খেলাফতের স্বীকৃতিপত্র ব্যতীত পীর-মুরীদি করার ক্ষমতা কাহারো নাই

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ)-এর প্রতিনিধিত্ব ও খেলাফতের সার্টিফিকেট বা স্বীকৃতিপত্র। এই সার্টিফিকেট ব্যতীত পীর-মুরীদি করার ক্ষমতা কাহারো নাইঃ
বিজ্ঞাপন
মহা পবিত্র কুরআন মজীদে যেমন শরীয়তের বিধানসমূহ রহিয়াছে, তেমনি পূর্ববর্তী নবী (আঃ) গণের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। এই ইতিহাসে যেমন সৃষ্টির পূর্বের কথা বলা হইয়াছে; তেমনি আদি মানব ও প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) সম্বন্ধে বিবরণ রহিয়াছে; একই রূপে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম মানব, বিশ্ব জগত সৃষ্টির উসিলা, সরোয়ারে কায়েনাত, সাইয়েদুল মোরছালীন, নবী-শ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)-এর সময়কালের বিবরণ, এমন কি পরকালের বিবরণও রহিয়াছে। কুরআন মজীদে যে সকল নবীগণের ঘটনাবলী বর্ণিত হইয়াছে, তাহাদের ঘটনাবলীর সহিত জড়িত বহু নিদর্শন এখনও আমাদের সম্মুখে ইতিহাসের জলন্ত প্রমাণ হিসেবে রহিয়াছে-যেমন হযরত আদম (আঃ) এর স্থাপিত পবিত্র কাবা শরীফ রহিয়াছে, রহিয়াছে সাফা-মারোয়া পাহাড়, সিরিয়া ও তুরস্কের নিকটবর্তী এক পর্বতের উপরস্থিত বরফের ভিতরে যে বিশাল আয়তন ও বহুতল বিশিষ্ট নৌকা পাওয়া গিয়াছে-তাহা অনেক বৈজ্ঞানিক হযরত নূহ (আঃ) এর নৌকা বলিয়া ধারণা করিয়াছেন এবং ঐ নৌকার কাষ্ঠাদি হযরত নূহ (আঃ) এর সমসাময়িক বলিয়াও প্রমাণিত হইয়াছে। জেরুজালেমে হযরত সোলায়মান (আঃ) এর মসজিদ, হযরত মুছা (আঃ) এর স্মৃতিজড়িত তুর পাহাড় বিশ্ববাসীর সম্মুখে আল্লাহতায়ালার বাণীর পার্থিব ও বাস্তব প্রমাণ হিসাবে রহিয়াছে।
কুরআন মজীদে নবী (আঃ) গণের প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হইয়াছে, আল্লাহপাক জমিনে তাহার খলিফা বা প্রতিনিধি প্রেরণ করিতে চাহিয়াছেন। এই সকল নবী (আঃ) গণ মানুষের নিকট আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েত করিয়াছেন বা আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পৌছাইয়া দিয়াছেন। আল্লাহপাক এই সকল নবী (আঃ) এর নিকট তাহার প্রতিনিধিত্বের প্রমাণ হিসেবে ওহী, কিতাব, মোজেযাদি দান করিয়াছেন। নবী (আঃ) গণের নিকট এই নিদর্শনাদি ইহাই প্রমাণ করিত যে, তাহারা যদিও সাধারণ মানুষের মতই জীবন-যাপন করেন, তবুও সাধারণ মানুষের সহিত তাহাদের পার্থক্যও রহিয়াছে, যে পার্থক্য স্বয়ং আল্লাহপাক নির্ধারিত করিয়াছেন। তাই নবী (আঃ) গণের এত্তেবা নিজ নিজ যুগের, এলাকার বা কওমের মানুষের জন্য ফরজ হইয়া গিয়াছে। যাহারা নবী (আঃ) গণের এত্তেবা করে নাই তাহাদেরকে 'কাফের' বলিয়া আল্লাহতায়ালা সাব্যস্ত করিয়া ধ্বংস করিয়া দিয়াছেন, যেমন হযরত নূহ (আঃ) এর উম্মতগণ ব্যতীত অন্য সকল কাফেরদের আল্লাহপাকের নির্দেশে প্লাবন আসিয়া ধ্বংস করিয়া দেয়। হযরত হুদ (আঃ) এর হেদায়েতের বাণী বিরোধী আদের কওমের কয়েক লক্ষ লোককে একই সাথে আল্লাহপাকের হুকুমে বাতাস আসিয়া সমুদ্রের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়াছিল। পক্ষান্তরে যে সত্তর জন লোক হযরত হুদ (আঃ) এর উপর ঈমান আনিয়াছিলেন তাহারা রক্ষা পাইয়াছিলেন। আদের কওমের তিন লক্ষ লোক পাহাড়ের আড়ালে লুকাইয়া বসিয়াছিল-পাহাড় সমেতই তাহাদের সকলকে প্রবল ঝড় আসিয়া উড়াইয়া লইয়া যায়। যাহারা হযরত হুদ (আঃ) এর উপর ঈমান আনিয়াছিলেন-তাহারা খোলা আকাশের নীচে থাকিলেও তাহাদের কোন ক্ষতি হয় নাই।
হযরত হুদ (আঃ)কে অতঃপর আদের কওমের আর এক শাখার রাজা সাদ্দাদের নিকট প্রেরণ করা হইল। সাদ্দাদকে তিনি আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনিতে বলিলেন। বলিলেন, আল্লাহপাক তোমাকে হাজার বছরের হায়াত, বাদশাহী, অগণিত সহায়-সম্পদ ও শক্তি দান করিয়াছেন। অতএব তুমি আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনয়ন কর। তাহা হইলে আল্লাহপাক তোমাকে বেহেশত দান করিবেন।
বিজ্ঞাপন
সাদ্দাদ হযরত হুদ (আঃ) এর বাণী উপেক্ষা করিয়া বলিল-সে নিজেও বেহেশত তৈরী করিতে পারে। তিন শত বৎসর ধরিয়া বেহেশত তৈরী করিল। তাহার কওমের সমস্ত সোনা-রূপা আনিয়া সেই বেহেশতের প্রাসাদ তৈরী করিল। সকল স্থান হইতে গাছ-পালা আনিয়া তাহার তথাকথিত বেহেশতে লাগাইল। সাদ্দাদের বেহেশত নির্মানের পর সে যখন ঐ বেহেশত দেখিবার জন্য উহার সিড়িতে দাড়াইল তখন "মালেকুল মউত" আসিয়া তাহার জান কবচ করিয়া লইল-সাদ্দাদের বাদশাহী ক্ষমতা তাহার কোনো কাজে লাগিল না: এমন কি সে তাহার ঘোড়া হইতে নামিতেও পারিল না।
হযরত ফারাবী তদীয় 'ফুসুসুল হিকাম' নামক কিতাবে উল্লেখ করেন, "পয়গম্বরগণের আত্মার মধ্যে একটি পবিত্র শক্তি বর্তমান থাকে। তোমাদের আত্মা যেমন নিজ দেহে ক্রিয়াশীল থাকে, তোমাদের দেহ সেই আত্মার অনুবর্তী ও আজ্ঞানুসারী হয়, পয়গম্বরগণের পবিত্র আত্মা বৃহৎ জগতে সক্রিয় থাকে এবং সমস্ত বস্তু জগত উহার অনুবর্তী ও আজ্ঞানুসারী হয়। তাই তাহার ইচ্ছায় প্রকৃতি বিরোধী কার্যাবলী বা মোজেযা সংঘঠিত হয়। যেহেতু পয়গম্বরগণের আত্মা অতি পরিষ্কার ও মলিনতামুক্ত থাকে, তাই লওহে মাহফুযে সুরক্ষিত ঘটনাবলী তথা আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি জগতে যাহা কছু ঘটিবার সেই সকল ঘটনার অভ্রান্ত সংবাদ তাহাদের আত্মায় প্রতিফলিত হয়। পয়গম্বরগণ সেই সকল ঘটনাবলীর সংবাদ আগাম জানিতে পারিয়া মানুষের নিকট ইহার যৎকিঞ্চিত পৌছান।"
হযরত মাওলানা শিবলী (রঃ) ছাহেব বলেন, নবী (আঃ) গণের পবিত্র আত্মা খোদায়ী ইচ্ছায় শুধু তাহাদের দেহ জগতের উপরই প্রভাব বিস্তার করে না, সমগ্র সৃস্টি জগতের সহিত সম্বন্ধ যুক্ত হইয়া যায়। তাই তিনি চোখের পলকে ভূলোক হইতে দূলোক পৌঁছাইয়া যান। তাঁহার সামান্য আঘাতে সমুদ্রের গতি স্তব্ধ হইয়া যায়। তাঁহার হাতের দেয়া শুখা রুটি বিপুল জনতাকে পরিতৃপ্ত করে। তাঁহার অংগুলী হইতে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়। তাঁহার ইংগিতে চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত হয়। পুণ্য স্পর্শে রুগ্ন সুস্থ হয় এবং মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়। তাঁহার নিক্ষিপ্ত ধুলি-মুষ্টি বিশাল সৈন্য দলকে পর্যুদস্ত করে। পাহাড়-প্রান্তর, জলস্থল, সজীব-নির্জীব সব কিছুই খোদার নির্দেশে তাহার কাছে নত জানু হয়; এত কিছু সত্ত্বেও তিনি সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষ এবং খোদার অনুগত বান্দাই থাকেন। তাহার দ্বারা যে অলৌকিক কর্মাদি হয় তাহা তাহার প্রভুর ইচ্ছায়ই সংঘটিত হয় বা আল্লাহতায়ালার পক্ষ হইতে সম্পাদিত হয়।
বিজ্ঞাপন
সকল নবী (আঃ) গণের মধ্যে সর্বশেষ নবী হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মর্যাদা সর্বাধিক যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে-
وَ مَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ -
অর্থাৎ "আপনাকে সমগ্র মানব জাতির জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হইয়াছে।"
বিজ্ঞাপন
পক্ষান্তরে পর্ববর্তী নবী (আঃ) গণ কোনো কোনো কওমের জন্য পথ প্রদর্শনকারী ছিলেন।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর এই শ্রেষ্ঠত্ব কেন?
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় "মাবদা ওয়া মা'য়াদ" গ্রন্থে ফরমান, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) অন্যান্য সকল পয়গম্বর (আঃ) অপেক্ষা আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়াতে জাতির সহিত বেশী সম্পর্ক যুক্ত। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উৎপত্তি স্থল যাহাকে "তাইয়ুনে মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" বলা হয় তাহা হইল আল্লাহতায়ালার জাত পাকের তাইয়ুনে এলেম-যাহা অন্য সকল তাইয়ুন, শান ও শয়ুনাতকে বেষ্টন করিয়া আছে। তাইয়ুনে এলেম যেহেতু অন্যান্য সকল তাইয়ুনকে বেষ্টন করিয়া আছে; তাই ইহাই কাবেলিয়াতে উলা। কাবেলিয়াতে উলাকে হকিকতে মুহাম্মদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কাবেলিয়াতে উলা (যাহা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল) তাইয়ুনে এলেমের সহিত সম্পর্কযুক্ত-তাহাই পরিপূর্ণ কামালাতের নির্দেশক। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ কামালাত ও জ্ঞান পরিদৃষ্ট হয়। পবিত্র কুরআন মজীদে এই পরিপূর্ণ কামালাতের ইংগিত দিয়া বলা হইয়াছে, "ইহা সেই কিতাব যাহা সকল সন্দেহ বা ত্রুটি হইতে মুক্ত এবং সকল মুত্তাকীর পথ প্রদর্শক।” (আয়াত-২, সূরা বাকারা)। একই রূপে সূরা ইয়াসিনের প্রথম দুই হইতে পাঁচ আয়াত পাকে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন- "মহা বিজ্ঞানময় বা জ্ঞানপরিপূর্ণ কুরআনের কসম এবং আপনি [নবী করীম (সাঃ)] অবশ্যই রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত এবং সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত এবং এই কুরআন মজীদ মহা পরাক্রান্ত এবং দয়ালু আল্লাহতায়ালা হইতে অবতীর্ণ।" আল্লাহপাকের কাবেলিয়াতে উলা বা সমস্ত সিফাতের সামগ্রিক যোগ্যতা ও পরিপূর্ণতার জ্ঞান বা এলেম কালামের মাধ্যমে কুরআন মজীদে বর্ণিত রহিয়াছে।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার জাত পাকের তাইয়্যুনে এলেম যেমন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল, তেমনি জাত পাকের শান-এ-এলেম হইল তাহার অনুসরণকারীগণেরও রব। যাহারা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুসরণকারী তাহারাও নবী (সাঃ) এর নেছবতে শানউল এলেমের জ্ঞানে আল্লাহতায়ালার দয়া অনুযায়ী পরিপূর্ণ বা আংশিকভাবে আল্লাহতায়ালার কামালাত ও জ্ঞানের অধিকারী হইয়া যান।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পূর্ববর্তী যে সকল উলুল আজম পয়গম্বর বা নবী (আঃ) ছিলেন-তাহাদের উৎপত্তিস্থল আল্লাহতায়ালার তাইয়নে এলেম ছিল না। তাহাদের উৎপত্তিস্থল ছিল আল্লাহতায়ালার জাত পাকের অন্যান্য সিফাতের তাইয়্যুনসমূহ। তাঁহারা নিজ নিজ সিফাত হইতে ফয়েজ প্রাপ্ত হন এবং তাহাদের উরুজ, ফানা ও বাকা নিজ নিজ উৎপত্তি স্থলের তাইয়ুন পর্যন্ত। তাহাদের নিজ নিজ জামাত বা উম্মতগণও ঐ সিফাত হইতে ফয়েজ প্রাপ্ত হইয়াছেন। আল্লাহতায়ালার জাত পাকের তাইয়ূনে এলেম হইল "কাবেলিয়াতে আখেরী" বা সর্বোচ্চ যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা হইল আল্লাহতায়ালার নিছক জাত এবং শান ও সিফাতের মধ্যে পর্দা বা বরযখ স্বরূপ। তাই আল্লাহতায়ালার জাতের এলেমের শান ও স্থান অন্য সকল সিফাত ও শানের ঊর্ধ্বে: অন্য সকল শান ও সিফাত উহার নীচে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, বরজখ ও পর্দা জাত ও সিফাত উভয় দিকের সহিত সম্পর্ক রাখে। তাই রাসূলে করীম (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল যে তাইয়ূন-এ-এলেম তাহা বস্তুত নিছক জাত ও জাত মিশ্রিত সিফাত -এই উভয় দিকের মধ্যবর্তী পর্দার অনুরূপ। তাই তাহার উরুজ ও উৎপত্তিস্থল নিছক জাতের সব চেয়ে নিকটবর্তী। আর রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মতগণের মধ্যে যাহারা নবীজী (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসারী তাঁহারাও এই সম্পদ লাভে বঞ্চিত হন না-তাহারাও আল্লাহতায়ালার জাত পাকের নিকটতম নৈকট্য লাভ করেন-যাহা পূর্ববর্তী নবীগণ বা তাঁহাদের উম্মত বা অনুসারীদের পক্ষে সম্ভব নয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "যাহারা সিফাতে এলেম পর্যন্ত উন্নীত তাঁহাদের ও তাঁহাদের রবের মধ্যে সিফাতে এলেমের পর্দা বা হেজাব প্রথম স্তরে থাকিয়া যায়; কিন্তু পরে তাহাও উন্মোচিত হইয়া যায় এবং আল্লাহতায়ালার জাত পাকের দর্শন লাভ হয়। নবী করীম (সাঃ) মহাপবিত্র মেরাজ শরীফে বিনা পর্দাতেই আল্লাহতায়ালার নিছক জাত পাকের দর্শন লাভ করিয়াছেন। অন্যান্যদের জন্য বিনা পর্দায় তাজাল্লীয়াতে জাতি দর্শন কেবলমাত্র রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব।"
কোনো কোনো সূফী সাধক হকিকতে মুহাম্মদীকে সমস্ত সিফাতের সহিত এবং সাধারণভাবে জাতের সহিত সম্পর্কযুক্ত মনে করেন। উহার কারণ তাহারা সিফাতের জ্ঞানের অধিকারী। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উৎপত্তি স্থল শানে এলেমকে বা শয়নাতকে আয়েনে জাত বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। আর সিফাত হইল জাত হইতে বিচ্ছুরিত; তাজাল্লীয়াতে সিফাত জাত হইতে নির্গত এবং জাতের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু জাত সিফাতের উপর নির্ভর নয়।
বিজ্ঞাপন
পূর্বে বলা হইয়াছে, আল্লাহতায়ালার কাবেলিয়াতে উলার জ্ঞান বা এলেম "কালাম" দ্বারা পবিত্র কুরআন মজীদে বর্ণিত হইয়াছে। তাই কুরআন মজিদ সমস্ত কামালাতে জাতিয়া এবং শয়ূনাতে জাতিয়া-এই উভয়েরই প্রকাশ। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পূর্বে অন্য নবী (আঃ) গণের নিকট আল্লাহতায়ালার যে ওহীসমূহ ও কিতাব সমূহ আসিয়াছিল তাহা আল্লাহতায়ালার সকল কামালাতের ও শয়ূনাতের প্রকাশ ছিল না। পূর্ববর্তী কিতাব সমূহ অধিকাংশই ছিল সামাজিক বিধি-নিষেধ বা সম্পর্কযুক্ত।
পবিত্র কুরআন মজীদ যাহা আল্লাহপাকের কামালাত, শয়ূনাত ও এলেমের পরিপূর্ণ প্রকাশ, তাহাও হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর উপর এককভাবে প্রকাশিত হইয়া তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সর্বোচ্চ করিয়াছে।
এই পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ বলেন, "যখন আমি কোনো বস্তু সৃষ্টি বা ঘটনা সংগঠিত হইবার জন্য "কুন" বা হও বলি-তখনই তাহা হইয়া যায়।” আল্লাহতায়ালা কুরআন মজীদে আরও ফরমান-"নিশ্চয়ই তিনি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।" আল্লাহপাক কুরআন মজীদে আরও ঘোষণা করেন "তাহার কুরছি বা সিংহাসন সমস্ত আসমান জমিন ব্যাপী।” এই সকল আয়াতপাক হইতে ইহা স্পষ্ট যে পবিত্র কুরআন মজীদ আল্লাহতায়ালার সকল ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রকাশক হিসেবে মরতবায়ে জামীয়া অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার সকল মরতবার বা গুণের সমন্বিত প্রকাশ। আল কুরআন আল্লাহতায়ালার সকল মরতবা সমূহের সমন্বিত প্রকাশ হিসেবে দায়েরায়ে আসলের অন্তর্গত-ইহার মধ্যে জেল্লীর কোন অবকাশ নাই। হকিকতে মুহাম্মদী যাহা আল্লাহতায়ালার কামালাতসমূহের প্রকাশ তাহা এই কুরআন মজীদেরই ছায়া স্বরূপ বা কুরআন মজীদে বর্ণিত গুণ ও কামালাতসমূহের ধারণকারী। যেমন উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন, "রাসূলে পাক (সাঃ) এর চরিত্র হইল আল কুরআন।"
বিজ্ঞাপন
নবী করীম (সাঃ) এর এই পরিপূর্ণ কামালাত ও জ্ঞান যাহা কুরআন মজীদে বর্ণিত হইয়াছে-তাহার পূর্ণতা অর্জনেই বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের পূর্ণতার প্রকাশ বলিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লেখ করিয়াছেন। আর এই জ্ঞান আল্লাহতায়ালার সকল শয়ুনাতের সমষ্টি বলিয়া ইহাকে তিনি জাতের আয়েন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ওলীগণকে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব তদীয় মুকাশিফাতে আয়নিয়া নামক গ্রন্থে 'আফরাদ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। আর আফরাদগণ কুরআন মজীদের প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী। আফরাদগণ কুতুবগণের চাইতে উচ্চ মর্তবার অধিকারী। এই পরিপূর্ণ জ্ঞান কুতুবগণের দৃষ্টি সীমা হইতে ঊর্ধ্বে বলিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বর্ণনা করিয়াছেন। তাই আফরাদগণই বা বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের অধিকারীগণই প্রকৃত হেদায়েতের অধিকারী। তবে কোনো কোনো আফরাদ কুতুবগণের সহিত সম্পর্ক রাখেন। তবে যাহারা কুতুবিয়াত ও ফরদিয়াত-এই উভয় সম্পদে সম্পদশালী তাহারাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান। হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রঃ) এই উভয় সম্পদে সম্পদশালী ছিলেন।
কুরআন মজীদে পরিপূর্ণ কামালাতের প্রতিফলন ও ভাষাগত প্রকাশ হইয়াছে-তাহার প্রমাণ এই যে, ইহা অতীত ও ভবিষ্যত কালের সমস্ত বিষয়ের প্রকাশক যেমন কোনো ব্যক্তি তাহার জীবনের প্রথম দিন হইতে শেষ দিন পর্যন্ত সকল ঘটনার সমন্বয়কারী; তদ্রুপ কুরআন মজীদও আল্লাহতায়ালার সৃষ্টিজগতের আদি অন্ত এবং খোদাতত্ত্বজ্ঞানের সমষ্টিগতভাবে প্রকাশকারী, আল্লাহপাকের সত্য জ্ঞানের ধারণকারী।
তবে এই জ্ঞান লাভ করিতে হইলে বা কুরআন মজীদে খোদাতত্ত্বজ্ঞান ও সৃষ্টিতত্ত্ব জ্ঞানের যে রহস্যভান্ডার রহিয়াছে তাহা উন্মোচিত করিবার জন্য প্রয়োজন এখলাস বা পবিত্র আত্মার। যেমন কুরআন মজীদে বলা আছে "পবিত্র আত্মা ব্যতীত ইহাকে কেহ স্পর্শ করিবে না।" অর্থাৎ ইহাতে বর্ণিত খোদাতত্ত্ব জ্ঞানের রহস্য ও সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্য পবিত্র আত্মা ব্যতীত কেহ লাভ করিতে পারিবে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, হকিকতে কুরআনের বিশেষ কিছু সূক্ষ্মতত্ত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়া পবিত্র আত্মার সহিত সম্পর্কযুক্ত; কিন্তু কুরআন মজীদের যাবতীয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় কেবলমাত্র আল্লাহপাকই জ্ঞাত।
বিজ্ঞাপন
পবিত্র আত্মা লাভ করিবার পথ কি? বেলায়েতের ততীয় অধ্যায় বেলায়েতে উলিয়ায় যখন কোনো খোদাতালাশী ছালেক আল্লাহতায়ালার দয়া ও হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহব্বতের আকর্ষণে উন্নীত হয়, তখন আল্লাহতায়ালার সিফাত মিশ্রিত জাতি নূরের দায়েমী তাজাল্লী বা অবিরাম স্রোত আসিয়া তাহার দেহের আগুন, পানি ও বাতাস এই তিনটি লতিফার উপর ক্রমাগতভাবে পড়িতে থাকে এবং এই উপাদানসমূহ পরিষ্কার হইয়া যায়। দেহের অপর উপাদান "খাক" বা মাটি-আগুন, পানি ও বাতাসের নিম্নে থাকিবার জন্য ঐ স্তরে দেহের মাটির অংশ পবিত্র হয় না। ইহার পরে আল্লাহতায়ালার দয়া ও হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহব্বতে ছালেক কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় উন্নীত হন, তখন আল্লাহতায়ালার জাতি নূরের দায়েমী বা অবিরাম স্রোত তাহার দেহের মাটির উপর আসিয়া পড়িতে থাকে। এই অবস্থায় দেহের সকল লতিফাই পবিত্র হইয়া যায়। তাই কামালাতে নবুয়ত ও তদ্ঊর্ধ্ব স্তরে উন্নীত সূফী সাধকগণ যাহাদেরকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব "আফরাদ" বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন তাহারা কুরআন মজীদের হরফে মোকাত্তায়াত, যেমন আলিফ, লাম, মিম, ইয়া-সিন, হা-মিম সহ হকিকতে কুরআনের সহিত সংশ্লিষ্ট আল্লাহতায়ালার আয়াতসমূহের জ্ঞান লাভে সক্ষম হন।
দেহের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস লতিফা পবিত্র হইবার সাথে সাথে ঐ স্তরের ওলীগণের দেহের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস মূলের আসলের সহিত ফানা হইতে থাকে। কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালত ও কামালাতে উলুল আজমের স্তরে দেহের সর্বাংশ এমনই বিশুদ্ধ হইয়া যায় যে, তখন কালব পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতা অর্জন করিয়া মোদগার রূপ লাভ করে-তখন দেহের সর্বাংশ পবিত্র হইয়া যায়। এই পবিত্র নাফস আল্লাহতায়ালার সহিত কালাম বিনিময় করিতে সক্ষম হয়। এই সকল ওলী বা আফারাদগণই তাই মানব জাতি বা কওমকে আল্লাহতায়ালার এলহাম দ্বারা পরিচালিত করিতে পারেন যাহা অন্যান্য স্তরের ওলীগণের পক্ষে সম্ভব নহে। কামালাতে নবুয়ত আল্লাহতায়ালার জাতি নূর লাভের প্রথম স্তর। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব তদীয় "মাবদা ওয়া মায়াদ" নামক কেতাবে আল্লাহতায়ালার জাতি নূর লাভের বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা নিম্নরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, "ছুলুকের রাস্তায় চলার ইচ্ছা প্রবল হইলে আল্লাহপাক আমাকে নকশবন্দীয়া তরিকার এক বুযুর্গের নিকট পৌঁছাইয়া দেন এবং আমি তাহার সাহচর্য গ্রহণ করিয়া ঐ বুযুর্গের তাওয়াজ্জুর বরকতে সিফাতসমূহের প্রতিপালনের মাধ্যমে সর্বশেষ স্থানে উপনীত হই। অর্থাৎ আমার মূলতত্ত্বে ফানা প্রাপ্ত হই। হযরত আলী করমাল্লাহ ওয়াজহাহুর রূহানী ঊর্ধ্বারোহণ ঐ পর্যন্ত হয় যাহা আমার প্রতিপালনকারী।..........
"অতঃপর খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রঃ) ছাহেবের রূহানী সহায়তায় ঐ এসেম থেকে কাবেলিয়াতে উলার দরজা পর্যন্ত পৌছাই -যাহাকে হকিকতে মুহাম্মদী বলে। পরে হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর রূহানী সহায়তায় আরও উচু মাকামে উন্নীত হই। ইহার পর হযরত নবী করীম (সাঃ) এর রূহানী সাহায্য দ্বারা আকতারে মুহাম্মদীর স্তরে উন্নীত হয়। এই স্তর কুতুবগণের জন্য নির্ধারিত সর্বশেষ স্তর। এই স্থানে দায়েরায়ে জিল্লিয়া শেষ হয় এবং দায়েরায়ে আসলের মাকাম শুরু হয়। আফরাদগণের একটি দল এই মাকামে উন্নীত হইবার যোগ্য। আবার কোনো কোনো কুতুব আফরাদগণের মহব্বতে এই বিশেষ মাকামে উন্নীত হন। কিন্তু তাহারা মূল বা আসলকে প্রতিবিম্বিত রূপে অবলোকন করেন। আসলে পৌঁছানো বা আসলকে জেল্লিয়াত হইতে পৃথক করা কেবলমাত্র আফরাদগণেরই বৈশিষ্ট্য।"
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব 'আকতাব'-এর মাকামে উন্নীত হইলে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তাহাকে কুতুবে এরশাদের ভূষণে ভূষিত করেন। অতঃপর আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহে আরও উচু মাকামে উন্নীত হন এবং এক সময়ে মিশ্রিত প্রতিবিম্বের আসলে উপনীত হইয়া ফানা ও বাকা লাভ করেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নেছবতে ফরদিয়াত তদীয় পিতার নিকট হইতে হাছিল করেন, পরে কুতুবিয়াতের মাকামসমূহ অতিক্রম করার কালে হযরত খিজির (আঃ) এর রূহানী সাহায্যে "এলমে লাদুন্নী" হাছিল করেন। পরে উক্ত মাকাম অতিক্রম করিয়া আরও উচ্চ মাকামে উন্নীত হইয়া স্বীয় হকিকতের মাধ্যমে এলেম বা জ্ঞান লাভ করিতে থাকেন।
জ্ঞানের উচ্চতর সীমা সম্বন্ধে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, নাফসে মোৎমাইন্ন্যা আলমে আরোওয়াহ বা রূহের জগতের সহিত সম্পর্কযুক্ত। জড় জগতে আকল বা জ্ঞান তাহার প্রতিনিধি হয়। এমতাবস্থায় দুনিয়ার জিন্দেগীর দুঃশ্চিন্তা হইতে সে মুক্ত হয়, কারণ ঐ নাফস সর্বাবস্থায়ই আল্লাহতায়ালার উপর রাজী থাকে। অতঃপর আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে নূর লাভ করিয়া সে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে।
হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বলেন-এলেম ও মারেফাত নিজ উৎস হইতে জারী হয়-কালব তাহা গ্রহণ করে। কালবের এই এলেম ও মারেফাত গ্রহণ করার যোগ্যতা নির্ভর করে ঐ নাফসের অধিকারীর আকল বা জ্ঞান বা বৃদ্ধির উপর। তবে কালবকে হকিকতে জামীয়া কালবিয়া বা কালবের মূল সত্ত্বার একত্রকারী বলা হয়। কাজেই কালবও আসলের গুণে গুণান্বিত। তাই কালবের গ্রহণ ক্ষমতা রূহের ক্ষমতার অনুরূপ।
বিজ্ঞাপন
আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের উপর যে দায়েমী তাজাল্লী পতিত হয় তাহার অনুভূতি সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) সহ তরীকার বিভিন্ন মাশায়েখগণ বলেন-
আকলে মায়াদের উপর এমন একটা সময় আসে যখন সে নাফসে মোৎমাইন্ন্যার প্রতিবেশী হইতে চায়। এই অবস্থায় 'আকলে মায়াদ শরীরকে পূর্ণভাবে ত্যাগ করে। তখন জ্ঞানের ও স্মরণের যোগ্যতা এই কালব রূপ জ্ঞান কেন্দ্রের থাকে। যাহাদের এই রূপ কালব আছে তাহারাই কেবল এই কথার নিশানা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। যাহারা ঐ কালব লাভ করেন, তাহাদের দেহের আগুনের অংশ শান্ত হইয়া যায়। "আনা খায়রুম" বা আমি শ্রেষ্ঠ এই বোধ আর থাকে না। এই রূপ অবস্থাতেই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, "আমার শয়তান মুসলমান হইয়া গিয়াছে।" শরীরের আগুনজাত বিদ্রোহ ভাব শান্ত হইলে হাকীকী ইসলামের গুণ লাভ হয়।
মানব দেহের এক লতিফা বাতাস। বাতাসও রূহের সহিত সম্পর্কযুক্ত। ছালেক যখন বাতাসের ফানার মাকামে আসে তখন অধিকাংশ ছালেকেরই একটি ভুল মোশাহেদা বা দর্শন হয়। তাহারা বাতাসকেই খোদা বলিয়া বিবেচনা করেন-তবে তাহা স্বল্প সময়ের জন্য। পানি মানব দেহের অপর এক লতিফা। পানি যাহা হকিকতে জামেয়ায়ে কালবিয়া বা কালবের মূল সত্ত্বার একত্রীকরণের সহিত সম্পর্কযুক্ত। এই জন্য ইহার ফয়েজ সকল কিছুর উপর পৌঁছে। যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান-"আমি পানি হইতে সকল বস্তুর জীবন দান করিয়াছি।"
মানব দেহের অপর এক লতিফা মাটি। বস্তুতঃ মাটি শরীরের প্রধানতম অংশ। মাটির নিজ স্বভাবের কদর্যতা বা নীচুতা আল্লাহতায়ালার জাতি দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা দূর হয়, উহা পরিপূর্ণ পবিত্রতা হাছিল করে। মাটির পবিত্রতা দেহের পরিপূর্ণ পবিত্রতার নিশ্চয়তা দান করে। মাটির এই প্রভাবের কারণ-দেহের চারটি উপাদানের মধ্যে মাটির পরিমাণ সব চেয়ে বেশী। দেহের প্রতি অংশ বস্তুত মাটিরই অংশ। আর এই কারণেই এই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল সমস্ত জাহানের কেন্দ্র বিন্দু এবং পৃথিবী নভোমন্ডলের কেন্দ্র স্থল।
রূহ সায়েরে ইল্লাল্লাহ বা খোদা সন্ধানে পরিভ্রমণ বা উরুজের সময়ে সিফাতে এরাদতের সহিত মিলিত হয়। ইহাই রূহের ফানার মাকাম। তবুও দেহের সহিত রূহের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। অতঃপর যখন শরীরের বিভিন্ন লতিফা যেমন ছের, খফি, আখফা, নাফছ, আব, আতস, খাক ও বাদ এবং আকল সহ আল্লাহতায়ালার প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগী হয়, তখন দেহের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে। এমতাবস্থায় শরীর উদিয়াত বা দাসত্বের মাকামে পৌছে।
এই অবস্থায় রূহ আল্লাহতায়ালার দরশনের স্থানে স্থিতি লাভ করে। অন্য দিকে আব, আতস, খাক, বাদ সহ শরীরও অনুসরণের মাকামে স্থিতি লাভ করে। ইহাই ফারাক বাদআল জামেয়া, অর্থাৎ একত্রিত হবার পর বিচ্ছিন্ন হবার মাকাম। ইহার পর রূহ আলমে খালক বা সৃষ্টি জগতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
আল্লাহতায়ালার সহিত মিলিত হবার পর এই প্রত্যাবর্তন যাহা আফরাদগণ ও কুতুবুল এরশাদগণ লাভ করেন, তাহার উদ্দেশ্য খাল্ক বা সৃষ্টিকে আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতের দাওয়াত প্রদান-যাহা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ও পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) করিয়া গিয়াছেন। সরোয়ারে কায়েনাত, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর হেদায়েতের নিদর্শন ছিলঃ কিতাব, ওহী ও মোজেযা। বর্তমান কালের কুতুবুল এরশাদ ও আফরাদ বা কামালাতে নবুয়তের উচ্চ স্তরের ওলীগণ মানুষকে যে আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে প্রত্যাবর্তিত হইয়া আল্লাহতায়ালার দিকে হেদায়েতের দাওয়াত দান করিতেছেন তাহার প্রমাণ হইল-তাহার পবিত্রতা লাভকারী কালবে লব্ধ এলহাম এবং আল্লাহতায়ালার নূর হইতে লব্ধ "এলমে লাদুন্নী” এবং কুরআন মজীদের রহস্য জ্ঞাত হইবার মাধ্যমে লব্ধ অলৌকিক কর্মকান্ড। আল্লাহতায়ালার জাতে পৌছাইয়া তথা হইতে প্রত্যাবর্তনকারী ওলীগণের মধ্যে যাহারা কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা লাভ করিয়া হেদায়েতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন-তাহাদের মহত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, কুতুবে এরশাদ এবং ফরদিয়াতের অধিকারী (যাহা তিনি নিজে ছিলেন) ওলী খুব কমই দেখা যায়। এই অন্ধকার দুনিয়া তাহার বিকাশের নূরে আলোকিত হয়। তদীয় এরশাদ ও হেদায়েতের নূর সমস্ত জগতকে আলোকিত করে। আরশ থেকে ফরশ পর্যন্ত যে কোনো ব্যক্তি যদি মারেফত, হেদায়েত, ঈমান ও রুশদ লাভ করে, তবে তাহা তাহার অছিলাতেই করিয়া থাকে। তাহার মধ্যস্থতা ব্যতীত কেহই আত্মিক সম্পদ লাভকরে না। তাহার হেদায়েতের নূর বিশাল বারিধির মত পৃথিবীর চতুর্দিকে বিস্তার করিয়া থাকে। যে ব্যক্তি সেই বুযুর্গের এত্তেবা করেন, মহব্বত ও সহব্বত লাভ করেন, অথবা ঐ মহান সাধক যদি কোনো মুরীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করিয়া নেক নজর দান করেন-তাহার বেলায়েতের দুয়ার খুলিয়া যায়। বস্তুত বেলায়েত বা কামালাত যদিও আল্লাহতায়ালার দান, তথাপিও কুতুবুল এরশাদের নেক নজর দ্বারাই ছালেকগণ তাহা লাভ করেন। বস্তুতঃ নবী (আঃ) গণের পরবর্তী যুগে এই কুতুবুল এরশাদ এবং ফরদিয়াতের অধিকারীগণই ধরাধামে আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি ও খলিফা হিসাবে আল্লাহতায়ালার নিকট বিবেচিত হন। তাই তাহাদের নেক দৃষ্টি দ্বারা যে রহমত লাভ সম্ভব হয়-তাহাদের নেক দৃষ্টি ব্যতীত বহু যুগের সাধনা দ্বারাও তাহা লাভ করা সম্ভব হয় না।
হে জাকেরান! বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত হইল খোদা নিদর্শক পীর বা আফরাদগণের আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ হইতে প্রাপ্ত স্বীকৃতিপত্র। এই স্বীকৃতিপত্র ব্যতীত আল্লাহর পথে আহ্বানের যোগ্যতা কাহারোও নাই। এমন যোগ্যতা সম্পন্ন ওলী-আল্লাহ পৃথিবীতে খুব কমই আসিয়াছেন। আমার পীর হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব উক্ত দুই মাকামের গুণ ও জ্ঞানসম্পন্ন সাধক ছিলেন। তাহারই নির্দেশমত আমি তোমাদেরকে তালিম প্রদান করিতেছে। তোমরা যদি উক্তরূপ যোগ্যতা অর্জন করিতে চাও, তবে পীরের খেদমত করিয়া তাহার স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা কর। পীরের স্বীকৃতি পাইলে আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি পাইবে। তোমাদের জীবন ধন্য হইবে। তোমরা সফলকাম হও। এই দু'আ করিয়া এ নসিহত এখানেই শেষ করিতেছি। আমীন!








