Logo

খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২২ জুলাই, ২০২৬, ১৯:০৭
খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা
ছবি: সংগৃহীত

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘আত্মদর্শনের পথে মাকাম-মঞ্জিল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এবং এই জ্ঞান অর্জনের পথে আলমে মেছালের গুরুত্ব সম্পর্কীয় আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

এই দুনিয়া হইতেই আল্লাহতায়ালাকে চিনিতে হইবে। আল্লাহতায়ালাকে চেনার জন্য যথাসাধ্য আমল করিতে হইবে। পরকালে আমলের ক্ষমতা থাকিবে না। এই জগতের আমল অনুযায়ী কবর, হাশর, মিজান, পুলসিরাতে মানুষের পরিণতি ভোগ করিতে হইবে। যিনি এই জগতে আল্লাহতায়ালার সহিত পরিচিত হইতে পারিলেন না, তিনি আর পরকালে আল্লাহতায়ালার সহিত পরিচিত হইতে পারিবেন না।

আল্লাহতায়ালা আদম সৃষ্টির সময় ফেরেশতাদের বলিয়াছিলেন, তিনি পৃথিবীতে তাঁহার খলিফা প্রেরণ করিতে চান। ফেরেশতাগণ আল্লাহতায়ালাকে বলিয়াছিল, আমরাই আপনার বন্দেগী করিতেছি। আদম (আঃ) ও তদীয় বংশধরগণ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করিবে। আল্লাহপাক ইহার উত্তরে বলিয়াছিলেন, "আমি যাহা জানি তোমরা তাহা জান না।" হযরত আদম (আঃ) এর দেহ তৈরী হইলে, আল্লাহপাক রূহকে আদমের দেহে প্রবেশ করিবার জন্য আদেশ দিলেন। হযরত আদম (আঃ) এর দেহে রূহ আল্লাহতায়ালার আদেশ পালন করিবার জন্য প্রবেশ করিল। কিন্তু তথায় অন্ধকার দেখিয়া সাথে সাথেই বাহিরে আসিল। রূহ আল্লাহপাককে বলিল যে, আদম (আঃ) এর দেহের অন্ধকারের মধ্যে সে বাস করিতে পারিবে না। আল্লাহতায়ালার ইঙ্গিতে নূরে মুহাম্মদী তখন আদম (আঃ) এর দেহে প্রবেশ করিয়া তাঁহার দেহকে আলোকিত করিয়া দিল। রুহ তখন আদম (আঃ) এর দেহে প্রবেশ করিয়া নূরে মুহাম্মদীর আলোতে আকর্ষণ বোধ করিয়া সেখানে থাকিয়া গেল। ইহার পর হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহপাক তাহার সিফাতসমূহ হইতে জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন, কথন, সৃজন, ইচ্ছা প্রভৃতি গুণ দান করিলেন। অর্থাৎ যে আদম (আঃ) কে আল্লাহতায়ালা তাহার খলিফা হিসাবে তৈরী করিয়াছিলেন, তাহার দেহকে নূরে মুহাম্মদী দ্বারা আলোকিত করিলেন এবং আপন সিফাত বা গুণ দ্বারা সুসজ্জিত করিলেন।

ইহার পর আল্লাহতায়ালা তাহার খলিফা হিসেবে আদম (আঃ) কে এস্তেকবাল বা স্বাগত জানাইবার জন্য এই পৃথিবীকে ফুল-ফল, তরু-লতা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, পাখ-পাখালির দ্বারা সুসজ্জিত ও সুশোভিত করিলেন। তরু লতায় বিভিন্ন গন্ধে ও রঙ্গে ফুল ফুটিল। গাছসমূহে বিভিন্ন বর্ণ-স্বাদ-গন্ধ ও আকারের ফল ফলিল। এক এক ঋতুতে এক এক রকম ফল ও ফুল ফলিতে লাগিল। তাহাদের একটিই উদ্দেশ্যঃ আল্লাহতায়ালার খলিফা হযরত আদম (আঃ) এর সেবা করা ও তাহার প্রয়োজনে আসা। আম, জাম, প্রভৃতি ফলভারে বৃক্ষসমূহ আনত হইল। জলছত্রের মত পিপাসা মিটাইবার পানি মস্তকে লইয়া নারিকেল গাছ দন্ডায়মান রহিল।

বিজ্ঞাপন

আদম (আঃ) এর সন্তান হিসেবে আমরা আজ আল্লাহতায়ালার খেলাফতের দাবীদার হইতে পারি কিনা তাহা আমাদের ভাবিয়া দেখা দরকার। আমরা আল্লাহতায়ালার স্মরণ হইতে আজ বিরত। অনেক আদম সন্তান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকারও করিতেছে। যে প্রকৃতি আল্লাহপাক সৃষ্টি করিয়াছিলেন হযরত আদম (আঃ) ও তাহার বংশধরদের সেবা করিবার জন্য, সেই প্রকৃতিও তাই আগের মত ফুল-ফলে সুসজ্জিত হয় না। জমিনে ফসল হয় না। গাছ আর আগের মত ফলভারে আনত হয় না। পানিতে মাছ আর আগের মত নাই। প্রকৃতি অস্থির।

বান্দা হিসেবে আমাদের প্রভু আল্লাহকে এই পৃথিবীতে থাকিয়াই চিনিয়া যাওয়া প্রয়োজন। আল্লাহপাককে চিনিবার জন্য আল্লাহতায়ালার জাত ও তদীয় সৃষ্টি-এই দুইয়ের জ্ঞানই প্রয়োজন।

আল্লাহপাকের পরিচয় লাভের জন্য "আলমে মেছাল" অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই আলমে মেছালে এক দিকে আল্লাহপাকের সৃষ্ট সকল বস্তুর প্রতিরূপ রহিয়াছে। আবার এই আলমে মেছালের মাধ্যমে সূফী সাধকগণ একটি পর্যায়ে তাহাদের ঈমানের বা বিশ্বাসের হাকীকী রূপও দেখিতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

আলমে মেছাল অতি বিশাল। পূর্বেই বলা হইয়াছে, আল্লাহতায়ালার জাত পাক ভিন্ন অন্য সকল কিছুরই মেছাল বা প্রতিরূপ সেখানে রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালা যে মুহূর্তে কুন বলিয়াছিলেন, সেই মুহূর্ত হইতে সৃষ্টির শেষে কেয়ামত পর্যন্ত যাহা কিছু ঘটিবে, তাহার সকল কিছুরই হাকীকী প্রতিরূপ এই আলমে মেছালে রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট জগতের জ্ঞান রহস্যের সামগ্রিক ভান্ডার এই আলমে মেছাল। সূফীগণ আরশ-কুরছি-লওহ-কলম তথা সাততলা আসমানের উপর হইতে জমিনের তাহাতাস সারা (সর্বনিম্ন স্তর) পর্যন্ত সকল কিছুরই মেছাল বা প্রতিরূপ এই আলমে মেছালে দেখিতে পান।

"আলমে হেস"-এ আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি জগতের পরিকল্পনার নকশা-নমুনা রহিয়াছে। সমগ্র সৃষ্টি জগত আল্লাহতায়ালার তিনটি শক্তিকে কেন্দ্র করিয়া চলিতেছে। এই তিনটি শক্তি হইলঃ তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আ্যাল। এই ত্রিশক্তির কেন্দ্রস্থলে রহিয়াছে নূরে মুহাম্মদী। আলমে মেছালে যেমন সমগ্র সৃষ্টির রূপ রহিয়াছে, তেমনি তাজাল্লীয়াতে সিফাত দ্বারা সকল ব্যক্তি ও বস্তু তাহাদের গুণাগুণ লাভ করিতেছে। তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল দ্বারা সৃষ্টি জগতের যাবতীয় ক্রিয়া কর্মকান্ড শৃংখলার সহিত সংঘটিত হইতেছে। কোথাও শৃংখলার ব্যতিক্রম ঘটিতেছে না। এই সমগ্র সৃষ্টির পরিচালনা, তথা গ্রহ, নক্ষত্ররাজি, চন্দ্র সূর্য নিজ নিজ কক্ষপথে অবিরাম চলিতেছে। পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তিত হইতেছে। ফুল-ফল, তৃণ-লতাদি প্রাণীসমূহের জন্ম হইতেছে। ইহার দ্বারা এই কথাই বোঝা যায়, সৃষ্টি জগতের কোন কিছুই অপরিকল্পিত নয়। সকলই একটি পরিকল্পনার মধ্য দিয়া সৃষ্ট, শৃংখলা দ্বারা পরিচালিত ও সমগ্র সৃষ্টি একটি সুনির্দিষ্ট পরিণতির দিকে অগ্রসর হইতেছে। আল্লাহপাকের হুকুম মানিয়া চলা বান্দার শর্ত। "আলমে মেছাল", "আলমে হেস"-এর জ্ঞান এবং তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আয়ালের নূরের মাধ্যমে সূফী সাধকগণ আল্লাহপাকের বিধান অনুধাবন করিতে ও পালন করিতে পারেন।

কালবে সাততলা আসমানের উপর হইতে জমিনের নীচে তাহাতাস সারাহ পর্যন্ত যাহা কিছু রহিয়াছে, তথা বেহেশত, দোজখ, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম তথা সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান রহিয়াছে, এ কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। তাই কোন ছালেকের কালব জিন্দা হইলে কালবের মধ্যেই ছালেক বেহেশত, দোযখ, আরশ, কুরছি তথা সাততলা আসমান হইতে সাততলা জমিনের নীচে তাহাতাস সারাহ পর্যন্ত সকল কিছুই দেখিতে পান। তবে তাহা দেখেন কালবে প্রতিফলিত নূরের সাহায্যে। কিন্তু সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর রূপ অর্থাৎ আকৃতি, গুণ, স্বাদ ও তাহার ভাল মন্দের সামগ্রিক ছুরাত রহিয়াছে আলমে মেছালে। আলমে মেছালের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান সেই সকল ছালেকগণই লাভ করিতে পারেন, যাহারা আকরাবিয়াতের ঊর্ধ্বে কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালাত ও কামালাতে উলুল আজমের মাকাম হাছিল করিয়াছে।

বিজ্ঞাপন

আকরাবিয়াত ও তাহার ঊর্ধ্বের মাকাম কোন ছালেক তাহার ইচ্ছা অনুযায়ী যাইতে পারিবেন না। আল্লাহপাক যাহাকে দয়া করিয়া নির্ধারণ করেন, তিনিই এই মাকামে উন্নীত হন। তবে আকরাবিয়াত বা কামালাতে নবুয়ত যে মাকামেই থাকুক না কেন, ছালেক আলমে মেছাল দর্শন করিতে পারিবে কিনা তাহাও আল্লাহতায়ালার দয়ার উপরই নির্ভর করে।

আকরাবিয়াতের শেষ অধ্যায়ে, কাওছের মাকামে ছালেক যে 'ওজুদ মাওহুব লাহু' আল্লাহতায়ালার দয়ায় প্রাপ্ত হন, সেই ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা ছালেক আল্লাহতায়ালার সিফাত যুক্ত জাত ছায়ের করিতে পারেন ও সকল বস্তুর হাকীকী অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করিতে পারেন। এইভাবে সাধক সকল বস্তুর ভাল মন্দ বা হাকীকী জ্ঞান লাভকরিতে পারেন।

হয়রত আদম (আঃ) কেও বেহেশতে সকল বস্তুর নাম আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে শিক্ষা দেয়া হইয়াছিল। আকরাবিয়াত মাকামের শেষ অধ্যায়ে উন্নীত হইলে ছালেক আল্লাহতায়ালার আটটি সিফাতের পর্দায় ছায়ের সম্পন্ন করিতে পারে। সৃষ্টি জগতের সকল বস্তুই এই ৮টি সিফাতের কোন না কোনটির অন্তর্গত। সৃষ্ট সকল বস্তুই নূরের সমষ্টি। তাই 'ওজুদ মাওহুব লাহু' সকল বস্তুর নূর গ্রহণের মাধ্যমে বস্তুর ভাল মন্দ বুঝিতে পারে। 'ওজুদ মাওহুব লাহু'র গতি আলোর চেয়েও লক্ষ গুণ বেশী। তাই অতি অল্প সময়ে সাধক সৃষ্টি জগতের যে কোন কিছু সম্পর্কে ওজুদ মাওহুব লাহু বা খোদা প্রদত্ত শরীর দ্বারা জ্ঞান লাভকরিতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

ছালেক আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে যে ওজুদ মাওহুব লাহু প্রাপ্ত হয়, বেলায়েতে উলিয়ার মাকামে ইহার দ্বারা ছালেক আল্লাহপাকের গুণ বিশিষ্ট জাতে ছায়ের করিতে পারে। এই ছায়েরকে ছায়েরে আনফুসি বলে।

সূফী সাধকগণের দৃষ্টিতে জ্ঞান দুই প্রকার। প্রথমটি হইল বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান, যাহাকে আরবী ভাষায় বলে 'আকলে মায়াশ'। আরবী 'শায়' শব্দের অর্থ বস্তুু। শায় শব্দ হইতে মায়াশ আসিয়াছে। দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান হইল বস্তুর উৎপত্তি সম্পর্কে। তাহাকে আরবী ভাষায় 'আকলে মায়াদ' বলে। যাহারা বেলায়েতে ছোগরার অধিকারী হন, তাহাদের নাফস শান্তিপ্রাপ্ত বা মোৎমাইন্না প্রাপ্ত হয়। আর যাহারা কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত হন, তাহাদের নাফস মোলহেমা প্রাপ্ত হয়। এই স্তরে তাহারা আল্লাহতায়ালার এলহাম বা বাণী শুনিতে পারেন। এই স্তরের সাধকেরাই আল্লাহতায়ালার দয়ায় আলমে মেছাল দর্শনের মাধ্যমে সৃষ্টি ও স্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। এই আলমে মেছাল হইতে তাহারা সৃষ্ট জগতের আদি অন্ত সকল কিছুর জ্ঞান লাভ করিতে পারেন। বেলায়েতে ছোগরার মাকাম পর্যন্ত যে জ্ঞান লাভ হয় তাহা অর্জন সাপেক্ষ। কিন্তু তাহার ঊর্ধ্বে বেলায়েতে কোবরা, কামালাতে নবুয়ত ও আরও ঊর্ধ্বে যে জ্ঞান তাহা আল্লাহতায়ালার দয়া ব্যতীত লাভ করা যাইবে না। আল্লাহতায়ালার মহব্বতে তাহার নির্ধারিত ব্যক্তিগণ, তাহার মহব্বত দ্বারাই ঐ স্তরে উন্নীত হন। যেহেতু তাহারা আল্লাহপাকের প্রিয়পাত্র, তাই তাহাদের ভয় করিবার বা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হইবার কোন কারণ থাকে না।

আলমে মেছালে ব্যক্তি বা বস্তুর যে ছুরাত দেখা যায়, তাহা আলমে আরোওয়াহতে ব্যক্তি বা বস্তুর যেরূপ অস্তিত্ব ছিল একদিকে সেই অস্তিত্বের প্রতিরূপ হিসাবে; অন্যদিকে দৈহিক জগতে যে ছুরাত তাহারও প্রতিরূপ হিসাবে। আলমে আরোওয়াহতে ব্যক্তি বা বস্তুর এই জগতের ছুরাত বা আকার ছিল না। মানুষের বা বস্তুর এই জগতে আকার দেওয়া হইয়াছে এই জড় জগতে অবস্থানের জন্য। সূফী সাধকগণ আলমে মেছালে তাই সৃষ্টির উৎপত্তির সময়ের অস্তিত্বে বস্তুকে ও ব্যক্তিকে যেমন দেখিতে পান, তেমনি এই স্থূল জগতস্থিত ব্যক্তি বা বস্তুর ছুরাতেও দেখিতে পান।

বিজ্ঞাপন

কাওছের মাকামে সাধকগণ ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা পরিচালিত হন। তাহার পূর্বে তাহারা তওবা তালকিন এবং কালব ও নাফসে তথা সমগ্র ওজুদে কলেমা প্রতিষ্ঠা দ্বারা বেলায়েত প্রাপ্ত হন। তাহার পর তাহারা হাকীকী জগতে পৌঁছাইবার জন্য আল্লাহপাক দ্বারা গৃহীত হন। আকরাবিয়াতের মাকামে উন্নীত হন। আকরাবিয়াতস্থিত অধ্যায়ের শেষ মাকামে কাওছ হইতে সিফাত ও সিফাত মিশ্রিত জাতের সহিত পরিচিত হইবার পর ছালেক যে হৃদয়ের পবিত্রতা লাভ করেন বা কামালাতে নবুয়ত লাভ করিবার পর ছালেক সমগ্র ওজুদের (দেহের) যে পবিত্রতা লাভ করেন সেই হৃদয়স্থিত পবিত্রতা ও ঈমানের হকিকতের প্রতিরূপও তিনি আলমে মেছালের আয়নায় দেখিতে পান।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এইরূপ তাহার পূর্ণাঙ্গ ঈমানকে নূরের দেহ সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ এক যুবকের রূপে দেখিয়াছেন। হযরত গউছ পাক আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) ছাহেব তাহার হৃদয়ের পবিত্রতাকে নবজাত শিশুর রূপে বা তিলুল মায়ানী রূপে দেখিয়াছেন। রূহে কুদছি বা হকিকতে ইনছান অর্থাৎ প্রকৃত মানবিক গুণসম্বলিত আত্মা সকল প্রকার অপবিত্রতা হইতে মুক্ত। তাই আলমে মেছালে নবজাত শিশুর রূপে পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে সাধকেরা দেখিতে পান। সাধক আলমে মেছালে এই ভাবে নিজের ঈমানের হাকীকী রূপ দেখিয়া থাকেন। কোন কোন সাধক উল্লেখ করিয়াছেন, তাহার নিজ নিজ ঈমানের হাকীকী অবস্থা নিজ নিজ চেহারায়ও দেখিয়াছেন। কারণ ঈমানও মানুষের হাকীকী বৈশিষ্ট্যের একটি।

আরোওয়াহ জগতে রূহ সমষ্টি যখন ঈমান আনিয়াছিল, তখন আল্লাহপাক রব বা প্রতিপালক হিসাবে তাহার উপরে ঈমান আনিতে বলিয়াছিলেন। তাই মানুষের অস্তিত্ব ও আকৃতিসহ যে ঈমান, তাহা আল্লাহতায়ালার রব সিফাত পর্যন্ত পৌঁছায়। তাই কোন কোন সাধক আলমে মেছালে তাহার নিজ ঈমানের হাকীকী রূপ নিজের ছুরাতে দেখিয়াছেন। রব অর্থ আল্লাহ, তবে আল্লাহতায়ালার জাত নহে। রব আল্লাহতায়ালার প্রতিপালন কর্তার গুণবিশিষ্ট পর্দার রূপ। তাই রবকে নিজের ছুরাতে দেখা আল্লাহতায়ালার আহদাত বা একত্বের সহিত বিরোধী বলিয়া অনেকে ধারণা করিতে পারেন; কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে। রাসূলে করীম (সাঃ) এর হাদীসে বলা হইয়াছে,

বিজ্ঞাপন

مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ

অর্থাৎ-"যিনি নিজের নাফস বা সত্বাকে চিনিয়াছেন, তিনি আপন রব বা প্রভুকে চিনিয়াছেন।"

অন্য কথায় বলিতে গেলে বলিতে হয় যে, নিজের সত্বার মধ্যেই আপন প্রভু বিরাজমান। তবে এই নাফস সকল মানুষের নাফস নয়। ইহা হইল সেই নাফস যে নাফসে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। অর্থাৎ যে নাফস “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বা আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর প্রভুত্ব অস্বীকার করিয়াছে ও আল্লাহ ব্যতীত সকল আকর্ষণ হইতে মুক্ত।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিয়াছেন,

نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ

অর্থাৎ-"আমি তোমাদের জান-রগ হইতেও নিকটবর্তী”। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা আকরাবিয়াতের মাকামে উন্নীত ব্যক্তির হৃদয়ে থাকেন। শুধু তাহাই নয়, কুরআন মজীদে বলা আছে,

বিজ্ঞাপন

اللَّهُ نُورُ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ

অর্থাৎ-"আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর।"

আল্লাহপাক আসমান ও জমিনের নূর-এই কথা আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করিয়াছেন। ইহার অর্থ প্রতি বস্তু ও ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার নূর দ্বারা গঠিত এবং প্রতি ব্যক্তি ও বস্তুতে আল্লাহতায়ালার নূর বিরাজমান। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিতেছেন,

বিজ্ঞাপন

أَنَا مِنْ نُوْرِ اللَّهِ وَ الْخَلْقُ مِنْ نُوْرِى

অর্থাৎ-" আমি আল্লাহর নূরে সৃষ্ট এবং জগতের সকল ব্যক্তি ও বস্তু আমার নূরে সৃষ্ট।"

কিন্তু কোন্ অবস্থায় মানুষ বুঝিতে পারে যে, সে নবীজী (সাঃ)-এর নূরে সৃষ্ট? পূর্বেই বলা হইয়াছে, যে মানুষের নাফস অর্থাৎ যে মানুষের সত্ত্বা পৃথিবীর সকল কিছুরই প্রতি আকর্ষণ অস্বীকার করিয়া আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব ও আনুগত্য স্বীকার করিয়াছে অর্থাৎ যে মানুষের সর্ব অস্তিত্বে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তিনিই কেবল উল্লিখিত তত্ত্ব উপলব্ধি করিতে পারেন। মানুষের কালব ও সমগ্র দেহ যখন আল্লাহতায়ালার দয়ায় পবিত্রতা লাভ করিয়া রিপু ও প্রবৃত্তি মুক্ত হয় এবং কলেমা শরীফের জেকের আল্লাহতায়ালার দয়ায় সকল সময় জারি থাকে, তিনি অনুধাবন করিতে পারেন যে তাহার হৃদয় ও দেহের অনু-পরমাণুতে আল্লাহতায়ালা ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর রহিয়াছে। তবে এই অনুভূতি অর্জন সাপেক্ষ নহে। আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া যাহাকে এই মর্তবা দান করেন তিনি ইহা উপলব্ধি করিতে পারেন ও এই নূর দেখিতে পান।

কামালাতে নবুয়তের মাকামে সূফীগণের সমস্ত ওজুদকে (শরীর) আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া পবিত্রতা দান করেন। সূফীগণ আল্লাহপাকের সহিত ফানা লাভ করেন বা আল্লাহতায়ালার নূরের সহিত তাহাদের সমগ্র অস্তিত্ব বিলীন হয়। আল্লাহপাকই সাধকের অস্তিত্ব তাহার নূরের সহিত বিলীন করিয়া লহেন। এই পর্যায়ে উন্নীত হইবার পর সূফীগণ যে মাকাম হাছিল করেন, সে সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা হাদীসে কুদসীতে বলেন, "আমার নফল ইবাদত করিতে করিতে আমার বান্দা আমার এমন নৈকট্য অর্জন করে যে, আমি তখন তাহার পঞ্চ ইন্দ্রিয় হইয়া যাই যাহার দ্বারা সে শ্রবণ করে, দেখিতে পায়, কথা বলে ইত্যাদি। এক্ষেত্রে দেখা যাইতেছে রাসূলে করীম (সাঃ) এর হাদীস অনুযায়ী আল্লাহপাক যে বান্দাকে এই পর্যায়ে উন্নীত করেন তাহার সহিত তিনি নিজেকে ফারাক করিতেছেন না।

"আল্লাহতায়ালা আসমান ও জমিনের নুর" এবং "আল্লাহতায়ালা বান্দার জান-রগ (হৃদয়ের শীরা) হইতে নিকটবর্তী।" -কুরআন শরীফের এই দুটি আয়াতের উপলব্ধির মাত্রার উপরে আল্লাহপাকের সহিত সাধকের বিলীন হওয়া ও ফানার মাত্রা নির্ভর করে।

এক্ষেত্রে একটি কথা উল্লেখযোগ্য-সত্ত্বা ও রূপ বা ছুরাত এক নহে। রূপ বা ছুরাত বস্তুজগতে আসিয়া বস্তুর বাহ্যিক আকার হইয়াছে। কিন্তু তাহার সত্ত্বার হাকীকী অস্তিত্ব ভিন্ন। মানুষের প্রকৃত সত্ত্বা ও তাহার ছুরাত এক করিয়া দেখিলে চলিবে না। মানুষের সত্ত্বা হইল তাহার মনুষত্ব। আলাহপাক মানুষকে নিরাকার গুণসমূহ দিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। মানুষের শরীর বা আকার সেই নিরাকার গুণসমূহ প্রকাশের মাধ্যম। মানুষের শরীরে দয়া-মায়া, স্নেহ-ভালবাসা প্রভৃতি আল্লাহতায়ালার সিফাত বা গুণের প্রতিবিম্ব যাহা আল্লাহ মানুষকে দান করিয়াছেন। মানুষের শ্রবন, দর্শন, কথন এবং চলাফেরার গুণ ইত্যাদিও সূক্ষ্ণ ও নিরাকার। এই সমস্ত গুণ আল্লাহতায়ালার দান। বস্তুতঃ কোন গুণই মানুষের নিজের নয়। সকলই আল্লাহপাকের গুণের প্রতিবিম্ব। মানুষ সকল গুণই আল্লাহপাকের দয়ার গুণেই লাভ করে। কোন গুণই আবার আকার বিশিষ্ট নয়। যেমন যদিও মানুষের চক্ষুর আকার আছে, কিন্তু দর্শন গুণের কোন আকার নাই। কর্ণের আকার আছে, কিন্তু শ্রবণ গুণের কোন আকার নাই। মানব দেহ তাই আকার ও নিরাকারের বৈশিষ্ট্যসমূহ লইয়াই পূর্ণতা লাভ করে। মানব দেহ তাই আকার ও নিরাকারের সমাবেশ। মানুষের শরীরের আকার আছে; কিন্তু তাহার প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির আকার নাই অর্থাৎ মানুষের গুণসমূহ নিরাকার। ইহাই প্রমাণ করেঃ মানুষের গুণসমূহ আল্লাহতায়ালার গুণের প্রতিবিম্ব ও তাহার দান।

মানব দেহ কামালাতে নবুয়তের মাকামে সম্পূর্ণ পবিত্রতা লাভ করিবার পর আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা বা বিলুপ্তি লাভ করে ও মানুষের শরীরের আদামাতের বা প্রবৃত্তির যে অন্ধকার বা তমোদোষ তাহা আর তাহার শরীরের মধ্যে থাকে না। আল্লাহতে বিলুপ্তি প্রাপ্ত দেহে যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহা হইল আল্লাহতায়ালার সিফাত বা গুণের সমষ্টি। তখন তাহার মধ্যে যে গুণ থাকে সে গুণ আল্লাহতায়ালারই গুণ। সেই সাধকের চরিত্র আল্লাহতায়ালার চরিত্রে ভূষিত হয়।

মানবদেহ আল্লাহতায়ালার ভেদের এক মহা সমুদ্র। ঐ পর্যায়ে উন্নীত সাধক তাহার দেহে লতিফা সমূহ (মূল উপাদান) দ্বারা আলমে আরোওয়াহ (রূহের জগত), আলমে মেছাল (সৃষ্টির আদি অন্তের ঘটনাসমূহের প্রতিচ্ছবির জগত), তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত, তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের সহিত পরিচিত হন অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাত, সিফাত ও তাহার সমগ্র সৃষ্টি জগতের আদি ও অন্তের জ্ঞান লাভকরিয়া আল্লাহপাকের অনন্ত জ্ঞানে জ্ঞানী হন। আল্লাহপাকের গুণে গুণান্বিত, তাহার পরিপূর্ণ জ্ঞানে জ্ঞানী ও তাহার জাতের সহিত বিলীন ব্যক্তির অস্তিত্ব ও আল্লাহতায়ালার আদিয়াতের সহিত তাহা হইলে সম্পর্ক কি?

পূর্বে বলা হইয়াছে, মানুষের হকিকত (আকৃতি বা ছুরাত নয়) বা মনুষত্বের গুণাবলী নিরাকার। তাহার শরীরের আকার এই পার্থিব জগতে বর্তমান থাকিবার জন্য। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাত, তাহার জাত হইতে সিফাতে এজাফিয়ার অধ্যায়ে আসিয়াছে এবং সিফাতে এজাফিয়া হইতে তাহার গুণসমূহ (নিরাকার অবস্থা হইতে) মানুষের দেহে স্থান লইয়া এই জগতে আসিয়াছে। আকরাবিয়াতের মাকামে ছালেক তাহার হাকীকী বা সৃষ্টির আদি জগতের গুণ ফিরিয়া পায় অর্থাৎ তাহার দেহের প্রবৃত্তি বা আদামাতের দোষ হইতে সে মুক্তি পায় এবং মানুষের মধ্যে আল্লাহতায়ালার গুণের প্রতিবিম্ব অবিমিশ্রভাবে প্রতিফলিত হয়।

আল্লাহতায়ালা চিরদিনের জন্য বোধগম্যের অতীত। তিনি সিফাতী পর্যায়েও নিরাকার। মানুষের শরীর আকার সম্পন্ন, কিন্তু মনুষত্ব নিরাকার। আবার মানুষ কখনও আকার বিশিষ্ট; কখনও নিরাকার গুণ লাভ করে। আকরাবিয়াতের মাকামে বা তাহার ঊর্ধ্বের মাকামে ছালেকের যে অস্তিত্ব, তাহা নিরাকার মানুষের অস্তিত্ব অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে মানুষের অস্তিত্বের যে গুণ ও বৈশিষ্ট্য, সেই গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অবিকল।

অন্য কথায় বলিতে গেলে এই পর্যায়ে উন্নীত সাধকের চরিত্র গুণে আল্লাহতায়ালা তদীয় যে গুণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টির আদিতে প্রতিফলিত করিয়াছিলেন তাহা ফিরিয়া আসে। আলমে আরোওয়াহতে সূক্ষ্ণ অস্তিত্বের মানুষ নিরাকার আল্লাহ বা রবকে অভিন্ন বলিয়া জানে। আবার আকরাবিয়াতের মানুষ সিফাত যুক্ত আলীম-জাতকে আহাদ বলিয়া জানে।

এই স্থানে "আমি আল্লাহতায়ালার নূর হইতে সৃষ্ট এবং সমগ্র সৃষ্টি আমার নূর হইতে সৃষ্ট" - রাসূর করীম (সাঃ) এর এই হাদীস স্মরণযোগ্য। রাসূলে করীম (সাঃ) সৃষ্ট হইয়াছিলেন সৃষ্টির সর্ব প্রথমে। আলমে আরোওয়াহর বা রূহের জগত সৃষ্টির আগে; রাসূলে করীম (সাঃ) তখন "নূরে মুহাম্মদী” অস্তিত্বে বিরাজমান ছিলেন। এই অবস্থায় আল্লাহপাক "কুন” বলিলেন, অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব লাভের জন্য আদেশ দান করিলেন। "নূরে মুহাম্মদী" বা রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর তখন সকল ব্যক্তি ও বস্তুর হাকীকী অস্তিত্বকে আল্লাহতায়ালার ইঙ্গিতে ধারণ ও আলোকিত করিয়া অস্তিত্ব দান করিল। উরুজের সময়ে বেলায়েতে কোবরার মাকামে আসিয়া ছালেকের নিজ রূহ আপন মুর্শিদে কামেল ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর রূহ মুবারকের সহিত বিলুপ্তি লাভ করে।

এই অবস্থায় ছালেকের রূহ বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালা যে রূহ আদম (আঃ) এর দেহে ফুঁকিয়া দিয়াছিলেন এবং যে রূহ আদম (আঃ) এর দেহে নূরে মুহাম্মদীর আকর্ষণে অবস্থান গ্রহণ করে, সেই রূহের পবিত্রতা ফিরিয়া পায়। তাই এই রূহ আল্লাহতায়ালার "এলহাম” বা বাণী শুনিবা গুণাগুণ লাভ করে। রাসূলে করীম (সাঃ) এর এই হাদীস ব্যাখ্যা করিলে বোঝা যায় রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার নূর হইতে সৃষ্ট। কিন্তু একথাও ঠিক আল্লাহতায়ালার সিফাত বা গুণসমূহ তাহার জাত বা মূল অস্তিত্ব হইতে পৃথক থাকিতে পারে না। যে শরীরের অস্তিত্ব নাই তাহার গুণাগুণ থাকিতে পারে না। গুণাগুণ থাকিলে তাহার পশ্চাতের কারণ হিসেবে শরীর থাকিবেই। তাই বস্তুতঃ নূরে মুহাম্মদী জাত মিশ্রিত সিফাত, তবে এককালীন অর্থে জাত নয়। তাই নূরে মুহাম্মদী ও নূরে মুহাম্মদী যে রূহুকে আলমে আরোওয়াহতে ধারণ করিয়াছিল, তাহা সিফাত মিশ্রিত জাতেরই প্রকাশ ছিল। এই জাত মিশ্রিত সিফাত যখন প্রতিবিম্বরূপে পৃথিবীতে আসিল, তাহা মানব দেহ লাভ করিল ও তাহাতে একই সাথে আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব ও আদামাতের দোষ বা প্রবৃত্তির সমাবেশ হইল।

কিন্তু যে কালবে ও নাফসে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইল অর্থাৎ যে কালব ও নাফস আল্লাহ ছাড়া সকল কিছুরই প্রভুত্ব ও অন্য সকল কিছুর প্রতি তাহার আকর্ষণকে অস্বীকার করিল, সেই নাফস ও কালব আদামাতের (দৈহিক প্রবৃত্তির) দোষ ও অপবিত্রতা হইতে মুক্ত হইল। ছালেক যখন এই মাকামে উন্নীত হইল, তখন তাহার কালব সেই গুণ লাভ করিল, যে সম্পর্কে রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, "কুলুবুল মু'মিনীনা আরশুল্লাহ”। অর্থাৎ মুমিনের কালব বা দেলেই আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ। কালব মানব দেহেই অবস্থিত। তাই কলেমা প্রতিষ্ঠিত মুমিনের কালবেই তখন আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ হয়, এই কথা রাসূলে করীম (সাঃ) নিজেই বলিতেছেন। এই গুণ যখন লাভ হয় তখন সেই মুমিনের সহিত আল্লাহতায়ালার কি সম্পর্ক হয়? সেই মুমিনের মধ্যে আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ এবং সৃষ্টির আদি ও অন্তের জ্ঞান রহিয়াছে। তাহার দেহ বিনাশী, কিন্তু তাহার কালব যাহাতে আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ ও জ্ঞান বিদ্যমান তাহা বিনাশী বা মরণশীল নয়।

সূফীদের কালব যেহেতু আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশ স্থল তাই তাহা অবিনাশী সত্ত্বা। বস্তুত কালব আরশের উপরে আল্লাহতায়ালার নূরের গুণে গুণান্বিত। ইহা এই জগতের উপাদান নহে। যাহাদের এই কালব জিন্দা হইয়াছে তাহাদের সম্পর্কে তাই রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান,

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا يَمُوْتُوْنَ -

অর্থাৎ-"সাবধান! নিশ্চয়ই ওলী আল্লাহগণের মৃত্যু নাই।"

রাসূলে করীম (সাঃ) নূরে মুহাম্মদী বা যেহেতু সকল রূহের ধারক এবং রাসূলে করীম (সাঃ) এর রূহ মুবারক যখন আকরাবিয়াতের মাকামে উন্নীত সকল সাধকেরই রূহুকে আলোকিত ও পবিত্রতা দান করেন তখন ঐ মাকামে সকল সাধকের বৈশিষ্ট্য কি এক নয়? নূরে মুহাম্মদীকে ভাগ করা যাইবে না। আর নূরে মুহাম্মদীর উৎপত্তি আল্লাহতায়ালার

জাত মোজাররাদা হইতে বা লা-তাইন হইতে। হকিকতে আহমদীর মাকামে যে সাধক উন্নীত হইয়াছে তাহার সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন যে, ঐ মাকামে সাধকের সিফাতী গুণ ও আল্লাহপাকের শানের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা নাই। "আহাদ” ও "আহমদ" নামের মধ্যে যে মিমের ব্যবধান তাহা আহাদ ও আহমদ নামের পার্থক্যই কেবল নির্ণয় করে। বস্তুতঃ এই আহাদ ও আহমদের মধ্যে সম্পর্ক যে কত নিবিড় তাহা এক আল্লাহপাক বিনে অন্য কেহ জানেন না। এমন কি যে সাধক ঐ মাকামে উন্নীত হইয়াছেন তিনিও প্রকাশ করিতে পারেন না।

কেবলমাত্র ইসলামের মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহতায়ালার এত নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ নৈকট্য লাভ করিতে পারে। অন্য কোন ধর্মে এত নিবিড় নৈকট্যের সংবাদ নাই। তাই ইসলাম সমগ্র বিশ্বমানবের জন্য আল্লাহতায়ালার মনোনিত ধর্ম। ইসলামের এই শ্রেষ্ঠত্বের চর্চা মধ্যযুগে বিভিন্ন কারণে রুদ্ধ হয়। মধ্যযুগ ও তাহার পরবর্তীকালে সূফী সাধকগণ বেলায়েতে ছোগরার মাকামে তাহাদের সাধনা শেষ করিয়াছেন।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ইসলামের এই শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করিয়া মানব জাতির জন্য প্রদর্শন করিয়াছেন। আমার দয়ালপীর দস্তগীর, ওলীকুল শ্রেষ্ঠ, হযরত আল্লামা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব এই তরীকায়ে মুজাদ্দেদীয়ার সর্বশেষ ইমাম ও হাদী। তদীয় পথ রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রদর্শিত সত্য পথের অবিকল, অনুরূপ। আর ইহাই বর্তমান জামানার মানুষের মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ পথ।

রাসূলে করীম (সাঃ) যে নেয়ামত মানব জাতির মুক্তির জন্য আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, পীরানে পীরগণের আত্মা পরম্পরায় তাহা আমার পীর কেবলার দেলে গচ্ছিত ছিল- সেই নেয়ামতের ডালী হইতে আজও আল্লাহতায়ালার প্রেম পিপাসুদের তথা সৃষ্টির রহস্য অনুসন্ধানীর জ্ঞানের পিপাসা মিটানো হইতেছে।

হে জাকেরান! তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার নৈকট্য হাসিলের মাধ্যমে মানব জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করিয়া সার্থকতা লাভ করিতে চাও, তাহা হইলে মহাতাপস খাজাবাবার পাক কদমে নিজেকে নেছার করিয়া দাও। আমার পীর কেবলাজান হুজুর, জামানার শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ, আল্লাহ ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর ভেদের মহাসমুদ্র, তাপসকুল শিরমণি হযরত খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন এমনি উচ্চস্তরের ওলী যিনি ঐ সকল মাকাম শুধু ত্বয়ই করেন নাই অন্যকেও ঐ সকল মাকামের ফয়েজ দানের প্রবল ক্ষমতা রাখিতেন। তিনি রাসূলে করীম (সাঃ) এর গুণে গুণান্বিত ছিলেন এবং হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নেসবতের অধিকারী ছিলেন, যাহার তুল্য ওলী তৎকালীন বিশ্বে আর কেহ ছিলেন না। সেই জ্ঞান হাসিল করিয়া আল্লাহতায়ালার নৈকট্য সাধনের মাধ্যমে তোমরা যদি মানব জীবনকে সার্থক করিতে চাও, তাহা হইলে খাজাবাবার পাক কদমে জানমাল নেসার করিয়া খোদা প্রাপ্তি সাধনার শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান লাভকরিবার জন্য নিজেকে নিয়োজিত কর।

মুর্শিদে কামেল ছাড়া এই জ্ঞান লাভ করিবার অন্য কোন পথ নাই। তাই পারস্যের মহাকবি হাফেজ বলিয়াছেন, "যদি তোমরা আমার পীরকে বাধ্য করিয়া দিতে পার, তাহা হইলে আমি সমরখন্দ বুখারার সিংহাসন বিলাইয়া দিব।" আল্লাহপাকের জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ ও সম্পূর্ণ জ্ঞান তাহা যাহারা বুঝিতে পারিয়াছেন, তাহারা তাহাদের জীবনের সকল কিছুই খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী সাধক মুর্শিদে কামেলের কদমে নেসার করিয়া এই জ্ঞান লাভ করিয়াছে।

হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব ও হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেবের মত পার্থিব জ্ঞানে তাহাদের যুগে শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের তুলনায় পার্থিব জ্ঞানের তুচ্ছতা তাহারা উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন। তাই তাহারা নিজ নিজ পীরের কদমে তাহাদের জীবন ও সম্পদ নেছার করিয়াছিলেন। যিনি ইহ জীবনে আল্লাহতায়ালাকে পাইলেন তাহার পাইবার আর কিছু থাকিল না। আল্লাহতায়ালাকে যিনি ভয় করিলেন, তাহার ভয় করিবার কিছুই রহিল না। আল্লাহকে যিনি মহব্বত করেন, আল্লাহ তাহাকে মহব্বত করেন। আর আল্লাহ যাহাকে মহব্বত করেন, সমস্ত সৃষ্টি তাহাকে মহব্বত করে।

আমার কেবলাজান হুজুরকে আল্লাহপাক মহব্বত করেন, তাই তদীয় খানদানের লোক হিসাবে আল্লাহপাক তোমাদের প্রতিদিন কত বিপদ-আপদ হইতে রক্ষা করিতেছেন। তাই তোমরাও খোদাতত্ত্ব জ্ঞান লাভ করিবার জন্য, তাহার মহব্বত অর্জন করিবার জন্য আল্লাহপাককে মহব্বত কর। আল্লাহতায়ালার জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান, সেই জ্ঞানের শেষ নাই। আল্লাহতায়ালার মহব্বতই শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যে সম্পদ আখেরাতেও শেষ হইবে না। আর এই সম্পদ প্রাপ্তির একমাত্র পথ মুর্শিদে কামেল। সেই মুর্শিদে কামেলের মহব্বত অর্জন করিলেই আল্লাহতায়ালা ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহব্বত তোমরা লাভ করিতে পারিবে, সৃষ্টি ও স্রষ্টার রহস্যজ্ঞান লাভ করিতে পারিবে। আমীন!

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD