Logo

কামালাতে নবুয়তের আলোকে স্বীকৃতপ্রাপ্ত হাদীগণের বৈশিষ্ট্য

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৩০ জুলাই, ২০২৬, ১৯:৫১
কামালাতে নবুয়তের আলোকে স্বীকৃতপ্রাপ্ত হাদীগণের বৈশিষ্ট্য
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কামালাতে নবুয়তের আলোকে নির্বাচিত ও স্বীকৃতপ্রাপ্ত হাদী (নবী ও কামেল ওলী) গণের বৈশিষ্ট্য সমূহের আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

"কামালাতে নবুয়ত"-হেদায়েতের দায়িত্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতকারীগণ কাহারা? তাঁহাদের বৈশিষ্ট্য কি কি? পবিত্র কুরআন মজীদ ও ইতিহাসের আলোকে আমরা জানিতে পারি নবী (আঃ) গণ আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে মানুষকে হেদায়েত করিয়াছেন। নবী (আঃ) গণ মানুষ হইয়াও অসাধারণ ছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যাহা তাঁহাদেরকে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর করিত এবং তাঁহাদের ঐ শ্রেষ্ঠত্বের জন্যই সাধারণ মানুষগণ নিজ হইতেই নবী (আঃ) গণের অনুসরণ করিত। নবী (আঃ) গণের ঐ সকল শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চিন্তা করিলেই "কামালাতে নবুয়ত” বা হেদায়েতকারী আম্বিয়াগণ এবং "ওয়ারেছাতুল আম্বিয়া" বা তাঁহাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী তথা হেদায়েতের দায়িত্ব প্রাপ্ত ওলী-আল্লাহগণ সম্পর্কে কিছু ধারণা করা যাইবে।

হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব তদীয় "মা'আরিফুল কুদস" এবং হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রঃ) ছাহেব তদীয় "হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা" কেতাবে নবী (আঃ) গণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন।

হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব বলেন, "পাশবতার চাইতে মানবতা যেমন উন্নত পর্যায়ের, তেমনি নবুয়ত মানবতার চাইতে উন্নত পর্যায়ের। এই বৈশিষ্ট্য আল্লাহতায়ালার দান। চেষ্টা, পরিশ্রম ও তত্ত্ব তালাশ বা অনুসন্ধান দ্বারা তাহা পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান,

اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ

অর্থাৎ- "আল্লাহই জানেন রেছালতের ভার কাহার উপর অর্পণ করিবেন।" (ছুরা আনআমঃ ১২৪)

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক ফরমান,

ذَالِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ

অর্থাৎ- "ইহা আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ-যাহাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন।" (সূরা হাদীদঃ ২১)

বিজ্ঞাপন

মানুষের মানুষ আকৃতিতে জন্মগ্রহণ যেমন তাহার নিজের আয়ত্বাধীন নহে, ফেরেশতাগণের ফেরেশতা হওয়া যেমন তাহাদের আয়ত্বাধীন নহে, তেমনি নবী (আঃ) গণ ও হেদায়েতকারীগণও আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত। তবুও প্রত্যেক নবী-রাসূল (আঃ) এবং হেদায়েতকারীগণ আল্লাহতায়ালার রাস্তায় সাধনা করিয়াছেন। হযরত মুসা (আঃ) কিতাব লাভের পূর্বে তুর পাহাড়ে চল্লিশ দিন "রোজা" রাখিয়া সাধনা করেন। হযরত ঈসা (আঃ) একটি জঙ্গলে নির্জনে ৪০ দিন যাবত "রোজা” রাখা অবস্থায় এবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ)ও হেরা পর্বতের গুহায় সুদীর্ঘ কাল সাধনায় রত ছিলেন।

নবী (আঃ) গণ যে "ওহী” অর্থাৎ পবিত্র ফেরেশতা হযরত জীব্রাইল (আঃ) মারফত যে "ওহী" বা কিতাব লাভ করেন সে সম্পর্কে কুরআন মজীদে আল্লাহ বলেনঃ-

مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَ مَا غَوى

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "তোমাদের সংগী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়।" (সূরা নাজমঃ আয়াত-২)

একই সূরাতে আল্লাহপাক ফরমান-

مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَ مَا طَغَى

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- "তাঁর রাসূল (সাঃ) এর দৃষ্টি বিভ্রমও হয় নাই, লক্ষ্যচ্যূতও হয় নাই।"

পশুর উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় শক্তির দ্বারা নয়-মানুষের বুদ্ধি ও কৌশল দ্বারা। নবী (আঃ) গণও তাঁহাদের আত্মার পবিত্রতা ও প্রকৃতির নিয়মের উপর আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্ব বা মোজেযা ও জ্ঞান দ্বারা সকলের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তাঁহাদের আত্মার পবিত্রতা দ্বারাই তাঁহারা পয়গম্বরসুলভ চারিত্রিক দৃঢ়তা, ন্যায় নিষ্ঠতা লাভ করেন। আল্লাহতায়ালা পয়গম্বর (আঃ) ও হেদায়েতকারীগণকে প্রকৃতির উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন বা প্রকৃতি পরিবর্তন করার ক্ষমতা দান করেন, তাহার দ্বারাই তাঁহারা মানব প্রকৃতি বা নাফসের পরিবর্তন ও সংশোধন করেন, মানুষকে আল্লাহতায়ালার পথে আহ্বান করেন, পথ নির্দেশ করেন ও মানুষকে আল্লাহতায়ালার পছন্দনীয় গুণে গুণান্বিত করেন।

মানুষের প্রকৃতি বা নাফসকে সংশোধন ও পরিবর্তন করার গুণ তাই হেদায়েতকারী নবী (আঃ)গণ ও ওলী আল্লাহগণের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। নবী (আঃ) ও তদীয় উত্তরাধিকারী হেদায়েতকারীগণ আরও কিছু দায়িত্ব পালন করেন। এ প্রসংগে হযরত মাওলানা শিবলী নোমানী (রঃ) বলেন, "আল্লাহপাক অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনিয়া সৃষ্টি করেন এবং সৃষ্টির উপর "আমর" বা হুকুম প্রদান করেন এবং যে হুকুম তিনি দান করেন, "তাহাই হইয়া যায়।" যেভাবে ফেরেশতা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যবর্তী দূত বা বাণীবাহক হিসাবে কাজ করে, তেমনিভাবে নবী (আঃ) গণ আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে বাণীবাহক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বান্দার কাছে খোদার বাণী পৌঁছে দেন-কখনও তিনি এই বাণীর মাধ্যমে আগত সত্য সম্পর্কে বলেন, কখনও আল্লাহতায়ালার হুকুম আহ্কাম জানান এবং কখনও আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে ভয় প্রদর্শন করেন। পূর্বকালের নবী (আঃ) গণ আল্লাহতায়ালার বাণী "ওহী" মারফত প্রাপ্ত হতেন এবং যাহা কিতাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান কালে আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত হেদায়েতকারীগণ 'ওহী' বা কিতাব লাভকরেন না; কিন্তু "এলহাম" বা আল্লাহতায়ালার নিকট হতে নির্দেশ লাভ করে থাকেন। এই এলহাম দ্বারাই তাহারা আল্লাহতায়ালার পথে মানবসমাজকে হেদায়েত করেন। বর্তমান কালের হেদায়েতকারীগণের যেমন খোদাতায়ালার এলহাম লাভের বৈশিষ্ট্য থাকে, তেমনি প্রকৃতির নিয়মকে পরিবর্তন করার বা মানব প্রকতি বা নাফসকে পরিবর্তন করার বৈশিষ্ট্যও তাঁহাদের মধ্যে থাকে। প্রয়োজন আছে বিধায়ই আল্লাহপাক যুগে যুগে হেদায়েতকারী প্রেরণ করিয়াছেন এবং করিতেছেন এই বিশেষ প্রয়োজন হইল মানুষের প্রকৃতি ও আত্মাকে সংশোধন করা। দেহ সত্ত্বা বা পশু সত্ত্বার আকর্ষণ হইতে মুক্ত করিয়া মানুষকে আল্লাহতায়ালার পথে আত্মনিবেদিত করার জন্য যে প্রবৃত্তির দমন ও প্রকৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন হয়-হেদায়েতকারীগণ মানুষের মধ্যে সেই পশুসুলভ প্রবৃত্তিকে দমন করাইতে সক্ষম হন এবং কারামত প্রদর্শনের ক্ষমতা নিজের মধ্যে ধারণ করেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, "পিত্ত বৃদ্ধিগত রোগ বা অসুস্থতার কারণে মানুষের কাছে মিষ্টি জিনিষকেও তিক্ত মনে হয়। যতই মিষ্টি দেয়া হউক মিষ্টি তাহার কাছে আর স্বাদপূর্ণ থাকে না। তেমনি পার্থিব লোভ, কামনা বাসনা দ্বারা মানুষের ভাল মন্দের বিচার ক্ষমতা রহিত হইয়া যায়। তখন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, মঙ্গল-অমঙ্গল, ভাল-মন্দ বোধশক্তি আর মানুষের মধ্যে কাজ করে না অর্থাৎ মানুষের "মানবতা' গুণ সমূহ থাকে না। মানুষের মধ্যে সহজাত পশুত্ব বোধ প্রধান হইয়া দাঁড়ায়।" অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এই পশুত্ব বোধ প্রধান হইয়া দাঁড়াইলে সেই সমাজের ন্যায়-শৃংঙ্খলা আর থাকে না। তখন শক্তি, কূট কৌশল বা মিথ্যার আশ্রয়ে-যেমন করিয়া হউক, একজন আর একজনের উপর, এক দল আর এক দলের উপর প্রভাব প্রতিপত্তি খাটাইতে চায়। এই রূপে সমাজে সংঘাত, সন্ত্রাস ও ধ্বংস নামিয়া আসে। মানুষ তথা আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট জীবই ধ্বংস হয়। আল্লাহতায়ালা জীবের স্রষ্টা। তিনিই ত্রাণকর্তা ও রক্ষা কর্তা। মানুষের মধ্যে পশু প্রবৃত্তি সমূহ দমন করিয়া তদস্থলে মানবিক গুণ সমূহ সৃষ্টি করিয়া মানব সমাজকে টিকাইয়া রাখিবার জন্যই তিনি বারংবার হেদায়েতকারী প্রেরণ করেন-সৃষ্টিকে রক্ষার জন্যই আল্লাহর পক্ষ হইতে যুগে যুগে হেদায়েতকারী আগমন করেন। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ও তদীয় খলীফাগণের পর যুগে যুগে আগমনকারী হেদায়েতকারীগণের বহু স্বাক্ষর বা প্রমাণ ইতিহাসে রহিয়াছে। কতিপয় হাদীর নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়-যেমন হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রঃ) ছাহেব, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব, হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব, হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব, হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) ছাহেব, হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) (কুঃ) ছাহেব প্রমুখ। এই সকল হেদায়েতকারীগণের মধ্যে কেহবা ছাহেব, হযরত শাহ জালাল (রঃ) ছাহেব, হযরত শাহসুফী এনায়েতপুরী কোনো একটা জাতির হেদায়েতের জন্য আসিয়াছেন, কেহবা এমন হেদায়েত ও রহমতের নেছবত লইয়া আসিয়াছেন, যাহার উসিলায় শত শত বছর ধরিয়া অসংখ্য মানুষ আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েত প্রাপ্ত হইতেছে।

বিজ্ঞাপন

এ পর্যন্ত যাহা আলোচিত হইল তাহা হেদায়েতকারীগণের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ-এই বার পীরানে পীরগণের দৃষ্টিতে হেদায়েতকারীগণের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা হইতেছে।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, “হেদায়েতকারী যিনি বেলায়েতে মুহাম্মদী (সাঃ) এর হকদার এবং দাওয়াতে মোস্তফার গুণে গুনান্বিত, তিনি সমস্ত বিকাশমান বস্তুর তথা সৃষ্টি জগতের কালব বা হৃদয় স্বরূপ।” তাঁহাদের দেহের সমস্ত লতিফা সমূহ কালব ও রূহের গুণে গুনান্বিত হইয়া যায়। "কালব" ও "রূহ" আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগতের লতিফা। রূহ আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত "এরাদত” হইতে সৃষ্ট। এই হেদায়েতকারীগণের রূহ আল্লাহতায়ালার এরাদত সিফাতের সহিত মিশিয়া যায় বা ফানা লাভ করে। এরাদত ব্যতীত খোদাতায়ালার আরও সাতটি হাকীকী সিফাত আছে। যথাঃ হায়াত, এলেম, কুদরত, সামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তকবীন। আল্লাহতায়ালার সকল অবিনাশী ও ধ্বংসাতীত গুণের তাজাল্লী ও জাতপাকের তাজাল্লীসমূহ তখন সাধকের দেহে রূহ হইয়া কালব ও সের, খফি, আখফা, নাফস ও নাফস হইয়া আব, আতশ, খাক ও বাদ বা আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের তৈরী এই মানব দেহে আসিয়া মানব দেহের প্রকৃতিকে পরিবর্তন করাইয়া দেয়; তখন সমস্ত দেহসত্ত্বা পবিত্র হইয়া যায় এবং আগুন, পানি, মাটি, বাতাসের দেহ সত্ত্বাকে তখন ছালেক আয়না রূপে দেখিতে পান। ওলীগণ শুধু কালবকে আয়না রূপে দেখিতে পান। আর কামালাতে নবুয়তের স্তরের হেদায়েতকারীগণ সমস্ত দেহসত্ত্বাকেই আয়নারূপে দেখিতে পান। সমস্ত দেহ সত্ত্বাই তখন কালবের গুণে গুনান্বিত হয়। মানব দেহ যেমন জগতের সর্ববস্তুর মিশ্রনে সৃষ্ট এবং সর্ব বস্তুর গুণে গুনান্বিত; তেমনি কালবও এমন একটি মাংস টুকরা যাহা মানব দেহের সকল উপাদান লইয়া তথা সৃষ্টির সকল উপাদান লইয়া গঠিত। পৃথিবীর মধ্যে মানুষ যেমন এক ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি এবং অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় মানুষের গুণ যেমন বিস্ময়কর, তেমনি কালবও মানব দেহের এক বিস্ময়কর উপাদান। এই কালবকে তাই বর্গগণ আলমে সগীর ও বৃহৎ জগতকে আলমে কবীর বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। মানব দেহের সমস্ত সত্ত্বা যখন কালবের গুণে গুনান্বিত হয় তখন সেই মানব দেহ সমস্ত সৃষ্টির জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হয়। এই গুণ লাভ হয় কালবের অভ্যন্তরীণ ছায়ের বা হাকীকী কালবের ছায়েরের মাধ্যমে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, "যা কিছু বিশাল জগতে দেখা যায় তার সব কিছুই ঐ ক্ষুদ্র জগতে বা আলমে সগীরে বা মানব দেহের মধ্যে দেখা যায়।" মানব দেহের দোষসমূহ আল্লাহতায়ালার জাত ও জাতমিশ্রিত সিফাতের তাজাল্লীর স্রোতে পরিচ্ছন্ন হইয়া আলোকিত হইয়া যায়। মানব দেহেই তখন আল্লাহতায়ালার জ্যোতির্ময় সত্ত্বার "দর্শন” বা নাফসের মধ্যেই আল্লাহতায়ালার দর্শন হয়। আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাতের নূরের দ্বারা দেহের যে নিজস্ব সংকীর্ণতা তাও দূর হয়। কালব যেহেতু মানব দেহের সকল উপাদান লইয়া গঠিত তাই কালব ও মানব দেহ উভয়ের গুণাগুণের মধ্যে সাদৃশ্য আছে। মানবদেহ কালবের গুণে গুণান্বিত হয়-এ কথার আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নাই। আল্লাহপাক হাদীসে কুদসিতে ফরমান-"আসমান জমিন আমাকে ধারণ করিতে পারে না, কিন্তু আমাকে ধারণ করিতে পারে মুমিন বান্দার কালব।” মানব দেহ যখন কালবের গুণে গুণান্বিত হয় তখন আল্লাহতায়ালার ধারণকারীর গুণেও গুণান্বিত হইয়া যায়। তাই মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "আলমে কবীর বা বিশাল জগত যদিও সৃষ্টির প্রকাশের দিক দিয়া প্রশস্ত আয়না স্বরূপ, তথাপি ব্যাপকতা ও প্রশস্ততার কারণে বারী তায়ালার সংশ্রব দৃষ্টি গোচর হয় না। কিন্তু জাতের আয়েন হইতে পারে যাহা সংকীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বিস্তৃততম; ক্ষুদ্রতম হওয়া সত্ত্বেও বৃহত্তম এবং অবিমিশ্র হওয়া সত্ত্বেও প্রশস্ততম। যে আরেফ এই মাকামে পৌছান তিনিই সমস্ত জাহানের কালব বা হৃদয় হইয়া যান। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, "বস্তুত সমস্ত কুতুব, আওতাদ ও আবদাল তাহার হেদায়েতের আলোকেই স্নাত হন। কারণ ঐ রূপ ব্যক্তিই রাসূলে করীম (সাঃ) এর স্থলাভিষিক্ত হন এবং আল্লাহতায়ালার হাবীব (সাঃ) হইতে হেদায়েত প্রাপ্ত হন।"

আগে যেরূপ বলা হইয়াছে রূহ যখন নিজ উৎপত্তিস্থল আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতের পর্দায় উরুজ করে ও সিফাতে এরাদতে ফানা লাভ করে তখন মানব দেহে জাত মিশ্রিত সিফাতের ফয়েজান আসে। এই ফয়েজান সমূহ কালব ও রূহ হইয়া নাফসের উপরে ও নাফস হইয়া আব, আতশ, খাক ও বাদের উপর পতিত হয়। তখন মানব দেহসত্ত্বা আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী হয় ও এবাদতে লিপ্ত হয়-যাহাকে নাফসে মোৎমাইন্ন্যার স্তর বলা হয়। এই রূপে জড়দেহ স্বীয় মাকামে স্থিতি লাভ করে। তখন ছয় লতিফা অর্থাৎ কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা ও নাফস তাহার নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া আলমে আমরে বা সূক্ষ্ম জগতের সহিত ফানা লাভ করে। তাহা সত্ত্বেও তাহার শরীর তখন ইহজগতে থাকিয়া যায়। এই রূপে যে মানব দেহের আলমে আমরের লতিফা সমূহ আল্লাহতায়ালার হাকীকীগুণ সমূহের সহিত ফানা লাভকরে এবং তাহার জড় দেহ কালবের গুণ ধারণ করিয়া পৃথিবীতে বর্তমান থাকে, সেই মানব দেহের পবিত্র গোশতের টুকরা কালবের উপরই আল্লাহতায়ালার এলহাম অস। এই রূপ যে কালব সমস্ত দেহব্যাপী বিস্তৃত থাকে তাহা হকিকতে জামেয়া কালবিয়া বলিয়া অভিহিত হয়।

বিজ্ঞাপন

এই ক্ষেত্রে রূহ ও কালবের সংযোগ সম্পর্কে একটু বিবরণ দেয়া প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালার সিফাতের পর্দাতে উরুজ হয় রুহের, কালবের নয়। কিন্তু রূহ আল্লাহতায়ালার আমর বা হুকুমের নূর ধারণ করিলেও তাহার অর্থযুক্ত অনুভূতি লাভ করে মানব দেহের আকল। যেরূপ টেলিফোনের তার ও যন্ত্র বার্তা বহন করিলেও ইহার অর্থ বুঝিতে লাগে একজন মানুষ। টেলিফোন যন্ত্র বা তার বার্তার অর্থ বুঝিতে পারে না। দেহ যে রূহের গুণ ধারণ করে ইহার অর্থ এই যে নাফস বা দেহসত্ত্বা তখন আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী থাকে এবং আলমে আরোওয়াহর জগতে রোজ আজলের দিনে যেমন আল্লাহপাক রূহকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, "আমি কি তোমাদের প্রভু নই?" ইহার উত্তরে রূহ সকল বলিয়াছিল "বালা” বা বেশখ আপনিই আমাদের প্রভু। আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী থাকার যে প্রবণতা তাহা আলমে আরোওয়াহ স্তরের গুণ। তাই বলা হইয়াছে দেহ তখন রূহের গুণে গুনান্বিত হয়-পার্থিব আকর্ষণ বা পার্থিব কোন বস্তুর প্রতি দেহের আনুগত্য তখন থাকে না।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "কালবের গোশতের টুকরা হকিকতে জামীয়া কালবিয়া অর্থাৎ কালবের মূল সত্ত্বার একত্রকারী, কাজেই ইহাও আসলের গুণে গুনান্বিত। এই হেতু তার গ্রহণ ক্ষমতা কালবের ক্ষমতার অনুরূপ।"

উপরের আলোচনা হইতে বোঝা যায় যে, নাফসে মোৎমাইন্যা বা প্রশান্ত নাফস আলমে আরোওয়াহ-এর সংগে জড়িত। জড় জগতে আকল তাহার প্রতিনিধি এবং আকলে মাআদ বা উৎপত্তি স্থলের জ্ঞান নাম ধারণ করে। তাই দুনিয়ার উপর তাহার আকর্ষণ থাকে না। এমন আরেফ ন্যায় ও সত্যের উপর সর্ব অবস্থায়ই দৃঢ় থাকিতে পারেন। আল্লাহতায়ালার সিফাতে হাকীকী হইতে রূহ যে জ্ঞান বহন করিয়া কালবে আনে ও কালবের যে আকল লাভ হয় তাহা উৎস বা উৎপত্তিস্থলের জ্ঞান বা আকলে মা'আদ বলিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব অভিহিত করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "আকলে মাআদের উপর এমন একটা সময় আসে যখন তাহা নাফসে মোৎমাইন্ন্যার প্রতিবেশী হইতে আগ্রহী হয়। এই আগ্রহ এতদূর বাড়িয়া যায় যে, আকলে মাআদকে নাফসে মোৎমাইন্ন্যা মাকাম পর্যন্ত পৌছাইয়া দেয়া হয়। এমতাবস্থায় "আকলে মা'আদ" শরীরকে পূর্ণভাবে ত্যাগ করে। তখন কালব রূপ গোশতের টুকরার মধ্যেই জ্ঞান ও যোগ্যতা আসে। আরেফগণ তাই আপন কালবে আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন। "আনা খায়রুম মিনহু"- বা "আমি তাহা হইতে শ্রেষ্ঠ" নাফসের এই শয়তানী স্বভাবও চলিয়া যায়। তখন হাকীকী ইসলাম লাভ হয়। ইবলিসের পোশাক খসিয়া পড়ে। নাফস মোৎমাইন্ন্যার স্তরে পৌঁছায়। তখন শরীরের মধ্যে কালব হাকীকী কালবের খলিফা হয়।"

রূহ তদসংগীয় লতিফাসমূহ যেমন কালব, সের, খফি, আখফার সাহায্যে পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা নিজের উৎপত্তি স্থলে পৌঁছায়। তবুও মাটির দেহ বর্তমান থাকায় দুনিয়ার সহিত রূহকে যোগাযোগ রক্ষা করিতে হয়। এই অবস্থায় রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস, কালব, আকল যদিও আল্লাহতায়ালার প্রতি পরিপূর্ণ রূপে নিবেদিত থাকে-ঐ সকল লতিফাসমূহে আল্লাহতায়ালার সিফাত মিশ্রিত জাতের নূর আসার কারণে দেহ তখন পূর্ণরূপে আল্লাহতায়ালার দাসত্বের মাকামে বা আবদিয়াতের মাকামে পৌঁছায়। ইহার পর রূহ নিজ মর্তবার সহিত মাকামে শুহুদ বা দর্শনের স্থান ব্যতীত অন্য সব কিছু হইতে মুখ ফিরাইয়া লয়। অন্য দিকে নাফস বা শরীরও তখন আবদিয়াতের মাকামে স্থির থাকে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের কালবীয়া জামিয়া লাভের পর বিচ্ছিন্নতার মাকাম। এই মাকামে রূহ ভাষায় ইহা হইল লতিফা সমূহের একত্রীভূত হওয়া তথা হকিকতে স্বীয় মর্তবা সহকারে আলমে খালক বা সৃষ্টি জগতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যাহাতে মানবজাতিকে আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতের দাওয়াত দান করিতে পারে। এই সময় রূহ কালেব বা শরীরের ন্যায় হইয়া যায় এবং শরীর পরিপূর্ণরূপে রূহের অনুসারী অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার হুকুমের অনুসারী হইয়া যায়। এই সময় এমন অবস্থা হয় যে, যদি শরীর আল্লাহতায়ালার প্রতি রুজু থাকে তাহা হইলে রূহুও আল্লাহতায়ালার দিকে রুজু থাকে; শরীর যদি আল্লাহতায়ালার দিকে নামাজ বা মোরাকাবা মোশাহেদা রত অবস্থায় না থাকে, তাহা হইলে রূহুও আল্লাহতায়ালার দিকে রুজু থাকে না। অবশ্য নামাজ আদায় কালে বা মোরাকাবা মোশাহেদা অবস্থায় রূহ নিজ মর্তবা অনুযায়ী আল্লাহতায়ালার দিকে পূর্ণরূপে নিবিষ্ট হয়।

আল্লাহতায়ালার সহিত মিলিত হওয়ার পর রূহের এই প্রত্যাবর্তন দাওয়াতের জন্য সর্বোত্তম মাকাম। প্রত্যাবর্তনের পরে রূহের এই গাফলত সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, "এই প্রত্যাবর্তন ও তৎপরের গাফলত তাঁহাকে সমস্ত জাহানের জন্য রহমতের মর্যাদা দিয়াছে। ইহা ঐ গাফলত যাহা বেলায়েতের দরজা হইতে নবুয়তের কামালাতের দরজায় পৌঁছাইয়া দেয়। ইহা সেই গাফলত যাহা হেদায়েতকারীগণকে নির্জনে বসবাসকারী ওলীগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর করিয়াছে। ইহা সেই গাফলত যাহার কারণে কুতুবে এরশাদ কুতুবে আবদালের উপরে প্রাধান্য প্রাপ্ত। উহা ঐ গাফলত যাহা সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) কামনা করিতেন। এই মাকাম হযরত নবী করীম (সাঃ) এর উম্মত ব্যতীত অন্য নবী (আঃ) গণের উম্মতগণের নসীব হয় নাই। তাই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মতগণকে খায়রুল উমাম বা উম্মতগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হইয়াছে। ইহাই কামেল ওলীগণের সর্বশেষ উরুজস্থল। তবে ওলীগণের উরুজ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পদতলে। রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরে হযরত আবুবকর সিদ্দিকী (রাঃ) সমস্ত মানব জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তাহার উরুজের মাকামও হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পদতলে ছিল।"

বিজ্ঞাপন

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মতগণের মধ্যে যাহারা তাঁহার পূর্ণ অনুসারী এবং আল্লাহপাক কর্তৃক নির্ধারিত হেদায়েতকারী তাঁহারা রাসূলে করীম (সাঃ) এর সর্বোচ্চ কামালাতের নীচের মাকামের পূর্ণ অংশ লাভকরেন-এই মাকাম যাহারা লাভ করেন-তাহারা "ফাওকুল ফাওক" বলিয়া অভিহিত, যদিও "ফাওকুল ফাওক" মাকাম আম্বিয়া (আঃ) গণের জন্য খাছ। খাদেম যেখানেই থাকুক না কেন মনিবের উদ্বৃত্ত খাদ্য তাহার নিকট পৌঁছাইয়া যায়।

হে জাকেরান! তোমরা কামালাতে নবুয়ত সম্পর্কে কিছু বুঝিতে পারিলে। গত নসিহত সমূহও কামালাতে নবুয়ত প্রসংগে সজ্জিত ছিল। এ নসিহতও একই প্রসংগে, তবে ভিন্ন দৃষ্টিকোণে সাজানো। মূলতঃ কামালাতে নবুয়ত এমন এক মাকাম-যাহার সম্পর্কে আলোচনার কোন শেষ নাই। যতটুকু করা হইল ইহাতে নবী-রাসূল (আঃ) গণ এবং কামেল ওলীর কিছু পরিচয় বিধৃত হইয়াছে। আজকের আলোচনা এ পর্যন্তই। দু'আ ইতি!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD