কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়ত হাছিলকারী ওলীর বৈশিষ্ট্য

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কামালাতে বেলায়েত হাছিলকারী ওলী এবং কামালাতে নবুয়ত হাছিলকারী ওলী-এ দুই প্রকার ওলী-আল্লাহর হাল, বৈশিষ্ট্য, আত্মিক অবস্থা ও কর্মপদ্ধতির পার্থক্য নিরুপণঃ
বিজ্ঞাপন
কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়ত খোদাতত্ত্বজ্ঞান সাধনা বা চর্চায় দুইটি উল্লেখযোগ্য মাকাম বা ষ্টেশন। কামালাতে বেলায়েত ওলীগণের বেলায়েত বা সংগী হইবার স্বীকৃতি লাভ। ওলী অর্থ সংগী। সংগী নিকটস্থ হইতে পারে, আবার সংগী দূরেও থাকিতে পারেন। চিঠি পত্র বা টেলিফোনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে পরিচয় থাকে; কুশল বিনিময় হয়। একজন অন্য জনের সংবাদও রাখিতে পারেন। বেলায়েত প্রাপ্ত ওলীগণ আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ করেন, কখনও কখনও তাহারা এলহামও লাভ করেন। কুরআন মজীদে উল্লেখ আছে,
وَ هُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ
অর্থাৎ- তিনি তোমার সংগে আছেন, তুমি যেখানেই থাক না কেন।
বিজ্ঞাপন
পক্ষান্তরে কামালাতে নবুয়ত হইল নবী (আঃ) গণের প্রতিনিধিত্বের মাকাম। আল্লাহতায়ালা মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন, তিনি পৃথিবীতে তাহার প্রতিনিধি প্রেরণ করিবেন- "ইন্নি জায়েলুন ফিল আরদে খালিফা"। মানুষকে আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েত করিবার জন্য পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা নবী (আঃ) গণকে প্রেরণ করিয়াছেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) খাতেমুন্নবী বিধায়, নবুয়তের যুগ শেষ হইয়াছে। মানুষ সৃষ্টির সময়ে যেমন আল্লাহতায়ালা বলিয়াছেন, তিনি পৃথিবীতে তাহার খলিফা প্রেরণ করিবেন; তেমনি একথাও বলিয়াছেন যে, তিনি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলেন, নিজেকে প্রকাশ করিতে চাহিলেন, তাই সৃষ্টি জগতকে সৃজন করিলেন। আল্লাহতায়ালা আপনাকে প্রকাশ করিবার জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। নবী (আঃ) গণের যুগ শেষ হইয়া গেলেও সৃষ্টি রহিয়াছে; তাই তাহার প্রকাশিত ও পরিচিত হইবার অবকাশ ও প্রয়োজন রহিয়াছে।
আল্লাহতায়ালা তাহার পরিচিতি গ্রহণ বা প্রকাশিত হইবার কামালাত কেবল মাত্র মানুষকে দান করিয়াছেন। যেমন আল্লাহতায়ালা কুরআন মজীদে বলেন, "আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত কেহই আল্লাহতায়ালার আমানত ভার গ্রহণ করিল না, গ্রহণ করিল কেবল মানুষ।" আল্লাহতায়ালার নিকট মানুষই আলমে আরওয়ায় প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছে যে, আল্লাহতায়ালাকেই প্রভু হিসেবে স্বীকার করিবে, অন্য কাহাকেও নহে। আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করিবার জন্য তাহার পরিচয় গ্রহণ প্রয়োজন-যা মানুষের জন্য ফরজ। কিন্তু আলমে আমর হইতে আলমে খালকে আসিয়া মানুষ সৃষ্টি জগতের নেশায় ও আকর্ষণে তাহার প্রভুর কথা ভুলিয়া যায়। তাই মানুষকে আল্লাহতায়ালার পরিচয়ের পথে তাহার প্রতিশ্রুতি পালন করিবার কথা স্মরণ করাইয়া দিবার জন্য ও যে পথে আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ সম্ভব, সেই পথ বাতলাইবার জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে প্রতিনিধির প্রয়োজন। যাহারা আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ করেন-তাহারা হইলেন "ওলী"; তাহারা কামালাতে বেলায়েত লাভ করেন। আর যাহারা আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ করিবার পর অন্যকেও আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ করিবার পথ বাতলাইয়া দিতে পারেন ও খোদাতত্ত্বজ্ঞান লাভের যোগ্যতা দান করিবার জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে প্রতিনিধি নিযুক্ত হন; তাহারা কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত হন। ওলীগণ পরিচয় লাভকারী আর কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত হেদায়েতকারীগণ প্রতিনিধিত্বলাভকারী। আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে নবী (আঃ) গণকে তিনি প্রেরণ করিতেন। নবুয়তের যুগ শেষ হইয়াছে বলিয়া নবীর প্রতিনিধিত্বকারীর প্রয়োজন যেমন শেষ হয় নাই, তেমনি রাসূলে করীম (সাঃ) এর পর নবুয়তের কামালাত বা আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্ব করিবার যোগ্যতা আর কাহারও মধ্যে থাকিবে না-এই রূপ মনে করিবারও কারণ নাই। আল্লাহতায়ালার পরিচিতি প্রদান ও গ্রহণ করিবার অবকাশ যখন রহিয়াছে, তখন আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতকারীগণেরও প্রয়োজন আছে। তাই আল্লাহতায়ালা তাহাদের উপস্থিতিও বর্তমান রাখিয়াছেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার পূর্ণ জ্ঞান লাভকরিয়াছিলেন। তিনি তদীয় হাদীস শরীফে উল্লেখ করিয়াছেনঃ আল্লাহতায়ালা তাহাকে যে জ্ঞান দান করিয়াছিলেন, তাহা তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এর কালবে রাখিয়াছেন। আবার হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, তাহার পরে যদি কেহ নবী হইতেন, তিনি হইতেন হযরত উমর (রাঃ)। অর্থাৎ হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর মধ্যে নবুয়তের যোগ্যতা ছিল। কামালাতে নবুয়ত বা আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে হেদায়েতকারী হইবার যোগ্যতা প্রাপ্তগণ পূর্ব কালের নবীগণের মত ওহী বা কিতাব লাভ করেন না সত্য; কিন্তু আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্ব করিবার নিদর্শনসমূহ তাহাদের মধ্যে থাকে। এই সকল ওলীগণ নাফসে মোহাদ্দেসার গুণ লাভ করেন, অর্থাৎ তাহারা আল্লাহতায়ালার সহিত কথা বলিতে পারেন। তাহাদের নাফস বা সত্ত্বার সহিত আল্লাহতায়ালার এমনি একটি সংযোগ আল্লাহতায়ালারই তরফ হইতে তাঁহারা লাভ করেন।
পক্ষান্তরে আল্লাহতায়ালার যে পরিচয় ওলীগণ লাভ করেন তাহা হইল সিফাতে এজাফিয়ার পর্যায়ে বা আল্লাহতায়ালার নূরের যে প্রতিবিম্ব কালবের আয়নায় পড়ে সেই প্রতিবিম্বের মাধ্যমে। প্রতিবিম্বকে আরবীতে বলা হয় "জেল্লী”। এই পরিচয় লাভের মাকামকে তাই জেল্লীর মাকাম বলা হয়। তবে সূফীতত্ত্বের তাছাউফ বিজ্ঞানের পরিভাষায় ইহাকে বলা হয় বেলায়েতে ছোগরা বা ছোট বেলায়েত।
বিজ্ঞাপন
কালবে আল্লাহতায়ালার নূরের প্রতিবিম্ব আসিয়া পড়ে। এই প্রতিবিম্বিত নূর যে আল্লাহতায়ালার পরিচয় দেয় না তাহা বলা যায় না। আয়নায় কোনো ব্যক্তির প্রতিবিম্ব বা ছবি দেখিয়া তাহার সম্পর্কে ধারণা করা যায়। কিন্তু ব্যক্তিকে সরাসরি দেখিবার বা তাহার দীদার লাভ করিবার জ্ঞান ও তাহার প্রতিনিধিত্ব লাভ করিবার মর্যাদা ও যোগ্যতা আরও অনেক বড়; তাহাতে সন্দেহ নাই।
এই প্রসংগে আরও একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "মোমেনের কালব আল্লাহতায়ালার আরশ।" তিনি আরও বলেন, "মানুষের শরীরে এক টুকরা মাংস পিন্ড রহিয়াছে, যাহা পাক পবিত্র হইলে সমস্ত ওজুদ পবিত্র হইয়া যায়।"
বিজ্ঞাপন
"মোমেনের কালব আল্লাহতায়ালার আরশ"-এই হাদীসের তাৎপর্য হইল কালবের পাক ছাফ হওয়ার অবস্থা। আর দ্বিতীয় যে হাদীস তাহার তাৎপর্য হইল সমস্ত দেহ ও সত্ত্বার পবিত্রতা। কামালাতে বেলায়েত প্রাপ্ত ওলীগণের কালব পাক ছাফ হয়, তাহাতে আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূর আসিয়া পড়ে। কিন্তু এই নূরের প্রতিবিম্ব
আল্লাহতায়ালার সামগ্রিক পরিচয় দিতে পারে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বের যুগের সূফীগণ লতিফায়ে নাফসের সংশোধন করিবার সাধনা করিয়া কালবে যাইয়া তাহারা তাহাদের সাধনা শেষ করিতেন। ইহাতে লতিফায়ে নাফসসহ আব, আতশ, খাক, বাদ এবং কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফা-এই দশ লতিফা সংশোধিত হইত। কিন্তু নাফসের মূল যে লতিফায়ে কালেব অর্থাৎ আগুন, পানি, মাটি, বাতাস বা আব, আতস, খাক, বাদ-এর যে সম্মিলিত মিশ্রণ ও সেই মিশ্রণের যে স্বভাব মানুষের দেহের রন্ধ্রে রন্ধে আছে, সেই স্বভাবের সংশোধনের কোনো প্রক্রিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) এর যুগের পূর্বের সূফীগণ বাতলাইয়া যান নাই। পূর্বতন যুগের সূফীগণ লতিফায়ে নাফসের সংশোধন করিয়া "নাফস"কে আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী করাইয়াছেন, ইহাতে বোঝা যায় যে, নাফস দুনিয়ামুখী হইতে আল্লাহমুখী হইয়াছে। কিন্তু দেহের নিজস্ব যে কুস্বভাব যাহাকে তরিকতের পরিভাষায় লতিফায়ে কালেব বলা হয়, সেই লতিফার স্বভাবের পরিবর্তনের কোনো ব্যবস্থা পূর্বতন সূফীগণ দেন নাই। তাই কামালাতে বেলায়েত প্রাপ্ত ওলীগণ যদিও দুনিয়াবী আকাংখা হইতে মুক্ত হন; কিন্তু তাহাদের দেহগত আকাংখা পরিপূর্ণরূপে নির্মূল হয় না। তাই কামালাতে বেলায়েত প্রাপ্ত ওলীগণকে 'দেহসত্ত্বাগত গোনাহ হইতে মুক্ত' বলা যায় না।
কিন্তু কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত ওলীগণের অবস্থা ভিন্ন। বেলায়েতে ছোগরা হইতে কামালাতে নবুয়তের স্তরে উন্নীত হইতে বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া, মোরাকাবায়ে শরহে ছদরের মাকাম পার হইয়া কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম-এর পর্যায়ে যাইতে হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত পার হইয়া আমার জাতের সহিত মিলিত হও। সেখানে তোমার সহিত আমার প্রেমের মিলন হইবে। বেলায়েতে ছোগরা স্তরের ওলীগণ সিফাতি নূরের প্রতিবিম্ব বা সিফাতে এজাফিয়া স্তরে আল্লাহতায়ালার পরিচয় লাভ করেন। ইহাতে তাহাদের মধ্যে আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান ও এতেবারের নূরের প্রতিবিম্ব আসিয়া পড়ে। ফলতঃ তাহারা তাহাদের কালবের আয়নায় বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া, কামালাতে নবুয়ত, হকিকতে এলাহিয়ার দফতর সমূহ, হকিকতে আম্বিয়ার দফতর সমূহ সহ মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফা পর্যন্ত সকল মাকামের নূরেরই জেল্লী দেখিতে পান।
বিজ্ঞাপন
সেই নূরের প্রতিবিম্বের গুণও তাহাদের মধ্যে দেখা যায় সত্য, কিন্তু প্রকৃত নূর আর নূরের প্রতিবিম্ব এক নয়-তাই তাহাদের দেহসত্ত্বার স্থায়ী পরিবর্তন লাভ হয় না। স্থায়ী পরিবর্তন লাভ হয় কেবল সেই সকল সাধকবর্গের যে সকল সাধকবর্গকে আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া তাহার জাতের জগতে উন্নীত করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার জাতি নূর দ্বারাই মানবের দেহ সত্ত্বার স্থায়ী পরিবর্তন আসে। নাফসের সহিত কালেবের যে সম্পর্ক তাহা গাছের কান্ড ও মূলের মত। দেহের মূল যে রস গ্রহণ করে তাহা গ্রহণ না করিয়া কান্ডের উপায় থাকে না। দেহ সত্ত্বার পরিপূর্ণ পরিবর্তন ও সংশোধন না হইলে নাফসও তাহার দাস থাকিয়া যায়। তাই দেহগত পবিত্রতা লাভ করা আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণের অন্যতম শর্ত। এই দেহগত পবিত্রতা পুরাপুরি লাভ হয় কামালাতে নবুয়তের স্তরে দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা-যাহা আল্লাহতায়ালার জাত পাক হইতে আসিয়া থাকে। এই রূপ পবিত্রদেহ সত্ত্বা বা নাফসই নাফসে মোহাদ্দেসা-যাহা আল্লাহতায়ালার দীদার লাভের যোগ্য। আল্লাহতায়ালা ঐ রূপ দেহ সত্ত্বার অধিকারীর সহিতই দয়া করিয়া কালাম (কথা) বিনিময় করিয়া থাকেন।
কামালাতে বেলায়েত লাভকারী ওলীগণের ক্ষেত্রে, 'মোমেনের কালব আল্লাহতায়ালার আরশ' এই হাদীসের যে তাৎপর্য তাহা অনেকটা নিম্নরূপে ব্যাখ্যা করা যায়। আলমে মেছালের আয়নায় তাহারা আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, ইত্যাদির জেল্লী আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে দয়া প্রাপ্ত হইলে দেখিতে পারেন, কিন্তু তাহারা নিজ ইচ্ছায় তাহা দেখিতে পারেন না। আল্লাহতায়ালার আরশের উপর নূরের তাজাল্লী তাহারা দেখিতে পারেন, তবে আল্লাহতায়ালার সকল প্রকার নূরের তাজাল্লীও যে দেখিতে পারেন, তাহাও নহে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, ওলীগণের কালবে আল্লাহতায়ালার আরশ হইতে আল্লাহতায়ালার দয়ায় নূর নিক্ষিপ্ত হয়; কিন্তু আরশ মজীদের সকল নূর কালব ধারণ করিতে পারে না।
উপরে যে কালবের কথা বলা হইয়াছে, তাহার সহিত 'যে মাংস খন্ড পবিত্র হইলে সমস্ত দেহ পবিত্র হয়' তাহার পার্থক্য সম্পর্কে আরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ওলীগণের কালব আরশ হইতে নূর লাভ করে। এই কালবের আর একটি নাম "হকিকতে জামেয়া"। আর মানুষের দেহের যে গোস্ত খন্ড পবিত্র হইলে সমস্ত দেহ পবিত্র হয় সেই গোস্ত খন্ডকে বলা হয় মোদ্গা-এই মোদ্গা নবী (আঃ) গণের কালব।
বিজ্ঞাপন
কালব বা হকিকতে জামেয়া সম্পর্কে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, সমস্ত সৃষ্টি জগতে যত কিছু আছে তাহার হকিকত দিয়া মানুষের কালব সৃষ্টি। সমষ্টিগতভাবে এই কালব যে মাংসপিন্ড, সেই মাংস পিন্ডেও মানবদেহের সকল স্থানের মাংসের বৈশিষ্ট্যও রহিয়াছে। আবার আলমে খালক বা সৃষ্টি জগত হইতে আল্লাহতায়ালার জাত পর্যন্ত যে ২৭/২৮ টি মাকাম বা স্তর রহিয়াছে; তাহার প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য এই কালব বুঝিতে সক্ষম; কারণ সমগ্র সৃষ্টি জগতের বৈশিষ্ট্য ইহাতে রহিয়াছে। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বকালের সূফীগণ বলিয়াছেন যে, কালবের প্রশস্ততা এত বেশী যে তাহাতে আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, দোযখ, বেহেশত তথা সাত তবক আসমান হইতে সাত তবক জমিনের নীচে তাহাতাছ ছারাহ পর্যন্ত ধরিয়া যায়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিয়াছেন, ঐ উক্তি পূর্ব কালের ওলীগণের (আল্লাহতায়ালার প্রেমে নেশাগ্রস্ত অবস্থায়) কথিত উক্তি। বস্তুতঃ তাহারা কালবের আয়নায় আলমে মেছাল হইতে আগত সমগ্র সৃষ্টি জগতের জেল্লী দেখিতে পান। আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লীতে কালব প্রশস্ত হয় ইহা সত্য; কিন্তু তাহার অর্থ এই নয় যে আল্লাহতায়ালার সমস্ত নূর কালবে প্রকাশিত হয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন যে, আরেফের কালব যখন নিজের ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছায়; তখন সেই কালবের উপর আল্লাহতায়ালার আরশের উপর হইতে কোনো একটি নূর আসিয়া পড়ে। আরশের সমষ্টিগত নূরের তুলনায় ইহা কিছুই নহে। আরেফের কালবে যে নূর পতিত হয় তাহা সিফাতি নূরের প্রতিবিম্ব বা সিফাতে এজাফিয়ার নূর। আল্লাহতায়ালার নূর পতনের স্থান আরশ; আর আরশের নূর পতনের স্থান মানব দেহের কালব। তাই কালব যেহেতু আরশের মত নূর পতনের স্থান, সেই হেতু এই কালবকে আরশুল্লাহ বলা হয়। মানুষকে বলা হয় "আলমে সগীর"। কারণ সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর হকিকত মানব দেহে রহিয়াছে। আবার স্থূল জগত ও সূক্ষ্ম জগত-এই উভয় জগতের নিদর্শনও মানুষের মধ্যে রহিয়াছে। আর বিস্তৃত সৃষ্টি জগত তথা সমগ্র সৃষ্টি জগত অর্থাৎ স্থূল জগত ও সূক্ষ্ম জগত লইয়া আলমে কবির গঠিত। আলমে কবিরের স্কুল ও সূক্ষ্ম জগতের মধ্যস্থলে আরশ মজীদ নিরূপিত। আবার মানবদেহের স্থূল জগত ও সূক্ষ্ম জগতের মধ্যখানে রহিয়াছে কালব অর্থাৎ কালব মানুষের জন্য "আরশ"। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানুষের কালবকে আরশুল্লাহ বলা হয়।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর মতানুযায়ী মানুষের কালব ছোট আরশ বা আলমে সগীরে অবস্থিত আল্লাহতায়ালার আরশ। আর আরশ মজীদ হইল আল্লাহতায়ালার বড় আরশ। বড় আরশ হইতে বা মহাকালব হইতে আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লী ঐ ছোট আরশে প্রতিবিম্বিত হয়।
পক্ষান্তরে নবী (আঃ) গণের কালব যাহা মোদ্গা নামে নামীয় তাহাতে যে নূর আসিয়া পড়ে তাহা প্রতিবিম্বের নূর নহে। উহা আল্লাহতায়ালার জাতী ও সিফাতি নূর। উহা সরাসরি আল্লাহতায়ালার সিফাতে হাকীকী ও জাত হইতে পতিত হয়। প্রতিবিম্ব ও আসলের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকিয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
কামালাতে নবুয়তের স্তরে ওলীগণ নবী (আঃ) গণের মতই হাকীকী সিফাতের নূর ও আল্লাহতায়ালার জাতি নূর সরাসরি আল্লাহতায়ালা হইতে লাভ করেন। তাই কামালাতে নবুয়তের স্তরে উন্নীত না হইলে প্রতিবিম্ব ও জেল্লিয়াতের যে সকল ত্রুটি থাকে; সেই সকল ত্রুটি মুক্ত মারেফাত লাভ করা যায় না। যাহারা কামালাতে বেলায়েতের স্তরে উন্নীত হইয়াছেন এবং যাহারা কামালাতে নবুয়তের স্তরে উন্নীত হইয়াছেন, তাহাদের মধ্যে যে সকল পার্থক্য তাহার অন্যতম হইল কামালাতে বেলায়েতের সাধকগণ কখনও কখনও এমন উক্তি করেন যাহা শরীয়তের সহিত সংগতিপূর্ণ নয় বা শরীয়তের খেলাফ। যেমন হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) বলিয়াছেন, "আনাল হক"। কোনো কোনো সাধক বলিয়াছেন, "আনা সোবহানী"। কোনো কোনো সাধক বলিয়াছেন, "আমার জোব্বার ভিতরে খোদা ছাড়া আর কিছুই নাই।" কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত ওলীগণ কখনই এই রূপ ভাবের ঘোরে অতিশয় উক্তি করেন না। তাহারা খুব নিখুঁত ও দৃঢ়ভাবে জানেন যে শরীয়ত হইতে এক চুলও খেলাফ করা যায় না। বরং তাহারা নিখুঁত ভাবে শরীয়ত পালন করেন। বরং বলা যায় যে, আল্লাহতায়ালা তাহাদের সর্ব প্রকার গোনাহ, স্খলন, পতন ও ত্রুটি হইতে পাক রাখেন। আল্লাহতায়ালার সহিত ঐ স্তরের ওলীগণের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, "আমি তাহাদের জান রগ হইতেও নিকটে।" কামালাতে বেলায়েত প্রাপ্ত ওলীগণ আল্লাহতায়ালার সিফাতে হাকীকী বা চিরস্থায়ী নূরের জগতে পৌঁছান না; তাহাদের কালবে হাকীকী বা চিরস্থায়ী জগত হইতে নূর নিক্ষিপ্ত হয়। কালবও আরশ পর্যন্ত উত্থিত হয় না-আরশও কালব পর্যন্ত নামিয়া আসে না। চিরস্থায়ী জগতের অবস্থা অস্থায়ী জগতে আসিতে পারে না। উহাতে চিরস্থায়ী জগতের বৈশিষ্ট্য নষ্ট হইয়া যায়।
এখন প্রশ্ন থাকিতে পারে, কালব যদি আরশে উত্থিত না হয়, তাহা হইলে কামালাতে নবুয়ত প্রাপ্ত সাধকগণ কি ভাবে আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত ও জাতি নূর লাভ করেন?
এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়ঃ-আল্লাহতায়ালা মানুষের সম্পর্কে বলিয়াছেন,
বিজ্ঞাপন
خُلَقْتُمْ لِلأَبَدِ
অর্থাৎ- তোমরা চির দিনের জন্য সৃষ্টি হইয়াছ।
কিন্তু এই চিরস্থায়ী শান্তিময় জগতে সকলে প্রবেশ করিতে পারে না। আল্লাহ বলেন, সকলকেই মৃত্যুর পেয়ালা পান করিতে হইবে। আবার শরীয়তে বলা আছে,
বিজ্ঞাপন
مُوتُوا قَبْلَ أَنْ تَمُوْتُوا -
অর্থাৎ- মৃত্যুর পূর্বেই মরিয়া যাও।
জীবিতাবস্থায়ই নাফসে আম্মারার মৃত্যু অর্থাৎ মানুষের উপর নাফস ও কালেবের প্রভুত্বের অবসান। যে সকল খোদাতালাশী ব্যক্তি বেলায়েতের দায়েরায় থাকিয়া নিজের দেহগত আকাংখা তথা নাফসে আম্মারার হাত হইতে মুক্তি লাভ করেন, তাহাদের মধ্যে হইতে কাহাকে কাহাকেও আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া তাহার আপন পরিচিতি দানের জন্য নির্বাচিত করিয়া লন। যে সকল খোদাতালাশী ব্যক্তির নাফসে আম্মারার মৃত্যু হইয়াছে; তাহারা নাফসে আম্মারার মৃত্যুকে আপন কালবী চোখে দেখিয়া থাকেন। কোনো কোনো খোদাতালাশী ব্যক্তি দেখিয়া থাকেন নিজ মৃত দেহের লাশ। কেহ দেখিয়া থাকেন নিজ মৃত দেহের জানাজা পড়িতেছেন। কেহ বা নিজ নাফসকে জন্তুর ন্যায় দেখিতেন। নাফসে আম্মারার মৃত্যুকে ঐ জন্তুর মৃত্যু মুখে পতিত হওয়ার ঘটনা হিসেবে তাহারা মোরাকাবার সময় দেখিতে পান। এই রূপে যে সকল খোদাতালাশী ব্যক্তির নাফসে আম্মারার অবসান হয়, তাহাদের মধ্যে যাহাদের আল্লাহ দয়া করিয়া আপন পরিচয় দান করিবার জন্য নির্বাচিত করিয়া লন, তাহারাই কেবল আল্লাহতায়ালার যথার্থ পরিচয় লাভ করেন।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা বলেন, "যে পর্যন্ত মানুষ নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা না করে, তিনি তাহাদের সাহায্য করেন না"। আবার আল্লাহতায়ালা বলিতেছেন, "তিনি যাহাকে খুশী হেদায়েত করেন, ইহা তাহার ফজল বা দয়া"। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য তাহা বেলায়েতে ছোগরা বা কামালাতে বেলায়েত লাভ করা ও হাকীকী জগতে উন্নীত হওয়া তথা কামালাতে নবুয়ত লাভ করার সংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহতায়ালার উক্তি। কামালাতে বেলায়েত লাভ করা মানুষের চেষ্টা ও সাধনা দ্বারা সম্ভব। খোদাতত্ত্ব সাধকদের অধীনে ও তত্ত্বাবধানে সাধনা করিয়া খোদাতালাশী ব্যক্তিবর্গ খোদাতায়ালার পরিচয় লাভ করিতে পারেন। এই পরিচয় লাভ হয় কলেমা শরীফের বা নাফী এজবাত জেকেরের মাধ্যমে। পীরে কামেল ছালেকের দশ লতিফায় নাফী এজবাত জেকের সংযোজন করিয়া দিলে খোদাতালাশী ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া সমস্ত কিছুর প্রভুত্ব অস্বীকার করিবার জন্য কলেমা শরীফের জেকের করিয়া থাকেন। ইহার ফলে ছালেকের মন ক্রমে আল্লাহমুখী হয় এবং আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী হইয়া যায়।
আপন দেহগত স্বভাব পরিবর্তন অর্থাৎ নাফসে আম্মারার সংশোধন সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "চলিয়া যাওয়া জিনিষ যেমন ফেরত আসে না; তেমনি যাহাদের নাফসে আম্মারার মৃত্যু হইয়া যায়, তাহাদের দেহগত সত্ত্বার যে দেহগত আকাংখা তাহা হইতে তাহারা আল্লাহতায়ালার ফজলে ও দয়ায় মুক্তি লাভ করেন। ইহার পর আল্লাহতায়ালা তাহাদের আপন পরিচয় দান করিবার জন্য আকরাবিয়াত বা বেলায়েতে কোবরার জগতে উন্নীত করেন। এই স্তরের পর হইতেই সাধক যাহা কিছু করেন, তাহা আল্লাহতায়ালার দ্বারাই করেন। এই স্তরে না আসা পর্যন্ত ছালেক হকিকত জগত বা আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত ও জাতি নূরের পরিচয় লাভ করিতে পারে না। সাধারণ মানুষ বা শুধু বেলায়েত লাভকারী ওলীগণের কালব যেহেতু আল্লাহতায়ালার হাকীকী নূর লাভ হইতে বঞ্চিত থাকে তাই সাধারণ মানুষের কালব বা কামালাতে বেলায়েত লাভকারী ওলীগণের কালব চিরস্থায়ীত্ব লাভ করে না। তাহাদের কালব সৃষ্টি জগতের মত অস্থায়ী রহিয়া যায়।
সাধারণ ওলীগণ যখন স্কুল জগত হইতে সূক্ষ্ম জগতের দিকে দৃষ্টিপাত বা মনোবিবেশ করেন, তখন তাহারা উর্ধ্বালোক হইতে আগত আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লী কালবের আয়নায় দেখিয়া থাকেন। আয়নার উপরে পড়া সূর্য রশ্মি যেমন চোখ ধাঁধাইয়া দেয়, তেমনি কালবের আয়নায় আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লী দেখিয়াও সাধকগণ নেশাগ্রস্ত হইয়া যান। তখনই তাহারা জ্ঞান হারা হইয়া শরীয়ত খেলাপী উক্তি করেন। এই রূপ ওলীগণও বা কামালাতে বেলায়েত প্রাপ্ত ওলীগণও আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে এলহাম লাভ করেন; তবে সে ক্ষেত্রে তাহারা যে এলহাম লাভ করেন, তাহা শরীয়তের প্রকাশ্য বিধানের সহিত সংগতিপূর্ণ কিনা তাহা বিশ্লেষণ করিয়া লইতে হয়। কারণ ঐ বেলায়েতে ছোগরা মাকামের ওলীগণের দেহসত্ত্বা পবিত্র থাকে না। তাই শয়তান তাহাদের মিথ্যা ধোকায় ফেলিবার চেষ্টা করিয়া থাকে।
যাহা হউক, খোদাতালাশী ব্যক্তির নাফসে আম্মারার মৃত্যু হইলে, আল্লাহপাক তাহাকে দয়া করিয়া আপন পরিচয় দানের পাত্র হিসেবে যখন গ্রহণ করেন, তখন আল্লাহতায়ালা তাহাকে ভালবাসিতে শুরু করেন। আর আল্লাহতায়ালা যখন কাহাকেও ভালবাসেন, তখন তিনি তাহাকে গোনাহ হইতে হেফাজত করেন। ক্রমে ক্রমে আল্লাহতায়ালা তাহাকে শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী করিয়া দেন, তাহার দেহগত সত্ত্বায় আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের নূর আসিয়া পড়ার কারণে দেহসত্ত্বা পবিত্রতা লাভ করে। তখন দেহসত্ত্বাও পরিপূর্ণভাবে আল্লাহতায়ালার প্রেমে মাতোয়ারা হয়, শরীয়তের সকল বিধান তখন দেহসত্ত্বা মানিয়া চলিতে অনুপ্রাণিত হয়। কিন্তু যতক্ষণ নাফসে আম্মারা বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ তাহাদের লতিফায়ে কালেবের সহিত জেহাদে আকবরে লিপ্ত থাকিতে হয়। সাধারণ ওলী বা সাধারণ মানুষের দেহগত সত্ত্বা ও বেলায়েতে কোবরা ও তঊর্ধ্ব কামালাতে নবুয়তের স্তরে উন্নীত সাধকগণের দেহগত সত্ত্বার মধ্যে পার্থক্য এই যে, সাধারণ ওলীগণের দেহগত পবিত্রতা পূর্ণভাবে অর্জিত হয় না। তাহারা কালবে পতিত নূরের জেল্লিয়াতের নেশায় অনেক সময় শরীয়তের খেলাফী উক্তি করেন-শরীয়তের বাহ্যিক বিধানও পরিপূর্ণ অনুসরণ করেন না। কিন্তু কামালাতে নবুয়তের স্তরে উন্নীত সাধকগণ ঐ সকল অবস্থা হইতে পাক। বেলায়েতে কোবরাস্থিত সকল মাকামে আল্লাহতায়ালার নূর আসিয়া পতিত হয় নাফসের উপর। ইহাতে নাফস যেমন পরিবর্তিত হইয়া যায়, তেমনি কালব সহ অন্যান্য লতিফা অর্থাৎ রূহ, ছের, খফি, আখফা, আব, আতশ, খাক, বাদ সকলে মিলিয়া একটি বিশেষ সমষ্টিগত রূপ লাভ করে, যাহা আল্লাহতায়ালার জাতি নূর ধারণ করিতে সক্ষম হয়। তাহা না হইলে শুধু কালবের আল্লাহতায়ালার জাতি বা সিফাতে হাকীকীর নূর গ্রহণ বা ধারণ করিবার ক্ষমতা নাই। যে খোদাতালাশী ব্যক্তির নাফসে আম্মারার মৃত্যু হইয়াছে ও যাহাকে আল্লাহতায়ালা আপন পরিচয় দানের জন্য গ্রহণ করিয়াছেন, সেই গৃহীত ব্যক্তির কালব হাকীকী নূরের দ্বারা যখন অন্য নয় লতিফার সংযোগে "হায়াতে ওহাদানী" রূপ লাভ করে তখন সেই কালব আল্লাহতায়ালার জাতি নূর ধারণ করিবার ক্ষমতা লাভ করিয়া "মোদগা" নামে অভিহিত হয়। এই মোদগা জাতি নূর লাভ করে বলিয়া ইহা চিরস্থায়ী। ইহা সকল প্রকার দুনিয়াবী আকাংখা ও দৈহিক আকর্ষণ বা রিপু হইতে মুক্ত। ঐ রূপ মোদগার অধিকারী ব্যক্তি তখন আল্লাহ দ্বারা সকল প্রকার স্খলন ও পতনের সম্ভাবনা হইতে হেফাজতে থাকেন। তিনি আল্লাহতায়ালার যে এলহাম লাভ করেন বা আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে যে সকল বিষয় তাহাকে দেখানো হয়, তাহাতে জেল্লিয়াতের বা প্রতিবিম্বের ভুল ত্রুটির সম্ভাবনা থাকে না। তখন তাহার নাফস এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়া যায় যে তিনি আল্লাহতায়ালার দ্বারাই পরিচালিত হন। ঐ দরজায় যে আরেফ উত্থিত হন, তাহা যেমন সম্ভব হয় কেবল আল্লাহতায়ালার দয়ায়, তেমনি হযরত নবী করীম (সাঃ) এর সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণে। হযরত নবী করীম (সাঃ) এর অনুসরণ ও আল্লাহতায়ালা কর্তৃক তাহার দেহগত সত্ত্বার পূর্ণ পবিত্রতা লাভ এবং শরীয়তের পূর্ণ আমলের মাধ্যমে তাহারা তখন নবী করীম (সাঃ) এর ওয়ারেশ হিসেবে গণ্য হন ও আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে নবী করীম (সাঃ) এর প্রতিনিধিত্ব লাভ করিয়া হেদায়েতকারীর যোগ্য হইয়া যান।
এখানে বিশেষভাবে বুঝিবার বিষয় এই যে, আল্লাহতায়ালার নূরের প্রতিবিম্ব, তাহার হাকীকী সিফাতের নূর ও আল্লাহতায়ালার জাতি নূর-এই তিনটি স্তরের পরিচয় গ্রহণ সম্পূর্ণ হইলেই আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ সম্পূর্ণ হয়। ছবি দেখিয়া যেমন মানুষের পরিচয়ের পূর্ণতা পাওয়া যায় না, মানুষের গুণাগুণের পরিচয় জানিয়াও তেমন তাহার সহিত সরাসরি পরিচয়ের যে ফলাফল তাহা জানা যায় না। আমরা বহু নেতার ছবি কাগজে দেখি। তাহাদের চোখে না দেখিয়াও তাহাদের চিনিতে পারি। আবার খবরের কাগজে তাহাদের সম্পর্কে যে সকল খবর ছাপা হয়, তাহা দ্বারা তাহাদের গুণাগুণ, মন মানসিকতা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা করিতে পারি। খবরের কাগজের ছবি দেখিয়া, খবর পড়িয়া একজনের সম্পর্কে ধারণা এবং তাহার সহিত প্রত্যক্ষ পরিচয় ও নিবিড সম্বন্ধ হওয়া এবং সকলের নিকট তাহার প্রতিনিধিত্বের সম্মান লাভ করা: এই দুই স্তরের মধ্যে যে তফাৎ-কামালাতে বেলায়েতের স্তরের ওলী এবং কামালাতে নবুয়তের স্তরের সাধকগণের মধ্যে এই পার্থক্য রহিয়াছে।
বেলায়েতে কোবরার স্তরে যে ছালেক উন্নীত হন, তাহার পর হইতে উচ্চতর মাকাম সমূহ অর্থাৎ দায়েরায়ে মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানি, মহব্বতে সালেস, বেলায়েতে উলিয়া, মোরাকাবায়ে শরহে ছদর পার হইয়া কামালাতে নবুয়তের স্তরে সাধককে আল্লাহতায়ালা উন্নীত করেন। এই স্তর সমূহের উন্নতি সম্ভব হয় জজবার মাধ্যমে। জেকের আজকারের চেয়ে মহব্বতের মাধ্যমেই এই স্তর সমূহ অতিক্রম করিতে হয়। আর মহব্বতের প্রকাশই জজবা।
কামালাতে নবুয়তের স্তরের পূর্বে দায়েরায়ে কাওছের মাকামে ছালেক আল্লাহতায়ালার প্রেমের নবজাত শিশু 'ওজুদ মাওহুব লাহু' লাভ করেন। এই ওজুদ মাওহুব লাহু খোদাতালাশী ব্যক্তি ও আল্লাহতায়ালার মধ্যে বিদ্যুতের চেয়েও লক্ষ গুণ বেগে যোগাযোগ রক্ষা করিতে সক্ষম হয়। একই সাথে ওজুদ মাওহুব লাহু দুনিয়ার তাবৎ বস্তুর সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিতে পারে। তাই একই সাথে ঐ স্তরে উন্নীত ছালেক আল্লাহতায়ালা ও সৃষ্টি জগতের সমুদয় বস্তুর সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিতে পারেন। ওজুদ মাওহুব লাহু সৃষ্টি জগতের তাবৎ বস্তুর সহিত যে যোগাযোগ রক্ষা করিয়া চলে তাহা সম্ভব হয় এই জন্যে যে, ইহার সম্পর্ক হইল বস্তুর হকিকতের সহিত। তাই বস্তুর ভালমন্দ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও ওজুদ মাওহুব লাহু জ্ঞানী হইয়া আরেফকে তাহা জ্ঞাত করে। ফলতঃ আরেফ হুয়াজ্জাহেরো, হুয়াল বাতেনো, হুয়াল আউয়ালো, হুয়াল আখেরো-আল্লাহতায়ালার এই নাম ও গুণের পরিচয় লাভ করিয়া সর্ব জ্ঞানী হন। দায়েরায়ে বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে আসিয়া তাহাদের দেহের আগুন, পানি, বাতাস-এই তিন দেহগত লতিফার উপর আল্লাহতায়ালার সিফাত মিশ্রিত জাতি নূরের দায়েমী তাজাল্লী পতিত হয়। কামালাতে নবুয়তে আসিয়া তাহাদের আনছারে খাক বা দেহগত সকল লতিফা এমন কি লতিফায়ে কালেবও পূর্ণরূপে ছাফ হইয়া যায় আল্লাহতায়ালার জাত হইতে আগত দায়েমী (সার্বক্ষণিক) তাজাল্লী দ্বারা। তাহারা মোরাকাবা হালাতে থাকুন বা না থাকুন-সর্ব সময়ের জন্য তাহাদের দেহ আল্লাহতায়ালার নূরের অবিরাম স্রোতে ছাফ হইতে থাকে। তাই পার্থিব জগতের অপবিত্রতা আর তাহাদের স্পর্শ করিতে পারে না। তাহাদের জবান, কর্ম, সিদ্ধান্ত সকলই তখন পবিত্র হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ কর্তৃক পরিচালিত হয়। আল্লাহপাক তাই তাহাদের সম্পর্কে বলেন, “নফল এবাদত করিতে করিতে বান্দা আমার ঐ রূপ নৈকট্য লাভ করে যে, সে পরিপূর্ণরূপে আমার দ্বারা পরিচালিত হয়"। এই গুণ কামালাতে নবুয়তের স্তরে লাভ হয়। যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদে নবী করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে বলেন, “হে নবী! যে আপনার হাতে বয়াত হইল সে যেন আমার হাতেই বয়াত হইল।" আল্লাহপাক আরও ফরমান, "ঐ ধুলি আপনার হাত নিক্ষেপ করে নাই তাহা আমিই নিক্ষেপ করিয়াছি।" বান্দার মধ্যে আল্লাহতায়ালা তাহার এই গুণ দান করিয়াছেন বলিয়াই আল্লাহতায়ালার পরিচয় বান্দা গ্রহণ করিতে পারে। যেমন শরীয়তে বলা আছে,
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ
অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আদমকে নিজের ছুরতে সৃষ্টি করিয়াছেন।
এখানে ছুরত অর্থ গুণ। আল্লাহপাকের গুণের স্বাদ গ্রহণ করিতে হইলে তাহার ভালবাসা ও মহব্বতের স্বাদ গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা তিনি মানুষকে দান করিয়াছেন তাহা অর্জন করিতে হইবে। আল্লাহতায়ালার এ গুণ লাভ হয় মোদগার দ্বারা।
বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরায় ঐ সকল কামেল ওলী ফেরেশতাদের বেলায়েতের সমকক্ষতা লাভ করেন ও ফেরেশতাদের জগত বা আলমে মালাকুতের জ্ঞান লাভ করেন। ঐ সময়ে তাহাদের কর্ম ও এবাদত ফেরেশতাদের মত নির্ভুল থাকে।
বেলায়েতে উলিয়ার পাশাপাশি রহিয়াছে মোরাকাবায়ে শরহে ছদরের দফতর। এই শরহে ছদরের দফতরের যে মোরাকাবা-তাহাতে ছালেকের হৃদয় আল্লাহতায়ালার নূর দ্বারা এমনই প্রশস্ততা লাভ করে যে, এই মোরাকাবায় যিনি কামালাত লাভ করেন তিনি সীমাহীন সহ্যগুণ বা সহনশীলতা লাভ করেন এবং আল্লাহতায়ালার জন্য এমনই মহব্বত ও সাহস সঞ্চয় করিয়া থাকেন যে তাহার নিকট কোনো বাঁধাই আর বাঁধা মনে হয় না, নিজের উপর কোনো নিপীডনও তাহাকে দুঃখিত করে না। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তাহার হেদায়েতের জীবনে অপরিসীম দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছেন। তাঁহার দন্ত মোবারক শহীদ হইয়াছে। তায়েফে তাহার উপরে কাফেরগণ বর্ণনাতীত অত্যাচার করিয়াছে। কিন্তু যাহারা তাহার উপর এই অমানবিক অত্যাচার করিয়াছে তাহাদের উপর তিনি কোনো দিন অভিসম্পাত করেন নাই। তিনি পাপকে ঘৃণা করিয়াছেন; পাপীকে ঘৃণা করেন নাই। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যেমন আল্লাহতায়ালার প্রেমের খাতিরে এক মাত্র পুত্রকে কোরবানী করিতে পারিয়াছেন। আপন সহায় সম্পত্তি আল্লাহতায়ালার প্রেমে মুহূর্তের মধ্যে ত্যাগ করিতে পারিতেন। হযরত নূহ (আঃ) এর উপর তাঁহার সময়ের লোকজন এমনই অত্যাচার করিত যে মাঝে মাঝে তাহাদের নিক্ষিপ্ত প্রস্তরের ঢিপির মধ্যে তিনি ঢাকিয়া যাইতেন। তাহার উপর নিক্ষিপ্ত প্রস্তর এত উঁচু হইয়া যাইত যে তিনি তাঁহার নীচে পড়িয়া যাইতেন; তাহার দেহের সকল অংশ নিক্ষিপ্ত পাথরে ঢাকিয়া যাইত। কিন্তু তবুও মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান হইতে তাঁহারা বিরত থাকিতেন না। শরহে ছদরের মোরাকাবা হাছিল কারী আরেফেরও ঐ রূপ সহ্য শক্তি লাভ হয়। তাহারা তাহাদের উপর অর্পিত হেদায়েতের দায়িত্ব সকল অবস্থাতেই পালন করেন। ইহাতে তাহাদের উপর আগত সকল প্রকার ভয় ও চ্যালেঞ্জ হইতে তাহারা মুক্ত থাকেন। কোনো অবস্থাই তাহাদের মনে দুঃখ বা ভয়ের সৃষ্টি করিতে পারে না।
কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত ও কামালাতে উলুল আজমের পরিপূর্ণতা আসে হকিকতে মুহাম্মদীতে। এই হকিকতে মুহাম্মদী সম্পর্কে বিশেষ রূপে জ্ঞান না হইলে রাসূলে করীম (সাঃ) এর নবী হিসেবে সার্বজনীনতা সম্পর্কে জ্ঞান আসে না। হকিকতে মুহাম্মদী ও নূরে মুহাম্মদী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হইবে অন্য কোন ভলিয়মে। হকিকতে মুহাম্মদী সম্পর্কে আজ শুধু এইটুকু বলিয়া রাখা হইল যে, "হকিকতে মুহাম্মদী হইল আল্লাহতায়ালার কল্পনার যে নিখুঁত মানুষ-যিনি একাধারে আল্লাহতায়ালার নিখুঁত এবাদতকারী হইবেন, আল্লাহতায়ালার নিখুঁত মহব্বতকারী ও তদীয় মহব্বতকে নিখুঁত ভাবে গ্রহণ করিবেন তথা আল্লাহতায়ালার নিখুঁত ও পরিপূর্ণ পরিচয় গ্রহণ করিবেন। কামালাত অধ্যায়ের শেষ যদিও কামালাতে উলুল আজমের স্তরে কিন্তু আমাদের নবী রাসূলে করীম (সাঃ) ই ছিলেন সর্ব উৎকৃষ্ট হেদায়েত কারী। তাই তাহার হেদায়েতের গুণাগুণ লাভই হেদায়েতকারীগণের কাম্য হইয়া থাকে। যে হেদায়েতকারীকে আল্লাহতায়ালা হকিকতে মহাম্মদীর দায়েরায় উন্নীত করেন, তিনি এই গুণাগুণ লাভ করিয়া থাকে।"
আল্লাহতায়ালা মানুষ সৃষ্টি করিয়াছিলেন আপন পরিচয় দানের জন্য; আপন প্রেম প্রকাশের জন্য। আল্লাহপাকের প্রেম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য যেমন জাতের সহিত পরিচয় প্রয়োজন, তেমনি তাহার গুণ ও ক্রিয়াসমূহ বুঝিবার জন্য সৃষ্টি জগতের সহিত পরিচয় প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালার গুণসমূহের সহিত পরিচয় লাভের জন্য সেই গুণ আস্বাদনের যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। সকল নবী (আঃ) ও আরেফ সকলের মধ্যে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ)-ই প্রথম আল্লাহতায়ালার জাত, মহত্ব ও গুণ এবং তাহার সৃষ্টি সম্পর্কে পরিপর্ণ ধারণা লাভকরেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এই জ্ঞান লাভ করেন আল্লাহতায়ালার সহিত মেরাজের মাধ্যমে হোব্বে ছেরফার মাকামে উত্থিত হইয়া। আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় লাভ করিয়া ও তাহার সমগ্র সৃষ্টি জগতের জ্ঞান লাভ করিয়া তিনি বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েতের নির্দেশক হন আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি হিসেবে। "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-কলেমা শরীফের এই অংশের যাহা অর্থ তাহা হইল মুহাম্মদ আল্লাহতায়ালার রাসূল বা প্রতিনিধি। কলেমা শরীফের এই অংশ বলিতে মক্কা নগরীর আব্দুল্লাহ তনয় বোঝায় না। এই অংশে যে মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর কথা বলা হইয়াছে, তাহার জন্ম সমগ্র সৃষ্টি জগতেরও দুই হাজার বছর পূর্বে। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, আল্লাহতায়ালা সর্বাগ্রে আমার নূর, আমার জ্ঞান ও আমার কালাম সৃষ্টি করেন-যাহা আরশের উপর রক্ষিত ছিল। এই নূরে মুহাম্মদী হইতেই সমগ্র সৃষ্টি জগতের উৎপত্তি। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন,
كُلُّ شَيْءٍ مِّنْ نُوْرِي
অর্থাৎ- সমগ্র সৃষ্টি আমার নূর হইতে সৃষ্ট।
রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর হইতে যেহেতু সমগ্র সৃষ্টির উৎপত্তি হইয়াছে, তাই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সমগ্র সৃষ্টি জগতের নবী; জীব জগত, জড় জগত এবং ফেরেশতাগণেরও নবী। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর যে হকিকত তাহা প্রথম সৃষ্টি হিসেবে আল্লাহতায়ালার নিখুঁত কল্পনারই হকিকত বা গুণের প্রকাশ। আবার তাহার মধ্যে নূরে মুহাম্মাদী যাহা সমগ্র সৃষ্টির নূরময় রূপ তাহাও সেই হকিকতেরই বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহতায়ালার নিখুঁত কল্পনার নিখুঁত হকিকত হিসেবে রাসূলে করীম (সাঃ) এর হকিকতকে আল্লাহ বলেন সর্বোত্তম সৃষ্টি। আবার সমগ্র সৃষ্টির মূল হিসেবে সমগ্র সৃষ্টির হকিকতও তাহার নূরের মধ্যে বিরাজমান। কামালাতে নবুয়তের স্তরের সাধকগণকে আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া যখন হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে উন্নীত করেন, তখন তাহার মধ্যে সর্বোত্তম সৃষ্টির গুণাগুণ ও সমগ্র সৃষ্টির হকিকতও আসিয়া যায়। তাই ঐ স্তরের সাধকগণ যেমন আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি হিসেবে তাহার যুগের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে পরিগনিত হন, তেমনি তাহার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি জগতের হকিকত বিরাজমান থাকায় সমগ্র সৃষ্টি জগতকে তিনি আপন বলিয়া ভাবিতে পারেন; তাহার মধ্যে তখন আপন-পর, শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ থাকে না। তিনি হন সমগ্র সৃষ্টির। সমগ্র সৃষ্টিই হইয়া যায় তাহার আপনার ধন। তাই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তাহার চির শত্রু, ইসলামের চির শত্রু আবু জাহেলের কল্যাণার্থে আল্লাহতায়ালার নিকট কাঁদিতে পারিয়াছিলেন। যে বৃদ্ধা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পথে কাটা ফেলিত, তাহার অসুস্থতার সময় চিকিৎসা করিতে পারিতেন। এই রূপে যখন কোনো সাধককে আল্লাহতায়ালা দয়া করিয়া হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে উন্নীত করেন-তিনি সৃষ্টির জন্য হইয়া যান আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি বা নায়েবে রাসূল। তখন তাহার মধ্যে কলেমা শরীফের দ্বিতীয় অংশের অর্থাৎ মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর হকিকত ও মারেফাত আসিতে থাকে। এই দৃষ্টিকোণ হইতে বলা যায়ঃ যাহারা কামালাতে বেলায়েতের পর্যায়ে উন্নীত হন, তাহারা কেবল আল্লাহতায়ালার জেল্লীর পরিচয় লাভ করেন। আর যাহারা কামালাতে নবুয়তের পরিচয় লাভ করেন তাহারা আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় লাভ করিয়া ও সমগ্র সৃষ্টি জগতের পরিচয় লাভ করিয়া সৃষ্টি জগতের জন্য আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বকারী হইয়া যান। আর এক শ্রেণীর ওলী আছেন যাহারা আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় ও প্রেম লাভকরেন বটে কিন্তু তাহারা হেদায়েতের দায়িত্ব লাভ করেন না। আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় ও প্রেম লাভকারী আরেফগণ আল্লাহতায়ালার জাতের প্রেমে বিভোর হইয়া দুনিয়া ও সৃষ্টি জগত ভুলিয়া থাকেন। সৃষ্টির জন্য তাহাদের কোনো কর্ম নিরূপিত থাকে না। বেলায়েতে নবুয়ত প্রাপ্তি অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় ও প্রেম লাভ করিবার পরই কামালাতে নবুয়ত বা হেদায়েতের দায়িত্ব ছিলেন। তাই তিনি মাঝে মাঝেই আল্লাহতায়ালার প্রেমে বিভোর হইয়া লাভ হয়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বেলায়েতে নবুয়তের অধিকারী যাইতেন। বলিতেন, "হে আল্লাহ! শুধু আপনি: আপনার জন্য আমি আমাকেও পরিত্যাগ করিলাম।" আল্লাহতায়ালা তখন তাহাকে কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা দিয়া আবার দুনিয়ার মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার জাতের প্রেমের জগত হইতে প্রত্যাবর্তন করাইয়া দিতেন বা ফেরত পাঠাইয়া দিতেন। বলিতেন, "হে নবী! আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতই মানুষ। তবে আমার উপর অহী হয়।"
বস্তুতঃ কামালাতে নবুয়ত অর্জনকারী সাধকগণকে তাই আল্লাহতায়ালার জাতের জগত হইতে প্রত্যাবর্তনকারী আরেফ বলিয়াও অভিহিত করা হইয়া থাকে। এই প্রত্যাবর্তন জাতের পরিচয় লাভের পর হেদায়েতের জন্য, বিশ্ব বাসীকে খোদামুখী করিবার জন্য।
আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বকারীর সহিত সমগ্র জগতের যে যোগসূত্র থাকে, বেলায়েতে নবুয়তের অধিকারীগণের সেই যোগসূত্র থাকে না। কামালাতে নবুয়তের অধিকারীগণের একই সাথে স্রষ্টা ও সৃষ্টি, উভয়ের সহিতই যোগাযোগ থাকে-যাহা অন্য কোনো স্তরের সাধক লাভ করিতে পারেন না। যিনি জামানার জন্য হেদায়েতকারী তিনিই রাসূলের নায়েব এবং আল্লাহ ও রাসূল-উভয়ের প্রতিনিধিত্বকারী। রাসূল করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি ছিলেন। নবুয়তের যুগ শেষ হইয়াছে। তাই হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরের সাধকগণকে নবী করীম (আঃ) এর প্রতিনিধি হিসেবে অনুসরণ করিলে একই সাথে আল্লাহ ও রাসূলের অনুসরণ করা হয়। জামানার মুজাদ্দেদের মহব্বত হাছিল করিলে একই সাথে আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত হাছিল হইয়া যায়।
হে জাকেরান! তোমরা জানিয়া রাখ, আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন বর্তমান জামানার শ্রেষ্ঠ হেদায়েতকারী। পূর্বকালের ওলী আল্লাহগণ বেলায়েতের স্তরেই তাহাদের সাধনা সম্পূর্ণ হইয়াছে বলিয়া মনে করিতেন। তাহারা জেল্লীর জগতেই থাকিয়া যাইতেন। সেই অবস্থা হইতে আমাদের তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার দয়ায় জাতের জগতে উন্নীত হইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরে আল্লাহতায়ালার জাতের পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন ও সৃষ্টি জগতের জ্ঞান লাভ করেন-যাহা তাহার পূর্বের যুগের অন্য কোনো ওলী লাভ করেন নাই। এই গুণ তিনি লাভ করিয়াছিলেন নবী (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ দ্বারাই। তাই কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা হাসিলের অন্যতম মাধ্যম হইল হযরত নবী করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ ও তাহার মহব্বত লাভ। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নেছবতের পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন আমার দয়াল পীর কেবলাজান ছাহেব। তাই এই সত্য তরিকার ঝান্ডার নীচে মানুষ দলে দলে আসিয়া শামিল হইতেছে। কারণ সমগ্র সৃষ্টি জগতের সহিত আমার পীর কেবলাজান হুজুর (কুঃ) ছাহেবের যে সম্পর্ক তাহা আর কাহারও নাই-তাই তাহার তাওয়াজ্জুহ দ্বারাই মানুষের মন আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ঘুরিতেছে, আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতে রংগীন হইতেছে।
তাই তোমরা যদি হকিকতে মুহাম্মদীর মাকামে পৌঁছাইতে চাও এবং মানুষকে আল্লাহতায়ালার পথে টা নয়া আনিয়া সৃষ্টির সেবা করিতে চাও, তবে জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ হেদায়েতকারী, আমার দয়াল পীর কেবলাজানের হকিকতকে বুঝিবার চেষ্টা কর। তাহার মহব্বত হাছিলের চেষ্টা কর। তাহা হইলেই আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত তোমাদের নছিব হইবে। আল্লাহতায়ালার জাতের জ্ঞান এবং হকিকতে মুহাম্মদীর জ্ঞান আল্লাহতায়ালার ফজল, করম ও দয়ায় লাভ করিতে পারিবে। আমীন!








