Logo

কলেমা শরীফের আলোকে বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৪ জুলাই, ২০২৬, ১৯:৩৩
কলেমা শরীফের আলোকে বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কলেমা শরীফের আলোকে বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদ বা ভিত্তি পাঁচটি রোকনের উপর প্রতিষ্ঠিত। ইহাদের মধ্যে সর্ব প্রথম স্তম্ভ হইল কলেমা। কলেমায়ে তাইয়্যেবা-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই এবং মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, "মান কালা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ফা দাখালাল জান্নাতা" অর্থাৎ যে ব্যক্তি একবার কলেমা পাঠ করিয়াছে, সে বেহেশতে প্রবেশ করিবে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, আল্লাহতায়ালা তাঁহার নিরানব্বইটি (৯৯) নামের রহমতের অংশগুলি, যাহা আখেরাতের জন্য আছে, এই ফকির এই কলেমা তৈয়বকে সেই ধন ভান্ডারের চাবি বলিয়া মনে করে।

কুফরীকে দূর করিবার জন্য এই কলেমা শরীফ সর্বশ্রেষ্ঠ সুপারিশকারী। যে ব্যক্তি এই কলেমা শরীফকে বিশ্বাস করে এবং মুখে উচ্চারণ করে এবং তাহার সহিত সে যদি শেরেকী ও কুফরীর ভিতর ডুবিয়াও থাকে তাহা হইলেও আশা আছে যে, এই কলেমা শরীফের দ্বারা সে একদিন মুক্তি পাইবে।" কলেমা শরীফের এই মাহাত্ম্য কেন? কেন ইহার গুরুত্ব এত বেশী?

কলেমা তৈয়বের দুইটি অংশ। প্রথম অংশটি-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বেলায়েতের সহিত জড়িত। আর ইহার দ্বিতীয় অংশ 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'-হযরত নবী করীম (সাঃ) এর নবুয়ত ও রেসালাতের প্রমাণকারী। শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাত-এই চার-এ মিলিয়া পূর্ণাংগ শরীয়ত। কলেমা তৈয়বের দুইটি অংশের ভিতরেই পূর্ণাংগ শরীয়ত বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান নিহিত। শরীয়তের দুইটি অবস্থা। একটি ছুরত, অপরটি হকিকত। মহান খোদাতায়ালা তাহার বান্দাদের এবাদতের নিমিত্ত রাসূলে করীম (সাঃ) মাধ্যমে এবং পবিত্র কুরআনের বিধানে যে সকল আদেশ নিষেধ দান করিয়াছেন, নাফসে আম্মারার বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও সেই আদেশ নিষেধের সাজে নিজেকে সজ্জিত করা, শরীয়তের ঘুরতের অন্তর্ভুক্ত। ছালেকের কালব প্রথমে দুনিয়ামুখী থাকে।

বিজ্ঞাপন

উর্ধ্বজগতের উপাদান হওয়া সত্ত্বেও পাপাচারে লিপ্ত থাকার কারণে কালবে মরিচা ধরে। সে যদি একটি মিথ্যা কথা বলে, তাহা হইলে তাহার কালবে একটি তিলক সদৃশ কাল দাগ পড়ে। এই ভাবে সে জীবনে যতগুলো মিথ্যা কথা বলে, তাহার কালবে ততগুলো কাল দাগ পড়ে। এমনি ভাবে কালব অস্বচ্ছ হয়। খোদাতালাশী ব্যক্তিকে সর্ব প্রথমে কালব পরিচ্ছন্ন করিবার চেষ্টা করিতে হয়। কালবের ভিতরে এক ভিন্ন দুইয়ের কোন স্থান নাই। মহান খোদাতায়ালা বলেন, "আমার নিদর্শন তোমাদের ভিতরেই আছে, তোমরা দেখ না কেন?" খোদাতায়ালার নিদর্শন দেখিতে হইলে, খোদা ভিন্ন সমস্তই ভুলিয়া যাইতে হইবে। দেলকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিতে হইবে। পরিষ্কার দেলে আল্লাহপাকের নূরের জেলাল প্রতিফলিত হয়। খোদাতালাশী ব্যক্তি প্রথমে খোদা ভিন্ন অন্য সকল কিছুই ভুলিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে। এই চেষ্টা থেকেই তরিকতের কার্য শুরু হয়। এক পর্যায়ে পীরে কামেলের নেক দৃষ্টির বরকতে মুরিদ বা খোদাতালাশী ব্যক্তি আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছুই ভুলিয়া যায়। ইহা বেলায়েতে ছোগরার স্তর। এখানে নূরের পতন এত অধিক হয় যে ছয় দিক বা দশ দিক হইতে নূরের তুফান প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। সেই নূরে মুরিদ নিজেকে এবং সমগ্র সৃষ্টি জগতকে নিমজ্জিত অবস্থায় দেখে। মুরিদ নূরের সাগরে নিমজ্জিত থাকে বিধায় দুনিয়ার দিকে, নিজের পোশাকের দিকে বা খাওয়া-দাওয়ার দিকেও তাহার আর কোন খেয়াল থাকে না। এইভাবে খোদাতায়ালার নূরের প্রতিবিম্বে মুরিদ বিলীন হয় এবং ফানার মাকাম হাছিল করে। এখানে আসিয়া মুরিদের ছুলুক সমাপ্ত হয়। তৎপর জজবার মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়।

ছুলুক হইল চেষ্টা, সাধনা ও পরিশ্রমের দ্বারা খোদাতায়ালার দিকে গমন করা এবং এমন এক পর্যায়ে উপস্থিত হওয়া যেখানে খোদা ভিন্ন সমস্ত কিছুকেই মুরীদ ভুলিয়া যায়; এমন কি নিজেকেও। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন শরীফে বলেন যে, 'আল্লাহ কোন ব্যক্তি বা জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি বা জাতি তাহার নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে।' মানুষকে কিছুটা স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে। মানুষের এই স্বাধীন ক্ষমতার শেষ বিন্দু বেলায়েতে ছোগরা। এই মাকামের ঊর্ধ্বে আর মানুষের কোন ক্ষমতা নাই। আল্লাহপাক নিজে তাহার পরিচয় দিতে চান। মুরিদ যখন চেষ্টা সাধনার দ্বারা বেলায়েতে ছোগরায় পৌছান এবং নিজেকে বিশ্বত হইয়া খোদাতায়ালাতে মগ্ন থাকেন; তখন আল্লাহপাক তাহাকে অন্য অবস্থায় জীবিত বা জ্ঞান সম্পন্ন করিয়া নিজের পরিচয় গ্রহণের যোগ্যতা দিতে থাকেন। তরিকতের শুরু হইতে মুরিদের ক্ষমতার শেষ প্রান্ত বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত সমস্ত অবস্থাকে ছুলুক' বলে এবং মুরিদের নিজ ক্ষমতার শেষ বিন্দুর পর আল্লাহ যখন তাহার চালক হন তখন হইতে জজবা এর কাজ আরম্ভ হয়। দুলুকের শেষ অবস্থায় মুরিদের দেলে কলেমার প্রথম অংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই। ইহা সে ভালভাবেই বুঝিয়া লয়। এই অবস্থাকে এসবাতের মাকাম বলা হয়। এই নাফি ও এসবাত যাহা ফানা ও বাকার মধ্যে সিদ্ধ হয়। মুরিদের যখন ফানা ও বাকা সিদ্ধ হয়, নাফি ও এসবাত হাছিল হয়, ছুলুক ও জজবার অবস্থা প্রাপ্ত হয় তখন সে বেলায়েতের অধিকারী হইয়া যায়। ইহা বেলায়েতে আউলিয়ার মাকাম। বেলায়েত অর্থ আল্লাহ ছাড়া সকলকে ভুলিয়া আল্লাহর অস্তিত্ব বুঝিবার ক্ষমতা এবং কামালাতে নবুয়তের অর্থ হইল আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য জানিয়া পরে সাধারণ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবানের জন্য আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব পাওয়া।

মুরিদ যখন বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত পৌছায় তখন তাহার নাফস সমস্ত কু-স্বভাব ত্যাগ করিয়া আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ বন্ধ করে এবং মোৎমাইন্নার স্তরে উপনীত হয়। নাফস এখানে শান্তিপ্রাপ্ত হয়। কলেমা তৈয়বের প্রথম অংশ-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই, বেলায়েতের অধিকারীগণ ইহা ভালভাবেই হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে। অন্ধকারে নিমজ্জিত মানব সমাজকে হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে আল্লাহপাক এই দুনিয়ার বুকে নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন। রাসূলদের নিকট আসমানী বিধান নাযিল করিয়াছেন। হযরত নবী করীম (সাঃ) সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল। আল্লাহপাক তাঁহার উপর পবিত্র আল কুরআন নাযিল করিয়াছেন। কলেমা শরীফের দ্বিতীয় অংশ তাঁহার এই কার্যের প্রমাণকারী। কলেমার এই অংশ শরীয়তকে পূর্ণ ও কামেলকারী। পবিত্র এই কলেমা শরীফ বেলায়েত ও নবুয়তের সমষ্টি। ইহা বেলায়েতকে প্রতিবিম্ব হইতে মুক্ত করে এবং নবুয়তের কামালাতকে উজ্জল করে। এই কলেমা শরীফের সাহায্য ব্যতীত ছালেকের উপরে অগ্রসর হইবার কোন উপায় নাই। এই কলেমা পাঠের ফজিলত ছাড়া আর অন্য কোন ফজিলত দ্বারা অদৃশ্য রাজ্যে অগ্রসর হওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

তরিকত ও হকিকত যখন বেলায়েতের মাকাম অনুসারে অর্জিত হয় যাহা আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী ও কাওছের অন্তর্গত, তখন তাহা কামালাতে নবুয়ত অর্জনের জন্য একটি শর্ত হিসাবে পরিগণিত হয়। শরীয়তের দুইটি দিক। একটি ছুরত, অপরটি হকিকত। শরীয়তের হকিকত কামালাতে নবুয়তের সহিত জড়িত। যতক্ষণ কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা প্রাপ্ত হওয়া না যাবে ততক্ষণ শরীয়তের হকিকত রাজ্যে প্রবেশ করা যাবে না। আবার যতক্ষণ বেলায়েতের মাকামগত তরিকত ও হকিকত অর্জিত না হইবে, ততক্ষণ কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় পৌঁছানো যাইবে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, অজু না থাকিলে যেমন নামাজ পড়া যায় না, তদ্রুপ বেলায়েতের মাকাম তয় না করিয়া কামালাতে নবুয়তের দায়েরার জ্ঞান অর্জন করা যায় না। অজুর উদ্দেশ্য নামাজ পড়া তদ্রুপ বেলায়েতের উদ্দেশ্য কামালাতে নবুয়ত তথা বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান আহরণ করা।

হাদীস শরীফে আছে,

رَجَعْنَا مِنْ الجِهَادِ الْأَصْغَرِ إِلَى الجِهَادِ الْأَكْبَرِ .

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- আমরা ছোট যুদ্ধ হইতে বড় যুদ্ধে যাইতেছি।

জেহাদে আকবর হইল নাফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তির সহিত যুদ্ধ করা। নাফসে আম্মারার বিরুদ্ধে যে জেহাদ তাহা এই আদামাত হইতে শুরু করিতে হয়। এই জেহাদ শেষ হয় বেলায়েতে ছোগরার মাকামে যেখানে নাফস মোৎমাইন্না প্রাপ্ত হয়। নাফস শান্ত হয়। তাহার কু-প্রবৃত্তিগুলো আর অবশিষ্ট থাকে না। এই নাফস আল্লাহর উপর রাজী, আল্লাহও তাহার উপর রাজী। কিন্তু কালেব বা মানব শরীর আগুন, পানি, মাটি, বাতাস -এই চার বিপরীত ধর্মী উপাদানে তৈরী। এই উপাদানগুলোর বিরুদ্ধভাব বেলায়েতের মাকামে দূর হয় না। এখানে নাফসের কু-স্বভাবগুলো শুধু দূর হয় কিন্তু শরীরের উপাদানগুলো পাক হয় না। মানুষের শরীরের আগুন নামক উপাদানের স্বভাব হইল অহংকার, গর্ব। যতক্ষণ পর্যন্ত এই আগুনের অংশ পবিত্র না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ অহংকার ও গর্ব পরিত্যাগ করিতে পারে না। মানব শরীরের আর একটি স্তর হইল মাটি। যতক্ষণ ইহা পবিত্র না হয়, ততক্ষণ মানুষের ভিতর সত্যিকারের নম্রতাভাব প্রকাশ পায় না। দেহের এই

চার উপাদান পরিপূর্ণভাবে পাক হয় কামালাতে নবুয়তের মাকামে আল্লাহপাকের দায়েমী তাজাল্লীতে। অবশ্য মাটি ছাড়া দেহের অন্যান্য উপাদান পবিত্র হয় কামালাতে নবুয়তের পূর্বের দায়েরা বেলায়েতে উলিয়াতে। মাটির স্তর পরাপুরি পাক হয় কামালাতে নবুয়তে। কামালাতে নবুয়তের মাকামে পৌছাইলে কালেবের (দেহের) ভিতরের বিরুদ্ধতা দূর হয়।

বিজ্ঞাপন

বেলায়েতের তিনটি অধ্যায়। যথাঃ বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে উলিয়া।

বেলায়েতে ছোগরা-

যাহা ওলীদের বেলায়েত। ইহা প্রতিবিম্বের জগত। এখানে বিভিন্ন ধরণের মনোমুগ্ধকর নূর বা জ্যোতি বর্তমান আছে। এই বেলায়েতের উপরে রহিয়াছে আসল বেলায়েত-যাহা নবী (আঃ) দের বেলায়েত। বেলায়েতের সাধারণ অর্থ হইল-আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছুই ভুলিয়া এক আল্লাহতে তন্ময় থাকা। ওলীদিগের বেলায়েত নূরময় জগত বা প্রতিবিম্বের জগত পর্যন্ত বর্তমান। এই নূরময় জগত পর্যন্ত তাহারা উরুজ করিয়া এখানেই তাহারা সাধনা শেষ করিয়া দেয়। কিন্তু নবী (আঃ) গণের বেলায়েত হইল আসল বেলায়েত যাহা আকরাবিয়াত হইতে শুরু করিয়া মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী ও মহব্বতে সালেস বা কাওছে যাইয়া শেষ হয়। নবীদের অনুসরণ ব্যতীত এই বেলায়েত কেহ অর্জন করিতে পারে না। বেলায়েতে ছোগরা প্রাপ্ত সাধক নবীদের সাহায্য সহযোগিতায় বেলায়েতে কোবরায় উন্নীত হয়। বেলায়েতের আসল উদ্দেশ্য খোদাতায়ালাতে নিমগ্ন থাকা, খোদাতায়ালার উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করা। ইহা বেলায়েতে কোবরায় ছালেকের সিদ্ধ হয়।

বিজ্ঞাপন

বেলায়েত নবুয়তের তুলনায় সংকীর্ণ। এক সাগর পানির কাছে এক ফোটা পানির মত। বেলায়েতের দরজায় ছালেক খোদাতায়ালার প্রেমসুধা পানে সদাব্যস্ত। শুধু নিজেকে লইয়াই ব্যস্ত। এখানে অন্যকে আল্লাহতায়ালার দিকে আহবান করিবার যোগ্যতা ছালেকের থাকে না।

কিন্তু আল্লাহপাক তাহার পরিচয় দানের জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করিলেন, তৎপর নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে শরীয়ত প্রদান করিলেন। সুতরাং শরীয়ত দানের উদ্দেশ্যই হইল মানুষ যাহাতে তাঁহার পরিচয় লাভে ধন্য হয়। বেলায়েতের মাকামে শরীয়তের এই উদ্দেশ্য সম্যকভাবে সিদ্ধ হয় না। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় কলেমার দ্বিতীয় অংশের কামালাত অর্জনের মাধ্যমে। এই অংশের কামালাত অর্জিত হইলে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকিবার যোগ্যতা ছালেক প্রাপ্ত হয়। কামালাতে নবুয়তের মাকাম হইতে শরীয়তের হকিকত আরম্ভ হয়। এই কামালাত অর্জন করিবার পর অপরকে আল্লাহর দিকে আহবান করিবার পূর্ণ যোগ্যতা আসে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যখনই বেলায়েতের মাকামে খোদাতায়ালার নূরে নিমজ্জিত হইয়া প্রেমসুধা পান করিতেন এবং বলিতেন "হে আল্লাহ! শুধু তুমি, আমিও না এবং তুমি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে তাহা আমি তোমার জন্যই পরিত্যাগ করিলাম।" তখনই আল্লাহপাক তাহাকে কামালাতে নবুয়তের দায়িত্ব স্মরণ করাইয়া দুনিয়ার পাঠাইয়া দিয়া বলিতেন,

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى.

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "(হে নবী!) আপনি বলুন, আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, তবে আমার উপর ওহী হয়।"

নবুয়ত শেষ হইয়া গিয়াছে। আর কোন নবী আসিবেন না। কিন্তু আল্লাহপাক নবুয়তের কামালাত এখনও জগতে জারী রাখিয়াছেন। নবী করীম (সাঃ) এর সুন্নতের অনুসরণের মাধ্যমে কিছু কিছু কামেল ব্যক্তি তাহা অর্জন করিয়া থাকেন। এইরূপ কামেল ব্যক্তি খোদাপ্রাপ্তির শেষ দরজায় উন্নীত হইয়া তথা হইতে খেলাফতির দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়া জগতের মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকিবার জন্য দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। কামালাতে নবুয়তের পোষাকে সজ্জিত আরেফ সাধারণ ওলীদিগের মর্যাদা হইতে শত গুণে শ্রেষ্ঠ। কামালাতে নবুয়তের এই শ্রেষ্ঠত্ব গুপ্ত রহিয়াছে কলেমা তৈয়বের দ্বিতীয় অংশের সহিত "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর" মধ্যে।

বেলায়েতের অধিকারীগণ উরুজের সময় বেলায়েতে ছোগরা বা মাকামে জেল্লী পর্যন্ত যাইয়া তথায় খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের নূরের প্রতিবিম্বে ফানা প্রাপ্ত হন। আর কামালাতে নবুয়তের মর্যাদাপ্রাপ্ত ছালেক যখন আল্লাহর দিকে রুজু হন তখন তাহাদের উরুজ হকিকতে এলাহিয়ার সর্বশেষ দায়েরা মা'বুদিয়াতে ছেরফায় এবং হকিকতে আম্বিয়ার সর্বশেষ মাকাম হোব্বে ছেরফা পর্যন্ত পৌঁছায়। আবার বেলায়েতের অধিকারীগণ যখন অবতরণ করেন অর্থাৎ দনিয়ায় ফিরিয়া আসেন, তখন তাহাদের জাহের মখলুকের দিকে থাকে কিন্তু বাতেন আল্লাহর দিকে থাকে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বা তাহারা দুনিয়ায় আসিয়া জাহের ও বাতেন উভয় অবস্থা যোগে অবস্থান করিতে পারেন না। খেলাফতীর স্বীকৃতি না প্রাপ্ত হওয়ায় তাহার মন সর্বদা ঊর্ধ্বগামী থাকে। আর কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত ওলী মানুষের হেদায়েতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়া দুনিয়ায় আসেন। তাই তাহার জাহের ও বাতেন এই জগতেই নিবদ্ধ থাকে এবং যাহাদিগকে আহবান করিতেছেন তাহাদের ভিতরের অবস্থার দিকেও নজর রাখেন আহবানের ফলাফল দর্শনের জন্য। তিনি সর্বদাই অন্তর দৃষ্টির সাহায্যে মুরীদের ভিতরের অবস্থা দেখিয়া সুবিধা অসুবিধা অনুসারে ফয়েজ দিতে থাকেন। তাই তাহাদের এই আহবান এত নিখুঁত।

আমার পীর কেবলাজান কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা প্রাপ্ত উচু স্তরের একজন আকাবের ওলী ছিলেন। তাহার তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে আজও মানুষ খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান লাভ করিতেছে। বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক নদীর স্রোতের মত আগমন করিতেছে তাহারই তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বদৌলতে। আল্লাহ রাসূলের মহব্বতে তাহারা অঝর নয়নে কাঁদিতেছে। খোদাপ্রাপ্তির এই পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। দুঃখ-জ্বালা, যন্ত্রণা এই পথের পথিকের নিত্য সংগী। কঠিন মছিবত দিয়া আল্লাহপাক এই পথের পথিকদের স্বীয় পরিচয় গ্রহণের যোগ্য করিয়া লন। বিপদ-আপদ, বালা-মছিবতে, ধৈর্য ধারণ করা একান্ত কর্তব্য। খোদাপ্রাপ্তির পথে ধৈর্য একান্ত আবশ্যক। যদিও বিপদে ধৈর্য ধারণ করা বেশ কঠিন। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেন,

"ধৈর্য তা বিষের মত মনে হয়

বিজ্ঞাপন

পরে কিন্তু এর ফল বেশ মধুময়,

রাজার চেয়ে সুখী কত দীন-দুঃখী জন

সন্তোষ সুধায় ভরা তাহাদেরই মন।"

বিজ্ঞাপন

ধৈর্যের পুরস্কার বড় মধুর। তোমাদের উপর আগত বিপদ-আপদে যদি ধৈর্য ধারণ করিতে পার, তাহা হইলে আল্লাহপাক তোমাদের এই উচ্চ নেয়ামত দয়া করিয়া দান করিতে পারেন। হযরত শায়খ শিবলী (রঃ) ছাহেব নেহাওয়ান্দের আমির ছিলেন। যশ-খ্যাতি, অর্থ-সম্পদ কোন কিছুরই তাহার অভাব ছিল না। কিন্তু খোদাপ্রাপ্তির বাসনায় তিনি উচ্চ পদের এই চাকুরী ছাড়িয়া দিয়া পীরে কামেলের সন্ধানে বাহির হইলেন। বহু সন্ধানের পরে তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ সাধক, ওলীয়ে কামেল হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেবের কদমে হাজির হইয়া বলিলেন, "হযরত! আপনার নিকট যে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান আছে, তাহা হয় এমনিই আমাকে দান করুন অথবা মূল্য গ্রহণপূর্বক বিক্রয় করুন।" হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "আমি এই ধন বিক্রয় করিলেও তুমি তাহা ক্রয় করিতে ব্যর্থ হইবে কারণ ইহার মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা তোমার নাই। আর যদি বিনা মূল্যে দান করি, তবে তুমি ইহার কদর বুঝিতে পারিবে না। বিনা মূল্যে প্রাপ্ত রত্নের প্রতি অমর্যাদা দেখাইয়া বরবাদ করিয়া ফেলিবে। তবে হ্যাঁ, সাহসী তরিকত পন্থীদের মত মস্তক দ্বারা কদম বানাও এবং নিজেকে এই দরিয়ায় নিক্ষেপ কর যাহাতে ধৈর্য ও প্রতীক্ষার পর এই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান লাভ করিতে পার।" হযরত শিবলী (রঃ) ছাহেব আরজ করিলেন, "হযরত! আমাকে বলিয়া দিন, আমি এখন কি করিব?" হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "এক বছর পর্যন্ত মূর্তি বিক্রয় করিতে থাক।" তিনি পূর্ণ এক বছর কাল পীরের আদেশ পালন করিয়া বৎসরান্তে আবার পীরের কদমে হাজির হইলে হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব তাহাকে বলিলেন, "যাও, এক বছর পর্যন্ত দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিতে থাক।" তিনি তাহাই করিলেন। পূর্ণ এক বছর ভরিয়া বাগদাদের বাজারে বাজারে ঘুরিয়া ভিক্ষা করিলেন। কিন্তু কেহই তাহাকে ভিক্ষা দিল না। বৎসর শেষে তিনি তাহার পীরের নিকট আসিয়া সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করিলেন। পীর ছাহেব শিবলীকে বলিলেন যে, মানুষের নিকট তোমার কোনই মূল্য এবং মর্যাদা নাই। সুতরাং কখনও এই সবের মধ্যে মন লাগাইও না। অতঃপর বলিলেন, যেহেতু তুমি তোমার জীবনের একটা অংশ নেহাওয়ান্দের গভর্নরী করিয়াছ সুতরাং তথায় যাইয়া সমস্ত লোকের নিকট মাফ চাও। পীরের নির্দেশ পাইয়া হযরত শিবলী (রঃ) ছাহেব নেহাওয়ান্দে যাইয়া সমস্ত শহরে ঘুরিয়া প্রত্যেকটি ঘরে গমনপূর্বক আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সকলের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। কেবলমাত্র একজন লোক শহরে উপস্থিত না থাকায় তাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতে পারিলেন না। তাহার পরিবর্তে তিনি এক লক্ষ দেরহাম খয়রাত করিলেন। ইহাতেওমতাহার তপ্তি হইল না। তিনি সর্বদা পেরেশান রহিলেন। এই পেরেশানীর (রঃ) বলিলেন, "এখনও তোমার মধ্যে কিছু পরিমান মান মর্যাদার মধ্যে চারি বৎসর কাল অতীত হইয়া গেলে হযরত জুনাইদ বোগদাদী অভিলাস বাকী বহিয়াছে। যাও, আবার এক বৎসর কাল ভিক্ষা কর "। অতঃপর পীরের নির্দেশ মোতাবেক তিনি এক বৎসর পর্যন্ত ভিক্ষা করিতে লাগিলেন। সারাদিন ভিক্ষা করিয়া যাহা কিছু পাইতেন তাহা আপন পীর হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) এর নিকট লইয়া যাইতেন। তাহার পীর তাহা দরবেশদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিতেন এবং তাহাকে ভুখা রাখিতেন। এইরূপে এক বৎসর পূর্ণ হইয়া গেলে হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, এখন তোমাকে আমি আমার ছহব্বতে রাখিতে পারি; কিন্তু এই শর্ত যে, দরবেশদের খেদমত করিতে হইবে। অতঃপর তিনি হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেবের ছহব্বতে থাকিয়া পূর্ণ এক বছর কাল দরবেশদের খেদমত করিলেন। একদা মারেফাতের সম্রাট হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব শিবলীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে আবুবকর শিবলী! এখন তোমার মূল্য তোমার নিকট কত খানি?” হযরত শিবলী (রঃ) অতীব বিনয়ের সহিত বলিলেন, "হযরত! আমি নিজেকে দুনিয়ার সমস্ত মানবের চেয়ে অধম বলিয়া মনে করি।" হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) যারপরনাই খুশী হইলেন এবং তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রয়োগে হযরত শিবলীকে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিলেন।

তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যে অহংবোধ বা আমিত্ববোধ আছে তাহা ঝারিয়া ফেল। বিন্দু পরিমান অহংকার থাকিলে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারিবে না। তোমাদের শরীরে যে আগুন নামক উপাদান রহিয়াছে-এই উপাদান বা লতিফা যতক্ষণ না পাক সাফ হইবে ততক্ষণ এই আমিত্ববোধ বা অহমিকা দূর হইবে না। উক্ত লতিফা পবিত্র হয় বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে। আগুনের স্বভাবই অহংকার বা দম্ভ করা। একা একা চেষ্টা করিয়া কস্মিনকালেও আগুনের এই স্বভাব দূর করিতে পারিবে না। পীরের কদমে কঠিন খেদমত করিতে থাক। তোমার খেদমত দয়া করিয়া যদি তিনি কবুল করেন, তাহা হইলে তাঁহার তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রয়োগে তোমার ভিতরের যাবতীয় কু-স্বভাব দূর হইবে। তোমার আমিত্ববোধ, গর্ববোধ দূর হইবে। পথের একটা চামড়া উঠা কুকুরের চেয়েও নিজেকে তুমি নিকৃষ্ট মনে করিতে পারিবে। তখনই আল্লাহপাকের রহমতের বৃষ্টি তোমার উপর অবিরাম পড়িতে থাকিবে।

খোদাপ্রাপ্তির এই পথ অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন। নেহাওয়ান্দের গভর্নর বা আমির হইয়াও, অগাধ ধন সম্পত্তির মালিক থাকিয়াও, খোদাপ্রাপ্তির এই রাস্তায় আসিয়া এক পর্যায়ে হযরত শিবলী (রঃ) সব কিছু হারাইয়া পীরের নির্দেশে দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া ভিক্ষা করিয়াছেন বছরের রের পর বছর। এই কঠিন খেদমতের এক পর্যায়ে তাহার পীর হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব তাহার উপর সন্তুষ্ট হন এবং তাওয়াজ্জুহ প্রদান করিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করিয়া দেন।

পীরে কামেলকে রাজী বা সন্তুষ্ট করা সহজ কথা নয়। তবে একবার রাজী করিতে পারিলে আল্লাহপাকও ঐ মুরীদের উপরে খুশী বা রাজী হইয়া যান। তাই মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলেন,

"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল

হাম খোদা দর জাতাস আমাদ হাম রসূল।"

অর্থাৎ যেই মাত্র তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসেবে, রাসূল তোমাকে উম্মত হিসেবে কবুল করিলেন। আল্লাহ এবং রাসূলের স্বীকৃতি তুমি তখনই পাইলে, যখন আপন পীরের তরফ হইতে স্বীকৃতি পাইলে।

খোদাপ্রাপ্তির এই পথ অতিশয় দুর্গম। এই পথে আপন পীরকে রাজী বা সন্তুষ্ট করাই প্রধান শর্ত। তাই মহাকবি হাফেজ বলেন, "আমার পীরকে তোমরা যদি বাধ্য করিয়া দিতে পার তবে সমরখন্দ এবং বোখারার সিংহাসন আমি তোমাদের বিলাইয়া দিব।" এই পথে সাফল্য সম্পূর্ণ পীরের দয়ার উপর নির্ভরশীল। একদা আমার পীর, জামানার নূর, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব আমাকে নিকটে আহবানপূর্বক বলিলেন, "বাবা, তুমি যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে ত্যাগী হও।" বিদায় লইয়া গৃহ অভিমুখে রওয়ানা হইলাম। পথিমধ্যে পীর কেবলাজানের সেই উপদেশপূর্ণ মুখ নিঃসৃত পবিত্র বাণী আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ে বারংবার বাজিতে লাগিল, "তুমি যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে ত্যাগী হও।" গৃহে গমনপূর্বক আমার যে সম্পদ ছিল, জমি-জমা ছিল; সবই বিক্রয় করিয়া প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ পীর কেবলাজানের কদমে নজরানা সরূপ পেশ করিলাম। পীর কেবলাজান দয়া করিয়া গ্রহণ করিয়া আমাকে শুধু একটি কথাই বলিলেন, "বাবা, পীরকে যাহা কিছু নজরানা দেওয়া হয়, মহান রাব্বুল আ'লামীনের নিকট তাহা গচ্ছিত থাকে।"

সমস্তই পীরের কদমে দেওয়ার পরে আমি চরম দরিদ্রতার শিকার হইলাম। এমনই অবস্থার সম্মুখীন হইলাম যে একটি সন্ধ্যার খাবারও আমার ঘরে থাকিত না। এরই মধ্যে পীর কেবলাজান আমাকে আবার বলিলেন, "বাবা, আট দিন করিয়া উপবাস থাক। তোমাকে দেখিয়া লোকে হাসিবে। কাহাকেও কিছু বলিতে পারিবে না। কাহারও নিকট হাত পাতিতে পারিবে না।" পীরের নির্দেশ শিরোধার্য মনে করিয়া দৃঢ় মনোবল ও অসীম সাহসিকতার সহিত হুকুম পালন করিতে লাগিলাম। কত নিশি অনাহারে রাস্তা ঘাটে পড়িয়া থাকিতে হইয়াছে তাহার কোন ইয়ত্ত্বা নাই। সেই দুঃখ আর মুছিবতে। কথা স্মরণ হইলে আজও শরীর শিহরিয়া উঠে। একবার পীর কেবলাজান হুকুম দিলেন, "তুমি কোলকাতায় যাও।" কিন্তু তিনি কেন আমাকে কোলকাতায় যাওয়ার হুকুম দিলেন, তাহা তখনও আমি বুঝি নাই। পীরের হুকুম, তাই কোলকাতায় গেলাম। টাকা পয়সা ছিল না। তাই হাটিয়া হাটিয়া কোলকাতা শহর ঘুরিয়াছি। আসলে এই দেশে, এই ফরিদপুরে আসিবার মূল উৎসই ছিল কোলকাতায়। কোলকাতাস্থিত ৬নং হায়াত খান লেনে প্রফেসর সানাউল্লাহ সাহেবের বাসায় আমি অবস্থান করিতাম। সেই প্রফেসর সাহেবের অতি প্রিয় এক বন্ধু জনাব মহসীন উদ্দিন খান সাহেবের সাথে আমার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী হয়। জনাব মহসীন উদ্দিন খান সাহেবের বাড়ী ছিল ফরিদপুরে এই আটরশি গ্রামে। সেই খান সাহেবই প্রথমে আমাকে ফরিদপুরে তাহার বাড়ীতে লইয়া আসেন। পরবর্তীতে পীর কেবলাজানের নির্দেশে মহসীন উদ্দিন খান সাহেবের বড় ভাইয়ের কন্যাকে বিবাহ করি। দীর্ঘ বার (১২) বৎসর পর্যন্ত তোমাদের সেই আম্মাজান আমার খেদমত করিয়া পরলোকগমন করে। এই দিকে হযরত পীর কেবলাজানের বাতেনী নির্দেশে প্রথমা স্ত্রীর জীবদ্দশাতেই জনাব মহসীন উদ্দিন খান সাহেবের অন্য এক ভাইয়ের মেয়েকে বিবাহ করিয়াছিলাম। তোমাদের সেই ছোট আম্মাজান ত্রিশ বৎসর খেদমত করিয়া দুনিয়া ছাড়িয়া দারুল বাকায় চলিয়া গেল। এই ভাবে জীবনের আজ শেষ প্রান্তে আসিয়াছি। তথাপিও খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারিয়াছি বলিয়া আমার মনে হয় না। খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব লাভ করিতে পারিয়াছি বলিয়া আমার মন সাক্ষ্য দেয় না। তবে আমার দুঃখ কষ্টের চরমাবস্তা দেখিয়া পীর কেবলাজান আমাকে বলিয়াছিলেন, "তোমার দাদাপীর আমাকে যেমন তাহার কদমের নীচে জায়গা দিয়াছিলেন, আমিও তেমনি তোমাকে আমার কদমের নীচে রাখিয়া দিলাম।" সেই অবধি পীর কেবলাজানের কদমই আমার ভরসা। পীর কেবলাজানের কদম বিনা, তাহার দয়া বিনা আমার আর কোন সম্বল নাই। তিনি একবার আমাকে বলিলেন, "বাবা, দুনিয়ার উপর বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবত নামিয়া আসিবে। তুমি ভয় করিও না।" পীর কেবলাজানের সেই অভয় বাণীই আমার সান্তনা। কেবলাজানের নেক দৃষ্টির হেফাজতে আমি আছি। এই বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে প্রতি দিন হাজার হাজার লোক আসে। কিন্তু খাবার দাবারের কোন অভাব নাই। কোন তরি-তরকারী কিনিবার প্রয়োজন হয় না। আল্লাহপাক নিজেই চালান। আল্লাহুছ ছামাদ। আল্লাহর কোন অভাব নাই। পীর কেবলাজান যেই দিন আমাকে তাহার কদমের নীচে জায়গা দিলেন সেই দিন হইতে আমার মনে হইত যেন সসাগরাধরিত্রী আমার হাতের মুঠোয়। আমি যেখানেই যাইতাম সেখানেই লোকজন আমাকে সমাদর করিত। কিন্তু কেন, তাহা বুঝিতাম না। তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে খাজাবাবার মহব্বত দেলে পয়দা কর। সেই মহব্বতের যষ্টি তোমাদেরকে হযরত মুসা (আঃ) এর যষ্টির মত হেফাজত করিবে। আল্লাহ তোমাদিগকে রক্ষা করিবেন।

কাজেই তোমরা যদি কবুলিয়াতের দরজায় পৌঁছাইয়া তৎপর খোদাতায়ালার দীন প্রচার করিতে চাও, তাহা হইলে বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত-এই দুই মাকাম তয় করিয়া আস। একদা আমার পীর কেবলাজান আমাকে বলিলেন, "বাবা, আনা-ফানার মোকাম ৭তয় করিয়া তৎপর হেদায়েতের জন্য প্রস্তুত হও। চারা কলা গাছের বুক ফাড়িয়া যদি কলার ছড়ি বাহির হয়, তবে সেই কলা পোক্ত হয় না; ছোপও নষ্ট হইয়া যায়।" কামালাতে নবুয়তের মাকাম তয় না করিয়া হেদায়েত করিতে গেলে তোমাদের কথার কোন ফয়েজ থাকিবে না। আর তোমাদের কথায় যদি ফয়েজ না থাকে, তবে যাহাদের উদ্দেশ্যে তোমরা আল্লাহ রাসূলের বাণী প্রচার করিবে, তাহাদের দেল পর্যন্ত তোমাদের কথা পৌঁছাইবে না।

খোদা প্রাপ্তির এই দুঃখের সমুদ্র যদি তোমরা পাড়ি দিতে চাও, তবে পীরের কদমকে শক্ত করিয়া ধরিয়া কঠিন বিপদ-আপদ, মুছিবতে নির্ভয়ে তরিকতের দুর্জেয় রাস্তা অতিক্রম করিতে চেষ্টা কর। এই দুর্গম পথ যাহারা অতিক্রম করিয়াছিলেন, তাহারা অতিশয় কঠোর খেদমত করিয়া: বহু দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করিয়া, ত্যাগ-তিতিক্ষার ভিতর

দিয়া এই দুর্গম পথ অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইয়াছিলেন। তাই রেজামন্দির এই কঠিন পথ পীরের কদম ধরিয়া চলিতে থাক। শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। নাফসে আম্মারা তোমাদের দেহাভ্যন্তরে শয়তানের পক্ষ হইতে এক সিপাহশালার। তাই মরমি কবি ও দার্শনিক হযরত রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন, "নাফসে আম্মারা তোমাদের দেহে এক ফেরাউন।" এই ফেরাউনকে যদি পরাস্ত করিতে না পার তবে সে নিজে খোদায়ী দাবি করিয়া তোমাকে ধ্বংস কূপে নিক্ষেপ করিবে। তোমার জীবন বরবাদ হইবে।” আমি প্রার্থনা করি, দয়াময় খোদাতায়ালা তোমাদিগকে খোদা প্রাপ্তির এই দুর্জেয় পথ অতিক্রম করিবার শক্তি প্রদান করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD