Logo

কারবালার ইতিহাসের তাৎপর্য ও কারবালার শিক্ষা নিয়ে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২ আগস্ট, ২০২৬, ২০:২২
কারবালার ইতিহাসের তাৎপর্য ও কারবালার শিক্ষা নিয়ে আলোচনা
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘মুহারাম’ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কারবালার ইতিহাসের তাৎপর্য ও কারবালার শিক্ষা নিয়ে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

হযরত নবী করীম (সাঃ) এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব, তদীয় পরিবারের সদস্য ও অনুগত সহচরগণ কারবালা প্রান্তরে বুকের রক্ত ঢালিয়া আল্লাহতায়ালার সত্য ধর্ম ইসলাম ও তাহার আদর্শ রক্ষার জন্য যে ত্যাগের নিদর্শন রাখিয়া গিয়াছেন, ইতিহাসে তাহার তুলনা নাই। তুলনা নাই বলিয়াই আজ প্রায় দেড় হাজার বছর পরও তাহা বিশ্ব ব্যাপী মুসলমানগণ স্মরণ করিতেছে। ধর্মের জন্য, আদর্শের জন্য, ইতিহাসে কোনো কোনো সময়ে হয়তো কোনো একজন ব্যক্তি প্রাণ দান করিয়াছেন, কিন্তু সমস্ত পরিবার তথা সমস্ত গোষ্ঠী সত্য রক্ষার জন্য এমন অকাতরে প্রাণ দান করিতে দেখা যায় নাই। কোনো পরিবার এমন বারংবার প্রতারণা ও মিথ্যার শিকারও হয় নাই যেমন হইয়াছিলেন নূর নবী (সাঃ) এর শোণিতবাহী তাহার প্রিয় দৌহিত্রগণ। এই আত্মত্যাগের ঘটনা স্মরণ করাইয়া প্রতি বছর আশুরা আসিয়া নবী করীম (সাঃ) এর ভক্তদের আজও অশ্রুসিক্ত করে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগিয়া থাকে, যে নবী করীম (সাঃ) কে সৃষ্টি না করিলে আল্লাহপাক এই সৃষ্টি জগতের কিছুই সৃষ্টি করিতেন না বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন, সেই নবী করীম (সাঃ) এর আদর্শের পতাকাবাহী বর্গের উপর বারংবার এমন অত্যাচার কেন নামিয়া আসিল? জগতের ইতিহাস সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দের ইতিহাস। সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দে সত্য চিরকালই টিকিয়া রহিয়াছে ন্যায় ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে; আর মিথ্যার ভিত্তি পত্তন হইয়াছে অন্যায় ও প্রতারণার মাধ্যমে। হযরত নবী করীম (সাঃ) এর আদর্শের পতাকাবাহী হযরত আলী (কঃ), হযরত ইমাম হাসান (রাঃ), হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) তাই হইয়াছেন শঠতা ও প্রতারণার শিকার। কারবালার ইতিহাস তাই একদিকে আত্মত্যাগের মহিমায় সমুজ্জল ও অন্য দিকে প্রতারণা ও শঠতার কলংকে লিপ্ত। কারবালার ইতিহাস যে শঠতার কলংকে লিপ্ত, তাহার সূত্রপাত হয় হযরত আলী (কঃ) এর সময়ে সিফফিনের যুদ্ধে সন্ধির নামে প্রহসন ও তদীয় শাহাদতের মাধ্যমে।

হযরত ওসমান (রাঃ) এর শাহাদাতের জন্য সিরিয়ার শাসনকর্তা মোয়াবিয়া ও তাহার নেতৃত্বাধীন কিছু লোক হযরত আলী (কঃ) কে মিথ্যাভাবে দোষারোপ করিতে থাকে। তাহাদের কারসাজিতে মুসলিম সাম্রাজ্যে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় হযরত আলী (কঃ) মদীনা হইতে কুফায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তাহার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষিপ্র হস্তে বিদ্রোহ দমন করা। মোয়াবিয়া হযরত আলী (কঃ) এর রাজধানী কুফা আক্রমণ করিলেন-তাহাদের দাবী হইল হযরত ওসমান (রাঃ) ও হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর বিশিষ্ট ছাহাবা হযরত তালহা (রাঃ) ও হযরত জুবায়ের (রাঃ) এর হত্যার বিচার করিতে হইবে। হযরত আলী (কঃ) এর অনুগত বাহিনী ও সিরিয়ার শাসনকর্তা মোয়াবিয়া ও মিশরের শাসনকর্তা উমাইয়া বংশীয় আমর বিন আসের সম্মিলিত বাহিনী সিফফিন নামক স্থানে পরস্পরের মুখোমুখি হইলো। এই স্থানও ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত। যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধের জন্য হযরত আলী (কঃ) শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে মীমাংসার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু মোয়াবিয়া বলিলেন, তিনি হযরত ওসমান (রাঃ) ছাহেবের হত্যার প্রতিশোধ নিতে আসিয়াছেন। এই হত্যার জন্য যাহারা দায়ী বলিয়া তিনি দাবী করিতে লাগিলেন, তাহাদের না পাওয়া পর্যন্ত তিনি দামেস্কে প্রত্যাবর্তন করিবেন না। এমন সকল ব্যক্তিকে তিনি হযরত ওসমানের (রাঃ) হত্যার জন্য দায়ী করিতে লাগিলেন, যাহারা এই হত্যার জন্য প্রকৃত পক্ষে দায়ী ছিলেন না। হযরত আলী (কঃ) উহাতে তাই রাজী হইতে পারিলেন না। সুতরাং যুদ্ধ শুরু হইল। ক্রমে মুহাররম মাস আসিয়া গেল। এই মাস পবিত্র বিধায় মুসলমানগণ এই মাসে যুদ্ধ করিতেন না। যুদ্ধ মুহাররম মাস উপলক্ষে স্থগিত হইল। হযরত আলী (কঃ) এই সুযোগে আবারও যুদ্ধ বন্ধের জন্য মীমাংসার উদ্যোগ গ্রহণ করিলেন। কিন্তু মোয়াবিয়া এইবার হযরত ওসমান (রাঃ) এর হত্যার বিচারের মূল দাবী ত্যাগ করিয়া নতুন প্রস্তাব দিলেন। তিনি বলিলেন, বিনা রক্তপাতে যুদ্ধ বন্ধ হইতে পারে, যদি নতুনভাবে খলিফা নির্বাচন করা হয়। আর সেই উদ্দেশ্যে হযরত উমর (রাঃ) এর মৃত্যুকালে যে রূপ খলিফা নির্বাচনের জন্য একটি সাধারণ সভা আহ্বান করা হইয়াছিল, ঐ রূপ সভার আহ্বান করা হউক। মোয়াবিয়া এ কথাও জানাইয়া দিলেন যে, ঐ সভায় তিনি নিজেই হযরত আলী (কঃ) এর সহিত প্রতিদ্বন্দিতা করিবেন। হযরত আলী (কঃ) বলিলেন, খেলাফতের দাবী আর হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার বিচারের দাবী-দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। দুইটিকে এক করিলে চলিবে না।

হযরত নবী করীম (সাঃ) এর সকল ছাহাবা মিলিয়া হযরত আলীকে (কঃ) খলিফা নির্বাচিত করিয়াছিলেন। তাই তাহার জীবদ্দশায় পুনর্বার খেলাফত পরিবর্তনের কথা উঠিতে পারে না। অথচ মোয়াবিয়া খেলাফত পরিবর্তনের দাবী তুলিল, ফলে সন্ধির সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইল। কিন্তু এই ঘটনার দ্বারা ইহাই বোঝা যায় যে, মোয়াবিয়া যুদ্ধে আসিয়াছিলেন রাজত্বের লিপ্সা লইয়া; হযরত ওসমান (রাঃ) বা হযরত যুবায়ের (রাঃ) এর বিচারের দাবী ছিল একটা মিথ্যা বাহানা মাত্র। তাই সন্ধির চেষ্টা ভাংগিয়া গেল। মুহাররম মাসের শেষে যুদ্ধ আবার প্রবল বেগে শুরু হইল। যুদ্ধে যখন মোয়াবিয়ার পরাজয় সুনিশ্চিত, তখন তিনি এক নতুন কৌশল গ্রহণ করিলেন। কিছু পক্ক কেশ বৃদ্ধ সৈন্য দিগের বর্শায় কুরআন শরীফ বাঁধিয়া সাদা পতাকা অর্থাৎ সন্ধি প্রস্তাবের প্রতীক হিসেবে রণক্ষেত্রে পাঠাইলেন। বর্শার মাথায় কুরআন শরীফ বাঁধা দেখিয়া হযরত আলী (কঃ) এর সৈন্য দলের একটি অংশ আর যুদ্ধে যাইতে রাজী হইল না। হযরত আলী (কঃ) তাহাদের বুঝাইলেন, উহা মোয়াবিয়ার নতুন কৌশল মাত্র; যুদ্ধের শেষ মীমাংসা না হইলে নতুন বিপদ সৃষ্টি হইবে। তিনি শত চেষ্টা করিয়াও তাহাদের সৈন্যদলের ঐ অংশকে আর যুদ্ধে পাঠাইতে পারিলেন না। যুদ্ধ স্থগিত করিতে তিনি বাধ্য হইলেন। নতুনভাবে সন্ধি স্থাপনের উদ্যোগ হইল। তিনি সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ বিমুখ মনোভাব দেখিয়া ভগ্ন মন লইয়া রণক্ষেত্র ত্যাগ করিলেন। সেনাপতি মুসার উপর মীমাংসার ভার দিয়া চলিয়া গেলেন। মোয়াবিয়ার পক্ষে আসিলেন তাহার কূট শাসনকর্তা আমর। আমর মীমাংসার প্রস্তাব হিসেবে বলিলেন, যেহেতু হযরত আলী (কঃ) এর খেলাফত আমলে কতিপয় এলাকায় বিদ্রোহ দেখা গিয়াছে, তাই হযরত আলী (কঃ) ও তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী মোয়াবিয়া-এই উভয়কে বাদ দিয়া ভিন্ন কোনো ব্যক্তিকে খেলাফতের ভার দিতে হইবে। মুসা আমরের কূট চালের সামনে টিকিতে পারিলেন না। তিনি শান্তি স্থাপনের জন্য হযরত আলী করমুল্লাহ্ ওয়াজহু-এর খেলাফতের দাবী প্রত্যাহার করিতে সম্মত হইলেন এবং অপেক্ষমান মুসলিম সৈন্যগণকে তাহা জানাইতে আসিলেন। সেনাপতি মুসা যখন বলিলেন মীমাংসার শর্ত হিসেবে হযরত আলী (কঃ) এর পক্ষ হইতে খেলাফতের দাবী রদ করা হইল-

বিজ্ঞাপন

তখনই মোয়াবিয়ার সহযোগী বলিয়া উঠিলেন, হযরত আলী (কঃ) এর প্রতিনিধি তাহার খেলাফতকে রদ করিয়াছেন, ফলে খেলাফতের আসন এখন শূন্য। আর তাই এক্ষণে মোয়াবিয়াকে খলিফা নির্বাচন করা হইল। মুসা ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন, সন্ধির প্রস্তাব অনুযায়ী তৃতীয় কোনো ব্যক্তি খেলাফতের ভার গ্রহণ করার কথা, কিন্তু মোয়াবিয়ার সৈন্যদের উল্লাস ধ্বনিতে মুসার কণ্ঠ তলাইয়া গেল। তাহার কথা কেহ শুনিতে পাইল না। সন্ধির শঠতা সম্পর্কে সকলেই বুঝিতে পারিল। হযরত আলী (কঃ) কুফায় ফিরিয়া রাজত্ব করিতে লাগিলেন বটে, কিন্তু মোয়াবিয়া আর তাহার বশ্যতা স্বীকার করিল না।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর আশীর্বাদ-ধন্য ও পুণ্য স্মৃতিময় মদীনা হইতে আরবের উত্তরাঞ্চল রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে হযরত আলী (কঃ) কুফায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন-কিন্তু নবী (সাঃ) এর প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্র হইতে দূরে যাইয়া, তিনি বিদ্রোহতো দমন করিতে পারিলেনই না, বরং খেলাফতও হস্তচ্যুত হইল। শেষ পর্যন্ত কুফাবাসী একদিন নামাজরত অবস্থায় কুফার একটি মসজিদে হযরত আলী (কঃ) কেও হত্যা করিল।

হযরত আলী (কঃ) এর শাহাদতের পর ইমাম হাসান (রাঃ) মাত্র কয়েকমাস খেলাফতের অধিকারী ছিলেন। হযরত আলী (কঃ) এর শাহাদতের পর মোয়াবিয়া নিজেকে সমস্ত মুসলিম জাহানের খলিফা বলিয়া ঘোষণা করিলেন ও কুফা আক্রমণ করিলেন। হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) সবেমাত্র সিংহাসনে আরোহন করিয়াছেন। তিনিও খেলাফত রক্ষার জন্য মোয়াবিয়ার বিরুদ্ধে সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করিলেন। মুদাইন নামক এক স্থানে উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হইবার পূর্বে রাজধানী কুফায় মোয়াবিয়ার পক্ষ হইতে গুজব রটাইয়া দেওয়া হইল যে ইমাম বাহিনীর সেনাপতি কায়েস যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরাজিত ও নিহত হইয়াছেন। ইহাতে কুফী সৈন্যদের মধ্যে বিশৃংখলা দেখা দিল। তাহারা তাহাদের নিজ খলিফা হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) এর তাবু লুন্ঠন করিল, এমন কি তাহাকে বন্দী করিয়া মোয়াবিয়ার হস্তে সমর্পণের আয়োজন করিতে লাগিল। সদ্য রাজ্যভার প্রাপ্ত খলিফা ইমাম হাসান (রাঃ) এই ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত হইলেন। বুঝিতে পারিলেন, চতুর্দিকেই শুধু প্রতারণা। ইতিমধ্যে মোয়াবিয়া সন্ধি স্থাপনের প্রস্তাব দিলেন। তিনি বলিলেন, বংশের মর্যাদার দিক দিয়া হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)-ই খেলাফতের প্রকৃত অধিকারী হইবার কথা-কিন্তু বর্তমানে সারা মুসলিম সাম্রাজ্যে যে বিশৃংখলা বিরাজমান-তাহা সমাধানের জন্য যে দৃঢ়তা প্রয়োজন, তাহা যদি ইমাম ছাহেবের মধ্যে থাকিত, তাহা হইলে তিনি নিজেই তাহার নিকট বয়াত হইতেন। ইমাম ছাহেব যেন খেলাফতের দাবী ত্যাগ করেন। খেলাফত ব্যতীত আর সকল কিছুই তিনি পাইবেন। হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) ছাহেব শান্তি ফিরাইয়া আনিবার খাতিরে সন্ধির প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন এক শর্তে যে, মোয়াবিয়া তাহার জীবদ্দশা পর্যন্ত খলিফা থাকিবেন। মোয়াবিয়ার মৃত্যুর পর হযরত হোসেন (রাঃ) ছাহেব খলিফা নির্বাচিত হইবেন। মোয়াবিয়া এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। ইমাম ছাহেবদের জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য খোরাসন প্রদেশের রাজস্ব তাহাদের জন্য বরাদ্দ করা হইল। খেলাফতের দাবী ত্যাগ করিয়া ইমাম ছাহেবগণ কুফা হইতে মদীনায় আবার ফিরিয়া আসিলেন। মদীনার মুসলমানগণ নবী দৌহিত্রকে খলিফা হিসেবে দেখিতে না পাইয়া আফসোস করিতে লাগিলেন এবং ইমাম ছাহেব (রাঃ) কে নবী করীম (সাঃ) এর আধ্যাত্মিক প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করিয়া ইমামের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করিলেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ইমাম হাসান (রাঃ) হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর বংশীয় হিসেবে যে সম্ভ্রম ও জনগণের শ্রদ্ধা পাইয়া আসিতেছিলেন, মোয়াবিয়া তাহাতে সন্ত্রস্ত ছিল। হযরত আলী (কঃ) হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জামাতা হিসেবে যে সম্মান পাইয়া আসিতেছিলেন, তাহাই ছিল বস্তুতঃ মোয়াবিয়ার ঈর্ষার কারণ। হযরত আলী (কঃ) এর খেলাফত গ্রহণ করিবার পর হইতেই তাই মোয়াবিয়া দামেস্কের মসজিদে খোতবা পাঠ করিবার সময়ে খলিফার সমালোচনা করিতেন।

ইমাম হাসান (রাঃ) যদিও সিংহাসনের দাবী ত্যাগ করিয়া কুফা হইতে মদীনায় গমন করেন, মদীনাবাসী তাহাকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন ইহাতে মোয়াবিয়ার শংকা বাড়িয়া যায়। তাই খেলাফতের দাবীতে যাহাতে নবী বংশের কেহ আর না আসিতে পারে, তাই মোয়াবিয়া কূট চালের আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) কে আততায়ী দ্বারা বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। মুসলিম সমাজের এই দুঃখজনক পরিস্থিতিতে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব একা হইয়া পড়িলেন। কিন্তু এই অবস্থা প্রতিকারের সৈন্যবল বা অর্থবল তাহার ছিল না। মুসলিম খেলাফত তখন মিশরের পশ্চিম সীমানা হইতে পারস্যদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল সাম্রাজ্যের বিপুল অর্থ ও জনবল সবই মোয়াবিয়া বা তাহার অনুগতদের অধীন। তাহাদের সতর্ক দৃষ্টির আড়ালে কোনো রূপ বিদ্রোহও দুঃসাধ্য। এতদসত্ত্বেও মোয়াবিয়া সকল সময়েই হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর উপর প্রখর দৃষ্টি রাখিতে লাগিলেন। তিনি তাহার শেষ ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করিতে লাগিলেন, যাহাতে নবী করীম (সাঃ) এর কনিষ্ঠ দোহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কেও খেলাফতের দাবী হইতে বিচ্যুত করিয়া নিজ পুত্র এজিদকে সিংহাসনে বসানো যায়। মোয়াবিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, তাহার পুত্রের খেলাফত প্রাপ্তির বিরুদ্ধে যদি কখনও কোনো দাবী উত্থাপিত হয় বা সশস্ত্র যুদ্ধ হয়, তাহা হইবে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবকে কেন্দ্র করিয়া।

ইমাম হাসান (রাঃ) ছাহেবের সহিত সম্পাদিত সন্ধি চুক্তির খেলাফ করিয়া মোয়াবিয়া নিজপুত্র এজিদকে যুবরাজ ও তাহার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে জীবদ্দশাতেই ঘোষণা দান করেন; যাহাতে এজিদের সিংহাসন প্রাপ্তিতে বিঘ্ন না ঘটে।

বিজ্ঞাপন

ইমাম ছাহেবদের প্রতি এই আচরণে মদীনাবাসী বিক্ষুদ্ধ হইলেন। মদীনায় নিযুক্ত মোয়াবিয়ার শাসনকর্তা মোয়াবিয়াকে যথা সময়ে এই বিক্ষুদ্ধ অবস্থার কথা জানাইলেন। অবস্থা স্বচক্ষে দেখিবার জন্য হজ্জের নাম করিয়া মোয়াবিয়া স্বয়ং মক্কার পথে মদীনায় উপস্থিত হইলেন। মোয়াবিয়া মদীনায় উপস্থিত হইলে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির সহিত মোয়াবিয়াকে নগরে প্রবেশকালে সংবর্ধনা জানাইতে গেলেন। সেখানে সর্ব সম্মুখে মোয়াবিয়া হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর সহিত ধৃষ্ঠতাপূর্ণ আচরণ করেন। নেতৃবর্গ মোয়াবিয়ার রুঢ় আচরণে স্তম্ভিত হইয়া স্থান ত্যাগ করিলে মোয়াবিয়া সাধারণ লোকদের লইয়া এক সভা আহ্বান করিলেন। সেই সভায় তিনি নিজ পুত্র এজিদের পক্ষে আনুগত্য আহ্বান করিলেন। সাধারণ নাগরিকগণ চুপচাপ রহিলেন। মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ বলিয়া মোয়াবিয়া গ্রহণ করিলেন। অতঃপর মোয়াবিয়া মক্কা গমন করিলেন। হজ্জের পর তিনি নাগরিকদের এক সাধারণ সভা আহবান করিলেন। সভায় তিনি নিজ পুত্র এজিদের গুণগাণ করিয়া তাহার পক্ষে আনুগত্য আহ্বান করিলেন। এই সভায় হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ), আব্দুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) ও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) স্ব স্ব স্থানে মোয়াবিয়ার প্রহরী দ্বারা বেষ্টিত রহিলেন। তাহারা কেহই কোনো কথা বলিতে পারিলেন না। মক্কার জনসভায় তিনি একথাও বলিলেন যে মদীনার জনগণ এজিদের নামে আনুগত্য প্রকাশ করিয়াছে। মক্কা ও মদীনায় এইভাবে প্রহসনের মাধ্যমে এজিদের পক্ষে তিনি আনুগত্য গ্রহণ করিয়া স্বীয় পুত্রকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার ঘোষণা করিয়া শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

এজিদ সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই আদেশ জারী করিল, হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কে এজিদের আনুগত্য স্বীকার করিতে হইবে; অন্যথায় মদীনার শাসনকর্তাকে বলা হইল যেন হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের ছিন্ন মস্তক তাহার নিকট প্রেরণ করা হয়। হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) এর মৃত্যুর পর হইতে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব রাজনীতি হইতে দূরে সরিয়া ছিলেন। এক্ষণে এজিদের এইরূপ উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে তিনি খুবই ব্যথিত হইলেন; অন্যায়ের নিকট মাথা নোয়ানো অসংগত বোধ করিলেন। এজিদের বশ্যতা স্বীকার করিয়া নিজের নিরাপত্তা চাহিলে তাহার নিকট আল্লাহতায়ালার যে বেলায়েত হযরত আলী (কঃ) ও তাহার ভ্রাতা হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) কর্তৃক রক্ষিত হইয়াছিল, তাহার প্রতি অবমাননা করা হয়। তাই তিনি ইহার প্রতিবিধান করিবার জন্য সংকল্পবদ্ধ হইলেন। প্রতিকার করিতে হইলে যে লোকবল ও সম্পদ প্রয়োজন, তাহা মদীনায় ছিল না বিধায় তিনি মক্কা গমন করিতে মনস্থ করেন।

যাত্রার পূর্বে তিনি প্রিয় নানা হযরত নবী করীম (সাঃ) এর রওজায় বসিয়া সারা রাত্রি অশ্রুপাত করিলেন, এই মহা সংকটে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জাগ্রত পবিত্র আত্মার নিকট কতর্ব্য সম্পর্কে নির্দেশনা চাহিলেন। এই রূপে কাঁদিতে কাঁদিতে নিদ্রামগ্ন হইলেন। নিদ্রামগ্ন অবস্থায় স্বপ্নে দেখিলেন, প্রিয় নানা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তাঁহার মস্তক ক্রোড়ে নিয়া বসিয়া আছেন। হযরত (সাঃ) ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবকে বলিলেন, "যত কঠিন বিপদই হউক না কেন, ভাংগিয়া পড়িও না। মনে রাখিও, তুমি বেশী দিন দুনিয়ায় থাকিবে না, শীঘ্রই আমার নিকট চলিয়া আসিবে। এই অস্থায়ী জীবনে সুখ ও আরামের জন্য দুর্নীতি ও অধর্মের নিকট মস্তক অবনত করিও না।" সে দিন ছিল ৩-রা শাবান। স্বপ্নাদেশ প্রাপ্তির পর হযরত ইমাম ছাহেবের সকল দ্বিধা ও ভয় কাটিয়া গেল। পরদিন সকলের নিকট হইতে বিদায় লইয়া সপরিবারে মক্কায় রওয়ানা হইয়া গেলেন। মদীনার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা কাঁদিতে কাঁদিতে হযরত ইমাম ছাহেব ও তদীয় পরিবারকে বিদায় দিয়া আসিল। জন্ম ভূমি হইতে ইহাই ছিল ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শেষ বিদায়।

বিজ্ঞাপন

মক্কায় আসিয়া হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব মোসলেম নামক একজন বিচক্ষণ লোককে দূত হিসেবে প্রেরণ করিলেন- জানিতে চাহিলেন কুফার অধিবাসীগণ এক্ষণে ইমাম পরিবার বর্গের প্রতি অনুগত থাকিবে, না এজিদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করিবে? কুফায় হযরত আলী (কঃ) এর রাজধানী থাকার কারণে সেখানে ইমাম পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল লোক তখনও ছিল বলিয়া হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব আশা করিতেছিলেন।

মোসলেম কুফায় আসিয়া হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর নিকট বয়াত গ্রহণের সম্ভাবনা যাচাই করিয়া দেখিতে গিয়া বুঝিতে পারিলেন, অগণিত লোক হযরত ইমাম ছাহেবের পক্ষে রহিয়াছে। তিনি হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের পক্ষে বায়াত প্রদান করিলেন। ঐ সময়ে নোমান বশীর ছিলেন এজিদের পক্ষে কুফার শাসনকর্তা। তিনিও ইমাম বংশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বণি উমাইয়াগণ ইহা বুঝিতে পারিয়া এজিদকে পত্র লিখিল। উহাতে এজিদ অবিলম্বে ওবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদ নামক এক ব্যক্তিকে কুফার নতুন গভর্ণর করিয়া নোমানকে পদচ্যুত করিল। ইবনে জিয়াদকে এজিদ হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর প্রতিনিধি মোসলেম এবং প্রাক্তন গভর্ণর নোমান বশীর-উভয়েরই গর্দান লইবার হুকুম দান করিল। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর বায়াত যে সকল লোক গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদেরও শিক্ষা দেবার জন্য এজিদ ইবনে জিয়াদকে হুকুম দিল।

ইবনে যিয়াদ অবিলম্বে কুফায় যাইয়া প্রাক্তন গভর্ণর ও মোসলেম-উভয়কেই বন্দী করিতে সক্ষম হইল। মোসলেমের গর্দানও লওয়া হইল। ইবনে যিয়াদ পরদিন কুফার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকিয়া এক সভা আহ্বান করিল। যিয়াদ বলিল-আপনাদের কীর্তিকলাপ আমি সবই জানিতে পারিয়াছি। কে কে মোসলেমের নিকট হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের নামে বায়াত হইয়াছে তাহা জানিতে বাকী নাই। কিন্তু এই বারের জন্য ক্ষমা করা হইল। তাহারা এই মুহূর্তে ইমাম হোসেনের বায়াত ভংগ করুক, পুনরায় এজিদের বশ্যতা স্বীকার করুক। অন্যথা তাহাদের একে একে পিষিয়া মারা হইবে। তাহাদের পরিবারের কাহারও কোনো চিহ্ন রাখা হইবে না। ইবনে যিয়াদের এই হুমকির মুখে কুফা বাসী মত পাল্টাইয়া ফেলিল।

বিজ্ঞাপন

এদিকে মোসলেম প্রথম দিকে কুফাবাসীর মধ্যে যে উৎসাহ ও সাড়া দেখিয়াছিলেন তাহা জানাইয়া হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবকে কুফায় গমনের জন্য একাধিক পত্র লিখিয়া ছিলেন। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) মাত্র অল্প কয়েকজন সংগী লইয়া কুফায় অগণিত সমর্থকদের সাথে মিলিত হইবেন-এই আশায় কুফার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করিলেন।

হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব যখন পথিমধ্যে তখনই মোসলেম বন্দী হইয়াছেন ও তাহার শিরোচ্ছেদ হইয়াছে। নতুন গভর্ণর যিয়াদের অত্যাচারের হুমকিতে কুফাবাসী হযরত ইমাম ছাহেবের পক্ষ ত্যাগ করিয়াছে। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুই জানিতেন না। তিনি কুফার পথে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তিনি কুফার সর্বশেষ অবস্থা জানিতে পারিলেন, যখন তিনি কুফা হইতে মাত্র এক দিনের পথ দূরে। এই স্থানে হোর নামক একজন এজিদ সেনাপতির সহিত হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের সাক্ষাৎ হইল। ইমাম ছাহেবকে হোর জানাইল, সে যদিও এজিদের বেতনভুক্ত কর্মচারী; তথাপি ইমাম ছাহেবের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করে। সে তাহাকে আরও জানাইল, ইমাম ছাহেব মক্কা ত্যাগ করা হইতে পথিমধ্যে তাঁহার ও তাহার দলের প্রতিদিনকার ঘটনাই এজিদ গুপ্তচর মাধ্যমে জানিয়া থাকে। ইতিমধ্যেই মোসলেমের মৃত্যু দন্ড হইয়াছে এবং কুফাবাসী তাহাদের আনুগত্য পরিবর্তন করিয়াছে। এই অবস্থায় মাত্র কিছু সংখ্যক লোক লইয়া কুফায় পৌঁছাইলে ইবনে যিয়াদের হাতে নিধন হইবার সম্ভাবনাই বেশী।

হোর বলিল, তাহার উপর হুকুম ইমাম সাহেবকে বন্দী করা। কাজেই এই অবস্থায় আপনাকে আমি ছাড়িয়া দিতে পারি না। তাহা হইলে আমার গর্দান যাইবে। বরং রাত্রির অন্ধকারে আপনি কাফেলাসহ অন্যত্র চলিয়া যাইবেন যেন সকলেই বুঝিতে পারে যে আমি কিছুই জানিতে পারি নাই। অধিক রাত্রিতে হোর অদৃশ্য হইয়া গেল। (পরবর্তীতে হোর তাহার সৈন্যদল সহ ইমাম বাহিনীর সহিত যোগ দিয়াছিল।) কাফেলা ভিন্ন পথে চলিতে লাগিল। সেই সীমাহীন মরু ভূমির মধ্যে নকিবেরা বা পথ প্রদর্শকেরা দিক হারাইয়া ফেলিল। সারা রাত্র পথ চলিয়াও সকালে উঠিয়া দেখিল তাহারা পূর্বের সেই স্থানেই ফিরিয়া আসিয়াছে। ক্লান্ত উষ্ট্রগুলি সেই স্থানে শুইয়া পড়িল। আর উঠিতে চাহিল না। কোনো কোনো ঘোড়ার পাও মরুভূমিতে ডাবিয়া গিয়াছে। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর মনে পড়িল প্রিয় নানা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) তাহাকে জানাইয়া গিয়াছেন, যে স্থানে তাহার ঘোড়ার পা মরুভূমির বালিতে ডাবিয়া যাইবে সেই স্থানই কারবালার প্রান্তর। আর সেই উষর প্রান্তরেই তাহাকে বুকের লহু ঢালিয়া প্রাণ দান করিয়া বেলায়েত ও ইসলামের সত্যকে রক্ষা করিতে হইবে। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ঐ স্থানে শিবির স্থাপন করিবার জন্য আদেশ করিলেন। পরদিন শিবির উঠাইবার পূর্বেই জানিতে পারিলেন, চার সহস্র সেনাদল লইয়া আমর নামক একজন এজিদ সেনাপতি ইমাম ছাহেবের ঐ স্থান ত্যাগ করিবার সকল পথ আগলাইয়া রাখিয়াছে। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব বুঝিতে পারিলেন যে সংঘর্ষ অনিবার্য। তিনি যুদ্ধাবস্থানের জন্য পরিখা খননের আদেশ দিলেন।

বিজ্ঞাপন

ইহারই মধ্যে সেনাপতি আমর এক পত্রে সন্ধির প্রস্তাব দিয়া জানাইলেন, ইমাম সাহেবকে খেলাফতের দাবী ত্যাগ করিতে হইবে ও এজিদের আনুগত্য স্বীকার করিতে হইবে। উত্তরে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) জানাইলেন, তুমি আমাকে মদীনায় ফিরিয়া যাইতে দাও। সেখানে গিয়া আমি বাকী জীবন আল্লাহর নাম জপ করিতে করিতে কাটাইয়া দেব; না হয় তোমাদের খলিফা এজিদের নিকট লইয়া চল। আমর গভর্ণর ইবনে যিয়াদকে সকল কিছু জানাইয়া পত্র লিখিল। পত্রের উত্তরে যিয়াদ সেনাপতি আমরকে লিখিয়া পাঠাইল, ইমাম ছাহেবকে যেন তাহার নিকট প্রেরণ করা হয়- ইবনে যিয়াদের নিকট ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবকে এজিদের নামে বায়াত হইতে হইবে। ইবনে যিয়াদের এই ধৃষ্ঠতাপূর্ণ আচরণে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন। অতএব যুদ্ধ অত্যাসন্ন হইয়া উঠিল। ৯ই মুহাররম আমরের সহিত সীমারের সৈন্য দল যোগদান করিল। ঐ দিনই হিযায নামক আর এক জন সৈন্য আসিয়া ফোরাত নদীর তীর দখল করিয়া রাখিল এবং হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শিবিরে পানি দিতে অস্বীকার করিল। উষর মরু ভূমিতে পানি বিহনে নবী করীম (সাঃ) এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর শিবিরে হাহাকার পড়িয়া গেল। নারী ও শিশুরা ক্রন্দন করিতে লাগিল। ৯ই মুহররমের দিবাগত রাত্রিকে আশুরার রাত্রি বলা হয়। সেই আশুরার রাত্রিতে কেহই আহার গ্রহণ করিলেন না। আসন্ন যুদ্ধের পরিণতি হিসেবে সকলেরই মৃত্যু অবধারিত; তাই সকলেই কলেমা শাহাদাত পাঠ করিতে লাগিলেন।

এই রাত্রিতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাহেব হযরত নবী করীম (সাঃ) কে স্বপ্নে দেখিলেন। তদীয় পবিত্র চেহারা মোবারক বিশুষ্ক ও শোক মলিন। তদীয় হস্ত মোবারকে একটি বোতল। বোতলে লাল রং এর জলীয় পদার্থ। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) জানিতে চাহিলেন, উক্ত বোতলে কি আছে? হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমাইলেন, "এইমাত্র আমি কারবালা হইতে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ দেখিয়া আসিলাম। এই বোতলে তাহারই পবিত্র রক্ত রক্ষিত আছে।"

পরদিন অর্থাৎ ১০-ই মুহাররম ভোর বেলায় ইমাম ছাহেব শিবিরের সকলের সহিত মিলিত হইলেন। বলিলেন, এজিদ বাহিনী শুধু আমাকেই চায়। তোমাদের তাহারা বিনা কারণে বধ করিবে না। সুতরাং তোমরা আমাকে ত্যাগ করিয়া নিজ নিজ গন্তব্য স্থানে যাও। প্রাণ রক্ষা কর। ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের এই প্রস্তাবে সকলেই বিলাপ করিয়া উঠিলেন। বলিলেন, ইমাম (রাঃ) ছাহেবকে একা রাখিয়া প্রাণ থাকিতে তাহারা কোথাও যাইবেন না। ইমাম ছাহেব প্রতি উত্তরে বলিলেন, "ভাই ও বন্ধুগণ! তোমাদের এই আত্মত্যাগ যেন আল্লাহতায়ালা কবুল করেন ও তোমাদের যেন পুরষ্কৃত করেন। অতঃপর ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব সকলকে যুদ্ধ সাজ পরিতে বলিলেন। নিজেও যুদ্ধ সাজ পরিলেন। অতঃপর ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব ব্যূহ রচনা করিলেন। সেই ব্যূহতে মাত্র ৪০ জন অশ্বারোহী ও ৩৪ জন পদাতিকের একটি ক্ষুদ্র দল, তাহাদের কেহ বা গোলাম, কেহবা গৃহ ভৃত্য; কেহবা উষ্ট্রের রাখাল বা সহিস যোদ্ধা। তাহাদেরকে ডাইনে ও বামে রাখিয়া তিনি নিজের জন্য মাঝখানে স্থান নির্বাচন করিলেন। অতঃপর অশ্ব ছাড়িয়া একটি উষ্ট্রীর পিঠে সওয়ার হইয়া যুদ্ধ বিরতির শেষ চেষ্টা করিতে শত্রু বাহিনীর সম্মুখে হাযির হইলেন। ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন-"হে নবী (সাঃ) এর উম্মতগণ! তোমরা যাহারা জান এবং জান না, তোমাদের সকলের উদ্দেশ্যে বলিতেছিঃ আমি হযরত রাসূলে করীম (কঃ) এর নাতি, বীর শ্রেষ্ঠ হযরত আলী (কঃ) এবং জগত মাতা হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর পুত্র। আমি সেই হোসেন যাহার সম্বন্ধে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, আমি বেহেশতের যুবকগণের সর্দার হইব এবং আমার বেহেশতে দাখিল আল্লাহতায়ালা কর্তৃক অংগীকারকৃত। আমি জীবনে কখনও শরীয়তের বিধি নিষেধ লংঘন করি নাই। তোমরা কি সেই হোসেনকে আজ বধ করিতে আসিয়াছ? তোমাদের কি হইয়াছে যে, তোমরা প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় নাতিকে বধ করিতে চাও? তোমাদের মনে কি আল্লাহ ভীতি নাই? রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রতি মহব্বত নাই? আমিতো কাহারও কোনো প্রকার ঋণ অপরিশোধিত রাখি নাই। কাহারও ক্ষতি করি নাই। তাহা হইলে তোমরা কেন আমার হত্যাকে হালাল মনে কর। আমিতো দুনিয়ার বাদশাহী ত্যাগ করিয়া মদীনায় আল্লাহতায়ালার ধ্যানে মগ্ন ছিলাম। শত্রুর অত্যাচারে মদীনা ছাড়িয়া মক্কায় আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নিলাম। অতঃপর তোমরা কুফা বাসীদের আমন্ত্রণেই আমি কুফায় আসিয়াছি। তোমরাতো হাজার হাজার লোক আমার নিকট বায়াত হইবার জন্য প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে। তোমরা শুধু বিশ্বাসই ভংগ কর নাই; উপরন্তু আমাকে হত্যা করিতে আসিয়াছ। আজ আমি তোমাদিগকে সেই কথাই বলিব, যাহা বলিয়া হযরত মুসা (আঃ) ফেরাউনকে আহ্বান করিয়াছিলেন। জগত স্রষ্টা আল্লাহতায়ালার নিকট আমার ও তোমাদের জন্য করুণা ও রহমত ভিক্ষা চাহিতেছি। যদি তোমরা আমাকে সহায়তা করিতে না পার, অন্ততঃ তোমরা আমাকে হত্যা করিও না। আমাকে পথ ছাড়িয়া দাও আমি মক্কা অথবা মদীনায় ফিরিয়া যাই।"

বিজ্ঞাপন

হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর কথায় কেহ কোনো প্রত্যুত্তর করিল না। অতঃপর আকাশের দিকে হাত তুলিয়া তিনি মুনাযাত করিলেন, "ইয়া এলাহী! আমি সংকটাপন্ন। তুমিই আমার একমাত্র ভরসা।" ইমাম ছাহেব অতঃপর নিজ ব্যূহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। তিনি নিজে যুদ্ধ আরম্ভ করিবার দুর্নাম গ্রহণ করিলেন না। শত্রুপক্ষই তাহার বাহিনীর উপর প্রথমে আঘাত হানিল। প্রথমে এজিদ বাহিনীর সেনাপতি আমর তীর নিক্ষেপ করিল। অতঃপর দুইজন পদাতিক সৈন্য আসিল। যুদ্ধ শুরু হইল। কিছুক্ষণ পরেই এজিদ বাহিনী বুঝিল, অর্ধভুক্ত ও পিপাসিত হইলেও মদীনার বাহিনীর সহিত দ্বন্দ্ব যুদ্ধে টিকিয়া থাকা দুস্কর। তখন তাহারা দূর হইতে তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের বাহিনীও সাধ্যানুযায়ী উত্তর দিতে লাগিল। সেনাপতি হোর ও তাহার অনুচরগণ এজিদ বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাইয়া নিজেরা নিহত হইলেন। শহীদ মোসলেমের দুই পুত্র শহীদ হইলেন। ইমাম হোসেন (রাঃ) এর ভাগিনা জয়নাবের দুই পুত্রও শহীদ হইলেন। সেদিন জুমার দিন ছিল। জুমার নামাজ উপলক্ষেও শত্রুবাহিনী আক্রমণ বন্ধ করিল না। ইমাম ছাহেবের বাহিনী যুদ্ধ রত অবস্থায় অগ্র পশ্চাৎ করিয়া নামাজ আদায় করিলেন। ইমাম ছাহেবের বাহিনীর যে কয়জন অনুগত সেবক ছিল, তাহারা একে একে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। ইমাম বংশের সদস্যরা, কিশোর ও যুবকগণও অবশেষে যুদ্ধের সাজ পরিয়া রণক্ষেত্রে শত্রু নিধন করিয়া শাহাদাত বরণ করিলেন। ইমাম হাসান (রাঃ) এর পুত্র মহাবীর কাসেম যুদ্ধে গমন করিলেন। মাত্র কিছু দিন পূর্বে ইমাম হোসেন (রাঃ) এর কন্যা সখিনার সহিত তাহার বিবাহ হইয়াছিল। কাসেমকে যুদ্ধে যাইতে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) বারণ করিয়াছিলেন। কিন্তু নিশ্চেষ্ট অবস্থায় তিনি স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু দেখিবেন? মহাবীর কাসেম সেরূপ ছিলেন না। তিনি যুদ্ধে গমন করিয়া সিরিয়া বাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ বীর আজকরকে হত্যা করিলেন। ইহা দেখিয়া সিরিয়া বাহিনীতে ত্রাস সঞ্চার হইল। সিরিয়া কমান্ডার আমর তখন সমস্ত সৈন্যগণকে এক যোগে মহাবীর কাসেমের উপর আঘাত হানিতে আদেশ দিল। শত্রুর সমবেত আক্রমণে তিনি প্রাণ দান করিলেন। অতঃপর জ্যেষ্ঠপুত্র আলী আকবর আসিলেন ইমাম ছাহেবের নিকট বিদায় লইতে। অশ্রু সম্বরণ করিয়া ইমাম ছাহেব তাহাকেও বিদায় দান করিলেন। কিশোর পুত্র আলী ছাদও ভাইয়ের সহিত যুদ্ধে গমন করিলেন। উভয় ভ্রাতাই শহীদ হইলেন।

একে একে তিনটি পুত্র শহীদ হইল। এক্ষণে হযরত ইমাম ছাহেব নিজ তাবুর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। স্ত্রী, কন্যা, ভগিনীদের শেষ উপদেশ দান করিলেন ও তাহাদের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন। সর্ব কনিষ্ঠ পুত্র অসুস্থ্য জয়নাল আবেদীন উম্মে কুলসুমের কোলে ছিলেন। ইমাম ছাহেব বলিলেন, “এই বালকটিকে তোমরা সযত্নে রক্ষা করিও-নবী করীম (সাঃ) এর গুপ্তধন, মহামূল্য বেলায়েত, যাহা আমি আমার পিতা ও ভ্রাতার নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছি; তাহা এই বালকের বক্ষে আমানত রাখিলাম। এই বালকের মাধ্যমেই নবীর বেলায়েত অর্থাৎ রূহানী জগতের অনুশাসন দুনিয়ায় জারী থাকিবে।” এই বলিয়া নবী করীম (সাঃ) এর দৌহিত্র নিজ বক্ষের সহিত পুত্র জয়নালের বক্ষ চাপিয়া ধরিলেন। অতঃপর যুদ্ধের জন্য রণক্ষেত্রে অগ্রসর হইলেন। তিনি প্রিয় অশ্ব দুলদুলে সওয়ার হইলেন, পিপাসায় কাতর ইমাম ছাহেব প্রথমে নদীর দিকে ছুটিলেন। সম্মুখে যাহাকে পাইলেন, তাহাকেই কাতেল করিলেন। এজিদ সেনাপ্রধান সীমার আমরকে বলিল, পিপাসার্ত অবস্থায়ই হোসেনের সম্মুখে কেহই দাঁড়াইতে পারে নাই। পিপাসা মিটিয়া গেলে তো কেহই তাহার সম্মুখে দাঁড়াইতে পারিবে না। ততক্ষণে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব পানিতে নামিয়া হাতের কোষ ভরিয়া মুখে তুলিতে যাইবেন। হঠাৎ তাঁহার মনে হইল, এই পানির জন্যই একে একে তিন পুত্র প্রাণ বিসর্জন দিয়াছে-আপন স্বজন সহচরগণ প্রাণ দিয়াছেন-আর তিনি পানি পান করিবেন-তাহা হয় না। তিনি হাতের কোষের পানি ফেলিয়া দিলেন। হঠাৎ শত্রু নিক্ষিপ্ত একটি তীর আসিয়া তাহার ওষ্ঠে বিদ্ধ হইল। নদীর পানি ইমাম ছাহেবের রক্তে লাল হইয়া উঠিল। মুখের তীর বহু কষ্টে নির্গত করিয়া শত্রুর উপর আবার ঝাপাইয়া পড়িলেন। তাহার সম্মুখে যে পড়িতে লাগিল সেই নিধন হইল।

সীমার তখন তাহার সৈন্যদলকে একটু দূর হইতে ইমাম ছাহেবকে ঘিরিয়া ফেলিতে আদেশ দিল। তাহার পর সকলে মিলিয়া একযোগে ইমাম ছাহেবের উপর তীর, বল্লম ও বর্শা দ্বারা আক্রমণ করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে পশ্চাৎ দিক হইতে আসিয়া একজন এজিদ সৈন্য ইমাম ছাহেবের বাম হস্তকে দিখন্ডিত করিয়া দিল। ইমাম ছাহেব ডান হাতে তলোয়ার চালাইয়া তাহাকেও দ্বিখন্ডিত করিলেন। অতঃপর সীমারের বাছাইকৃত কিছু সৈন্য এক যোগে আর একটু নিকটে আসিয়া ইমাম ছাহেবের উপর বর্শা দ্বারা আক্রমণ করিল। একটা বর্শা হযরত ইমাম ছাহেবের বক্ষে প্রবেশ করিল। তিনি ভূ-পাতিত হইলেন। অতঃপর সীমার হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শিরোচ্ছেদ করিল। ইমাম ছাহেব শাহাদত বরণ করিলেন।

বিজ্ঞাপন

এই রূপে কারবালার প্রান্তরে জগতের ইতিহাসে সত্যের জন্য সব চেয়ে বড় আত্মত্যাগের ঘটনা ঘটিল। তত্সংগে এজিদ কর্তৃক প্রতারণা, শঠতা, বিশ্বাস ভংগ এবং সব চেয়ে জঘন্য পৈশাচিক ও বীভৎস হত্যাকান্ড সমাপ্ত হইল।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ও তদীয় প্রথম দুই খলিফা সামগ্রিকভাবে আরব-আজম নির্বিশেষে সকলেরই সম্মান লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু হযরত ওসমান (রাঃ) এর সময় হইতেই রাসূলে করীম (সাঃ) এর পূর্বকালে যে গোষ্ঠী-বিভেদ আরবে বিদ্যমান ছিল-তাহা পুনরায় দেখা দেয়। বস্তুতঃ মোয়াবিয়া ছিলেন উমাইয়া বংশ উদ্ভূত, যে বংশ হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর বংশ বনি-হাশেমীদের চির শত্রু। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মহান ব্যক্তিত্ব ও আত্মিক প্রভাবে এই দুই বংশের মধ্যে সাময়িক সদ্ভাব আসিয়াছিল বটে। কিন্তু হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এবং প্রথম দুই খলিফার ওফাতের পরে সেই সম্ভাব আবার নষ্ট হইয়া যায়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এবং তদীয় খলিফাবর্গের আমলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালিত হইত আল্লাহতায়ালার দিক নির্দেশনা প্রাপ্ত যোগ্য ব্যক্তিত্ব দ্বারা। পক্ষান্তরে খেলাফতের আমলের পর যাহারা ক্ষমতায় আসিলেন, তাহারা পরিচালিত হইলেন পার্থিব ক্ষমতা দ্বারা। তাহারা শক্তি ও শঠতাকেই মনে করিলেন রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি। ইসলামের অন্তর্নিহিত যে মর্মবাণী সেই মর্মবাণীকে তাহারা অগ্রাহ্য করিলেন। সেই ধারা আজও বর্তমান রহিয়াছে। রাষ্ট্রীয় শক্তিসমূহ আল্লাহতায়ালার দিক নির্দেশনা ব্যতীত পরিচালিত হইতেছে। শক্তির দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার কারণে কখনও যেমন অত্যাচার অবিচার বাড়িয়াছে আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার জন্য কেহ কেহ শরীয়তের প্রকাশ্য আদেশ-নিষেধের সহিত আপোষ করিয়া নিজের ক্ষমতায় আকড়াইয়া থাকিয়াছেন। পক্ষান্তরে রাসূলে করীম (সাঃ) হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কে স্বপ্নে যে আদেশ দেন তাহাতে বোঝা যায় যে, অসত্য ও অধর্মের সহিত আপোষ করিয়া টিকিয়া থাকার চেয়ে আত্মত্যাগই সর্বোত্তম পন্থা। তাহাই ইসলামের বিধান। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর আত্মত্যাগ সেই উদ্দেশ্যেই। আল্লাহতায়ালার দিক নির্দেশনা তাহারাই প্রাপ্ত হন, যাহারা আল্লাহতায়ালার নৈকট্য জ্ঞান ও গুণ এবং প্রতিনিধিত্ব লাভ করেন। তাহারাই প্রকৃত পক্ষে সমাজে আত্ম স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠিয়া ন্যায় প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন। যাহারা এই গুণ অর্জন করিতে পারেন না, তাহারা সমাজে ন্যায় নীতি টিকাইয়া রাখিতে পারেন না। তাহারাই স্বার্থ ও শক্তির দাপট দ্বারা ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিতে চাহেন যাহার শেষ রক্ষা হয় না। এক পাশবিক শক্তি আর এক পাশবিক শক্তির দ্বারাই পরিচালিত হয়। এই ধারার বর্তমানতার জন্যই সারা পৃথিবীতে আজ বিশৃংখলা। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার। মানবতার বন্ধন ও ন্যায় নীতি আজ ইতিহাসের বিষয়। হযরত উমর (রাঃ) ইসলামের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী খলিফা হইয়াও যে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করিয়াছেন, যে ভাবে মানবতার নীতি ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছেন, মোয়াবিয়া তাহা পারেন নাই। কারণ আল্লাহতায়ালার যে নৈকট্যগুণ হযরত উমর (রাঃ) এর মত ব্যক্তিত্বের মধ্যে আল্লাহভীতি, ন্যায় নীতি ও মানবপ্রেম জন্ম দিয়াছিল, আল্লাহতায়ালার নৈকট্যগুণের সেই শিক্ষা ও আদর্শ মোয়াবিয়ার মধ্যে ছিল না। কারবালার আদর্শ তাই সত্য ও অসত্যের দ্বন্দ্ব বলিতে যে সত্যকে নির্দেশ করে সেই সত্য হইল আল্লাহতায়ালার নৈকট্য জ্ঞানের সত্য; অন্য কোনো সত্য নয়। সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ইসলামের সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্ব তাই আবার ফিরিয়া আসিতে পারে। কারণ আল্লাহতায়ালাই সকল জ্ঞানের ও গুণের অধিকারী, আল্লাহতায়ালার নৈকট্য জ্ঞানের প্রতিষ্ঠার জন্যই হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) প্রাণ বিসর্জন দিয়াছেন। তাই কারবালার শিক্ষা অনুযায়ী আল্লাহতায়ালার নৈকট্য জ্ঞানের মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিফলিত করিয়াই মুসলমানগণ আবার পূর্ণ ইসলাম কায়েম করিতে পারে। আর এই লক্ষ্যের প্রয়োজনে মুসলমানদের ইমাম ছাহেবদের মত প্রাণ বির্সজন দেবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইতে হইবে। ইহাই কারবালার শিক্ষা। তাই মোমিন মুসলমানদের নিকট আমার আহ্বান, আপনারা কারবালার শিক্ষা অনুযায়ী আল্লাহতায়ালার নৈকট্য জ্ঞানের আদর্শ ও মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে সত্য ও সম্পূর্ণ ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করিতে নিয়ত করুন ও অগ্রসর হউন। এই উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তির সন্ধান করুন ও তাহার নৈকট্য হইতে খোদা প্রাপ্তি জ্ঞান ও গুণের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা অনুধাবন করুন।

আমার দয়াল পীর দস্তগীর হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন আল্লাহতায়ালার জ্ঞানে প্রকৃত জ্ঞানী ও আল্লাহতায়ালার পথে প্রকৃত হেদায়েতকারী। তাই তাহার আদর্শ অনুধাবন করিবার চেষ্টা করুন। তাহার জ্ঞানে জ্ঞানী হইয়া ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরুন। তাহার আদেশ-নিষেধ পালন করিয়া চলুন, তাহার নীতি ও আদর্শকে অনুসরণ করুন ও সর্বস্তরে তাহা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করুন।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব জানাইয়া গিয়াছেন, "আখেরী জামানায় হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ) আবির্ভূত হইয়া তদীয় আত্মিক প্রভাবে সমস্ত মুসলমানদের আবার এক করিবেন ও ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব আবার দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করিবেন।" হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর পূর্ণ আত্মিক নেছবতের অধিকারী আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর জানাইয়াছেন, "হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ) এর আর্বিভাবের সময় নিকটবর্তী।” তিনি আরও জানাইয়াছেন, ইমাম ছাহেব মুজাদ্দেদী তরিকার অন্তর্ভুক্ত হইবেন। বর্তমান জামানায় আমার পীর কেবলাজান হুজুর হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের ধারাই তরিকায়ে মুজাদ্দেদীয়ার সর্বাপেক্ষা বেগবান ধারা। তাই আপনারা হযরত ইমাম ছাহেবের পতাকাতলে সমবেত হইবার জন্য, তাহার হেদায়েত প্রাপ্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকিবার জন্য আমার দয়াল পীর কেবলাজানের পতাকাতলে সমবেত হউন। আজিকার এই পবিত্র দিনে এই-ই আমার নসিহত। আল্লাহতায়ালা তাহাদের হেদায়েত দান করুন, যাহারা আল্লাহতায়ালার রাজীতে রাজী থাকিয়া সত্য ইসলামের পতাকা উড্ডীন রাখিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে। জাকেরানদের প্রতি আমার নসিহত, তোমরা ইসলামকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও। আল্লাহ তোমাদের দৃঢ় ঈমান দান করুন ও ইসলামের পতাকাতলে সর্বাবস্থায় দৃঢ় থাকিবার তৌফিক এনায়েত করুন। দু'আ। ইতি!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD