Logo

হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়ার সংক্ষিপ্ত আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১০ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৫৯
হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়ার সংক্ষিপ্ত আলোচনা
ছবি: সংগৃহীত

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়ার সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

কামালাতের মাকামসমূহের ঊর্ধ্বে জাতমুখী দুইটি রাস্তা বর্তমান। একটি হকিকতে আম্বিয়া, অপরটি হকিকতে এলাহিয়া।

হকিকতে আম্বিয়া দফতরে পাঁচটি মাকাম আছে। যথাঃ

  • হকিকতে ইব্রাহিমী,

বিজ্ঞাপন

  • হকিকতে মুসবী,

  • হকিকতে মুহাম্মদী,

  • হকিকতে আহমদী ও

  • বিজ্ঞাপন

  • হোব্বে সেরফা

  • হকিকতে এলাহিয়ার দফতরে চারটি মাকাম বর্তমান। যথাঃ

    • হকিকতে কুরআন,

    বিজ্ঞাপন

  • হকিকতে কা'বা,

  • হকিকতে সালাত ও

  • মাবুদিয়াতে সেরফা।

  • বিজ্ঞাপন

    হকিকত অর্থ মূল উৎস বা তাৎপর্য। ফল বা ফুলের উৎস বীজ। বীজ দেখিয়া ফল বা ফুলের বা ঐ গাছের আকৃতি, রং বা সুঘ্রাণের পরিচয় পাওয়া যায় না। তবুও আমরা বলি ইহা বটবৃক্ষের বীজ বা অমুক ফুলের বীজ। হকিকতের গুণাগুণ বা অবস্থা আছে; রূপ, আকার বা ছুরাত নাই। তদ্রুপ হকিকতে আম্বিয়া বা হকিকতে এলাহিয়ার মাকাম সমূহের গুণাগুণ ও অবস্থা আছে, সেই অবস্থার আত্মিক দর্শন ও অনুভূতিও আছে। দয়া মানবীয় গুণ সমূহের একটি। খালেক সাহেব দয়ার্দ্র ব্যক্তি বলিলে তাহার মনের অবস্থা ও গুণাগুণ সম্পর্কে আমরা ধারণা করিতে পারি বা দয়ার ফল হিসাবে তাহার নিকট হইতে কেহ কিছু প্রাপ্ত হইলে তাহা আমরা বুঝিতে পারি-ইহা তাহার দয়া গুণের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আমরা বলিতে পারি না, দয়া গুণটি দেখিতে কেমন বা শুনিতে কেমন বা ছুঁইয়া দেখিলে নরম বা শক্ত লাগে। হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কা'বা ও হকিকতে সালাত-এই স্তরসমূহে যে ছালেক আল্লাহতায়ালার দয়া ও আপন পীরের সাহায্যে উন্নীত হন; তিনি এই ভিন্ন ভিন্ন দফতরের অবস্থা ও গুণাগুণ কি তাহা অনুভব করিতে পারেন কিন্তু তাহার আকৃতিগত কোনো কিছু দেখেন না।

    হকিকত সম্পর্কে আর একটি বিষয় জানিবার এই যে, হকিকত জগত আল্লাহতায়ালার সিফাতে হাকিকী অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নিজস্ব ও জাতসংলগ্ন গুণসমূহের প্রকাশ স্থল। সৃষ্টির তাবৎ কিছুরই উৎপত্তি স্থল আল্লাহতায়ালার জাতসংলগ্ন এই হাকিকী সিফাতসমূহ। গুণের কোনো ছুরাত নাই কিন্তু অবস্থা আছে। এই অবস্থা দেখিয়া, ছুঁইয়া, শুনিয়া বুঝিবার নহে-উহা হৃদয় দিয়া বুঝিবার বা অনুভব করিবার বিষয়। হকিকত ঐ গুনসমূহেরই 'অবস্থা'। তাই ঐ অবস্থা সমূহ হৃদয় দিয়া বুঝিবার বিষয়। আর তিনিই ঐ অবস্থা হৃদয় দিযা বুঝিতে পারেন, যিনি আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে ঐ অবস্থা দান হিসাবে আপন মোরশেদে কামেলের অনুসরণ, দয়া ও তোফায়েলীতে লাভ করেন। এই খন্ডে উল্লিখিত হকিকতসমূহের অবস্থা সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব বর্ণনা করা হইবে। ছুফীগণ হকিকত জগৎকে এবং জাতপাককে ভাষার অবর্ণনীয় বলিয়াছেন। বস্তুতই উহা অবর্ণনীয়। 'দয়া' গুণ বা ফলের মিষ্টত্ব কেমন; দেখিতে বা শুনিতে কেমন, তাহা বলা যায় না। তবুও দয়া ও মিষ্টত্ব গুণ সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি আছে- আর অনুভূতিরও প্রকাশ আছে; যদিও 'প্রকাশ' অনুভূতির ধার-কাছ দিয়াও যাইতে পারে না। তাই হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কা'বা, হকিকতে সালাত সম্পর্কে যতটুকুই লেখা হইবে, তাহা অবর্ণনীয় অনুভূতিরই প্রকাশ যাহা অনুভূতির কোটি ভাগের এক ভাগও নয়। এ নসিহতে উল্লিখিত মাকামসমূহের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইতেছে। মাকামসমূহের বিস্তারিত আলোচনা থাকিবে এ খন্ডেরই পরবর্তী নসিহতসমূহে।

    শুরুতেই উল্লেখ করা হইয়াছে-জাতমুখী দুইটি পথ। যথাঃ হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া। হকিকতে আম্বিয়ার পথ অতিক্রম করিতে হয় মহব্বতের মাধ্যমে এবং হকিকতে এলাহিয়া অতিক্রম করিতে হয় ইবাদতের মাধ্যমে। আর এই জন্যই বলা হয়, খোদাপ্রাপ্তির দুইটি পথ; মহব্বত ও ইবাদত। শুধুমাত্র মহব্বতে যেমন খোদাকে পাওয়া যায় না; তেমনি শুধু ইবাদতেও খোদাতায়ালাকে পাওয়া যায় না। মহব্বতের সাথে ইবাদত বা ইবাদতের সাথে মহব্বতের সংমিশ্রণ প্রয়োজন। মহব্বত ও ইবাদতের পূর্ণতা যখন আসে- তখনই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান ছালেকের হাছিল হয়।

    বিজ্ঞাপন

    হকিকতে আম্বিয়ার দফতর অতিক্রমের মাধ্যম হইল মহব্বত বা প্রেম। তাই ইহাকে মহব্বতের রাস্তাও বলা হয়। মহব্বত দুই প্রকার। যথা-মহব্বতে জাতি বা জাতি প্রেম এবং মহব্বতে সিফাতি বা সিফাতি প্রেম।

    গুণাবলী, সৌন্দর্য বা ক্রিয়াকলাপ দর্শনে যে প্রেম সৃষ্টি হয় তাহাকে সিফাতি প্রেম বলে। যেমন ইউসূফ (আঃ) ও জোলেখার প্রেম। আবার গুণাবলী, ক্রিয়াকলাপ বা সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি না দিয়া কেবলমাত্র জাতের বা সত্ত্বার যে প্রেম; তাহাকে জাতি প্রেম বা জাতি মহব্বত বলে। যেমন সন্তানাদির প্রতি পিতা-মাতার প্রেম।

    প্রেম বা মহব্বতের জন্য দুইটি পক্ষের প্রয়োজন। যে কোন এক পক্ষ হইতে প্রেম উৎপন্ন হইয়া অপর পক্ষের দিকে ধাবিত হয়। যে পক্ষ হইতে প্রেম উৎপন্ন হয়; তাহাকে বলে প্রেমিক বা মোহেব। আবার যে পক্ষের দিকে প্রেম ধাবিত হয়, তাহাকে বলে প্রেমাস্পদ বা মাহবুব। কাজেই প্রেম দুই প্রকার হইলেও ইহার অবস্থা দাঁড়ায় চারটি। যথা-মহব্বতে জাতি, মাহবুবিয়াতে জাতি, মহব্বতে সিফাতি ও মাহবুবিয়াতে সিফাতি।

    বিজ্ঞাপন

    প্রেমের উল্লিখিত চারটি অবস্থা সম্পর্কে জানিতে হইলে প্রেমমুল্লুকের বা হকিকতে আম্বিয়ার দফতরসমূহ অর্থাৎ হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী অতিক্রম করিয়া হোব্বে সেরফায় পৌঁছাইতে হইবে।

    হকিকতে ইব্রাহিমীঃ

    এই মাকাম হইতে পাওয়া যায় মাহবুবিয়াতে সিফাতি বা সিফাতি প্রেমাস্পদত্ব নূরের ফয়েজ। এই মাকাম হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর জন্য খাছ। তিনি আল্লাহতায়ালার সিফাতের প্রতি বেশী আকৃষ্ট ছিলেন। আল্লাহতায়ালার গুণ সম্পর্কীয় আলোচনা শ্রবণে তিনি অতিশয় আবেগাভিভূত হইতেন। সিফাত বা গুণাগুণের প্রতি তাঁহার যেমন আকর্ষণ ছিল তেমনটি জাতের বা সত্ত্বার প্রতি ছিল না। তাই দেখা যায় যে, আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাতের প্রতি পূর্ণ আস্থা দর্শনে অস্থির থাকিতেন। তিনি বলিতেন, "হে খোদা! তুমি কিভাবে থাকা সত্ত্বেও তিনি জাত দর্শনে উদগ্রীব না হইয়া সিফাত বা ক্রিয়াকলাপ মৃত্যুকে জীবিত কর, আমাকে তাহা দেখাও।"

    বিজ্ঞাপন

    সিফাত বা গুণাবলীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট থাকায় কাহারও নিকট থেকে আল্লাহর গুণ কীর্তনের কথা শুনিলে তিনি আবেগাপ্লুত হইতেন। তিনি আল্লাহর গুণমুগ্ধ ছিলেন। তাই তাহাকে খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু বলা হইত। কারণ বন্ধু বন্ধুর গুণে মুগ্ধ থাকেন। বন্ধুর চোখে বন্ধুর কোন দোষ ধরা পড়ে না।

    একদা হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহতায়ালাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে পরওয়ারদিগার! আপনি কি কারণে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে বন্ধু বলিয়াছেন?” উত্তর হইল- প্রেমের কারণে। সে আমাকে অতিশয় প্রেম করে; উহার নিকট গেলে জানিতে পারিবে। ইহা শুনিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) এক দরিদ্রের বেশে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর বাড়ির নিকটে উপস্থিত হইয়া মধুর সুরে আল্লাহর গুণগান করিতে লাগিলেন। ইহা শুনিয়া হযরত ইব্রাহিম (আঃ) অধির হইয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন এবং আল্লাহর গুণকীর্তন শুনিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) এই অবস্থা দেখিয়া চুপ করিলেন। এমন সময় হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কাতর স্বরে বলিতে লাগিলেন, হে গায়ক! খোদার দিকে দৃষ্টিকরতঃ আরও কিছুক্ষণ গান কর। জিব্রাইল (আঃ) আবার গুণগান শুরু করিলেন। ইব্রাহিম (আঃ) অধিক ব্যাকুল হইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। জিব্রাইল (আঃ) চমৎকৃত হইয়া আবার চুপ করিলেন। তখন ইব্রাহিম (আঃ) কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিলেন, আমার সমুদয় সম্পদ ও টাকা-পয়সা যাহাকিছু আছে, সবই আপনাকে দিলাম। আপনি পূর্বাপেক্ষা আরও অধিক গুণগান করুন। জিব্রাইল (আঃ) গাইতে আরম্ভ করিলেন এবং অনেকক্ষণ গাহিয়া আবার চুপ করিলেন। ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, হে গায়ক! এখন কেবলমাত্র আমার প্রাণটি অবশিষ্ট আছে; ইহাও আমি আপনাকে দিলাম। আপনি পূর্বাপেক্ষ আরও অধিক আল্লাহর গুণগান করুন। গায়ক আবার গুণগান করিলেন। অতঃপর হযরত ইব্রাহিম (আঃ) গায়কের হাত ধরিয়া আপন বাড়িতে লইয়া গেলেন এবং সমুদয় সম্পদ ও পরিবারবর্গ সমর্পণ করিয়া বলিলেন, আমিও জীবিতকাল পর্যন্ত আপনার অনুগত থাকিলাম। তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) নিজের পরিচয় প্রদান করিয়া বলিলেন, এই কারণেই আল্লাহ আপনাকে খলিল বা বন্ধু বলিয়াছেন, আপনি তাহারই উপযুক্ত। হকিকতে ইব্রাহিমীর মাকামকে তাই খোল্লাতেরও মাকাম বলা হয়।

    হকিকতে মুসবীঃ

    বিজ্ঞাপন

    এই মাকাম থেকে মহব্বতে জাতি নূরের প্রকাশ পায়। জাতী প্রেমের নূর নিপতিত হওয়ায় কখনও কখনও খোদাতায়ালার নিরপেক্ষ গুণের প্রতিবিম্ব সাধকের উপর পতিত হয়। সেই সময়ে সাধক নির্ভীকচিত্তে খোদাতায়ালার সহিত কথা বলিতে থাকে, যেমন হযরত মুসা (আঃ) নির্ভীকচিত্তে খোদাতায়ালাকে বলিয়াছিলেন, "হে খোদা! তুমি আমাকে দেখা দাও, আমি তোমাকে দর্শন করি।"

    হকিকতে মুহাম্মদীঃ

    এই মাকাম মহব্বতে জাতী ও মাহবুবিয়াতে জাতী-উভয় প্রকার ফয়েযানের উৎপত্তিস্থান। হকিকতে মুহাম্মদী হকিততে ইব্রাহিমীর বৃত্তের কেন্দ্র। কেন্দ্রই বৃত্তের মূল। জাতপাকের সাথে বৃত্তের পরিধীর চেয়ে কেন্দ্রের সম্পর্কই নিকটতর। এ মাকাম হাসিলকারী সাধকের সাথে নবী করীম (সাঃ) এর এক বিশেষ প্রেমের সম্পর্ক গড়িয়া উঠে। আসহাবদিগের অনুগমন, নবী করীম (সাঃ) এর অনুসরণ ছালেকের নিকট তখন অধিক প্রিয় বলিয়া মনে হয়।

    বিজ্ঞাপন

    হকিকতে আহমদীঃ

    এই মাকাম বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতী নূরের উৎপত্তিস্থান। ইহা হকিকতে মুহাম্মদীর মূল। এই মাকাম হকিকতে কুরআন, হকিকতে কা'বা, হকিকতে সালাত মাকাম সমূহের সমমর্যাদার।

    হোব্বে সেরফাঃ

    এই মাকাম জাত মতলক' সংলগ্ন অতি নিকটবর্তী মাকাম। ইহা অপেক্ষা নিকটবর্তী মাকাম আর নাই। মূলতঃ ইহাই হকিকতে মুহাম্মদীর উৎপত্তিস্থল। কেননা জাত মতলক লা-তাইনে, অর্থাৎ অনাদী অনন্ত জাতে নবীজী (সাঃ) কে সৃষ্টি করার মহব্বত প্রকাশ পায়। সেই প্রেম বিশিষ্ট জাতকে হকিকতে আহমদী বলা হয়। দায়েরায়ে হোব্বে সেরফার নূর বেরংগী। এই বেরংগী নূর সকল সময়ই পড়িতে থাকে।

    পূর্বেই বলা হইয়াছে, হকিকতে এলাহিয়ার অধীনে চারটি দফতর যথাঃ

    • হকিকতে কুরআন,

  • হকিকতে কা'বা

  • হকিকতে সালাত

  • মাবুদিয়াতে সেরফা।

  • হকিকতে কুরআনঃ

    পবিত্র কুরআন মজীদকে আমরা বলি-আল্লাহতায়ালার কালাম বা বাণী। 'বাণী' বা 'কালাম' আল্লাহতায়ালার হাকিকী সিফাত বা জাত সংলগ্ন সিফাত সমূহের একটি। এই 'কালাম' সিফাত আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত শানে কালাম দ্বারা যুক্ত। আবার সিফাতে হাকিকী ব্যতীতও আল্লাহতায়ালার জাতপাকেরও কালাম গুণ রহিয়াছে; তাহা ঐ সিফাতে হাকিকী নির্ভর নয়। বরং সিফাতে হাকিকীর কালাম গুণ তাহা জাতের কালাম গুণ হইতে নির্গত।

    আল্লাহতায়ালার জাতি গুণসমূহের যে সমষ্টিগত রূপ-তাহার সহিত ছালেক পরিচয় লাভ করেন 'হকিকতে মুহাম্মদীর' পূর্ণতার স্তরে। হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে আল্লাহতায়ালার যে সকল গুণসমূহ ছালেক লাভ করে তাহার সমষ্টিগত নাম 'কাবেলিয়াতে জাতি'। হকিকতে মুহাম্মদী একই সাথে আল্লাহতায়ালার 'এলেম' বা জ্ঞান গুণ হইতে নির্গত। এলেম বা 'জ্ঞান' এমন একটি গুণ যাহা সর্বব্যাপী বা যে গুণ সকল গুণকে বেষ্টন করিয়া থাকে। তাই হকিকতে কুরআন যদিও আল্লাহতায়ালার কালাম নামক হাকিকী গুণের বহিঃপ্রকাশ-উহা একই সাথে এলেম গুণের সহিতও সম্পর্কযুক্ত। সিফাতে কালাম আল্লাহপাকের জাতের শানসমূহ বা শয়ুনাতের একটি। আল্লাহতায়ালার 'শানে-কালাম' এর বহিঃপ্রকাশ পবিত্র কুরআন-মজীদ। কুরআন মজীদে সৃষ্টির আদি হইতে অন্ত পর্যন্ত সকল বিষয় বর্ণিত রহিয়াছে।

    আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান, "যখন আমি কোনো জিনিষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে 'হও' বলি, উহা হইয়া যায়"- আল্লাহপাকের এই বাক্য দ্বারা বোঝা যায়, কুরআন মজীদ আল্লাহতায়ালার বিশেষ শানসমূহের একটি। আল্লাহতায়ালার 'কালাম' নামক এই বিশেষ শানের সহিত সৃষ্টির সম্পর্কও অতি প্রগাঢ়। এই কালাম গুণ দ্বারাই আল্লাহপাক সৃষ্টির প্রতি আদেশ-নিষেধ প্রকাশ করেন- যাহার দ্বারা সৃষ্টি দিক নির্দেশনা পায়; স্থিতি লাভ করে এবং ধ্বংসও হয়। তাই আল্লাহতায়ালার কালাম হিসেবে কুরআন মজীদের বিশেষ শক্তি রহিয়াছে- যাহাকে 'কুওতে কালামিয়া' বলা হয়। আল্লাহতায়ালার এই কুওতে কালামিয়া দ্বারা আল্লাহ প্রেরিত নবী রাসূলগণ (আঃ) এবং ওলীগণ স্রষ্ট্রার প্রতি সৃষ্টির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মোজেযা প্রকাশ করেন। 'মোজেযা' বা আয়াত তাই আল্লাহতায়ালার 'কুওতে কালামিয়া' বা আল্লাহতায়ালার কালাম গুণের শক্তি। আল কুরআন বা হকিকতে কুরআন আল্লাহতায়ালার দায়রায়ে আসলের বা মূল বৃত্তের একটি শান। আরেফগণের ধারণা হইল, হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরেই ছালেক আল্লাহতায়ালার জাতপাকের জ্ঞান লাভ করেন। আল্লাহতায়ালার জাতপাকের কামালাতকে সমষ্টিগতভাবে বলা হয় 'কাবেলিয়াতে উলা'। এই কামালাত সমস্ত জাতি কামালত ও শয়নাতের একত্রকারী। আল কুরআন মূল হিসাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তাহা স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসাবেই নবী করীম (সাঃ) এর উপর অবতীর্ণ হয়। তাই মা আয়েশা (রাঃ) বলিয়াছেন- 'নবী করীম (সাঃ) এর চরিত্র হইল আল কুরআন।' হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে যে আরেফ জ্ঞান লাভ করেন, অর্থাৎ আল্লাহপাকের জাতের জ্ঞান লাভ করেন, তিনি তখন আল্লাহতায়ালার কালাম মজীদের নূর তেলাওয়াতের সময় অন্তচোখে দেখিতে পান। কিন্তু হকিকতে মুহাম্মদী স্তরের সাধক যাহা অন্তচোখে দেখেন, তাহা বস্তুত প্রতিবিম্ব হিসাবে- 'আসল' হিসাবে নয়।

    আল কুরআনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হইল উহাতে অতীতকাল ও ভবিষ্যত কাল-এই উভয় কালের অর্থজ্ঞাপক বাক্য ও শব্দ রহিয়াছে। তাহার কারণ হইল, উহাতে সৃষ্টির প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত সবকিছু বর্ণীত রহিয়াছে। অতীতে যে সকল পয়গম্বরের (আঃ) উপর আল্লাহতায়ালার অহী নাজেল হইয়াছে, তাহাদের নিকট প্রেরিত বাণীর নির্যাসও রহিয়াছে কুরআন মজীদে। কুরআন মজীদের প্রতিটি বাক্য ও শব্দই আল্লাহতায়ালার কুওত বা শক্তি ও কামালতের আধার।

    কুরআন মজীদ যিনি তেলাওয়াত করেন, তাহার তেলাওয়াতকৃত বাক্যের যে কামালত; তাহার প্রভাব তেলাওয়াতকারীর উপর পড়িয়া থাকে। যে আয়াত তাযকীয়ে নাফস বা নাফসের পবিত্রতা সম্পর্কে আলোচিত হইয়াছে; সেই বাক্যটির প্রভাব নাফসকে পবিত্র করিবার জন্য কার্যকর হয়। যে বাক্য ছিনা প্রশস্ত করিবার জন্য নাজিল হইয়াছে- তাহা ছিনা প্রশস্ত করিবার জন্য কার্যকর হয়। যে বাক্য আল্লাহতায়ালার কুদরত বা ক্ষমতার প্রতি সৃষ্টির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নাজিল হইয়াছে, তাহার দ্বারা আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা প্রকাশ পায়।

    কুরআন মজীদ পাঠ ও উহার হকিকত অবগত হওয়া হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরের সাধক ব্যতীত সম্ভব নয়। কারণ, হৃদয়ের পূর্ণ পবিত্রতা ব্যতীত কুরআন মজীদের অন্তর্নিহিত নিগূঢ় অর্থ ও তাহার নূর দর্শন সম্ভব নয়। আর হৃদয় ও দেহের পূর্ণ পবিত্রতা লাভ হয় হকিকতে মুহাম্মদীর স্তরে। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে এরশাদ করেন, 'পবিত্র লোক ব্যতীত ইহা কেহ স্পর্শ করিবে না।'

    এই আয়াতপাকের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো হকিকতে কুরআন বা কুরআন মজীদের নিগূঢ় অর্থ ও উহার নূর লাভ করিবার জন্য হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জন করা আবশ্যক।

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় কেতাব 'মোকাশিফাতে আয়নিয়া' তে কুরআন মজীদকে রমজান মাসের সহিত উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ব্যাখ্যা করিয়া বলিয়াছেন, কুরআন মজীদ আল্লাহতায়ালার সকল শয়ূনাতে জাতি ও কামালাতের একত্রীকরণকারী- যে রূপ রমজান মাস সকল প্রকার খায়ের ও বরকতের একত্রীকরণকারী। 'তুমি যে ভাল ফল পাও, উহা আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে; আর তোমার যে অনিষ্ট হয়, তাহা তোমার কারণেই।'

    পবিত্র রমযান মাসের সমস্ত বরকত ও কল্যাণ আল্লাহতায়ালার শানে জাতিয়ারই ফল। আর আল্লাহতায়ালার শানে কালাম ইহার সকলকে একত্রকারী। কুরআন মজীদও সমস্ত মঙ্গলকে একত্রীকরণকারী। কুরআন মজীদ যে রমজান মাসে নাযিল হইয়াছে তাহা এই কারণেই। আল্লাহপাক তাই এরশাদ করেন, 'রমজানের মাস, যাহাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়।'

    হকিকতে কা'বাঃ

    আল্লহপাক কুরআন মজীদে পবিত্র কা'বা শরীফ সম্পর্কে বলেন, 'যে ব্যক্তি এখানে প্রবেশ করিল সে নিরাপত্তা লাভকরিল।' আল্লাহপাক কুরআন মজীদে কা'বা শরীফ সম্পর্কে আরও বলেন, 'এই গৃহে (আল্লাহতায়ালার) সুস্পষ্ট নিদর্শন রহিয়াছে।'

    এই দুই আয়াত পাকের ব্যাখ্যা করিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন যে, কা'বার ছুরাতের অর্থ উহার ইট পাথর নহে। যদি কা'বার ইট-পাথর ইত্যাদি এবং ঘরের আকৃতিও না থাকিত তাহা হইলেও কা'বা সমস্ত সৃষ্টি জগতের সেজদার স্থান হইত। যদিও কা'বা জড় জগতের সৃষ্টি; তবুও হকিকতের দিক দিয়া আলমে আমরের এমন একটা সৃষ্টি যাহা ইন্দ্রিয়ানুভূতি অর্থাৎ ধরা-ছোঁয়া ও বুদ্ধির দ্বারা লাভকরা যায়- এমন জ্ঞানের অতীত। কারণ যে সকল জিনিষ ধরা-ছোঁয়া বা বুদ্ধির দ্বারা লাভ করা যায়- এমন জ্ঞানের মধ্যে আসে, তাহা সেজদার দিক-নির্দেশক হইতে পারে না।

    প্রকৃতপক্ষে কা'বার হকিকত এমন একটি অবস্থা নির্দেশ করে, যে সম্পর্কে বুদ্ধি বা জ্ঞান কিছুই নির্দেশ করিতে পারে না। আমরা মক্কায় যে কা'বার কথা জানি তাহা কা'বার ছুরাত-এই ছুরাতে কা'বার দিকে ছুরাতে মুহাম্মদী সেজদা করিতে আল্লাহতায়ালার আদিষ্ট হন। সমস্ত মাখলুকাতের মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যাঁহাকে ছুরাতে মুহাম্মদী বলিয়া অভিহিত করা হয়, তাহাকে এই কা'বার দিকে মুখ করিয়া সেজদা করিতে বলা হয়।

    তাই বুঝা যায়, হকিকতে মুহাম্মদীর সেজদার দিক হকিকতে কা'বা। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করে, "আল্লাহতায়ালার জন্য সুউচ্চ নিদর্শন আছে।" তাহা এই পৃথিবীতে হকিকতের একটি নশ্বর বিন্দু মাত্র- যাহা গৃহের ছুরাতে বর্তমান। কা'বা ঘর এমন একটি ঘর যাহা সকল প্রকার কলুষতা হইতে মুক্ত। হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ ফরমান, "আসমান জমিনে আমার স্থান সংকুলান হয় না- আমার সংকুলান হয় কেবল মোমিন বান্দার দেলে" এই মোমিন বান্দার দেলও কা'বার গুণে গুণান্বিত-মোমিন বান্দার দেল দুনিয়া, আখেরাত এবং দেহের আকর্ষণ হইতে মুক্ত। হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেব বলিতেছেন, বস্তুত কা'বা দুনিয়ার সাধারণ ঘর বাড়ির মত নহে- তাহা সকল প্রকার কলুষতা মুক্ত হইবার কারণেই তাহা সৃষ্টি জগতের সেজদার স্থান হিসেবে নিরূপিত। কা'বার হকিকত হইল মাবুদিয়াত' ও মাসজুদিয়াত'-এর একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। উহা হকিকতে মুহাম্মদীরও সেজদার স্থান। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হকিকত সমস্ত সৃষ্টি জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কা'বার হকিকত সৃষ্টি জগতের অনুরূপ নয়- উহা আল্লাহতায়ালার মাবুদিয়াতের সহিত বা উপাস্য হইবার গুণের সহিত যুক্ত। তাই ইহার শ্রেষ্ঠত্ব হকিকতে মুহাম্মদীরও উপরে।

    তরীকতের পীরানে পীরগণ বলিতেছেন, 'হকিকতে কা'বা বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালার জাতের এতেবার বা নিছক নূরের পর্দা- উহা সেরেফ নূর ছাড়া আর কিছুই নহে। আল্লাহতায়ালার প্রিয়তম বান্দা প্রিয় ফেরেশতা হইতে নিকটতর। মে'রাজ রজনীতে খাছ ফেরেশতা হযরত জীব্রাইল (আঃ) সিদরাতুল মোন্তাহার নিকট দাঁড়াইয়া যান; তিনি আর অগ্রসর হইতে পারেন নাই। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এই সিদরাতুল মোন্তাহা অতিক্রম করিয়া আল্লাহতায়ালার জাত পাকের প্রান্তে পৌঁছাইয়া জাতের দর্শন লাভ করেন।

    আমরা জানি, সেরেফ জাতপাক ব্যতীত আর সকল কিছুরই ছুরাত আলমে মেছালে দেখা যায়। বায়তুল্লাহর হকিকতের বা সেরেফ নূরের পর্দার ছুরাত আলমে মেছালে দেখা গিয়াছে, তাহারই অনুরূপ করিয়া প্রথমে হযরত আদম (আঃ) ও পরে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কা'বা নির্মাণ করেন। এই কা'বাগৃহের দিক মুখ ফিরাইয়া হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আনন্দিত চিত্তেই সেজদা করিয়াছেন। কারণ আল্লাহপাক তাহার জাতের ইতেবারের পর্দার ভেতরে আছেন। এই ইতেবারের পর্দা আল্লাহতায়ালার হকিকত জগতের ঊর্ধ্বে বর্তমান। এই ছুরাতের জগত হইতে হকিকতের জগতে পৌছাইতে হইলে মানুষকে তাহার হকিকতে পৌছাইতে হয়। মানুষের হকিকত সিফাতে হাকিকীর মধ্যে বর্তমান।

    কলেমা শরীফ ছাবেত-এর মাধ্যমে ছালেক যখন দুনিয়া ও দেহের সকল আকর্ষণ হইতে মুক্ত হয়, তখন সে যাবতীয় কলুষতা হইতে মুক্ত হয়। তখন তাহার দেহে-জাতি দোষসমূহ আর বর্তমান থাকে না। আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবারের পর্দার মধ্যে যেমন আল্লাহ থাকেন, আর কেহ নন; ঐ আরেফের হৃদয়েও তখন আল্লাহ অবস্থান করেন। এই অবস্থা যখন কোনো সাধক হাসিল করিতে পারে, তখন তাহার হৃদয় কলুষতা মুক্ত হয়। হৃদয় তখন এমন গুণাগুণ বা অবস্থা লাভকরে যেখানে আল্লাহ ছাড়া আর কেহ অবস্থান করিতে পারে না। এই হৃদয় তখন আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবারের পর্দা বা হকিকতে কা'বার গুণ লাভ করিতে সমর্থ হয়। হকিকতে কা'বা আল্লাহতায়ালার জাতের পাশাপাশি ইতেবার। তাই হকিকতে কা'বার স্থান হকিকতে কুরআনের ঊর্ধ্বে। হযরত মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলেন, 'যে আরিফে বিল্লাহ এই মর্তবা হাছিল করিতে সমর্থ হন, তাহার দেল সর্বদাই আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবারের সহিত বা হকিকতে কা'বার সহিত মিশিয়া থাকে। কোনো কোনো বর্ণনায় জানিতে পারা যায়, ছালেক এই স্তরে নিজেকে এক বিশালাকার বেলুনের মধ্যে দেখিতে পায়- যে বেলুন তাহাকে সর্বপ্রকার গোনাহ ও স্খলন ও পতন হইতে নিরাপত্তা দেয়। শয়তানের ফেরেব ও ধোকা'বাজি হইতে ঐ সাধক তখন নিরাপদ থাকেন। এই হকিকত বা অবস্থা সম্পর্কে বলা আছে-"যখন খোদা কাহাকেও ভালবাসেন, তিনি তাহাকে গোনাহ হইতে রক্ষা করেন।" কা'বা শরীফ এই অর্থেই নিরাপত্তার প্রতীক; এই কারণেই বলা হইয়াছে- 'এই গৃহে যে প্রবেশ করিল, সে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিল।' বস্তুত ইহা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে এক জাতি মহব্বতের স্তর। যে জাতি মহব্বতের কারণে বান্দার হৃদয়ে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই স্থান পায় না এবং আল্লাহতায়ালার জাতের পর্দার আবরণ দ্বারা সেই বান্দাকে তিনি রক্ষা করেন। বান্দা যখন জাতি মহব্বতের কারণে হকিকতে মুহাম্মদী হইতে হকিকতে আহমদীতে উপনীত হন; তখন তিনিও হকিকতে কা'বার গুণাগুণ লাভ করেন।

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হকিকতে আহমদী ও হকিকতে কা'বাকে এক বলিয়াছেন। আবার তাহার 'মাবদা ওয়া মায়াদ' পুস্তিকা থেকে জানা যায় যে, রাসূলে পাক (সাঃ)- এর ইন্তেকালের এক হাজার বছর পর হকিকতে মুহাম্মদী স্বীয় মাকাম হইতে উরুজ করিয়া হকিকতে কা'বার সহিত মিলিত হইয়াছে। তখন হকিকতে মুহাম্মদীর নাম হইয়াছে হকিকতে আহমদী। হকিকতে মুহাম্মদী মাকাম এখন শূন্য। ইহা পূর্ণ করিবেন হযরত ঈসা (আঃ)। তিনি দুনিয়াতে আসিয়া সুন্নতে রাসূল (সাঃ) এর উপর আমল করিয়া নিজ মাকাম হকিকতে ঈসূবী হইতে হকিকতে মুহাম্মদীতে উন্নীত হইবেন।

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের উপরোক্ত মন্তব্য থেকে যদিও বুঝা যায় যে হকিকতে আহমদী ও হকিকতে কা'বা একই মাকাম; তবুও তাহা এক নয়। উভয় মাকামই পৃথক পৃথক। তবে দৃশ্যতঃ এক মনে হয়। কারণ হকিকতে আহমদী অপরাপর মাকাম সমূহকে পরিবেষ্টন করিয়া আছে। পরিবেষ্টিত থাকার কারণে এক বলিয়া মনে হয়। সেই সূত্রে এক বলাও যায়; যদিও পৃথক পৃথক মাকামের পৃথক পৃথক অবস্থা বর্তমান।

    হকিকতে সালাতঃ

    রাব্বুল আলামীন আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন মজীদে ফরমান- "হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে শ্রেষ্ঠতম, শক্তিমান ও জ্ঞানী (আল্লাহ) শিক্ষা দান করিয়াছেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে আকাশের উচ্চতম প্রান্তে উন্নীত করা হইয়াছিল। অতঃপর সে অতি নিকটবর্তী হইল-ব্যবধান রহিল মাত্র দুই তৃণসম। আল্লাহপাক তাহার বান্দাকে যাহা বলিবার বলিলেন।"

    এই বর্ণনা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মেরাজ সম্পর্কে। মেরাজে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার কতখানি নিকটবর্তী হইলেন তাহারই বর্ণনা। মেরাজ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আলাহপাকের নিকট ফরিয়াদ করিলেন যে, মেরাজে তিনি আল্লাহপাকের দর্শন লাভ করিলেও তাঁহার উম্মতগণের আল্লাহ দর্শন হইল না। আল্লাহপাক নবীকে (সাঃ) জানাইলেন, "সালাত বা নামাজের মধ্যেই উম্মতগণ মহান খোদাতায়ালার দীদার বা সাক্ষাৎ লাভ করিবে।"

    হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ফরমান, “আল্লাহতায়ালার সহিত মিলিত হইবার সময় এমনও মুহূর্ত আসে (যে মুহূর্তের নৈকট্য) কোনো নিকটতম ফেরেশতা ও পূর্বতন নবী (আঃ) গণ লাভ করেন নাই।"

    হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আরও ফরমান, "বান্দাকে যাহা আল্লাহপাকের সবচেয়ে নিকটবর্তী করে; তাহা হইল সালাত।" সালাত সম্পর্কে ইহাও শরীয়তে বলা আছে যে, নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে গোনাহের গ্লানি বা খারাবী হইতে মুক্ত করে।

    নামাজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার দীদার বা দর্শন লাভের মাধ্যমে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) চোখের শান্তি এবং এক অবর্ণনীয় আনন্দ লাভকরিতেন। তাই নামাজের ওয়াক্ত উপস্থিত হইলে তিনি হযরত বেলাল (রাঃ) কে বলিতেন,

    قُرَّةُ عَيْنِي يَا بِلالُ

    অর্থাৎ- 'হে বেলাল! আমার চোখের শান্তি দাও।' অর্থাৎ আজান দাও-আজান দিলে নামাজ; আর নামাজে খোদাদর্শনের অনাবিল শান্তি।

    আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ নিশ্চয়ই বান্দার জন্য আলাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতের প্রতিশ্রুতি। আল্লাহতায়ালা সকল মঙ্গলের উৎস। আল্লাহতায়ালার দর্শন সালাতের মাধ্যমেই সম্ভব-তাই সালাতের মত মঙ্গলময় ও শ্রেষ্ঠতম আমলও কিছু নাই। তাই নামাজের প্রকৃত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অবস্থার যে নামাজ; সেই নামাজই আরেফ বা খোদাতত্ত্বজ্ঞানী সাধককে প্রকৃত শান্তি দিতে পারে। আল্লাহপাক মানুষের শুভ আমলের প্রতিদান হিসাবে বেহেশত দান করিবেন। আর বেহেশত সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বেহেশত- যে বেহেশতে ফুল, দুধ ও মধু নাই; আছে শুধু আল্লাহতায়ালার হাস্যমুখী তাজাল্লা বা নূর। আল্লাহতায়ালা যে প্রিয় বান্দাকে হকিকতে সালাতের পর্যায়ে উন্নীত করেন, তাহাকে নামাজের মধ্যে তিনি হাস্যমুখে নূরের তাজাল্লি বা জ্যোতিসহ দর্শন দান করেন। ঐ পর্যায়ের সালাতের গুণ যে সাধক অর্জন করিতে পারেন, তিনিই বুঝিতে পারেন; নামাজের মধ্যে সূরা ফাতেহায় কেন বলা হয় 'ইয়া কামনাবুদু ওয়া ইয়া কা নাস্তাইন'- তোমারই দাসত্ব করিতেছি, তোমারই ইবাদত করিতেছি।

    হকিকতে নামাজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার সহিত বান্দার মধ্যম পুরুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয়-অর্থাৎ বান্দা যেন আল্লাহতায়ালার সম্মুখে দন্ডায়মান থাকেন। অর্থাৎ এই পৃথিবীতে থাকিয়াও বান্দা নামাজের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য হইলেও সপ্ত আসমানের ঊর্ধ্বে হাকিকী জগতে চলিয়া যান-আপন প্রভুর সহিত কথা বলিতে পারেন- ইহাই প্রকৃত নামাজ বা হকিকতে নামাজের অবস্থা বা নিগূঢ় তত্ত্ব। যাহার এই সৌভাগ্য লাভহয় নাই- তাহার জন্য ঐরূপ অভিজ্ঞতা হয়তো ধারণায় আনা কষ্ট-কিন্তু আল্লাহতায়ালাতো এই প্রতিশ্রুতি তাহার বান্দার জন্যই দান করিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার দিকে সাধনার পথে একদিকে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কা'বা, হকিকতে সালাত ও অন্যদিকে হকিকতে মুছবী, হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী মাকামের পূর্ণতার পরে যে মাকাম খোদাতালাশী সাধক লাভ করেন- অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার প্রতি দাসত্ব ও মহব্বত- এই দুই গুণের পূর্ণতা যখন আরেফ হাছিল করেন, তখনই তিনি আল্লাহতায়ালার দীদার লাভ করেন; আল্লাহতায়ালার সহিত মিলন লাভ করেন। খোদাতালাশী সাধকদের মধ্যে যাহারা হকিকতে সালাতের গুণ লাভ করেন, তাহারা তাই এই পৃথিবীতে থাকিয়াই আল্লাহতায়ালার দর্শন ও দীদার লাভ করেন।

    ঐ স্তরে সাধক যেমন আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ করেন, তেমনি নামাজের সময়ে দেখিতে পান, হকিকতে সালাত যেন এক উঁচু চূড়া বিশিষ্ট গুম্বজ-যাহা হকিকতে কা'বা ও হকিকতে কুরআন-এই দুইটি চূড়াকে বেষ্টন করিয়া আছে এবং তিনটি চূড়া হইতেই নূরের স্রোত ঝর্ণার মত আসিয়া আরেফের সর্বদেহে ও সত্ত্বায় পড়িতেছে। এই নূর পতনের ফলে ছালেক এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও শান্তি লাভ করিতে থাকে। এই নূরে ছালেকের সর্বদেহ নূরময় হইয়া যায়। হযরত মুসা (আঃ) যেমন তুর পাহাড়ের নিকটে আল্লাহতায়ালার নূরে প্রজ্জ্বলিত বৃক্ষ দেখিয়াছিলেন, ছালেকও তদ্রুপ নিজেকে নূরের তাজাল্লিতে প্রজ্জ্বলিত সেই বৃক্ষের মত দেখিতে পান।

    মাবুদিয়াতে সেরফাঃ

    মাবুদিয়াতে সেরফা কথার অর্থ হইল নিছক ইবাদত গ্রহণকারী। আল্লাহতায়ালাই একমাত্র উপাসনার যোগ্য, আর কেহ নয়। ইহার প্রকৃত ভেদ হইল আল্লাহতায়ালা ছাড়া বান্দার যখন আর কোনো মকছুদ থাকে না, তখনই আল্লাহতায়ালা বান্দাকে তাহার পরিচয় দান করেন। কারণ আপন পরিচয় প্রকাশ করাই ছিল আল্লাহতায়ালার মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন, "আমি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলাম। পরিচিত হইতে ভালবাসিলাম। তাই সৃষ্টি জগৎ সৃষ্টি করিলাম।" আল্লাহতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করাই তাই মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত- যাহা মানুষের উপর আল্লাহতায়ালার হক। কারণ আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তিনি আমাদের যে জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন সেই উদ্দেশ্যের জন্য নিজেকে নিবেদিত করা ছাড়া বান্দার আর কিছুই করনীয় থাকে না। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যখন মেরাজের সময়ে জাত-সন্নিকটে নীত হন, তখন তাহার উদ্দেশ্যে বলা হয়,

    قفْ يَا مُحَمَّدُ

    অর্থাৎ-'হে মুহাম্মদ! আপনি দাঁড়াইয়া যান।' অর্থাৎ সৃষ্টি হিসাবে প্রভু আল্লাহতায়ারার জাতকে দর্শন করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। ছালেক যখন এই পর্যায়ে উন্নীত হয়, তখন আল্লাহপাকের জাতকে তিনি দর্শন করেন ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়া দ্বারা। এই স্থানকে কালেমা ছাবেতের মাকামও বলা হয়। কারণ এই মাকামে ছালেক সঠিকভাবে আল্লাহতায়ালার মাবুদিয়াত বা প্রভুত্ব সম্পর্কে অবগত হইতে পারে।

    মাবুদিয়াতে সেরফা নিছক উপাস্যের মাকাম। এখানে দাসত্বের কোন চিহ্ন নাই। যেখানে দাসত্বের চিহ্ন আছে সেখানে কদমী ছায়ের চলে; যেখানে বন্দেগী বা দাসত্বের সংমিশ্রণ নাই, কেবলমাত্র নিছক উপাস্যের মর্তবার সহিত কারবার, সেখানে কদমী ছায়ের আর সম্ভবপর হয় না। কিন্তু নজরিয়া ছায়েরের পথ উন্মুক্ত থাকে। ছালেক এই নজরিয়া ছায়েরের মাধ্যমেই খোদাতায়ালার জাতের সহিত ফানা ও বাকা লাভ করে; জাতের সান্নিধ্য লাভ করে।

    হে খোদা অন্বেষীগণ! যে সমস্ত মাকাম বা স্তর সম্পর্কে আলোচনা করা হইল তাহা বুঝা বা উপলব্ধি করা কিংবা ছায়ের করা কেবলমাত্র কামেল পীরের খাছ দয়া বা অনুকম্পাতে সম্ভব; নতুবা নয়। কারণ কামেলের দয়া না হইলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি না হইলে ওজুদ মাওহুব লাহু বা খোদাদত্ত শরীর লাভও সম্ভব

    নয়। আর খোদাপ্রদত্ত শরীর ব্যতীত হকিকত মুল্লুকে ছায়ের করা কম্মিণ কালেও সম্ভব নয়। কাজেই পীরে কামেলের দয়াই হইল প্রথম শর্ত। তাই হযরত মাওলানা রূমী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন,

    'চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল

    হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।'

    অর্থাৎ- 'যে মুহূর্তে তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে, সে মুহূর্তে আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসাবে, রাসূল তোমকে উম্মত হিসাবে স্বীকৃতি দিলেন, আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি তুমি সেই মুহূর্তে পাইলে, যে মুহূর্তে আপন পীরের তরফ থেকে স্বীকৃতি পাইলে।' দু'আ, ইতি।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD