দায়েরায়ে এমকান ও দায়েরায়ে বেলায়েতে ছোগরার ছুলুক সমূহের আলোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খোদাতত্ত্ব সাধনায় শোগল ও মুরাকাবার গুরুত্ব এবং দায়েরায়ে এমকান ও দায়েরায়ে বেলায়েতে ছোগরার ছুলুক ও বৈশিষ্ট্য সমূহের আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
খোদাপ্রাপ্তির পথে যে সকল জিনিষের প্রয়োজন হয়, তাহাদের মধ্যে প্রধান পাঁচটি হইল-জেকের, রাবেতা', মুরাকাবা', শোগল ও মুহাছাবা'। এই পাঁচটিকে বাদ দিয়া খোদাপ্রাপ্তির পথে কেহই অগ্রসর হইতে পারিবে না। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা এই দরজাগুলি যখন খুলিয়া যায়, তখন ছালেক সহজেই খোদাপ্রাপ্তির পথে অগ্রসর হইতে পারে। এই সকল নিয়ম পদ্ধতি বাদ দিলে মাঞ্জিলে মাসুদে পৌঁছান কঠিন। আল্লাহতায়ালা এরশাদ ফরমান,
إِنَّ الشَّيْطَنَ لِلإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينِ
অর্থাৎ-"শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।" (সূরা ইউসুফঃ ৫)
বিজ্ঞাপন
শয়তান চায় না তোমরা আল্লাহতায়ালার বন্দেগী কর। শয়তান আল্লাহকে ভুলাইয়া মানুষের নাফসের মধ্যে বাজে কথা আনে। শয়তানের হাত হইতে বাঁচিবার জন্য শোগল, রাবেতা ও মুরাকাবার বিশেষ প্রয়োজন। পুস্তকাকারে প্রকাশিত নসিহতসমূহের দ্বিতীয় খন্ডে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে প্রাসংগিক বিধায় এস্থলে শোগল ও মুরাকাবা সম্পর্কে আরও কিছু বলা হইতেছে।
শোগলঃ-শোগল শব্দের অর্থ কোন কাজে নিবিষ্ট হওয়া। তবে তরীকতের পরিভাষায় শোগল শব্দের অর্থ মুরীদের দেহে যে যে স্থানে জেকের হয়, সেই সেই স্থানে জেকেরের শব্দ ও নূর খেয়াল করা।
মুরীদ চলিতে, ফিরিতে, উঠিতে, বসিতে সর্বাবস্থায় নিজের দেহের লতিফাসমূহে জেকেরের শব্দ ও নূর খেয়াল করিবে। লতিফাসমূহের জেকেরের প্রতি অবিরাম ও অবিচ্ছিন্ন খেয়াল রাখাই শোগল। এই রূপ খেয়াল রাখা অবস্থায় মুরীদ নিজ দেহের লতিফাসমূহের জেকেরের শব্দ নিজ কানে শুনিবে। একই সাথে বিভিন্ন লতিফার জেকেরের নূরের রংও তাহার দৃষ্টিগোচর হইবে-যাহা দ্বারা সে বুঝিতে পারিবে জেকের জারী বা অব্যাহত রহিয়াছে।
বিজ্ঞাপন
এক এক লতিফার জেকেরের নূরের এক এক রকম রং রহিয়াছে। কালবের নূরের রং সরিষা ফুলের ন্যায় হলুদ বর্ণের। লতিফায়ে "রুহ"-এর নূরের বর্ণ সোনালী। লতিফায়ে "সের"-এর নূরের বর্ণ সাদা-অতি তেজস্কর। লতিফায়ে “খফির" নূরের বর্ণ আকিক পাথরের মত কাল, তবে দৃষ্টিরোধক নয়। লতিফায়ে "আখফার" নূর সবুজ রংগের। "নাফস" এর নূর বে-রংগী। মুরীদ শোগলরত বা লতিফায় খেয়ালরত অবস্থায় প্রতি লতিফার জেকেরের শব্দ নিজ কানে শুনিতে পাইবে ও উহার জেকেরের নূরের বর্ণ দেখিতে পাইবে।
এই রূপে যে মুরীদের সর্ব শরীরের লতিফাসমূহ জিন্দা হইয়াছে তাহার সর্ব শরীরের অনু-পরমাণুর জেকেরের শব্দ সে শুনিতে পাইবে। যে মুরীদের সর্ব শরীরের জেকের তাহার পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা জারী হইয়াছে সেই মুরীদ সদা সর্বদা হাঁটিতে-চলিতে, উঠিতে-বসিতে, পাক-নাপাক অবস্থায় তাহার সর্ব শরীরের লতিফাসমূহের জেকের নিজ কানে শুনিতে পাইবে। আপন মুর্শিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা যে মুরীদ সর্ব শরীরের জেকেরের দরজা হাসিল করিয়াছে, সে সদা সর্বদাই জেকেরের সমুদ্রে নিজেকে নিমজ্জিত দেখে।
মুরাকাবাঃ- মুরাকাবার সময়ে গভীর ভাবে ধ্যানমগ্ন থাকিতে হইবে। মুরাকাবার সময়ে আল্লাহর ধ্যান এমনি গভীর হইতে হইবে যেন শরীরের কোন অংগ-প্রত্যংগ নড়া চড়া না করে। খ্যাতনামা সূফী সাধক হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব মুরাকাবা অবস্থায় সামান্য নড়াচড়া করিয়াছিলেন। ইহাতে তাঁহার উদ্দেশ্যে আল্লাহপাকের এলহাম হয়, "হে জুনায়েদ! তুমি কি দেখ নাই সামান্য একটি ইদুর ধরিবার জন্য বিড়াল কেমন নিঃশব্দে খাব ধরিয়া বসিয়া থাকে? বিড়াল সেই অবস্থায় নড়াচড়াও করে না। তুমি কি মনে কর একটা ইদুর ধরিবার জন্য বিড়াল যেমন স্থির হইয়া খাব ধরিয়া বসিয়া থাকে-আল্লাহকে পাইবার জন্য তাহারই ধ্যান করিতে বসিয়া বিড়ালের চেয়েও কম মনোযোগী হইলে চলিবে? বিড়াল যেমন এক ধ্যানে, এক মনে, এক খেয়ালে কেবলমাত্র ইদুরের দিকেই লক্ষ্য রাখে, তেমনি নড়াচড়া না করিয়া খেয়াল কেবল আল্লাহপাকের দিকে তাহার হুজুরীতে ও ধ্যানেই মগ্ন রাখিতে হইবে। অন্য কোন দিকেই দৃষ্টি ফিরানো যাইবে না। আল্লাহ পাক সর্ব জগতের সৃষ্টি কর্তা ও অধিকর্তা। তাহার প্রতি হুজুরী ও তাকওয়া' কম হইলে বা আদবের খেলাফ হইলে চলিবে না। মুরীদের ধ্যান ও খেয়াল পরিপক্ক হইলে শুধু মাত্র রংয়ের দিকে খেয়াল করিলেই মুরীদ তাহার কোন্ কোন্ লতিফায় জেকের হইতেছে তাহা বুঝিতে পারিবে।
বিজ্ঞাপন
আপন মুর্শিদে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা মুরীদের সর্ব শরীরের জেকের জারী হইলে, সে নিজ দেহের মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত সকল লতিফাসমূহের জেকেরের শব্দ এমন ভাবে শুনিতে পায়, যেমন নতুন বর্ষার শুরুতে ভেক বা ব্যাঙসমূহ আনন্দে কোলাহল করিয়া মাতোয়ারা হইয়া ডাকিতে থাকে। মুরীদের দেহের সর্ব শরীরের লতিফাসমূহে তখন ঐ রূপ জেকের সর্বক্ষণ জারী থাকিবে। মুরীদ খেয়াল করিলেই সেই শব্দ শুনিতে পাইবে। কখনও কখনও ঐ রূপ জেকেরের কারণে সুলতানুল আজকার হাসিলকারী মুরীদের সর্ব শরীর কাঁপিতে থাকিবে। মুরীদের নিকট তখন এই রূপ মনে হইবে যে, তাহার সর্ব শরীরে ভূমিকম্প হইতেছে বা ভূমিকম্পের মত কাঁপিতেছে। ঐ অবস্থায় মুরীদ একই সাথে ৩/৪ ঘন্টা বা তাহারও অধিক সময়কাল ধরিয়া আল্লাহতায়ালার ধ্যানে নিমগ্ন থাকিবে। ঐ রূপ দীর্ঘ সময় ধরিয়া ধ্যানমগ্ন থাকার অবস্থাকেই 'হুজুরী' বলে। মুরীদের মধ্যে যখন এই সমস্ত লক্ষণ দেখা যাইবে মুরীদ তখন 'দায়েরায়ে এমকান' অতিক্রম করিতেছে বুঝিতে হইবে।
দায়েরায়ে এমকানঃ- দায়েরায়ে এমকান দায়েরায়ে আফয়াল, দায়েরায়ে মুনাচ্ছেব, আলমে খালক এবং আলমে আমর বলিয়া জানিবে। দায়েরায়ে এক্কান খোদাপ্রাপ্তির পথযাত্রার প্রথম মাকাম। খোদাপ্রাপ্তির পথে ঊর্ধ্বদিকে যে সমস্ত মাকাম ছালেককে অতিক্রম করিতে হয় সেগুলিকে দায়েরা বলে। দায়েরায়ে এস্কানের দু'টি অংশ। একটি আলমে খাল্ক; অপরটি আলমে আমর। তাহাতাছ ছারা (পাতাল) হইতে আরশ পর্যন্ত আলমে খালক' এবং 'আরশ হইতে ঊর্ধ্বদিকে আলমে আমর' বলিয়া জানিবে।
মুরীদ দায়েরায়ে এমকানে আসিলে পীরে কামেল তদীয় মুরীদ সন্তানকে তাওয়াজ্জুহ দান করিয়া তাহার সমস্ত লতিফা জিন্দা করিয়া দেন। তখন মুরীদের সকল লতিফা পীরে কামেলের লতিফা মোবারক সমূহের সহিত মিশিয়া যায়। এই অবস্থায় পীরে কামেলের পবিত্রদেহ মুবারকের লতিফাসমূহের মাধ্যমে আলমে খালক ও আলমে আমরের সকল লতিফার মূলের সহিত এক অপূর্ব যোগ সূত্র স্থাপন হইয়া যায়। তখন আসমান ও জমিন ব্যাপী সকল বস্তুই যে সর্বসময় আল্লাহপাকের জেকেরে রত রহিয়াছে মুরীদ তাহা শুনিতে পায় ও বুঝিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
কালামুল্লাহ শরীফে প্রকাশঃ
يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوتِ وَ مَا فِي الْأَرْضِ
অর্থাৎ-"আসমান জমিনের সকল বস্তুর রেণুতে রেণুতে আল্লাহতায়ালার জেকের হইতেছে।" (সূরা জুমু'আঃ ১) কুরআন মজীদের এই আয়াতের হকিকত ও মারিফত মুরীদ তখন বুঝিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এই মাকামে আসিয়া ফানা ফিশ শেখ'-এর মোকাম পূর্ণ হয়। এই অবস্থায় পীরে কামেলের পাক রূহ মুবারকের সহিত মুরীদের রূহ এমনভাবে মিশিয়া যায় যেমন দুধের সহিত চিনি। পারস্যের মহা কবি হাফিজ (রঃ) ছাহেব এমনি অবস্থায় উপনীত হইয়া বলিয়াছিলেন "আজ রুনাবাদ দরিয়া হইতে এমনি এক লজ্জত আমার দেলে আসিতেছে যাহা বেহেশতেও মিলিবে না। এই রুগ্মাবাদ দরিয়া হইল আমার পীরের দেল।"
এই ফানা ফিশ শেখের মাকামে মুরীদ আপন মুর্শিদে কামেলের রূহকেই নিজ রূহ বলিয়া মনে করে। নিজের রূহের অস্তিত্ব তখন পুরাপুরি বিস্মৃত হয়। এই অবস্থায় মুরীদ যে দিকে তাকায় আপন মুর্শিদে কামেলকেই দেখিতে পায়। এই বিশেষ স্থানে থাকিয়া উপরে স্থিত সিফাতে এরাদতের পর্দা হইতে নূর গ্রহণ করাকে মাকামে আদিয়াত বলা হয়। যদিও অন্য লতিফা সকলের ফয়েযান আদিয়াত মাকাম হইতে লওয়া হইয়াছে, কিন্তু উহা নিম্নস্থ দায়েরায়ে এমকানের মধ্যে থাকিয়া কোন স্থানে ছুরাতে মেছালীর দ্বারা, কোন স্থানে ছুরাতে রূহীর দ্বারা লওয়া হইয়াছে। সিফাতে এরাদতের নিকটবর্তী এই বিশেষ মাকাম হইতে ফয়েয লওয়া হয় নাই। আর এই আদিয়াতও প্রকৃত আদিয়াত নহে। কারণ ইহাতে সিফাত যুক্ত থাকে। প্রকৃত আইদিয়াতের নূর শেষের শেষ মাকামে পাওয়া যায়।

আল্লাহতায়ালার এরাদতের পর্দা পর্যন্ত রূহের উরুজ' শেষ হইয়া যায়। উহার উপরে রূহের আর গন্তব্য নাই। কারণ রূহ আল্লাহপাকের এরাদতের বা ইচ্ছারই সৃষ্টি। এই সিফাতে এরাদতের পর্দা হইতে রূহের সৃষ্টি। এখানেই রূহের উৎপত্তি। এখানেই রূহ এরাদতের পর্দার সহিত বিলীন হইয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার আরশের উপর ৭০ হাজার নূরের আর অন্ধকারের পর্দা রহিয়াছে। ইহা ছাড়াও রহিয়াছে আটটি সিফাতের পর্দা। এই ৮টি পর্দা ভেদ করিতে না পারিলে আল্লাহপাকের জাতের নৈকট্য প্রাপ্তি সম্ভব নয়। এই আটটি পর্দা পোশাক সদৃশ। কোন মানুষের পোষাক ভেদ না করিলে যেমন তাহার মূল দেহ স্পর্শ করা যায় না, তেমনি এই ৮টি পর্দা ভেদ করিতে না পারিলে আল্লাহপাকের জাতে পৌঁছান যায় না। পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ ছাড়া কেহই এই ৮টি মহাগ্রন্থ সদৃশ সিফাতের পর্দা অতিক্রম করিতে পারে না। এই ৮টি সিফাতের পর্দা হইল আল্লাহপাকের হাকীকী গুণের সমষ্টি। সে গুলি হইলঃ (১) হায়াৎ (জীবন), (২) এলেম (জ্ঞান), (৩) কুদরত (ক্ষমতা), (৪) এরাদত (ইচ্ছা), (৫) বাছারাত (দর্শন), (৬) ছামা'আত (শ্রবণ), (৭) কালাম (কথা) ও (৮) তাকবীন (সৃষ্টি করণ)।
আল্লাহপাকের সিফাতের পর্দাসমূহ জাতের সহিত মিশিয়া জাতকেও ঐ সকল গুণে গুণান্বিত করিয়াছে। তাহাকেই 'কাবেলীয়াতে ইত্তেছাল' বা আল্লাহতায়ালার শান ও শয়নাত বলা হয়। উহারই মধ্যে হকিকতে মুহাম্মদী (সাঃ) নিরূপিত আছে।
অতএব এই মাকামে আল্লাহতায়ালার জাত আহ্দিয়াতের নূরের ফয়েজ লইতে হইলে রাসূলে করীম (সাঃ) এর অসিলা লইতে হইবে। খেয়াল করিতে হইবে "খোদাতায়ালার নূর সিফাতে এরাদত হইতে নবী করীম (সাঃ) এর উপর পড়িতেছে এবং হযরত (সাঃ) হইতে আমার উপর পড়িতেছে।" এই মাকামের নূরের কোন রং নাই। এই মাকামে নূর রূহ হইতে কালবে পতিত হইলেও তরীকতের পীরানে পীরগণের অভিমত, এই মাকামের নূর সকল লতিফায় পড়িতে কিম্বা আসিতে থাকে।
বিজ্ঞাপন
এই মাকামে নাফী-এসবাত জেকের করিতে হইলে নিয়ত করিতে হইবে, "লা মাকছুদা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; লা মতলুবা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।" আল্লাহ ভিন্ন আমার আর কোন মঞ্জুদ বা মতলুব নাই। সেই পবিত্র জাত হইতে যিনি সমস্ত সিফাত বা গুণের উৎস ও আধার; যাহার কোন লয় বা ক্ষয় নাই; ও সকল দোষ হইতে পবিত্র তাহার নূর আমার মধ্যস্থের উপরে আসিয়া পড়িতেছে।
ছালেক এই মাকামে আসিলে মুরাকাবায় নূরের পতন এত অধিক দেখিবে যে, আপনার বলিয়া জানা পীরের রূহুও তখন সে বিস্মৃত হইয়া যাইবে। এই সময়ে ছালেক দ্বিতীয় দায়েরায় অগ্রসর হইবে বা উপস্থিত হইবে।
বেলায়েতে ছোগরাঃ- দ্বিতীয় দায়েরা বেলায়েতে ছোগরার দায়েরা। ইহাকে মা'ইয়াতের মাকামও বলা হয়। আবার আসমা ও সিফাতের জেলাল বা প্রতিবিম্বের দায়েরাও বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
এই মাকামে পীরের রূহ রাসূলে করীম (সঃ) এর রূহানী ছুরাতে বিলুপ্ত হওয়াতে এই দায়েরায়ে ফয়েজের নূর রাসূলে করীম (সঃ) এর পাক দেলের উপর পড়িতে থাকে। এই মাকামকেই ফানা ফির রাসূল' এর মাকাম বলে। এই মাকামের ফয়েজ লইতে হইলে খেয়াল করিতে হইবে-“আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের ফয়েজ ঐ পবিত্র জাত হইতে ছোগরা বেলায়েতের দায়েরা দিয়া আমার দেলের উপর পড়িতেছে যে জাত আমার সংগে, আমার সমস্ত শিরা-উপশিরা, রক্ত-মাংস, হাডিড-মজ্জা তথা দেহের প্রত্যেক অনু-পরমাণুর সংগে এবং সকল সৃষ্টির রেণু রেণুর সংগে আছেন।” তখন আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের ফয়েজ দ্বারা সমস্ত লতিফা জিন্দা হইবে।
এই দায়েরাতে দয়াল পীর দস্তগীর হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব আমাকে ছবক দিয়া বলিলেন, "বাবা, এই দায়েরায় পৌঁছাইলে মুরীদের আর কোন কিছুর হুঁশ জ্ঞান থাকে না। মতিভ্রম হয়। নিজের দিকে, এমন কি পরণের কাপড়ের দিকেও খেয়াল থাকে না। আমি আল্লাহপাকের নিকট দু'আ করি, এই মাকামের ফয়েজ হাসিল করিতে তোমার যেন কোন রূপ অসুবিধা না হয়। আল্লাহপাক তোমাকে তরীকতের সকল ফয়েজান হাসিল করিবার ক্ষমতা প্রদান করুন।"
এই মাকামে আসিলে মুরীদের অবস্থা অপ্রকৃতিস্থ হইবার কারণ রহিয়াছে। এই মাকাম আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্ব পতনের স্থান। এই দায়েরায় তাই নূরের পতন এত অধিক হইয়া থাকে যে, ছয় দিক বা দশ দিক হইতে নূরের তুফান এমন বেগে প্রবাহিত হয় যে, তাহাতে আসমান জমিনসহ তামাম সৃষ্টি সেই সমুদ্রে মুদ্রে নিমজ্জিত দেখা যাইবে; মুরীদ তখন নিজেকেও নূরের মধ্যে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত দেখিবে। নিজেকেও সে তখন আর নূর হইতে পৃথক করিতে পারিবে না। মুরীদ তখন নূরের সাগরে তন্ময় হইয়া থাকিবে। দুনিয়ার দিকে, নিজের পোশাকের দিকে, খাওয়া-দাওয়ার দিকেও তখন আর তাহার কোন দৃষ্টি থাকিবে না।
বিজ্ঞাপন
মুরীদ তখন তাহার চোখে নূর ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পাইবে না। সমুদ্র গর্ভে যেমন মৎস, শৈবাল, পাহাড়-পর্বতাদি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দর্শকের চোখে পানি বিশিষ্ট সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। তখন মুরীদের চোখে-
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ
অর্থাৎ-"আল্লাহতায়ালা সর্ব ব্যাপী; তিনি অনাদি অনন্ত এবং সর্বত্র বিরাজিত"- তাহা স্পষ্ট হইবে।
হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) ঐ মাকামে যাইয়া নূরের সমুদ্রে নিজেকে নিমজ্জিত দেখিতে পাইয়া বলিয়াছিলেন,
أَنَا الْحَقُّ
অর্থাৎ- "আনাল হক।"
তিনি বস্তুতঃ তখন নিজেকে খোদার নূরে নিমজ্জিত দেখিয়া নূর হইতে নিজেকে আর পৃথক করিতে পারেন নাই। এই রূপ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রাঃ) ছাহেবও ঐ নূরের নেশায় মত্ত হইয়া বলিয়াছিলেন,
أَنَا سُبْحَانُ مَا شَانِي
অর্থাৎ-"আমি সোবহান, কি মহৎ আমার শান!"
এই মাকামের ফয়েজানে মুরীদ এতই নিমজ্জিত হইয়া যায় যে, তাহার স্বাভাবিক জ্ঞান ঠিক থাকে না, বেকারার' হইয়া যায়।
এই মাকামে নাফী-এসবাত জেকের হইতে এই নিয়ত করিতে হইবে যে অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কেহ আমার মঞ্জুদ ও মতলুব নাই। আমার সংগে তুমি ব্যতীত কেহ নাই। মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) খোদাতায়ালার প্রেরিত রাসূল। হে খোদাতায়ালা! আমার বাঞ্ছিতও তুমি; তোমার রাজি থাকাই আমার বাঞ্ছা, তুমি নিজের মহব্বত ও মারেফত আমাকে দয়া করিয়া দান কর।
এই মাকাম খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্ব পতনের স্থান। এই দায়েরায় প্রকৃত মা'ইয়াত বা আল্লাহতায়ালার প্রকৃত সান্নিধ্য সম্পূর্ণ হয় না। কারণ এই স্থানে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের ঝলক ও জ্যোতি ভিন্ন আল্লাহপাকের মূল জাতের সহিত সান্নিধ্য লাভহয় না। প্রকৃত মা'ইয়াতের মাকাম বা আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভহয় এমোজ্জাহেরে। তখন সমস্ত কিছু হইতে পৃথক পৃথক ফয়েজান পাওয়া যাইবে।
এই দায়েরায়ে জেলাল হইতে জাতের ক্রিয়াকলাপের জ্যোতি প্রকাশ পাইয়াছে। এই স্থানেই কালবের মূল বা আসল বা মহাকালব রহিয়াছে। ইহাই কালবের ফানা হইবার স্থান। এই মাকামে অধিকার জন্মিলে নিজের এবং অন্যের সকল কর্ম যে জ্যোতির্ময় খোদাতায়ালা ভিন্ন আর কাহারও নয়, তাহা স্পষ্ট হইবে। রাসূলে করীম (সাঃ) এর অস্তিত্বে বিলুপ্ত মুরীদের রূহতে নূর এত পরিমান পড়িবে যে, সমস্ত জগতে খোদাতায়ালার জ্যোতি ভিন্ন আর কিছুই দেখা যাইবে না। এই মাকামে অধিকার জন্মিলে পূর্বে প্রকাশিত বিশাল জগৎ খোদাতায়ালার নূরের সমুদ্রে অদৃশ্য হইয়া যাইবে। এই পর্যন্ত ছায়েরে এলাল্লাহ” সমাপ্ত।
ইহার পরে পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহতে ছালেক তৃতীয় দায়েরার দিকে অর্থাৎ বেলায়েতে কোবরার দিকে অগ্রসর হইবে। সে বিষয় সম্পর্কীয় আলোচনা বিধৃত আছে পরবর্তী নসিহতে।
হে জাকেরান সকল! জামানার শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ, আমার দয়ালপীর, দস্তগীর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের পর এত বড় আকাবের ওলী এই দুনিয়াতে আর আসেন নাই। সেই মহান পীরে কামেলের পাক আত্মার সহিত যদি তোমরা সম্পূর্ণ মিশিয়া যাইতে পার, তবে আসমা ও সিফাতের বা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বের ফয়েজ তোমরা পাইতে থাকিবে। হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের মত আকাবের ওলী পৃথিবীতে খুব কমই আসেন; আসমানের একটি চন্দ্র যেমন কোটি কোটি তারকা ও পৃথিবীকে আলোকিত করে, তেমনি আকাবের ওলী পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে আল্লাহতায়ালার প্রেম সুধা পান করাইতে সক্ষম হন। পথিবীর সমগ্র মানব জাতি তথা সৃষ্টি জগতের জন্য তিনি আল্লাহতায়ালার রহমত ও নেয়ামত বহন করিয়া আনেন। তাই খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের মতন আকাবের ওলী সমগ্র পৃথিবী ও মানব জাতির জন্য গৌরব।
অতএব হে জাকেরান ও আশেকানগণ! খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব এই জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ যাহার পাক দেল হইতে এই সকল ফয়েজ এখনও তোমরা পাইতেছ। তদীয় পাক আত্মার যোগাযোগেই আল্লাহতায়ালার জালাল ও জামালের ফয়েজ পাওয়া যায়, আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য পাওয়া যায়। অতি ভাগ্যের জোরে মুর্শিদের বোল। আমাদের অতি ভাগ্যের জোরে এই দেশে হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের মত আকাবের ওলী জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার সন্ধান তাই আমরা পাইয়াছিলাম। তিনি তদীয় নেয়ামতের ডালা তোমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন। সেই নেয়ামতের ডালা হইতেই তোমাদের জন্য প্রতিদিন রহমত ও নেয়ামত বিতরণ করা হইতেছে, যাহাতে তোমরা দীন ও দুনিয়ার কামিয়াবী লাভ করিতে পার। তোমরা যদি তরীকতের নিয়ম অনুযায়ী চল তবে তোমাদের মুর্দা দেল জিন্দা হইবে।
বেলায়েতে ছোগরার এই দায়েরাতে সিফাতে হাকীকী ও সিফাতে এজাফিয়ার নূর প্রকাশিত হওয়ায় আল্লাহতায়ালার ভেদের এক মহা সমুদ্রের সহিত মুরীদ পরিচয় লাভ করে, যে সমুদ্রের কোন কূল কিনারা পাওয়া যায় না। যে সম্পর্কে মহা কবি হাফেজ বলিয়াছেন, "কত কিন্তুি, কত নৌকা এই সমুদ্রে ডুবিয়া গেল; তাহার একটি তাও আর ভাসিয়া কিনারে আসিল না।" আল্লাহতায়ালার ভেদের সেই মহাসমুদ্রের তুলনা হয় না। এখানে পুরাপুরিভাবে রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাসিল হয়। রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাসিল হইলে মুরীদ সর্বাবস্থায় আপদে-বিপদে আপন পীরে কামেলকে কাছে পায়। তখন পীরে কামেলকে মুরীদ কি ভাবে কাছে পায় তাহার একটি দৃষ্টান্ত তোমাদের বলিতেছি।
একবার আমি এনায়েতপুর পাক দরবার শরীফে উরস মুবারকে যোগদানের জন্য আমার বাড়ী শেরপুর হইতে রওয়ানা হই। আকাশে ঘন কালো মেঘ। মুষলধারে বৃষ্টি হইতেছে। উরস শরীফ সন্নিকটে বিধায় আমি প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যেও স্টীমার ধরার জন্য জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে যাই। সেই সময় একদিন পর পর স্টীমার চলিত। তাই সেদিন স্টীমার ছিল না-পাওয়া গেল না। এই দিকে আবহাওয়া ভীষণ খারাপ। প্রচন্ড বৃষ্টি হইতেছিল। সেই বৃষ্টির মধ্যে আমি জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে ছুটাছুটি করিতে করিতে ভাবিতেছিলাম, কি উপায়ে ঠিক সময়ের মধ্যে দরবার শরীফে পৌঁছাইব। এই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে কোন নৌকা ছাড়িবে কিনা, ছাড়িলেও নিরাপদ হইবে কিনা তাহা ভাবিতেছিলাম। কারণ তখন মাঝে মাঝেই নৌকায় ডাকাতি হইবার খবর পাওয়া যাইত।
মাঝি মাল্লারা নিজেরাও অনেক সময়ে ডাকাতি করিত। যদি কোন ডাকাতের নৌকায় গিয়া উঠি তা হইলেই বা উপায় কি হইবে। এই সব ভাবিয়া ভাবিয়া আমি বৃষ্টির মধ্যেই জগন্নাথগঞ্জের ঘাটে ছুটাছুটি করিতেছিলাম। এমন সময় দেখিতে পাইলাম একটা নৌকা হইতে পীর কেবলাজান হুজুর আমাকে ডাকিয়া বলিতেছেন, "বাবা, তাড়াতাড়ি এই নৌকায় ওঠো।" আমি সেই নৌকায় গেলাম। ভাবিলাম, আমার পীর কেবলাজান যখন স্বয়ং ডাকিতেছেন, তখন আর ভয় করিবার কিছু নাই। নৌকার লোকদের জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম তাহারা সোহাগপুরে যাইবেন। সোহাগপুর ঘাট হইতে এনায়েতপুর যাইবার পথ ছিল। আমি খুশী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, "আপনারা সোহাগপুর গেলে আমাদের কি নিতে পারেন?" তাহারা বলিল, "আমরা সোহাগপুর যাইব। আপনারা গেলে আমরা নেব না কেন?" ঐ নৌকায় করিয়া আমরা ঠিক ঠিক সময় উরস শরীফে পৌছাইলাম।
এইরূপে বিপদে আপদে কামেল পীর মুরীদকে রূহানী শক্তির দ্বারা রক্ষা করেন। উরস শরীফে উপস্থিত হইয়া পীর কেবলাজানকে যখন ঘটনাটি বলিলাম, তিনি পূর্বাপর শুনিয়া বলিলেন, "পীরের মহব্বতে যাহার দেল পূর্ণ, সমুদ্রের গর্ভেও আল্লাহপাক তাহাকে সাহায্য করেন।"
তাই তোমাদের বলিতেছি, হযরত পীর কেবলাজান হুজুর (কুঃ) ছাহেব তাহার সকল নেয়ামতের ডালা রাখিয়া গিয়াছেন। জানিয়া রাখ, আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিয়াছেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ -
অর্থাৎ- "সাবধান! নিশ্চয়ই ওলী-আল্লাহদের দুঃখিত বা গমগীন হইবার কিছু নাই।” (সূরা ইউনুসঃ ৬২) এবং
হযরত রাসূলে করীম (সঃ) ফরমান,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا يَمُوْتُوْنَ
অর্থাৎ-"সাবধান! নিশ্চয়ই ওলী-আল্লাহগণের মৃত্যু নাই।"
ওলী-আল্লাহসকল ওফাতের পর মানব দেহে থাকেন না, তবে পর্দার আড়ালে রূহানী দেহে সকল স্থানে তাহারা বিরাজমান থাকেন। কবির ভাষায়-
"জাগ্রত পরাণ যার মরে না সেজন,
দৈহিক মরণ তার নহেরে মরণ;
শত শত মুর্দা দেল মাটির উপরে,
তার চাইতে অধিক ভাল যদিও কবরে।"








