Logo

কারবালার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীন

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৫৬
কারবালার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীন
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘মুহারাম’ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কারবালার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীনের শৈশব ও কৈশোরঃ

বিজ্ঞাপন

নসিহত নং-৪৬ এ কারবালায় সংঘঠিত শোকাচ্ছন্ন ঘটনা প্রবাহ কেন্দ্রিক আলোচনা বিধৃত হইয়াছে। নসিহত-৪৭ এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কারবালার উক্ত মর্মন্তুদ ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করা হইয়াছে।

সত্যের আদর্শ রক্ষায়, অন্যায় ও অসত্যের নিকট মাথানত না করিয়া কারবালার মরু প্রান্তরে রাসূলে পাক (সাঃ) এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব আত্মীয় পরিজনসহ অকাতরে প্রাণ দান করিলেন। নবী বংশের মধ্যে নারীরা ব্যতীত পুরুষদের মধ্যে একমাত্র জয়নাল আবেদীন ছাড়া সকলেই শাহাদাত বরণ করিলেন। আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও অনুকম্পায় নবী বংশের একমাত্র প্রদীপ জয়নাল আবেদীন প্রাণে বাঁচিয়া গেলেন। এই জয়নাল আবেদীন ছিলেন কারবালার ঘটনার প্রত্যক্ষ দর্শী। কাজেই কারবালার আলোচনা অধ্যায়ে জয়নাল আবেদীনের জীবনচরিত আলোচনা নিতান্তই প্রয়োজন বলিয়া মনে হয়। এ নসিহত সেই চেষ্টারই প্রতিফলন।

ইমাম জয়নাল আবেদীনের পিতৃপরিচয় এখানে নিষ্প্রয়োজন। তবে মাতৃপরিচয় উল্লেখের দাবী রাখে। তাঁহার মাতা ছিলেন পারস্যের সম্রাট রাজা ইয়াজদেগারদের কন্যা শাহরেবানু। ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের সহিত পারস্য রাজ-তনয়া শাহরেবানুর পরিণয় কিভাবে হয়, সে সম্পর্কে কিছু আলোচনা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

তখন হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেবের শাসনামল। মুসলিম সাম্রাজ্যের পরিধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাইতেছে। নতুন নতুন এলাকাতে ইসলামী পতাকা শোভা পাইতেছে। সেই সময়ে মুসলমানদের শক্তিশালী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল-পারস্য অধিপতি ও রোম সম্রাট। হযরত উমর (রাঃ) ছাহেব একদল মুসলিম সেনাকে পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠাইলেন। পারস্য সম্রাট ইয়াজদেগারদ বার বার চেষ্টা করিয়াও মুসলিম সেনাদের সাথে পারিয়া উঠিলেন না। অবশেষে রাজধানী মাদায়েন থেকেও বিতাড়িত হইলেন। ইসলামী নীতিতে পরাজিতদের উপর অস্ত্র চালানো নিষিদ্ধ ছিল। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) ছাহেবও পারস্য অভিযানে প্রেরিত মুসলিম সেনা বাহিনীর সেনাপতিকে নির্দেশ দিয়াছিলেন, যদি পারস্যাধিপতি শত্রুতা হইতে বিরত থাকে, তাহা হইলে তোমরা আর অগ্রসর না হইয়া তোমাদের বিজিত এলাকায় জনসাধারণের কল্যাণ সাধনে মনোযোগ দান করিবে। কিন্তু পরাজিত ও রাজধানী হইতে বিতাড়িত সম্রাট ইয়াজদেগারদ পুনরায় তাহার সৈন্য দলকে পুনর্গঠিত করিলেন এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র চীনের সম্রাট খাকানের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। চীন-সম্রাটও মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন। রাজা ইয়াজদেগারদের সাথে তিনিও হাত মিলাইলেন। বিরাট একদল সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করিলেন সম্রাট ইয়াজদেগারদের সাহায্যে। ফলে এইবার মুসলিম বাহিনীকে মোকাবেলা করিতে হইল চীন ও পারস্য-দুই সাম্রাজ্যের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে। মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। রাজা ইয়াজদেগারদ নিহত হইলেন। তাহার প্রচুর সৈন্য বন্দী হইল। সংগে বন্দী হইলেন পারস্য সম্রাট ইয়াজদেগারদের পরিবার-পরিজন। বন্দিনীদের মধ্যে সম্রাট ইয়াজদেগারদের তিন জন কুমারী কন্যাও ছিলেন। যুদ্ধবন্দী ও বন্দিনীদেরকে খলিফা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেবের সমীপে প্রেরণ করা হইল।

সেই সময় যুদ্ধবন্দীদেরকে তাহাদের অবশিষ্ট জীবন ক্রীতদাস-দাসীরূপে অতিবাহিত করিতে হইত। রাজপরিবারের কেহ বন্দী হইলে তাহাকেও একইরূপে অমানবিক জীবন যাপন করিতে হইত। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ইসলামে। ইসলামে রাজবন্দী বা বন্দিনীদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করা হইত।

খলিফা হযরত উমর (রাঃ) ছাহেব রাজা ইয়াজদেগারদের কুমারী কন্যাত্রয়কে লইয়া ভাবনায় পড়িলেন। তিনি সভা আহবান করিলেন সভায় উক্ত বিষয়ে আলাপ আলোচনা হইল। সভ্য মন্ডলীর সবাই আপন আপন মতামত ব্যক্ত করিলেন কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না। এই দিকে সভার একপ্রান্তে বসিয়া আছেন পারস্য রাজকুমারীত্রয়। তাহাদের চেহারা মলিন ও বিষন্ন। হয়তো বাকী জীবন ক্রীত দাস-দাসীদের মত অতিবাহিত করিতে হইবে। আর খলিফা মুক্তি দিলেও আগের জীবন আর তাহারা ফেরত পাবেন না। কারণ তাহাদের পিতা নিহত। রাজ্য হাতছাড়া। তাই তাহারা অপেক্ষায় থাকিলেন খলিফার সিদ্ধান্তের প্রতি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সভ্যমন্ডলীর আলোচনায় শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না। অতঃপর খলিফা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব ফায়সালার দায়িত্ব দিলেন হযরত আলী (কঃ) এর উপরে। হযরত আলী (কঃ) যে সিদ্ধান্ত দিলেন, তাহাতে সকলেই খুশী হইলেন।

হযরত আলী (কঃ) বলিলেন, "এই কুমারীত্রয় দুনিয়ার অন্যতম সেরা খান্দান-তনয়া। ভাগ্যের বিবর্তনে আজ তাহারা আমাদের আশ্রিতা। ইসলামের সুমহান নীতি ও ন্যায়ের খাতিরেই আমরা তাহাদের সাথে কোন অন্যায় আচরণ করিব না। আমার অভিমত-তাহাদের জন্য একটা মুক্তিপণ নির্ধারন করা হউক। তাহাদের পক্ষ হইতে আমি নিজেই তাহা বায়তুলমালে জমা দিয়া দিব। অতঃপর তাহাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করিয়া মদীনার কোন অভিজাত খান্দানের তিনজন যুবকের সাথে বিবাহ দেওয়া হোক। তাহারা যদি ইহা পছন্দ না করেন, তবে তাহাদেরকে তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী স্বাধীনভাবে বসবাস করার অধিকার দেওয়া হোক।"

হযরত আলী (কঃ) এর উক্ত সিদ্ধান্তে রাজা ইয়াজদেগারদের কুমারীত্রয় আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিলেন। হযরত আলী (কঃ) এর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় তাহাদের হৃদয় ভরিয়া গেল। তাহারা হযরত আলী (কঃ) এর নিকটে ইসলাম গ্রহণ করিলেন। অতঃপর তিনজন বিশিষ্ট যুবকের সাথে তাহাদের বিবাহ সম্পন্ন হইল। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) এর পুত্র আব্দুল্লাহর সাথে বিবাহ হইল জ্যেষ্ঠ কুমারীর। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের পুত্র মুহাম্মদের সাথে বিবাহ দেওয়া হইল মধ্যমা কন্যার এবং কনিষ্ঠা কন্যাকে বিবাহ দেওয়া হইল হযরত আলী (কঃ) এর পুত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের সহিত। এই তিনটি শুভ পরিণয় সম্পন্ন হওয়ার পরে হযরত আলী (কঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন যে, আরব আজম-এই দুইটি অভিজাত রক্ত ধারার সংমিশ্রণে আল্লাহপাক নিশ্চয় ইহাদেরকে দুনিয়ায় সেরা প্রতিভাবান সন্তান দান করিবেন।

বিজ্ঞাপন

হযরত আলী (কঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে প্রমাণিত হইয়াছিল। তিনজনের গর্ভেই জগৎবিখ্যাত তিনজন মহাপুরুষের জন্ম হইয়াছিল। জ্যেষ্ঠ কন্যার গর্ভজাত পুত্র ছিলেন হযরত ইমাম ছালেস ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) এবং মধ্যমার গর্ভজাত পুত্র ছিলেন হযরত ইমাম কাসেম ইবনে মোহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ)। উল্লিখিত দুই ব্যক্তিত্বই ইসলামী ফিকাহশাস্ত্রের জগৎবিখ্যাত আলেম ছিলেন। আর রাজা ইয়াজদেগারদের কনিষ্ঠা কন্যার গর্ভজাত সন্তান ছিলেন সাধককুলের সম্রাট হযরত ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ)।

যে সত্যাদর্শ সমুন্নত রাখার জন্য হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব মিথ্যার নিকট মাথানত না করিয়া প্রাণদানকে শ্রেয় মনে করিয়াছিলেন; সেই সত্যাদর্শ মুসলিম রাজ্যে পুনরায় ইমাম জয়নাল আবেদীনের মাধ্যমেই প্রচার ও প্রসার লাভ করিয়াছিল।

জয়নাল আবেদীন মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় তদীয় মাতা রাজা ইয়াজদেগারদ-তনয়া মনে মনে স্থির করিলেন, গর্ভজাত সন্তান পুত্র হইলে নাম রাখিবেন "আলী"। কারণ তিনি তাহার শ্বশুর হযরত আলী (কঃ) কে যারপরনাই শ্রদ্ধা করিতেন। হযরত আলী (কঃ) এর প্রস্তাব ও মুক্তিপণ প্রদানের কারণেই তাহারা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিবার সুযোগ পাইয়াছিলেন। শুধু তাই নয়, তাহারই সুচিন্তিত মতামতের কারণে তিনি মদীনার শ্রেষ্ঠতম বংশের পুত্রবধু হওয়ারও সৌভাগ্য লাভকরিয়াছেন। তাই হযরত আলী (কঃ) এর প্রতি তাহার ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল অগাধ।

বিজ্ঞাপন

যথাসময়ে জয়নাল আবেদীন ভূমিষ্ঠ হইলেন। গর্ভধারিণী শাহরেবানু তাহার সিদ্ধান্তের কথা স্বামীকে জ্ঞাপন করিলেন। স্বামী হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব চিন্তায় পড়িলেন। তাহার প্রথম স্ত্রীর গর্ভেও একজন পুত্র সন্তান হইয়াছে। তাহারও নাম রাখা হইয়াছে 'আলী'। কিন্তু শাহরেবানুরও আকাংখা-তাহার এই সন্তানটির নামও আলী রাখিতে হইবে। জ্ঞানী ও বিচক্ষণ পিতা এই পুত্রেরও নাম রাখিলেন "আলী"। তবে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখিবার জন্য প্রথম পুত্রের নামের শেষে যোগ দিলেন আকবর এবং ছোট ছেলের নামের শেষে যোগ দিলেন আছগর। কাজেই পুত্রদ্বয়ের নাম দাঁড়াইল-আলী আকবর ও আলী আছগর।

এই আলী আছগরের উপাধিই হইল জয়নাল আবেদীন। ইহার অর্থ সাধককুলের ভূষণ। পরবর্তীতে আলী আছগর খোদাপ্রাপ্তির পথে সুকঠিন সাধনার মাধ্যমে আশাতীত সফলতা অর্জন করেন। তাহার যশঃ খ্যাতি মুসলিম রাজ্যের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়ে। তিনি সাধককুলের ভূষণ বা জয়নাল আবেদীন উপাধিতে ভূষিত হন।

জয়নাল আবেদীন ভূমিষ্ঠ হওয়ার কিছুদিন পরেই শাহরেবানু জ্বরে আক্রান্ত হইয়া ইন্তেকাল করেন। শিশু পুত্রের লালন-পালনের ভার পড়ে ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের অপর এক নিঃসন্তান স্ত্রীর উপর। দায়িত্ব প্রাপ্ত এই নিঃসন্তান স্ত্রী হৃদয় নিংড়ানো স্নেহ-আদরে জয়নাল আবেদীনকে প্রতিপালন করিতে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

হযরত জয়নাল আবেদীনের শিক্ষা শুরু হয় পারিবারিক শিক্ষা কেন্দ্রেই। তাহার পিতা হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব জ্ঞানের উভয় শাখার পান্ডিত্ব অর্জন করিয়াছেন। এলমে বাতেন বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করিয়াছেন আপন পিতা, জ্ঞান শহরের দরজা, হযরত আলী (কঃ) এর নিকট হইতে।

পারিবারিক শিক্ষাকেন্দ্রে পিতার তত্ত্বাবধানে পুত্র জয়নাল আবেদীনের শিক্ষা শুরু হয়। ইহার কিছুদিন পর বালক জয়নাল আবেদীন মসজিদে নববীর শিক্ষাকেন্দ্রে জ্ঞান অর্জনে যাতায়াত শুরু করেন। তদকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষাকেন্দ্র ছিল এই "মসজিদে নববী।" এখান হইতে যেমন ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হইতো, তেমনি প্রদত্ত হইতো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। ধর্মের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান দান করিতেন ইসলামের প্রখ্যাত সব আলেমবর্গ। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) প্রমুখ প্রথিতযশা শিক্ষাদাতাগণই এলমে হাদীস, এলমে তাফসির, এলমে ফিকাহ এবং এলমে বাতেন বা আল্লাহপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। 'মসজিদে নববী'র শিক্ষাকেন্দ্র হইতে জ্ঞান আহরণের জন্য মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা হইতে আগত জ্ঞান অন্বেষীদের ভীড় পড়িত।

হযরত জয়নাল আবেদীন এই মসজিদে নববীতে নিয়মিত ভাবে আসিয়া জ্ঞান আহরণে প্রবৃত্ত হন। জয়নাল আবেদীনকে সকলেই ভালবাসিতেন, স্নেহ করিতেন। মসজিদে নববীর শিক্ষাদাতাগণ অতীব যত্নে হযরত জয়নাল আবেদীনকে শিক্ষাদান করিতে থাকেন। প্রখর মেধাশক্তির কারণে অল্প সময়েই আশাতীত জ্ঞান আহরণ করিতে সক্ষম হন। যতই দিন যায়, বালক জয়নাল আবেদীনের জ্ঞান অর্জনের নেশা ততই বাড়িতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু নবী বংশের উপর একের পর এক বিপর্যয় নামিয়া আসার কারণে বেশীদিন আর তিনি জ্ঞান অর্জন করিতে পারেন নাই। হযরত আলী (কঃ) এর শাহাদাত বরণে নবী বংশের সকলেই ছিলেন শোকাতুর। সেই শোক লাঘব হইতে না হইতেই ইমাম হাসান (রাঃ) ছাহেব মোয়াবিয়ার চক্রান্তের হীন শিকার হন। আততায়ী দ্বারা বিষ প্রয়োগে তাহাকে হত্যা করা হয়। ফলে নবী বংশের সবাই মুষড়িয়া পড়েন। ইহার কিছুদিনের মধ্যেই মুসলিম জাহানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে ঘোলাটে হইতে থাকে। শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় মোয়াবিয়া-পুত্র এজিদ। এজিদ পুনঃপুনঃ ইমাম হোসেন (রাঃ) কে তাহার আনুগত্য স্বীকারের জন্য চাপ প্রয়োগ করিতে থাকে। অপরদিকে কুফাবাসীরা বারবার ইমাম ছাহেবকে কুফায় আমন্ত্রণ জানায়। উদ্দেশ্য-তাহার হাতে বায়াত হওয়া। এহেন অবস্থায় ইমাম হোসেন (রাঃ) কুফার উদ্দেশ্যে মদীনা ত্যাগ করেন। প্রথমে মক্কায় যান। পরে সেখান হইতে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পিতার ক্ষুদ্র কাফেলাতে সেদিন জয়নাল আবেদীনও ছিলেন। কাফেলা শেষ পর্যন্ত কুফায় না পৌঁছাইয়া কারবালায় পৌছে। তাহার পর কারবালার সেই ঐতিহাসিক প্রান্তরে এজিদ সৈন্যগণ কর্তৃক ঘটে জগতের জঘন্যতম পৈশাচিক হত্যাকান্ড। যাহার সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণ বিবরণ নসিহত নং-৪৬ এ দেওয়া হইয়াছে।

কারবালার প্রান্তরে এজিদ সৈন্যদের হাতে সর্বশেষে প্রাণ দান করেন ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব। ইমাম ছাহেবের পূর্বে একে একে শাহাদাত বরণ করেন অনুচরগণ, ইমাম ছাহেবের ভ্রাতৃগণ, ইমাম হোসেন (রাঃ) এর তনয় আলী আকবর, এমনকি কোলের দুগ্ধপোষ্য শিশুও। কেবলমাত্র পুরুষদের মধ্যে আলী আছগর ওরফে জয়নাল আবেদীন অসুস্থ্যতার কারণে শিবির অভ্যন্তরে শায়িত। এই সময়ের দৃশ্য বড় করুণ, বড় হৃদয়বিদারক। একদিকে ফোরাত তীরে এজিদ সৈন্যদের বিজয় উল্লাস, অন্যদিকে শিবির অভ্যন্তরে নারীদের মাতম সুর। একদিকে আনন্দ স্ফুর্তি, অন্যদিকে স্বজন হারানো হাহাকার। এমতাবস্থায় ইমাম ছাহেব ধীর পদক্ষেপে শিবিরে প্রবেশ করিলেন।

হযরত জয়নাল আবেদীন (রঃ) বলেন, "আব্বাজান এই সময়ে শিবিরে প্রবেশ করিয়া কিছু সময় নীরবে বসিয়া থাকিলেন। কাহারো মুখে কোন কথা নাই। শুধু ক্রন্দনের সুর।" তিনি বলেন যে, আমি লক্ষ্য করিলাম, উক্ত সময়ে অগণিত ফেরেশতা দলে দলে শিবিরে প্রবেশ করিয়া আব্বাজীকে বলিতেছে, "হে ইমাম ছাহেব! আপনাকে এই বিপদে সাহায্য করিবার জন্য আমরা আগমন করিয়াছি। আপনি আমাদেরকে আদেশ করুন, জালেমদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দেই। কিন্তু আব্বাজী তাহাদেরকে অনুমতি দিলেন না। বলিলেন, আল্লাহপাকের ইহা বিধান নয়, তোমরা চলিয়া যাও।" ফেরেশতাসকল চলিয়া গেল।

বিজ্ঞাপন

অতঃপর ইমাম ছাহেব ভগ্নি জয়নব ও উম্মে কুলসুমকে ডাকিয়া বলিলেন, "আমার একমাত্র সন্তান জয়নাল আবেদীনকে তোমাদের হেফাজতে রাখিয়া গেলাম। নবী প্রদত্ত এলমে বাতেন বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান, যাহা আব্বাজান ও ভ্রাতার দেল বাহিত হইয়া আমার দেলে পুঞ্জিভূত ছিল-তাহা আমি জয়নাল আবেদীনের দেলে রাখিয়া গেলাম। তাহার অছিলাতে এই জ্ঞানের আলো দুনিয়ার সর্বত্র ছড়াবে ইনশাল্লাহ।"

এই বলিয়া তিনি পুত্র জয়নাল আবেদীন (রঃ)কে নিজ বক্ষের সাথে কিছুক্ষণ চাপিয়া ধরিয়া তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করিলেন এবং নিজ দেলে রক্ষিত আধ্যাত্মিক জ্ঞান পুত্রের দেলে ট্রান্সফার (Transfer) করিলেন।

অতঃপর যুদ্ধের পোশাক পড়িয়া যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে পুত্রকে বলিলেন, "বাবা, তোমার মন কি চায়, বল?"

বিজ্ঞাপন

জয়নাল আবেদীন বলিলেন, "আব্বাজান, আমার মন বলে-আমি যেন তেমন লোকদের মত হইতে পারি যাহারা আল্লাহর দরবারে কখনও কিছু কামনা করে না; যখন যাহা দরকার হয়, তাহা আল্লাহ নিজ থেকেই ব্যবস্থা করিয়া দেন।"

এত শোকের মধ্যেও ইমাম ছাহেব যেন কিছুটা শান্তি পাইলেন। তিনি পুত্রের কল্যাণের জন্য খোদাতায়ালার দরবারে হাত তুলিলেন।

পুত্রকে বলিলেন, 'বাবা, তোমার কথা ঠিক হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর কথার অনুরূপ। নমরূদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বক্ষণে ফেরেশতা সম্রাট জিব্রাইল হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, 'হে আল্লাহর নবী! আপনার কিছু প্রয়োজন থাকিলে বলুন।' জবাবে তিনি বলিয়াছিলেন, 'আল্লাহপাক সব কিছু দেখিতেছেন। আমার জন্য তিনিই যথেষ্ঠ।'

বিজ্ঞাপন

ইহাই ছিল পুত্র জয়নাল আবেদীনের সাথে পিতা ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শেষ কথোপকথোন। ইহার পরই ইমাম ছাহেব ফোরাত কুল উদ্ধারে যান এবং পাষন্ড এজিদ বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন।

কারবালার যুদ্ধশেষে ইমাম বংশের পুরুষগণের মধ্যে জীবিত থাকেন একমাত্র প্রদীপ জয়নাল আবেদীন (রাঃ) ছাহেব। এজিদ সৈন্যদের হাতে ইমাম বংশের জীবিত সকলেই বন্দী হন। ইমাম জয়নাল আবেদীনসহ বন্দিনীদিগকে কুফাভিমুখে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইহার পর হইতে একের পর এক বিপদ আসে ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীনের উপর। কিন্তু আল্লাহপাকের ইচ্ছায় সমস্ত বিপদ থেকেই তিনি রক্ষা পান। বন্দিনীদের মধ্যে জয়নাল আবেদীনকে দেখিতে পাইয়া সীমার তাহাকে হত্যা করিতে উদ্যত হয়। কিন্তু বাধা দেয় এজিদ সেনাপতি আমর। আমর বলিল, "সাবধান সীমার! বন্দী শিশু, নারী ও অসুস্থদেরকে হত্যা করিতে পারিবে না। যদি কর, তাহা হইলে তোমাকেও হত্যা করা হইবে।" সীমার আমরের হুমকিতে তলোয়ার কোষবদ্ধ করে। অতঃপর জয়নাল আবেদীন ও নবীবংশের পুরনারীরা কুফায় ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের সমীপে নীত হন।

ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নির্দেশ ছিল-নবী বংশের কোন পুরুষ যেন জীবিত না থাকে। কিন্তু এক্ষণে বন্দিনীদের মধ্যে জয়নাল আবেদীনকে দেখিয়াই সরোষে সে জিজ্ঞাসা করে, "এই ছেলে, তুমি কে?"

জয়নাল আবেদীন নির্ভীকচিত্তে জবাব দেন, আলী ইবনে হোসেন (রাঃ)। উত্তর শুনিয়া ইবনে যিয়াদ আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিয়া উঠে, তবে আমাকে যে জানানো হইয়াছিল-আলী ইবনে হোসেন নিহত হইয়াছে? জয়নাল আবেদীন বলিলেন, তোমাকে ঠিকই জানানো হইয়াছিল। আমার অপর এক ভাইয়ের নামও আলী। তিনি শাহাদাত বরণ করিয়াছেন।

ইহা শুনিয়া ক্রুদ্ধ ইবনে যিয়াদ উন্মুক্ত তলোয়ারে ইমাম-তনয়কে হত্যা করিতে উদ্যত হয়। তৎক্ষণাৎ জয়নব বিনতে আলী (কঃ) ভ্রাতুষ্পুত্রকে বক্ষে ধারণ করিয়া সন্তান হারা বাঘিনীর ন্যায় গর্জিয়া উঠেন। তিনি বলেন, 'খবরদার নরাধম, এক পাও অগ্রসর হবে না, বলিতেছি। তুমি যদি ইমাম বংশের এই একটি মাত্র সন্তানের প্রতি একটি নখের আচরও প্রদান কর-তাহা হইলে আল্লাহর গজবে তুমি হালাক হইবে।'

ক্রুদ্ধ জয়নবের রুদ্র মুর্তি দেখিয়া ইবনে যিয়াদ খোলা তলোয়ার কোষবদ্ধ করে। কিন্তু ইবনে যিয়াদের উন্মুক্ত তলোয়ার দৃষ্টে জয়নাল আবেদীনের হৃদয়ে বিন্দুমাত্রও ভয়ের সঞ্চার হইল না। ঈমানী তেজে বলীয়ান ইমাম-তনয় ইবনে যিয়াদকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “হে ইবনে যিয়াদ! তুমি আমাকে হত্যা করিতে চাও: কিন্তু আমি আল্লাহর কালামের প্রতি অবিচল বিশ্বাস রাখিয়া বলিতেছি-যদি আল্লাহর ইচ্ছা না হয়, তাহা হইলে তোমার মত শত ইবনে যিয়াদেরও সাধ্য নাই-যে আমাকে হত্যা করে। আর যদি আমার মৃত্যুই আল্লাহর মর্জি হয় তাহা হইলে আমাকে কেহই রক্ষা করিতে পারিবে না।" কর্তব্যপরায়ণ ইমাম-তনয় বলেন যে, "আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে তুমি ইসলামের পুরনারী এই সম্মানিতা মহিলা ও নিষ্পাপ শিশুগণকে কোন ধর্মভীরু ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে মদীনায় পাঠাইয়া দিও।"

ইবনে যিয়াদের সাথে জয়নাল আবেদীনের কথা কাটাকাটি এখানেই সমাপ্ত হয়। ইবনে যিয়াদ সরোষে দরবার কক্ষ ত্যাগ করে। অতঃপর জয়নাল আবেদীনসহ বন্দিনীগণকে প্রেরণ করা হয় সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে-এজিদের সমীপে।

পাষন্ড এজিদ ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীনের আনুগত্য দাবি করে। কিন্তু জয়নাল আবেদীন কোন মতেই এজিদের খেলাফত মানিয়া লইতে রাজী নহেন। কৌশলে বায়াত লইতে ব্যর্থ হইয়া এজিদ ইমাম হোসেন (রাঃ) সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করে। কারবালার ঘটনার সমুদয় দোষ সে চাপায় ইমাম ছাহেবের প্রতি। সে ইমাম-পুত্রকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, 'হে জয়নাল আবেদীন! তোমার পিতা খেলাফত লাভের জন্য যে অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছিল-তাহার প্রতিফল সে পাইয়াছে। কারবালার ঘটনার সমুদয় দায়-দায়িত্ব তাহারই।'

এজিদের এই উক্তির প্রতিবাদে ফাটিয়া পড়েন ইমাম ভগ্নি, আলী-নন্দিনী জয়নব। তিনি সরোষে এজিদকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়া উঠেন, 'হে পাষন্ড এজিদ! তুমি কাহার সম্পর্কে এমন উক্তি করিতেছ? এই বংশের নর-নারীগণকে আল্লাহতায়ালা অন্যায় ও মিথ্যার কলংক থেকে পবিত্র রাখিয়াছেন। বরং অন্যায় ও মিথ্যার দ্বারা তোমরাই কলংকিত। হে এজিদ! তোমার কি এতটুকু লজ্জা নাই, যে নবী-গৃহের পুরনারীগণ সদা-সর্বদা অপরিচিত লোকদের চোখের আড়ালে অবস্থান করিতেন, তাহাদেরকে তুমি প্রকাশ্য দরবারে বসাইয়া এই ভাবে অপমান করিতেছ?' বিবি জয়নবের এহেন বাক্যবাণে জর্জরিত হয় মোয়াবিয়ার-পুত্র এজিদ। সে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়। তাহার সমস্ত ক্ষোভ জমা হয় ইমাম-নন্দন জয়নাল আবেদীনের প্রতি। তৎক্ষণাৎ সে ইমাম-তনয়কে হত্যার নির্দেশ দেয়। কিন্তু উম্মে কুলসুম নিকটেই ছিলেন। তিনি তখনই উঠিয়া ভ্রাতুষ্পুত্রকে বক্ষে জড়াইয়া ধরিয়া অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক ভাষায় কিন্তু উচ্চস্বরে দয়াল নবী (সাঃ) এর রওজার দিকে মুখ করিয়া নবীজীর উদ্দেশ্যে বলিয়া উঠেন, 'হে আমাদের মাতামহ! নবীদের ছদার; আপনার অতি আদরের দৌহিত্র, আমার কলিজার টুকরা ভাই হোসেন (রাঃ) কে এজিদ গংরা হত্যা করিয়াছে; সংগে আপনার সমস্ত বংশাবলীকে নির্মূল করিয়াছে। এই মুহূর্তে আবার আপনার বংশের অবশিষ্ট একটি মাত্র বাতি, ভাতিজা জয়নাল আবেদীনকেও হত্যার চেষ্টা করিতেছে। আমরা আপনার অছিলা লইয়া ইহাকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করিলাম।” এই বলিয়া বিবি উম্মে কুলসুম এজিদকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, "এজিদ! তোমার পাপের মাত্রা চরমে উঠিয়াছে। তোমার ধ্বংস অনিবার্য।"

উম্মে কুলসুমের আবেগময় মর্মস্পর্শী কথায় কাহার না হৃদয় বিগলিত হয়? এজিদ নরম হইল। হত্যার নির্দেশ প্রত্যাহার করিল। অতঃপর জয়নাল আবেদীনের আনুগত্য নেওয়ার জন্য ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করিল। জয়নাল আবেদীনের সমবয়স্ক তাহার একটি পুত্র সন্তান ছিল। এজিদ ইমাম-তনয়কে বলিল, তোমার সমবয়স্ক আমার যে পুত্র আছে-তাহার সাথে তোমাকে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হইতে হইবে। যদি তুমি জয়লাভকর; বুঝিব তোমাদের বংশের বীরত্বের গৌরব সত্য। আর যদি পরাজিত হও; তবে বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বীর পিতার খেলাফত নিশ্চয় তুমি স্বীকার করিবে

এজিদের ধারণা ছিল-তাহার সুঠামদেহী পুত্রের সাথে মল্লযুদ্ধে ইমাম হোসেনের নন্দন রাজি হইবেন না-ফলে তাহার আনুগত্য সহজেই মিলিবে। কিন্তু এজিদের সে আশা পূরণ হইল না। মহাবীর আলী (কঃ) এর দৌহিত্র জয়নাল আবেদীন এজিদের প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ কবুল করিয়া বলিলেন, 'শুধু মল্ল যুদ্ধ কেন, অস্ত্র চালাইবার পরীক্ষাও হউক।' অস্ত্র চালানোর পরীক্ষার কথা শোনামাত্রই এজিদ তাহার প্রস্তাব প্রত্যাহার করিল। সে জানিত যে, ইমাম বংশের সব পুরুষই অস্ত্র চালানোতে বড়ই দক্ষ ও পারদর্শী। মুসলিম জগতে যাহাদের কোন তুলনা নাই।

অতঃপর পাপিষ্ঠ এজিদ ইমাম-পুত্র জয়নাল আবেদীনকে বলিল, আচ্ছা বল, তুমি আমার নিকট কি চাও? উত্তরে জয়নাল আবেদীন বলিলেন, আগামীকল্য শুক্রবার; তুমি আমাকে জুমার নামাজের খুৎবা পাঠ করিতে দিবে। এজিদ রাজী হইল। কিন্তু পরবর্তী দিনে এজিদ জয়নাল আবেদীনকে খুৎবা পাঠ করিতে না দিয়া মসজিদের নির্ধারিত ইমামকেই খুৎবা পাঠ করিতে নির্দেশ দিল। ইমাম-তনয় সংগে সংগে প্রতিবাদ করিলেন। তিনি এজিদকে বলিলেন, আজকের জুমায় তুমি আমাকে খুৎবা পড়িতে দিবে বলিয়া ওয়াদা দিয়াছিলে। আজ কেন ওয়াদা ভংগ করিতেছ?

ইহা শুনিয়া মসজিদে উপস্থিত সকল মুসুল্লিরা নির্ধারিত ইমামের পরিবর্তে জয়নাল আবেদীন ইবনে হোসেন (রাঃ) এর খুৎবা শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। কারবালায় "নবী বংশ" নিধনের হৃদয়বিদারক ঘটনার কারণে সকলের অন্তরেই চাপা যন্ত্রণা ছিল। ইমাম-তনয়ের ভাষণ শুনিয়া মুসুল্লিরা সেই যন্ত্রণার খানিকটা লাঘব করিতে চায়। এজিদ নামাজীদের আগ্রহাতিশয্যের কারণে ইমাম-নন্দনকে খুৎবা পাঠে অনুমতি দিল। জয়নাল আবেদীন ইবনে ইমাম হোসেন (রাঃ) খুৎবা পাঠের জন্য মিম্বরে গিয়া বসিলেন। মুয়াযযিনকে ছানী আযানের নির্দেশ দেওয়া হইল। মুয়াযযিন আযান দেওয়া শুরু করিলেন। ইমাম-তনয় আযান শুনিতেছেন আর অঝরে কাঁদিতেছেন। ইমাম ছাহেবের সাথে সাথে নামাজীরাও কাঁদিতেছেন। যখন উচ্চারিত হইল, "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ"-তখনই জয়নাল আবেদীন এজিদকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, "ওহে এজিদ! আযানে যাহার নাম উচ্চারিত হইল, তিনি কি তোমার আত্মীয় ছিলেন, নাকি আমার পিতার মাতামহ ছিলেন? সেই মহান আখেরী নবীর রক্ত কি তোমার ধমণীতে প্রবাহিত, নাকি আমার পিতার ধমণীতে? একবার ভাবিয়া দেখ, কাহার বংশকে তুমি এমন জঘন্য ভাবে হত্যা করিলে?" এজিদ কোন জবাব দিল না।

আযানান্তে জয়নাল আবেদীন মিম্বরে দাঁড়াইয়া প্রথমে আল্লাহপাকের শানে হামদ, তৎপর দয়াল-নবী (সাঃ) এর শানে নাত পেশ অন্তে খুৎবা পাঠ শুরু করিলেন। অত্যন্ত আবেগময় ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তিনি তাহার মাতৃকুলের সম্যক পরিচয় প্রদান করিয়া কারবালায় সংঘটিত নবী বংশের উপর অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণ চিত্র তুলিয়া ধরিলেন। কারবালার কাহিনী বর্ণনা কালে তিনিও কাঁদিতেছিলেন, শ্রোতারাও কাঁদিতেছিলেন। সকলের কান্নাকাটির মধ্যে দিয়াই জয়নাল আবেদীন (রঃ) খুৎবা পাঠ সম্পন্ন করিলেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা লক্ষ্য করিয়া সন্ত্রস্ত এজিদ দ্রুত মোয়াযযিনকে একামত দিয়া নামাজ শুরু করিতে বলিল। নামাজ শেষে মুসুল্লীদের মধ্যে বিদ্রোহ ভাব ফুটিয়া উঠিল। কারবালার হত্যাকান্ডে বিক্ষোভ দানা বাঁধিয়া উঠিতে পারে-এই আশংকায় জয়নাল আবেদীনসহ বন্দিনীগণকে মদীনায় পাঠাইয়া দেওয়া হইল।

মদীনায় আসার পর ইমাম-তনয় অধিক সময়ই মসজিদে এবাদতে মশগুল থাকিতেন; জেকের আজকার, মোরাকাবা-মোশাহেদায় লিপ্ত থাকিতেন। খুব কম কথা বলিতেন। তাহার মত এত বড় শোকের বোঝা আর দ্বিতীয় কাহারো ছিল বলিয়া জানা যায় না। পিতৃশোক, ভ্রাতৃশোক, বন্ধুশোক, আত্মীয়-স্বজনের শোক-শোকে শোকে শোকাতুর জয়নাল আবেদীন তাই নির্জনে এবাদতে মগ্ন থাকিতেন।

এদিকে কারবালার হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বিদ্রোহ দেখা দেয়। মদীনার বিক্ষুব্ধ মুসলমানেরা এজিদের আনুগত্য অস্বীকার করতঃ এজিদের পক্ষে মদীনার গভর্ণর ওসমানকে আটক করিয়া রাখে। তারপর তাহারা ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের পুত্র জয়নাল আবেদীনের সমীপে যায়। উদ্দেশ্য-তাহার হাতে বায়াত হইয়া তাহাকে মদীনার সিংহাসনে বসানো। ইমাম-তনয় সেই সময় মসজিদের এক কোনে বসিয়া ওজিফারত ছিলেন। বাহিরে অগণিত লোকের শোরগোল শুনিয়া তিনি বাহিরে আসিলে তাহাদের পক্ষ থেকে মনষর বিন যোবায়ের অতীব আদবের সাথে নিবেদন করিলেন, “হে রাসূলে করীম (সাঃ) এর আওলাদ! মদীনার মসনদের একমাত্র আপনিই অধিকারী, আমরা মদীনা বাসীরা আপনার আনুগত্য স্বীকার করিয়া আজ আপনাকে মদীনার সিংহাসনে উপবিষ্ট করাইয়া স্বীয় কর্তব্য পালন করিব বলিয়া এখানে উপস্থিত হইয়াছি। আপনি শোকাতুর, বেশী কথা বলিয়া আপনাকে বিরক্ত করা আমাদের উচিৎ নয়। আমরা শুধু এতটুকুই বলিতে চাই, যাহারা এখানে উপস্থিত হইয়াছে তাহারা সকলেই আপনার বংশের দাসানুদাস। আপনার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢালিয়া দিতে ইহারা সব সময়ই প্রস্তুত। আপনি দয়া পূর্বক আমাদের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়া আমাদিগকে বাধিত করিবেন।"

কিন্তু মদীনা বাসীদের আবেদনে তিনি রাজী হইলেন না। তিনি নিজেকে রাজনৈতিক ধরা-ছোয়ার বাহিরে রাখিতে মনস্ত করিলেন। তাহাদেরকে বলিলেন, "ভাইয়েরা আমার! আপনাদের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিতে আমি মুগ্ধ হইয়াছি কিন্তু কারবালায় স্বজনহারানোর যে অগ্নি আমার হৃদয়ে জ্বলিতেছে তাহাতে সংসারের কথা, সিংহাসনের কথা, কিছুই আর ভাবিতে পারিতেছি না। আমার একটাই অনুরোধ, দুনিয়াবী কোন ঝামেলায় আমাকে জড়াইবেন না। আমি ইহা থেকে মুক্তি চাই। আমি সেই মহান খোদাতায়ালার সন্ধানে রত যাহার নিকট দুনিয়ার রাজ সিংহাসনেরও কোন মূল্য নাই। আমাকে দু'আ করুন, আমি যেন সফলকাম হই।"

অতঃপর জয়নাল আবেদীন পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করিয়া ওজিফায় রত হইলেন। পরদিন তিনি নগরের কোলাহল এড়াইবার জন্য মদীনা হইতে চার দিনের পথ দূরে "নেবু" নামক স্থানে চলিয়া গেলেন। "নেবু" তদীয় পিতার আমলের এক ক্ষুদ্র জায়গীর। এখানে পৌঁছাইয়া তিনি কোলাহল মুক্ত পরিবেশে এক পর্বত গুহাতে আরাধনায় মগ্ন রহিলেন। মদীনার রাষ্ট্রীয় বিক্ষোভ আর তাহার এবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করিতে পারিল না। এইভাবে নির্জনে কিছুকাল এবাদতের মাধ্যমে তিনি খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছান, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করেন।

তিনি খুবই সামান্য আহার করিতেন। তাহার সম্মুখে যখনই কোন খাদ্য ও পানীয় নেওয়া হইতো, তখনই তাহার দু'গন্ড নয়ন অশ্রুতে ভিজিয়া যাইত। তিনি অঝরে কাঁদিতেন। তাহার মনে পড়িত কারবালার সেই মর্মন্তুদ হৃদয় বিদারক ঘটনাবলী। মনে পড়িত-পানি বিহনে আত্মীয় স্বজনের প্রাণ বিয়োগের কথা। কিতাবে দেখা যায়, তিনি জীবনে যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন, ততদিনে কেহই তাহার মুখে কোন দিন হাসি দেখিতে পায় নাই।

তবে তিনি যে সংসার ধর্ম ত্যাগ করিয়া জংগলবাসী হইয়াছিলেন-তাহা নয়। কিছুদিন নির্জন এবাদতের মাধ্যমে তিনি তাহার পিতা থেকে প্রাপ্ত এলমে বাতেনের পরিপূর্ণতা অর্জন করেন। তৎপর তিনি সংসারের দিকে নজর দেন। তিনিইতো নবী-বংশের একমাত্র পুরুষ অভিভাবক। বিশাল সংসার দেখাশুনার ভার তো তাহারই উপর ন্যস্ত। তাই তিনি ধর্মীয় কর্তব্য পালনের সাথে সাথে পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করেন। ইহার পর তাহার কর্মকান্ড ছিল জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক-উভয়বিধ।

হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা জয়নাল আবেদীন ইবনে ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের দুঃখময় জীবনের একাংশ সম্পর্কে জানিতে পারিলে। আল্লাহপাক যাহাদেরকে যত অধিক ভালবাসেন, তাহাদের উপর দিয়া দুঃখকষ্টের রোলারও তত অধিক চালান। দয়াল-নবী (সাঃ) আল্লাহতায়ালার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিত্ব। আল্লাহতায়ালার দরবারে তাহারই মর্যাদা সকলের চাইতে বেশী। অথচ দুঃখ-কষ্ট জীবনে তিনিই বেশী ভোগ করিয়াছেন। তাই তিনি বলিতেন, "আমার মত এত দুঃখ আর কেহই ভোগ করেন নাই।" সেই রাসূলে করীম (সাঃ) এর বংশধর হইলেন জয়নাল আবেদীন। তিনি যেমন দয়াল নবী (সাঃ) রক্তের উত্তরাধিকারী, তেমনি এলমে বাতেনেরও অধিকারী। এলমে মারেফাতের প্রভাবে তাহার চরিত্র ছিল দয়াল নবী (সাঃ) এর চরিত্রের অনুরূপ। জয়নাল আবেদীন (রঃ) এর জীবনে দুঃখ কষ্টের ঝড় শুরু হয় বাল্যকাল থেকেই। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই দুঃখ আর কমে নাই। কিন্তু শত উত্তাল তরঙ্গের মাঝেও তিনি ধৈর্য ও সহনশীলতায় ছিলেন পাহাড়ের মত অবিচল, স্থির। ইহার প্রতিদানও আল্লাহতায়ালা তাহাকে দান করিয়াছিলেন।

কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার প্রেম ভালবাসা যদি লাভ করিতে চাও, তবে যতই বিপদ-আপদ তোমাদের উপর আসুক না কেন, ধৈর্যের সাথে তাহা মোকাবেলা কর। তাহা হইলে আশা করা যায় তোমরা সফলতা অর্জন করিতে পারিবে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD