কামালাতে নবুয়তের মর্যাদাধারী সাধকবর্গের প্রদর্শিত পথই কল্যাণের পথ

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কামালাতে নবুয়তের মর্যাদাধারী সাধকবর্গের প্রদর্শিত পথই কল্যাণের পথ। এমন সাধকবর্গই সাধারণ মানুষের দেহস্থিত আদামাতের বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করাইয়া তাহাদেরকে ইনসানে কামেলের মর্যাদায় উন্নীত করিতে পারেনঃ
বিজ্ঞাপন
কামালাতে নবুয়ত খোদাতত্ত্বজ্ঞান চর্চার অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; কারণ ইহা আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতের সহিত যুক্ত। মানুষকে আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতের জন্য আল্লাহপাক নবী ও রাসূল (আঃ) গণকে দুনিয়াতে প্রেরণ করিয়াছেন। যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদের সূরা মায়েদাতে ফরমান, "অনন্তর আমার প্রেরিত পুরুষগণ অবশ্যই মানব জাতির জন্য সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি লইয়া আগমন করিয়াছেন। "কামালাতে নবুয়ত”- অর্থ নবুয়তের পূর্ণতা। যাহারা নবী বা প্রেরিত পুরুষ তাহারা সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা করেন-ইহা সত্য; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তাহারা মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি। যেমন কলেমা শরীফের দ্বিতীয়াংশে বলা আছে, "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" অর্থাৎ মুহাম্মদ আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহতায়ালা মানব সৃষ্টির দুইটি প্রধান উদ্দেশ্য ব্যক্ত করিয়াছেন-একটি হইল,
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
অর্থাৎ- নিশ্চয়ই পৃথিবীতে আমি আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করিব।
বিজ্ঞাপন
আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থাৎ- আমি জ্বিন ও ইনছানকে আমার এবাদত ভিন্ন অন্য কাজের জন্য সৃষ্টি করি নাই।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার প্রথম উদ্দেশ্য নবী (আঃ) গণের সৃষ্টি সংক্রান্ত। আদম (আঃ) কে সষ্টি করিবার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করিয়া আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের নিকট ইহা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। আর মানুষ সৃষ্টি সংক্রান্ত আল্লাহতায়ালার দ্বিতীয় উক্তি সকল মানুষের সহিত সম্পর্কযুক্ত।আল্লাহতায়ালার এই দুইটি উক্তি হইতে বোঝা যায়ঃ সকল মানুষই আল্লাহতায়ালার এবাদতের জন্য সৃষ্টি; কিন্তু সকলেই আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি নহেন। তাই সকল মানুষের হেদায়েত বা যে কোনো মানুষের প্রদর্শিত পথই গ্রহনযোগ্য নহে। আল্লাহতায়ালা বলেন "সকল কল্যাণ তাহার নিকট হইতে আসে-আর সকল অকল্যাণ আসে মানুষের আদামাত হইতে।" তাই আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধি দ্বারা প্রদর্শিত পথই আল্লাহতায়ালা বর্ণিত কল্যাণের পথ। আর যাহারা তাহার প্রতিনিধি নহেন, তাহাদের প্রদর্শিত পথ স্থায়ী কল্যাণের পথ বা সর্ব মানুষের কল্যাণের পথ নহে। যাহারা আল্লাহপাকের প্রতিনিধি তাহারা আল্লাহতায়ালার নিদর্শন সহ পথ প্রদর্শন করেন। তাই তাহা মঙ্গলের পথ। যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদে "সূরা মুহাম্মদে" এরশাদ করেন-"যাহারা বিশ্বাসী, সৎকর্ম করে এবং মুহাম্মদের উপর অবতীর্ণ বিষয় তাহার রব হইতে আগত বলিয়া মনে করে, তিনি তাহাদের মন্দ কার্যগুলি ক্ষমা করিবেন এবং কল্যাণ দান করিবেন।"
আবার সূরা আহযাবে হযরত (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক ফরমান-"হে নবী! আমি আপনাকে স্বাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা, ভয় প্রদর্শনকারী এবং খোদার নির্দেশমত তাহার দিকে আহ্বানকারী ও একটি প্রোজ্জ্বল আলোক বর্তিকা স্বরূপ পাঠাইয়াছি।"
সূরা কাহাফে আল্লাহ বলেন, "হে রাসূল! আপনি বলুন, আমিতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ-তবে আমার উপর অহী নাজিল হয়।" কুরআনপাকে আল্লাহপাক হযরত খিজির (আঃ) প্রসংগে এরশাদ করেন, আমি তাহাকে (খিজিরকে) "এলমে লাদুন্নী" বা বিশেষ হেকমত দান করিয়াছি।
বিজ্ঞাপন
কুরআন মজীদ হইতে উদ্ধৃত উপরোক্ত আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করিলে বোঝা যায় যে, যাহারা হেদায়েতের জন্য আল্লাহ দ্বারা নির্বাচিত হন; তাহাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমনঃ-
(১) তাহারা আল্লাহতায়ালার দ্বীন বা ধর্ম প্রচার করেন।
(২) এই দ্বীন তাহারা ওহী মারফত আল্লাহতায়ালার দ্বারা প্রাপ্ত হন-ইহা তাহাদের নিজস্ব কোনো মত বা পথ নয়।
বিজ্ঞাপন
(৩) এই দ্বীন বা ধর্ম অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ যাহারা পালন করেন, নবী ও রাসূল (আঃ) গণ তাহাদের শান্তির সুসংবাদ দান করেন।
(৪) আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধের প্রতি তথা দ্বীন বা শরীয়তের প্রতি সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট ও আল্লাহতায়ালার উপর আস্থা স্থাপনের জন্য নবী ও রাসূল (আঃ) গণ মোজেযা প্রদর্শন করেন।
নবী (আঃ) গণের এই বৈশিষ্ট্য সমূহের মধ্যে আল্লাহতায়ালার ওহী কাহারা প্রাপ্ত হন-কি কি গুণ থাকিলে মানুষের নিকট আল্লাহতায়ালার ওহী আসে এবং কেন ও কি প্রকারে নবী (আঃ) গণ মোজেযা প্রদর্শন করেন সে সম্পর্কে পূর্ববর্তী নসিহতে ব্যক্ত করা হইয়াছে। বর্তমান অংশে তাই সেই সকল বিষয়ের পুনরাবৃত্তি হইল না। বর্তমান অংশে নবী (আঃ) কেন আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বকারী হইলেন এবং তাহাদের দ্বারা যে দ্বীন আল্লাহ প্রচার করেন, সেই দ্বীন মানুষের জন্য কি সুসংবাদ দান করে এবং নবী (আঃ) গণের পর যাহারা ওয়ারেছাতুল আম্বিয়া তাহারা কি ভাবে নবী (আঃ) গণের গুণ অর্জন করেন এবং তাহারা মানুষের জন্য কি কল্যাণ ও শান্তি আনয়ন করেন তাহার কিঞ্চিত ব্যাখ্যা করা হইতেছে।
বিজ্ঞাপন
হযরত আলী (কঃ) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একদিন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ আনসারী (রাঃ) আরজ করিলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের বলুন, সর্বপ্রথম আল্লাহ কোন জিনিষ সৃষ্টি করিয়াছেন। হযরত নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করিলেন-আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম এক হাজার বৎসর ধরিয়া আমার নূর সৃষ্টি করিলেন। আমার সেই নূর আল্লাহর কুদরতে আল্লাহরই মর্যাদা প্রদর্শন করে এবং আল্লাহতায়ালার তাছবীহ, তাহলীল ও তাহার সমীপে সেজদায় রত থাকে। এই নূরই নূরে মুহাম্মদী।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত অপর এক হাদীস শরীফে উক্ত আছেঃ ঐ নূরে মুহাম্মদী বারো হাজার বছর এবাদত বন্দেগীতে রত ছিল। অতঃপর আল্লাহতায়ালা এই নূরকে চারিভাগে বিভক্ত করিয়া এক ভাগ দ্বারা আরশ মজীদ সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয়ভাগ দ্বারা কলম সৃষ্টি করেন। ততীয় ভাগ দ্বারা জান্নাত সৃষ্টি করেন। চতুর্থভাগ দ্বারা আলমে আরোওয়াহ বা আত্মার জগৎ সৃষ্টি করেন ও সমগ্র বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করেন। এই চারিভাগের একভাগ অর্থাৎ যাহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার আরশ মজীদ সৃষ্টি করা হইয়াছে-তাহার একটি অংশ দ্বারা আমার প্রিয় ও বিশেষ সম্মানিত রূহ সৃষ্টি করা হইয়াছে। নূরে মুহাম্মদী সম্পর্কে শরীয়তে আরও বলা আছে-ইহা আল্লাহতায়ালার জাত পাকে উত্থিত প্রেমের নূর।" আল্লাহতায়ালাও রাসূলে করীম (সাঃ) প্রসংগে বলেন-
لَوْ لاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- হে মুহাম্মদ (সাঃ)! আমি যদি আপনাকে সৃষ্টি না করিতাম, তাহা হইলে আসমান, জমিন তথা কিছুই সৃষ্টি করিতাম না।
আল্লাহতায়ালার এই বাণী এবং হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূরের এই পবিত্র মর্তবা, সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর উপর তাহার প্রাধান্য-আল্লাহতায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য হইবার প্রশ্নে তাহার একক গুরুত্বেরই ইংগিত বহনকারী। আর ইহাও বোঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা এক লক্ষ ২৪ হাজার বা মতান্তরে দুইলক্ষ ২৪ হাজার পয়গম্বর সৃষ্টি করিলেও কেন রাসূলে পাক (সাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য নবী (আঃ) গণের উপর নির্ধারিত হইয়াছে। কেন আল্লাহপাক তাহাকে নবীদের মধ্যে তথা সমস্ত সৃষ্টি জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান দান করিয়াছেন। বস্তুতঃ সমগ্র নবী (আঃ) তাঁহার নূরেরই অংশ। আর নবী করীম (সাঃ) এর পবিত্র নূরের যে অংশ দ্বারা আল্লাহপাকের আরশ নির্মিত-সেই অংশ দ্বারাই তাঁহার পবিত্র রূহ মোবারক সৃষ্ট; যাহা অন্য কোনো নবী (আঃ) এর বেলায় ঘটে নাই। হযরত নবী করীম (সাঃ) কেই আল্লাহপাক মেরাজ শরীফে তাহার জাতের জগতে উন্নীত করিয়াছিলেন-যাহা অন্যান্য নবী (আঃ) দের ক্ষেত্রে ঘটে নাই। তাই আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় লাভের জন্য রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহব্বত, তদীয় এত্তেবা ও অনুসরণই একমাত্র পথ। রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমানঃ
خُلِقْتُ مِنْ نُوْرِ اللَّهِ وَ خُلِقَ كُلُّ شَيْ مِنْ نُوْرِى
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- আমি আল্লাহতায়ালার নূর দ্বারা সৃষ্ট; আর আমার নূর দ্বারা সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টি করা হইয়াছে।
অতঃপর তিনি আরও বলেন, এই রূপে আসমান-জমিন, আরশ-কুরছি, কলম সৃষ্টির পরে আল্লাহপাক কলমকে হুকুম করেন, আরশের উপরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-এই কলেমা লিখিতে। কলম প্রথমে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু-এই পর্যন্ত লিখিয়া থামিয়া আরজ করিল, হে আল্লাহ! আপনি একক ও অতুলনীয় সত্ত্বা, আপনার নামের পার্শ্বে ইহা কোন মহান সত্ত্বার নাম? আল্লাহপাক হইতে তখন এরশাদ হইলঃ ইহা আমার সম্মানিত বন্ধুর নাম। তুমি "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" লেখ। আদেশ শুনিয়া কলম ভয়ে কাঁপিতে থাকিল। কাঁপিতে কাঁপিতে কলমের আগা ফাটিয়া গেল। কলম আল্লাহপাকের নির্দেশ অনুসরণ করিল। আসমান, জমিন, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, জান্নাত প্রভৃতি সৃষ্টি শেষ করিবার পর আল্লাহপাক ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি জমিনে খলিফা প্রেরণ করিতে চাই।" ফেরেশতারা বলিয়া উঠিলেন, আপনি কি এমন কিছু সৃষ্টি করিবেন যাহারা জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করিবে? আপনার এবাদতের জন্যতো আমরাই রহিয়াছি। আল্লাহ বলিলেন, "আমি যাহা অবগত আছি তাহা তোমরা জান না।" ইহার পর তিনি জীব্রাইল (আঃ) কে হুকুম করিলেন, "দুনিয়া হইতে এক টুকরা মাটি লইয়া আস।" আল্লাহতায়ালার নির্দেশে হযরত জীব্রাইল (আঃ) জমিনে আসিলেন। তিনি দুনিয়া হইতে মাটি লইতে চাহিলে জমিন তাহাকে মাটি দিতে রাজি হইল না। জমিন বলিল-এই মাটি হইতে খলিফা প্রস্তুত হইলে তাহার বংশধরগণ পৃথিবীতে রক্তপাত ঘটাইয়া আল্লাহতায়ালার শাস্তির যোগ্য হইবে। আমি মাটি অতিশয় নিকৃষ্ট বস্তু-আমি আল্লাহতায়ালার শাস্তির যোগ্য হইতে পারিব না। জীব্রাইল (আঃ) মাটির এই কথা শুনিয়া ফিরিয়া গেলেন। ইহার পর মিকাঈল (আঃ) ও ইস্রাফিল (আঃ) আসিলেন। তাহাদেরও জমিন মাটি না দিয়া ফিরাইয়া দিল। তৎপর আসিলেন, আজরাইল (আঃ)। জমিনের কাছে মাটি চাহিলে জমিন তাহাকেও মাটি দিতে অস্বীকার করিল। কিন্তু আজরাইল (আঃ) বলিল, তুমি যে মহান প্রভু আল্লাহতায়ালার শাস্তির ভয় পাইতেছ; আমিও সেই প্রভু আল্লাহতায়ালার হুকুমে মাটি লইতে আসিয়াছি। আমি ইহা লইয়াই যাইব। ইহার পর আজরাইল (আঃ) হাত বাহির করিয়া সমগ্র জমিন হইতে মাটি কুড়াইয়া লইয়া আল্লাহতায়ালার নিকট হাজির হইলেন, ইহা হইতে আদম (আঃ) এর দেহ তৈরী করা হইল। অতঃপর হযরত আদম (আঃ) এর রূহ আল্লাহপাক সৃষ্টি করিলেন-যে প্রসংগে আল্লাহপাক ফরমান-আমি তাহার মধ্যে আমার রূহ ফুকিয়া দিয়াছি। এই রূহ আদম (আঃ) এর দেহে ঢুকিয়া অন্ধকারের জন্য ফিরিয়া আসিল। অতঃপর রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর বা রূহ হইতে একটি নূরের স্ফুলিংগ হযরত আদম (আঃ) এর দেহে প্রবেশ করিল। ইহাতে হযরত আদম (আঃ) এর দেহ নূরানী বা আলোকিত হইয়া গেল। আল্লাহপাকের নির্দেশে আবার তদীয় রূহ পুনরায় হযরত আদম (আঃ) এর মাটির দেহে প্রবেশ করিল। এইবার নূরে মুহাম্মদীর প্রেমে হযরত আদম (আঃ) এর রূহ তাহার দেহে অবস্থান করিল। হযরত আদম (আঃ) এর রূহ মোবারক তাহার দেহের ভিতরে অবস্থান লইবার পর তদীয় দেহে প্রাণের স্পন্দন আসিল-তিনি চক্ষু মেলিয়া চাহিলেন। তিনি আল্লাহতায়ালার ফুকিয়া দেয়া রূহের গুণে সমস্ত বস্তুর পরিচয় জানিতে পারিলেন। হযরত আদম (আঃ) এর এই জ্ঞান বা হেকমত যাহা আল্লাহতায়ালার ফুকিয়া দেয়া রূহের গুণে লাভ হইয়াছিল-তাহা তাহার মর্যাদা ফেরেশতাদের উপরে লইয়া গেল। তিনি খলিফার মর্যাদার আসনেও বসিলেন। এই যে আল্লাহতায়ালার ফুকিয়া দেয়া রূহ-তাহা তাহার দেহে স্থান লইয়াছিল হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর রূহ হইতে আগত একটি নূরের স্ফুলিংগের আকর্ষণে। আল্লাহতায়ালা যে রূহ হযরত আদম (আঃ) এর দেহে ফুকিয়া দিয়াছিলেন তাহাকে খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী সাধকগণের মধ্যে কেহ "রূহুল কুদ্দুস” কেহ বা রূহে হাকীকী বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। আর সেই "রূহুল কুদ্দুস"-যাহার গুণে হযরত আদম (আঃ) সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী হইয়াছিলেন-তাহা লাভ হইয়াছিল হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর দয়া ও মহব্বতের মাধ্যমে-যাহার প্রকাশ ঘটিয়াছিল রূহে মুহাম্মদী বা নূরে মুহাম্মদীর একটি নূরের স্কুলিংগ হযরত আদম (আঃ) এর দেহে প্রবেশের মাধ্যম। তাই বলা যায় আল্লাহতায়ালার খলিফা বা প্রতিনিধির গুণ হযরত আদম (আঃ) লাভ করিয়াছিলেন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রেমের দ্বারা।
যাহা হউক, ইহার পর রোজ আজলের দিনে হযরত আদম (আঃ) এর পৃষ্ঠদেশ হইতে একে একে আদম সন্তানদের রূহ বাহির করা হইল। ঐ সকল রূহ দ্বারা সমস্ত আরওয়াহ জগত ভরিয়া গেল। ঐ রূহ সমূহের সর্ব প্রথমে দাঁড়াইলেন হযরত নবী করীম (সাঃ) এর রূহ মোবারক এবং তাঁহাকে অনুসরণ করিয়া ডান দিকে দাঁড়াইয়া গেলেন নবী (আঃ) গণের রূহ: তাহাদের অনুসরণ করিয়া দাঁড়াইলেন ওয়ারেছাতুল আম্বিয়াগণের রূহ। আর হযরত আদম (আঃ) এর বাম দিকে যাহারা রহিল তাহারা হইল অবিশ্বাসীগণের রূহ।
বিজ্ঞাপন
অতঃপর আল্লাহপাক তাহাদের নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন-'আমি কি তোমাদের প্রভু নই?' তাহারা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিল, "বালা" বা বেশখ তুমি আমাদের প্রভু। অতঃপর তাহাদের উপর আদেশ হইল তোমাদের 'রব' বা প্রভুকে সেজদা কর। তাহাদের মধ্যে মোমিনগণের রূহসমূহ প্রথম নির্দেশেই এবং যাহারা মোমেন নহে-তাহারা দ্বিতীয় নির্দেশে সেজদা করিল। মোমেনগণ উভয় নির্দেশে সেজদা করিলেন। তাই নামাজের সময় প্রতি রাকাতে দুই বার সেজদা করিবার নিয়ম হইয়াছে। অতঃপর আল্লাহতায়ালা নবী (আঃ) গণের নিকট হইতে শপথ লইলেন। আল্লাহপাক নবী (আঃ) দিগের নিকট হইতে শপথ গ্রহণের সময় বলিলেন "আমি কিতাব ও হেকমত যাহা কিছু দান করিয়াছি তাহা লইয়া তোমাদের মধ্য হইতে যদি কোনো রাসূল আসেন এবং তোমাদের কাছে যাহা আছে তাহা সত্য বলিয়া মানিয়া লন, তবে তোমরাও তাহা সত্য বলিয়া মানিয়া লইও। অতঃপর আল্লাহতায়ালা আদম (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন তোমরা কি তাহা মানিয়া লইলে? আদম (আঃ) ও অন্যান্য নবীগণ শপথ করিলেন-আমরা তাহা মানিয়া লইলাম। আল্লাহ বলিলেন, তোমরা এখন পরস্পরের সাক্ষী হও এবং আমিও তোমাদের সাক্ষী হইলাম। এই রূপে হযরত আদম (আঃ) হযরত শীষ (আঃ) এর উপর, হযরত শীষ (আঃ) হযরত আদম (আঃ) এর উপর সাক্ষী হইলেন। হযরত ইদ্রিস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ) এর উপর সাক্ষী হইলেন। হযরত নুহ (আঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উপর সাক্ষী হইলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) হযরত ইসমাইল (আঃ) এর উপর সাক্ষী হইলেন। হযরত ইসমাইল (আঃ) হযরত ইসাহাক (আঃ) এর উপর সাক্ষী হইলেন। হযরত ঈসা (আঃ) হযরত মুছা (আঃ) এর উপর এবং হযরত মুছা (আঃ) হযরত ঈসা (আঃ) এর উপর সাক্ষী হইলেন। হযরত ঈসা (আঃ) সহ সকল নবী (আঃ) গণকে সমবেত ভাবে আল্লাহপাক বলিলেন- "তোমরা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর রেসালতের জন্য সাক্ষী থাক। তোমরা নিজ নিজ জাতিকে উপদেশ দান করিবে; তাহারা যেন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর রেছালতে বিশ্বাস করে এবং তাহার দ্বীন প্রচারে সাহায্য করে।” এই ভাবে আল্লাহতায়ালার নিকট সকল নবী (আঃ) গণ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর রেসালতকে মানিয়া লওয়ার অংগীকার করিলেন।
কুরআন মজীদে বর্ণিত আছে, আল্লাহতায়ালার 'ওহী' অনুযায়ী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) মক্কায় অবস্থান কালে তদীয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে লইয়া "কাবা গহ" পুনঃ নির্মান করিলেন। কাবা গৃহ নির্মানের পর আল্লাহতায়ালার কাছে মিলিত ভাবে মুনাজাত করিলেন-হে আমাদের প্রভু! আমাদের উভয়কেই তোমার অনুগত কর এবং আমাদের বংশ দিগের মধ্য হইতে একটি মহা জাতি সৃষ্টি কর, আমাদিগকে তোমার এবাদত পদ্ধতি শিক্ষা দাও এবং আমাদের প্রতি করুণা কর। নিশ্চয়ই তুমি দয়াময়। হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের বংশধরগণের মধ্যে হইতে একজন রাসূল প্রেরণ কর যিনি তাহাদের নিকট তোমার বাণী প্রচার করিবেন, কিতাব শিক্ষা দেবেন, জ্ঞান দান করিবেন এবং তাহাদিগকে শুদ্ধ করিবেন। নিশ্চয়ই তুমি শক্তিমান ও জ্ঞানী। (সূরা বাকারা)। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ) এর মুনাজাত আল্লাহতায়ালা কবুল করিয়াছিলেন এবং হযরত ইসমাইল (আঃ) এর বংশেই হযরত নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করিলেন।
হযরত আদম (আঃ) এর মধ্যে যে নূরে মুহাম্মদী ছিল তাহা হযরত আদম (আঃ) হইতে শিষ (আঃ); এই রূপে হযরত ইউনুস (আঃ), কাইনান, মহলিল, ইয়ার্দ, হযরত ইদ্রিস (আঃ), মাতুশালাখ, লমক, হযরত নূহ (আঃ), শাম, আরকায়শাদ, হযরত সালেহ (আঃ), হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ) প্রমুখ হইয়া হযরত ইসমাইল (আঃ) এর সত্তরতম পুরুষে আসিয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর মক্কা মোয়াজ্জামায় প্রকাশিত হইল-যে স্থানে প্রথমে হযরত জীব্রাইল (আঃ) আসিয়া হযরত আদম (আঃ) এর দেহ গড়িবার জন্য জমিনের নিকট মাটি চাহিয়াছিল ও যে স্থানে হযরত আদম (আঃ) এর তওবা কবুল হইয়াছিল এবং যে স্থানে হযরত আদম (আঃ) সপ্তম আসমানে অবস্থিত ফেরেশতাদের কাবার অনুরূপ "বায়তুল্লাহ” তৈরী করিয়াছিলেন। হযরত আদম (আঃ) হইতে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) পর্যন্ত যে বংশ তালিকা হযরত ইমাম ইসাহাক (রঃ) তুলিয়া ধরিয়াছেন এবং তাহা হইতে কবি গোলাম মোস্তফার "বিশ্ব নবী" নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হইয়াছে-তাহাদের মধ্যে যাহারা নবী ছিলেন তাহারা হইলেন হযরত আদম (আঃ), হযরত শীষ (আঃ), হযরত ইউনুস (আঃ), হযরত ইদ্রিস (আঃ), হযরত নুহ (আঃ), হযরত ছালেহ (আঃ), হযরত আইয়ুব (আঃ), হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত ইসমাইল (আঃ) ও হযরত ঈছা (আঃ)। এই ভাবে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর পৃথিবীতে আবির্ভূত ও প্রকাশিত হইল।
বিজ্ঞাপন
হযরত রাসুলে করীম (সাঃ) তেইশ বৎসর যাবৎ নবুয়ত জীবনে যে দ্বীন প্রচার করেন তাহার নাম ইসলাম, যে কিতাব তিনি আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে ওহী মারফত প্রাপ্ত হন তাহার নাম কুরআন। তাহার নবুয়ত জীবনের আধ্যাত্মিক চরম উন্নতি সম্পর্কে শরীয়তে যাহা প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা হইল মহাপবিত্র মেরাজের রজনীতে আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত মিলন। ইতিপূর্বে কোনো নবী (আঃ) গণের মধ্যে কেহ আল্লাহতায়ালার জাতের নিবিড় দরশন লাভ করেন নাই। হযরত মুসা (আঃ) তুর পাহাড়ে যাহা দেখিয়াছিলেন-তাহা আল্লাহতায়ালার 'নূর'। হযরত মুসা (আঃ) এর সহিত আল্লাহপাকের কথোপকথোন হইয়াছে; কিন্তু আল্লাহতায়ালার জাতপাকের তেমন নিবিড় সান্নিধ্য তিনিও লাভ করেন নাই। কুরআন মজীদে সূরা নাজমে বর্ণিত আছে "মুহাম্মদকে শ্রেষ্ঠতম শক্তিমান শিক্ষা দান করিয়াছেন। তাহাকে আকাশের উচ্চতম প্রান্তে উন্নীত করা হইয়াছিল। অবশেষে নিকটে আসিয়া ঝুঁকিয়া পড়িল-তখন দুই ধনুক কিম্বা তার চেয়েও কম ব্যবধান ছিল। অতঃপর তিনি নিজ বান্দাকে যাহা বলিবার তাহা বলিলেন। সে যাহা দেখিয়াছে-তাহাতে তাহার অন্তর তাহাকে ধোকা দেয় নাই। সে যাহা দেখে তাহাতে কি তোমরা সন্দেহ পোষণ কর? অথচ জান্নাতুল মাওয়ার নিকট ছিদরাতুল মুন্তাহায় সে নিশ্চিত ভাবে দ্বিতীয়বার পৌঁছাইয়া দেখিল-যাহা আচ্ছাদিত করিবার তাহা আচ্ছাদিত করিয়া রহিয়াছে। তাহার পলক পড়িল না। দৃষ্টি ধোকা দিল না। নিঃসন্দেহে সে আল্লাহতায়ালার মহান নিদর্শনাবলী দেখিল।" ইহা ছাড়া বোখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ প্রভৃতি ছহী গ্রন্থে বর্ণিত হাদীস পাকে আছেঃ তিনি মেরাজে যাইবার পথে সাত আসমান পরিভ্রমণ করেন। ইহা ছাড়াও তাহাকে আল্লাহতায়ালার মেহমান হিসেবে সকল বেহেশত ও দোযখ দেখান হয়।
হযরত আল্লামা শিবলী নোমানী (রঃ) ছাহেব তদীয় সীরাতুন্নবী গ্রন্থে কুরআন মজীদ ও হাদীস হইতে ব্যাখ্যা করিয়া রায় দিয়াছেন যে, রাসূলে করীম (সাঃ) এর মেরাজ সশরীরে হইয়া ছিল। কারণ কুরআন পাকে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাতে স্বপ্নের উল্লেখ নাই। বরং বলা আছেঃ সে যাহা দেখিয়াছে, তাহার অন্তর সে বিষয়ে ধোকা দেয় নাই। সে যাহা দেখে তাহাতে কি তোমরা সন্দেহ পোষণ কর? এই আয়াতেই বোঝা যায় যে, রাসূলে করীম (সাঃ) এর মেরাজ জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জাতপাকের দর্শন, সপ্ত আকাশ পরিভ্রমণ ও দোযখ-বেহেশত তথা সাত তবক আসমান জমিনের জ্ঞান লাভই প্রকৃত পক্ষে কামালতে নবুয়তের বা নবুয়ত গুণের পূর্ণতা। যাহারা আল্লাহতায়ালার জাত পাকের গুণ লাভ করিয়া আল্লাহতায়ালা দ্বারা নির্দেশিত হইয়া খোদাতত্ত্ব সাধনার পথে ও দ্বীনের পথে মানুষকে হেদায়েত করেন তাহারাই কামালাতে নবুয়তের অধিকারী, আর যাহারা জাত পাকের প্রেমে নিবিষ্ট থাকেন তাহারা বেলায়েতে নবুয়তের অধিকারী। মোট কথা, জাত পাকের জ্ঞান লাভ ও জাতপাক হইতে হেদায়েতের জন্য নির্দেশিত হইয়া প্রত্যাবর্তনকারীগণই শুধু কামালতে নবুয়তের গুণে গুণী। আর জাত পাকের নিকটে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহব্বত ও অনুসরণ। স্বয়ং রাসূলে করীম (সাঃ) কে কলেমা শাহাদতে "মুহাম্মাদান আব্দুহু ও রাসূলুহু" অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার আবেদ বা গোলাম এবং প্রতিনিধি-এই উভয় নামে অভিহিত করা হইয়াছে। অর্থাৎ রাসূলে করীম (সাঃ) এর গুণে যিনি গুণান্বিত হন এবং আল্লাহতায়ালার এবাদত করিতে পারেন এবং তাহাকে মহব্বত করিতে পারেন-তাহারই জন্য জাত পাকের দরশন লাভ করিবার সৌভাগ্য লাভ হইতে পারে যদি আল্লাহতায়ালা দয়া করেন।
তরিকায়ে নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদিয়ার কামেল আরেফ বা খোদাতত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী সাধকগণ কামালতে নবুয়ত হইতে উপরের দিকে চার পাঁচটি মাকাম নির্ণয় করেন যাহাতে উন্নীত হইবার পর হকিকতে মুহাম্মদীর মাকামে আল্লাহতায়ালা দয়া করিলে পৌঁছানো যায়। বস্তুতঃ হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে কামালতে নবুয়তের পূর্ণতা লাভ করিয়া প্রত্যাবর্তনের পথে কামালতে নবুয়তের স্তরে আসিয়া দ্বীনের পথে হেদায়েতের জন্য খোদাতত্ত্ব সাধক পরিপূর্ণতা লাভ করেন।
নবী রাসূলগণ ব্যতীত খোদাতত্ত্ব সাধকগণ আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সান্নিধ্য লাভ করেন কি না? এই প্রশ্ন অনেকেই করিতে পারেন। এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়ঃ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তদীয় হাদীসপাকে উল্লেখ করিয়াছেন-আমার কালবে বা বক্ষে যে জ্ঞান আল্লাহপাক দান করিয়াছেন তাহা আমি আবুবকরের বক্ষে দান করিয়াছি। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) হইতে এই জ্ঞান হযরত সালমান ফারছী (রাঃ), হযরত কাসেম বিন আবুবকর (রাঃ), হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) হইয়া হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ও তৎপরবর্তীকালে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) হইয়া আমার দয়াল পীর কেবলাজানের নিকট পৌঁছাইয়াছে: হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবও যে জাতের জগতের জ্ঞান লাভ করিয়াছেন তাহার বর্ণনা তিনি নিজেই দান করিয়াছেন।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার জাতপাক সম্পর্কে যে জ্ঞান ছুলুক ও জজবার মাধ্যমে লাভ করিয়াছিলেন তাহা তিনি এই রূপে বর্ণনা করিয়াছেন। "মাআরিফে লাদুন্নিয়া” নামক কেতাবে বলিয়াছেন-ইনায়েতে ইলাহী জাল্লা সুলতানুহু সর্ব প্রথম আমাকে তাহার প্রতি আকর্ষিত করেন যেমন মুরাদের মাকামে উপনীত ব্যক্তিদেরকে আকর্ষিত করা হয়। আমার জন্য এই জযবা সুলুকের মঞ্জিল সহজ করিয়া দেয়। বস্তুতঃ আমি প্রথম অবস্থায় হক তায়ালার জাত পাককে বস্তুর অনুরূপ প্রাপ্ত হই যেরূপ তৌহীদে ওজুদের মাকামের সূফীগণ প্রাপ্ত হয়। পরে আমি হক তায়ালাকে সমস্ত বস্তুর মধ্যে প্রাপ্ত হই, এই রূপ অবস্থায় যে তিনি বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করেন নাই। পরে আমি হক তায়ালাকে মাইয়াতে জাতীয়া হিসাবে পাই, সমস্ত বস্তুর সহিত অনুভব করি অতঃপর আমি হক তায়ালাকে সমস্ত বস্তুর পরে প্রাপ্ত হই। পরে সব বস্তুর প্রথমে পাই। অতঃপর সোবহানুহু তায়ালাকে আমি অবলোকন করি। আর সেখানে কোনো কিছুই আমার দৃষ্টিগোচর হয় নাই। ইহাই তৌহিদে শহুদী যাহা বেলায়েতের রাস্তায় প্রথম পদক্ষেপ। অতঃপর আমি বাকার স্তরে উন্নীত হই-তখন আমি হক তায়ালাকে সমস্ত বস্তুর মধ্যে এমন কি নিজের মধ্যে নিজের অনুরূপ পাই। অতঃপর সকল বস্তুর সাথে এমন কি আমার নিজের সাথে দেখি। অতঃপর সকল বস্তুর প্রথমে এমনকি আমারও প্রথমে বা অগ্রে দেখি। পরে সমস্ত বস্তুর পশ্চাতে দেখি; বরং আমি আমাকে পরে অবলোকন করি। ইহার পর আমি বস্তুই দেখিতে পাই; আল্লাহতায়ালাকে দেখিতে পাই নাই। ইহাই ছিল সর্বশেষ মাকাম। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব অতঃপর বলিতেছেন-ইহাই সর্বশেষ পদক্ষেপ যেখান হইতে প্রথম পদক্ষেপের দিকে প্রত্যাবর্তন করিতে হয়। আর এই মাকাম হইল হক সোবহানুহু তায়ালার দিকে দাওয়াত দেবার জন্য পরিপূর্ণ মাকাম। আর এই মঞ্জিলই পূর্ণাংগ হাছিল হয়। কেননা পূর্ণ দরজায় পৌঁছানোর জন্য ইহাই হাছিল করা প্রয়োজন। আর ইহাই আল্লাহতায়ালার ফজল যাহাকে ইচ্ছা তিনি ইহা দান করেন, আর ইহা তাহাদেরই ভাগ্যে লাভ হইয়া থাকে যাহারা সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ নবী (সাঃ) এর তোফায়েলের সহিত সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ নবী করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ, অনুগমন ও মহব্বত দ্বারাই তোফায়েলীর মাকামে পৌছানো যায়। আর রাসুলে করীম (সাঃ) এর মহব্বত ও এত্তেবা যে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাকেরই অনুসরণ ও মহব্বত করা; সে প্রসংগে আল্লাহ বলেন-"যে আপনার আনুগত্য করিল সে যেন আমারই আনুগত্য করিল। আর জাতি মহব্বত ও জাতি আনুগত্য বস্তুত একই মুদ্রার দুইটি পিঠ-পরস্পরের সহিত যুক্ত বা জড়িত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার যে বর্ণনা দিয়াছেন তাহা একদিকে যেমন আল্লাহতায়ালার জাত পাকের নিকটবর্তী হইবার বর্ণনা-যেমন হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মেরাজে লাভ করিয়াছিলেন; তেমনি অপর দিকে ইহা কুরআন মজীদের আল্লাহতায়ালার "ওয়াসিয়া কুরসিয়্যুহুছ ছামাওয়াতে অল আরদ” এবং হুয়াজ্জাহেরো, হুয়াল বাতেনো, হুয়াল আয়ালো, হুয়াল আখেরো-এই বর্ণনারই রূপক প্রতিফলন-যাহা মেরাজের অনুরূপ।
আমরা জানি, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর ২৩ বছরের নবুয়ত জীবনের সব চেয়ে বড় সাফল্যের দিন বা পূর্ণতার দিন হইল মক্কা বিজয়। মক্কা বিজয়ের দিন জায়েদ নামক ক্রীতদাসের সহিত একই উটের পিঠে সওয়ার হইয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মক্কা শরীফে প্রবেশ করেন। বায়তুল্লাহে পৌঁছাইয়া তিনি নিজ হস্ত মোবারকে রক্ষিত লাঠি দ্বারা মূর্তিসমূহ ভাংগিয়া ফেলেন। ইসলাম মূর্তিপূজা বিরোধী, তাই কাবা গৃহ হইতে মূর্তি ভাংগিয়া ফেলা হইয়াছে উহা যেমন সত্য; তেমনি আদম (আঃ) দেহ এবং তাহার উত্তরসুরী হিসাবে আমাদের দেহও আগুন, পানি, বাতাস ও মাটিরই তৈরী-যাহা একটি মূর্তি বিশেষ। এই মূর্তির খেয়াল খুশী ও প্রবৃত্তির দাসত্ব হইতে মুক্তি লাভ করিলেই মানব দেহে নূরে মুহাম্মদী ও আল্লাহতায়ালার ফুকিয়া দেয়া রূহ তাহার পবিত্রতা ফিরিয়া পাইয়া রূহে হাকীকী বা 'রূহুল কুদ্দুস' এর পবিত্রতা লাভ করে। তখন নাফসও রূহের গুণ লাভ করে। বেলায়েতে ছোগরার স্তরে নাফস পবিত্র কালবের গুণও লাভ করে। নাফস রূহের গুণ লাভকরিলে তখন ইহা যেমন আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিতে পায়; তেমনি নাফস সকল জিনিষের আয়না হইয়া যায়। ছালেক তখন তাহার নিজের নাফসের মধ্যে সৃষ্টির প্রতিবিম্ব দেখিতে পান। ইহা আল্লাহতায়ালার সহিত কালব, রূহ, সের, খফি আখফা ও নাফসের ফানা লাভের স্তর। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বলেন, এই স্তরের পূর্ণতা কালেবের ফানা লাভের স্তরে যখন দেহের আগুনের অংশের পরিপূর্ণ তা লাভ হয় ফানা লাভ হয়। এই স্তরে দেহের আগুনের অংশ পরিপূর্ণ দোষমুক্ত হইয়া যায়, তখন নাফস পূর্ণ শান্তি লাভ করে। ইহাই আনা ফানা বা আনা বা আমিত্ব ধ্বংস হইবার মাকাম যাহাকে কালেবের ফানা হইবার মাকাম বলা হয়। আল্লাহতায়ালার জাত পাকের সহিত নিজ সত্ত্বার অনুতে পরমাণুতে মিলনের এই যে শান্তি; তাহাই ইসলামের শান্তির তাৎপর্য। আর এই শান্তি যেহেতু ব্যক্তি জীবনে পরিপূর্ণ শান্তি আনয়ন করে অর্থাৎ ব্যক্তি তাহার প্রবৃত্তি রূপ আগুন হইতে পরিপূর্ণ মুক্তি লাভকরিয়া পরিপূর্ণ শান্তি লাভ করে-তাই ইসলামকে পরিপূর্ণ শান্তির দ্বীন বলা হইয়াছে। এখন প্রশ্ন হইতে পাওে আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের গুণাগুণ যে মানব দেহে বর্তমান থাকে-সেই মানব দেহ প্রবৃত্তির প্রবণতা হইতে মুক্তি লাভ করে কেমন করিয়া?
এই প্রসংগে সকল সূফীতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের অভিমত হইলঃ কোনো বস্তুরই স্থায়ী কোনো বৈশিষ্ট্য নাই। সকল বস্তুর মধ্যে যে সকল প্রবণতাকে আমরা তাহার নিজস্ব বলিয়া বা সহজাত বলিয়া মনে করি তাহাও তাহার নিজস্ব নহে। আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের যে নিজ নিজ প্রবণতা রহিয়াছে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় তাহাও পরিবর্তনশীল। "নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সর্ব বস্তুর উপরই ক্ষমতাবান" -কুরআন মজীদের এই উক্তি অনুযায়ী আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় সকল জিনিষেরই গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যায়। কুরআন মজীদে বর্ণিত আছে, আল্লাহপাকের হুকুমে বা ইচ্ছায় মুসা (আঃ) এর হাতের লাঠি সাপ হইয়া গেল। নীল নদের পানি দ্বিখন্ডিত হইল। আছহাবে কাহাফের তরুন যুবক তিনশত বৎসর ঘুমাইয়া রহিল। আল্লাহতায়ালা তাহাদের তিনশত বৎসর হায়াৎ দান করিলেন-এই সময়ের মধ্যে তাহাদের ক্ষুধা লাগিল না, তৃষ্ণাও পাইল না। তাহারা নিদ্রা হইতে জাগরিতও হইল না। অতঃপর তাহারা আল্লাহতায়ালার দ্বীন ভিত্তিক একজন বাদশাহের শাসনকাল দেখিতে চাহিয়াছিল-আল্লাহপাক তাহাদের তাহা নসিব করিলেন। কুরআন মজীদের উল্লিখিত ঘটনাবলী এবং 'আল্লাহপাক সর্ব বস্তুর উপর ক্ষমতাবান'-'তিনি সর্বাপেক্ষা কৌশলী'-'তাহার সিংহাসন আসমান জমিন সর্বত্র বিরাজিত'- এই আয়াতসমূহে আল্লাহতায়ালার যে ক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে তাহার উল্লেখ করিয়া খোদাতত্ত্ব জ্ঞানে সাধকগণ আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত নূরের ক্ষমতা প্রয়োগ করিয়া, মানব দেহের সকল প্রবৃত্তিকে পরিবর্তন করিয়া, আল্লাহতায়ালার জেকেরের নূর দ্বারা মানব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে পরিপূর্ণ সংশোধন করিয়া আদর্শ মানবে তৈয়ারী করিয়া দিতে পারেন। তাহারা যেমন আল্লাহপাকের নাম, গুণ ও শানের নূরে নিজেরা আলোকিত হন; তাহাদের নিকট প্রদত্ত আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা দ্বারা কামালতে নবুয়তের স্তরের সাধকগণও মানব দেহের আদামতের বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করিয়া এনছানে কামেল হযরত আদম (আঃ) যেমন সমস্ত সৃষ্টির জ্ঞানে জ্ঞানী আল্লাহতায়ালার খলিফা ছিলেন, তেমনি গুণে নিজেরা যেমন সজ্জিত হন; তেমনি অন্যদেরও সেই রূপ চরিত্র গুণে ও জ্ঞানে সজ্জিত করিয়া দিতে পারেন। মানব দেহ সৃষ্টির সকল বস্তুর মিশ্রন দিয়া তৈরী উহা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। কামালতে নবুয়তের স্তরের সাধকগণ আলাহতায়ালা প্রদত্ত যে শক্তিবলে মানব চরিত্র সংশোধন করেন তাহাকে বলে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী; আর আল্লাহ প্রদত্ত যে ক্ষমতা বলে প্রকৃতিগত ঘটনার বিপরীত কার্য ঘটান তাহাকে বলে মোজেযা বা কারামত। সূফীতত্ত্ববিদগণ সৃষ্টির মূল জ্ঞান (আকলে মায়াদ যাহা সমস্ত জ্ঞানের মূল) লইয়া চর্চা করেন। তাহারা জানেন, দেখেন ও শোনেন যে, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”-এই কলেমা শরীফ যাহা আরশের উপর লিখিত তাহাই সমস্ত জগতের প্রতি বস্তুর অনুতে পরমাণুতে সর্বক্ষণ জেকের হইতেছে-সমস্ত বস্তুই আল্লাহ ও তদীয় রাসূলে করীম (সাঃ) এর এত্তেবা করিতেছে। আল্লাহ ও তদীয় রাসূলে করীম (সাঃ) এর আনুগত্যই তাই প্রকৃতির একমাত্র নিজস্ব ও অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব যাহার অপর নাম ধর্ম বা দ্বীন, তাই যাহারা আল্লাহ ও তাহার রাসূল অর্থাৎ লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এই কলেমা শরীফের এত্তেবা করিল তাহারাই প্রকৃত ইসলামের অনুসারী হইল। ইসলাম তাই সার্বজনীন অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টি জগতের ধর্ম। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সহ অন্যান্য খোদাতত্ত্ব সাধনার পথিকগণ উল্লিখিত বোধ লাভ করেন আল্লাহতায়ালার জাতের পরিচয় লাভ করার পর সৃষ্টি জগতের উদ্দেশ্যে হেদায়েতের জন্য নামিয়া আসিবার পথে বা প্রত্যাবর্তনের পথে। আল্লাহতায়ালার জাত পাকের নৈকট্য লাভের জন্য সূফীতত্ত্ব সাধনার পথিকগণ প্রথমে যে পার্থিব বন্ধন মুক্ত হন তাহাও হন এই "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-কলেমা শরীফ দ্বারা। আর যখন তাহারা
প্রত্যাবর্তনের জন্য নামিয়া আসেন তখন দেখিতে পান যে, সমস্ত বস্তুর প্রতি অনু পরমাণু ঐ নামেরই জেকের করিতেছে যেমন আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান "সমস্ত বস্তু আল্লাহতায়ালার জেকেরে রত।" তবে এই জেকের কলেমা শরীফের জেকের এই জন্য যে, জগতের সৃষ্টি হইয়াছে নূরে মুহাম্মদী হইতে। নূরে মুহাম্মদীর উৎস হইল আল্লাহতায়ালার প্রেম। আল্লাহতায়ালার প্রেমের নূরই নূরে মুহাম্মদী। আল্লাহতায়ালার সর্বময় ক্ষমতা ও প্রেমের নূর যাহা নূরে মুহাম্মদী নামে পরিচিত তাহাই সৃষ্টি জগৎকে ধারণ ও লালন করিতেছে। তাই আল্লাহ ও রাসূলের এত্তেবাই জগতের শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ। জগতে কোনো স্থায়ী পদ্ধতি বা নিয়ম নাই-একমাত্র স্থায়ী বিষয়ই হইল আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও দয়া ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রেম-অন্য সব কিছুই পরিবর্তনশীল। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও প্রেম দ্বারাই সৃষ্টি জগতের সকল বিষয়েই পরিবর্তন ঘটানো যায়। মানব চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, প্রবৃত্তি যাহাকে আমরা সহজাত বা প্রকৃতিগত বলি তাহাও পরিবর্তন করানো যায়। আল্লাহতায়ালার আদিষ্ট হেদায়েতকারী আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও দয়ার প্রতিভূ হইয়াই মানব জাতিকে হেদায়েত করিতে আসেন। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও দয়া দান করিয়া তাই তাহারা প্রয়োজনে তাহাদের চরিত্র বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করিয়া মানুষকে "আদর্শ মানুষ" বা ইনছানে কামেল বা আল্লাহতায়ালার খলীফা বানাইয়া দিতে পারেন। কোনো সমাজের সমগ্র মানব জাতির চরিত্র পরিবর্তনও তাহাদের জন্য দুঃসাধ্য নয়; কারণ তাহাদের ইচ্ছা আল্লাহতায়ালা কবুল করিয়া লইতে ওয়াদাবদ্ধ থাকেন। আর আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাতে বা রাজীতে রাজী থাকিবার জন্য মানুষের প্রবৃত্তিগত পরিবর্তন আনার ক্ষমতাই মূলতঃ হেদায়েত করিবার ক্ষমতার অর্থ। তাই যে হেদায়েতকারী মানুষকে আদামাতের অন্ধকার হইতে মুক্ত করিতে তথা মানুষের নাফসকে পরিবর্তন করাইয়া দিতে পারেন-তিনিই প্রকৃত শান্তি বা ইসলামের বাণী বাহক; তিনিই তাই সমাজ বা মানব জাতির জন্য সুসংবাদের বাণী বাহক। তিনিই প্রকৃত শান্তির দিশারী; অন্য কেহ নয়।
রাসূলে করীম (সাঃ) দেহগত ও বাতেনী-এই উভয় ভাবেই আল্লাহতায়ালার জাতপাকের দর্শন লাভ করিয়াছিলেন। নবীজী (সাঃ) -এর পরে কামালতে নবুয়তের জ্ঞানের অধিকারীগণ আল্লাহতায়ালার জাতের সাক্ষাৎ ও ফানা-বাকা অর্থাৎ একাত্ম অনুভূতি লাভ করেন। এই অনুভূতি তাহারা লাভ করেন বাতেনী চোখে-যাহা ওজুদ মাওহুব লাহু বা খোদাদত্ত শরীরের চোখ। তাহার পাশাপাশি তাহারা হকিকতে তওবা কবুলিয়তের মাকামে উন্নীত হন যে স্তরে হযরত আদম (আঃ) হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নাম সম্বলিত কলেমা তৈয়ব-এর উছিলায় আল্লাহতায়ালার নিকট পুনরায় গৃহীত হইয়াছিলেন; ঐ রূপ তাহার পর আল্লাহতায়ালা তাহাকে গোনাহ হইতে হেফাজত করেন যাহা হকিকতে কাবার বৈশিষ্ট্য। আল্লাহতায়ালার পথে যাহারা হেদায়েতকারী, আল্লাহপাক তাহাদেরও গোনাহ হইতে হেফাজত করেন।
হে জাকেরানগণ! কামালতে নবুয়তের অধ্যায়ের ভাষায় প্রকাশিতব্য কিছু জ্ঞান তোমাদের জানার জন্য প্রকাশ করা হইল, এই মাকামেই সাধকগণ সেই জ্ঞান লাভ করেন যে প্রসংগে কুরআন মজীদে বলা আছে, "আল্লাহ্ আলিমূল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতে" অর্থাৎ- আল্লাহপাক দৃশ্য ও অদৃশ্য সবই জ্ঞাত। তিনি মানুষের অন্তরের খবরও জ্ঞাত; যেমন আল্লাহ বলেন, আমি "আলীমুম বেজাতিস ছুদুর।" এই সকল জ্ঞান প্রকাশিতব্য নহে। তবে আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন এই জ্ঞান বা হেকমত তিনি তাহার ইচ্ছানুযায়ী বান্দাগণকে দান করেন; তাহা আল্লাহতায়ালার ফজল। এই যে কামালতে নবুয়তের জ্ঞান ও গুণের বিশাল অধ্যায় তাহার ধারক ও বাহক ছিলেন আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর। সেই নেয়ামত তিনি আল্লাহতায়ালার পথে মানবজাতিকে হেদায়েত করিবার জন্য রাখিয়া গিয়াছেন। তোমরা যদি এই জ্ঞান ও গুণের পোশাকে সজ্জিত হইয়া আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির খেদমত করিতে চাও; তবে আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কদম মোবারক শক্ত করিয়া ধর, তাহার কদমে পুরাপুরি নিজেকে নেছার কর বা আনানিয়াতকে ধ্বংস করিবার জন্য কোশেশ করিতে থাক। নিজের আমিত্বকে ধ্বংস করিবার জন্য বিভিন্ন ওলী আল্লাহগণ বা হেদায়েতকারীগণ বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করিয়াছেন। হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ও হযরত শাহজালাল (রঃ) ছাহেব চল্লিশদিন ধরিয়া এক একটি রোজা থাকিতেন বলিয়া তাহাদের জীবনী গ্রন্থে উল্লেখ আছে। হযরত গউছপাক (রঃ) ছাহেবও তদ্রুপ চল্লিশ দিন ধরিয়া রোজা রাখিয়া কঠিন রেয়াজত করিয়াছেন। হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেবও অনুরূপ করিয়াছেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব অবশ্য রেয়াজতের পাশাপাশি রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহব্বতের উপর বেশী জোর দিয়াছেন। আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর আমাকে বলিয়াছিলেন, "যদি হেদায়েতের ভার পাইতে চাও, তাহা হইলে আনা ফানার মোকাম তয় করিয়া আস। আট দিন ধরিয়া রোজা রাখ। তোমার যাহা কিছু আছে তাহা পীরের কদমে নেছার কর। কারণ কলা গাছের বুক ফাড়িয়া যদি কলার ছড়া বাহির হয় তবে সে কলা পোক্তও হয় না; ছোপও বালা (নষ্ট) হইয়া যায়।" কেবলাজান হুজুর যাহা কিছু বলিলেন, আমি তাহা আব্বাজানের নিকট বলিলাম, তিনি পূর্বেই পীর কেবলাজান হুজুরের নিকট ওয়াদা করিয়াছিলেন-তিনি আমার ও আমার বড় ভাই সাহেবের উপর কোনো দাবী রাখিবেন না। তিনি আমার প্রাপ্য সম্পত্তি আমাকে পৃথক করিয়া দিলেন। আমি তাহা বিক্রয় করিয়া সমুদয় অর্থ পীর কেবলাজানের হাতে তুলিয়া দিয়া পুরাপুরি আল্লাহতায়ালার উপর নির্ভরশীল হইলাম। পীর কেবলাজান হুজুরের কদম ব্যতীত আমার আর কিছুই রহিল না। একই সাথে আট দিন করিয়া এক একটি রোজা রাখিতে লাগিলাম। অতঃপর একদিন পীর কেবলাজান হুজুরের দয়া হইল। তিনি আমাকে ডাকিয়া পরিপূর্ণ ফানার সৌভাগ্য দান করিলেন। তাই তোমরা যদি আনা ফানার মোকাম তয় করিতে চাও, তবে আল্লাহতায়ালার উপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল হও এবং ক্ষুধার আগুনে আপন আনানিয়াতকে বা আমিত্বকে জ্বালাইয়া মার, তাহা হইলেই ত্রাণ ও পরিপূর্ণ শান্তি বা পরিপূর্ণ ইসলামের স্বাদ ও ঘ্রাণ তোমরা পাইতে থাকিবে। আল্লাহপাক তোমাদের সহায় থাকুন। এই দু'আ!








