ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ)-এর জীবন ও কর্মকান্ড

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘মুহারাম’ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ)-এর জীবন ও কর্মকান্ড (যৌবনে নির্জন সাধনা, এলমে শরীয়তে গবেষণা, সত্য প্রচার, ক্রীতদাসদাসী মুক্তকরণ ইত্যাদি) নিয়ে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
পূর্বের নসিহতে ইমাম জয়নাল আবেদীন ইবনে হোসেন (রাঃ) ছাহেবের জীবনের একাংশ সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। এ নসিহতে তত্পরবর্তী অংশ সম্পর্কে আলোচনা করা হইতেছে।
কারবালার প্রান্তরে পিতা, ভ্রাতা, আত্মীয়-স্বজনকে হারাইয়া ইমাম জয়নাল আবেদীন মদীনাতে আসিয়া কিছুদিন নির্জন এবাদতে কঠোর সাধনার মাধ্যমে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছান। অতঃপর তিনি নিজ পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্রতী হন।
প্রথমে তিনি পিতা হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের ঋণ পরিশোধের দিকে মনোনিবেশ করেন। হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব ঋণগ্রস্থ ছিলেন। যে সমস্ত কারণে তাহাকে ঋণগ্রস্থ হইতে হইয়াছিল, তন্মধ্যে নিম্নলিখিত কারণগুলো অন্যতম।
বিজ্ঞাপন
▼ তাহার পারিবারিক খরচ ছিল অনেক বেশী।
▼ পরিবারের সদস্য ছাড়াও অনেক এতিম, বিধবা ও অসহায় লোকজনকে তিনি লালন-পালন করিতেন।
▼ অনেক সময় অনেক ঋণগ্রস্থকে তিনি নিজ অর্থে ঋণের দায় থেকে মুক্ত করিতেন।
বিজ্ঞাপন
▼ অনেক ক্রীতদাসকে তিনি নিজ অর্থে ক্রয় করিয়া মুক্তি দিতেন।
উল্লিখিত কারণে তিনি ঋণগ্রস্থ হইয়াছিলেন। সেই ঋণ পরিশোধের পূর্বেই কারবালায় এজিদ বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। পুত্র ইমাম জয়নাল আবেদীন মদীনাতে আসিয়া প্রথমে তাই পিতার ঋণ পরিশোধে তৎপর হন। কিন্তু কিভাবে তিনি ঋণ পরিশোধ করিবেন? তাহার নিজেরতো কোন সম্পদ নাই।
তাহার পিতার কিছু অস্ত্রশস্ত্র এবং মূল্যবান বইপুস্তক উম্মুল মোমেনীর হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) এর নিকট গচ্ছিত ছিল। এতদ্ব্যতীত পিতার একখন্ড জমিন ছিল। সেই জমিনে একটি ঝরণা ছিল। ঝরণাটির নাম ছিল "আইনে ইউহান্নাস"। কিতাবে দেখা যায়, ইমাম হোসেন (রাঃ) এর ইউহান্নাস নামক এক গোলাম একদা উক্ত জমিনটুকু কর্ষণ করিবার কালে ভূগর্ভ থেকে একটি ঝরণা বাহির হয়। সেই গোলাম ইউহান্নাসের নামে ঝরণাটির নাম দেওয়া হয় "আইনে ইউহান্নাস।" ঝরণাযুক্ত এই জমিনটুকুর দাম ছিল প্রচুর। ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) পিতার পুস্তকাদি ও অস্ত্রশস্ত্র উম্মে সালমা (রাঃ) ছাহেবের নিকট থেকে আনয়নপূর্বক বিক্রয় করেন এবং "আইনে ইউহান্নাস" নামক ঝরণাযুক্ত জমিটুকুও বিক্রয় করেন। পুস্তকাদি, অস্ত্রশস্ত্র ও জমিনটুকু বিক্রয় করিয়া পিতার ঋণ পরিশোধ করেন; অবশিষ্ট কিছু অর্থ দ্বারা তেজারতী শুরু করেন। কিছু দিনেই তেজারতীতে তাহার ভাল মুনাফা হয়।
বিজ্ঞাপন
এদিকে তাহার বিবাহেরও বয়স হয়। চিন্তায় পড়েন তাহার ফুপু আম্মা হযরত জয়নব বিনতে আলী (কঃ)। ভ্রাতা ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেব শহীদ হওয়ার কিছু সময় পূর্বে কারবালায় শিবির অভ্যন্তরে এই জয়নাল আবেদীনকে তাহার হাতে সোপর্দ করিয়া যান। বলিয়া যান, "হে ভগ্নি জয়নাব! আমার একটি মাত্র সন্তান রাখিয়া গেলাম। যে কোন প্রকারেই হোক, তাহাকে তোমরা হেফাজতে রাখিও।" সেই হইতে জয়নব বিনতে আলী (কঃ) ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীনের চিন্তায় অধিক সময় অতিবাহিত করেন। ভ্রাতুস্পুত্র বয়প্রাপ্ত হইয়াছে। বিবাহ করানো দরকার। তিনি বিভিন্ন জনের মাধ্যমে প্রথমে জয়নাল আবেদীনের নিকট বিবাহের কথা উত্থাপন করেন। কিন্তু জয়নাল আবেদীন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে রাজী নহেন। অনেকেই তাহাকে রাজী করাইতে চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইলেন। অবশেষে জয়নব নিজে একদিন ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিকটে উপবেসন করাইয়া বলিলেন, "বাবা জয়নাল আবেদীন! তোমার পিতা তোমার সমুদয় দায়-দায়িত্ব আমার হাতে অর্পণ করিয়া গিয়াছেন। তোমার বয়স হইয়াছে। আমি তোমাকে বিবাহ করাইতে চাই। তুমি দ্বিমত করিও না।"
ইহা শুনিয়া জয়নাল আবেদীন বলিলেন, "ফুফু আম্মা! আমাকে সংসার জালে আবদ্ধ করিবেন না। ইহা ছাড়া যে কোন হুকুম আপনি দেন না কেন, আমি তাহা মাথা পাতিয়া লইব।" জয়নব বলিলেন, "হে জয়নাল আবেদীন! তুমি ভুল করিতেছ কেন? পারিবারিক জীবন-যাপন করা মানে সংসার জালে আবদ্ধ হওয়া নয়। ইহা আমার মাতামহ, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সুন্নত। তিনি নিজে বিবাহ করিয়াছেন এবং অপরকে বিবাহ করিতে নির্দেশ দিয়াছেন। যাহারা বিবাহে বিরাগ তাহাদের প্রতি হুশিয়ারী উচ্চারণ করিয়া তিনি বলিয়াছেন-যাহারা সামর্থ থাকিতে বিবাহ করিবে না: তাহারা আমার দলভুক্ত নহে। যাহারা বিবাহ করে না, দয়াল নবী (সাঃ) তাহাদের প্রতি গোস্বা হন।" ফুফু আম্মার কথার কোন জবাব জয়নাল আবেদীন দিতে পারিলেন না। তিনি মৌন থাকিলেন।
অতঃপর জয়নব তাহাকে বলিলেন, "বাবা! তোমার জন্য আমি যোগ্য পাত্রীও ঠিক করিয়া রাখিয়াছি। আমার ভ্রাতা, তোমার পিতৃব্য হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) ছাহেবের "ফাতেমা" নাম্মী কন্যা। তুমি তাহাকে ভালই চেন। দেখিতেও সুন্দর; গুণেও অতুলনীয়া। তুমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত হও। শীঘ্রই আমি তোমাদের পরিণয় সম্পন্ন করিব।"
বিজ্ঞাপন
যথাসময়ে ইমাম জয়নাল আবেদীন ইবনে হোসেন (রাঃ) ছাহেবের সহিত ফাতেমা বিনতে ইমাম হাসান (রাঃ) এর পরিণয় সম্পন্ন হয়। বহুদিন অন্তে ইমাম পরিবারের দুঃখসমুদ্রে আনন্দের একটি ঢেউ দৃষ্ট হইল।
জয়নব বিনতে আলী (কঃ) এর চেষ্টায় ইমাম বংশের দুই শাখা একত্রিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত দুই শাখার মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক পূর্বেও হইয়াছিল। হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) ছাহেবের পুত্র বীর কাসেমের সহিত ইমাম হোসেন (রাঃ) ছাহেবের কন্যা সখিনার বিবাহ হইয়াছিল। কিন্তু কারবালার যুদ্ধে ইমাম হাসান-তনয় বীর কাসেম শহীদ হন। ইতিহাস-বিধৃত পুস্তকে দেখা যায়, সখিনা জীবনে আর কখনোও বিবাহ করেন নাই। তিনি ধর্ম, সাহিত্য ও কবিতা চর্চা করিতেন। বিদুষী ও শুদ্ধচারিণী বলিয়া মদীনায় তাহার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল।
ইমাম জয়নাল আবেদীন বিবাহ করেন। নতুন জীবন শুরু করেন। ইহার পর তিনি একদিকে তেজারতী কর্মকান্ড পরিচালনা করেন, অপর দিকে জাহেরী জ্ঞানার্জনে ব্রতী হন। এখানে উল্লেখ্য যে, কারবালার ঘটনার পূর্বে তিনি মসজিদে নববীতে জ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে নিয়মিত যাতায়াত করিতেন। বয়স বেশী না হইলেও বড় বড় শিক্ষাদাতাদের নিকট থেকে তিনি কুরআন, হাদীস ও ফিকাহের উপরে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন। তৎপর কয়েক বছর আর লেখাপড়া হয় নাই।
বিজ্ঞাপন
অতঃপর কারবালা হইতে মদীনায় আসিবার পরে নির্জন এবাদতের মাধ্যমে পিতা থেকে প্রাপ্ত এলমে বাতেনের কামালিয়াত অর্জন করিয়াছেন। কিন্তু এলমে হাদীস, এলমে তাফসীর ও এলমে ফিকাহের জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ তাহার পূর্বের মতই থাকিয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে তিনি আবার মসজিদে নববীতে যাতায়াত শুরু করেন; জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করেন। মসজিদে নববীর শিক্ষাকেন্দ্রে নিয়োজিত শিক্ষাদাতা সাহাবী ও তাবেয়ীগণ ইমাম জয়নাল আবেদীনকে অতীব যত্নে শিক্ষা দিতে থাকেন। তাহার অসাধারণ প্রতিভা ও প্রখর ধী-শক্তি দেখিয়া সকলেই আশ্চর্যান্বিত হন। মাত্র কয়েক বছরেই তিনি জ্ঞানের সর্বশাখায় পূর্ণতা হাছিল করেন। এলমে হাদীস, এলমে ফিকাহ, এলমে তাফসীরে কামালিয়াত অর্জন করেন। এলমে বাতেনে কামালিয়াততো পূর্বেই তিনি হাছিল করিয়াছিলেন। সর্ব বিষয়ে কামালিয়াত অর্জন করিয়া তিনি মুসলিম জগতে শ্রেষ্ঠতম আলেম হিসাবে উম্মতে মুহাম্মদী (সাঃ) এর মধ্যে ইমামের মর্যাদা লাভ করেন।
ইহার পর তিনি জ্ঞান বিতরণের কাজে আত্ম-নিয়োগ করেন। দ্রুতই তাহার খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ে। জ্ঞান-অন্বেষীদের ভীড় পড়ে তাঁহার দারবারে। খোদাঅন্বেষীদেরকে তিনি এলমে বাতেন শিক্ষা দেন। এতদ্ব্যতীত জ্ঞানের অন্যান্য শাখার যে কোন জটিল তত্ত্ব ও দুর্বোধ্য মাসলা উদঘাটন ও বিশ্লেষণের জন্য যাহারা তাঁহার সমীপে হাজির হইতেন, তাহাদেরকে সেই সমস্যার সমাধান দিতেন। শুধু যে সাধারণ লোক তাহার নিকট জ্ঞান অন্বেষণে আসিত-তাহাই নহে; মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্র থেকে, তথা মক্কা, মদীনা, কুফা, দামেস্ক, ইয়ামেন, মিশর, বসরা প্রভৃতি এলাকা থেকে শীর্ষস্থানীয় মোহাদ্দেস, মোফাসসের এবং ফকিহগণ আসিতেন তাহার নিকট হইতে ধর্মীয় বিভিন্ন জটিল তত্ত্বের মাসলা উদ্ধারে।
একদা হাদীসবিশারদ মুহাম্মদ ইবনে শেহাব যুহরী (রঃ) তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা আব্দুল মালেকের নিকটে যান। মালেকের সাথে তাহার হাদীস সম্পর্কে কিছু মূল্যবান আলাপ-আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে আব্দুল মালেক ইমাম যুহরী (রঃ) ছাহেবকে কিছু অর্থ এবং মূল্যবান দ্রব্য নজরানা স্বরূপ দেন। ইমাম যুহরী (রঃ) সেই অর্থ ও মূল্যবান দ্রব সমূহ একটি ব্যাগে ভরিয়া সংগী ক্রীতদাসের জিম্মায় দিয়া পথ চলিতে থাকেন। কিছুদূরে যাওয়ার পর সন্ধ্যা হয়। তাহারা দুইজন নির্জন মরুভূমিতে রাত্রি যাপন করেন। সকালবেলা ইমাম যুহরী তাঁহার ব্যাগ খুলিয়া অর্থ ও মূল্যবান দ্রব্যাদি খুঁজিতে থাকেন। কিন্তু ব্যাগে আর তাহা পান না। জায়গাটি ছিল জন-মানবশূন্য। কাজেই অন্য কেহ সেখানে আসিয়াছে-এমন কোন নজিরও পাওয়া গেল না। সংগত কারণেই ইমাম যুহরীর সন্দেহ হইল তাহার ক্রীতদাসের প্রতি। তিনি ক্রীতদাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করিলেন। কিন্তু ক্রীতদাস তাহার অপরাধ অস্বীকার করিল। ইহাতে তিনি অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া শাসনের উদ্দেশ্যে তাহাকে একটি ঘুষি মারেন। এক ঘুষিতেই ক্রীতদাসের মৃত্যু হয়। এই অভাবনীয় ঘটনায় তিনি খুবই অনুতপ্ত ও ব্যথিত হন। সেখানেই ক্রীতদাসটিকে দাফন করিয়া তিনি গৃহাভিমুখে রওয়ানা দেন। ক্রীতদাসকে হত্যা করার কোন ইচ্ছাই তাহার ছিল না। সামান্য একটি ঘুষিতে তাহার মৃত্যু হইবে-ইহাইবা কে জানে? ফলে ইমাম যুহরী (রঃ) এর অন্তর্দাহ শুরু হয়। বিবেক তাহাকে দংশন করিতে থাকে। ইহার প্রতিকার কি?-তাহা জানিবার জন্য তিনি বিভিন্ন আইনবিদের সমীপে হাজির হন। সমুদয় ঘটনা খুলিয়া বলেন। কিন্তু কেহই তাহার মনঃপুত উত্তর দিতে পারে না। সকলেই বলেন-এই অনিচ্ছাকৃত ক্রীতদাস হত্যার কোন দন্ডের বিধান প্রচলিত আইনে নাই। ইহা শ্রবণে তাহার অন্তরের অনুতাপ-অগ্নি মোটেই প্রশমিত হয় না। তিনি মদীনার বিভিন্ন মোহাদ্দেস ও ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণের নিকটে যাইয়া বিশদ আলোচনা করেন। কিন্তু সকলেরই একই উত্তর।
বিজ্ঞাপন
অবশেষে তিনি বিখ্যাত মোহাদ্দেস সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাবের শরণাপন্ন হন। সেখানেও কোন মনঃপুত সমাধান না পাইয়া তিনি যান হযরত আব্দুর রহমান (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রাঃ), হযরত ওরওয়া (রাঃ), কাসেম ইবনে মুহাম্মদ (রঃ) প্রমুখ সনামধন্য আলেমগণের নিকট। তাহারা সকলেই বলেন, আইনে যখন আপনার উপরে খুনের বদলা আরোপিত হয় না, তখন আপনার মনের অশান্তি কিভাবে দূর করিব? ফলে ইমাম যুহরী (রঃ) নিরাশ হন। তাহার অন্তর্দাহ বাড়িতেই থাকে। অবশেষে তিনি শরণাপন্ন হন ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের নিকট। সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলেন। ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেব সমুদয় শুনিয়া এক নিমিষ চিন্তা করিয়া ইহার সুষ্ঠু সমাধান দেন। তিনি ইমাম যুহরীকে বলেন, "আপনি আপনার কৃতকর্মের প্রতিকার উদ্দেশ্যে একজন মুসলিম ক্রীতদাসকে ক্রয় করিয়া আজাদ করিবেন অথবা একটানা দুইমাস রোযা রাখিবেন। তাহা হইলে, আপনার মনের অশান্তি দূর হইবে।"
ইমাম জয়নাল আবেদীনের উক্ত নির্দেশমত আমল করিয়া ইমাম যুহরী (রঃ) ছাহেব তাহার অন্তরের অনুতাপ-অগ্নি প্রশমিত করিতে সক্ষম হন। ইমাম যুহরীর উক্ত সমস্যার সমাধানে ইমাম জয়নাল আবেদীন যে সমাধান দেন তাহা শ্রবণ করিয়া মদীনার অন্যান্য আলেম, ফকিহ, মোহাদ্দেস সকলেই অবাক হন এবং জটিল সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রদানের যোগ্যতা দেখিয়া সকলেই তাহার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনি ভাবে ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেব সমকালীন সময়ে সকল ইমামগণেরও ইমাম হন। ধীরে ধীরে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে ও মর্যাদার তুংগে আরোহন করেন।
মারোয়ান পুত্র আব্দুল মালেক তখন মুসলিম সাম্রাজ্যের সিংহাসনে উপবিষ্ট। উমাইয়া বংশ উদ্ভুত সকলেই বনি হাশেমীদের ঘৃণা করিত। আব্দুল মালেকের মধ্যেও বনি-হাশেমীদের প্রতি যথেষ্ট বিদ্বেষ ছিল; তথাপিও ইমাম জয়নাল আবেদীন সম্পর্কে অতি সত্য কথাটি সে একদা তাহার দরবারস্থিত আমির-উমরাদের নিকট প্রকাশ করিয়া ফেলে।
বিজ্ঞাপন
একদা দরবারস্থিত লোকজনকে উদ্দেশ্য করিয়া আব্দুল মালেক প্রশ্ন করে, "তোমরা কি বলিতে পার, অতি সাধারণ জীবন-যাপন করিয়াও সকল শ্রেণীর লোকদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও মর্যাদার অধিকারী কোন ব্যক্তি?” সকলেই জবাব দিলেন, "মুসলিম জাহানের আপনিই শাসনকর্তা। আপনার চেয়ে মর্যাদাশালী আর কে হইতে পারে?"
খলিফা আব্দুল মালেক তাহাদের কথায় প্রতিবাদ করিয়া বলে, “তোমাদের ধারণা ভুল। অধুনা মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক মর্যাদাশালী তোমাদের এই আমীরুল মোমেনীন নয়। তিনি হইলেন মদীনার অধিবাসী অতি মামুলী জীবনযাপনরত জয়নাল আবেদীন ইবনে হোসেন (রাঃ)। যে অবস্থায় পতিত হইলে মানুষের কোন মর্যাদাই থাকে না, সেই অবস্থার মধ্যে হইতে তিনি সকলের উপর মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছেন।"
পূর্বেই বলিয়াছি, ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেব তেজারতী করিতেন। তাহার ব্যবসা দেখাশুনার জন্য বেশ কিছু সৎ ও একনিষ্ঠ অনুসারী নিয়োজিত ছিলেন। তাহার ব্যবসায়ী কাফেলা বসরা, কুফা, সিরিয়ায় নিয়মিত ভাবে যাতায়াত করিত। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় প্রচুর মুনাফা হইত তাহার ব্যবসায়। অন্যদিকে জ্ঞান আহরণে মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্র থেকে জ্ঞান অন্বেষীগণ নজরানা ও উপঢৌকনসহ তাহার কদমে আসিতেন। প্রাপ্ত নজরানা থেকেও প্রচুর অর্থ জমা হইত। মাত্র সামান্য পরিমাণ অর্থ তিনি তাহার পারিবারিক খরচের জন্য ব্যয় করিতেন। ইহা ব্যতীত ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা এবং অনুসারীদের দেওয়া নজরানা জনসেবামূলক কাজে ব্যয় করিতেন। তাহার জনকল্যাণমূলক কাজের মধ্যে নিম্নলিখিত কার্যসমূহ উল্লেখযোগ্য-
বিজ্ঞাপন
ধর্মীয় প্রচারকেন্দ্র হিসাবে দরবার পরিচালনা করা।
ঋণগ্রস্থদের ঋণের দায় থেকে মুক্ত করা।
অভাবগ্রস্থদের অভাব দূর করা।
বিজ্ঞাপন
এতিম ছেলেমেয়েদের লালন-পালন করা।
নিরন্নকে অন্ন দান করা এবং
ক্রীতদাস-দাসীদেরকে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করা।
এতদ্ব্যতীত আরও অনেক জনহিতকর কাজ তিনি করিতেন।
আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে দাস প্রথা সর্বত্রই চালু ছিল। মানুষ সাধারণ পণ্যের মত হাটে-বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হইত। ক্রীতদাস দাসীদেরকে সামান্য পরিমাণ খাবার দেওয়া হইত। বিনিময়ে তাহাদের থেকে সাধ্যাতীত শ্রম আদায় করা হইত। স্বাধীনতা বলিতে তাহাদের কিছুই ছিল না। শুধু শ্রম আর শ্রম দিতে হইত। তাহাদের পাজর ভাঙ্গা শ্রমেই গড়িয়া উঠিত বড় বড় সৌধ-অট্টালিকা। তাহাদের বৈবাহিক জীবনের প্রয়োজনীয়তাও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মিটাইয়া দেওয়া হইত। কোন কাজেই কোন প্রতিবাদ তাহারা করিতে পারিত না। কেহ কোন প্রতিবাদ করিলে তাহার ভাগ্যে জুটিত অমানুষিক নির্যাতন। বড় কোন অপরাধ করিলে তো আর রক্ষা নাই-তাহাকে হত্যা করা হইত।
দয়াল নবীই (সাঃ) প্রথম ব্যক্তি-যিনি এই দাস প্রথা উচ্ছেদ সাধনে সচেষ্ট হন এবং পর্যায়ক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সফলকামও হন।
পরবর্তীতে তিনিই ঘোষণা করেন যে, তোমরা যাহা খাইবে, দাস-দাসীদেরকে তাহাই খাইতে দিবে; তোমরা যাহা পরিবে, দাস-দাসীদেরকে তাহাই পরিতে দিবে। তাহাদেরকে সু-শিক্ষা দিবে। মুক্তির ব্যবস্থা করিবে। "দাস-দাসীদের মুক্ত করনও এবাদত"-ইহা দয়াল নবীই (সাঃ) প্রথম প্রচার করেন।
দয়াল নবী (সাঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মানবিক ও সাত্ত্বিক আদর্শ চার খলিফা পর্যন্ত ভালই অনুসৃত হয়। কিন্তু বনি উমাইয়ারা শাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দয়াল নবী (সাঃ) এর উক্ত মানবতার আদর্শ অবহেলিত ও উপেক্ষিত হইতে থাকে। দাসপ্রথা পূর্বের রূপ নেয়। আবারও দাসদাসী গরুছাগলের মত ক্রয়-বিক্রয় হইতে থাকে।
ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের দেলে দাস দাসীদের মানবেতর জীবন ক্ষতের সৃষ্টি করে। তিনি দাস প্রথা উচ্ছেদে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাহার সংস্কার কর্মকান্ডের মধ্যে দাস প্রথার উচ্ছেদ সাধনই ছিল অন্যতম। সেই উদ্দেশ্যে তিনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে, তাহার অর্থ সম্পদের কোন অভাব ছিল না। তিনি সেই অর্থ দ্বারা দাস দাসী খরিদ করিতেন। মদীনা, মক্কা, বসরা, তথা সর্বত্র থেকে দাসদাসী ক্রয় করিয়া তাহার দরবারস্থিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করিতেন। তারপর তাহাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হইত। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও তাহাদেরকে দেওয়া হইত। প্রশিক্ষণ দানের জন্য নিয়োজিত শিক্ষাদাতাগণই খরিদকৃত গোলামদেরকে ধর্মীয় ও বৃত্তিমূলক কারিগরী শিক্ষা দান করিতেন। আর এলমে বাতেন বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিতেন ইমাম জয়নাল আবেদীন নিজেই। এক একজন ক্রীতদাস দাসীকে এক বছরের অধিক সময় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে থাকিতে হইত না।
প্রতি বছর রমজান মাসে ঈদুল ফিতরের দুই-তিন দিন পূর্বে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মক্ষম ক্রীত দাস-দাসীগণকে তিনি মুক্তি দিতেন। মুক্তি প্রদানের অনুষ্ঠানও ছিল অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। খরিদকৃত দাস-দাসীদের সংখ্যা ছিল অনেক। তাহাদের নামের তালিকা রাখা হইত। এক বছরের মধ্যে ক্রয়কৃত গোলামেরা যে সমস্ত অপরাধ করিত; ইমাম জয়নাল আবেদীনের নির্দেশে তাহা লিখিয়া রাখা হইত।
রমজান মাসের শেষের দিকে "গোলাম মুক্তি দিবসে" ইমাম জয়নাল আবেদীন গোলামদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত হইয়া এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দিতেন। অতঃপর যে সকল গোলামের প্রশিক্ষণকাল এক বছর অতিক্রান্ত হইয়াছে-তাহাদের নাম ঘোষণা করিতেন। এক বছরের মধ্যে
তাহারা যে সব অপরাধ করিয়াছে-তাহা তাহাদেরকে পাঠ করিয়া শুনাইতেন। অতঃপর তিনি খরিদকৃত দাস-দাসী (যাহাদের সময়কাল এক বছর অতিক্রম করিয়াছে) গণকে বলিতেন, "তোমরা অযু করিয়া দুই রাকায়াত তওবার নামাজ আদায় কর। তারপর মহান খোদাতায়ালার দরবারে তোমাদের জন্য এবং এই ফকিরের জন্য ক্ষমা চাও।”
নির্দেশ পাওয়ামাত্র গোলামেরা অযু করিয়া নামাজ সমাপ্ত করিয়া মহিমান্বিত আল্লাহর দরবারে অনুতপ্ত হৃদয়ে হাত তুলিয়া নিজেদের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাহিতেন এবং ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের জন্য সার্বিক মংগল কামনা করিতেন।
অতঃপর ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেব তাহাদেরকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করিয়া মুক্তি দিতেন। সংগে প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পদ ও মাল-সামানাও দান করিতেন
মুক্তিপ্রাপ্ত দাস-দাসীরা স্বাধীন জীবন যাপন করিতেন; কিন্তু ইমাম জয়নাল আবেদীনের মধুময় সান্নিধ্য তাহারা ছাড়িতেন না। ইমাম ছাহেবের নির্দেশে তাহাদের অনেকেই জ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করিতেন। জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে তাহাদের অনেকেই পরবর্তীতে বড় বড় আলেম, মোহাদ্দেস বা ফকীহরূপে পরিগণিত হইয়াছেন।
ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের একক চেষ্টায় এই রকম কত সংখ্যক দাস-দাসী যে তাহাদের দাসত্বের বিড়ম্বনাময় জীবন থেকে মুক্তি পাইয়া স্বাধীন জীবনের আস্বাদন পাইয়াছেন-তাহার ইয়ত্বা নাই। কিতাবে দেখা যায়-ইমাম ছাহেবের দয়া ও অনুকম্পায় শুধু মদীনাতেই মুক্তিপ্রাপ্ত দাস-দাসীদের সংখ্যা ছিল অর্ধ লাখেরও বেশী। মদীনা ছাড়া মুসলিম রাজ্যের সর্বত্র থেকেই তিনি দাসদাসী খরিদ করিয়া প্রশিক্ষণ প্রদানান্তে তাহাদেরকে মুক্তি দিতেন।
শুধু যে দুনিয়াবী দাসত্বের শৃংখল থেকে ইমাম জয়নাল আবেদীন খরিদকৃত দাস-দাসীগণকে মুক্তি দিয়াছেন তাহা নহে-তিনি তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিয়া তাহাদেরকে নাফসের দাসত্বের শৃংখল হইতেও মুক্ত করিতেন। ফলে তাহারা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান বা আল্লাহ-রাসূলের প্রেমতত্ত্বের চিত্তশীতলকারী আস্বাদন লাভ করিয়া আপন আপন জীবনকে ধন্য করিতেন।
ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের লক্ষ লক্ষ অনুসারী এবং উভয় দাসত্বের শৃংখলমুক্ত লক্ষ লক্ষ গোলাম তাহারই নির্দেশমত কাজ করিত। তিনি যাহা বলিতেন, তাহারা তাহাই তৎক্ষণাৎ পালন করিত। এই সকল অনুসারী ও গোলামেরা ইমাম জয়নাল আবেদীনকে নিজ প্রাণাপেক্ষা অধিক মহব্বত করিতেন। এমনি ভাবে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় নবী বংশের একমাত্র প্রদীপ জয়নাল আবেদীন যশ-খ্যাতি, মান-মর্যাদা ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করেন। ইমাম-তনয়ের এই জনপ্রিয়তা তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা মারোয়ান-পুত্র আব্দুল মালেকের গাত্রদাহের সূচনা করে।
এখানে আব্দুল মালেকের কিছুটা পরিচয় প্রয়োজন। নসিহত নং-৪৭ এ বলা হইয়াছে যে, মোয়াবিয়ার পরে দামেস্কের সিংহাসনে আরোহন করে মোয়াবিয়া-পুত্র এজিদ। এজিদ মাত্র তিন বছর তিন মাস ক্ষমতায় ছিল। একদা হরিণ শিকার হইতে ফিরিবার পথে অশ্বের পদস্খলনের কারণে সে ভূপাতিত হইয়া আহত হয়। আহতাবস্থায় তাহাকে নিকটস্থ শিকার গৃহে নেওয়া হয়। সেখানে মাত্র ৪০ বছর বয়সে বহু অপকর্মের নায়ক এজিদ ইবনে মোয়াবিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
এজিদ মুসলিম সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হইতে পারে নাই। কারবালার হত্যার পরে মক্কা-মদীনা-কুফায় যে বিদ্রোহ দেখা দেয়-তাহার একাংশ দমন করিতে না করিতেই এজিদের ডাক পড়ে। তাহার ইহলিলা সাংগ হয়। এজিদের পরে দামেস্কের সিংহাসনে বসে এজিদেরই জ্যেষ্ঠ-পুত্র দ্বিতীয় মোয়াবিয়া। কথায় বলে, "গোবরেও পদ্ম ফুল ফোটে।" এজিদের এই পুত্র দ্বিতীয় মোয়াবিয়া ছিল গোবরে উৎপন্ন পদ্ম ফুলের অনুরূপ। পিতা এজিদ ছিল মদ্যপ, বহুনারীভোগী; তাহার প্রায় সমুদয় কর্মকান্ডই ছিল রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রতিষ্ঠিত আদর্শ-পরিপন্থী। এজিদ-পুত্র দ্বিতীয় মোয়াবিয়া ছিলেন ঠিক ইহার বিপরীত। তিনি ছিলেন সাত্ত্বিক আদর্শের অনুসারী, ধর্মভিরু ও সৎ প্রকৃতির মানুষ। উমাইয়াদের অনুরোধে তিনি দামেস্কের সিংহাসনে বসেন। কিন্তু রাজপ্রাসাদের অন্যায়-অপকর্ম, ব্যভিচার-অনাচার এবং এজিদ কর্তৃক নিযুক্ত আমির-উমরাহের ধর্মবিরোধী কর্মকান্ড দেখিয়া তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিয়া মসজিদে নির্জন এবাদতে মগ্ন হন। ইহার মাত্র চল্লিশ দিন পরে আততায়ীর বিষ প্রয়োগে তিনি নিহত হন। এজিদের জ্যেষ্ঠ পুত্রের পরে এজিদ কর্তৃক প্রণীত সংবিধান মতে দামেস্কের সিংহাসনে বসার কথা এজিদের দ্বিতীয়-পুত্র খালেদের। কিন্তু সে ছিল নাবালক। তাই তাহার বয়ঃপ্রাপ্তির সাপেক্ষে দামেস্কের মসনদে আরোহণ করে মোয়াবিয়ার জ্ঞাতিভ্রাতা কু-চক্রী মারোয়ান ইবনে হাকাম।
অন্যদিকে মক্কা-মদীনার জনগণ আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের নেতৃত্বে সংগবদ্ধ হয়। এই আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের ছিলেন সাহাবী-সম্রাট হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের দৌহিত্র। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) যখন মক্কা ছাড়িয়া মদীনায় হিজরত করেন, তখন আবুবকর-তনয়া আসমা (রাঃ) নিজ পরিধানের বস্ত্র ছিড়িয়া দয়াল নবী (সাঃ) এর উটের গলায় খাদ্যের থলিয়া বাঁধিয়া দিয়াছিলেন। সেই আসমা (রাঃ) এর গর্ভজাত সন্তান হইলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের।
কারবালার হত্যাকান্ডের পরে আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের মক্কার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়াইয়া কারবালায় এজিদ বাহিনীর নৃশংস হত্যাকান্ডের চিত্র তুলিয়া ধরিয়া এক জ্বালাময়ী ভাষণ দান করেন। তিনি কারবালা হত্যার প্রতিকারের জন্য মক্কা ও মদীনাবাসীদিগকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান। তাহার ডাকে সেদিন মক্কা-মদীনা, হেযায-ইয়ামেন, ইরান-ইরাকের ধর্মভিরু আশেকে রাসূল সকল সাড়া দেয়। ফলে দক্ষিণ আরব [হেযায ও ইয়ামেন) ও পূর্ব আরব (ইরাক-ইরান) এবং মক্কা-মদীনা আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের নেতৃত্বে উমাইয়া শাসকদের নাগপাশ হইতে মুক্ত হয়। এই সময় মুসলিম সাম্রাজ্যে দুইজন শাসনকর্তা শাসন করিতে থাকেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের উত্তর ও পূর্বভাগ শাসন করিতে থাকে দামেস্কের খলিফা উমাইয়া বংশোদ্ভূত মারোয়ান এবং দক্ষিণ ও পূর্বভাগ শাসন করিতে থাকেন মক্কার খলিফা আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের।
ইহার কিছুদিন পরেই (৬৫ হিজরীর দিকে) কুফায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। কুফার জনগণ বিপ্লবী নেতা মুখতারের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। মুখতারের নেতৃত্বে কুফার জনগণ কারবালা হত্যার প্রতিশোধ নেয়-নসিহত নং- ৪৭ এ সে সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে।
এই কুফা আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের শাসনাধীন ছিল। কিন্তু কারবালার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের পর থেকে মুখতার নির্বিঘ্নে কুফার শাসনকার্য চালাইতে থাকেন। এই সময় মুসলিম সাম্রাজ্যে তিনজন খলিফা পরিলক্ষিত হয়। দামেস্কের শাসক মারোয়ান ইবনে হাকাম। মক্কা-মদীনার শাসক আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের এবং কুফার শাসনকর্তা মুখতার ইবনে আশু ওবায়দা।
মক্কা মদীনার জনগণ আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরকে সিংহাসনে বসাইয়াছেন মূলতঃ কারবালা হত্যার প্রতিকারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রতিকার বিধানে আব্দুল্লাহর অবহেলা ও অহেতুক বিলম্ব দর্শনে মুখতার কুফার জনগণের অকুন্ঠ সমর্থন পুষ্ট হইয়া এজিদ গংদের দন্ড বিধানে সমর্থ হন। ইহাতে পূর্ব আরবে (ইরাক ও ইরানে) মুখতারের সমর্থন বাড়িতে থাকে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের সমর্থন কমিতে থাকে।
রাজ্যলিপ্সা মানুষকে কখনও কখনও অন্ধ করিয়া তোলে। আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রেও ইহা পরিলক্ষিত হয়। সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া মুখতারের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করে। তাহারই নির্দেশে তাহার ভ্রাতা, বসরার গর্ভণর "মাসআব" এবং ইরানে নিযুক্ত সেনাপতি মহল একত্রে বিশাল এক সেনাবাহিনী লইয়া কুফার উপর ঝাপাইয়া পড়ে। মুখতার আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের প্রেরিত মাসআব ও মহলের আক্রমণ প্রতিহত করিবার প্রাণপণ চেষ্টা করেন কিন্তু পারেন না। এই যুদ্ধে মুখতার শাহাদাত বরণ করেন।
রাজনৈতিক দাবা খেলায় কারবালা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণকারী মুখতারকে হত্যা করা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের মারাত্মক ভুল চাল। এই মর্মান্তিক মুখতার-হত্যার অব্যবহিত পরেই আব্দুল্লাহর প্রতি সর্বত্রই সমর্থন হ্রাস পাইতে থাকে।
ঐদিকে দামেস্কের শাসনকর্তা কুচক্রী মারোয়ান মাত্র একবছর কয়েক মাস (৬৮৩-৬৮৪ খৃঃ) রাজত্ব করিবার পরে এক নিশীথে তাহারই স্ত্রীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। মারোয়ানের পরে দামেস্কের সিংহাসনে উপবেসন করে মারোয়ান-পুত্র আব্দুল মালেক।
এই সময় মুখতারের আকস্মিক পতনে মুসলিম রাজ্যে দুই দিকে দুইজন রাজনৈতিক নেতাকে দৃষ্ট হয়। দামেস্কের মসনদে আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ান এবং মক্কার মসনদে আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের।
মুখতার হত্যার কারণে আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের প্রতি জনসমর্থন কমিতে থাকে। এই সুযোগে আব্দুল মালেক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে কুফাতে সৈন্য প্রেরণ করে এবং নিজেও এক দল সৈন্য লইয়া কুফা আক্রমণ করে এবং কুফায় নিযুক্ত আব্দুল্লাহর গভর্ণর মাসআবকে হত্যা করিয়া কুফা দখল করে। ফলে কুফা আব্দুল মালেকের হস্তগত হয়।
ইহার পর আব্দুল মালেক মক্কা বিজয়ের জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের বিরুদ্ধে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নামক এক দুর্ধর্ষ সেনাপতির অধীনে বিরাট এক দল সৈন্য পাঠায়। তুমুল যুদ্ধ হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের এই যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়। ফলে মক্কা-মদীনা, ইয়ামেন, কুফা-বসরা তথা সর্বত্র আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ানের খেলাফত প্রতিষ্ঠা হয়। আব্দুল মালেক সমগ্র মুসলিম সামাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হয়।
আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ান যখন সমগ্র মুসলিম রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি; ঠিক তখন ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীন জনপ্রিয়তার শীর্ষে ও যশ-খ্যাতি, মানমর্যাদার তুংগে। জয়নাল আবেদীনের জনপ্রিয়তায় আব্দুল মালেকের মাথা ব্যথা শুরু হয়। তাহার চিন্তা হয়, জয়নাল আবেদীনের যে জনপ্রিয়তা, যে খ্যাতি; ইহা যদি তিনি তাহার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কাজে লাগান, তবে সহজেই সফলকাম হবেন। কারণ লক্ষ লক্ষ অনুসারী ও মুক্তিপ্রাপ্ত অগণিত গোলাম তাহার সামান্য নির্দেশেই প্রাণপাত করিতে সদা প্রস্তুত। কাজেই যে কোন সময়েই আব্দুল মালেকের সিংহাসনে ঝড় উঠিতে পারে। চিন্তায় তাহার নিদ্রা আসে না। সে জয়নাল আবেদীনের জনপ্রিয়তাকে নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে লাগানোর চেষ্টা করে কিন্তু ইমাম-তনয়কে বশে আনিতে ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতা থেকে আব্দুল মালেকের মধ্যে প্রতিহিংসার জন্ম হয়। সে ইমাম-তনয় জয়নাল আবেদীনকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে।
ইমাম-নন্দনকে বশে আনার প্রচেষ্টা, প্রচেষ্টায় ব্যর্থতা, অতঃপর ইমাম-তনয়ের উপর নির্যাতন প্রভৃতি বিষয়ে পরবর্তী নসিহতে আলোচনার আশা রইল।
এতক্ষণের আলোচনায় তোমরা নিশ্চয় বুঝিলে যে, কারবালার হত্যার পরে রাসূল প্রচারিত আদর্শের পতাকা ভূলুণ্ঠিত হয়। সর্বত্রই অন্যায়, অত্যাচার, ব্যভিচার, অনাচার মাথাচাড়া দিয়া উঠে। সত্য উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত হয়। মিথ্যার লালন হইতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতপ্রায় ইসলাম বা দয়াল নবী (সাঃ) এর পর্যুদস্ত আদর্শের পতাকাকে আকাশে বাতাসে উড়ানোর জন্য যুগের শ্রেষ্ঠতম সাধক ও সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানী জয়নাল আবেদীনই জীবনপণ চেষ্টা করেন। বহু ঝড়-ঝঞ্ছা ও উত্তাল তরঙ্গ সত্ত্বেও রাসূলে পাক (সাঃ) এর ভূলুণ্ঠিত পতাকাকে তিনি আকাশে উঠাইতে সক্ষম হন। মহান খোদাতায়ালার দয়া ও অনুকম্পায় সবই সম্ভব হয়।








