিত গোপন আলাপ করেন।" সূরা শুরাতে আল্লাহ বলেন, "কোনো মানুষের সাধ্য নাই খোদাতায়ালার সহিত সরাসরি কথা বলে তবে তাহা সম্ভব ওহীর মাধ্যমে বা পর্দার আড়াল হইতে, অথবা এইভাবে যে তিনি কোনো দূত প্রেরণ করিবেন-যে দূত আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পৌঁছাইয়া দিবেন।""
বিজ্ঞাপন
এই সকল আয়াত শরীফ হইতে বোঝা যায় যে আল্লাহপাক কেবল মাত্র আসমানী কিতাব সমূহ নাজিল করিবার জন্যই ওহী নাজেল করেন নাই, তাহার প্রেরিত পুরুষগণ ও পছন্দনীয় বান্দাদেরকে তাহার ইচ্ছানুযায়ী পরিচালনা করিবার জন্যও বান্দাগণের উদ্দেশ্যে হয় ওহী প্রেরণ করিয়াছেন; নতুবা পর্দার আড়াল হইতে কথা বলিয়াছেন অর্থাৎ এলহাম বা হুকুম বা নির্দেশনা প্রদান করিয়াছেন-অথবা ফেরেশতা প্রেরণ করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে যাহারা হাদী হিসাবে নির্বাচিত হন, তাহারা যেমন আল্লাহতায়ালার পক্ষে হেদায়েতের জন্য "ওহী" বা এলহাম দ্বারা পরিচালিত হন, তেমনি তাহারা আল্লাহতায়ালার নিকট থেকে "মোজেযা বা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটাইবার ক্ষমতাও প্রাপ্ত হন। পূর্বকালের নবী (আঃ) গণ আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে মোজেযা লাভকরিতেন মানুষের দৃষ্টিকে আল্লাহতায়ালার সর্বময় কুদরত বা ক্ষমতার দিকে আকৃষ্ট করিতে।
উল্লিখিত কুরআন মজীদের আয়াতসমূহ দ্বারা এই কথাই বোঝা যায়, যে কোনো মানুষ বা শরীয়তের আলেম মাত্রই আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত হাদী হইতে পারেন না। শরীয়তের আলেমগণ শরীয়ত প্রচার করিতে পারেন। ইহার যে গুণ ও পুণ্য তাহা তাহারা আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে লাভ করেন। কিন্তু শরীয়তের সকল আলেমই আল্লাহতায়ালার এলহাম বা ওহী দ্বারা পরিচালিত হন না বা তাহারা আল্লাহতায়ালার এমন গুণাবলীর নিদর্শন বাস্তবে প্রয়োগ করিতে পারেন না-যাহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার সর্বময় ক্ষমতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। বস্তুতঃ ইহাই সর্ব কালের হেদায়েতকারীর জন্য আল্লাহতায়ালার বিশেষ নিদর্শন।নবুয়তের যুগ শেষ হইয়াছে সত্য কিন্তু মানুষ তাহার পরে পুরুষানুক্রমে বাঁচিয়া আসিতেছে। রাসূলে করীমকে (সাঃ) যাহারা নিজ চোখে করীম (সাঃ) খাতেমুন্নবী। এই কথার অর্থ আল্লাহপাক তাহার দ্বীন ও দোখয়াছেন, তাহারা বহু যুগ পূবে গত হইয়াছেন। হযরত রাসূলে শরীয়ত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মাধ্যমেই সমাপ্ত করিয়াছেন। কিন্তু সেই দ্বীনের প্রতি মানুষকে পুরুষানুক্রমে হেদায়েত করিবার প্রয়োজন রহিয়াছে। এই জন্য প্রতি যুগেই আল্লাহতায়ালা পূর্বকালের নবী বা রাসূলগণের গুণে গুণসম্পন্ন মানুষ হেদায়েতের জন্য দুনিয়াতে প্রেরণ করেন। তাজকেরাতুল আউলিয়া কেতাবের তৃতীয় খন্ডে হযরত আবুবকর ওয়াসেতী (রঃ) এর জবানীতে বলা আছে- "একবার জুমার দিনে আছরের নামাজের পর আমি বাইতুল মোকাদ্দাসে হযরত সোলায়মান (আঃ) এর মিম্বরের নিকটে বসিয়াছিলাম। হঠাৎ সেখানে দুই জন লোক আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনারা কে? তাহাদের একজন বলিলেন, "আমি খিজির আর উনি আমার ভাই ইলিয়াস।" আমি আবার তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, জমিনের উপর যত আউলিয়া আছেন, তাহাদের সকলকেই কি আপনি চিনেন? তিনি বলিলেন, আল্লাহপাক যাহাদের সংখ্যা গণনা করিয়াছেন তাহাদেরকে চিনি। জিজ্ঞাসা করিলাম, সংখ্যা গণনা করিয়াছেন-ইহার অর্থ কি? হযরত খিজির (আঃ) বলিলেন, নবী করীম (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর জমিন আল্লাহপাকের দরবারে ফরিয়াদ করিল, হে খোদা! কেয়ামত পর্যন্ত কি আমাকে এইভাবে থাকিতে হইবে যে আমার উপরে আর কোনো নবী চলা-ফেরা করিবেন না? আল্লাহ বলিলেন, শীঘ্রই উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে এমন লোক পয়দা করিব যাহাদের অন্তঃকরণ নবী (আঃ) গণের অন্তকরণের সদৃশ হইবে।"
হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ও হযরত উমর ফারুক (রাঃ) নবুয়তের যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন এবং এই মর্মে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নির্ভরযোগ্য হাদীস রহিয়াছে। তাহারা ব্যতীত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মতগণের মধ্যেও যে নবুয়তের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি আছেন তাহা হযরত আবুবকর ওয়াসেতী (রঃ) ছাহেবের বর্ণিত ঘটনায় উদ্ধৃত রহিয়াছে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর এই হাদীস পাকও রহিয়াছে যে, নবী করীম (সাঃ) এর উম্মতবর্গের মধ্যে এমন বুযুর্গ ব্যক্তি থাকিবেন যাহাদের মর্যাদা ও গুণ বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের নবী ও পয়গম্বরগণের অনুরূপ হইবে। হযরত ঈসা (আঃ), যিনি বনি ইসরাইলী বংশের নবীগণের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উলুল আজম পয়গম্বর ছিলেন, তিনিও আল্লাহপাকের কাছে ফরিয়াদ জানাইয়াছেন, তিনি যদি নবী না হইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মত হইতেন, তাহা হইলেই অধিকতর খুশী হইতেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর বক্তব্য হইতে ইহা বোঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা কামালাতে নবুয়ত বা নবুয়তের মর্তবা বা যোগ্যতাসম্পন্ন হেদায়েতকারী দুনিয়াতে নবীদের আগমন বন্ধ হওয়ার পরও অব্যাহত রাখিয়াছেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) উক্তরূপ কামালাত তদীয় উম্মতবর্গের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন, যাহা পাইবার জন্য হযরত ঈসা (আঃ) এর মত উলুল আজম পয়গম্বর আল্লাহতায়ালার দরবারে ফরিয়াদ করিয়াছেন। শরীয়তে ইহাও উল্লেখ রহিয়াছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ) এর আবির্ভূত হইবার পর পুনরায় জমিনে অবতরণ করিবেন এবং উম্মতে মুহাম্মদীর দলভুক্ত হইবেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর দ্বীনের এই বিশেষ মর্যাদা এই জন্য যে, ইসলামের মাধ্যমেই আল্লাহতায়ালার জাতপাক ও তদীয় সৃষ্টির পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করা যায় যাহা পূর্ববর্তী অন্য কোনো নবী (আঃ) এর দ্বীনের আমলের মাধ্যমে সম্ভব নয়। রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরবর্তী যুগে যাহারা আল্লাহতায়ালা কর্তৃক হেদায়েতকারী হিসাবে নির্বাচিত হইয়াছেন তাহাদের কেহ কেহ আল্লাহতায়ালার জাতপাক ও তদীয় সৃষ্টির জ্ঞানে জ্ঞানী-সেই অর্থে পরিপূর্ণ জ্ঞানী। আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান হযরত নবী করীম (সাঃ) লাভ করিয়াছিলেন মেরাজের মাধ্যমে। মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহপাকের যে নৈকট্য হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) লাভকরিয়াছিলেন আল্লাহপাক তাহা সূরা নাজমে "ক্কাবা কাওসাইনে আও আদনা"-এই আয়াত পাকের মাধ্যমে বর্ণনা করিয়াছেন। এই আয়াতের অর্থ তীর ও ধনুর ছিলার মধ্যে যে নৈকট্য আল্লাহপাকের সহিত হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সেই নৈকট্য লাভ করিয়াছিলেন। ইহার পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ ফরমান, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সহিত তাহার নিবিড় নৈকট্যের মাধ্যমে গোপন আলাপ হইয়াছিল।
বিজ্ঞাপন
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার জাতের যে জ্ঞান লাভকরিয়াছিলেন, তাহা তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের কালবে রাখিয়া দেন-এই জ্ঞান হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুসরণের মাধ্যমে লাভকরেন ও মানব জাতি তথা সৃষ্টির খেদমতে বিতরণ করেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এর কালবে রক্ষিত জ্ঞান কি প্রকারে লাভ করেন এবং কি উপায়ে তাহা লাভ করা সম্ভব তাহা তদীয় "মুকাশিফাতে আয়নিয়া" নামক কেতাবে বর্ণনা করিয়াছেন।
যাহা হউক, উল্লিখিত বিষয় সমুহের মূল কথা হইল আল্লাহতায়ালা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরবর্তী যুগেও তাহার পক্ষে হেদায়েত অব্যাহত রাখিয়াছেন। যাহারা আল্লাহতায়ালা কর্তৃক হেদায়েতকারী হিসাবে নির্বাচিত হন তাহাদের মধ্যে নবুয়তের যোগ্যতা ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর দ্বীনের পরিপূর্ণ জ্ঞান রহিয়াছে-অর্থাৎ তাহাদের মধ্যে আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান ও সান্তর পরিপূণ জ্ঞান রহিয়াছে আল্লাহতায়ালা কতক প্রেরিত এলহাম বা ওহী ও আল্লাহতায়ালার কুদরতের গুণ হইতে লাভ করা কারামত বা আতপ্রাকৃত ঘটনা ঘটাইবার জন্য বিশেষ জ্ঞান তাহারা আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে লাভ করেন-ইহাই আল্লাহতায়ালার দ্বারা নির্বাচিত হেদায়েতকারীর প্রকৃত লক্ষণ, নিদর্শন ও বৈশিষ্ট্য। তাহারাই কামালাতে নবুয়ত ও তঊর্ধ্ব মাবুদিয়াতে ছেরফা, হোব্বে ছেরফা বা আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞানের অধিকারী। তাহারাই প্রকৃত নায়েবে নবী।
কামালাতে নবুয়তের জ্ঞান লাভের জন্য "মোদগা" বা সমস্ত শরীরকে কালবের গুণে গুণান্বিত করিতে হয়। মোদগার বৈশিষ্ট্য হইল-ইহা সমগ্র শরীর বা ওজুদকে পবিত্র করে যাহার ফলে কামালাতে নবুয়তের মাকাম বা তদ্ঊর্ধ্ব মাকাম হাছিলকারী ওলীগণ আল্লাহতায়ালার এলহাম বা ওহী লাভ করিতে পারেন। ইহার পূর্ববর্তী মাকাম অর্থাৎ বেলায়েতে উলিয়ার স্তরের ওলীগণ ফেরেশতাগণের বেলায়েত লাভ করেন ও ফেরেশতাবৃন্দের সহিত সাক্ষাৎ লাভ করিয়া থাকেন।
বিজ্ঞাপন
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) হইতে আল্লাহতায়ালার জাতপাকের যে জ্ঞান হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) লাভ করিয়াছিলেন, তাহা তিনি হযরত ছালমান ফারসী (রাঃ) কে দান করেন। হযরত ছালমান ফারসী (রাঃ) এর নিকট হইতে এই জ্ঞান অবিকৃত অবস্থায় লাভ করেন, হযরত কাসেম মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ)। অতঃপর এই নেছবত হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রঃ) লাভ করেন। হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব বলেন, "আসমান ও জমিনের জ্ঞান ঐ ব্যক্তি লাভকরিতে পারে না যে দ্বিতীয়বার জন্ম গ্রহণ করে নাই।" হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ ও তাহার জাতের জ্ঞান লাভের শর্ত হিসাবে বলিয়াছেন মৃত্যুর পূর্বেই মরিয়া যাও। মৃত্যুর প্রদত্ত নূরের শরীর প্রাপ্তিকে বুঝাইয়াছেন-যে নূরের দেহকে হযরত পূর্বে মারয়া যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার যে জন্মালাভ হয় তাহা আল্লাহতায়ালা মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব "ওজুদ মাওহুব লাহু" এবং হযরত গউসপাক "তেফলুল মায়ানী" বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই "ওজুদ মাওহুব লাহু” বা খোদাদত্ত শরীরই সঠিকভাবে আল্লাহতায়ালার এলহাম লাভ করে এবং বিদ্যুতের চেয়ে বহু গুণ গতিতে আল্লাহপাক ও তদীয় সৃষ্টির হাকীকী সত্ত্বার সহিত যোগাযোগ করিয়া সকল ব্যক্তি ও বস্তুর হকিকত ও ভালমন্দ নির্ণয় করিতে পারে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যে মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর কথা বলিয়াছেন, তাহার অর্থ দৈহিক মৃত্যু নয় -তাহার অর্থ হইল দেহের কামনা বাসনার অবসান। এই অবস্থা যে ছালেক আল্লাহতায়ালার দয়ায় লাভ করেন, তিনি আল্লাহতায়ালার দয়ায় দেহের পবিত্রতা লাভ করিবার পথে অগ্রসর হন। প্রকৃত পবিত্রতা লাভহয় বেলায়েতে উলিয়া ও কামালাতে নবুয়তের স্তরে। কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে ছালাত, মাবুদিয়াতে ছেরফার জ্ঞান লাভকরিয়া আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভ করিতে হয়। ইহার পাশাপাশি হকিকতে আম্বিয়ার দায়েরাও ছালেককে সম্পূর্ণ করিতে হয়-হকিকতে আম্বিয়া দফতরের মধ্যে যে সকল দায়েরা রহিয়াছে তাহার অন্যতম হইল দায়েরায়ে হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুছবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে সেরফা। এই সকল দায়েরায় ছায়ের সম্পূর্ণ করিলেই আল্লাহতায়ালার জাতপাকের জ্ঞান লাভ হয়।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) তদীয় "মোকাশিফাতে আয়নিয়া" কিতাবে উল্লেখ করেন, আল্লাহতায়ালা যাহাদেরকে তাহার জাতের পরিচয়দানের জন্য গ্রহণ করিয়া লন বা পছন্দ করিয়া লন, তাহারা ঐ মাকামে উন্নীত হন জজবা ও মহব্বতের দ্বারা।
এই রূপে যাহারা জাতের পরিচয় লাভ করেন, তাহারা বস্তুতঃ রাসূলে করীম (সাঃ) এর জ্ঞানে জ্ঞানী হইয়া যান-বা তাহার গুণাগুণ বা হকিকত অর্জন করেন। এই হকিকতকে হকিকতে মুহাম্মদী বলা হয়। মেরাজ লাভের যে বর্ণনা কুরআন মজীদে আছে এবং হাদীস পাকে আছে, তাহাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলে পাক (সাঃ) মেরাজের রাতে যেমন সপ্ত আসমান ভ্রমণ করেন, তেমন বেহেশত, দোযখ, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, ফেরেশতা ও পূর্ব যুগের নবী (আঃ) গণের সহিত মিলিত হন তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের সহিত পরিচিত হন।
বিজ্ঞাপন
হকিকতে মুহাম্মদী, রূহে মুহাম্মদী ও নূরে মুহাম্মদীর পরিচয়ঃ
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তদীয় হাদীস পাকে উল্লেখ করেন, "আল্লাহতায়ালা প্রথমে সৃষ্টি করেন আমার রূহ, আমার নূর, আমার জ্ঞান ও আমার কালাম।" তরিকতের সাধকগণ বলেন, আল্লাহতায়ালার প্রথম সৃষ্টি তাহার জাতের ভিতরে উত্থিত প্রেম বা হোব্ব। এই হোব্ব বা প্রেমকে তদীয় আরশের উপরে হকিকতে মুহাম্মদীর ভেতর রাখা হয়। গোপন আমানতের এই হকিকতগত প্রকাশ হইল রূহে মুহাম্মদী। হকিকতে মুহাম্মদী, রূহে মুহাম্মদী ও নূরে মুহাম্মদীকে এক করিয়া দেখিলে চলিবে না। যদিও পবিত্র হাদীসে বলা আছে "আউয়ালো মা খালাকাল্লাহো রূহী", "আউয়ালো মা খালাকাল্লাহো নূরী"। রুহ ও নূর একই সাথে সৃষ্টি হইবার নয়; অতি কিঞ্চিৎ হইলেও সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান থাকার কথা, সাধারণ যুক্তিতে ইহা মনে হয়। কিন্তু হাদীস পাকে উভয়ই যখন একই সাথে সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছে তখন বিশ্বাস করিতে হইবে যে, উভয়েই একই সাথে সৃষ্ট হইয়াছিল। তরীকতের সাধকগণ বলেন, হকিকতে মুহাম্মদী হইল নবী চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহতায়ালার কল্পনা যাহা চিরস্থায়ী। নবী করীম (সাঃ) সম্পর্কে আল্লাহতায়ালার আমর বা হুকুম হইল রূহে মুহাম্মদী। সেই হুকুমের নূরগত প্রকাশ হইল নূরে মুহাম্মদী। আর নবী চরিত্র হইল পার্থিব জগতে নবী-করীম (সাঃ) এর বহিঃপ্রকাশ। ছালেককে যখন আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" কলেমা শরীফের হকিকত ও মারেফাতের জ্ঞান দান করেন, তখন ছালেক (১) আল্লাহতায়ালার কল্পনা স্তরে হকিকতে মুহাম্মদীর জ্ঞান, (২) আল্লাহতায়ালার কল্পনাকে বাস্তব রূপ দানের জন্য তাহার হুকুম বা আমরের জ্ঞান বা রূহে মুহাম্মদীর জ্ঞান ও (৩) সেই হুকুমের নূরগত প্রকাশ নূরে মুহাম্মদীর জ্ঞান লাভ করেন। আর রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, সমগ্র সৃষ্টি তাহার নূর হইতে উৎপন্ন। তাই নূরে মুহাম্মদীর জ্ঞান দ্বারা সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান লাভ করেন। কলেমা শরীফের উভয় অংশের হকিকত ও মারেফতের জ্ঞান লাভের দ্বারা ছালেক পবিত্র কুরআনে নিহিত গুপ্তভেদ অর্থাৎ হরফে মোকাত্তায়াতের জ্ঞান লাভ করেন এবং সৃষ্টি জগতের পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন। এই প্রসংগে স্মরণীয় যে, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন যে, আদম যখন মাটি ও কাদায় তখনও তিনি নবী। আল্লাহ বলেন, রাসূলে করীম (সাঃ) কে সৃষ্টি করিবার জন্যই তিনি সমগ্র সৃষ্টি জগৎ সৃজন করিয়াছেন। হাদীসে কুদসীতে আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আদমকে নিজ ছুরতে অর্থাৎ গুণ দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালা বলিয়াছেন, আদম পৃথিবীতে তাহার খলিফা। কিন্তু যে আদম (আঃ) নবী, সেই আদম (আঃ) কে তিনি তাহার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি বলেন নাই। শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি বলিয়াছেন দয়াল নবী (সাঃ)- কে। আদমকে যে গুণাগুণ বা জ্ঞান আল্লাহতায়ালা দান করিয়াছিলেন, তাহার পরিপূর্ণতা দান করিয়াছিলেন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে। তাই কলেমা শরীফের হকিকত ও মারেফাতের জ্ঞান লাভের অর্থ একই সাথে আল্লাহতায়ালার জাতপাকের জ্ঞান, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির গুণ ও সমগ্র সৃষ্টি জগতের পরিচয় লাভ করা। যাহা হকিকতে মুহাম্মদী ও নূরে মুহাম্মদী-এই উভয় গুণ ও জ্ঞান লাভের দ্বারা সম্ভব হয়।
কলেমা শরীফের গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, সমস্ত এবাদতের মধ্যে কলেমা শরীফের জেকেরই সর্বশ্রেষ্ঠ। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, সমস্ত জেকেরের মধ্যে কলেমা শরীফের জেকেরই সর্ব শ্রেষ্ঠ। নবী করীম (সাঃ) বলেন, "আমি ব্যতীত যদি সাত তবক আসমান ও সাত তবক জমিনকে এক পাল্লায় রাখা যায় এবং অপর পাল্লায় কলেমা শরীফকে রাখা হয় তাহা হইলে কলেমা শরীফের পাল্লাই ভারী হইবে।" হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব প্রশ্ন রাখিয়াছেন, কেন ইহা শ্রেষ্ঠ হইবে না যখন তাহার একটি কলেমা বা অংশ আল্লাহ ছাড়া সমস্ত আসমান, জমিন, লওহ, কলম, আদম ও আলমকে নাফিকারী। দ্বিতীয় কলেমা খাঁটি মাবুদকে প্রমাণ করিতেছে-যিনি জমিন ও আসমানসমূহের সৃষ্টিকারী। আল্লাহতায়ালা ছাড়া যাহা কিছু আফাক ও আনফাছের মধ্যে অর্থাৎ ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য গুণ ও অনুভূতির মধ্যে আছে তাহার সবই অতি তুচ্ছ।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "জ্ঞান ও ধারণাতে যাহা আছে ও আসে তাহা সবই মখলুক বা সৃষ্টি জগতের অন্তর্গত; তাই তাহা এবাদতের উপযুক্ত নহে। এবাদতের উপযুক্ত তিনিই যাহার কোন দৃষ্টান্ত বা উপমা নাই। আমাদের কাশফ ও শহুদের চক্ষু আল্লাহতায়ালার এজমাত ও জালালের মোশাহেদা করিতে পারে না। এই রূপ বোঝাবুঝির অতীত আল্লাহকে গায়েব বলিয়া বিশ্বাস করা
ছাড়া উপায় নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানা (রাঃ) ছাহেব আরও বলেন, ঈমান বিল গায়েব ঐ সময়ে অর্জন করা সম্ভব যখন জ্ঞান বুদ্ধি ও দ্রুতগামী খেয়াল ধ্বংস হইয়া যায়। সেখানে কোনো জিনিষ চিন্তা শক্তির মধ্যে আবর্তিত হয় না, এই কথা আল্লাহতায়ালার আকরাবিয়াতে ও তদঊর্ধ্ব মাকামে প্রমাণিত হয়। ইহা খেয়াল ও ধারণার সীমার জ্ঞানের প্রকাশ বেশী হইবে। এই দৌলত অর্থাৎ ঈমান বিল গায়েব দূরে। খেয়াল ও ধারণার সীমা যত দূরে হহবে, ততই আমাদের আম্বিয়া (আঃ) দিগের সহিত নির্ধারিত। ঈমান বিল গায়েব তাহাদের অনুসরণের কারণে আল্লাহপাক যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে দান করেন। ঐ অবস্থা জ্ঞানের ধ্বংসের স্থান। সেখানে জ্ঞান প্রবেশের কোন স্থান নাই। উহা শুধু নৈকট্যের দ্বারাই লাভ হয়। তবে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "আমার ধারণা যে, যখন নবী পাক (সাঃ) আল্লাহকে এই দুনিয়ায় থাকিয়া দর্শন করিয়াছিলেন তাহা হইলে তাহার সম্পর্কে যদি উহা ঈমানে শহুদী নির্ধারণ করা হয় তাহা হইলে উহা উপযুক্ত ও সহনীয় হইবে এবং নিজের কল্পনা হইতে পবিত্র হইবে। কেননা যে জিনিষ লাভের জন্য অপরের পক্ষে কেয়ামতের পরে ওয়াদা আছে, উহা তাহার জন্য এইখানে হইবে। ইহা আল্লাহতায়ালার ফজল। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা উহা দান করেন।"
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের অত্র মকতুবের মর্মার্থ এই যে, আল্লাহপাকের জাত গায়েব। তাহা জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়ানুভূতির অতীত। সাধারণ লোকের নিকট তাহা জ্ঞানের অতীত। এমনকি আম্বিয়া (আঃ) গণের নিকটও তাহা ঈমান বিল গায়েব হিসাবে রহিয়া যায়। কিন্তু হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জ্ঞানের নিকট তাহা ঈমানে শহুদী অর্থাৎ দেখিয়া বিশ্বাস করিবার স্তরের জ্ঞান। কারণ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সশরীরে মেরাজে গমন করিয়াছিলেন-ইহাই অধিকাংশ জ্ঞানী মোফাচ্ছের ও আরেফগণের অভিমত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন-এই দুনিয়াতে আগত শেষ কালাম অর্থাৎ কুরআন পাক এই নবীকে কামেল করার জন্য। কলেমা তৈয়ব এই কথার কামালাতের প্রকাশ বা ছাবেত। মোট কথা এই যে, হযরত নবী (সাঃ) এই দুনিয়াতে আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ করিয়াছেন। সুতরাং কলেমা ছাবেতের কামালাত পূর্ণাংগ লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্যই নিছক জাতের দর্শন তাহার জন্য দুনিয়াতে সম্ভব বলিয়া বলা হয় আর অপরের জন্য তাহা ওয়াদা যাহা আখেরাতে পূর্ণ হইবে। নবী করীম (সাঃ) এর অনুসরণে যাহারা দুনিয়াতে থাকিয়া কলেমা সাবেত করিতে পারেন, আল্লাহতায়ালার ফজল, করম ও রহম হইলে তাহারাও এই জ্ঞান লাভ করিতে পারেন-ইহাই তরীকতের বুযুর্গগণের অভিমত। ইহা আল্লাহতায়ালার অনুকম্পা। এই মাকাম যিনি লাভ করেন তিনি হকিকতে মুহাম্মদীর জ্ঞান তথা কলেমা শরীফের হকিকতের জ্ঞান লাভকরেন এবং শরীয়তের হকিকতের জ্ঞান অর্জন করেন। কলেমা শরীফের হকিকতের জ্ঞান ছাড়া আল্লাহতায়ালা ও তদীয় সৃষ্টির জ্ঞান লাভ করার অন্য কোন পথ নাই।
কলেমা শরীফের মাহাত্ম্যঃ
কলেমা তৈয়বের প্রথম অংশ বেলায়েতের নিদর্শন এবং দ্বিতীয়াংশ নবুয়তের নিদর্শন। কলেমার প্রথমাংশের "লা" দ্বারা সকল সৃষ্টিকে নাফী করা হয় এবং 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বা মুহাম্মদ আল্লাহতায়ালার রাসূল বা প্রতিনিধির দ্বারা সৃষ্টিকে আল্লাহতায়ালার প্রতি আকর্ষণ ও হেদায়েত করিবার ইশারা করা হয়। "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এই কলেমা যিনি ছাবেত করিতে পারেন তিনি বেলায়েত লাভ করেন; আর যিনি "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" কলেমা শরীফের দুই অংশ ছাবেত করিতে পারেন তিনি বেলায়েতের সহিত কামালাতে নবুয়তের জ্ঞান লাভ করেন। কলেমা শরীফের দুই অংশের হকিকতের জ্ঞান দ্বারাই আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভ করা যায়। প্রথমাংশ ছাবেত করিতে পারিলে যাহা লাভ হয় তাহা হইল আল্লাহতায়ালার নূরের জেলাল বা প্রতিবিম্বের জ্ঞান। এই কলেমার জেকেরের ফজিলত ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভ হয় না। এই কলেমা শরীফের জেকের ব্যতীত অন্য কোনো ফজিলত দ্বারা আল্লাহতায়ালার গায়েবের রাজ্যের জ্ঞান লাভ করা যায় না। এই কলেমার জেকেরকারী দুনিয়া ও নিজ হইতে দূরে সরিয়া গিয়া আল্লাহপাকের জাতের অধিকতর সান্নিধ্যে পৌঁছান এবং ঈমান বিল গায়েব হাছিল করেন। তবে কলেমা শরীফের হকিকতের বোঝাবুঝি ছালেক তাহার মাকাম অনুযায়ী লাভ করেন। বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা হইতে দ্বিতীয় দায়েরার পৃথক অনুভূতি হইবে। ঐ রূপে ছালেক যতই উপরের দিকে উন্নীত হইবেন, তাহার অনুভূতিও পৃথক হইবে। এই অনুভূতির পূর্ণাংগতা বা পরিপূর্ণতা আসে হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদীর স্তরে। ছালেক ঐ স্তরেই জাত পাকের পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন ও সৃষ্টি
জগতের জন্য আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি হইয়া যান। কলেমা শরীফের দ্বিতীয়াংশ অর্থাৎ মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, ইহা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর রেছালতকে প্রমাণ করিতেছে। ইহা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জাগতিক অস্তিত্বের সহিত জড়িত। এই দ্বিতীয়াংশ শরীয়তকে পূর্ণ করে ও শরীয়তের পূণতা ও কামালাতের নিদর্শন। শরীয়তের আসল কথা তাই প্রতিষ্ঠা করে। কলেমার প্রথমাংশ শরীয়তের ছুরত, আর দ্বিতীয়াংশ কামালাতে বেলায়েতের পরে আসে এবং তাহা কামালাতে নবুয়ত হইতে শুরু ও অর্জিত হয়। এই রূপে কলেমা শরীফের উভয় অংশের হকিকতের জ্ঞান লাভকারীদের মধ্য হইতে আল্লাহতায়ালা যাহাকে পছন্দ করেন, তাহাকে সৃষ্টির সেবার জন্য হেদায়েতকারী হিসাবে নির্ধারিত করেন।
শরীয়তের হকিকত কামালাতে নবুয়তের মাকামের সহিত জড়িত। কামালাতে নবুয়তের মাকাম তয় করিবার পূর্বে কোনো ছালেকই শরীয়তের হকিকতের জ্ঞান লাভ করিতে পারে না; শরীয়তের হকিকতের রাজ্যে পূর্ণরূপে প্রবেশ করিতে পারে না।
কামালাতে নবুয়তের মাকামের ওলীগণ যখন আল্লাহর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন তখন তাহাদের উরুজ হয় জাত পাক পর্যন্ত; আর বেলায়েতে ছোগরার স্তরের ওলীগণের উরুজ হয় মাকামে জেল্লী পর্যন্ত। জেল্লীর স্তরে যাহা পাওয়া যায় তাহা শরীয়তের ছুরত ছাড়া আর কিছু নহে। যিনি জেল্লীর স্তরে থাকিয়া মানুষকে আল্লাহর দিকে হেদায়েত করেন, তাহার আহ্বান বা হেদায়েত পূর্ণাংগ হয় না। হেদায়েতের উদ্দেশ্য হইল মানুষকে সমস্ত সৃষ্টি ও নিজ হইতে আকর্ষণ সরাইয়া আল্লাহর দিকে রুজু করা। কিন্তু যাহার উরুজ জেল্লীর মাকাম পর্যন্ত, যিনি নিজেই জাতের পরিচয় অর্জন করিতে পারেন নাই; তিনি কি রূপে মানুষকে আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত পরিচয় করাইয়া দিবেন? ঐ রূপ সাধকতো জাতের সহিত পরিচিত হইতে নিজেই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু যে আরেফ জাতের সহিত পরিচয় শেষ করিয়াছেন, সেই কামেলের আহ্বান অবশ্যই পরিপূর্ণ হেদায়েতের আহ্বান হইবে।
হে জাকেরান ও আশেকান সকল! আল্লাহতায়ালা বলেন, তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহার পথে হেদায়েতকারী নির্ধারিত করেন। ইহা আল্লাহতায়ালার ফজল। "ঈমান বিল শহুদ" বা আল্লাহতায়ালাকে দর্শন দ্বারা প্রকৃত ঈমান হাছিল করার আকাংখা বা বাসনা খোদার বান্দা কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করিতে পারেন না, যাহা কামালাতে নবুয়তের ঊর্ধ্বে হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে লাভ হয়। তাই আল্লাহতায়ালার জাতের দর্শন তথা ঈমানের পূর্ণতা লাভের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহতায়ালার দয়া ও মহব্বতের উপর নির্ভর ও ভরসা রাখা উচিত। আল্লাহতায়ালার জাতের এই ঊর্ধ্ব জগতের পরিচয় হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব লাভ করিয়াছিলেন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে অনুসরণ করিয়া। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নেছবতের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করিয়াছেন আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর বর্তমান জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ হাদী হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসুফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। যদি তোমরা আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুরকে অনুসরণ করিতে পার, তাহার দয়া ও মহব্বত হাছিল করিতে পার, তাহা হইলে আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় তোমরাও লাভ করিতে সক্ষম হইবে-তিনিই তোমাদের পথ প্রদর্শন করাইয়া লইয়া যাইবেন। তাই তোমরা যাহারা আল্লাহতায়ালার উপর পূর্ণ ঈমান আনিতে চাও, আল্লাহতায়ালার জাতপাকের পরিচয় লাভ করিতে চাও-আমার দয়ালপীর কেবলাজান ছাহেবের পূর্ণ মহব্বত হাছিলের জন্য সদা সর্বদা চেষ্টা করিয়া যাও। আল্লাহতায়ালার রহমত ও দয়া হইতে নিরাশ হইতে নাই। আশা করা যায়, আল্লাহতায়ালার দয়া ও অনুগ্রহে তোমরাও জাত পাকের পরিচয় লাভে সক্ষম হইবে। আমীন!








