Logo

বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৩ জুলাই, ২০২৬, ১৯:০০
বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও হাল সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক কুরআন মজীদে এরশাদ ফরমান-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ .

অর্থাৎ- "আমি মানুষ ও জ্বিনকে আমার এবাদত ভিন্ন অন্য কোন কাজের জন্য সৃষ্টি করি নাই।” (সূরা জারিয়াতঃ ৫৬)

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক হাদীসে কুদসীতে ফরমান,

كُنْتُ كَنْزًا مَخْفِيًا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الْخَلْقَ لأَعْرَفَ .

অর্থাৎ- "আমি ছিলাম গুপ্ত ধনভান্ডারের মত। অতঃপর পরিচিত হইতে চাহিলাম। তাই বিশ্বব্রহ্মান্ডকে সৃষ্টি করিলাম।"

বিজ্ঞাপন

সৃষ্টির এই দুইটি উদ্দেশ্য আল্লাহতায়ালা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। একটু চিন্তা করিলে বোঝা যাইবে, উপরে উদ্ধৃত দুইটি বাণীর প্রথমটি ব্যক্তিগত ভাবে প্রতি মানুষ ও জ্বিনের জন্য প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় বক্তব্যটি হইল সামগ্রিক ভাবে সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য। সামগ্রিকভাবে সৃষ্টির মকছুদ হাছিল হওয়ার উপরে নির্ভর করে ব্যক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্য সার্থক হইবার প্রশ্ন। তাহা ছাড়া সমগ্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য হাসিলের গুরুত্ব নিশ্চয়ই ব্যক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্য হাসিলের চেয়ে বড়।

ইহাও চিন্তা করার বিষয় যে ব্যক্তিগতভাবে প্রতি মানুষ বা জ্বিন কিভাবে পৃথিবীতে বসিয়া এবাদত করিবে, যদি তাহাদের জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে কেহ নিয়োজিত না থাকেন; অর্থাৎ ব্যক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যও হাছিল হইবে না, যদি না সামগ্রিকভাবে সৃষ্টির উদ্দেশ্য হাসিলের ব্যবস্থা না থাকে।

আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির উভয় মকছুদ হাসিলের জন্যই তাই প্রয়োজন পথ প্রদর্শকের বা আল্লাহতায়ালার পথে আহ্বানকারীর। আমরা উপরে উদ্ধৃত দুইটি উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও চিন্তা করিলে বুঝিতে পারি আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে দুইটি শ্রেণী করিয়াছেনঃ (১) “হেদায়েতকারী" বা আল্লাহতায়ালার পথে আহ্বানকারী ও (২) "এবাদতকারী।"

বিজ্ঞাপন

এবাদতকারীদের মধ্যে নাফী-এসবাত জেকের, ফানা-বাকা সিদ্ধ হইবার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মাকামে যিনি পৌঁছাইতে পারেন এবং বুঝিতে পারেন আল্লাহপাক একমাত্র মাবুদ, তিনি 'বেলায়ত'-এর অধিকারী হন। এই অবস্থাকে "এসবাত" বা সত্য প্রতিষ্ঠার মাকাম বলা হয়। ইহা ওলীগণের মাকাম। 'বেলায়েত'-এর অর্থ সৃষ্টির সকল কিছু বাদ দিয়া আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব বোঝার ক্ষমতা।

আর যাহারা আল্লাহর পথে আহ্বানকারী তাহাদের অবস্থান ভিন্ন। আল্লাহই একমাত্র মা'বুদ বা উপাস্য, ইহা তাহারা যেমন নিজেদের দেলে প্রতিষ্ঠা করেন, তেমনি এই সত্যের আলো দিয়া অন্যকে আলোকিত হইতে আহ্বান করেন। তাহারা আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্ব প্রাপ্ত হন বা কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা আল্লাহ রাহমানুর রাহিমের নিকট হইতে লাভ করেন।

যাহারা "বেলায়েত” প্রাপ্ত হন আল্লাহপাকের এবাদত বন্দেগী করিতে করিতে তাহাদের নাফস "মোৎমাইন্না" প্রাপ্ত বা শান্তিপ্রাপ্ত হইয়া যায়। তাহারা কলেমা শরীফের প্রথম অংশ "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া মাবুদ নাই, ইহা সামগ্রিকভাবে বিশ্বাস করেন।

বিজ্ঞাপন

আর যাহারা হেদায়েতের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হন বা কামালাতে নবুয়তের সম্মান লাভ করেন, তাহারা কলেমা শরীফের প্রথম অংশ ও দ্বিতীয় অংশ- উভয় অংশের তাৎপর্য অনুভব করিতে পারেন। কলেমার প্রথম অংশ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই-ইহাও তাহারা প্রকৃতই যথার্থভাবে অনুধাবন করেন। কলেমা শরীফের দ্বিতীয় অংশ "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" অর্থাৎ রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ বা প্রতিনিধি, ইহাও তাহারা বুঝিতে পারেন। রাসূলে করীমই (সাঃ) মানুষের কাছে আল্লাহতায়ালার ধর্ম ইসলামের বাণী বাহক। শরীয়তের পরিপূর্ণ রূপ তাহারই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিফলিত। আল্লাহপাক তাহার পক্ষ হইতে রাসূলে করীম (সাঃ) কে হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন, তাঁহার দেখাইয়া দেয়া পথই আল্লাহতায়ালাকে লাভ করিবার একমাত্র সহজ পথ, ইহা তাহারা অনুভব ও বিশ্বাস করেন।

"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-এই কলেমার প্রথম অংশ তাই বেলায়েতের ইশারা। আর কলেমার দ্বিতীয় অংশ কামালাতের ইশারা।

ছালেক যখন পার্থিব ধ্যান ধারণা মুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার জাতপাক সম্পর্কে ধারণা করিতে সক্ষম হন, তখন এই কলেমার হকিকত ছাড়া ছালেকের অগ্রসর হইবার অন্য কোন পথ থাকে না। দায়েরায়ে এমকান হইতে শুরু করিয়া লা-তাইনের মাকাম পর্যন্ত প্রায় বিশটি মাকামের ওজিফা এই কলেমা শরীফের জেকের। এই কলেমা শরীফের তাৎপর্য ছালেক তাহার মাকাম বা অবস্থান অনুযায়ী উপলব্ধি করিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কলেমা শরীফের দ্বিতীয় অংশ রাসূলে করীম (সাঃ) এর মর্যাদা ঘোষণা করে। রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহপাকের প্রেরিত পুরুষ বা প্রতিনিধি। আল্লাহপাক পবিত্র কলেমাতে ও তাহার আরশ মোবারকে-উভয় স্থানেই নিজ নামের পাশে রাসূলে করীম (সাঃ) এর নাম পাশাপাশি বসাইয়াছেন।

কলেমার দ্বিতীয় অংশ শরীয়তকে পূর্ণকারী ও শরীয়তকে সার্থকভাবে কামেলকারী। কলেমার প্রথমে ও মধ্যে যাহা কিছু সিদ্ধ হয়, তাহা শরীয়তের ছুরত। শরীয়তের আসল বেলায়েতের পরে আসে এবং তাহা কামালাতে নবুয়ত হইতে শুরু ও অর্জিত হয়। বেলায়েতের পরের অংশ কামালতে নবুয়তের অধ্যায় বা মাকাম। ইহা অনুসরণ ও উত্তরাধিকার হিসেবে কামেল আরেফগণ লাভ করেন। নবুয়ত নবী (আঃ) গণের সহিত জড়িত। সুতরাং নবুয়তের কামালাত অর্জন করিতে হইলে নবী (সাঃ) কে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করিতে হইবে।

তবে কামালাতে নবুয়তের মাকামে পৌঁছানোর জন্য প্রথমে বেলায়েতে কোবরার মাকামে অর্থাৎ আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে সানী ও কাওছের মাকামে পৌঁছাইতে হয়। বেলায়েতের মাকামে বর্ণিত তরিকত ও হকিকত হাছিল না করিয়া কামালাতে নবুয়তের মাকাম হাছিল করা যাইবে না।

বিজ্ঞাপন

কামালাতে নবুয়ত অর্জন করিতে না পারিলে শরীয়তের হকিকত রাজ্যে প্রবেশ করা যাইবে না। নামাজের জন্য যেমন ওজু গুরুত্বপূর্ণ; শরীয়তের হকিকত ও কামালাতে নবুয়তের মাকাম অর্জন করিবার জন্য বেলায়েত তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। তবে "ওজুই" ওজুর উদ্দেশ্য নয়। ওজুর উদ্দেশ্য নামাজ পড়া। তেমনি বেলায়েতের উদ্দেশ্য শরীয়তের হকিকত লাভকরা; আর শরীয়তের হকিকতই হইল কামালাতে নবুয়ত।

কামালাতে নবুয়তের অধিকারীগণ অর্থাৎ- যাহারা আল্লাহতায়ালার পথে মানুষকে হেদায়েত করেন, তাহাদের উরুজ আল্লাহতায়ালার জাত পর্যন্ত হইতে পারে, আর বেলায়েতের অধিকারীগণের উরুজ "মাকামে জেলালী" পর্যন্ত পৌঁছায়।

হযরত নবী করীম (সাঃ) যিনি বিশ্ব জগতে আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বকারী, তাঁহাকে সৃষ্টির প্রথমেই আল্লাহপাক তদীয় প্রেম প্রকাশের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। নবী করীম (সাঃ) এর উসিলায় ও তাহার নূর হইতে আল্লাহপাক সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার প্রেমের আধার ছিলেন নবী করীম (সঃ)। এই পৃথিবীতে নবী হিসেবে আবির্ভূত হইয়া তিনি বিশ্ব মানবকে প্রেম দিয়াই আল্লাহপাকের পথে আহ্বান জানাইয়াছেন। মানুষের জন্য তথা সৃষ্টির জন্য রাসূলে করীম (সাঃ) এর ভালবাসা যে কত গভীর ছিল তাহা নবীজী (সাঃ) এর জীবন সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি মাত্রই জানেন। তাহার পথে যে বৃদ্ধা দৈনিক কাঁটা ফেলিত, একমাত্র রাসূলে করীম (সাঃ) এর মত সৃষ্টিপ্রেমীই তাহাকে গিয়া শুশ্রুষা করিতে পারিতেন। তাহার মত মানব প্রেমীই তাহার উপর অত্যাচারকারী আবু জাহেলের রোগ মুক্তির জন্য কাঁদিয়া কাঁদিয়া আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করিতে পারিতেন। যিনি জন্মের প্রথম নিশ্বাস হইতে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত "উম্মতি উম্মতি” বলিয়া সমগ্র মানব জাতির মঙ্গল কামনা করিয়াছেন, সেই নবীজীও (সাঃ) আফসোস করিয়াছেন এই মনে করিয়া যে, মানুষকে যেভাবে আল্লাহর পথে আহ্বান করা উচিত ছিল, তাহা বুঝি তাহার করা হইয়া ওঠে নাই।

বিজ্ঞাপন

এই যে বেদনা ও আমিত্বহীনতা, ইহা কামালাতে নবুয়তের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হযরত আদম (আঃ) মাটির তৈরী মানুষ বলিয়া নিজেকে নিকৃষ্ট জানিতেন। তাই তিনি আল্লাহপাকের নিকট হইতে নবুয়তের মর্যাদা পাইয়াছিলেন। কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা তাই তাঁহারাই লাভ করেন, যাঁহারা নাফসানিয়াত বিশেষতঃ আমিত্বের অহংকার হইতে মুক্ত হন। তরিকতে মুজাদ্দেদিয়া অনুসরণকারী আরেফগণ ও ছালেকগণ জানেন যে, বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে আসিয়া ছালেকের ওজুদের আলমে খালকের তিন লতিফা-আগুন, পানি ও বাতাস পাক হইয়া যায়। কামালাতে নবুয়তের পর্যায়ে আসিয়া "খাক" লতিফাও আল্লাহতায়ালার "দায়েমী তাজাল্লীর" স্রোতে পাক হইয়া যায়। তখন এই মাকাম হাছিলকারী পরিপূর্ণরূপে পবিত্র হইয়া যায়। তাহার মধ্যে আর আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস প্রভৃতি আলমে খালকের লতিফাসমূহের বা নাফসে আম্মারার উপাদানগুলির দোষ থাকে না। তাহার নাফস পরিপূর্ণভাবে পবিত্র ও আল্লাহতায়ালার প্রেমে পাগল হয়। এই পবিত্র দেহ ধারী ব্যক্তি দ্বারা শরীয়তের বা আল্লাহতায়ালার আদেশের খেলাফ বা বিরুদ্ধাচরণ সম্ভব হয় না। তাই আল্লাহতায়ালা তাহার প্রতিনিধিত্ব করিবার ভার পবিত্রদেহ অধিকারী বর্গের নিকটই অর্পণ করেন।

হযরত রাসূলে করীমও (সাঃ) আল্লাহপাকের উদ্দেশ্যে বলিয়াছিলেন, "হে আল্লাহ! শুধু আপনি আমার মকছুদ, আমি আপনাকে ছাড়া আর যাহা কিছু তাহা সবই পরিত্যাগ করিলাম। এমনকি আমি নিজেকেও পরিত্যাগ করিলাম।" হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যেমন বলিয়াছিলেন, সকল নবী (আঃ) গণও অনুরূপ বলিয়াছেন। ইহা নবী (আঃ) গণের বেলায়েতের অধ্যায়। কিন্তু আবার আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন, "কূল হু আল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস সামাদ।" অর্থাৎ হে রাসূল, আপনি বলুন আল্লাহ এক, তিনি অভাব হইতে মুক্ত।” এই ক্ষেত্রে আসিয়া দেখা যাইতেছে, রাসূলে করীম (সাঃ) কে তিনি মানব জাতির হেদায়েতের দায়িত্ব প্রদান করিয়াছেন।

রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, "আসলামা শায়ত্বানা।” অর্থাৎ “আমার শয়তান মুসলমান হইয়া গিয়াছে।" এই শয়তান মানুষের দেহের আগুন-যাহা শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। আর শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারই সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জিনিষ। কামালাতে নবুয়তের মাকামে আসিলে নাফসের আল্লাহ বিরুদ্ধতা একেবারে চলিয়া যায়। বেলায়েতে উলিয়া ও কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় এই পবিত্রতা আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা অর্জন করা যায়, ইহা আগেই বলা হইয়াছে।

বিজ্ঞাপন

হাদীসে কুদসীতে রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, “আল্লাহপাক বলেন, আসমান জমিনের কোথাও আমার গুঞ্জায়েশ হয় না, মুমিন বান্দার কালব বা দেল ব্যতীত।" এই হাদীসে কুদসীতে রাসূলে করীম (সাঃ) শুধু মুমিনগণের দেলের অবস্থার কথা বলিয়াছেন

আবার আর একটি হাদীসে তিনি বলিতেছেন, "মানুষের শরীরে এক টুকরা মাংশপিন্ড আছে; যাহা পবিত্র হইলে, সমস্ত ওজুদ পবিত্র হইয়া যায়"। এই হাদীসে রাসূলে করীম (সাঃ) সমগ্র শরীরের পবিত্র হইবার সংবাদ দিয়াছেন।

যাহাদের দেল পরিষ্কার হইয়াছে ও দেলে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহারা বেলায়েত প্রাপ্ত। আর যাহাদের দেলে কলেমা প্রতিষ্ঠিত হইবার পর সমগ্র ওজুদ পবিত্রতা লাভ করিয়াছে, তাহারাই আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা প্রাপ্ত বা হেদায়েতের দায়িত্ব লাভ করেন। অর্থাৎ যে সকল কামেল আরেফ বা খোদাতত্ত্বজ্ঞানী হেদায়েতের দায়িত্ব আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে লাভ করেন, তাহাদের দেল ও দেহের পবিত্রতা ও শরীয়তের নির্দেশের প্রতি আনুগত্য আল্লাহপাকই আপন কুদরতে রক্ষা করেন এবং আল্লাহপাক তাহাদের কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা দান করেন।

বিজ্ঞাপন

নাফস এবং নাফসের উপাদান আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস পবিত্র হইয়া গেলে নাফস মোলহেমা প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ ইহা আল্লাহপাকের এলহাম শুনিবার যোগ্যতা লাভ করে। স্থূল জগতে আসিবার পূর্বে মানুষের যে অস্তিত্ব আলমে আরোওয়াহতে বা রূহের জগতে বা হুকুমের জগতে ছিল, সেই অস্তিত্বেরও এই গুণ ছিল। রূহে মোলহেমা আল্লাহপাকের এক বিশেষ দান ও নেয়ামত। এই রূহে মোলহেমার অধিকারী ব্যক্তি কবরের পাশ দিয়া যাইবার সময়ে বা কবর স্থানে গেলে কবরবাসীদের কথাও শুনিতে পারেন।

মোলহেমা প্রাপ্ত নাফস রূহের আদি গুণ লাভ করে। যে রুহ "আলমে আরোওয়াহ" বা রূহানী জগতে "আমি কি তোমাদের প্রভু নই?" আল্লাহপাকের এই প্রশ্নের জবাবে আনুগত্য স্বীকার করিয়া "বালা” বা "বেশখ, আপনি আমাদের প্রভু” বলিয়াছিল। এই মোলহেমার স্তর শুরু হয় আকরাবিয়াতের মাকাম হইতে, যে মাকামকে আল্লাহপাক তাহার প্রেমের হেরেম বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এই মাকামে যাহারা উন্নীত হন; তাহারা আল্লাহপাকের মহব্বত বা "হোব্ব” দ্বারাই ঐ মর্যাদাপ্রাপ্ত হন। নবী (আঃ) গণ যেমন নির্ধারিত ও আল্লাহপাকের মহব্বতের (হোব্ব) অধিকারী, এই মাকামে যাহারা উন্নীত হন তাহারাও আল্লাহ দ্বারা গৃহীত ও আল্লাহপাকের মহব্বতের (হোব্ব) দ্বারা ঐ মাকামে আনীত হন। ছায়ের ছুলুক বা চেষ্টা দ্বারা যাহা অর্জন করা যায় তাহার সীমা বেলায়েতে ছোগরার মাকাম পর্যন্ত বলিয়া তরিকতের পীরানে পীরগণ উল্লেখ করিয়াছেন।

মোলহেমা প্রাপ্ত নাফসের অধিকারীগণ আলমে আরোওয়াহর গুণ বা রূহের জগতের বা সূক্ষ্ম জগতের গুণাগুণ লাভ করেন। তাহাদের ওজুদের বা দেহের সকল উপাদানের পবিত্রতার কারণেই তাহারা এই মাকাম লাভ করেন বা অন্য কথায় বলা যায় আল্লাহপাক যাহাদের মহব্বত করেন, তাহাদের দেহের সমস্ত লতিফাকে তিনি পবিত্রতা দান করেন। এই মহব্বত (হোব্ব) বা প্রেম আল্লাহপাকের মধ্যে উদ্ভূত হয় সৃষ্টির প্রথমে; যাহার উদ্দেশ্য ছিল তাহার নিজের পরিচয় প্রকাশ করা। আল্লাহপাকই প্রেমের স্রষ্টা। এই প্রেম আল্লাহপাকের নিজস্ব সম্পদ। সাধারণ মানুষের ইহা ব্যবহারের যোগ্যতা বা ইহার মর্ম উপলব্ধি করার ক্ষমতা নাই, কারণ স্থূল জগতের মানুষ স্বার্থান্ধ। তাই তাহাদের প্রেম স্কুল ও স্বার্থ জড়িত, বিশুদ্ধ নয়। তাই হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন-

"সাধারণে এর ভেদ বুঝিতে কি পারে

আবে হায়াতের স্থান গভীর আঁধারে।"

যাহাদের নাফস মোলহেমার স্তরে উন্নীত হইয়াছে, তাঁহারা বুঝিতে পারেন, তাঁহাদের নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্য, কোন গুণাগুণ নাই। বস্তুত সৃষ্টির নিজস্ব কোন গুণ বা সৌন্দর্য নাই; ইহার সমস্ত গুণ ও সৌন্দর্যই আল্লাহপাকের। সৃষ্টির নিজস্ব যাহা কিছু তাহাই অশুভ। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান, "তোমার নিকট যে মংগল আসিয়াছে তাহা আল্লাহপাকের নিকট হইতে এবং তোমার মধ্যে যাহা কিছু অশুভআছে, তাহা আদামত হইতে।" আদামত অন্ধকার; তাই সৃষ্টির নিজ বৈশিষ্ট্য অশুভ। সৃষ্টির নিজস্ব কোন শুভ গুণ বা সৌন্দর্য নাই। সমস্ত কল্যাণ ও সৌন্দর্যের মালিক আল্লাহ। মহব্বত বা হোব্বও আল্লাহপাকের বিশেষ গুণ ও সৌন্দর্যের প্রকাশ

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাত শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন, যিনি নিজের অক্ষমতা ও নিজের মধ্যে অকল্যাণকর বৈশিষ্ট্য যত বেশী উপলব্ধি করিবেন; তিনি ততই তাহার প্রতি আল্লাহপাকের মহব্বত, দয়া ও রহমত উপলব্ধি করিতে পারিবেন।

আল্লাহপাকের জন্য মহব্বতে তাহার হৃদয় বিগলিত হইবে। তিনি তাই আল্লাহপাকের মুখাপেক্ষী হইবেন। আল্লাহপাক তাহাকে ক্রমে ক্রমে প্রেমাস্পদ হিসেবে গ্রহণ করিবেন। সৃষ্টি জগতের অন্তর্গত হইয়া যিনি যত বেশী নিজের দোষ সম্পর্কে সচেতন হইবেন, নিজের নিকৃষ্টতার কথা স্বীকার করিবেন, তিনি ততই আল্লাহপাকের মা'আবুদিয়াত বা প্রভুত্ব স্বীকার করিবেন।

হযরত আদম (আঃ) মাটির মানুষ হিসেবে নিজেকে নিকৃষ্ট জানিতেন। পক্ষান্তরে আজাজিল আগুনের তৈরী বলিয়া নিজেকে শ্রেষ্ঠ জানিয়াছিল। শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার তাহাকে সর্বনিম্ন করিয়া দিল। হযরত আদম (আঃ) নিজেকে অপরাধী এবং নিকৃষ্ট বলিয়া স্বীকার করিয়াছিলেন বলিয়া সকল দোষমুক্ত হইলেন। আল্লাহপাক হযরত আদম (আঃ) কে তাহার খলিফা বলিয়া স্বীকৃতি দিলেন। তার অহংকারের জন্য আজাজিল অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হইল।

নিজ দোষ দেখার গুণ যিনি যতখানি নিখুঁতভাবে অর্জন করিতে পারেন, তাহার মধ্যেই আল্লাহপাক এই শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন। মানুষের মধ্যে যখন কোন কিছু গচ্ছিত রাখা হয়, মানুষ জানে সে সেই গচ্ছিত বস্তুর মালিক নয়-আমানতদার মাত্র। আল্লাহপাকও মহব্বত করিয়া তাহার নিজস্ব গুণাবলী যেমনঃ হায়াত (জীবন), এলেম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা), এরাদত (ইচ্ছা), ছামায়াত (শ্রবণ), বাছারত (দর্শন), কালাম (কথন), ও তাকবীন (সৃষ্টিকরণ) হইতে মানুষকে অনেক গুণ দান করিয়াছেন।

আল্লাহপাক এই সকল গুণ দান করিয়াছেন বলিয়াই আমরা বাঁচিয়া থাকি, দেখিতে পারি, কথা বলিতে পারি, চলাফেরা করিতে পারি। মানুষের যে জ্ঞান তাহার মূলও আল্লাহতায়ালার সিফাতে এলেম। সচরাচর আমরা মনে করি যে, এই সকল গুণ আমাদের। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা সমস্তই আল্লাহপাকের গুণ। ইহাইতো সত্য যে সৃষ্টির নিজের বলিয়া কিছুই নাই; সমস্তই আল্লাহপাকের। সকল গুণ, সকল ক্ষমতা আল্লাহপাকের। তিনি মানুষের নিকট ইহা গচ্ছিত রাখিয়াছেন। মানুষের এই সকল গুণ ও ক্ষমতা আল্লাহপাকের গুণ ও ক্ষমতাসমূহের ছায়া মাত্র। সেই জন্য মানুষের এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয় না। ছায়া বা প্রতিবিম্ব তাহার উৎসে বা মূলে বা আসলে ফিরিয়া যায়। ইহাই প্রকৃতির চিরদিনের নিয়ম। এই জন্য আল্লাহপাক আদেশ করিয়াছেন, "তোমার গচ্ছিত সম্পদ ইহার মালিকের নিকট ফিরাইয়া দাও।" আমাদের নিকট স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে, আমরা ভুল করিয়া এই ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হই।

সৃষ্ট বস্তুুর সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য আল্লাহপাকের, বস্তুর নিজস্ব নয়। প্রত্যেক বস্তুর গুণ ও অবস্থা পরিবর্তনীয়। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় তাহা পরিবর্তন করা সম্ভবও। আল্লাহপাক তাহা করেনও। হযরত মুসা (আঃ) এর লাঠিকে "সাপ” তৈরী করার ঘটনা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বস্তুর স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য চিরস্থায়ী নহে, ইহার সমস্ত বৈশিষ্ট্য আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় পরিবর্তনশীল, চিন্তাশীল লোকের ইহা অনুধাবন করা প্রয়োজন। আল্লাহপাক ফরমানঃ সমস্ত শক্তি, সমস্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহতায়ালার। অন্য কাহারও কোন যোগ্যতা বা গুণাগুণ নাই। "ইন্নাল কুয়াতা লিল্লাহে জামীয়া। ইন্নাল ইজ্জতে লিল্লাহে জামীয়া"।

আল্লাহপাক যাহাদের মহব্বত করেন তাহারা আল্লাহপাকের নেয়ামত ও দানের প্রতি শোকর গোজার ও তাহার ভালবাসা স্মরণ করেন। নিজের নিকৃষ্টতা স্বীকার করার জন্যই তাহারা ইহা করেন। আল্লাহপাকের মহব্বত যাহারা লাভ করেন তাহারা আল্লাহপাকের নিকট হইতে বালা মুছিবত আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সহিত গ্রহণ করেন। কারণ তাহারা উপলব্ধি করেন, আল্লাহপাকের নিকট হইতে যাহা কিছুই আসে তাহা বান্দার জন্য আল্লাহতায়ালার মহব্বতের নিদর্শন হিসেবে বা মহব্বতের প্রকাশ হিসেবেই আসে। বালা মুছিবতের আপাত খারাপি ছাড়া ইহার আড়ালে আল্লাহপাকের অসীম নেয়ামত ও রহমত লুকায়িত থাকে।

দেখা যায় যে, যাহারা আল্লাহপাকের মহব্বত অর্জনকারী কামেল ওলী বা খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী আরেফ; তাহাদের জন্যও বালা মুছিবত আসে। আবার দেখা যায় যাহারা আল্লাহপাকের বিরুদ্ধাচারণ করে, তাহাদের উপরেও বালা মুছিবত আসে।

যাহারা আল্লাহপাকের দেওয়া বালা মুছিবত কৃতজ্ঞতার সহিত গ্রহণ করিতে পারে না, তাহাদের জন্য বালা মুছিবত সত্যই মুছিবত হিসেবেই রহিয়া যায়। আর যাহারা বালা মুছিবতকে আল্লাহপাকের দেয়া নেয়ামত হিসেবে গ্রহণ করেন, সেই বালা মুছিবত নতুন নেয়ামত ও সৌভাগ্যের দরজা খুলিয়া দেয়। সেই জন্য অনেক আরেফ আল্লাহপাকের নিকট নিজেদের উপর বালা মুছিবতের জন্য মুনাজাতও করিয়াছেন।

এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন "শোকর" হইতে "হামদ" বা প্রশংসার মর্যাদা অধিক। শোকর নেয়ামত গ্রহণের পরের মনোভাব। আর প্রশংসার ক্ষেত্রে আল্লাহপাকের তিরস্কার বা পুরস্কারের প্রতি খেয়াল থাকে না। নেয়ামত না পাইলে কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু প্রশংসা বা "হামদ" পাওয়া-না পাওয়া, আনন্দ-বেদনার প্রশ্ন না তুলিয়াই করা যায়। কোন নেয়ামত না পাইয়াই আল্লাহতায়ালার প্রশংসা করিতে পারাই জাতি মহব্বতের প্রকাশ। আর জাতি মহব্বত যখন সৃষ্টি হয়, তখন এবাদতে জাহান্নামের শাস্তির ভয় বা জান্নাতের শান্তি পাবার লোভ থাকে না। সেই এবাদত মহব্বতের এবাদত। প্রেমাস্পদ আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে প্রেমিক বান্দার এবাদত; তাহাই আল্লাহপাকের জন্য বেশী আনন্দের।

সেইজন্য হযরত রাবেয়া বসরী (রাঃ) বলিয়াছেন, "বেহেশত পোড়াইয়া ফেল এবং দোযখ পানি দিয়া নিভাইয়া ফেল। তাহা হইলে মানুষ বেহেশতের লোভে বা দোযখের আজাবের ভয়ে এবাদত করিবে না।" তাহার মধ্যেই রহিবে প্রেমাস্পদ খোদার জন্য প্রেমিক বান্দার মহব্বতপূর্ণ এবাদত। আল্লাহ যাহাদের মহব্বত করেন, তাহাদের তিনি তাহার কুদরত, রহমত ও মহব্বতের আবরণে ঢাকিয়া রাখেন। অনেক সময় আরেফ বা ছালেকের উপর যে বিপদ আসে, সেই বিপদ তাহাকে বড় রকমের গজব হইতে বাঁচাইয়া দিবার জন্য বা উচ্চতর কোন নিয়ামত বা মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহপাকের তরফ থেকে আসে। যেমন হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তাহার ভ্রাতারা ষড়যন্ত্র করিয়া কূপের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছিল। বনিকেরা হযরত ইউসুফ (আঃ) কে সেখান হইতে উঠাইয়া আবার মিশরে বিক্রয় করিয়াছিল। আল্লাহপাকের ইশারায় ইহার সমস্তই হইয়াছিল হযরত ইউসুফ (আঃ) এর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। আল্লাহপাক ইহার পর হযরত ইউসুফ (আঃ) কে মিশরের বাদশাহ্ করিয়াছিলেন।

আল্লাহপাক যাহাদের মহব্বত করেন, তাহারাই কেবল তাহা অনুধাবন করিতে পারেন। আর আল্লাহতায়ালার দেয়া বিপদকে ধৈর্য ও শোকরের সাথে বরণ করিয়া খোদাতায়ালাকে যাহারা ভালবাসেন তাহারা তাহাদের মাবুদের প্রতি মহব্বত প্রকাশ করেন। এই ভাবে আল্লাহ ও তাহার প্রেমিক বান্দার মধ্যে যে মহব্বত সৃষ্টি হয়, তাহাই প্রকাশ পায় কামালাতে নবুয়তের মাকামে। "আল্লাহর ভেদ মানুষ, মানুষের ভেদ আল্লাহ" এই মাকামে আসিয়া ছালেক এই কথার মারেফাত বা ভেদ বুঝিতে পারে। এই মাকামে আসিয়া শত গজবের মুখেও বান্দা তাহার মা'বুদ ও মাহবুব বা প্রভু ও প্রেমাস্পদ আল্লাহকে ছাড়ে না, আর আল্লাহও বান্দাকে ভোলেন না।

সকল স্বার্থ অর্থাৎ নাফসানিয়াত মুক্ত হন যিনি, তিনি অনুধাবন করেন আল্লাহ সকল কিছুর মালিক। যে ব্যক্তি সকল দোষমুক্ত হইয়া আল্লাহতায়ালার আকরাবিয়াত বা হেরেমের অভ্যন্তরে প্রবেশানুমতি পান, তিনি খোদা প্রদত্ত একটি দ্বিতীয় শরীর ও ব্যক্তিত্ব লাভ করেন। এই দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব আসে, আল্লাহপাক তাহাকে তাহার নিজ সিংহদ্বারে লইয়া যে শরীর প্রদান করেন, সেই শরীর দ্বারা। এই শরীরকেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব "ওজুদ মাওহুব লাহু” বলিয়াছেন। ওজুদ মাওহুব লাহুর ব্যক্তিত্ব সাধারণ মানুষের আমিত্ব হইতে মুক্ত।

এই আল্লাহ প্রদত্ত শরীর বা "ওজুদ মাওহুব লাহু" নিজেকে ভালবাসার চেয়ে আল্লাহকে বেশী ভালবাসিতে পারে। কারণ সে আল্লাহতায়ালার মহব্বত বেশী অনুভব করিতে পারে। এই "ওজুদ মাওহুব লাহু'ই আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে প্রকৃত মহব্বতের সম্পর্ক স্থাপন করিতে পারে যে মহব্বত সকল স্বার্থ ও পাওয়া না পাওয়া হইতে মুক্ত। বেলায়েত প্রাপ্ত ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত পরিপূর্ণ বিলীন করিয়া দেন। বেলায়েত যিনি প্রাপ্ত হন, তিনি আল্লাহতায়ালার দিকে তদীয় দৃষ্টি পরিপূর্ণভাবে নিবদ্ধ করেন-তিনি আর দুনিয়ার দিকে ফিরিয়া তাকান না। আর যাহারা কামালাতে নবুয়ত হাছিল করেন, তাহারা আল্লাহতায়ালার জাতপাকে পৌঁছাইবার পর হেদায়েতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন, তাহারা জাতের সহিত বিলীন হইয়া পুনরায় মাটির পৃথিবীর সংগে সম্পর্ক স্থাপন করেন সাধারণ মানুষকে আল্লাহপাকের পক্ষ হইতে হেদায়েত করিবার জন্য।

রাসূলে করীম (সাঃ) যখন এই রূপ নিজে আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে বিলীন হইয়া যাইতেন, আল্লাহপাক তাহাকে ঘুরাইয়া দিতেন; বলিতেন,

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ.

অর্থাৎ- [হে নবী!] আপনি বলুন, আমিতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ; তবে আমার প্রতি ওহী হয়।" (সূরা কাহফঃ১১০)

বেলায়েতে নবুয়ত প্রাপ্ত আরেফগণ শুধু নিজেদের আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে নিবেদিত করেন। আর কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত ব্যক্তি জাতপাক হইতে ফিরিয়া আসিয়া বিশ্ব মানবের কল্যাণের জন্য নিজেদেরকে আল্লাহতায়ালার নিদের্শে নিয়োজিত করেন। এই উন্নত মাকাম তয় করিতে হইলে, পীরে কামেলের বিশেষ মহব্বত ছাড়া ফয়েজান হাছিল হয় না। এই মাকামে ফয়েজ দান করার মত ওলীও জগতে কম আসেন। কোটি কোটি তারকার মধ্যে যেমন আকাশে একটি মাত্র চন্দ্র উদয় হয়, তেমনি কোটি কোটি মানুষ তথা বহু ওলী আল্লাহগণের মধ্যে স্থান একজন মুরাদ ফকিরের।

তাই হে জাকেরানগণ! তোমরা জানিয়া রাখ, এই সকল দুর্লভ গুণাবলী ও খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় উচ্চতর মাকামের ফয়েজ দানের দুর্লভ ক্ষমতা ও গুণাবলী লইয়া ধরাধামে আর্বিভূত হইয়াছিলেন আমার মহান দয়ালপীর দস্তগীর হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। তিনি এতবড় ওলী যে, তিনি রাসূলে করীম (সাঃ) এর গুণে গুণান্বিত ছিলেন। রাসূলে করীম (সাঃ) যেমন সমস্ত জীবন উম্মতের জন্য কাঁদিয়াছেন, তেমনি হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব মুরীদের বেদনায় সমস্ত রাত্রি ধরিয়া কাঁদিতেন। সমস্ত সৃষ্টির কল্যাণের জন্য ও সমস্ত সৃষ্টির গোনাহকে নিজের কাঁধে লইয়া আল্লাহতায়ালার দরবারে পানাহ চাহিতেন। তাই আশেকগণ গাহিয়াছেন-

"হয় নাই এমন ওলী ভুবনে কখন

কোন কালে, কোন দেশে, এহেন রতন।"

তাই তোমাদিগকে বলা হইতেছে, তোমরা আপন পীরে কামেলের মহব্বত যদি পুরাপুরি অর্জন করিতে পার, তাহা হইলে তোমাদের দেলে এই সকল মাকামের ঘ্রাণ আসিবে; বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের ফয়েজ হাছিল করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব হইবে।

তাই তোমরা সকলেই ধ্যানে ও খেয়ালে আপন পীরের সহিত মিশিয়া থাক যেমন পানিতে লবণ মিশিয়া যায়। লবন পানির সহিত মিশিয়া গেলে লবনের অস্তিত্ব আর দৃষ্টিতে ধরা পরে না। আল্লাহ বলেন, "তোমরা তিনটি দেশ পার হইয়া অর্থাৎ জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত পার হইয়া আকরাবিয়াতের মাকামে আস। সেইখানে তোমাদের সহিত আমার প্রেমময় মিলন হইবে।" পীরের সহিত পরিপূর্ণরূপে বিলুপ্ত হইতে হইবে। তাহা হইলেই আল্লাহতায়ালার নৈকট্যের মাকামে বা আকরাবিয়াতের মাকামে পৌঁছাইবার পথ তোমাদের জন্য প্রশস্ত হইবে। যে মাকামে নৈকট্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, "নাহনু আকরাবো এলাইহে মিন হাবলীল ওয়ারিদ" অর্থাৎ আমি তোমাদের জানরগ হইতেও নিকটে। পীরানে পীরগণ বলেন, "আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সমুদ্রে সমস্ত সৃষ্টি নিমজ্জিত।" তখন তুমি বুঝিতে পারিবে আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত তুমি মিশিয়া আছ। পীরের সহিত পরিপূর্ণ মেশামিশি বা ফানা লাভ হইবার পর এই মাকাম হাছিল করা যায়।

তোমাদের এই জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস আল্লাহ তোমাদের দান করুন। আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-এ চারিটি গুণ ছাড়া খোদাপ্রাপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই চারিটি গুণই লাভ হয় মুর্শিদে কামেলের দয়ায়। মুর্শিদে কামেলের খেদমতের দ্বারাই এই দয়া লাভ করা যায়।

হে খোদা! আপনি দয়া করিয়া তৌফিক দেন, আমরা যেন আপনাকে বুঝিবার পথে মুর্শিদে কামেলের মহব্বত লাভ করিতে পারি ও ফানা ফিশ শেখের মাকাম হাছিল করিতে পারি। আমীন! (চলবে......)

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD