Logo

মুরীদ আল্লাহপাকের সিফাত বিশিষ্ট জাতের সহিত পরিচয় লাভ করে

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২০ জুলাই, ২০২৬, ১৮:৫০
মুরীদ আল্লাহপাকের সিফাত বিশিষ্ট জাতের সহিত পরিচয় লাভ করে
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বেলায়েতে উলিয়া, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত, মাবুদিয়াতে ছেরফা, হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুছরী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে ছেরফা ইত্যাদি মাকাম সমূহে ছুলুক-ছায়ের ও ঐ সকল মাকামে সম্ভাব্য আত্মিক অভিজ্ঞতা ও হাল সম্পর্কিত আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

দায়েরায়ে বেলায়েতে উলিয়াঃ-

বেলায়েতে উলিয়া বেলায়েতসমূহের মধ্যে শেষ দায়েরা। ইহা ফেরেশতাগণের খাস বেলায়েত। এই দায়েরাতে আসিয়া এমোল বাতেনের ছায়ের সম্পন্ন করিতে হয়। এখানে আনফাস সিদ্ধ হয়। বেলায়েতে কোবরায় থাকাকালীন মুরীদ তাহার এমোজ্জাহেরের ছায়ের শেষ করে। এমোজ্জাহেরের ছায়েরে আল্লাহপাকের সিফাতসমূহের সহিত ছালেক পরিচিত হয়। এসমোল বাতেনের ছায়ের দ্বারা মুরীদ আল্লাহপাকের সিফাত বিশিষ্ট জাতের সহিত পরিচয় লাভ করে। এই দায়েরার ফয়েজ পড়িবার স্থান আলমে খালকের তিন লতিফা-আগুন, পানি ও বাতাস। এইভাবে এই দায়েরাতে আসিয়া ছালেকের ঐ তিন লতিফা খোদাতায়ালার 'এসমোল বাতেন' জাতের ফানা ও বাকা সিদ্ধ হইয়া পবিত্রতা লাভকরে। এই দায়েরার নূর বেরংগী। বেলায়েতে কোবরার দায়েরাতে যে ছায়েরে এমোজ্জাহের সম্পন্ন হয়; তাহাতে সিফাতী নূর পাওয়া যায়। এসমোল বাতেনের ছায়েরে ফয়েজান যদিও আসমা ও সিফাত অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের পর্দা হইতেই পড়ে-তাহাতে আল্লাহপাকের জাতের ফয়েজ পাওয়া যায়। এমোজ্জাহের হাড্ডির তুল্য আর এস্মোল ব্রাতেন হাড্ডির ভিতরের মজ্জা তুল্য।

বেলায়েতে কোবরায় যে এমোজ্জাহের সম্পন্ন হয়, উহা সিফাতী ও বেরংগী। আর যে ফয়েজান বেলায়েতে ছোগরার মধ্যে পাওয়া যায়, তাহা কোন কোন স্থানে রংগী ও কোন কোন স্থানে বেরংগী বোধ হয়। তাই ঐ ফয়েজান কিছুটা স্কুল বলিয়া মনে হয়। আর এস্মোল বাতেনের

বিজ্ঞাপন

ফয়েজ-যাহা এই বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরায় পাওয়া যায়-তাহার সহিত আল্লাহপাকের জাত মিশ্রিত থাকে। এই জন্য এই দায়েরার ফয়েজ অতি আনন্দদায়ক ও পবিত্র। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়ত করিবে- "এস্মোল বাতেনের ফয়েজ বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা হইতে আমার দেহের আগুন, পানি ও বায়ু- এই তিন লতিফায় পড়িতেছে।" তরীকতের পীরানে পীরগণ বর্ণনা করিয়াছেন, বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা হইতে যে নূর পতন হয় তাহা আলমে খালকের চারি লতিফা-অর্থাৎ আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি-সকলের উপরেই পড়ে। তবে মাটির স্তর আগুন, বাতাস ও পানির স্তরের নীচে হওয়ার কারণে, ঐ নূর মাটির স্তরে আসিয়া যৎসামান্য পৌঁছায়। তাই খাক লতিফা বা মাটি পবিত্র হইবার আগেই আব, আতস, বাদ অর্থাৎ আগুন, পানি ও বাতাস-এই তিন লতিফা পবিত্র হইয়া যায়। মাটি পবিত্র হয় পরবর্তী দায়েরা অর্থাৎ কামালাতে নবুয়তে যাইয়া। ছালেক উলিয়া দায়েরাতে মুরাকাবার মাধ্যমে ফয়েজ লইবার সময়ে অনুভব করিতে পারে যে, তাহার সর্ব শরীরের এই তিন লতিফায় ফয়েজের নূর পড়িতেছে।

এই দায়েরাতে থাকা কালীন ছালেক কখনও কখনও ফেরেশতাদের পাখীর রূপে দেখিতে পায়।

বেলায়েতের তিন দায়েরা সমাপ্ত হইলে মুরীদ কামালাতের দায়েরাসমূহের দিকে ছায়েরের জন্য অগ্রসর হইবে। কামালাতের তিনটি দায়েরা আছে। যথাঃ

বিজ্ঞাপন

  • দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়ত,

  • দায়েরায়ে কামালাতে রেসালত,

  • দায়েরায়ে কামালতে উলুল আজম।

  • বিজ্ঞাপন

    উল্লিখিত দায়েরাত্রয় আল্লাহতায়ালার "দায়েমী-তাজাল্লীর" তিনটি অংশ। "দায়েমী তাজাল্লী" অর্থ যে তাজাল্লী অনবরত আসিতে থাকে।

    দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়তঃ-

    কামালাতের প্রথম দায়েরা হইল দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়ত। এই দায়েরাতে বাতেন এতই প্রশস্ত হয় যে, পূর্ববর্তী দায়েরা বা বেলায়েতসমূহে প্রকাশিত প্রশস্ততাকে ইহার তুলনায় সামান্য মনে হইবে। এই দায়েরায় ফয়েজান আসিয়া ছালেকের শরীরের মাটি বা "খাক" লতিফাকে পবিত্র করে। দায়েরায়ে উলিয়াতে ছালেকের আলমে খালকের অন্য তিন লতিফা অর্থাৎ আগুন, পানি ও বাতাস পবিত্রতা লাভ করে। এই দায়েরায় আসিয়া "খাক" লতিফা পবিত্র হওয়ার কারণে ছালেকের সব লতিফা পবিত্রতা অর্জন করে। তবে এই লতিফার ফয়েজান ছালেকের সর্ব শরীরের পড়ে। আগুন, পানি ও বাতাসের স্তর আগেই পবিত্র হইবার কারণে ফয়েজানের কোন প্রতিরোধক বা প্রতিবন্ধক থাকে না। তাই এই মাকামের ফয়েজান সরাসরি "খাক্" লতিফায় অর্থাৎ ছালেকের শরীরের মাটির অংশে পড়ে। সৃষ্টি জগতের মধ্যে আল্লাহপাক মাটির দেহধারী মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করিয়াছেন। নবী করীম (সাঃ) ও সকল নবী (আঃ) গণ মাটির দেহধারী। সমস্ত ওজুদ বা শরীর পবিত্র না হইলে কোন মানুষ নবুয়তের বা নবী হইবার যোগ্যতা লাভ করে না। এই মাকামে আসিয়াই সর্ব শরীর বা ওজুদের প্রতি উপাদান যথা আব, আতশ, খাক, বাদ বা আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস পবিত্রতা লাভ করে। তাই এই মাকামে আসিয়া ছালেক কামালতে নবুয়তের মর্যাদা আল্লাহপাকের তরফ হইতে নাত করে। তবে এই মাকামের ফয়েজান অতি সূক্ষ্ম হইবার কারণে ছালেক অনেক সময় অনুভব করিতে পারে না যে তাহার উপর ফয়েজান ওয়ারেদ হইতেছে। তাই ছালেক নিজেকে আল্লাহপাকের নারেত লাভ করিবার অযোগ্য মনে করিয়া নিরাশ হইয়া পড়ে। আসলে ছালেক তখন বাস্তব অবস্থা বুঝিতে পারে না। সূর্যের নিকটবর্তী হইলে চোখে যেরূপ ধাঁ ধাঁ লাগে, কিছুই দেখা যায় না; তেমনি খোদাতায়ালার অতি নিকট হইতেও সেই রূপ বোধ হয়। আল্লাহতায়ালার জাতি ফয়েজ অতি সূক্ষ্ম বিধায় ছালেক তাহার উপলব্ধির অভাবের কারণে বুঝিতে পারে না। তবে ছালেক যখন এই মাকামের ফয়েজ গ্রহণ করিতে শিখিবে ও অভ্যস্থ হইবে, নিজেকে "ফাকানা কাবা কাওছাইনে আও আদনা" এই মাকামে দেখিতে পাইবে এবং খোদাদর্শন বা দীদার বিনা পর্দায় সিদ্ধ হইবে।

    বিজ্ঞাপন

    হযরত নবী করীম (সাঃ) শরীয়ত সম্বন্ধে যে সব আদেশ-নিষেধ দান করিয়াছেন, যেমন, কেন আমরা নামাজ পড়ি, কেন রুকুতে যাই ও রুকুর পর সেজদাতে যাই, এই মাকামে আসিলে ছালেক তাহার মর্ম নিজ দেহের মধ্যে বা ওজুদের ভিতর উপলব্ধি করিবে। উহা প্রমাণ করিবার জন্য তখন আর কোন দলিল দরকার হইবে না। এই মাকামের

    মুরাকাবার নিয়ত হইল-"তাজাল্লীয়াতে জাতি দায়েমীর ফয়েজ কামালাতে নবুয়তের দায়েরা দিয়া আমার শরীরস্ত মাটির উপর পড়িতেছে এবং পাক হইতেছে। এই মাকাম পর্যন্ত মানবদেহস্থিত দশ লতিফা পৃথক পৃথকভাবে ফয়েয গ্রহণ করতঃ পরিপূর্ণভাবে পবিত্রতা লাভ করে। এখান থেকে ওজুদ মাওহুব লাহুর সাহায্যে ফয়েযান ১০ লতিফা বিশিষ্ট দেহ হায়াতে ওহাদানীতে পতিত হইবে। হায়াতে ওহাদানী হইল দশ লতিফা বিশিষ্ট শরীর। ফয়েজ ওয়ারেদ হইবার সময়ে ছালেকের হায়াতে ওহাদানী অর্থাৎ ১০ লতিফাতে একই সাথে জেকের হইবে। ছালেক তাহা বুঝিতে পারিবে।

    দায়েরায়ে কামালাতে রেসালতঃ-

    বিজ্ঞাপন

    এই দায়েরা তাজাল্লীয়াতে জাতি দায়েমীর দ্বিতীয় দায়েরা। এই দায়েরায় মুরাকাবা করিতে হইলে নিয়ত করিতে হইবে-"তাজাল্লীয়াতে জাতি দায়েমীর ফয়েজ কামালতে রেসালতের দায়েরা হইতে কিংবা যে জাত কামালাতে রেসালতের উৎপত্তি স্থান তথা হইতে আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" দায়েরায়ে রেসালতের নূরের ফয়েজ অতি আনন্দদায়ক। এই মাকামে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত ও নফল নামাজ পড়া অগ্রগতির জন্য সহায়ক হয়।

    দায়েরায়ে কামালতে উলুল আজমঃ-

    ইহা কামালাত অধ্যায়ের তৃতীয় দায়েরা। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়তে বসিতে হইবে যে,-"তাজাল্লীয়াতে জাতি দায়েমীর ফয়েজ কামালাতে উলুল আজমের দায়েরা হইতে আসিয়া "ওজুদ মাওহুব লাহু” হইয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে আসিতেছে।" এই মাকামের ফয়েজ পূর্ববর্তী সকল দায়েরা হইতে অধিকতর আনন্দদায়ক হইবে। এই মাকামে কুরআন মজীদের বিশেষ বিশেষ অক্ষরসমূহ অর্থাৎ আলিফ, লাম, মিম-ইয়াসিনসহ কুরআন শরীফের গুপ্ত ভেদ ছালেকের নিকট আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে প্রকাশ হইবে। এই মাকামে সদা দরুদ শরীফ পাঠ, কুরআন শরীফ তেলাওয়াত, নবীজী (সাঃ) এর সুন্নতের অনুসরণ ইত্যাদি অগ্রগতির জন্য অধিক সহায়ক।

    বিজ্ঞাপন

    কামালাতের দায়েরাসমূহ ছায়ের শেষে খোদা প্রাপ্তির পথে ছায়েরের দুটি পৃথক পৃথক রাস্তা রহিয়াছে। যথাঃ

    • হকিকতে এলাহিয়া।

  • হকিকতে আম্বিয়া।

  • বিজ্ঞাপন

    ইহাদের একটি ইবাদতের পথ, অন্যটি মহব্বতের পথ। ইবাদতের পথ শেষ হইয়াছে "মাবুদিয়াতের ছেরফা" মাকামে। মহব্বতের পথ শেষ হইয়াছে "হোব্বে ছেরফা" মাকামে। খোদাপ্রাাপ্তির পথে এই দুই গুণ অর্থাৎ ইবাদত এবং মহব্বতের সংমিশ্রণ প্রয়োজন। মহব্বত না থাকিলে ইবাদত হইবে প্রাণহীন। ইবাদত বিনে মহব্বত হইবে মূল্যহীন। তরীকতের মহান পীরানে পীরগণ বলেন, এই দুই দায়েরা একটি পর্যায়ে যাইয়া এক হইয়া যায়; যে মাকামে গিয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মে'রাজ রজনীতে আল্লাহপাকের বিশেষ সান্নিধ্য লাভকরিয়াছিলেন।

    "হকিকতে এলাহিয়া"র মধ্যে চারটি দায়েরা রহিয়াছে। যথাঃ

    ▶ হকিকতে কুরআন,

    বিজ্ঞাপন

    ▶ হকিকতে কাবা,

    ▶ হকিকতে সালাত,

    ▶ মাবুদিয়াতে ছেরফা।

    বিজ্ঞাপন

    দায়েরায়ে হকিকতে কুরআনঃ-

    ইহা হকিকতে এলাহিয়ার অভ্যন্তরস্থ দায়েরাসমূহের মধ্যে প্রথম দায়েরা। এই মাকামে মুরাকাবার জন্য নিয়ত করিতে হইবে যে "হকিকতে কুরআনের দায়েরা হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরার ফয়েজ বর্ণনাতীত ও বেরংগী। ছালেক এই দায়েরাতে আসিলে এই রূপ বোধ করিবে যে, আল্লাহতায়ালা যেন আপন কুদরতের দ্বারা এই মুহূর্তেই কুরআনপাক অবতীর্ণ বা নাজিল করিতেছেন। কুরআন মজীদের প্রতি আয়াতের সহিত অতি সূক্ষ্ম নূর ফয়েজরূপে ছালেকের উপর পড়িতে থাকিবে। ছালেক আয়াতসমূহের মর্মার্থ অনুধাবন করিয়া দৃষ্টিপাত করিলে তাহার মনে হইবে যে, প্রতিটি অক্ষর ও আয়াত হইতে নূরের ঝলক অনবরত প্রবাহিত হইতেছে। কারণ কুরআন মজীদের ঐ সকল অক্ষরের সহিত সিফাতী নূরের সম্পর্ক রহিয়াছে। এই মাকামে পৌঁছাইবার পরে ছালেক কুরআন মজিদ তেলাওয়াত করিতে থাকিলে বা কাহারও কুরআন তেলাওয়াত শুনিতে থাকিলে তাহার নিকট মনে হইবে যে, তাহার সমস্ত শরীর নূরে আলোকিত হইয়া গিয়াছে; যে রকম হযরত মুছা (আঃ) তুর পাহাড়ের নিকটে একটি বৃক্ষের মূল,

    কান্ড, শাখা-প্রশাখা ও তাহার পত্র-পল্লব সকলই নূরে প্রজ্জ্বলিত দেখিয়াছিলেন। হযরত মুছা (আঃ) সেই নূরের প্রখর দীপ্তিতে সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন। এই মাকামে ছালেক নিজেকে উক্ত নূর প্রজ্জলিত বৃক্ষের মত দেখিবে। পরে ছালেক অন্য কোন সময়ে কুরআনপাক তেলাওয়াত করিতে গেলে দেখিবে, উহার প্রতি শব্দের ফয়েজান বিনা চেষ্টাতেই তাহার উপর পড়িতেছে। ইহাতো গেলো কুরআন তেলওয়াতের কথা। ইহা ব্যতীত যে কোন কথা বা বাক্য, ছালেক বলুক বা শুনুক না কেন, তৎক্ষণাৎ ঐ কথার মাদা হইতে সেই প্রকারের নূরাগমন হইতে দেখিবে। ফলে বাজে কথা শ্রবণে বা গর্বকারীর গর্বজনীত গল্পে ছালেকের মন খারাপ হইবে। তেমনি আল্লাহ-রাসূলের মহব্বতপূর্ণ কথা শ্রবণে সে সন্তুষ্ট হইবে।

    দায়েরায়ে হকিকতে কাবাঃ-

    ইহা হকিকতে এলাহিয়ার দ্বিতীয় দায়েরা। এই দায়েরা আল্লাহপাকের জাতের মর্তবা ও মহত্ব বা শান প্রকাশ করে। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে নিয়ত করিতে হইবে যে,- "হকিকতে কাবার মাকাম হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার ১০ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই মাকামে অগ্রসর হইতে থাকিলে ছালেক দেখিতে পাইবে, সৃষ্টির প্রতি রেণু রেণু বা কনা কনা হকিকতে কাবার দিকে সেজদা করিতেছে। ছালেক এইরূপও দেখিতে পাইবে যে, কাবা শরীফের হকিকত হইতে এক বিশাল বেরংগী নূর রাশি কাবা শরীফের ঘরের উপরে পড়িতেছে। এই নূর বিশুদ্ধতায় কামালাতের মাকামসমূহের নূরের মতন হইলেও ইহা কিঞ্চিত তেজস্কর বোধ হইবে। আর কামালাতের মাকামের নূরসমূহ যদিও জাতি নূর, তথাপি তাহা অতিশয় সূক্ষ্ম ও মৃদু। হকিকতে কাবা মাকামের নূর অতি জালালী। আর কামালাতের মাকামসমূহের নূর জামালী। হকিকতসমূহের ফয়েযান ও কামালাতের ফয়েজান একই রূপ জাতি ও দায়েমী হইলেও প্রত্যেক হকিকতে ছায়েরের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থা দৃষ্ট হইবে। যেমন হকিকতে কাবা। কাবা শরীফ সকল সৃষ্টির সেজদা করিবার দিক বা স্থান। ঐরূপ হকিকতে কাবা ঐ সকল সৃষ্টির হকিকতের সেজদা করার নির্ধারিত দিক ও স্থান, এই মর্যাদা ও হকিকতের জন্যই বিশেষ করিয়া নির্দিষ্ট রহিয়াছে, অন্য হকিকতের জন্য নহে। হকিকতে কাবা আল্লাহপাকের জাতের এক ইতেবার। এখানে সিফাতের কোন অধিকার নাই। এই মাকাম শানের উপরের অংশ অর্থাৎ জাত ও শানের মধ্যস্থান। পক্ষান্তরে কুরআন

    মজীদের উৎপত্তি হইল আল্লাহপাকের সিফাতসমূহের মধ্যগত-“সিফাতে কালাম" থেকে। তাই হকিকতে কাবার মর্তবা হকিকতে কুরআনের ঊর্ধ্বে। ছালেক এই মাকামে আসিলে কাবা শরীফের মর্যাদা ও মর্তবা বিশেষ রূপে জানিতে পারে। এই সময়ে কাবা শরীফের জেয়ারত করিলে এই মাকাম হাসিলকারী কাবা শরীফের নূর দর্শন করিতে পারিবে। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, হকিকতে কাবা আল্লাহতায়ালার জাতের নিদর্শন। হকিকতে কাবা হইল প্রকৃত অর্থে ফেরেশতাদিগের কাবা। যে আরিফে বিল্লাহ্ এই মাকাম হাসিল করিয়াছেন, তদীয় দেল সর্বদাই আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবার বা হকিকতে কাবার সহিত মিশিয়া থাকে অর্থাৎ বলা যায় তাহাদের দেল আল্লাহপাকের জাতের সহিতই মিশিয়া থাকে। তাই হকিকতে কাবার মাকাম হাসিলকারী সাধকের মর্তবা ও মর্যাদা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর তৈরী ইট-পাথরের কাবার চেয়েও উত্তম।

    দায়েরায়ে হকিকতে সালাতঃ-

    ইহা হকিকতে এলাহিয়ার তৃতীয় দায়েরা। এই দায়েরা মহামহিম আল্লাহপাকের অসীম জাতের সুপ্রশস্ততার স্থান। ইহার মর্তবা হকিকতে কুরআন ও হকিকতে কাবার চাইতে অধিক। এই দায়েরার মুরাকাবায় এই নিয়ত করিতে হইবে যে, "দায়েরায়ে হকিকতে সালাত হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরার নূর অতি আনন্দদায়ক। এই দায়েরার ফয়েজ মনে অতি বিনীতভাব সৃষ্টি করে। এই দায়েরায় আসিলে হৃদয় সব সময় আল্লাহপাকের জাতের ভিতর ডুবিয়া থাকে। এমন এক শান্তিময় অনুভূতি সে লাভ করে, যাহার তুলনা এই দুনিয়াতে নাই। ছালেক এই পবিত্র মাকামে আসিলে নামাজের সময়ে এক অনির্বচনীয় আনন্দদায়ক অনুভূতি লাভ করে। তাহার নিকট ইহা স্পষ্ট হইবে যে, হকিকতে সালাত প্রকৃত পক্ষে হকিকতে কুরআন ও হকিকতে কাবাকে বেষ্টন করিয়া আছে। ছালেকের নিকট মনে হইবে যে, হকিকতে সালাত যেন এক অতি উচ্চ চূড়া বিশিষ্ট গম্বুজ। সেই গম্বুজের মধ্য হইতে নামাজে দন্ডায়মান ছালেকের উপর তিন হকিকত অর্থাৎ হকিকতে সালাত, হকিকতে কাবা ও হকিকতে কুরআন হইতে পৃথক পৃথক নূরের স্রোতের ফয়েজান তাহার উপর পড়িতেছে। হযরত মুছা (আঃ) তূর পাহাড়ে মূল হইতে পত্র পল্লব পর্যন্ত খোদার নূরে প্রজ্জ্বলিত যে বৃক্ষ দেখিয়াছিলেন, ছালেক তখন নিজেকে সেই নূর প্রজ্জ্বলিত বৃক্ষের ন্যায় দেখিবে। তাহার শরীরের প্রতি রেণু পরমাণুতে সে তখন নূরের খেলা দেখিবে, ইহাতে ছালেকের হৃদয় বিগলিত হইবে। তাহার প্রতি অংশ তখন আল্লাহপাকের জাতের সহিত বিলুপ্ত হইবে। ইহাকেই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) "আসসালাতু মে'রাজুল মু'মিনীন" বলিয়াছেন। এই মাকামে মেরাজের মধ্যে যেমন নবী করীম (সাঃ) এর খোদাপ্রাপ্তি সিদ্ধ হইয়াছিল, সেই রূপে মুমিনদিগের নামাজে খোদাপ্রাপ্তি সিদ্ধ হইবে। এই মাকামে উপনীত ছালেক রুকুতে যাইয়া সেজদায় যাওয়ার কারণ কি এবং কাহাকে, কোন স্থানে সেজদা দেওয়া হইতেছে ইত্যাকার বিষয় সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করিবে।

    দায়েরায়ে মাবুদিয়াতে ছেরফাঃ-

    দায়েরায়ে মাবুদিয়াতে ছেরফা হকিকতে এলাহিয়ার সর্বশেষ দায়েরা। এই দায়েরায় প্রবেশ করিতে হইলে "ওজুদ মাওহুব লাহু"-এর কুওতে নজরীয়ার দ্বারা করিতে হয়। এই দায়েরা ছায়েরী কদমীর উর্ধ্বে। তাই "ওজুদ মাওহুব লাহু” বা খোদা প্রদত্ত শরীরের কুওতে নজরিয়া দিয়া ইহা ছায়ের করিতে হইবে। এই মাকামের নূর অতিশয় বিশুদ্ধ এবং সূক্ষ্ম। এই ফয়েজের বর্ণনা করা ভাষার অতীত। পৃথিবীতে এমন কোন উপমা বা দৃষ্টান্ত নাই, যাহা দিয়া ইহার তুলনা করা যায়। এই মাকামে মুরাকাবার নিয়ত হইবে, 'জাত মোজাররাদার মাবুদিয়াতে ছেরফার ফয়েজ আমার "ওজুদ মাওহুব লাহু'র কুওতে নজরীয়ার উপর পড়িতেছে।" উক্ত জাত মোজাররাদাই আহ্দিয়াতের মাকাম। এই মাকামে জাত পাকের সহিত কেবলমাত্র আবেদ ও মাবুদের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্কই আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে স্থাপিত হয়। এই মাকামে কলেমা শরীফের প্রকৃত মর্ম ছালেক অনুধাবন করিতে পারে। এই দায়েরাতে অধিক নামাজ আদায় দ্বারা অগ্রগতি লাভ করা যায়। এই পর্যন্ত হকিকতে এলাহিয়ার ছায়ের শেষ হইল।

    ইহার পর কামালাত হইতে নির্গত দ্বিতীয় পথ অর্থাৎ হকিকতে আম্বিয়ার ছায়ের শুরু হয়। এই হকিকতের সংখ্যা অনেক; তবে প্রধানতঃ চারটি। যথাঃ-

    > হকিকতে ইব্রাহিমী,

    > হকিকতে মুছবী,

    > হকিকতে মুহাম্মদী,

    > হকিকতে আহমদী।

    উল্লিখিত হকিকতসমূহে ছায়ের কেবল মহব্বত দ্বারাই অর্জন করিতে হয়। মহব্বত দ্বারাই উক্ত হকিকতের দায়েরাসমূহে প্রবেশ করিতে হয়। মহব্বত দুই প্রকার। যথাঃ জাতি ও সিফাতী। গুণ ও সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি না দিয়া কেবল মাত্র জাতের যে প্রেম হয় তাহাকে "জাতি মহব্বত" বলে। যেমন সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার প্রেম। সন্তান কুৎসিত হউক, বধির হউক, যাহাই হউক; তাহাকে ভাল না বাসিয়া পিতা-মাতা পারে না। উহাকেই জাতি মহব্বত বলে। আর রূপ ও গুণের জন্য যে মহব্বত তাহাকে সিফাতী মহব্বত বলে। যেমন ইউসুফ ও জোলেখার প্রেম। জোলেখা হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তাহার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া ভালবাসিয়া ছিলেন।

    উক্ত দুই প্রকার প্রেমের উৎপত্তি বা আধিক্য দুই পক্ষের যে কোন এক পক্ষের মধ্যে অবশ্যই সৃষ্টি হইবে। প্রেমের উৎপত্তি বা আধিক্য প্রেমিকের দিক হইতে হইলে তাহাকে মহব্বত বলে। আর প্রেমাস্পদের দিক হইতে হইলে তাহাকে মাহবুবিয়াত বলে। তাই প্রেমকে সাধকগণ চারিভাগে ভাগ করিয়াছেন। যথাঃ

    ▲ বিশুদ্ধ মহব্বতে জাতি,

    ▲ বিশুদ্ধ মহব্বতে সিফাতী,

    ▲ বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি এবং

    ▲ বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে সিফাতী।

    এই চার প্রকার প্রেমে ছায়ের করিতে পারিলে সমস্ত হকিকতে ছায়ের করা সম্ভব হইবে। আর ঐ চারি প্রকার প্রেমের ছায়ের সিদ্ধ হওয়া, নিম্নলিখিত চার হকিকতে ছায়ের করার উপর নির্ভর করে, যথাঃ-

    হকিকতে আহমদীঃ-

    ইহা বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতির কামাল বা সম্পূর্ণ প্রকাশ স্থান।

    হকিকতে মুহাম্মদীঃ-

    ইহা মাহবুবিয়াত ও মহব্বতের মিশ্রিত ফয়েযানের প্রকাশ স্থান।

    হকিকতে ইব্রাহিমীঃ-

    ইহা বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে সিফাতীর প্রকাশ স্থান।

    হকিকতে মুছবীঃ-

    ইহা বিশুদ্ধ মহব্বতের সম্পূর্ণ প্রকাশ স্থান।

    এই চারি মাকামের ছায়ের সিদ্ধ হইলে ছালেক সমুদয় হকিকতের ছায়ের করিতে ক্ষমতাবান হইবে।

    প্রথমতঃ হকিকতে সিফাত হইতে ছায়ের আরম্ভ করিতে হয়। তাই হকিকতে ইব্রাহিমী প্রথম বর্ণিত হইল।

    দায়েরায়ে হকিকতে ইব্রাহিমীঃ-

    দায়েরায়ে হকিকতে ইব্রাহিমীকে "খোল্লাতের মাকাম" বলে। এই মাকামে কোন বিষাদ বা দুঃখ অনুভূতি নাই। এই মাকাম মাহবুবিয়াতে সিফাতী নূরের বিশেষ উৎপত্তি স্থান। এই স্থান হইতেই মাহবুবিয়াতে সিফাতী নূরের প্রকাশ পায়। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে নিয়ত করিতে হইবে যে, "মাহবুবিয়াতে সিফাতীর উৎপত্তি স্থান হকিকতে ইব্রাহিমী হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।"এই মুরাকাবায় খোদাতায়ালার জাতের সহিত এক বিশেষ প্রেম সৃষ্টি হইবে, যাহা অন্য কোন মাকামে সিদ্ধ হইবে না। এই মাকামে আত্তাহিয়াতুর সহিত যে দরুদ পড়িতে হয়, সেই দরুদ প্রতিদিন তিন হাজার বার বা কমপক্ষে এক হাজার বার পাঠ করিতে হয়। প্রতিদিনই ইহা পড়িতে হইবে।

    দায়েরায়ে হকিকতে মুছবীঃ-

    ইহা খোদাতায়ালার মহব্বতে জাতি নূরের বিশেষ উৎপত্তি স্থান। এই স্থান হইতে মহব্বতে জাতি নূরের প্রকাশ পায়। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে নিয়ত করিতে হইবে "বিশুদ্ধ মহব্বতে জাতির উৎপত্তি স্থান হকিকতে মুছবী হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই মুরাকাবায় ছালেক তেজ বিশিষ্ট ফয়েজান অনুভব করিয়া অধীর হইবে। এই মাকাম হইতে জাতি প্রেমের নূর নিপতিত হওয়ায় কখনো কখনো খোদাতায়ালার নিরপেক্ষ গুণের প্রতিবিম্ব ছালেকের উপর পতিত হইবে। সেই সময়ে সাধক আদব সম্মানের দিকে খেয়াল না রাখিয়া নির্ভীকচিত্তে খোদাতায়ালা সহিত কথা বলিতে থাকিবে, যেমন হযরত মুছা (আঃ) নির্ভীকচিত্তে খোদাতায়ালাকে বলিয়াছিলেন, "হে খোদা! তুমি আমাকে দেখা দাও আমি তোমাকে দর্শন করি। হযরত মুসা (আঃ) এর প্রতি অধিক দরুদ প্রেরণ এ মাকামে অগ্রগতির জন্য অধিক সহায়ক।

    দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদীঃ-

    খোদাতায়ালার 'আলিম' হওয়ার কে হকিকতে মুহাম্মদী বলে। উহাই সমস্ত সৃষ্টির হকিকত ও আদি সত্তি স্থান। কারণ খোদাতায়ালার ঐ এলেম হইতেই সমস্ত সৃষ্টির উদ্ভব হইয়াছে। এই হকিকত খোদাতায়ালার মাহবুবিয়াতে জাতি ও মহব্বতে জাতির সম্মিলিত ফয়েজানের উৎপত্তি স্থান। দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদী দায়েরায়ে হকিকতে ইব্রাহিমীর কেন্দ্র। কেন্দ্রই বৃত্তের মূল। কেন্দ্রের সহিত জাতের যে বিশেষ সম্পর্ক রহিয়াছে, বৃত্তের সহিত সে সম্পর্ক নাই। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়তে করিতে হইবে যে, "মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতির উৎপত্তি স্থান হকিকতে মুহাম্মদী হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানী শরীরে পড়িতেছে।" এই মাকামের ফয়েজান পতনের কখনও বিরাম নাই। সকল সময়েই ইহা ছালেকের উপর পড়িতে থাকে। এই দায়েরার ছায়েরে নবী করীম এর (সাঃ) সহিত ছালেকের এক বিশেষ প্রণয় সম্পর্ক জন্মিবে। হযরত নবী করীম (সাঃ) কে ছালেক সদা সর্বদা সম্মুখে দেখিতে পাইবে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর হাদীস অনুযায়ী কর্ম করিতে ছালেক ভালবাসিবে। সে হযরত নবী করীম (সাঃ) এর আসহাব দিগের রীতি নীতি ও ভাব অবলম্বন করিতে ভালবাসিবে। আসহাবদের ন্যায় বিনা ব্যবধানে ছালেক নিজেকে নবীজী (সাঃ) এর সভায় আসীন দেখিবে। সে রাসূলে করীম (সাঃ) এর সাহাবাগণের স্বভাব পাইবে ও তাহাদের গুণে গুণান্বিত হইবে।

    দায়েরায়ে হকিকতে আহমদীঃ-

    ইহা হকিকতে মুহাম্মদীর মূল। এই হকিকত বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের বিশেষ উৎপত্তি স্থান। এই হকিকত হইতেই বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূর প্রকাশ পায়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই হকিকতকে হকিকতে কাবা বলিয়া তদীয় মকতুবাত শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে, হকিকতে আহমদী হকিকতে কাবা, হকিকতে কুরআন ও হকিকতে সালাত মাকামসমূহের সমমর্যাদার। এই মাকামের মরতবা ও মাহাত্ম্য সম্বন্ধে শুধু এইটুকুই বলা যায়; গুণ ও শানের এই স্থানে কোন প্রতিবন্ধকতা নাই। আহাদ ও আহমদ নামের মিলনের মধ্যে "মিম” অক্ষরের যে ব্যবধান সেই ব্যবধান আহাদ ও আহমদের সম্পর্কের নৈকট্য প্রকাশ করে। এই সম্পর্ক কতখানি নিবিড় আল্লাহপাক ভিন্ন আর কেহই তাহা জানে না। এমন কি যিনি ঐ মাকামে পৌঁছান, তিনিও ভাষায় বর্ণনা করিতে পারেন না। এই মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়ত করিতে হইবে যে, “বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতির প্রকাশ স্থান হকিকতে আহমদী হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।” এই মাকামের ফয়েজান অতিশয় সূক্ষ্ম এবং ইহা জাতি প্রেম বৃদ্ধি করে। হকিকতে আহমদীর নূর হইতে হকিকতে মুহাম্মদীর ফয়েজানের নূর কিছুটা তেজস্কর। ইহার কারণ সম্পর্কে পীরানে পীরগণ বলেন, হকিকতে মুহাম্মদীর ফয়েজের উৎপত্তিস্থান মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াত জাতি উভয় স্থান হইতে। সুতরাং দুই হকিকতের ফয়েযান একত্রিত হওয়ায় অধিক তেজ ভাব অনুভূত হয়। আর হকিকতে আহমদী-এর উৎপত্তি স্থল কেবল বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি হইতে। এই মাকামে অধিক দরুদ পাঠ (কমপক্ষে লক্ষ দরুদ) অগ্রগতির জন্য অতি ফলদায়ক।

    দায়েরায়ে হোব্বে ছেরফাঃ-

    অনাদি অনন্ত অনির্দিষ্ট জাতে প্রথমেই প্রেম বা হোব্ব প্রকাশ পাওয়ায় ঐ জাত হোব্ব দ্বারা নির্ণীত হয়। সেই হোব্ব নির্ণীত জাতকে হোব্বে ছেরফা বলে। এই মাকাম সমগ্র সৃষ্টির মূলের মূল-স্থান। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহাই হকিকতে মুহাম্মদী-এর উৎপত্তি স্থান। কারণ জাত মতলক লা-তাইনে, অর্থাৎ অনাদি অনন্ত জাতে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে সৃষ্টি করার মহব্বত প্রকাশ পায়। ঐ প্রেম বিশিষ্ট জাতকে হকিকতে আহমদী বলে। এই হকিকত জাত মতলক সংলগ্ন অতি নিকটবর্তী মাকাম। উহা অপেক্ষা নিকটবর্তী মাকাম আর নাই। হোব্বে ছেরফার মাকামে মুরাকাবা করিতে হইলে নিয়ত করিতে হইবে যে-"হোব্বে ছেরফার ফয়েজ আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানী শরীরে পড়িতেছে।" এই মাকামের নূর বেরংগী, যাহা সকল সময়েই অবতীর্ণ হইতে থাকে; কোথাও কোন প্রকার বাধা প্রাপ্ত হয় না। অধিক পরিমানে দরুদ পড়া এই মাকামে অগ্রগতির জন্য অধিক সহায়ক। এ মাকাম নবী করীম (সাঃ) এর জন্য খাস; অন্য কোন পয়গম্বর (আঃ) এর জন্যে নহে।

    হে জাকেরগণ! তোমরা ছায়ের-ছুলুক ত্বয় করিতে যতই চেষ্টা কর না কেন, খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় সব চেয়ে বড় হইল মুর্শিদে কামেলের দয়া ও তদীয় দয়া অর্জনের জন্য প্রয়োজন খেদমত। মুর্শিদে কামেলের কঠিন খেদমত ব্যতীত আল্লাহতায়ালার রেজামন্দি কেহই লাভ করিতে পারে নাই; পারা সম্ভবও নয়। তাই সদা সর্বদা মুর্শিদে কামেল যে হুকুম করেন, সেই হুকুম মুরীদকে পালন করিতে হইবে। নচেৎ কোন দায়েরাতেই গিয়া শান্তি পাইবে না। তাই পীরের মহব্বত এমনিভাবে নিজের মধ্যে সৃষ্টি কর যে, পীরের হুকুমে নিজের জান-মাল কুরবান রিতে সদা সর্বদা প্রস্তুত থাকিতে পার। এই স্থানে দয়াল পীর দস্তগীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের নিকট হইতে শোনা একটা নকল তোমাদের শুনাইতেছি।

    "একজন মুরীদ তাহার পীরের দরবারে ১২ বৎসর খেদমত করিলেন। পীর ১২ বৎসর পর তাহাকে বিদায় দিলেন। বিদায় দিবার সময়ে পীর তাহাকে একটি ছোরা হাতে দিয়া বলিলেন, "তুমি ১২ বছর খেদমত করলে, এই ছোরাটা নিয়ে যাও।" মুরীদ অতীব বিনীত ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, "হুজুর এই ছোরা দিয়ে আমি কি করব?" তাহার পীর মুরীদকে ফরমাইলেন-"কোথাও একটি উঁচু গাছের নীচে এই ছোরাটা খাড়া করে মাটিতে গাড়বে।

    ছোরার ধারাল অগ্রভাগ যেন মাটি থেকে বের হয়ে থাকে। তুমি সেই উঁচু গাছের উপরে একটি ডাল থেকে ঐ ছোরার ধারাল অগ্রভাগের উপর এমনভাবে লাফ দিয়ে পড়বে, যেন ঐ ছোরার ধারাল অগ্রভাগ তোমার বুকে লাগে ও তোমার বুক বিদীর্ণ করে পিঠের দিক থেকে বের হয়ে যায়।" এই আশ্চর্য জনক ভয়াবহ কথা শুনিয়া মুরীদ কাঁদিতে কাঁদিতে বিদায় লইলেন। কিছুদূর যাইবার পর মুরীদ একটা উঁচু বৃক্ষের নিকট বসিলেন। পীরে কামেলের দেওয়া সেই ছোরাটা সেই গাছের একটি ডালের সোজাসুজি মাটিতে এমনভাবে গাড়িলেন যে, ছোরার ধারাল অগ্রভাগ বাহির হইয়া রহিল। তৎপর তিনি গাছে উঠিয়া নীচে গাড়িয়া রাখা ছোরার দিকে চাহিলেন। ছোরার ধারাল অগ্রভাগ দেখিয়া তিনি ভীত হইলেন।

    ভাবিতে লাগিলেন, কি প্রকারে তিনি মৃত্যু জানিয়াও ঐ ছোরাটার উপর লাফাইয়া পড়িয়া নিজেই নিজের মৃত্যু ডাকিয়া আনিবেন। তাই নীচে নামিয়া অনেকক্ষণ কাঁদিলেন। তারপরে ভাবিতে লাগিলেন, পীরের হুকুম না মানিলে ১২ বছরের খেদমত বৃথা যাইবে-তথা সারাটি জীবনই বৃথা হইয়া যাইবে। এই চিন্তা করিয়া তিনি ঝাঁপ দিবার জন্য আবার গাছে উঠিলেন। কিন্তু মৃত্যুর ভয়ে এবারও ঝাঁপ দিতে পারিলেন না।

    ছোরার দিকে তাকাইয়া শিহরিয়া উঠিলেন। তাই নীচে নামিয়া আসিয়া আবারও অনেকক্ষণ কাঁদিলেন। ভাবিতে লাগিলেন, এই ভাবে ধারাল ছোরার উপর ঝাঁপ দিয়া কিভাবে নিজে নিজের মৃত্যু ডাকিয়া আনি। এই রূপ একবার, দুইবার, তিনবার তিনি গাছে উঠিলেন এবং ধারাল ছোরা দেখিয়া মৃত্যুর ভয়ে নামিয়া আসিলেন। চতুর্থবার তিনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, "মৃত্যুতো একদিন আসবেই, কাজেই আমি পীরের হুকুম পালন করব। আমি ছোরার আগার দিকে না তাকিয়ে চোখ বুজে ঝাঁপ দিয়ে ছোরার উপর পড়ে মারা যাব।

    " তিনি ছোরাটিকে ঠিকমত গাড়িয়া গাছে উঠিয়া নির্দিষ্ট ডাল হইতে চোখ বুজিয়া ঠিক ছোরার ধারাল অগ্রভাগের সোজাসুজি লাফ দিয়া পড়িলেন, যাহাতে ছোরা তাহার বুক দিয়া ঢুকিয়া পিঠ দিয়া বাহির হইয়া যাইতে পারে। মুরীদ যখন ছোরার উপর ঝাঁপ দিয়া পড়িলেন, কিছুক্ষণের জন্য তিনি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিলেন। তাহার হুঁশ ফিরিয়া আসিলে তিনি দেখিলেন, প্রকৃত প্রস্তাবে ছোরা তাহার বুকে বা শরীরের অন্য কোথাও প্রবেশ করে নাই।

    যেখানে ছোরাটা গাড়া ছিল, সেখানেও নাই। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ছোরাটা গেল কোথায়? তাহার শরীরে ছোরার আঘাতের কোন চিহ্ন নাই। ছোরাটাকে তিনি চারিপাশে খুঁজিতে লাগিলেন। যে স্থানে গাড়া হইয়াছিল, সেই স্থানের মাটি খুঁড়িয়া দেখিলেন। কিন্তু ছোরাটা পাওয়া গেল না। তখন তিনি আপন পীরের দিকে দেলকে মোতাওয়াজ্জুহ করিয়া মুরাকাবায় বসিলেন। তিনি দেখিলেন, তাহার দেল দিব্য জ্যোতিতে পরিপূর্ণ। তিনি খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব লাভ করিলেন; আল্লাহতায়ালার প্রেম-প্রীতি ও রেজামন্দি লাভ করিয়া এক অপূর্ব নেয়ামতের সন্ধান পাইলেন।

    তোমরাও যদি খাজাবাবার খেদমত জানমাল দিয়া করিতে পার, স্বীয় মুর্শিদের হুকুম পালনের জন্য সর্ব সময় কাতেল থাক, তাহা হইলে হায়াতে ওহাদানী, হকিকতে ওহাদানী, ছয় ছুরাত-ছুরাতে আছলী, ঘুরাতে মেছালী, ছুরাতে রূহানী, ছুরাতে জেছমানী, ছুরাতে জাহেরী, ছুরাতে বাতেনী, খেয়াল-খেয়ালে নজর, বর্জক-সম্পূর্ণ আপন পীরের সহিত মিশাইয়া ফেল, তবেই তুমি মাঞ্জিল-এ-মাছুদে পৌঁছাইতে পারিবে। রাব্বিছ রাহী ছাদরী ওয়া ইয়াছ ছেরলী আম্রী; মান আরাফা নাচ্ছাহু-ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু। (চলবে)

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD