কারবালার মর্মন্তুুদ ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমির পর্যালোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘মুহারাম’ بسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ কারবালার মর্মন্তুুদ ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমির পর্যালোচনা এবং কারবালার শিক্ষা নিয়ে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
হিজরী সনের প্রথম মাস মুহাররম। এই মুহাররমের ১০ তারিখেই রাসূলে পাক (সাঃ) এর দোহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব কারবালার মরুপ্রান্তরে আত্মীয়-পরিজন ও অনুচরসহ ধর্মের হেফাজতে, দ্বীনের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখিবার উদ্দেশ্যে মোয়াবিয়া পুত্র এজিদের সৈন্যদের হাতে পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় নৃশংসভাবে নিহত হন। সেই দিনের সে পৈশাচিক হত্যাক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত আলোচনা পূর্বের নসিহতে করা হইয়াছে। কারবালার এমন জঘন্যতম হত্যাকান্ড কেন ঘটিল? কেন নবী বংশকে এমন অকাতরে প্রাণ দিতে হইল? ঐতিহাসিক পটভূমির বিশ্লেষণে ইহার উৎস বা কারণ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, কারবালার এই হত্যাকান্ড মূলতঃ বনি উমাইয়া ও বনি হাশেমী গোত্রদ্বয়ের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের করুণ পরিণতি। বনি উমাইয়া ও বনি হাশেমী-উভয় গোত্রই কোরাইশ বংশ উদ্ভূত।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর আবির্ভাবের বহু পূর্বে ২০০ খৃষ্টাব্দের দিকে কোরায়েশ বংশের প্রথম পুরুষ বলিয়া পরিচিত ফিরহ্ কোরেশ মক্কায় বসতি স্থাপন করেন। ফিরহ কোরেশের সন্তান সন্ততি বহু শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হইয়া মক্কার আশে পাশে ছড়াইয়া পড়ে। ইহারা সকলেই "কোরায়েশ" বলিয়া পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
মক্কায় আরও বহু গোত্র বা বংশ থাকিলেও সকলের উপর এই কোরায়েশদের মর্যাদা ছিল সর্বাধিক। জ্ঞানে-গুণে, বুদ্ধিমত্তায়, শৌর্য-বীর্যে তাহারা বিভিন্ন বংশ বা গোত্রের উপরে মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হইয়াছিল।
কাবাগৃহ ছিল আরববাসীদের তীর্থস্থান। বছরে কমপক্ষে একবার আরবের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে, এমনকি আরবের বাহিরে বিভিন্ন দেশ হইতে মানুষ আসিত কাবাঘরের দর্শনে। আর এই কাবাঘরের দেখাশুনার ভার ছিল উক্ত কোরায়েশ বংশের উপর। তাই কোরায়েশ বংশ আরবের শ্রেষ্ঠ বংশ হিসেবে পরিচিত।
ফিরহ্ কোরেশের বংশের ৬ষ্ঠ পুরুষের নাম কুসাই কোরেশ। কুসাই কোরেশ মক্কার প্রশাসনিক দফতরের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করিয়া ৪৮০ খৃষ্টাব্দের দিকে পরলোকগমন করেন। তাহার দুই পুত্র ছিল। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম আব্দেদ্দার এবং কনিষ্ঠ পুত্রের নাম আব্দে মানাফ।
বিজ্ঞাপন
কুসাই কোরেশের মৃত্যুর পর তাহার জ্যৈষ্ঠ পুত্র আবদেদ্দার পিতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। আবদেদ্দারের মৃত্যুর পরে কনিষ্ঠ ভ্রাতা আবদে মানাফ সেই ক্ষমতা হস্তগত করেন। তখন আবদেদ্দারের পুত্রগণ ছিল নাবালক।
আবদে মানাফের মৃত্যুর পরে আবদেদ্দারের পুত্র-পৌত্ররা আব্দে মানাফের বংশধরদের সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। কোরায়েশ গোত্রের বহু শাখা গোত্র ছিল। তাহাদের কেহ আবদেদ্দারের বংশধরদের সহিত, কেহ আবদে মানাফের বংশধরদের সহিত যোগ দেয়। কোরায়েশ বংশের নেতৃস্থানীয় গুরুজনেরা নিজ বংশের দুই শাখা গোত্রের মধ্যেকার এই বিরোধ সালিসীর মাধ্যমে মিমাংসা করিয়া দেয়। সালিসীতে সিদ্ধান্ত হয়-আবদে মানাফের পুত্র হাশেম মক্কায় আগত তীর্থযাত্রীদের খাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ করিবে। ইহাতে যে আয় হইবে- তাহা ভোগ করিবে আবদে মানাফের বংশধরেরা। আর প্রশাসনিক দফতর পরিচালিত হইবে আবদেদ্দারের বংশধর কর্তৃক। এইভাবে কিছু কাল বেশ ভালই চলে। কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আবার ইহাদের মধ্যে বিদ্বেষের অগ্নি প্রজ্জলিত হইতে থাকে। কারণ কাবা তীর্থযাত্রীদের আহার ও পানীয় সরবরাহ করিয়া মানাফ পুত্র হাশেম খুব অল্প সময়েই বহু অর্থের মালিক হন। এই অর্থ, এই সম্পদই মানাফ পুত্র হাশেমের প্রতি আবদেদ্দারের বংশধরদের ঈর্ষার কারণ হয়।
আবদে মানাফ একাধিক পুত্রের জনক। একজনের নাম হাশেম, অপর পুত্রদের নাম আবদে শামস্, নওফেল ও আল মুত্তালিব। আবদে মানাফের পুত্রগণ সবাই ছিল প্রভাব প্রতিপত্তিশীল। ইহাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন মানাফ পুত্র হাশেম
বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে আবদে মানাফের বংশধরদের ভিতরে ফাটল ধরে। আবদে শামসের পুত্র উমাইয়া। এই উমাইয়ার উচ্ছৃংখলতাই বংশীয় ফাটলের কারণ। মানাফ পুত্র হাশেম হইলেন উমাইয়ার চাচা। চাচার অত্যাধিক সমৃদ্ধি উমাইয়ার চক্ষুশুল হয়। তাই চাচা হাশেমের সহিত সে মর্যাদার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়।
তৎকালীন আরবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের মধ্যে উক্তরূপ মর্যাদার প্রতিযোগিতা মাঝে মাঝেই অনুষ্ঠিত হইত। দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সালিসীর মাধ্যমে তাহা সমাধান করিতেন। ভাতিজার সাথে চাচার এই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের পণ ধার্য্য হইল পঞ্চাশটি কৃষ্ণ-চক্ষু উষ্ট্র এবং মক্কা থেকে দশ বছর নির্বাসন। পরাজিত গ্রুপ উক্ত শর্ত পালন করিতে বাধ্য।
বিজ্ঞাপন
নির্ধারিত দিনে ভাতিজা উমাইয়ার সাথে চাচা হাশেমের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। উচ্ছৃংখল উমাইয়া প্রতিযোগিতায় পরাজিত হইয়া শর্তসাপেক্ষে পঞ্চাশটি উষ্ট্র প্রদান পূর্বক মক্কা থেকে সিরিয়াতে নির্বাসিত হয়। ফলে উমাইয়ার মধ্যে প্রতিহিংসার আগুন বহুগুণে প্রজ্জলিত হয়-সেই প্রতিহিংসা বংশানুক্রমে সন্তান-সন্ততির মধ্যে সংক্রামিত হয়।
উমাইয়ার একাধিক পুত্রের এক জনের নাম হারেব। অপর জনের নাম আবুল আস। অপরদিকে হাশেমের পুত্রের নাম আবদুল মুত্তালেব। উমাইয়ার সহিত মর্যাদার লড়াই হয় হাশেমের। উমাইয়া পরাজিত হয়। উমাইয়ার পুত্র হারেব আবার পিতার মতই হাশেমের পুত্র আব্দুল মুত্তালেবের সহিত মর্যাদার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এখানেও উমাইয়ার পুত্র হারেব হাশেম পুত্র আব্দুল মোত্তালেবের নিকট পরাজিত হয়। ফলে চিরদিনের জন্য বণি হাশেমীদের সাথে সংশ্রব ত্যাগ করে। এমনি ভাবে বনি উমাইয়া ও বনি হাশেমী হিসেবে পরিচিত দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী শাখা উদ্ভূত হয়।
উমাইয়ার এক পুত্রের নাম হারেব। হারেবের পুত্রের নাম আবু সুফিয়ান। আবু সুফিয়ান বদর ও ওহোদের যুদ্ধে দয়াল নবী (সাঃ) এর প্রধানতম শত্রু ছিল। এই আবু সুফিয়ানের পুত্রের নাম মুয়াবিয়া-যে মুয়াবিয়া হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। মুয়াবিয়ার পুত্রের নাম এজিদ। এই এজিদ কারবালার নৃশংস হত্যা কান্ডের নায়ক।
বিজ্ঞাপন
উমাইয়ার অপর পুত্রের নাম আবুল আস। যাহার পুত্রের নাম হাকাম। হাকামের পুত্রের নাম মারোয়ান। এই মারোয়ান ছিল মানব রূপী দানব। হযরত ওসমান (রাঃ) এর খেলাফত আমলে মারোয়ান খলিফার সচিবের দায়িত্ব পায়। হযরত ওসমান (রাঃ) এর নামাংকিত সীলমোহর ইচ্ছামত ব্যবহার করিয়া এই মারোয়ানই মুসলিম জাহানের শান্তি বিনষ্ট করে। মারোয়ানের পুত্রের নাম আবদুল মালেক।
অপর দিকে বনি হাশেমী গোত্রে-হাশেম পুত্র আব্দুল মোত্তালেবের ১১ জন পুত্র ছিল। তাহাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ, আবু তালেব, আমীর হামজা, আব্বাস প্রমূখ স্বনামধন্য। আব্দুল্লাহর ঘরে জন্ম নেন সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, আখেরী নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)। অন্য দিকে আবু তালেবের পুত্রই হযরত আলী (কঃ)।
কাজেই দেখা গেল, বনি উমাইয়া গোত্রের উমাইয়া পরবর্তী ব্যক্তিবর্গ হইল, হারেব, আবু সুফিয়ান, মুয়াবিয়া, এজিদ, হাকাম, মারওয়ান, আঃ মালেক প্রমূখ এবং বনি হাশেমী গোত্রের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ হইলেন, আব্দুল মোত্তালেব, আব্দুল্লাহ, আবু তালেব, হযরত আব্বাস (রাঃ), হযরত হামজা (রাঃ), হযরত আলী (কঃ), হযরত মুসলিম বিন আবু তালেব (রাঃ), হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ), মা ফাতেমা (রাঃ), হযরত ইমাম হাসান (রাঃ), হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) প্রমুখ।
বিজ্ঞাপন

বনি হাশেমীদের নিকট মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব, গুণে ও জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় বনি উমাইয়ারা পরাজিত হইয়া প্রতিশোধের নেশায় প্রতিহিংসা পরায়ণ হইয়া উঠে। সেই প্রতিহিংসারই চূড়ান্ড বিস্ফোরণ কারবালার বিয়োগাত্মক মর্মান্তিক ঘটনা।
রাসূলে পাক (সাঃ) এর আবির্ভাবের পূর্বে দুই বংশের সংঘাত ছিল মূলতঃ শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা কেন্দ্রিক। রাসূলে পাক (সাঃ) নবী হিসেবে জগতে আবির্ভূত হওয়ার পরে গোত্রীয় দ্বন্দ্বের সাথে যুক্ত হয় আদর্শগত দ্বন্দু। তৎকালীন সময়ে আরববাসীগণ বহু দেবদেবীর পূজা করিত। কিন্তু দয়াল নবী (সাঃ) আসিয়া একত্ববাদ প্রচার করেন এবং দেবদেবী পূজা বা উপাসনার অসারতা চোখে অংগুলী দিয়া দেখাইয়া দিতে থাকেন। ফলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর বংশ বনি হাশেমীদেরকে ধ্বংস করিবার জন্য বনি উমাইয়াগণ মরিয়া হইয়া উঠে। তাই দেখা যায়, ইসলামের প্রথম দুই যুদ্ধ-বদর ও ওহোদের যুদ্ধে বনি উমাইয়ারাই রাসূলে পাক (সাঃ) এর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে। বনী উমাইয়াদের সংগে যোগ দেয় বনি আবদেদ্দার। বনি উমাইয়াদের মধ্যে আবু সুফিয়ানই বদরের যুদ্ধে রাসূলে পাক (সাঃ) এর বিপক্ষে নেতৃত্ব দেয়।
হযরত দয়াল নবী (সাঃ) দুনিয়ায় আসিয়া আল্লাহর মনোনীত সত্য ধর্ম ইসলাম প্রচার করেন। রাসূল-প্রচারিত ধর্মে নিহিতঃ ত্যাগ ও সংযমের আদর্শ, মানবতার আদর্শ, আত্মশোধন ও আত্মসংশোধনের আদর্শ। রাসূলে পাক (সাঃ) এর নিরলস চেষ্টার ফলে তাহার মহান আত্মার তাওয়াজ্জুহ বলে মাত্র ২৩ বছরে আরবের বিভিন্ন গোত্র তাহাদের গোত্রীয় সংঘাত ভুলিয়া সত্য ইসলামের শান্তির পতাকাতলে সমবেত হয়। বিশেষ করিয়া বনি উমাইয়া ও বনি হাশেমী গোত্রের মধ্যেকার হিংসার আগুণ নির্বাপিত হয়।
বিজ্ঞাপন
কথায় বলে, "চুলার আগুন নিভে গেলেও ছাই-এর ভিতরে গরম থাকে।" রাসূলে পাক (সাঃ) এর আত্মার শক্তিশালী তাওয়াজ্জুহ বলেতে বনি উমাইয়াদের প্রতিহিংসার অগ্নি নির্বাপিত হইলেও তাহা ছিল সাময়িক। চুলার ছাই-এর গরম ভাব হইতে যেমন অগ্নি প্রজ্জলিত হইয়া ঘর বাড়ী পুড়াইয়া ফেলে, তেমনি সময়ের ব্যবধানে বনি উমাইয়াদের অন্তরের অন্তঃস্থলস্থিত প্রতিহিংসার অগ্নি মুয়াবিয়া, মারোয়ান ও এজিদের মাধ্যমে প্রজ্জলিত হইয়া কারবালার হৃদয় বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়া সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্যকে কলঙ্কিত করে।
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর পর হযরত আবুবকর (রাঃ), তৎপর হযরত উমর (রাঃ) খলিফা নির্বাচিত হন। হযরত উমর (রাঃ) পর্যন্ত মোটামুটি ভালই দেখা যায়। গোত্রীয় সংঘাত তেমন মাথাচাড়া দিতে পারে না। কিন্তু গোত্রীয় দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দেয় হযরত ওসমান (রাঃ) এর শাসনামলে। হযরত ওসমান (রাঃ) বংশের দিক থেকে বনি হাশেমীদের চেয়ে বনি উমাইয়াদের নিকট সম্পর্কের ছিলেন। তাহার পূর্ব পুরুষ ছিলেন আবদেদ্দার।
হযরত ওসমান (রাঃ) এর আমলে বনি উমাইয়া গোত্রের মোয়াবিয়া সিরিয়ার শাসন কর্তা নির্বাচিত হন। একই গোত্রের মারোয়ান হয় হযরত ওসমান (রাঃ) এর মন্ত্রণা-সচিব। গোত্র প্রেমিক, কুচক্রী মারোয়ান ছলে-বলে কৌশলে হযরত ওসমান (রাঃ) এর অগোচরেই খলিফার নামাংকিত সীল মোহর ব্যবহার করিয়া প্রশাসন যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে হযরত উমর (রাঃ) কর্তৃক নির্বাচিত বনি হাশেমীদের পদচ্যুত করিয়া বনি উমাইয়াদের বসাইতে শুরু করে। ফলে মুসলিম সাম্রাজ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই বিদ্রোহের প্রথম মর্মান্তিক শিকার হন তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রাঃ) ছাহেব। বিদ্রোহীরা বহু দুস্কর্মের নায়ক মারোয়ানকে খলিফার নিকট চাহিয়াছিল কিন্তু খলিফা তাহা দেন নাই -পাছে বিদ্রোহীরা তাহাকে হত্যা করে, এই আশংকায়। মারোয়ানকে না পাইয়া বিদ্রোহীরা খলিফার পদত্যাগ দাবী করে কিন্তু খলিফা পদত্যাগ না করায় তাহারা খলিফাকে দীর্ঘ চল্লিশ দিন গৃহবন্দী রাখে, খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ বন্ধ করিয়া দেয়। অতঃপর একদিন তাহারা কুরআন শরীফ পাঠরত অবস্থায় হযরত ওসমানকে (রাঃ) নির্মমভাবে হত্যা করে।
বিজ্ঞাপন
ইহার পর মুসলিম জাহানের খলিফা নির্বাচিত হন হযরত আলী (কঃ)। কিন্তু বনি উমাইয়াদের মধ্যে মুয়াবিয়া, মারোয়ান, আব্দুল্লাহ বিন সাদ প্রমুখ হযরত আলী (কঃ) এর খেলাফত মানিয়া নিতে পারে না। এখান থেকেই দুই গোত্রের গোত্রীয় সংঘাতের দানা পুনরায় বাঁধে।
পরবর্তীতে জঙ্গে জমল বা উষ্ট্রের যুদ্ধ এবং সিফফিনের যুদ্ধ নামক দুইটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইহাতেও খেলাফতের দ্বন্দ্বের মিমাংসা হয় না। এই সময়ই সিরিয়ার শাসন কর্তা মোয়াবিয়া নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা দেয়। ইহার কিছুদিন পরেই হযরত আলী (কঃ) আততায়ীর হাতে শহীদ হন। ফলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রচারিত সাত্ত্বিক আদর্শ মুষড়িয়া পড়ে।
রাসূলে পাক (সাঃ) এর সাত্ত্বিক আদর্শচ্যুত মুয়াবিয়া ইসলামিক গণতন্ত্রকে পদদলিত করিয়া রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বেপরোয়া হইয়া উঠেন। তিনি হযরত হাসান (রাঃ) কে মারোয়ানের কুমন্ত্রয়ায় বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। ইহার কয়েকদিন পরে তিনিও স্বাভাবিক ভাবে ইনতেকাল করেন। ইনতেকালের পূর্বে মোয়াবিয়া নিজ পুত্র এজিদকে বলিয়া যানঃ চার ব্যক্তি রহিল-যাহারা তোমার নামে বায়াত স্বীকার করে নাই। তাহারা হইল-আলীর পুত্র হোসেন, আবুবকরের পুত্র আব্দুর রহমান, ওমরের পুত্র আব্দুল্লাহ এবং যোবায়ের-পুত্র আব্দুল্লাহ। ইহাদের মধ্যে হোসেনের সংগে খুব সম্ভব তোমার যুদ্ধ হইবে। যুদ্ধ হইলে তাহাকে প্রাণে মারিও না। প্রাণে মারিলে সমগ্র মুসলিম জাহানে বিদ্রোহ দেখা দিবে।"
বিজ্ঞাপন
স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর আদর্শচ্যুত মোয়াবিয়া পুত্র এজিদকে যে উপদেশ দেন, কুখ্যাত এজিদ হিংস্রতা ও স্বার্থপরতায় আরও কয়েক ধাপ অগ্রসর হয়। তাহার হিংস্রতার ভয়াল থাবা পড়ে ইমাম বংশের উপর। ফলে কারবালার মরু প্রান্তে পুরুষদের মধ্যে ইমাম হোসেন (রাঃ) এর কনিষ্ঠ পুত্র, একমাত্র জয়নুল আবেদীন ও নারীরা ব্যতীত সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। যাহার বিবরণ পূর্ববর্তী নসিহতে দেওয়া হইয়াছে।
কারবালার এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডের কেন্দ্রীয় নায়ক মুয়াবিয়ার পুত্র এজিদ, প্রাদেশিক নায়ক ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ এবং এজিদ পক্ষীয় সেনাপতি আমর বিন আস এবং পাষন্ড সীমার।
এজিদ ছিল স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর যালেম। সে ছিল মদ্যপ, গীতবাদ্যাসক্ত ও বহু নারীভোক্তা। ধর্ম কর্মের লেশমাত্র তাহার মধ্যে ছিল না।
আর কুফার শাসনকর্তা ছিল ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ। এই যিয়াদের পরিচয় কি? যিয়াদ ছিল উমাইয়া বংশোদ্ভূত আবু সুফিয়ানের রক্ষিতা এক বেদুইন নারীর গর্ভজাত জারজ সন্তান। নিষ্ঠুরতায় সে এজিদকেও অতিক্রম করিয়াছিল। নিষ্ঠুরতার জন্যে লোকে তাহাকে 'কসাই' বলিত। আবুসুফিয়ান-পুত্র মুয়াবিয়া তাহাকে কোন দিনই ভাই বলিয়া সম্মোধন করেন নাই; বলিতেন "বাদীর বাচ্চা"। সেই যিয়াদ-পুত্র ওবাইদুল্লাহ ছিল কারবালার যুদ্ধে এজিদ পক্ষের অধিনায়ক।
এজিদের নির্দেশে ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নেতৃত্বে সেনাপতি আমর, সীমার, হেযায প্রমুখ কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) সহ তদীয় পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সীমার ইমাম হোসেন (রাঃ) এর শিরোচ্ছেদ করিয়া বর্শা বিদ্ধ করে। অতঃপর দুরাচারেরা ইমাম ছাহেবের মৃতদেহের উপর দিয়া চালনা করে অশ্ব। বিশ জন অশ্বারোহী মৃতদেহের উপর দিয়া পুনঃপুনঃ অশ্ব চালাইয়া অশ্বখুরে দলিত মথিত করে ইমাম ছাহেবের পবিত্র দেহ মোবারককে। তাহাদের এই পৈশাচিক হত্যা ক্রিয়া সমাপ্ত হয়-যখন ইমাম ছাহেবের দেহের হাড্ডি, মজ্জা, মাংশ সবই কারবালার বালুকনায় মিশিয়া যায়।
সেই সময় ইমাম শিবিরে বন্দিনীরা শুধুই বিলাপ করিতেছিল। তাহাদের মাতমের সুর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করিতেছিল। ইমাম ছাহেবের মৃতদেহকে মাটির সহিত মিশাইয়া দিয়া তাহারা ইমাম শিবিরে প্রবেশ করিয়া খীমা লুণ্ঠন করে। শিবির হইতে ইমাম পরিবারকে বাহির করিয়া শিবিরে আগুন ধরাইয়া দেয়। হোসেন-হন্তা সীমার জয়নাল আবেদীনকেও হত্যা করিতে উদ্যত হয়। অপর সেনাপতি আমরের বাঁধাদানের কারণে জয়নাল আবেদীন কোন রকমে প্রাণে বাঁচিয়া যান।
সীমারের এক অনুচর তাহারই নির্দেশে বর্শাবিদ্ধ হোসেন-শির লইয়া অগ্রে অগ্রে চলে। পিছনে বন্দিনীদেরকে লইয়া সীমার ও আমর কুফাভিমুখে রওয়ানা হয়। কুফায় পৌঁছানোর পর ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ তাহার কুফাস্থিত প্রাসাদে একটি টেবিলের উপর রৌপ্য নির্মিত প্লেটে হোসেন শির রাখিয়া সর্ব সম্মুখে নিজ দাম্ভিকতা প্রকাশ করিতে থাকে।
অতঃপর কুফা হইতে ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শিরসহ বন্দিনীগণকে দামেস্কে এজিদের নিকট প্রেরণ করা হয়। এজিদ দ্রুত বন্দিনীদিগকে মদীনায় প্রেরণ করিয়া ইমাম-শিরকে দামেস্কের বাহিরে সিরিয়ার উত্তর পূর্ব অঞ্চলে আসকালান নামক স্থানে পুতিয়া রাখে। ইহার শত বছর পরে মিশরে ফাতেমীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তথাকার কোন এক উজির ইমাম-শির আসকালান হইতে মিশরে লইয়া যান এবং নীল নদের পশ্চিম তীরে আসোয়ান উপত্যকায় উহা পুনরায় কবরস্থ করেন। এই মুহাররম মাসে প্রতি বছর নীল নদের তীরে ইমাম ছাহেবের মাজারে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হয়।
এজিদের নৃশংসতা ও ইমাম বংশের শাহাদাতের সংবাদ বাতাসের বেগে সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়াইয়া পড়ে। ফলে চতুর্দিকে বিদ্রোহ দেখা দেয়। মক্কা, মদীনা, কুফা, বসরা-সর্বত্রই বিক্ষুদ্ধ মুসলমানেরা এই লোমহর্ষক হত্যা কান্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করে। কিন্তু কে কাহাকে শাস্তি দিবে? এই পৈশাচিক হত্যা কান্ডের মূল নায়কই হইল মোয়াবিয়া-পুত্র এজিদ। সেইতো এখন মুসলিম জাহানের খলিফা সাজিয়া বসিয়া আছে। ফলে যাহা হইবার তাহাই হয়। মদীনা ও মক্কা বাসীরা এজিদের আনুগত্য অস্বীকার করেন।
নিষ্ঠুর এজিদ মদীনার বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করিবার জন্য মুসলিম বিন ওকবা নামক একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতিকে মদিনা আক্রমণের জন্য প্রেরণ করে। মদীনায় বিদ্রোহী মুসলমানদের সাথে মুসলিম বিন ওকবার যুদ্ধ হয়। কিন্তু যুদ্ধে মদীনাবাসীরা পরাজিত হন।
মুসলিম বিন ওকবা মদীনাতে প্রবেশ করিয়া নির্বিচারে মুসলমানদেরকে হত্যা করে। তাহার অত্যাচার থেকে মদীনার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা কেহই রক্ষা পায় নাই। ইতিহাস বিধৃত পুস্তকে দেখা যায়, মুসলিম মদীনাতে প্রবেশ করিয়া আশি (৮০) জন সাহাবা ও সাতশত (৭০০) জন ক্বারীকে হত্যা করে। তাহার এই হত্যা ক্রিয়ার কারণেই ইতিহাসে সে 'অভিশপ্ত খুনী' বলিয়া পরিচিত।
এজিদের নির্দেশে মুসলিম মদীনাতে অত্যাচারের স্ট্রীম রোলার চালায়। মদীনার বিদ্রোহ দমন করিয়া এজিদেরই নির্দেশে মুসলিম দুর্ধর্ষ এক বাহিনী লইয়া মক্কার বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হয়। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার পরে এজিদের বিরুদ্ধে মক্কায়ও বিদ্রোহ দেখা দেয়। হযরত আবুবকর (রাঃ) এর দৌহিত্র আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরকে বিদ্রোহী জনগণ নেতার আসনে বসায়। সেই বিদ্রোহ দমনের জন্য মুসলিম মক্কাভিমুখে রওয়ানা হয়। কিন্তু পথিমধ্যে আকস্মিকভাবে সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মুসলিমের শূন্যতা পূরণ করে হাসীন বিন নমীর নামক অপর একজন এজিদ সেনাপতি।
এজিদ সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য মক্কাবাসীরা আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের নেতৃত্বে মক্কা নগরীর বাহিরে এক শক্তিশালী ব্যূহ তৈরী করেন। কিন্তু এজিদ সৈন্যদের প্রচন্ড আক্রমণে তাহারা পিছু হটিয়া মক্কা নগরীতে আশ্রয় লন বটে কিন্তু আত্মসমর্পণ করেন নাই। অত্যাচারী এজিদ সৈন্যগণ মক্কার অভ্যন্তরে অগ্নিবলয় নিক্ষেপ করিতে থাকে। ইহাতে বহু ঘরবাড়ী পুড়িয়া ছাই হয়। অসংখ্য মক্কাবাসীরা প্রাণ হারায়। তথাপিও এজিদ বাহিনী মক্কা বিজয় করিতে পারে নাই দুইটি কারণে।
১। যুদ্ধরত অবস্থায় এজিদ বাহিনীর তাবুতে আগুন লাগিয়া যায়। ফলে তাহাদের আস্ত্রাগার ধ্বংস হয়। বহু সৈন্য পুড়িয়া মরে।
২। এজিদ সৈন্যদল যখন মক্কা আক্রমণে রত, সেই সময়ই সিরিয়াতে আকস্মিক দুর্ঘটনায় এজিদের মৃত্যু হয়। দূত মারফত এই সংবাদ পাইয়া এজিদ সৈন্যরা ভগ্নোৎসাহ হইয়া যুদ্ধ বন্ধ করিয়া সিরিয়া প্রত্যাবর্তন করে।
যে এজিদ রাজ ক্ষমতাকে নিষ্কন্টক করার জন্য কারবালায় নবী-বংশ নিধনে কুণ্ঠিত হয় নাই, রক্ত পিপাসু দানবের মত অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে হত্যা করিতে যাহার হাত একটুও কম্পিত হয় নাই; সেই ইতিহাস ধিকৃত এজিদ মাত্র তিন বৎসর তিন মাস রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। একদিন হরিণ শিকার হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পথে তাহার অশ্বের পদস্খলন হইলে সে অশ্ব হইতে পড়িয়া আহত হয়। আহতাবস্থায় তাহার এক শিকার গৃহে সে প্রাণত্যাগ করে। ইতিহাসের ঘৃণিত এজিদ এমনিভাবে তাহার রাজ্য শাসনের স্বাদ মিটিবার পূর্বেই যাবতীয় দুষ্কর্মের জবাবদিহিতার জন্য পরপারে চলিয়া যায়।
এজিদের মৃত্যু সংবাদ শুনিয়া তদীয় সৈন্যগণ মক্কার উপর অগ্নি বলয় নিক্ষেপ বন্ধ করিয়া সিরিয়া চলিয়া যায়। ফলে দামেস্কের শাসন থেকে মক্কা, মদীনা, ইয়েমেন, ইরাক ও ইরান মুক্ত হয়। মুসলিম জাহানের এই বিরাট অংশের খলিফা নির্বাচিত হন আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রাঃ)।
এদিকে এজিদের ইনতেকালের পরে দামেস্কের রাজনৈতিক দৃশপটও বারংবার পরিবর্তিত হয়। তাহার মৃত্যুর পর তদীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিতীয় মোয়াবিয়া দামেস্ক সিংহাসনে বসে। মাত্র নয় মাস শাসন কার্য চালাইয়া সে ইচ্ছাপূর্বক পদত্যাগ করে। এজিদের দ্বিতীয় পুত্র খালেদ তখনও নাবালক। তাই খালেদের যৌবন প্রাপ্তির সাপেক্ষে দামেস্কের সিংহাসনে আরোহন করে হযরত ওসমান (রাঃ) এর মন্ত্রণা সচিব, মোয়াবিয়ায় বুদ্ধিদাতা কুখ্যাত মারোয়ান।
যখন মুসলিম জাহানের দক্ষিণ আরব (হিযাজ ও ইয়েমেন) ও পূর্ব আরব (ইরাক ও ইরান) আব্দুল্লাহ ইবনে জোবায়েরের শাসনাধীন এবং উত্তর ও পশ্চিম ভূ-ভাগ দামেস্কের শাসক মারোয়ানের অধীন, ঠিক তখনই কুফায় দেখা দেয় প্রচন্ড বিক্ষোভ। যদিও কুফা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের শাসনাধীন, কিন্তু তিনি ইমাম বংশ হত্যার বিচার করিতে শৈথিল্য করায় কুফা বাসীরা তাহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
তাহাদের দাবী ছিল এজিদ গংদের বিচার করা। তাহারা সোলায়মান বিন সুররাদ নামক একজন প্রবীণ সাহাবীর নেতৃত্বে একত্রিত হইয়া দামেস্ক আক্রমণে সংকল্পবদ্ধ হয়। একদিন দশ হাজার সৈন্য একত্রিত হইয়া তাহারা দামেস্ক অভিমুখে রওয়ানা হয়। দামেস্কের সিংহাসনে তখন মারোয়ান। কুফাবাসীদের আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য মারোয়ান হাসীন বিন নমীরের নেতৃত্বে বিরাট এক দল সৈন্য প্রেরণ করে। এই মারোয়ান বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণে বিদ্রোহী কুফাবাসীরা পরাজিত হন। তৎপর মারোয়ান নিশ্চিন্তে শাসন কার্য চালাইতে থাকে। মারোয়ান সিংহাসনে বসিয়াছিল একটি শর্তে। তাহা ছিলঃ এজিদ পুত্র খালেদ যৌবন প্রাপ্ত হইলে মারোয়ান রাজত্ব তাহার হাতে ফেরত দিবে। কিন্তু কু-চক্রী মারোয়ান শর্তকে অবহেলা করিয়া নিজ পুত্র আব্দুল মালেককে দামেস্কের ভাবী শাসনকর্তা হিসাবে দেখিতে থাকে।
উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য কৌশলে এজিদ পুত্র খালেদকে সে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে।
এখানে উল্লেখ্য যে, এজিদপুত্র খালেদের বিধবা মাতাকে মারোয়ান সিংহাসনে আরোহন করিবার পর বিবাহ করিয়াছিল। মারোয়ানের অত্যাচারে খালেদ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়। খালেদের মা ইহাতে ভীষণ ক্রুদ্ধ হন। পুত্রের প্রতি এহেন অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে তিনি মনে মনে সংকল্পবদ্ধ হন। একদা গভীর নিশীথে নিদ্রামগ্নাবস্থায় মারোয়ানের বুকে ছুরিকাঘাত করিয়া খালেদের মা খালেদের প্রতি মারোয়ানের অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। মারোয়ানের ইহলীলা সাঙ্গ হয়। তাহার মৃত্যুর পর স্বীয় পুত্র আব্দুল মালেক দামেস্কের সিংহাসনে আরোহন করে।
এদিকে সুলায়মানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কুফার বিদ্রোহ কিছুদিন দমিয়া থাকিবার পর মুখতার নামক এক বিপ্লবী নেতার নেতৃত্বে কুফাবাসীরা আবার একত্রিত হইয়া কারবালার হত্যার প্রতিশোধ নিতে সংকল্পবদ্ধ হয়। তাহাদের প্রচন্ড আন্দোলনের মুখে আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের নিয়োজিত কুফার প্রতিনিধি পদত্যাগ করিয়া কুফা ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। ফলে কুফায় মুখতারের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি কারবালার হত্যাকান্ডের বিচার করিতে প্রবৃত্ত হন।
ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শিরোচ্ছেদকারী সীমার এবং কারবালার যুদ্ধে প্রথম অস্ত্র নিক্ষেপকারী আমর বিন সাদ মুখতারের সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হয়। তাহারা মুখতারের সম্মুখে নীত হয়। মুখতার কারবালার ঘটনার নায়কদের দেখিয়া ক্রুদ্ধ হইয়া বলিয়া উঠেন, "হে আমর! তোমরাই না অর্থের লোভে, উচ্চ চাকুরীর আশায়, নিঃসহায় ইমামকে কারবালায় হত্যা করিয়াছ। তখন কি একবারও আল্লাহর বিচারের কথা স্মরণ হয় নাই? হে সীমার! তুমিই না ভূ-লুষ্ঠিত ইমামের বক্ষে চড়িয়া নির্মমভাবে তাহাকে জবেহ করিয়াছ?" মুখতারের হুংকারে সীমার ও আমর ভীত সন্ত্রস্ত। তাহাদের মুখে কোন শব্দ নাই। অতঃপর মুখতারের নির্দেশে জল্লাদ প্রকাশ্যে জনসম্মুখে তাহাদের শিরোচ্ছেদ করেন। ইহার পর কারবালার যুদ্ধে নবী বংশের বিপক্ষে যাহারা অস্ত্রধারণ করিয়াছিল, একে একে তাহাদের সবাইকে মুখতার হত্যা করেন।
সীমারের এক অনুচর। নাম খোলি বিন ইয়াজিদ। এই খোলিই ইমাম ছাহেবের ছিন্ন শির বর্শাবিদ্ধ করিয়া সীমারের অগ্রে অগ্রে কুফায় আব্দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নিকট লইয়া গিয়াছিল। খোলিও ধরা পড়ে। মুখতারের নির্দেশে তাহার হস্তপদ কাটিয়া ফেলা হয়। রক্তক্ষরণ হইতে হইতে সেই পাপিষ্ঠ মারা পড়ে।
অতঃপর কারবালার যুদ্ধে নৃশংস হত্যাকান্ডের আসামীদের মধ্যে বাকী থাকে একমাত্র ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ। মুখতার এই ইবনে যিয়াদের দিকে মনোনিবেশ করেন। ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ তখন দামেস্ক শাসনকর্তা আব্দুল মালেকের সেনাপতি।
মুখতার প্রখ্যাত সেনাপতি ইব্রাহিম ইবনে মালেক ওশতুরের নেতৃত্বে বিরাট একদল সৈন্যবাহিনীকে প্রেরণ করেন ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ইতিহাস প্রসিদ্ধ জ্বাব নদীর তীরে উভয় পক্ষের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুখতারের সেনাবাহিনীর হাতে ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ নিহত হয়। কুফার সৈন্যরা যিয়াদের কর্তিত মস্তক বর্শাবিদ্ধ করিয়া মহা উল্লাসে কুফাপানে ধাবিত হয়। ইবনে যিয়াদের কর্তিত মস্তক মুখতারের সম্মুখে রাখা হয়।
রহস্যময়ের রহস্যের অন্ত নাই। কুফাস্থিত প্রাসাদে বসিয়া এই ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদই প্রাসাদস্থিত টেবিলের উপর ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের শির রাখিয়া দম্ভ প্রকাশ করিয়াছিল। আজ সেই প্রাসাদে মুখতার বসিয়া প্রাসাদস্থিত সেই ঐতিহাসিক টেবিলেই দুরাচার ইবনে যিয়াদের শির রাখিয়া সকলকে সম্বোধন করিয়া বলেন, "ভাইসব! আল্লাহর মহিমা দেখ। দুনিয়ায় সব কিছুই আল্লাহতায়ালার এখতিয়ার। এই ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ একদিন কাহাকেও পরোয়া করিত না। তাহার বিরাট বাহিনী আজ আমাদের মত নগণ্য ব্যক্তিগণের হাতে বিধ্বস্ত। যে ইবনে যিয়াদ জীবিত থাকিতে আমার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তিকে গ্রাহ্য করা দূরের কথা, ক্ষমতার গর্বে কারবালায় ইমাম হোসেন (রাঃ) এর অনুরোধও উপেক্ষা করিয়াছিল, আজ তাহারই সিংহাসনে বসিয়া আমি তাহার ছিন্ন মস্তক নিরীক্ষণ করিতেছি। শত সহস্র বার সেই আল্লাহর শোকর। তাহারই অনুগ্রহে তোমরা বিজয়ী হইয়াছ। তোমাদের গৌরবে আজ আমিও গৌরবান্বিত।"
এমনিভাবে মুখতারের প্রচেষ্টায় কারবালার প্রান্তরে পৈশাচিক হত্যাকান্ডের যাহারা নায়ক ছিল, তাহাদের জীবন লীলা সাংগ হয়; আপন আপন অপরাধের জবাবদিহিতার জন্য পরপারে চলিয়া যায়।
কারবালার হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ কিয়দাংশ সমাপ্ত হইলেও নবী-বংশ নিধনের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া চলে আরও বহুকাল। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসিকাতে যে পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাহার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় এখনও নাকি সেখানে পংগু শিশুর জন্ম হয়। আরও কতকাল ইহার প্রতিক্রিয়া থাকে-তাহা কে জানে?
খৃষ্টীয় ৭৯ সনের দিকে বিসুবিয়াসের অগ্ন্যুদগারে প্রথম বিস্ফোরণ হয়। প্রথম বিস্ফোরণেই তিনটি শহর (পম্পিয়াই, হারাকিউলিনিয়াম ও ষ্টেরিযাই) বিধ্বস্ত হয়। পরবর্তী পাঁচশত (৫০০) বছর পর্যন্ত মাঝে মাঝে সেই আগ্নেয়গীরী থেকে অগ্ন্যুদপাত হইতো। এখনও নাকি অগ্নিস্রাব হয়।
তেমনি কারবালায় নবী-বংশকে নির্মমভাবে হত্যা করায় সমগ্র মুসলিম জাহানে যে বিক্ষোভ দেখা দেয়, তাহার প্রতিক্রিয়া চলে কমপক্ষে দুইশত (২০০) বছর। এই ২০০ বছরে বহু শাসকের উত্থান-পতন হয়। কি পরিমাণ রক্তক্ষয় যে হয়, তাহার হিসাব একমাত্র আল্লাহতায়ালা ব্যতীত অন্য কাহারো দেওয়ার ক্ষমতা নাই। সেই বিপর্যয় প্রশমিত হয় ২০০ শত বছর পরে খৃষ্টীয় দশম শতকে, ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের
বংশধর ইমাম ওবাইদুল্লাহ আল মেহেদী কর্তৃক মিশরে ফাতেমীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস এবং তত্পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ বর্ণনার একটিই উদ্দেশ্য; তাহা হইল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া।
ইমাম হোসেন (রাঃ) যদি ধর্মচ্যুত ও আদর্শচ্যুত এজিদের বশ্যতা বা আনুগত্য স্বীকার করিতেন, তাহা হইলে হয়তো আরও কিছুদিন তিনি জীবিত থাকিতে পারিতেন কিন্তু সত্যের সাধক ইমাম হোসেন (রাঃ) এর পক্ষে অসত্য ও অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ানো কি করিয়া সম্ভব? তিনি যদি তাহা করিতেন, তাহা হইলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর সত্য ধর্ম ইসলামের সাত্ত্বিক আদর্শ চিরদিনের জন্য কবরস্থ হইতো। তাই সত্যের আদর্শ সমুন্নত রাখার জন্য ধর্মের হেফাজতের প্রয়োজনে তিনি পুত্র-পরিজনসহ প্রাণ দান করিলেন। প্রাণ দান করিয়া মরণজয়ী মহাপুরুষ হিসেবে খ্যাত হইলেন। সত্যের জয় হইল।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াইয়া আদর্শের জন্য প্রাণ দান-সহজ কথা নয়। ইহা এক মহৎ গুণ। এই মহৎ গুণ ইমাম বংশের মধ্যে সঞ্চারিত হইয়াছিল দয়াল নবী (সাঃ) এর চারিত্রিক গুণের প্রতিবিম্ব হিসেবে। কারবালার ইতিহাস মুসলিম জাতিকে সেই ত্যাগের গুণ অর্জনের তাগিদ দেয়। কিন্তু ত্যাগের সেই মহৎ গুণ অর্জনের জন্য প্রয়োজন আত্মশুদ্ধির সাধনা, প্রয়োজন আধ্যাত্মিক অনুশীলন। আধ্যাত্মিক চর্চা মুসলমানদের মধ্যে না থাকার কারণে সংখ্যার দিক থেকে এই জাতি ১২৫ কোটির মত হওয়া সত্ত্বেও তাহারা এজিদি শক্তির নিকট বারংবার অত্যাচারিত বা লাঞ্ছিত হইতেছে।
এজিদ শুধু একজন ব্যক্তি নয়। এজিদ এক অশুভ শক্তি। এজিদি শক্তির সেলসেলা বিশ্ব ব্যাপী বিস্তৃত। সে শক্তি আজ বিরাট মহীরুহ। শিকড়সহ সেই এজিদি অপশক্তির মহীরুহ উৎপাটন করিতে হইলে প্রত্যেক মুসলমানেরই প্রয়োজন আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে ত্যাগের গুণ অর্জন করা। ইমাম ছাহেবের রক্ত সেই অনুপ্রেরণাই দেয়।
মুসলমানরা যেদিন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে রাসূলে পাক (সাঃ) এর গুণাগুণ অর্জনে সক্ষম হইবে, সেদিন প্রত্যেক মুসলিমই হইবেন এক এক জন মর্দে মোজাহিদ। তাহাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির নিকটে সমুদয় এজিদি শক্তি ভু-লুষ্ঠিত হইবে, সত্য প্রতিষ্ঠিত হইবে, মিথ্যা দূরীভূত হইবে।
ইসলাম আর কুফরী-বেদাত সহাবস্থান করিতে পারে না। সত্য আর মিথ্যা একসাথে থাকিতে পারে না। হয় সত্য থাকিবে, না হয় মিথ্যা থাকিবে। আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "সত্যই থাকিবে। কারণ 'আল ইসলামু হাক্কুন, ওয়াল কুফ্রো বাতেলোন।' অর্থাৎ- ইসলাম সত্য বা হক, কুফরী-বেদায়াতী বাতেল বা ধ্বংসী।"
কিন্তু শতধা বিভক্ত মুসলিম জাতিকে একত্রিত করিবেন কে? সে ব্যবস্থাও আল্লাহপাক করিবেন। বিরাট আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসহ দয়াল নবী (সাঃ) এর প্রতিশ্রুত জন হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ) আসিয়া তদীয় আত্মার শক্তিশালী তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদী প্রয়োগ করিবেন। ফলে মুসলিম জাতি, হিংসা-হানাহানি ভুলিয়া, নিজেদের ভুল বুঝিতে পারিয়া একত্রিত হইবেন; যেমন দয়াল নবী (সাঃ) এর তাওয়াজ্জুহ বলে একত্রিত হইয়াছিলেন বহুধা বিভক্ত আরব জাতি। সে সময় অতি আসন্ন। আল্লাহতায়ালাই সব ভাল জানেন।
হে জাকেরান সকল, তোমরা আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে মহৎ গুণাগুণ অর্জনের চেষ্টা কর। তরিকার নিয়মকানুন অনুযায়ী চল। তাহা হইলে তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন মর্দে মোজাহিদ হইয়া আখেরী ইমাম ছাহেবের সৈনিক হইতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। দু'আ। ইতি!








