Logo

বেলায়েতে ছোগরার মাকামে মুরীদ দেখে আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্ব

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৯ জুলাই, ২০২৬, ১৯:২১
বেলায়েতে ছোগরার মাকামে মুরীদ দেখে আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্ব
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী, কাওছ, ছায়েরে এস্মোজ্জাহের এবং মুরাকাবায়ে শরহে ছদর ইত্যাদি মাকামসমূহের ছায়ের-ছুলুক, হাল ও সম্ভাব্য আত্মিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

বেলায়েতে কোবরাঃ-

আল্লাহপাকের নাম, গুণ, শান বা আসমা, সিফাত ও শয়নাত বেষ্টন করিয়া যে দায়েরা, তাহাকে বেলায়েতে কোবরা বলা হয়। এই দায়েরা নবী করীম (সঃ) ও পয়গম্বরদের বেলায়েত। স্বয়ং নবী করীম (সঃ) এর সাহায্য ও দয়া ব্যতীত ওলী-আল্লাহগণ এই দায়েরায় প্রবেশ করিতে পারেন না।

বেলায়েতে কোবরার অন্তর্গত পূর্ণ তিনটি ও একটি অর্ধ দায়েরা বা সর্বমোট সাড়ে তিন দায়েরা রহিয়াছে। পূর্ণ তিনটি দায়েরা হইলঃ আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল ও মহব্বতে ছানী। বাকী অর্ধেক দায়েরার নাম কাওছ। কাওছ অর্থ ধনুক। কাওছের উপরে রহিয়াছে আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদা।

বিজ্ঞাপন

বেলায়েতে কোবরার মধ্যবর্তী প্রথম দায়েরা আকরাবিয়াত। ইহা আল্লাহতায়ালার গুণসমূহের সমষ্টি বা সিফাতসমূহের মাকাম। দায়েরায়ে বেলায়েতে ছোগরাতে মুরীদ আল্লাহপাকের সিফাতসমূহের প্রতিবিম্বের সহিত পরিচিত হয়। কিন্তু এই আকরাবিয়াত মাকামে আসিলেই কেবল আল্লাহপাকের হাকীকী গুণসমূহের পরিচয় মুরীদ লাভ করিতে পারে। আল্লাহপাক ফরমান, “তিনটি জগত পার হইয়া তোমরা আকরাবিয়াতের মাকামে আস। তাহা হইল-জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত।” এই আকরাবিয়াতের মাকাম আল্লাহতায়ালার মারেফাতের সিংহদ্বার। এই মাকামে আল্লাহপাকের সত্যিকার মারেফাত ও তাঁহার প্রেমের খেলার সহিত মুরীদ বা ছালেক পরিচয় লাভ করে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, ইতিপূর্বের দায়েরাসমূহে আল্লাহপাকের যে পরিচয় মুরীদ লাভ করে তাহা মারেফতের রাস্তার ধুলাবালি। যদিও হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহগণের অধিকাংশই আকরাবিয়াত মাকামের পূর্বে বেলায়েতে ছোগরাতেই তাহাদের উরুজ ও ছায়ের শেষ করিয়াছেন।

বেলায়েতে কোবরার সাড়ে তিনটি দায়েরার পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য আছে। আকরাবিয়াত আল্লাহপাকের নাম ও গুণের সমষ্টি। মহব্বতে আউয়াল নাম ও গুণসমূহের আসলের স্থান। মহব্বতের ছানী আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণসমূহের আসলের আসল স্থান। কাওছ আল্লাহপাকের নাম ও গুণসমূহের আসলের মূলের মূল স্থান। কাওছের উপর আল্লাহপাকের জাতের স্থান যাহা জাত-মোজাররাদা।

বেলায়েতে কোবরার সাড়ে তিন দায়েরা অর্থাৎ আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী ও কাওছ অতিক্রম করিতে পারিলে মুরীদ সাধারণ অর্থে তাহার মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইতে পারে অর্থাৎ আল্লাহপাকের জাতের সহিত পরিচিত হইতে পারে। এই স্থানে মুরীদ আহদিয়াত প্রাপ্ত হইবে এবং হাকীকী ফানা লাভ করিবে। তবে এইখানেও আল্লাহপাকের জাত সম্পর্কে মুরীদ বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্টভাবে জানিতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

বেলায়েতে কোবরা অতিক্রম করিতে হইলে ইহার অন্তর্গত আকরাবিয়াতের মাকাম হইতেই ছায়েরে ফিল্লাহ শুরু করিতে হয়। ছায়েরে ফিল্লাহ হইল আল্লাহময় জগতে ছায়ের। আকরাবিয়াত হইতে ঊর্ধ্বদিক জাতমুখী ছায়েরকে ছায়েরে ফিল্লাহ বলা হয়।

বেলায়েতে কোবরার সর্বশেষ মাকাম কাওছ হইতে মুরীদ যে খোদা প্রদত্ত শরীর লাভ করে সেই "ওজুদ মাওহুব লাহু” (খোদাপ্রদত্ত শরীর) দিয়া আল্লাহপাকের সিফাত, সিফাতের মূল ও মূলের মূলের জগতে ছায়ের বা বিচরণ করা যায়। এতদ্ব্যতীত জাত জগতেও ছায়ের করা যায়। বেলায়েতের ছোগরায় মুরীদ আল্লাহপাক প্রদত্ত এই বিশেষ শরীর লাভ করে না। তাই তাহার পক্ষে আল্লাহপাকের জাত সংলগ্ন সিফাত বা জাত মোজাররাদায় ছায়ের সম্ভব হয় না।

আল্লাহপাক প্রদত্ত বিশেষ শরীর "ওজুদ মাওহুব লাহু" তাই তরীকায়ে মুজাদ্দেদীয়া দফতরের এক বিশেষ নেয়ামত যাহা আল্লাহপাকের জাতের জগতে ছায়েরের জন্য একমাত্র বাহন। ইহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার সিফাতী গুণ লাভ করা হয়। ইহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার গুণসমূহ মুরীদের সমস্ত লতিফায় আসে।

বিজ্ঞাপন

আকরাবিয়াতঃ-

আকরাবিয়াতের মাকাম হইতেই মুরীদের ছায়েরে ফিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহপাকের নাম, গুণ ও শানের জগতে ছায়ের শুরু হয়।

আকরাবিয়াত মাকামের নাফী-এসবাত জেকের করিতে হইলে এই মর্ম গ্রহণ করিতে হয় যে, 'আল্লাহপাকের পবিত্র জাত ভিন্ন আমার নিকটতম আর কেহ নাই। খোদাতায়ালা আপনিই আমার সবচেয়ে বেশী নিকটতম। আপনার রাজি থাকাই আমার বাঞ্ছা ও আকাঙ্খা। দয়া করিয়া আপনি আপনার মহব্বত ও মারেফত আমাকে ভিক্ষা দিন।'

বিজ্ঞাপন

আকরাবিয়াত মাকামের ফয়েজ লইতে হইলে এই মর্মে মুরাকাবা করিতে হইবে যে, আল্লাহপাকের যে পবিত্র জাত আমার জান-রগ হইতে নিকটবর্তী ও সমস্ত শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে প্রবাহিত সেই জাত হইতে ফয়েজান বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা আসমা ও সিফাত দিয়া আমার রূহ এবং রূহ হইয়া নাক্সের উপর কিংবা আমার 'আমি' শব্দ যাহার উপর প্রয়োগ হয়, তাহার উপর পড়িতেছে।

তখন ছালেক বুঝিবে "নাহনু আকরাবূ এলাইহে মিন হাব্লিল ওয়ারিদ"-কুরআন পাকের এই আয়াত-শরীফের নূর তাহার দেল ও সর্ব শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে আসিতেছে। ছালেক নিজের শরীরে তখন আল্লাহতায়ালার জাত পাকের নূরের সন্ধান পাইবে। সমগ্র সৃষ্টিই যে জাতপাকের সমুদ্রে নিমজ্জিত মুরীদ তাহা বুঝিবে।

এই মুরাকাবায় ছালেক অনুভব করিবে, মহব্বতের ফয়েজান পর্বত নিঃসৃত ঝরণার স্রোতের ন্যায় প্রবাহিত হইয়া তাহার রূহ হইয়া নাফস এবং পরে সমস্ত লতিফার উপর পতিত হইতেছে। কখনো কখনো তালেব এই ফয়েজের স্রোত প্রবল বেগের সহিত কিংবা মৃদু গতিতে আসিতে দেখিবে।

বিজ্ঞাপন

এই ফয়েজের স্রোতে মুরীদের নাফসের পূর্বের সকল দোষ ও কু-স্বভাব যেমন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কীনাহ, রিয়া, কামনা-বাসনা প্রভৃতি সম্পূর্ণ লুপ্ত হইবে। মুরীদের মধ্যে তখন মানবিক গুণ বিকশিত হইবে-বিনয়, সহনশীলতা ও মানবিক অনুভূতি বৃদ্ধি পাইবে।

মুরীদ এই মাকামের মুরাকাবা অভ্যাস করিতে থাকিলে তাহার উপর পতিত নূরের স্রোত ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে। কখনও কখনও এই নূরের স্রোত এত বেগে প্রবাহিত হইবে যে, এই সকল ফয়েজান এক স্বচ্ছ ইষৎ নীল বর্ণের পর্দা হইতে বাহির হইয়া সমুদয় জগতকে আচ্ছন্ন করতঃ সকল সৃষ্টিকে একেবারে বিলুপ্ত করিয়াছে বলিয়া মুরীদের নিকট অনুভূত হইবে।

বেলায়েতে ছোগরাতেও সকল বস্তু নূরাচ্ছন্ন দেখা যায়; আবার বেলায়েতে কোবরাতেও দেখা যায়। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কি?

বিজ্ঞাপন

এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, বেলায়েতে ছোগরার মাকামে মুরীদ যাহা দেখে, তাহা আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের নূর। বেলায়েতে ছোগরায় এই নূরের জেলাল অতি তেজস্কর বিধায়, অনেকের বুদ্ধি বিভ্রম দেখা দিতে পারে।

বেলায়েতে কোবরার নূর অধিকতর স্বচ্ছ এবং আনন্দদায়ক। বেলায়েতে কোবরায় দৃষ্ট এসেম, সিফাত ও শান সমূহের নূরের আনন্দ দানের ক্ষমতা তুলনামূলক বেশী।

বেলায়েতে ছোগরার মাকামে আল্লাহপাকের সহিত মুরীদের যে মা'ইয়াত হয়, তাহা প্রকৃত মা'ইয়াত নয়। সেই মা'ইয়াতকে অপ্রকৃত মা'ইয়াত বলা হয়। মুরীদের সহিত আল্লাহপাকের প্রকৃত মা'ইয়াত হয় আকরাবিয়াতে আসিয়া। আল্লাহপাক বলিতেছেন, 'আমি তোমাদের জানরগ হইতে নিকটে।' আর তরীকতের মহান মুর্শিদে কামেলগণ বলিতেছেন, 'আল্লাহপাকের জাত মুবারক সমগ্র ওজুদ তথা সৃষ্টির তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বিস্তৃত।' আকরাবিয়াতের মাকামে আসিয়া মুরীদ আল্লাহপাকের "নাহনু আকরাবু এলাইহে মিন হাবলিল ওয়ারিদ"-অর্থাৎ আমি তোমাদের জানরগ হইতেও নিকটবর্তী-এই আয়াতের হাকিকত, মারিফত এবং পীরানে পীরগণের অভিজ্ঞতা 'আল্লাহপাকের জাত সমগ্র সৃষ্টির তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে প্রবাহিত'-এই মহা সত্যের অনুভূতি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় লাভ করিয়া এক অনির্বচনীয় আনন্দ লাভ করে, যাহা বেলায়েতে ছোগরার প্রতিবিম্বের মাকামে লাভের সুযোগ নাই বা লাভকরা সম্ভবও নয়।

বিজ্ঞাপন

আকরাবিয়াতের মাকামে তাই আল্লাহপাকের সহিত মুরীদের এক বিশেষ মিলন হয়। আর মুরীদ আপন মাশুক আল্লাহতায়ালার যতই নিকটে যাইতে থাকে, ততই তাহার প্রতি নূরের আনন্দ দান ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এক কথায় বলা যায়, আকরাবিয়াত মাকামের নূরের স্বচ্ছতা ও আনন্দ দানের ক্ষমতা বেশী। মুরীদ তখন বুঝিতে পারেঃ আপন মাশুক ও রব বস্তুতই কত আপন, কত নিকটবর্তী।

الإِنْسَانُ سِرُّ اللَّهِ وَ اللَّهُ سِرُّ الْإِنْسَانِ

অর্থাৎ-"আল্লাহর ভেদ মানুষ, মানুষের ভেদ আল্লাহ"-এই কথার মারেফতও তাহার নিকট পরিষ্কার হয়। তবে এখানেও উল্লেখ করা প্রয়োজন আকরাবিয়াতের মাকামে আল্লাহতায়ালার সহিত তালেবের যে ঘনিষ্ঠতা ও নৈকট্য তাহার চেয়েও ঘনিষ্ঠ, নিবিড় ও প্রেমপ্রদ মিলনের সংবাদ রহিয়াছে "তাইনে আউয়ালের" মধ্যে। তাহার উপরে আর উরুজ সম্ভব হয় না। আল্লাহতায়ালার সহিত ইহার চেয়েও আর ঘনিষ্ঠ নিবিড় সান্নিধ্য সম্ভব হয় না।

বিজ্ঞাপন

আর আকরাবিয়াতের মাকামে আসিয়া নবী করীম (সঃ) এর রূহ মুবারকের সংগে পীরের রূহে বিলুপ্ত মুরীদের রূহ বিলীন হইয়া একাকার হইয়া যায়। তখন নদীর স্রোতে কোন কিছু পতিত হইলে তাহা যেমন স্রোতের ধাক্কায় সমুদ্রের দিকে যায়; তেমনি রাসূলে করীম (সঃ), মুর্শিদে কামেল ও মুরীদের আত্মা একাকার হইয়া ফয়েজে বর্কির ধাক্কায় জাত পাকের সমুদ্রে বিলীন হয়। তখন নবী করীম (সঃ), মুর্শিদে কামেল ও মুরীদ-সকলেই একই সাথে আল্লাহপাকের জাতে ফানা প্রাপ্ত থাকে। মুরীদের চোখে তখন আর রাসূলে করীম (সঃ) এর তাছাউর, পীরে কামেলের তাছাউর-কিছুই দৃষ্ট হয় না। শুধু আল্লাহই আল্লাহ দৃষ্ট হয়। অর্থাৎ আল্লাহর সহিত তালেবের ফানা লাভ হয়। তবে এই ফানাও প্রকৃত ফানা নয়, ইহা আবির্ভূত ফানা। মুরীদ আল্লাহপাকের সহিত প্রকৃত ফানা লাভ করিবে বেলায়েতের কোবরার তৃতীয় দায়েরা কাওছের মাকামে। তখন মুরীদ আল্লাহপাকের জাত মোজাররাদার সহিত পরিচিত হইবে।

এই স্থান হইতে অগ্রে যাহা গমন করিবে, তাহা হইল মুরীদের আত্মার কায়া বা "রূহে বেমেছালি ছুরাত"। যাহা পূর্বেই রাসূলে করীম (সঃ) ও আপন পীরে কামেলের রূহে বেমেছালিতে বিলুপ্ত বা ফানা হইয়া গিয়াছে। এই বেমেছালি ছুরাত আদি সৃষ্টির পূর্বে খোদাতায়ালার এরাদার মধ্যে নির্ধারিত ছিল। সেই ছুরাতেই তখন আল্লাহপাকের সহিত কাওছের মাকামে যাইয়া মুরীদ ফানা লাভ করে। মুরীদ তাহা মুরাকাবায় অনুভব করিবে।

মহব্বতে আউয়ালের আত্মিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার বিবরণঃ

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার এরাদাস্থিত যে আত্ম-প্রতিকৃতি ছালেক আকরাবিয়াতের মাকামে দেখিতে পায়, সেই আত্ম-প্রতিকৃতি পূর্বে কথিত নীল পর্দা ভেদ করিয়া আরও সম্মুখে এক অনাদি অনন্ত সীমাহীন জ্যোতির্ময় প্রান্তরের মধ্যে প্রবেশ করিবে। এই প্রান্তরের প্রথম ভাগ বেলায়েতে কোবরার দ্বিতীয় দায়েরা বা মহব্বতে আউয়াল।

এই স্থানে সদাই নূরের তুফান বহিতেছে; ইহার কোন উপমা নাই। ইহার প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করিবার সাধ্য কাহারও নাই। এই জন্য সাধকগণ ইহাকে বেকায়েফী বা বর্ণনাতীত বলিয়াছেন। এই নূর কখনও বিগলিত কুয়াশার মত, কখনও ধীর গতিতে, আবার কখনও অতি প্রবল বেগে পর্বত নিঃসৃত ঝর্ণার মত পড়িতে থাকে।

উক্ত নূর পতনের ফলে নাফস খোদাতায়ালার প্রেমে এমনই মাতোয়ারা হয় যে নাফসই তখন খোদাতায়ালায়ার প্রেমে মত্ত হইয়া যায়। নিজেকে ভুলিয়া যায়। নিজের উপর আমি শব্দ প্রয়োগ করিতে তখন অপছন্দ হয়।

উরুজের সময়ে আল্লাহপাকের এরাদাস্থ যে আত্ম-প্রতিকৃতি দেখা যায়, নাফসের সহিত ঐ আত্ম-প্রতিকৃতির সম্বন্ধ থাকার কারণে নাফস উক্ত আত্ম-প্রতিকৃতির উরুজের সময় নূর গ্রহণ করে ও তৃপ্তি পায়। নাফস ইহাতে পবিত্রতা লাভ করে। নাফস তখন আল্লাহতায়ালার প্রেমে এমনই মগ্ন হয় যে, দুনিয়ার দিকে তখন তাহার আর কোনো খেয়াল থাকে না। নাফস আল্লাহপাকের গুণে-গুণান্বিত হইয়া মোলহেমার গুণ লাভকরে।

এই মাকামে নাফী-এসবাত জেকের করিতে হইলে এই মর্ম গ্রহণ করিতে হইবে যে, "আল্লাহপাকের পবিত্র জাত ভিন্ন আমার প্রিয় আর কেহ নাই। লা মাহবুবা ইল্লাল্লাহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।" তিনি আমাদিগকে ভালবাসেন, আমরা তাহাকে ভালবাসি। মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) তাহার প্রেরিত রাসূল। "হে আল্লাহ! দয়া করিয়া আপনি আপনার মহব্বত ও মারেফত আমাকে দান করুন।"

এই মাকামের মুরাকাবার ফয়েজ লইতে হইলে এই ধারণা করিতে হইবে যে, "মহব্বতে আউয়ালের ফয়েয খোদাতায়ালার জাত পাক হইয়া বেলায়েতে কোবরার দ্বিতীয় দায়েরা আসমা ও সিফাতের আসল হইয়া হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর ছুরাতে রূহী বেমেছালী এবং আপন মুর্শিদে কামেলের ছুরাতে রূহী বেমেছালীর যোগাযোগে আমার রূহে বেমেছালী ছুরাত হইয়া রূহে, তথা হইতে আমার নাফস তথা সর্ব শরীরে পড়িতেছে।"

এই রূপ মুরাকাবা করিতে করিতে ঐ স্থানে অতি সূক্ষ্ম তেজস্কর নূরের পতন হইবে এবং ফয়েজ এতই অধিক হইবে যে, পূর্বের সকল নূর পতনের ফয়েজান অতি সাধারণ ও নগণ্য বলিয়া মুরীদের নিকট বোধ হইবে। তবে এই ফয়েজান মা'ইয়াতের ফয়েজানের মত নেশাযুক্ত নয়। বেলায়েতে ছোগরার মাকামে নূরের প্রতিবিম্বে যদি কাহারো মতিভ্রম বা বুদ্ধি বৈকল্য দেখা দিয়া থাকে, এই মাকামের নূরের প্রশান্ততায় তাহার মতিভ্রম ভাব কাটিয়া যাইবে। মুরীদের মনে শান্তি ফিরিয়া আসিবে। তাহার বুদ্ধিমত্তা সে ফিরিয়া পাইবে।

মহব্বতে ছানীঃ-

এই দায়েরা বেলায়েতে কোবরার তৃতীয় দায়েরা। এই স্থানের ফয়েজান মহব্বতে আউয়ালের দায়েরার ফয়েজান হইতেও সূক্ষ্ম। এই মাকামের ফয়েজ প্রকৃত প্রস্তাবে পরবর্তী দায়েরা কাওছ হইতে নির্গত।

কালব হইতে শুরু করিয়া তাহার উপর যত মাকাম আছে উহার সকল মাকামে নিজ নিজ উপরি মাকাম হইতে ফয়েজ পতিত হয়। কিন্তু মুরীদ ইহা কতখানি অনুভব করিতে পারিবে, তাহা নির্ভর করে তাহার নৈপুণ্য ও অভিজ্ঞতার উপর। এই মাকামের নাফী-এসবাত জেকের করিতে হইলে এই মর্ম গ্রহণ করিতে হইবে যে, 'আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাতপাক হইতে আমার প্রিয় আর কেহ নাই। তিনি আমাদিগকে ভালবাসেন, আমরা তাহাকে ভালবাসি।'

এই মাকামে মুরাকাবার সময়ে এই ধারণা করিতে হইবে যে, 'মহব্বতে ছানীর ফয়েজ বেলায়েতে কোবরার তৃতীয় দায়েরা আসমা ও সিফাতের মূলের মূল হইতে রাসূলে করীম (সঃ) এবং মুর্শিদ কেবলাজানের রূহে বেমেছালীর যোগাযোগে আমার বেমেছালী ছুরাতে তথা হইতে রূহের উপর, তথা হইতে নাফস তথা সর্ব শরীরে আসিতেছে।'

বেলায়েতে কোবরার আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল ও মহব্বতে ছানীর মুরাকাবা, উরুজ ও ছায়েরে মুরীদের যে আত্মিক অভিজ্ঞতা হয় তাহাতে তাহার কাছে এই ধারণা স্পষ্ট হইবে যে, আল্লাহপাকের জাতের মধ্যে সমস্ত সষ্টি নিমজ্জিত আছে। আমাদের সম সৃষ্টি বাতাস। বাতাসের মধ্যেই আমরা নিমজ্জিত, কিন্তু তবুও বাতাস আমরা দেখিতে পাই না। তাহা হইলে জাত পাকের সন্ধান আমরা পাইব কেমন করিয়া? পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহতে এই মাকামে না আসিলে আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সন্ধান পাওয়া যাইবে না। মানুষ তথা সমগ্র সৃষ্টির প্রতিটি তন্ত্রী জাতপাকে নিমজ্জিত। তাই মৃত্যুর ডাক বা শেষের ডাক মানুষ আর এড়াইতে পারে না। মানুষ যত বড় বিদ্বান, বুদ্ধিমান, দার্শনিক-বিজ্ঞানী বা যত বড় ক্ষমতাবানই হোক, মৃত্যুর ডাক কেহই রোধ করিতে পারে না। কারণ সৃষ্টির প্রতি রেণু পরমাণু আল্লাহপাকের জাতের সহিত মিশিয়া আছে।

মহব্বতে ছানীর মুরাকাবা ও নাফী-এসবাত জেকেরের মাধ্যমে যখন এই ধারণা তালেবের মনে দৃঢ় হইবে ও আল্লাহপাকের প্রতি প্রেমাকর্ষণ প্রগাঢ় হইবে, ছালেক তখন বেলায়েতে কোবরার অবশিষ্ট দায়েরা কাওছ অভিমুখে অগ্রসর হইবে।

কাওছঃ-

এই অর্ধ দায়েরা বেলায়েতে কোবরার অভ্যন্তরস্থ সর্বশেষ মাকাম। ইহাকে অর্ধ দায়েরা বলা হইয়াছে এই জন্য যে, এই মাকামে ছালেক যত দূর পর্যন্তই ছায়ের করুক না কেন, খোদাতায়ালার জাতকে নাম, গুণ, ও শানাদি হইতে পৃথক ভাবে পাইবে না। তাই নাম ও গুণাদিকে এক কাওছ এবং মূল জাতকে এক কাওছ ধারণা করিয়া দুই কাওছে এক দায়েরা ধরা হইয়াছে।

কাওছের মাকামে খোদাতায়ালার এরাদাস্থিত ছালেকের আত্ম-প্রতিকৃতি বিদ্যুতের বেগে আল্লাহতায়ালার জাতে বিলুপ্ত হয়। এই মাকামে বান্দার সহিত প্রভুর মিলন এমনই নিবিড় ও নিকটতর হয় যে, তখন আর কোন নজুল বা নূর পতন অনুভূত হয় না। এক প্রগাঢ় মিলন অনুভূতি ছালেকের অন্তরাত্মাকে ভরিয়া দেয়।

এই মাকামের হাল বড় অদ্ভুত। এখানে ছালেকের দ্বিত্ব জ্ঞান একেবারেই থাকে না। এই মাকামের হাল সম্পর্কে পীরানে পীরগণের অভিমত হইলঃ ছালেকের সত্ত্বা এই মাকামে খোদাতায়ালার জাতে বিলুপ্ত হয়। এখানে না প্রেম থাকে, না প্রেমিক থাকে; না খোদাতালাশীর তলব, না উপরে গমনের স্থান দৃষ্ট হয়, সমুদয়ই একেতে লোপ পায়। "এরশাদে খালেকীয়া” নামক পুস্তকের প্রণেতা এই মাকামের হাল সম্পর্কে বলেন যে, প্রেমিক প্রেমিকা বহু বিরহের পর, পরস্পর সন্দর্শনে যেরূপ জ্ঞানশূন্য হইয়া উভয়ে উভয়ের প্রতি পলকহীন নেত্রে নিরীক্ষণ করে এবং পরস্পর সংমিলনে যেরূপ জ্ঞানশূন্য নিস্পন্দ হইয়া আপনাকে ভুলিয়া যায়, তদ্রুপ ছালেকের চৈতন্য গুণও ঐ একে লয় পাইয়া অচেতন জড় পদার্থের মত হয়। এই অবস্থাই প্রকৃত আদিয়াত।

তবে পরে আল্লাহতায়ালার বেনেয়াজী গুণ দ্বারা তালেব এক প্রকার চৈতন্য গুণ লাভ করিবে। পরক্ষণেই তাইনে আউয়ালের মাকামে আসিয়া স্রষ্টার দৃষ্টান্তশূন্য এক রূপ সূক্ষ্ম জ্যোতি সমুদয় সৃষ্টিকে আপ্লুত করিয়া আছে বলিয়া ছালেকের মনে হইবে। যে নূরের হিল্লোলে সমগ্র সৃষ্টি হিল্লোলিত হইতেছে-সেই পরম পবিত্র জ্যোতিকে আল্লাহতায়ালার নূর বা 'অহুয়া নূরুন' অর্থাৎ তিনিই নূর বলিয়া ছালেক জানিতে পারিবে। এই চৈতন্যই বাকাবিল্লাহ। এই পর্যন্ত আল্লাহপাক সম্পর্কে সাধারণ জানা ছালেকের শেষ হয়।

এই মাকামে ছালেক নিজের শরীরের মতন একটি কায়া আল্লাহতায়ালার নূরে নিমজ্জিত দেখিবে। উহাকে ছালেকের নিজের শরীরের মতন মনে হইবে। ঐ ওজুদ বা শরীরকে 'ওজুদ মাওহুব লাহু' বা খোদাপ্রদত্ত শরীর বলা হয়। এই শরীরের গতি বিদ্যুতের চেয়েও বহু গুণ বেশী। ঐ ওজুদের দ্বারা ছায়েরে আনফুসি সম্পূর্ণ হয়। ইহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার জাহেরী ও বাতেনী সিফাতসমূহে এবং জাতপাকে ছায়ের সম্পন্ন হয়। খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব এই ভাবেই আল্লাহতায়ালার সিফাত ও গুণ বিশিষ্ট জাতে ছায়ের করা শিক্ষা দিয়াছেন।

ছায়েরে এসমোজ্জাহেরঃ-

কাওছ মাকাম হইতে -

هوَ الظَّاهِرُ هُوَ الْبَاطِنُ

অর্থাৎ-"তিনিই প্রকাশ, তিনিই গোপন"-এই ছায়ের শুরু করিতে হয়। এই ছায়ের বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে ছোগরার মধ্যে সিদ্ধ হয়। আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাত সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা লইতে হইলে, এই ছায়ের প্রয়োজন হয়। কাওছের উপর ও বেলায়েতে উলিয়া মাকামের পূর্বে এই ছায়ের সমাপন করিতে হয়।

বেলায়েতে কোবরার মধ্য হইতে ছায়েরে এস্মোজ্জাহের আরম্ভ করিলে সিফাতসমূহ হইতে ছায়ের করিতে হইবে। বেলায়েতে কোবরার অন্তর্গত এস্মোজ্জাহেরের ছায়েরে খোদাতায়ালার প্রত্যেক সিফাত হইতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের নূর অনুভূত হইবে এবং ছালেক এক সিফাতের নূর অন্য সিফাতের নূর হইতে পৃথক করিতে পারিবে।

কিন্তু যদি ছালেক এই এস্মোজ্জাহের ছায়ের বেলায়েতে ছোগরা হইতে আরম্ভ করিতে চায় তবে তাহাকে পূর্বোক্ত কাওছ মাকাম হইতে নিম্নের মহব্বতে ছানীতে এবং তথা হইতে নিম্নস্থিত মহব্বতে আউয়ালে, একইভাবে ক্রমান্বয়ে নিম্নে আসিতে আসিতে আপন 'আশীয়ানায়' অর্থাৎ নিম্নস্থ যে মাকামে স্থায়ী হইয়াছে তথায় উপস্থিত হইতে হইবে। পরে সেখান হইতে বেলায়েতে ছোগরাস্থিত এস্মোজ্জাহেরসমূহে ছায়ের করিতে হইবে। বেলায়েতে ছোগরা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের মাকাম। এই প্রতিবিম্ব হইতে শাখা-প্রশাখা সমূলে যাহা কিছু উৎপন্ন হইয়াছে, তাহার সবই এই মাকামের অধীন বলিয়া পীরানে পীরগণ তরীকতের পুস্তকে উল্লেখ করিয়াছেন। সুতরাং বেলায়েতে ছোগরা মাকাম হইতে এস্মোজ্জাহের ছায়ের করিতে গেলে পৃথিবীস্থিত সমুদয় বস্তু হইতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের নূর দৃষ্ট হইবে। উৎকৃষ্ট ও পবিত্র বস্তু হইতে নির্মল ও বিশুদ্ধ নূর দৃষ্ট হইবে, তেমনি নিকৃষ্ট ও মন্দ বস্তু হইতে ইহার বিপরীত নূর দেখা যাইবে।

মৌলভী মুহাম্মদ আবদুল করীম ছাহেব তদীয় 'এরশাদে খালেকীয়া' পুস্তকে উল্লেখ করেন, বেলায়েতে ছোগরার এস্মোজ্জাহেরের ছায়েরে রূপ-লাবণ্যযুক্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কমনীয়কান্তিবিশিষ্ট কোমল শরীর হইতে বিশুদ্ধ ও আনন্দজনক নূর অনুভূত হয়, পক্ষান্তরে কুৎসিৎ ও কদাকার হইতে সেই প্রকার আনন্দ তিরোহিতকারী নূর দৃষ্ট হয়।"

এ প্রসংগে তরীকতের ইমাম হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় পীরের নিকট লিখিত এক মকতুবে উল্লেখ করেন "পথ অতিক্রম কালে এম্মোজ্জাহেরের নূরের সাথে এমনভাবে মিলিত হইয়াছি যে প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে পৃথক পৃথক খাছ তাজাল্লীর আবির্ভাব পাইতেছি। উক্ত তাজাল্লী নারী জাতীর পোষাক-পরিচ্ছদে এবং তাহাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পৃথকভাবে বিশেষ করিয়া পাইতেছি। আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে তাহাদের এইরূপ অনুগত হইলাম যে, উহা বর্ণনাতীত। তাহাদের লেবাসে যেইরূপ আবির্ভাব ছিল তদ্রুপ আর কোথাও ছিল না, এইরূপ বিশিষ্ট নম্রতা এবং বিস্ময়কর সৌন্দর্য অন্য কোন আবির্ভাবস্থলে আবির্ভূত হয় নাই। সুতরাং তাহাদের সম্মুখে পানির মত বিগলিত অবস্থায় চলিয়া যাইতাম। এই আবির্ভাব প্রত্যেক পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদে দৃষ্ট হইত। সুমিষ্ট ও সুস্বাদু আড়ম্বর বিশিষ্ট খাদ্যাদির মধ্যে যে নূর ও সৌন্দর্য দৃষ্ট হইত তাহা সাধারণ খাদ্যে হইত না। মিষ্ট পানি ও সাধারণ পানির মধ্যেও এইরূপ পার্থক্য দেখিতাম বরং নূন্যাধিক্য প্রত্যেক সুস্বাদু দ্রব্যের মধ্যেও কোন না কোন একটি বৈশিষ্ট্য পাইতাম। উক্ত নূর বা তাজাল্লীর বৈশিষ্ট্যসমূহ পত্র দ্বারা বর্ণনা করিতে আমি অক্ষম।" (মকতুবাত শরীফ ১ম খন্ড; মকতুব নং- ১)

বেলায়েতে ছোগরার এস্মোজ্জাহের ছায়েরে যে ফয়েয অবতীর্ণ হয় তাহা পতনের স্থান আলমে আমরের পাঁচ লতিফা এবং আলমে খালকের নাক্স বলিয়া জানিবে। বেলায়েতে ছোগরার অন্তর্বতী সৃষ্টিসমূহ হইতে উক্ত ছয় লতিফায় ফয়েযান পড়িতে পড়িতে এমন অবস্থা জন্মে যে, চতুর্দিকস্থ প্রত্যেক বস্তু হইতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের ফয়েযানের স্রোত প্রবল বেগে শরীরের উপর পড়িতে থাকিবে। অতঃপর ধীরে ধীরে পূর্বে উল্লিখিত বেলায়েতে কোবরাস্থিত এস্মোজ্জাহেরের ছায়ের করিতে হইবে।

এসমোজ্জাহেরের ছায়েরের সময় এই রূপ বোধ হইবে যে, মুরীদের আল্লাহপ্রদত্ত শরীর "ওজুদ মাওহুব লাহুর" সহিত সৃষ্টির সকল বস্তু নূরের তার দ্বারা সংযুক্ত রহিয়াছে। সুতরাং যখন যে বস্তু হইতে ফয়েজ লইতে ইচ্ছা হইবে সেই বস্তু হইতে ফয়েজ লওয়া যাইবে। ঐ তার দ্বারা আকর্ষণ করিলেই তখন ঐ বস্তু হইতে নিজ শরীরে জ্যোতি পতন আরম্ভ হইবে। যখন যে ফয়েজ মনে করিবে, ছালেক সেই ফয়েজ লাভকরিতে পারিবে।

দায়েরায়ে মুরাকাবায়ে শরহে ছদরঃ-

এই মুরাকাবায় তালেবের ছিনা অতি প্রশস্ত হয়। সৃষ্টির উপর যত প্রকার ফয়েজান আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে পতিত হইতেছে, এই মাকামে তাহার সমুদয় প্রকার ফয়েজ তালেব তাহার নিজের ছিনার মধ্যে ধারণ করিতে সমর্থ হইবে। এই মুরাকাবায় সহ্য গুণ অতি প্রবল হয়। এই মুরাকাবায় কৃতকার্য হওয়ার একমাত্র লক্ষণ এই যে, ছালেকের সহ্য গুণ অতিশয় বৃদ্ধি পাইবে। শরহে ছদরের ফয়েজান লইতে হইলে খেয়াল করিতে হইবে যে, 'শরহে ছদরের ফয়েজান আল্লাহতায়ালার জাতপাক হইতে আমার ছিনায় আসিতেছে এবং মনের আকুতি এই হইবে যে, "হে খোদাতায়ালা! তুমি আমার ছিনাকে প্রশস্ত কর, যেমন প্রশস্ত করিয়াছ দয়াল নবী (সঃ) এর ছিনাকে।"

এই মুরাকাবার সহিত সূরা 'আলাম নাশরাহ্'-এর বিশেষ সম্বন্ধ রহিয়াছে। ঐ সূরাতে আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন,

الَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ -

অর্থাৎ-"হে নবী! আমি কি আপনার ছিনাকে প্রশস্ত করিয়া দেই নাই?" (সূরা আলাম নাশরাহঃ ১)

এই মুরাকাবার সফলতা লাভ করিলে ছালেকের হৃদয় এতই প্রশস্ত হইবে যে, তাহার আর হরিষে বিষাদ থাকিবে না। তাহার উপর যতই বিপদ আসুক সে আর দুঃখ পাইবে না। আল্লাহতায়ালার উপর সর্বাবস্থায় তাওয়াক্কুল করিবে ও নির্ভর রহিবে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে আল্লাহপাক হৃদয় প্রশস্ত করিয়া দিয়াছিলেন বলিয়াই তাহাকে যখন নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করিয়াছিল, তখনও তিনি বিচলিত হন নাই। ছালেকের হৃদয়ও আল্লাহপাক দয়া করিয়া এই শরহে ছদরের মুরাকাবার অসিলায় ঐ রূপ প্রশস্ত করিয়া দিলে ছালেক সর্বাবস্থায় হাসিমুখে আল্লাহতায়ালার উপর নির্ভর করিতে পারিবে। এই মাকামকে "খোল্লাতের মাকাম" বলা হয়, যেখানে হরিষে বিষাদ নাই।

বলখের সুলতান বাদশাহ ইব্রাহিম আদহাম বলখী (রঃ) ছাহেবকে কেহ জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, "হুজুর, আপনি কি কোন দিন শান্তি পাইয়াছিলেন?" তিনি উত্তর দিলেন, একদিন পাইয়াছিলাম। আমি এক রাত্রিতে এক মসজিদে ঘুমাইবার জন্য গিয়াছিলাম। মসজিদের লোকেরা আমাকে তথায় শুইতে দিল না। মসজিদের সকল লোক আমাকে পা ধরিয়া টানিয়া ফেলিবার জন্য রওয়ানা হইল। আমাকে যখন হেঁচড়াইয়া তাহারা ফেলিয়া দিতে লাগিল আমার মাথায় সিঁড়ির প্রথম ধাপে বাড়ি লাগিল। ইহাতে বেলায়েতের এক দরজা খুলিয়া গেল। ইহার পর তাহারা টানিয়া আরও সামনে লইল। আমার মাথায় সিড়ির দ্বিতীয় ধাপে বাড়ি লাগিল। ইহাতে বেলায়েতের দ্বিতীয় দরজা খুলিয়া গেল। ইহার পর তাহারা আমাকে আরও সম্মুখে টানিতে লাগিল। আমার মাথায় সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে বাড়ি লাগিল। ইহাতে বেলায়েতের তৃতীয় দরজা খুলিয়া গেল। ঐ মসজিদে সিঁড়ির আর কোন ধাপ ছিল না। ঐ দিন আমি শান্তি পাইয়াছিলাম। এই দায়েরাতে খোদাতায়ালার প্রেম প্রবাহ বৃদ্ধি পাইবে এবং ঐ "শরহে ছদরের মুরাকাবায়" ছালেকের সহ্য গুণ ও তাওয়াক্কুল অতি বৃদ্ধি পাইবে।

কাজেই হে জাকেরান! তোমরা যদি আল্লাহপাকের এশক মহব্বতের ফয়েজ হাসিল করিতে চাও, পীরের খেদমত এমনিভাবে কর যেন তোমার খেদমতে খুশী হইয়া তোমার পীর তোমাকে গোলাম হিসেবে কবুল করেন।

যেদিন তোমার পীর তোমাকে গোলাম বলিয়া স্বীকৃতি দিবেন, সেই দিন আল্লাহ ও রাসূলের তরফ হইতে তুমি স্বীকৃতি পাইবে। আল্লাহ তোমাকে বান্দা বলিয়া স্বীকার করিবেন, রাসূলে করীম (সঃ) তোমাকে উম্মতের মধ্যে হাকিমুল উম্মত বলিয়া স্বীকৃতি দিবেন। সেদিন বান্দার মধ্যে তুমি হইবে শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং উম্মতের মধ্যে হইবে হাকিমুল উম্মত। তখন এমন একটি নেয়ামত আল্লাহপাক তোমাকে দান করিবেন; যাহার তুলনা বা মেছাল নাই।

পীরের মত আপন, পীরের মতন দরদী, পীরের মত বন্ধু আর কেহ নাই। তাই মুর্শিদে কামেলের পাক কদমে জান-মাল নেসার করিয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বের এই নেয়ামত হাসিল কর। হযরত জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) ছাহেব তাহার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, সহায়-সম্পত্তি তদীয় পীরের কদমে নেসার করিয়াছিলেন, তোমরা আপন পীরকে আপন পরিবার পরিজন, ছেলে-মেয়ে, সকল কিছুর ঊর্ধ্বে মহব্বত কর। তাহা হইলেই তোমরা এই নেয়ামত লাভ করিতে পারিবে, মাঞ্জিলে মাছুদে পৌছাইতে পারিবে। আল্লাহ তোমাদের সহায় হোন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD