কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের পরিচয়

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের পরিচয়। কামালাতে নবুয়তের আলোকে কামেল পীরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
বেলায়েত অর্থ ওলীত্ব যাহা খোদাতায়ালার নৈকট্য বা সান্নিধ্যের উপর নির্ভর করে। বেলায়েতের মূখ্য উদ্দেশ্য খোদাতায়ালার নৈকট্য বা সান্নিধ্য অর্জন।
আল্লাহ্পাক তাঁহার নিজ পরিচয় প্রদানের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন। মানুষের হকিকত বা নিরাকার, রূপহীন, অবিনাশী সত্ত্বা আল্লাহ্পাকের সিফাতের মধ্যে স্থিত ছিল। সিফাতস্থিত হকিকতসমূহের প্রতি 'কুন' শব্দ প্রয়োগ করায় মানুষের নিরাকার, রূপহীন অবিনাশী সত্ত্বা অপরূপ ও সূক্ষ্ণ আকারে সৃষ্ট হইয়া আলমে আরোওয়াস্থিত হইল। তথা হইতে বিভিন্ন ধাপে আলমে খালকে আসিয়া স্থূল আকৃতিতে বিরাজ করিতেছে। এখান হইতে তথা এই আদামাত হইতে মানুষকে 'ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেয়ন'-এর পথ ধরিয়া পুনরায় খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে বা নৈকট্যে পৌছাইতে হইবে। মানুষ যাহাতে খোদাতায়ালার পরিচয় সহজে গ্রহণ করিতে পারে, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা নৈকট্য অর্জন করিতে সক্ষম হয়, সেই উদ্দেশ্যে আল্লাহ্পাক মানুষের এই স্কুল দেহের অভ্যন্তরে কিছু সংখ্যক লতিফা প্রদান করিয়াছেন। লতিফা মূলতঃ দশটি। পাঁচটি আলমে আমরের লতিফা; যথা কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা এবং পাঁচটি আলমে খালকের লতিফা; যথাঃ আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফস। এই লতিফাসমূহ মানবদেহে সুপ্ত অবস্থায় রহিয়াছে। সুপ্ত এই লতিফাসমূহের জাগ্রতকরণ ব্যতীত খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন সম্ভব নয়। লতিফাসমূহের জাগ্রতকরণ পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদী বা দয়ার উপর নির্ভরশীল। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে মুরীদের কালব (দেল) হইতে খোদা ভিন্ন অন্য সকল কিছুর মহব্বত দূর হয়। বেলায়েতের উদ্দেশ্য খোদা ভিন্ন অপরাপর সব কিছু ভুলিয়া যাওয়া। কিন্তু এই পথে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা প্রচুর। প্রথম প্রতিবন্ধক নাফসে আম্মারা, যে সব সময়ই খোদাতায়ালার বিরুদ্ধ কর্মে লিপ্ত থাকে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ-মাৎসর্য, হিংসা, কিনা রিয়া, কামনা, বাসনা ইত্যাদি কুরিপুর মধ্যে ইহার কর্মসূচী। ইহা শয়তানের পক্ষ হইতে মানবদেহে এক সিপাহসালার যে সবসময়ই মানুষকে খোদা হইতে দূরে রাখিতে তৎপর। নাফসে আম্মারা ব্যতীত অন্যান্য যাহা ছালেককে খোদাতায়ালার দিকে অগ্রসর হইতে বাধা দেয় তারা মূলত ছালেকের মানব দেহ এবং দুনিয়ার মহব্বত। উল্লিখিত বাঁধা বা প্রতিবন্ধকতা দূর করিয়া খোদার সান্নিধ্যে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন বিষয়। এখানে দীর্ঘ সময় নাফসে আম্মারা এবং মানবদেহের উপাদান চতুষ্টয়ের সহিত যুদ্ধ করিতে হয়। এই যুদ্ধ বা জেহাদকে রাসূলে পাক (সাঃ) 'জেহাদে আকবর' বলিয়াছেন। রাসূলেপাক (সাঃ) বলেন,
رَجَعْنَا مِنْ الجِهَادِ الْأَصْغَرِ إِلَى الجِهَادِ الْأَكْبَرِ.
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- "আমরা ছোট যুদ্ধ হইতে বড় যুদ্ধে যাইতেছি।"
এই বড় যুদ্ধ বা জেহাদে আকবর হইল ফেরাউনরূপী নাফসের সহিত যুদ্ধ করা এবং জড়দেহের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করা। এই যুদ্ধে বা জেহাদে পীরে কামেল ছালেককে বা খোদাতালাশী ব্যক্তিকে সর্বাপেক্ষা বেশী সাহায্য করিয়া থাকেন। তাই বলা হয় পীরের মত দরদী কেউ নাই, পীরের মত দরদী কেউ হয়ও না। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলে ছালেক নাফসে আম্মারার সাথে জেহাদে জয়ী হয় এবং দেল হইতে আল্লাহ্ ভিন্ন সমস্ত কিছু ঝাড়িয়া ফেলিতে সক্ষম হয়। দুনিয়ার মহব্বত, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা, বাসনাকে পরিত্যাগ করিয়া এক আল্লাহ্ নূরে বিলীন হয়। ইহা বেলায়েতে ছোগরা বা মা'ইয়েতের মাকাম। এখানে সিফাতে হাকীকী এবং সিফাতে এজাফিয়ার নূর একত্রিত হইয়া এক বিশাল নূরের সমুদ্র তৈরী করে যে সমুদ্রে ছালেক তামাম বিশ্ব ব্রহ্মান্ড এবং নিজেকে নিমজ্জিত দেখে। এখানে মনোমুগ্ধকর নূর সর্বদাই বিরাজমান। নূরের চমকে ছালেকের কখনও মতিভ্রম হয়, বুদ্ধি বৈকল্য দেখা দেয়। শরীয়তের খেলাফ বহু কথাই ছালেক এই ছোগরা বেলায়েতে বলিয়া ফেলে। বেলায়েতকে মোটামুটি তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করা হইয়াছে।
যথাঃ বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে উলিয়া। তিনটি অধ্যায় অতিক্রম করিবার মধ্যে বেলায়েতের কামালাত এই নিহিত। কামালাতে বেলায়েতের প্রথম মাকাম বেলায়েতে ছোগরা। বেলায়েতে ছোগরার সম্পর্ক তাজাল্লীয়াতে আফয়াল বা আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াকলাপের প্রকাশস্থলের সঙ্গে। দ্বিতীয় মাকাম বেলায়েতে কোবরার সম্পর্ক তাজাল্লীয়াতে সিফাত বা আল্লাহতায়ালার গুণাবলীর প্রকাশস্থলের সঙ্গে এবং তৃতীয় মাকাম বেলায়েতে উলিয়ার সম্পর্কও তাজাল্লীয়াতে সিফাতের সঙ্গে তবে এই সিফাত জাত মিশ্রিত থাকে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, কামালাতে বেলায়েতের উল্লিখিত তিনটি ধাপ ছাড়াও আরও একাধিক ধাপ রহিয়াছে যাহাদের সম্পর্ক তাজাল্লীয়াতে জাত অর্থাৎ মূল সত্তার আবির্ভাব স্থলের সঙ্গে। এমন কিছু লোক আছেন যাহারা বেলায়েতের চতুর্থ স্তরের সাহিত সম্পর্ক রাখেন। ইহাদের চেয়েও কম, অতি অল্প সংখ্যক লোক আছেন যাহারা পঞ্চম স্তরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। ইহাই কামালাতে বেলায়েতের সর্বশেষ স্তর যাহার শেষ বিন্দু নাম, গুণ, শান, শয়ুনাতের পরপারে তাইনে আউয়ালের প্রান্তরেখার হোব্বে সেরফা পর্যন্ত বিস্তৃত।
বিজ্ঞাপন
কামালাতে বেলায়েতের পরবর্তী দায়েরা হইল কামালাতে নবুয়ত। ইহা দায়েমী তাজাল্লীয়াতে জাতির প্রথম অংশ। এই দায়েরায় ফয়েজান ছালেকের 'খাক' লতিফার উপর পতিত হইয়া ছালেকের দেহের মাটির স্তর পবিত্র হয়। দেহের অন্যান্য তিন স্তর যথা আগুন, পানি ও বায়ু পবিত্রতা লাভ করে কামালাতে নবুয়তের পূর্বের দায়েরা বেলায়েতে উলিয়াতে। কাজেই, কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় আসিয়া ছালেকের দেল এবং দেহ সম্পূর্ণ পাক হয়। তথা ছালেকের দশ লতিফা অর্থাৎ কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক ও বাদ সবই পবিত্রতা লাভ করে এই দায়েরাতে। ফলে কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় ছালেক দশ লতিফা বিশিষ্ট একক সত্ত্বা অর্থাৎ 'হায়াতে ওহাদানী' প্রাপ্ত হয়। ফলে এই দায়েরা হইতে লা-তাইনের পূর্ব পর্যন্ত যত দায়েরা বিদ্যমান, সমস্ত দায়েরাতেই তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের দায়েমী ফয়েজ 'ওজুদ মাওহুব লাহু' হইয়া ছালেকের হায়াতে ওহাদানীতে পতিত হয়। এই দায়েরায় ছালেক শরীয়তের যাবতীয় আদেশ-নিষেধের হকিকত বুঝিতে সক্ষম হয়। শরীয়তের দুইটি অবস্থা যথাঃ শরীয়তের ছুরত, শরীয়তের হকিকত। শরীয়তের ছুরতের সীমা বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত। আর শরীয়তের হকিকতের জ্ঞান যদিও আকরাবিয়াত হইতে শুরু তবুও কামালাতে নবুয়ত এবং তৎপরবর্তী মাকামসমূহে আসিয়া এই হকিকত পূর্ণরূপে অর্জিত হয়। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন যে, আলেমগণ নবীদের ওয়ারেস। যাহারা শরীয়তের ছুরত ও হকিকতের জ্ঞানে জ্ঞানী তাহারাই নবী (সাঃ)-এর ওয়ারেস বা উত্তরাধিকারী।
কামালাতে বেলায়েতের শেষ বিন্দু বা স্তরে পৌছানোর পর আল্লাহপাক ছালেককে কামালাতে নবুয়তের যোগ্যতা, মর্যাদা এবং হাল সমূহ দিয়া দুনিয়ায় পাঠাইয়া দেন আল্লাহভোলা মানুষদেরকে আল্লাহ্ ও রাসূলের পথে আনয়নের জন্য। কামালাতে বেলায়েতের শেষ প্রান্তে প্রেমসমুদ্রের গভীর কেন্দ্রে হোব্বে সেরফায় পৌঁছাইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) যখন উম্মতের কথা ও দুনিয়ার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়া খোদাতায়ালার প্রেমসুধা পানে রত থাকিতেন, তখনই আল্লাহ্পাক তাহাকে তাহার প্রেমাস্পদ উন্মতের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া, তথা কামালাতে নবুয়তের দায়িত্বের কথা স্মরণ করাইয়া দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিতেন। বলিতেন, وه قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى.
অর্থাৎ- “(হে নবী!) আপনি বলুন যে, আমি তোমাদের মতই মানুষ তবে আমার উপর অহী হয়।।"
বিজ্ঞাপন
রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণ, উত্তরাধিকার ও তোফায়েলের মাধ্যমে কিছু সংখ্যক উম্মত বেলায়েতের শীর্ষে আরোহনের পরে খোদাতায়ালার নির্দেশে দাওয়াত ও এরশাদের দায়িত্বের বোঝা মাথায় করিয়া দুনিয়ায় অবতরণপূর্বক জগতবাসীদেরকে আল্লাহমুখী করিবার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁহারাই জগতের বুকে ওলীয়ে কামেল বা মোর্শেদে কামেল বা কামেল ও মোকাম্মেল পীর নামে পরিচিত।
কাজেই অপরাপর সকলকে খোদাতায়ালার দিকে দাওয়াত দেওয়া বা হেদায়েত করা বা সোজা কথায় পীর-মুরিদী করা সহজসাধ্য নহে। পীর-মুরিদী করিতে হইলে বা হেদায়েতের কার্য করিতে মনে বাসনা থাকিলে অবশ্যই কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের সম্পদে সম্পদশালী হইতে হইবে অর্থাৎ কামালাতে বেলায়েতের সর্বশেষ বিন্দু পর্যন্ত উরুজ করিয়া তথা হইতে খেলাফতির সাজে সজ্জিত হইয়া বা প্রতিনিধিত্বের পোশাক পরিধান করিয়া অর্থাৎ কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা ও হালসহ দুনিয়ায় নযুল (অবতরণ) করিয়া সৃষ্টির বা খালকের হেদায়েত কার্যে আত্মনিয়োগ করিতে হইবে।
যদি কেহ চিকিৎসক হইতে ইচ্ছা করে, তবে তাহাকে চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জনপূর্বক মেডিক্যাল কলেজ হইতে চিকিৎসকের যোগ্যতার স্বীকৃতি পত্র আনিতে হয় নতুবা সে চিকিৎসা কর্ম করিতে পারে না। ঠিক তেমনি যদি তোমরা খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও এবং খোদাপ্রাপ্তির পরে অন্যান্যদের এই পথে আহবান করিতে বা দাওয়াত দিতে চাও তবে অবশ্যই তোমাদেরকে কামালাতে বেলায়েতের সর্বশেষ বিন্দু পর্যন্ত উরুজ করিয়া তথা হইতে হেদায়েতের স্বীকৃতিপত্র সংগ্রহ করিয়া অর্থাৎ কামালাতে নবুয়তের তাক হইতে ব্যাপক জ্ঞান আহরণ করিয়া দুনিয়ার আগমনপূর্বক দাওয়াতের কর্ম বা দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। ইহার কোন বিকল্প নেই। তাই আমার পীর কেবলাজান আমাকে বলিয়াছিলেন 'বাবা, তুমি আনা-ফানার মোকাম তয় করিয়া তৎপর হেদায়েতের জন্যে প্রস্তুত হও। চারা কলাগাছের বুক ফাড়িয়া যদি কলার ছড়ি বাহির হয়, তবে সে কলাও পোক্ত হয় না, ছোপও বালা হইয়া যায়।' এই আনা-ফানার মোকামের তাৎপর্য হইল কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের সম্পদে নিজেকে সম্পদশালী করা। আসলে, কামালাতে বেলায়েত উরুজের সাথে সম্পর্কিত। ইহা লতিফা কালব হইতে শুরু করিয়া দায়েরায়ে মোনাস্বেফ, আলমে খাল্ক, আলমে আমর, বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালত, কামালাতে উলুল আজম, তৎপর এবাদতের পথে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত ও মাবুদিয়াতে ছেরফা এবং মহব্বতের পথে হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী, হোব্বে ছেরফা এবং ইহার পরে ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে জাত লাতাইন ও জাত পাক পর্যন্ত ছায়ের ও উরুজ। এইভাবে উরুজের শেষ প্রান্তে পৌছাইয়া পুনরায় অবতরণ (নযুল) করিতে হয়। এই অবতরণ বা নযুল যাহা কামালাতে নবুয়তের সহির সংশ্লিষ্ট।
বিজ্ঞাপন
কাজেই লতিফা কালব হইতে শুরু করিয়া উরুজের শেষ প্রান্তে জাত লাতাইন ও জাতপাক পর্যন্ত পৌঁছাইয়া পুনরায় নযুল করিয়া দুনিয়ায় আগমন করা যাহা কামালাতে বেলায়েত (বা বেলায়েতে নবুয়ত) ও কামালাতে নবুয়ত বলিয়া পরিচিত।
এখন তোমাদেরকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'- এই কলেমা তৈয়ব সম্পর্কে দু'একটি কথা বলিবার প্রয়োজন বলিয়া মনে করি। কলেমা তৈয়বের দুইটি অধ্যায়। (১) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, (২) মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। প্রথম অধ্যায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কামালাতে বেলায়েতের সহিত সংস্রব বিশিষ্ট এবং 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অর্থাৎ কলেমার দ্বিতীয় অংশ খালকের দাওয়াতের মাকাম কামালাতে নবুয়তের সহিত জড়িত।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে কামালাতে নবুয়ত দুই কলেমা তথা কলেমার দুই অধ্যায়ের সারাংশ। কারণ নবুয়তের উরুজ কলেমার প্রথম অংশের সহিত এবং নবুয়তের নযুল কলেমার দ্বিতীয় অংশের সহিত জড়িত।
বিজ্ঞাপন
কাজেই বুঝা যায়, কামালাতে নবুয়তের জন্য কামালাতে বেলায়েত তয় করা অত্যাবশ্যক।
আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি প্রাপ্ত পথপ্রদর্শক বা হাদী বা কামেল মোকাম্মেল পীরের যৎসামান্য পরিচয় নসিহতের এই অংশে তোমরা পাইলে। এখন তোমাদেরকে জাহেরা আলেম সমাজ যাহারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে জাহেরা শরীয়তের বিভিন্ন শাখার উপর অর্থাৎ কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, তাফসীর, কিয়াস, এজমা, কালামশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয় সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জনপূর্বক সাধারণ মানুষদের পথ প্রদর্শনের কাজে লিপ্ত থাকেন, তাহাদের সম্পর্কে দু'একটি কথা বলি। আলেম সমাজকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমার উদ্দেশ্য ওলীয়ে কামেলদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মর্যাদাকে জগতবাসীর সামনে তুলিয়া ধরা। ওলামায়ে কেরাম বা জাহেরা আলেম সমাজ নিজেদেরকে শরীয়তের ছুরতের আদেশ-নিষেধের সাজে সজ্জিত করেন এবং অন্যদেরকে জাহেরী শরীয়তের পোশাকে সজ্জিত হইতে আহবান করেন। তাহারা শরীয়তের বাহ্যিক সৌভাগ্য লাভ করেন। ইহা আল্লাহপাকের নেয়ামতসমূহের মধ্যে একটি নেয়ামত। নাফসের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তাহারা নিজেদেরকে শরীয়তের জাহেরী রং-এ রঙীন করেন। শুধু এতটুকু করিবার কারণেই আল্লাহপাক তাহাদেরকে মাফ করিয়া বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি দিবেন যদি খাতেমা বিল খায়ের হয় এবং সমাজে শরীয়তের জাহেরা অংশ প্রচার করিবার বিনিময়ও তাহারা পরকালে পাইবেন। কিন্তু ওলীয়ে কামেল সকল আল্লাহপাকের তরফ থেকে যে নেয়ামত প্রাপ্ত হন, সেই মহা নেয়ামতের নিকট ওলামাদের প্রাপ্ত নেয়ামত ধর্তব্যই নহে।
ওলীয়ে কামেল শরীয়তের ছুরত এবং শরীয়তের হকিকতের জ্ঞানে জ্ঞানী হইয়া আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শেষ্ঠ বান্দারূপে এবং রাসূলে পাক হন। তাহারাই নবীদের ওয়ারেস এবং তাহাদের উদ্দেশ্যেই রাসূলে (সাঃ) এর উম্মতের মধ্যে হাকিমল উম্মত হিসাবে জগতের বুকে চিহ্নিত পাক (সাঃ) বলেন,
বিজ্ঞাপন
عُلَمَاءُ أُمَّتِي كَأَنْبِيَاءِ بَنِي إِسْرَائِيلَ.
অর্থাৎ- আমার উম্মতদের আলেমগণ বনী ইসরাইলদিগের নবীদের ন্যায়।
কারণ ওলীয়ে কামেল কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়ত-এই দুই দফতরের ব্যাপক জ্ঞান আহরণপূর্বক দুনিয়ায় আসিয়া নবীদের অনুসরণেই দাওয়াত ও হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু জাহেরা আলেম সমাজ কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের কোন গন্ধই পান না। তবে শরীয়তের ছুরতের কিছু জ্ঞান তাহারা অর্জন করায় আংশিক ওয়ারেস বা উত্তরাধিকারের দাবিদার তাহারা হইতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
অবস্থা ভেদে নাফস পাঁচ প্রকারের। যথা-
নাফসে আম্মারা-
যাহা সর্বদাই খোদাতায়ালার বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত। ইহা দুনিয়ার প্রেমে আসক্ত। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা, বাসনা ইত্যাদি কুপ্রবৃত্তির মধ্যেই নাফসে আম্মারার কর্মসূচী নিহিত। ইহার বিচরণ ক্ষেত্র আলমে খাল্ক।
বিজ্ঞাপন
নাফসে লাওমা-
ইহা নাফসে আম্মারার চেয়ে স্বভাবে কিছুটা উন্নত। ইহা কখনও খোদাতায়ালার দিকে, আবার কখনও বা আম্মারার দিকে ঝুকিয়া পড়ে। কখনও ইহা পাপ-পংকিলতায় জড়াইয়া পড়ে আবার পরক্ষণেই অনুতপ্ত হইয়া আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে। ইহার বিচরণ ক্ষেত্র দায়েরায়ে আহাদিয়া বা দায়েরায়ে এমকানের শেষ পর্যন্ত।
নাফসে মোৎমাইন্না-
বিজ্ঞাপন
বেলায়েতের প্রথম ধাপ বেলায়েতের ছোগরা পর্যন্ত গমনকারী ছালেকের নাফসকে নাফসে মোৎমাইন্না বলে। এই নাফস তাহার কু-স্বভাব পুরাপুরি ত্যাগ করিয়া খোদাতায়ালার উপর রাজী হয়। খোদাতায়ালাও তাহার উপর রাজী থাকে। যাবতীয় অপবিত্রতা ও পাপ-পংকিলতা দূর করিয়া নাফস এই স্তরে পবিত্র হয়। এই নাফসের বিচরণ ক্ষেত্র দায়েরায়ে এমকান হইতে শুরু করিয়া আকরাবিয়াতের ঠিক পূর্ব পর্যন্ত বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতে।
নাফসে মোলহেমা-
ইহা নাফসের উন্নততর এক অবস্থা যাহা চিরস্থায়ী জগতে বিশেষ করিয়া কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় ছালেক প্রাপ্ত হয়। এই নাফসের উপর এলহাম হয়। অর্থাৎ এই নাফস আল্লাহর সহিত কথোপকথনের যোগ্যতা প্রাপ্ত হয়।
নাফসে মোহাদ্দেসা-
ইহা নাফসের সর্বোচ্চ অবস্থা। ইহা নবী (আঃ)দের নাফস।
ওলীয়ে কামেলগণের নাফস পবিত্রতা অর্জনের পর আরও ঊর্ধ্বে মোলহেমার স্তরে উন্নীত হয় এবং আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়। ওলীয়ে কামেলগণ তাই নিজেদেরকে আল্লাহর এলহাম অনুযায়ী পরিচালনা করেন। দেল ও দেহের পবিত্রতা প্রাপ্তির পর ওলীয়ে কামেল এলহাম দ্বারা পরিচালিত হন বিধায় তাহাদের যাবতীয় কর্মকান্ড এমনকি ইশারা ইংগিতও আল্লাহপাক নিজের বলিয়া হাদীসে কুদসীতে উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু জাহেরা আলেমগণ নাফসে আম্মারার দোষে দোষী থাকে। তথাপিও যদি খাতেমা বিল খায়ের হয়, আল্লাহপাক তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া দিবেন বলিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাহার মকতুবাদ শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন। ওলীয়ে কামেলদের কথা হকিকতে আল্লাহপাকেরই কথা। এই কারণে তাহাদের উপদেশের ক্রিয়া শ্রোতাদের অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত পৌঁছায় এবং যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। তাই ওলীয়ে কামেলদের কথার ইতিবাচক ক্রিয়ায় মুরীদান অঝর নয়নে কাঁদিয়া থাকেন। অপরদিকে জাহেরা শরীয়তে বিজ্ঞ আলেমের উপদেশের মর্মার্থ শ্রোতাদের আত্মার রাজ্যের গোপন প্রদেশ পর্যন্ত পৌঁছায় না কারণ তাহারা যা বলেন তাহার মধ্যে নূর থাকে না। তাহারা নাফসে আম্মারার প্লাটফর্মে থাকিয়া কথা বলেন। এই প্রসঙ্গে একটি দৃষ্টান্ত তোমাদের সামনে তুলিয়া ধরি।
আরেফে কামেল, হযরত গউস পাক আবদুল কাদের জিলানী (রঃ) ছাহেব কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের জ্ঞানে মহাজ্ঞানী ছিলেন। তাহার এক পুত্রের নাম আবদুল ওয়াহ্হাব (রঃ)। তিনি দেশে বিদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে জাহেরা শরীয়তের বিভিন্ন শাখার অগাধ জ্ঞান অর্জন করিয়া পিতার সন্নিধানে আসিলেন। একদিনের ঘটনা, হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব হাজার হাজার শ্রোতমন্ডলীর মজলিসে ওয়াজ করিবার উদ্দেশে মঞ্চ অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। সঙ্গে তাহার সেই বিজ্ঞ আলেম পুত্র হযরত আবদুল ওয়াহহাব। পুত্রকে সঙ্গে করিয়া হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব ওয়াজের মঞ্চে আরোহনপূর্বক উপবিষ্ট হইলেন। প্রথমে পিতার নির্দেশে বিজ্ঞ পুত্র শ্রোতাবৃন্দের উদ্দেশ্যে ধর্মের বিভিন্ন শাখার উপর জ্ঞানময় ও সারগর্ভপূর্ণ এক বক্তব্য রাখিলেন। কিন্তু এই মূল্যবান ওয়াজ শ্রোতৃমন্ডলীর হৃদয়ে কোন ক্রিয়া করিতেছে না দেখিয়া তিনি বিস্মিত হইয়া মিম্বর হইতে নামিয়া আসিলেন। অতঃপর হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব মিম্বরে আরোহনপূর্বক বলিতে শুরু করিলেন যে, 'গতকাল আমি রোজা রাখিয়াছিলাম। উম্মে ইয়াহিয়া একটি ডিম পাক করিয়া পাতিলসহ তাকের উপর রাখিয়া দিয়াছিল। একটি বিড়াল আসিয়া পাতিলটিকে নীচে ফেলিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিলে ডিমটি মাটিতে পড়িয়া ধুলাময়লা বিজড়িত হইয়া গেল।' হযরত গউসপাক (রঃ) ঘটনার এই পর্যন্ত বলিতেই সারা মজলিসে হা হুতাশ ও কান্নার রোল পড়িয়া গেল।
সভাশেষে হযরত গউস পাক (রঃ) তাহার পুত্রকে নিকটে আহবানপূর্বক বলিলেন, 'বৎস! বলিতে পার কি, তোমার এমন জ্ঞানগর্ভ ওয়াজ শ্রোতাদের দেলে কোন ক্রিয়া করিল না কেন? এবং আমার সাধারণ কয়েকটি কথা তাহাদের মনে এমন আলোড়ন সৃষ্টি করিল কেন? ইহার কারণ এই যে তুমি নাফসে আম্মারার প্লাটফর্ম হইতে কথা বল; নাফসে মোৎমাইন্না বা মোলহেমার জগতে প্রবেশ কর নাই। কিন্তু আমি যখন কথা বলি তখন আল্লাহতায়ালার তাজাল্লী প্রকাশিত হয়। কেননা আমি নাফসে মোলহেমার স্তর হইতে কথা বলি। তাই শ্রোতাদের হৃদয়সমুদ্রে আমার কথা এক অদ্ভুদ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এখানে উল্লেখ্য যে, উপরে বর্ণিত দৃষ্টান্তে ডিম ও বিড়াল যথাক্রমে মানব রূহ এবং নাফসে আম্মারার প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।
উল্লিখিত এই ঘটনার মধ্যে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শক বা ওলীয়ে কামেলদের হেদায়েত কর্মে নিহিত তাৎপর্য যে কত গভীর ও ব্যাপক এবং তাহা জাহেরা ওলামাদের হেদায়েত কর্মের চেয়ে যে কত পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন তাহা পরিষ্কারভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে।
বেলায়েতে উলিয়ার পাশাপাশি 'মোরাকাবায়ে শরহে ছদর' নামক এক বিশেষ দায়েরা বর্তমান। এই মোরাকাবায় কামেলের ছিনা এমনই প্রশস্ত হয় যে সৃষ্টির উপর পতিত সমুদয় ফয়েজান সে তাহার প্রশস্ত ছিনার ধারণ করিয়া এক অস্বাভাবিক সহ্য বা ধৈর্যগুণের অধিকারী হয়। ছিনা প্রশস্ত হওয়ার অর্থ কি? আসলে মানুষের এই ছিনায় বা বক্ষে আলমে আমরের পাঁচটি সুক্ষ্ণ লতিফা বিদ্যমান। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই লতিফাসমূহ সুপ্ত থাকে। ওলীয়ে কামেলের ছিনায় এই পাঁচটি জাগ্রত লতিফা যেন পঞ্চবর্ণের পাঁচটি নূরের সমুদ্র। মোরাকাবায়ে শরহে ছদরের দায়েরায় উল্লিখিত পঞ্চ বর্ণের পাঁচটি নূরের সমুদ্র একত্রিত হইয়া নূরের এক মহাসমুদ্র তৈরী করে। ইহাই মোরাকাবায়ে শরহে ছদর। আল্লাহপাক রাসূলে করীম (সাঃ)- এর ছিনার ব্যাপক প্রশস্ততা দান করিয়াছিলেন। ইহার ইঙ্গিত সূরা আলাম নাশরাহে রহিয়াছে। আল্লাহপাক বলেন,
أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ .
অর্থাৎ- আমি কি আপনার ছিনাকে প্রশস্ত 'করি নাই?
এই মোরাকাবায়ে শরহে ছদরে ছালেকের ছিনা এতই প্রশস্ত হয় যে সমস্ত পৃথিবী, পাহাড়-পর্বত তাহার উপর নিক্ষেপ করিলেও সে হাসিমুখে তাহা ধারণ করিতে পারে। পাহাড়সম বিপদ আপদ আসিলেও ছালেক তখন বিচলিত হন না। তাই একজন ওলী বলিয়াছেন, 'হে খোদা! আসমান ও জমিন দিয়া যাতাকল তৈরী করিয়া সেই যাতাকলে আমাকে যদি পিষিয়াও ফেলা হয়, তথাপিও আমি তোমাকে ছাড়িব না।' ইহাই শরহে ছদরের গুণাগুণ। দায়েরায়ে বেলায়েতে উলিয়ার ছায়েরে এসমোল বাতেনের ফয়েজে ছালেক শরহে ছদরের এই সমস্ত গুণাগুণ লাভকরে।
ওলীয়ে কামেলের এরকম বিচিত্র মর্তবা ও ক্ষমতা দর্শনে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বিস্মিত হইয়া বলিতে বাধ্য হইলেন, 'এলাহী! একি যাহা ওলীয়ে কামেলদের আপনি প্রদান করিলেন, যে ব্যক্তি তাহাদের চিনিল সে আপনাকে পাইল। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে পাইল না ততক্ষণ পর্যন্ত তাহাদেরকে চিনিল না।' (মকতুবাদ শরীফ, জেলাদে দুয়োম-২য় ভাগ, ৭৩ মকতুব)
কাজেই তোমরা যদি খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিল করিতে চাও, তাহা হইলে বর্তমান যামানার শ্রেষ্ঠ ওলী, কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের ভষণে ভূষিত, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কঃ ছেঃ আঃ) ছাহেবের নির্দেশিত তরিকা মত চল। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরে তিনি স্বীকৃতি প্রাপ্ত পথ প্রদর্শক বা হেদায়েতকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আসনে আসীন। তাহার হেদায়েতের বৃত্তে তামাম বিশ্ব বর্তমান। লতিফা কালব হইতে জাত আহদিয়াত, তথা বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা, তৎপর তাজাল্লীয়াতে জাতীর মহাসমুদ্রে বয়াসদৃশ্য মাকামসমূহ যেমন কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালাত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে ছালাত, মাবুদিয়াতে ছেরফা, হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী, হোব্বে ছেরফা (এই সকল মাকাম আল্লাহর কোর্বের সমুদ্রে, প্রেমের বা মহব্বতের সমুদ্রে স্থিতিশীল আছে) সমুদয় মাকাম তয় করিয়া যদি তোমরা খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন করিতে চাও তবে বর্তমান যামানার সর্বশ্রেষ্ঠ কামেল, উল্লিখিত মাকামসমূহ তয়কারী হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের সত্য রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধর এবং তাহার উপদেশ মোতাবেক যে সমস্ত শিক্ষা দেওয়া হইতেছে, সেই শিক্ষা মোতাবেক চলিতে চেষ্টা কর।
নাফস তোমাদের প্রধান শত্রু। নাফসকে যদি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনিতে না পার তাহা হইলে খোদাতায়ালার কোর্বে তোমরা পৌঁছাইতে পারিবে না। নাফসকে পরাভূত করিবার জন্য পীরে কামেল মুরীদকে তিনটি মূল নীতি শিক্ষা দেন। কম খাওয়া, কম ঘুমানো ও কম কথা বলা। আমার পীর কেবলাজান আমাকে বলিয়াছেন, 'আট দিন করিয়া উপবাস থাকিবে। তোমাকে দেখিয়া লোকে মুচকি হাসিবে। কাহাকেও কিছু বলিতে পারিবে না। কাহারও নিকট হাত পাতিতে পারিবে না।' আমি তাহাই করিতাম।
হে জাকেরান সকল! তোমরা কেউ বা বিশ বছর, কেউবা পঁচিশ বছর ধরিয়া খেদমত করিতেছ। তোমাদের দেলে কম বেশী পীরের মহব্বত দেখা যায়। কিন্তু কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্য, হিংসা, কিনা ইত্যাদি কুরিপুগুলিকে জয় করিতে পার নাই। সহসাই তোমরা রাগিয়া যাও। অন্যের উপর সর্দারী করিতে তোমরা ব্যস্ত। অথচ তোমাদের নাফস তোমাদের উপর সর্দারী করিতেছে, সেদিকে লক্ষ্য নাই। তোমরা অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হও না। কিন্তু আমাদের নবী (সাঃ) আজীবন অন্যের ব্যথায় ব্যথিত ছিলেন। আবু জেহেলের মত পাপিষ্ঠ, যে সারা জীবন রাসূলে করীম (সাঃ) কে হত্যার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিল, তাহার অসুস্থ্যতায় দয়াল নবী (সাঃ) এমনি ক্রন্দন করিয়াছিলেন যে মহান খোদাতায়ালা পর্যন্ত নবী পাক (সাঃ) কে বলিলেন, "হে নবী। আপনি কি আবু জেহেলের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করিয়া দিবেন?""
কাজেই তোমরা যদি রাসূলে পাক (সাঃ) এর চরিত্রের রং ধারণ করিতে চাও, তবে রাসূলের চরিত্রে চরিত্রবান খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কঃ) ছাহেব প্রদত্ত প্রশিক্ষণ অনুযায়ী চল। তোমরা আনা-ফানার মোকাম তয় করিবার জন্য দিবানিশি চেষ্টা করিতে থাক। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেদাহীর বলে তোমরা কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের সাজে নিজেদেরকে সজ্জিত করিয়া জগতবাসীদের হেদায়েতের জন্য প্রস্তুত হও। আল্লাহপাক তোমাদের কামিয়াবী বখশিস করুন।
আমার পীর কেবলাজান মস্তবড় আকাবের ওলী ছিলেন। জগতের মানুষ তাহাকে চিনিতে পারে নাই। ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে আমাকে তিনি বলিলেন, 'বাবা, এমন একজন ওলী পৃথিবীতে আসিলেন, কেহই তাহাকে বুঝিল না, চিনিল না। আর মাত্র কয়েকদিন। তারপর সকলের চোখে ধূলা দিয়া তিনি চলিয়া যাইবেন।' এর কয়েকদিন পরেই তিনি আমাদেরকে দুঃখের সাগরে ভাসাইয়া দারুল বাকায় তশরিফ নিলেন। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে সেই আকাবের ওলীর ফয়েজের ঢেউ খেলিতেছে। তাহার সত্য রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধরিয়া তোমরা দুর্গম পথ চলিতে থাক। আল্লাহ তোমাদের কবুল করুন। আমীন!








