মানুষ পাপাচারে লিপ্ত থাকায় কালব বা দেলে ময়লা পড়ে

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘আত্মদর্শনের পথে মাকাম-মঞ্জিল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আলমে মেছালের পরিচয় এবং খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাসিলের পথে আলমে মেছালের ভূমিকাঃ
বিজ্ঞাপন
পবিত্র আল কুরআনে আল্লাহপাক বলেন,
مَنْ كَانَ فِي هَذِهِ أَعْمَى فَهُوَ فِي الْآخِرَةِ أَعْمَى
অর্থাৎ-"এই জগতে যে ব্যক্তি অন্ধ, পরজগতেও সেই ব্যক্তি অন্ধ থাকিবে। "(সূরা বনি-ইস্রাইলঃ ৭২)
বিজ্ঞাপন
এই অন্ধত্ব চর্মচোখ বা দৈহিক চোখের অন্ধত্ব নয়। চর্মচোখ ছাড়াও আল্লাহপাক মানুষকে পৃথক এক চক্ষু প্রদান করিয়াছেন-যাহার নাম কালবী চক্ষু বা অন্তর চক্ষু বা দেলের চক্ষু। উল্লিখিত আয়াতে দেলের (কালবের) চক্ষু বা অন্তর চক্ষুর অন্ধত্বের কথা বলা হইয়াছে।
কালব ঊর্ধ্ব জগতের উপাদান। কালব অত্যন্ত স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন। কিন্তু মানুষ পাপাচারে লিপ্ত থাকায় কালব বা দেলে ময়লা পড়ে। ফলে কালব তাহার স্বচ্ছতা হারায়। মানুষ নাফসের কু-প্ররোচনায় পড়িয়া পাপ বা অন্যায় করিয়া তদীয় স্বচ্ছ কালব বা দেলে মরিচা ফেলে। দুষ্ট নাফসের প্রভাব হইতে মুক্ত হইতে পারিলে মানুষের কালব বা দেল পুনরায় স্বচ্ছ হয়। স্বচ্ছ বা পরিচ্ছন্ন কালবে তখন খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের নূর প্রতিফলিত হয় এবং খোদাতায়ালার নিদর্শনাবলী ছালেকের চোখে দৃষ্ট হয়। নাফসের প্রভাব মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কালবে পুঞ্জিভূত পাপের ময়লা দূর হওয়া সম্ভব নয়। পাপের ময়লাই অন্তর চক্ষুর ছানি। নাফসের প্রভাবমুক্ত বা দাসত্বমুক্ত হওয়া অর্থই অন্তর চক্ষু বা কালবী নেত্রের ছানি অপসারিত হওয়া; এক কথায় দেলের চোখের অন্ধত্ব মোচন হওয়া, হারানো জ্যোতি ফিরিয়া পাওয়া। দেলের চোখ উন্মীলিত হওয়ার পরে আল্লাহপাকের অসংখ্য নিদর্শন ছালেক দেখিতে পায়, যে নিদর্শনাবলী দেখিবার আহবান স্বয়ং খোদাতায়ালাই মানবজাতিকে করিয়াছেন। আল্লাহপাক বলেন,
وَ فِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"আমার নিদর্শনতো তোমাদের মধ্যেই আছে, তোমরা দেখ না কেন?" (সূরা জারিয়াতঃ ২১)
আল্লাহপাকের অগণিত নিদর্শনাবলীর মধ্যে অতি আশ্চর্য ও অপরূপ এক নিদর্শন হইল আলমে মেছাল। "মেছাল" আরবী শব্দ। যাহার আভিধানিক অর্থ উদাহরণ, উপমা বা রূপ। আলমে মেছাল অর্থ উদাহরণিক জগত, উপমার জগত বা রূপজগত। মোক্কেন বা সৃষ্ট জগতকে মূলতঃ তিনভাবে ভাগ করা হইয়াছে। যথাঃ
• আলমে আরোওয়াহ বা রূহানী জগত।
বিজ্ঞাপন
• আলমে মেছাল বা উদাহরণিক জগত বা উপমার জগত।
• আলমে শাহাদাত বা দৈহিক জগত বা জড় জগত।
আলমে আরোওয়াহ বা রূহানী জগতের একটু নীচে আলমে মেছাল বর্তমান। অন্যান্য জগতের সাথে আলমে মেছালের তফাৎ এই যে, অন্যান্য জগতে ছায়ের বা ভ্রমণ করা যায় কিন্তু আলমে মেছাল ছায়ের করার জন্য নয়। আলমে মেছালকে আল্লাহপাক দর্শনার্থে সৃষ্টি করিয়াছেন। সৃষ্টির আদি হইতে অর্থাৎ আল্লাহপাক যখন 'কুন' বলিয়া সৃষ্টি করিলেন, সেই হইতে শুরু করিয়া কিয়ামত পর্যন্ত; বরং কিয়ামতের বিচার কার্যের পরে বেহেশত ও দোযখের অনন্তকাল পর্যন্ত যাহা কিছু সংঘটিত হইবে, তাহা সবই সূক্ষ্ম আকৃতিতে বা ছুরাতে আলমে মেছালে বর্তমান। আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট ১৮,০০০ আলম এবং আলমস্থিত সমুদয় সৃষ্টি এবং সমস্ত তত্ত্বের ছুরাত আলমে মেছালে আল্লাহপাক সংরক্ষিত রাখিয়াছেন যাহা ওলীয়ে কামেল সকলকে তিনি দয়া করিয়া দেখান। আলমে মেছাল দর্শনের ক্ষমতা যে সব ছালেক অর্জন করিয়াছেন, তাহারা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জ্ঞানে জ্ঞানী হন। সৃষ্টির আদি হইতে অন্ত পর্যন্ত যাহা কিছু হইয়াছে এবং হইবে, তাহার ছুরাত বা রূপ আলমে মেছালে বর্তমান থাকায় উক্ত ছালেক মেছালী জগত দর্শন করিয়া আদি অন্তের জ্ঞানে জ্ঞানী হন।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞান আবিষ্কৃত টেলিভিশন জ্ঞান অর্জনের এক উন্নত মাধ্যম। প্রতি বছর হজ্জ্বের সময় সরাসরি হজ্জ্ব অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখানো হয়। এই দেশের মুসলমানেরা টেলিভিশনের পর্দায় সেই হজ্জ্ব অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করিয়া হজ্জ্বের ফয়েজ পায় এবং হজ্জ্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। আলমে মেছাল খোদাতায়ালার এক আশ্চর্য টেলিভিশন, যে টেলিভিশনের বিশাল পর্দায় সমগ্র সৃষ্টি জগত, জগতস্থিত ব্যক্তি, বস্তু এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঘটনাবলীর ছুরাত বা আকৃতি দরশন করিয়া ছালেক সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী হয়। শুধু যে সৃষ্টি জগত ও জগতস্থিত সমুদয়ই মেছালী পর্দায় প্রতিফলিত হয় তাহা নহে, আল্লাহপাকের জাত পাক ব্যতীত তদীয় সমুদয় কামালাতের ছুরাতও আলমে মেছালে দৃষ্ট হয়।
আল্লাহপাকের ওজুদ, সিফাত, সিফাতে এজাফিয়া, সিফাতে হাকীকী, তথা নাম, গুণ, শান, মহব্বত ও শয়ুনাত, সবেরই সূক্ষ্ম রূপ আলমে মেছালে দেখা যায়। আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাত ব্যতীত, নাম, গুণ, শান, শয়ুনাত, মহব্বত তথা সর্ববিধ কামালাতের জ্ঞান আলমে মেছাল রূপ টেলিভিশনের পর্দা হইতে ছালেক অর্জন করিতে পারে। তবে যে ছালেক বেলায়েতে ছোগরাতেই উরূজ শেষ করেন, তিনি বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত সকল অবস্থা আলমে মেছালে দেখিতে পান। তিনি আকরাবিয়াত হইতে তদূঊর্ধ্বের মাকাম সমূহের অবস্থা বুঝিতে পারেন না, আলমে মেছালে ঊর্ধ্ব জগতের কোন কিছুই তিনি দেখিতে পান না।
কিন্তু যিনি মহান খোদাতায়ালার দয়ায় আকরাবিয়াতে প্রবেশ করেন তথা আল্লাহপাকের প্রেমের হেরেমের সিংহদ্বার দ্বারা মারেফতের মূল রাজ্যে প্রবেশ করিয়া মহব্বতে আওয়াল, মহব্বতে ছানী, কাওছ, বেলায়েতে উলিয়া, কামালাতের দায়েরা সমূহ, হকিকত ও মহব্বতের দায়েরা সমূহ বিচরণ করিয়া খোদাতায়ালার জাত পাকের প্রান্ত হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফায় পৌঁছান, তিনি পবিত্র জাত ভিন্ন সবই তথা সমস্ত দায়েরার অবস্থা এবং বাতেনী জগতে বিচরণে তাহার যে অগ্রগতি বা উন্নতি হইয়াছে, তাহাও আলমে মেছালের পর্দায় দেখিতে পান। আলমে মেছালের পর্দায় জাতপাক দেখা যায় না; কারণ জাতপাকের কোন ছুরাত নাই, আকার নাই। তবে হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফা হইতে ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার দ্বারা ছালেক জাত পাকের দর্শন লাভ করেন।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আলমে মেছালকে আয়না বা দর্পণের সাথে তুলনা করিয়াছেন। দর্পণ বা আয়নাতে যাহা কিছু দৃষ্ট হয়, তাহা বাহির হইতে আগত। ঠিক তেমনি আলমে মেছালে যাহা কিছু দৃষ্ট হয়, তাহা সমুদয়ই বাহির হইতে আগত। অর্থাৎ আলমে আরোওয়াহ, আলমে শাহাদাত বা দৈহিক জগত এবং অন্যান্য জগত ও জগতস্থিত সমুদয়ই আলমে মেছালের দর্পণে বা আয়নাতে প্রতিফলিত হয়। প্রতিবিম্বিত সেই দৃশ্যাবলী দেখিয়া ছালেক তদীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রের পরিধি বৃদ্ধি করে।
আলমে মেছালের দর্শন ছালেকের জন্য খুবই উপকারী। মুসলমান আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করে। আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর নিদের্শিত পথে আমল করে; কিন্তু আমলের ফলাফল সে বুঝিতে পারে না। নেক আমলের শুভ ফলাফল যে সে প্রাপ্ত হইবে-ইহা সে বিশ্বাস করে। কিন্তু কতটুকু বিশ্বাস করা হইল, কতটুকু আমল করা হইল; কৃত বিশ্বাস বা আমলের ফলাফলইবা কতটুকু পাওয়া গেল, তাহা সাধারণ ঈমানদার মুসলমানেরা বুঝিতে পারে না। কিন্তু যে ছালেক আত্মিক সাধনার মাধ্যমে ঊর্ধ্বালোকের পানে উরুজ করেন, তিনি তাহার আমলের ফলাফল যেমন সূক্ষ্ম আকৃতি বা ছুরাতে আলমে মেছালের পর্দায় দেখিতে পান, ঠিক তেমনি স্রষ্টার প্রতি তদীয় বিশ্বাস তথায় নিজ ছুরাতে দেখিতে পান। বিশ্বাস জ্ঞানমূলক অবস্থা। বিশ্বাস কালব বা দেলের সহিত জড়িত। কালবের মূল আরশ, মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আ্যাল। তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের প্রকাশ বেলায়েতে ছোগরায়। কালব ইহার মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফ্যালে ফানাপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বাসের সম্পর্ক কালবের সাথে হওয়ায়; সাধারণ বোঝাবুঝির এই বিশ্বাস বেলায়েতে ছোগরার শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছায়। সাধারণ বোঝাবুঝির জ্ঞান আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিতে পারে না। ফলে প্রকাশগত বিশ্বাসও আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিতে পারে না।
খোদাতায়ালার প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস আনয়ন প্রথম দরকার হইয়াছিল আলমে আরোওয়াহতে বা বেলায়েতে ছোগরায় বা নাফসে মোৎমাইন্ন্যার জগতে। সৃষ্টির হকিকত সিফাতে হাকীকীতে বর্তমান ছিল। সিফাতস্থিত হকিকত সমূহের প্রতি 'কুন' শব্দ প্রয়োগ করায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম অবস্থায় রূহ সমূহ সৃষ্ট হইয়া আলমে আরোওয়াস্থিত হইল। এই আলমে আরোওয়াহস্থিত সকল রূহকে উদ্দেশ্য করিয়াই আল্লাহপাক বলিয়াছিলেন,
বিজ্ঞাপন
الَسْتُ بِرَبِّكُمْ
অর্থাৎ-"আমি কি তোমাদের প্রভু নই?” উত্তরে সমস্ত রূহ একত্রে বলিয়াছিল,
بلی
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"নিশ্চয়ই তুমি আমাদের প্রভু।"
ছালেক প্রভুর প্রতি তদীয় এই বিশ্বাসকে আলমে মেছালের পর্দায় তাহার নিজেরই ছুরাতে দেখিতে পায়। মারেফতের ভাষায় উৎপত্তিস্থলকে 'রব' বলা হয়। বিশ্বাসের উৎপত্তিস্থল আল্লাহপাকের সিফাতে 'রব'। বিশ্বাসের যে ছুরাত ছালেক আলমে মেছালের পর্দায় দেখিতে পায়, তাহাই ছালেকের বিশ্বাসের উৎপত্তিস্থল বা রব। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, 'আল্লাহ' ও 'রব'- এই দুইয়ের তফাৎ কি? আল্লাহ হইল খোদাতায়ালার জাতি নাম। পবিত্র জাত আল্লাহ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু 'রব' খোদাতায়ালার একটি সিফাত; যাহা সিফাতে এজাফিয়ার অন্তর্গত। সিফাতে হাকীকীর নীচে বেলায়েতে ছোগরায় সিফাতে এজাফিয়া বর্তমান। পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তাই বলিয়াছিলেন,
رَأَيْتُ رَبِّي عَلَى صُورَةِ شَابٌ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- "আমি আমার রবকে দাড়ী-গোফ বিহীন যুবকের ন্যায় দেখিয়াছি।"
মূলতঃ আল্লাহপাকের জাতের কোন ছুরাত নাই। জাতপাক নিরাকার, অবোধগম্য ও অবর্ণনীয়। তবে ছালেক তদীয় পূর্ণ বিশ্বাসকে আলমে-মেছালের পর্দায় নিজেরই ছুরাতে দেখিতে পায় যাহা বিশ্বাসের উৎপত্তিস্থল বা রব বা প্রতিপালন কর্তার গুণের প্রতিফলিত ছুরাত।
ছালেক তদীয় বিশ্বাস ও আমলের ফলাফল সূক্ষ্ম ছুরাত বা আকৃতিতে আলমে মেছালে দেখিতে পাইয়া এক অভূতপূর্ব শান্তি পায়, যে শান্তি বা আনন্দ প্রকাশ করিবার ভাষা সৃষ্ট হয় নাই। ইহা অনুভূতির ব্যাপার। এই অনুভূতি বা স্বাদের কোন সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত কেহই দিতে পারে নাই। স্বাদ কি? এই প্রশ্নের কোন জওয়াব নাই। কেহ এক চামচ মধু পান করিল। ইহাতে সে এক প্রকার তৃপ্তি পাইল। কিন্তু মধু পান করে নাই, এমন লোক যদি মধুপানকারীকে জিজ্ঞাসা করে, "আপনি মধু পান করিলেন। তাহা কেমন লাগিল বলুন? ইহার জবাব মধুপানকারী দিতে অক্ষম। একটাই উপায় আছে, তাহা হইল প্রশ্নকারীর জিহবায় এক চামচ মধু প্রদান করা।
বিজ্ঞাপন
আলমে মেছালের পর্দায় অপূর্ব দৃশ্যাবলী দৃষ্টে যে তৃপ্তি বা আনন্দ পাওয়া যায় তাহা বুঝিতে হইলে মেছালী জগত পর্যন্ত উরুজ করিতে হইবে। কিন্তু নাফসের দাসত্ব মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর দৃষ্টির ছানি অপসারণ, দেলে আল্লাহর নূর আগমন, কিংবা আলমে মেছাল দর্শন-কোনটাই সম্ভব নয়। নাফসের দাসত্ব মুক্তির জন্য পীরে কামেলের কদমে কঠোর খেদমত প্রয়োজন। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী নামক ধারালো অস্ত্রের সাহায্যেই কালবী নেত্র বা দেলের চক্ষুর ছানি অপারেশন সম্ভব। ইহার কোন বিকল্প নাই।
ওলীয়ে কামেলসকল মাঝে মাঝে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তাহা কি ভাবে? ওলীয়ে কাশ্মিরী হযরত নেয়ামতউল্লার ভবিষ্যদ্বাণীর কথা সর্বজনবিদিত। আজ থেকে সাতশত (৭০০) বছরের অধিককাল পূর্বে তিনি জগতের বিভিন্ন ঘটনার উপরে বহু ভবিষ্যদ্বাণী করেন; যাহা সবই বাস্তবে রূপ লাভ করিয়াছে। তিনি প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ, এমন কি তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ সম্পর্কেও ভবিষ্যৎবাণী করিয়াছিলেন। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ সম্পর্কে যা যা বলিয়াছিলেন, তাহা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবে প্রতিফলিত হইয়াছে। বাকী বাণী সমূহ বাস্তবায়িত হইবে-ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ ওলীয়ে কাশ্মিরী হযরত নেয়ামত উল্লাহ (রঃ) ছাহেব আলমে মেছালে সংরক্ষিত ঘটনাবলীর ছুরাত দেখিয়াই ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন-তাই তাহার ব্যক্ত বাণী সত্য। তিনি নিজেই বলিয়াছেন যে, "আমি যাহা বলিতেছি তাহা কোন জ্যোতিষীর গণনা দ্বারা নয়, আমি অন্তর চক্ষু দ্বারা দেখিয়াই বলিতেছি।"
তরীকার ইমাম হযরত শায়খ আহমদ সেরহিন্দী মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের অতি শৈশবের একটি ঘটনা। তিনি তখনও দুগ্ধপোষ্য শিশু। এমতাবস্থায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং পীড়ার বেগতিক অবস্থা দেখিয়া তদীয় বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন দুশ্চিন্তায় পড়েন। এমন সময় ঘটনা ক্রমে হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেব সেরহিন্দে তশরীফ আনিলেন। তাহার আগমনের সংবাদ পাইয়া শিশু মুজাদ্দেদ (রঃ) এর পিতা আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব অসুস্থ দুগ্ধপোষ্য পুত্রকে লইয়া হযরত শাহ কামাল (রঃ) এর নিকট লইয়া যান। শিশুকে দেখামাত্রই হযরত কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেব জজবা হালাতে বলিয়া ফেলিলেন, "আল্লাহতায়ালা এই শিশুর হায়াত দারাজ করুন।
এই শিশুর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জল। পরিণত বয়সে সে একজন আরেফে কামেল ও হক্কানী আলেম হইবে এবং আমার মত হাজার হাজার লোক তাহার আত্মিক তালিম দ্বারা অশেষ ফায়েদা হাসিল করিবে। খোদাতত্ত্বের যে আলো তাহার মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় ছড়াইবে, তাহা কেয়ামত পর্যন্ত কখনও নিষ্প্রভ হইবে না। জামানার সমস্ত আউলিয়া কেরাম তাহার জন্য অপেক্ষায় রহিয়াছে। অতঃপর হযরত শাহ ছাহেব নিজ পবিত্র জিহবা শিশুর মুখের মধ্যে ঢুকাইয়া দিলেন, আর শিশু পরমানন্দে কিছুক্ষণ যাবৎ উহা চুষিলেন এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হইয়া উঠিলেন।
হযরত কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেব শিশু মুজাদ্দেদকে দেখিয়া যে ভবিষ্যদ্বাণী করিলেন, পরবর্তীতে তাহা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হইল। কারণ হযরত কামাল (রঃ) ছাহেব শিশু মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের ভবিষ্যতের যাবতীয় কর্মকান্ডের ছুরাত বা রূপ আলমে মেছালে দেখিয়াই উপরোক্ত মন্তব্য করিয়াছিলেন।
আমি আমার সমস্ত সহায় সম্পদ জমি জমা বিক্রয় করিয়া প্রাপ্ত টাকা পীর কেবলাজান ছাহেবের কদমে নজরানা দিয়াছিলাম। তৎপর পীরের কদম ছাড়া আমার আর কিছুই ছিল না। চরম দরিদ্রতা ও দুঃখ-কষ্টের ভিতর দিয়া দিন অতিবাহিত করিতাম। আমার দুঃখ দুর্দশা দেখিয়া খাজা ছাহেবেরা পর্যন্ত পীর কেবলাজান হুজুরের নিকট আমার জন্য সুপারিশ করিতেন। পীর কেবলাজান বলিতেন, "আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যাহার জন্য এক উচ্চ সম্মানী চাকুরী রাখিয়াছেন; দুই একদিনের দুঃখ-কষ্টে তাহার আসে যায় কি?” কি যে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন চাকুরী আল্লাহপাক আমার জন্য জমা রাখিয়াছেন, তাহা তখনও বুঝি নাই। কিন্তু আজ তাহা বুঝিতে পারি। আমার পীর কেবলাজানের এই ভবিষ্যদ্বাণী যাহা দীর্ঘকাল পর আমার জীবনে বাস্তবায়িত হইল; তিনি কিভাবে ইহা বলিয়াছিলেন? আসলে আলমে মেছালে আমার জীবনের সাথে জড়িত ঘটনাবলীর ছুরাত বা সূক্ষ্ম আকৃতি দেখিয়া তিনি এমন মন্তব্য করিয়াছিলেন। কাজেই ওলীয়ে কামেল সকল যাহা বলেন, তাহা সত্য।
আলমে মেছালে কত যে আশ্চর্য ঘটনা দেখা যায়, তাহার কোন ইয়ত্বা নাই। হযরত শায়খ ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব 'ফতুহাতে মক্কী' নামক কিতাবে একটি হাদীসের উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীসটি হইল, রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন,
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ مِئَةَ أَلْفِ أَدَمَ
অর্থাৎ-"আল্লাহতায়ালা এক লক্ষ আদম পয়দা করিয়াছেন।"
উক্ত কিতাবে হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব আরও উল্লেখ করেন, একবার কাবা শরীফ তাওয়াফ কালে আমি দেখিতে পাইলাম যে, আমার সংগে এমন কতকগুলি লোক তাওয়াফ করিতেছে যাহাদিগকে আমি চিনি না। তাওয়াফ কালে তাহারা দুইটি আরবী কবিতা আবৃত্তি করিতেছিল। যাহার একটি এই যে,
لَقَدْ طُفْنَا كَمَا طُفْتُمْ ثَانِيًا بِهَذَ البَيْتِ طُرْرًا أَذِي مِنَّا
উচ্চারণঃ
"লাকাদ তোফনা কামা তোফতুম ছানীয়া
বেহাজাল বায়তে তোররা আজামিন্না।"
অর্থাৎ-"আমরা এই ঘরকে বহু বছর হইতে তাওয়াফ করিতেছি, যেমন তোমরা তাওয়াফ করিয়া থাক।"
হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব বলেন যে, আমি যখন এই কবিতা শুনিলাম, তখন আমার মনে উদয় হইল যে, এই সব ব্যক্তিবর্গ আলমে মেছালের বদন (মুখ)। এই কথা আমার মনে উদয় হইতে না হইতে তাহাদের একজন বলিল, "আমি তোমার পিতৃপুরুষ।" আমি তাহাকে বলিলাম, "আপনি কত বছর হইল মরিয়া গিয়াছেন?" তিনি বলিলেন, "আমি চল্লিশ হাজার বছর হইল মরিয়া গিয়াছি।" আমি আশ্চর্য হইয়া বলিলাম যে, হযরত আদম (আঃ) এর জন্ম হইতে অদ্যাবধি মনে হয় সাত হাজারের বেশী বছর অতিক্রান্ত হয় নাই। তিনি বরং জিজ্ঞাসা করিলেন, "আপনি কোন্ আদমের কথা বলিতেছেন? আপনি কি এই সাত হাজার বৎসরের প্রথম ভাগে যে আদম আসিয়াছেন, সেই আদমের কথা বলিতেছেন?" শায়খ মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী বলেন, সেই সময় আমার উপরে লিখিত হাদীস শরীফ তথা "আল্লাহপাক এক লক্ষ আদম পয়দা করিয়াছেন"-ইহা স্মরণ পড়িয়া গেল। এই হাদীসে ঐ ব্যক্তির কথার সত্যতাও প্রমাণিত হইল।"
উল্লিখিত ঘটনা 'ফতুহাতে মক্কী' নামক কিতাবে বর্ণিত আছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রঃ) ছাহেব উক্ত ঘটনার গ্রহণযোগ্য এবং যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা তদীয় মকতুবাদ শরীফে রাখিয়াছেন। তিনি বলেন, হাদীসে যে লক্ষ আদমের কথা বলা হইয়াছে, যাহারা হযরত আদম (আঃ) এর অস্তিত্বের পূর্বে চলিয়া গিয়াছেন তাহাদের অস্তিত্ব আলমে মেছালে হইয়াছিল; এই দুনিয়ায় বা জড় জগত বা স্কুল জগতে নয়। হযরত আদম (আঃ) তিনি, যিনি আলমে শাহাদাতে, স্কুল ও প্রকাশ্য জগতে বর্তমান ছিলেন এবং জমীনে খেলাফতি পাইয়া ফেরেশতাগণের সেজদার পাত্র হইয়াছেন।
আল্লাহপাক নিজ পরিচয়, গুণাবলী ও প্রেম প্রকাশের জন্য মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। হয়ত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করিয়া তাহার দেহে রূহ ফুকিয়া দিলেন। তৎপর নিজ গুণাবলীর প্রতিবিম্ব দ্বারা আদম (আঃ) কে সুসজ্জিত করিলেন। তাহাকে দান করিলেন জীবন, জ্ঞান, চিন্তন, দর্শন, বর্ণন, কল্পন, শ্রবণ ইত্যাদি গুণাবলী; দান করিলেন নেয়ামত সরূপ অসংখ্য লতিফা। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, হযরত আদম (আঃ) এর অস্তিত্বের অগণিত যুগ পূর্বে তাহার গুণাবলীর মধ্যের কোন একটি গুণ অথবা তাঁহার লতিফা সমূহের কোন একটি লতিফা আল্লাহতায়ালার প্রকাশ ইচ্ছায় আলমে মেছালের মধ্যে প্রকাশিত হইল এবং আদমের ছুরাতেই প্রকাশিত হইল এবং তাহার নামে নামীয় হইল। এই মেছালী আদমে ভাবী আদমের কাজ কারবার এই আদম হইতে ঘটিতে থাকিল। এমন কি সন্তান প্রসব ও বংশবৃদ্ধি আলমে মেছালের মধ্যেই প্রকাশিত হইল, কামালাত হাসিল হইল এবং ছওয়াব ও আযাবের উপযুক্ত হইয়া মেছালী কেয়ামত অধ্যায়ের বিচার অনুসারে বেহেশতি বেহেশতে ও দোযখী দোযখে চলিয়া গেল।
অতঃপর পুনরায় কোন সময়ে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাতে হযরত আদম (আঃ) এর কোন সিফাত বা লতিফা এই আলমে মেছালে প্রকাশিত হইল। প্রথম বারের মত কার্যকলাপগুলি দ্বিতীয়বারেও প্রকাশ পাইল। যখন এই যুগও চলিয়া গেল, তখন তৃতীয়বার প্রকাশিত হইল। এই যুগও যখন শেষ হইল, তখন চতুর্থ যুগ আরম্ভ হইল। এইভাবে যতদূর আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, হইতে লাগিল। এই মেছালী প্রকাশ সমূহের যুগ যখন চলিয়া গেল, তখন সমস্ত লতিফা ও গুণাবলীর সমষ্টি হিসেবে এই প্রকাশ্য জগতে বা দৈহিক জগতে হযরত আদম (আঃ) আগমন করিলেন।
কাজেই প্রকাশ্য জগত বা আলমে শাহাদাতে যে আদম ৭/৮ হাজার বছর পূর্বে প্রকাশ পাইলেন, তিনিই আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ); যাহার বংশধর হিসেবে আমরা দুনিয়ায় অবস্থান করিতেছি এবং কেয়ামত পর্যন্ত তদীয় বংশধরেরা দুনিয়ায় আসিতে থাকিবে। আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর পূর্বে যে লক্ষ আদমের কথা বলা হইয়াছে, তাহা আসলে এই আদমেরই এক একটি লতিফা বা সিফাত, যাহা হযরত আদম (আঃ) এর জড় দেহের ছুরাতে আলমে মেছালে প্রকাশ পাইয়াছিল।
নবী-রাসূল ও ওলীয়ে কামেলদের আল্লাহপাক এমন সব আশ্চর্য ক্ষমতা প্রদান করেন যাহার বর্ণনা চলে না। ওলীয়ে কামেল সকল কোটি কোটি লতিফা-মুখে আল্লাহ আল্লাহ জেকের করেন। কোটি কোটি লতিফার সহিত আল্লাহ পাকের নূরের সংযোগ থাকে। ওলীয়ে কামেল সকলের প্রত্যেকটি লতিফাই স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। কথিত আছে, হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব কোন এক রমজান মাসে একই দিনে বহু সংখ্যক মুরীদের বাড়ীতে ইফতার করিয়াছিলেন। কিভাবে? আসলে ওলী-আল্লাহদের প্রত্যেকটি লতিফা বা সিফাত পৃথক পৃথক ভাবে তাহারই জড়দেহের ছুরাতে বিভিন্ন জায়গায় একই সময়ে উপস্থিত হইয়া বিবিধ কাজ করিতে সক্ষম। হযরত গউসপাক (রঃ) এর বিভিন্ন লতিফা তাহারই জড়দেহের ছুরাতে বিভিন্ন মুরীদের বাড়ীতে একই সময় উপস্থিত হইয়া ইফতার করিয়াছিলেন।
মীর বেলায়েত হোসেন ফিরোজী নামে আমার এক জাকের ভাই ছিলেন। তিনি একদা আফ্রিকার জংগলে মানুষ খেকো গাছের কবলে পড়িয়া পীর কেবলাজানকে স্মরণ করা মাত্রই কেবলাজান হুজুর তথায় উপস্থিত হইয়া তাহাকে মানুষ খেকো গাছের কবল থেকে উদ্ধার করিয়াছিলেন। কিন্তু পীর কেবলাজানতো তখনও এনায়েতপুরের দরবারে ছিলেন। তাহা হইলে কিভাবে তিনি মীর বেলায়েত হোসেন ফিরোজীকে রক্ষা করিলেন? আসলে পীর কেবলাজান হুজুরের কোটি কোটি লতিফার মধ্যে একটি লতিফা তাহারই জড়দেহের ছুরাতে আফ্রিকার জংগলে উপস্থিত হইয়া মীর বেলায়েত হোসেন ফিরোজীকে মানুষ খেকো গাছের কবল থেকে উদ্ধার করিয়াছিলেন। তাই বলা হয়, কামেল পীর পৃথিবীর এই প্রান্তে থাকিয়া অপর প্রান্তের কাজ এই প্রান্ত হইতেই করিতে পারেন। যাহার এই ক্ষমতা নাই, তিনি কামেল ও মোকাম্মেল ওলী নহেন।
মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে বিভিন্ন দেশ বিচরণ করে। সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে অনেক স্বপ্নদ্রষ্টা অজ্ঞাত বিষয় বা ভবিষ্যতের ঘটনাবলীর কিছু কিছু দেখিয়া থাকে। অর্থাৎ বহু অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান মানুষ সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে অর্জন করিতে পারে। এই সত্য স্বপ্নকে হাদীসপাকে নবুয়তের ছয় চল্লিশ (৪৬) ভাগের এক ভাগ হিসেবে রাসূলে করীম (সাঃ) উল্লেখ করিয়াছেন। কি ভাবে মানুষ নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্নে অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করে? আসলে মানুষের নিদ্রিত অবস্থায় মানব রূহ দেহ পিঞ্জর থেকে বাহির হইয়া ঊর্ধ্বলোকের দিকে অগ্রসর হইতে হইতে আলমে মেছালের সম্মুখে উপস্থিত হয়। আলমে মেছালে অজ্ঞাত জিনিস বা ঘটনাবলী সূক্ষ্ম আকৃতিতে সংরক্ষিত আছে। স্বপ্নদ্রষ্টার স্বচ্ছ রূহের উপর আলমে মেছালের কিছু কিছু ঘটনার ছবি প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত ছবি বা ছুরাতের সেই জ্ঞান লইয়া রূহ পুনরায় দেহে প্রবেশ করে। এই ভাবেই স্বপ্নের মাধ্যমে অনেকে আলমে মেছাল থেকে অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান আহরণ করে।
আমার পীর কেবলাজান আলমে মেছালের আদি অন্তের জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন। তোমরা যদি আলমে মেছালের এই অভূতপূর্ব জ্ঞান আহরণ করিতে চাও, খোদাতায়ালার অপূর্ব নিদর্শনাবলী দেখিতে চাও, সর্বোপরি খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা রেজামন্দী লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে খাজাবাবার সত্য তরীকার রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধর। পীর কেবলাজান এখন দুনিয়াতে নাই, তথাপিও ঊর্ধ্ব জগত থেকে তিনি যে নির্দেশ প্রদান করিতেছেন সেই নির্দেশ মতই কাজ হইতেছে। তিনি আমাকে বলিয়া গিয়াছিলেন, "তোর কোন চিন্তা নাই, তোর সমস্ত কাজই আমার হাতে রাখলাম।" তিনি বর্তমান জামানার মুজাদ্দেদ। যে নেয়ামতের ডালা তিনি রাখিয়া গিয়াছেন, তাহার নির্দেশ মতই সেই নেয়ামতের ডালা হইতে তোমাদেরকে ওয়াক্তে ওয়াক্তে নেয়ামত বিতরণ করা হইতেছে। খোদাপ্রাপ্তির এই পথে পীরের ইচ্ছায় বিলীন হইতে হয়। ভাল-মন্দ সমস্ত চিন্তাই পীরের ইচ্ছাতে বিলীন করিতে হয়। পীর যখন যে নির্দেশ প্রদান করেন তাহা দ্বিধাহীনচিত্তে তখন তখনই পালন করিতে তৎপর হইতে হয়। তবেই মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছানো সহজ হয়।
এক মুরীদ তদীয় পীর ছাহেবের নিকট বলিল, "হুজুর, আমি খোদাতায়ালাকে দেখিতে চাই। পীর ছাহেব সেই মুরীদকে বলিলেন, "বাবা, তুমি আজকে নামাজ পড়িও না।" সেই মুরীদ পাঞ্জেগানা নামাজ যথারীতি আদায় করিত। পীর ছাহেব নিষেধ করাতে ঐ দিন মাগরীব ওয়াক্ত পর্যন্ত কোন নামাজই সে পড়িল না। কিন্তু এশার নামাজের সময় সে চিন্তা করিতে লাগিল যে, "সারাটা দিন গেল নামাজ পড়িলাম না। এশার ওয়াক্তের অন্ততঃ ফরজ নামাজটুকু পড়ি।" মুরীদ শুধুমাত্র এশারের ফরজ চার রাকাত নামাজ আদায় করিয়া শুইয়া পড়িল।
রাত্রে স্বপ্নে দেখিল যে, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আসিয়া তাহাকে বলিতেছে, "বৎস! তুমি তো কখনও আমার সুন্নতের খেলাফ কর নাই, আজ কেন করিলে? যাই হোক, এই বার তোমাকে ক্ষমা করা হইল, আবার যদি কখনও তুমি সুন্নতের খেলাফ কর, তাহা হইলে তোমাকে মার (শাস্তি) দেওয়া হইবে।" মুরীদের নিদ্রা ভংগ হইল। পরদিন তদীয় পীর ছাহেব তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, "বাবা, রাত্রে তুমি কি কোন স্বপ্ন দেখিয়াছিলে?" মুরীদ বলিল, "হুজুর, আমি স্বপ্নে দেখিলাম হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে। তিনি আমাকে বলিলেন, "বৎস! তুমি তো কখনও সুন্নতের খেলাফ কর না। আজ কেন করিলে? এই বার তোমাকে মাফ করা হইল, আবার কখনও যদি তুমি সুন্নতের খেলাফ কর, তাহা হইলে তোমাকে শাস্তি দেওয়া হইবে।" পীর ছাহেব মুরীদকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "বাবা, আল্লাহ তোমাকে কিছু বলিলেন না?" মুরীদ উত্তর দিল, "না, হুজুর।" তখন পীর ছাহেব বলিলেন, "নিশ্চয় তুমি এশার ওয়াক্তের ফরজ নামাজ আদায় করিয়াছিলে। নতুবা আল্লাহপাকও একই কথা বলিতেন।" এই কারণে মহা কবি হাফেজ বলেন,
باماء سجاده رنگی کن گرتو پیر مغاگویت
که سالك بى خبر نابود زراه و رسم منزل ها
উচ্চারণঃ
"ব মায়ে সাজ্জাদা রংগি কুন গারতু পীরে মগা গুয়েদ
কে ছালেক বেখবর না বুয়াদ যে রাহ ওরেছমে মাঞ্জেল হা।"
অর্থাৎ-তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ সিক্ত করিয়া তদ্উপরে নামাজ পড়িতে বলেন, তুমি তাহাই কর; কারণ, মাকাম-মাঞ্জিলের পথ তোমার চেয়ে তোমার পীরই ভাল জানেন।
কাজেই, হে জাকেরানগণ! তোমরা পীরের নির্দেশিত পথে চল। পীরের ইশারার বাহিরে যাইও না। পীরের ইশারার বাহিরে গেলে শয়তানী কুহকে ও নাফসে আম্মারার ধোকায় পড়িয়া তোমাদের জীবন বরবাদ হইতে পারে। পীরের ইশারা যে বুঝে না, ইহকাল ও পরকাল-উভয়ই সে হারায়। আমি দু'আ করি-আল্লাহ তোমাদিগকে শয়তানী ওয়াসওয়াসা ও নাফসের ধোকা হইতে রক্ষা করুন। আমীন!








