হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদীর তুলনামূলক আলোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদীর তুলনামূলক আলোচনা। এতদ্ব্যতীত হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর বিভিন্ন গুণাগুণ ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কিত আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
হকিকতে ইব্রাহিমী আল্লাহতায়ালার জাতে পৌছাইবার জন্য এমন একটি মাকাম যাহার বিকল্প নাই। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) কেও আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে অনুসরণ করিতে বলিয়াছিলেন। মানুষে মানুষে যে বন্ধুত্ব, বস্তুর স্বাদ ও লজ্জত এবং পারস্পরিক আকর্ষণ-তাহা মাকামে ইব্রাহিমী বা খোল্লাতের মাকামের তাছির দ্বারাই হইয়া থাকে। ইহারই ফলে সৃষ্টি তাহার প্রবাহমানতা অক্ষুন্ন রাখিয়াছে।
অনেকের কাছে হঠাৎ খটকা লাগিতে পারে যে, হযরত রাসূলে পাককে (সাঃ) আল্লাহপাক হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুসরণ করিতে বলিয়াছেন। হযরত ইব্রাহিমকে (আঃ) আল্লাহপাক খলিল বা খাছ বন্ধু বলিয়াছেন, তাঁহার মাকামের প্রতিবিম্ব দ্বারা জীব জগতের পরস্পরের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করিয়াছেন-এই সকল কথা বলিলে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মাকামকে কি তাহা হইলে দয়াল নবী (সাঃ) এর উপরে স্থান দেয়া হইল?
ইহার স্পষ্ট উত্তর হইল "না"। মাকামে ইব্রাহিমী কোনো অবস্থাতেই মাকামে মুহাম্মদীর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নহে। মাকামে মুহাম্মদীর মত মাকামে ইব্রাহিমী গভীরও নহে, ব্যাপকও নহে। মাকামে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার জাতপাকের যত নিকটবর্তী, মাকামে ইব্রাহিমী ততখানি নিকটেও নহে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহতায়ালার খাছ বন্ধু বা খলিল কিন্তু হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আল্লাহপাকের প্রেমাস্পদ ও প্রেমিক। একথা বুঝাইয়া বলার প্রয়োজন নাই যে, প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক নিকটতম বন্ধু কখনও লাভ করিতে পারে না। তাই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার যে নৈকট্য লাভ করিয়াছিলেন, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাহা কখনও লাভ করেন নাই। প্রকৃত অবস্থা হইল এই যে, মাকামে ইব্রাহিমী পর্যন্ত যাইয়া থামিয়া গেলে কখনও আল্লাহতায়ালার জাতের প্রান্তে নজর ও কদমসহ পৌঁছানো আউয়ালের বত্ত অর্থাৎ বলা যায়, ইহা বাড়ীর সীমানার দেয়াল। আর যায় না: কারণ মাকামে ইব্রাহিমী হইল বস্তুতঃ আল্লাহতায়ালার তাইনে মাকামে মুহাম্মদী হইল সেই বাদীর অন্দর মহল বা অন্তঃপুর। যাহার সহিত সম্পর্ক বাড়ীর বাহিরের দেয়াল পর্যন্ত, তাহার সহিত যে ঘনিষ্ঠতা, তাহা অপেক্ষা যিনি অন্তঃপুর পর্যন্ত আগমন করেন, তাহার ঘনিষ্ঠতা যে অনেক বেশী; ইহা বলাই বাহুল্য। কিন্তু একথাও ঠিক যে সীমানার দেয়াল পার না হইয়া কখনও অন্দর মহলে যাওয়া যায় না।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার সহিত হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর সম্পর্ক যে কত নিবিড়; সে সম্পর্কে আল্লাহপাক বলিতেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ
অর্থাৎ-'যাহারা তোমার হাতে বায়াত গ্রহণ করিল বা তোমার প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করিল, তাহারা মূলতঃ আল্লাহতায়ালার প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করিল।' (সূরা ফাতিহঃ ১০)
বিজ্ঞাপন
আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الإِسْلَامَ
অর্থাৎ-'আল্লাহপাকের নিকট ইসলামই প্রকৃত ধর্ম।' (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৯)
বিজ্ঞাপন
আল্লাহপাক রাসূলে পাক (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে এরশাদ করেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَ اَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থাৎ-'আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাংগ করিলাম এবং আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করিলাম আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করিলাম।' (সূরা মায়েদাঃ ৩)
বিজ্ঞাপন
উপরে উদ্ধৃতি দেয়া কুরআন মজীদের আয়াত সমূহের মধ্যে প্রথমটিতে বলা হইয়াছে যে, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রতি আনুগত্য, আল্লাহতায়ালার প্রতিই আনুগত্য। এই আয়াতপাক দ্বারাই বোঝা যায় যে. আল্লাহপাকের সহিত হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সম্পর্ক কত নিকটের। আর হযরত রাসুলে করীম (সাঃ) এর মধ্যেই আল্লাহপাক আল্লাহতায়ালা হযরত নবী-করীম (সাঃ) ব্যতীত অন্য কাহারোও নিকট তাহার মনোনীত ধর্ম ইসলামের পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন আনুগত্য প্রকাশ করিলে আল্লাহতায়ালার নিকট আনুগত্য প্রকাশ হইবে বলিয়া ঘোষণা দান করেন নাই। আল্লাহপাক অহী বা ফেরেশতা জীব্রাইল ছাড়াই দয়াল নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর সহিত অনেক কথা বলিয়াছেন। ফেরেশতা জীব্রাইল অহী শেষ করিবার পূর্বেই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কুরআনের বাণী অহীর অবিকল অনুরূপ পাঠ করিতেন-ইহা দ্বারা বোঝা যায় অধিক নিকট সম্পর্ক ছিল আল্লাহপাক ও রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে। রাসূলে পাক (সাঃ) স্বয়ং বলিতেছেন, "আল্লাহতায়ালা ও আমার মধ্যে এমন অনেক সময় আসিয়া যায়, যাহা কোনো নবী (আঃ) বা নিকটতম ফেরেশতাগণও এই অবস্থার কিছু জানেন না।" মেরাজের রাত্রিতে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী জিব্রাইল ফেরেশতা মক্কা নগরী হইতে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে সাত আসমান পার করিয়া লইয়া গেলেন। যাত্রা পথে প্রথম আসমানে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর দেখা হইল মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর সহিত, দ্বিতীয় আসমানে দেখা হইল হযরত ঈসা (আঃ) এর সহিত, তৃতীয় আসমানে দেখা হইল হযরত ইউসূফ (আঃ) এর সহিত, এই রূপে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানে দেখা হইল যথাক্রমে হযরত ইদ্রিস (আঃ), হযরত হারুন (আঃ), হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত মুসা (আঃ) এর সহিত। উলুল আজম পয়গম্বর (আঃ) দিগের সহিত হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সাক্ষাৎ হইয়াছিল সপ্তম আসমান সমূহের স্তরে। হযরত জীব্রাইল (আঃ) এর সংগে হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আরও ঊর্ধ্বে আরোহন বা সম্মুখ পানে গমন করিলেন। অবশেষে সিদরাতুল মুনতাহায় আসিলেন। এই খানে আসিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না। কিন্তু হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সেখানে থামিয়া যান নাই।
এই স্থানে দেখা যায়, আল্লাহতায়ালার নিকটতম সান্নিধ্যে যাইবার এই কাহার ইংগিত, কাহার হাতছানিতে যেন তিনি অগ্রসর হইতে লাগিলেন। যে অদম্য আকর্ষণ: হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ব্যতীত খাছ ফেরেশতা হযরত জীবাইল (আঃ) এর যেমন নাই, তেমনি পূর্বের উলুল আজম পয়গম্বরদের মধ্যেও নাই।
তাহারা পথিমধ্যে সপ্তম আসমানের বিভিন্ন স্তরে রহিয়া গেলেন কেন? ইহা যেমন একটি প্রশ্ন, তেমনি প্রশ্ন সিরাতুল মুস্তাহা পার হইয়া হযরত রাসুলে করীম (সাঃ) আল্লাহতায়ালার কতখানি নিকটে পৌঁছাইয়াছিলেন বা তিনি কি অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন?
বিজ্ঞাপন
প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিবার পূর্বেই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাইতেছে, কারণ তাহা সংক্ষেপে বলা যাইবে। আল্লাহতায়ালার কত নিকটে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) পৌঁছাইয়াছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে কুরআন পাকের বাণী রহিয়াছে,
فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى
অর্থাৎ- 'অতঃপর ব্যবধান রহিল তাহাদিগের মাঝে দুই ধনুকের।' (সূরা নাজুমিঃ ৯) ধনুর ছিলার সহিত তীরের যে নৈকট্য ঐরূপ নৈকট্য তিনি আল্লাহতায়ালার সহিত লাভ করিয়াছিলেন। তাহার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এইবার বলা হইতেছে, তিনি বাণী শুনিলেন,
বিজ্ঞাপন
قفْ يَا مُحَمَّدُ فَإِنَّ اللَّهَ يُصَلَّى
অর্থাৎ-'হে মোহাম্মদ! দাঁড়াইয়া যান। আল্লাহতায়ালা নামাজ পড়িতেছেন।'-এই কথা শুনিলেই প্রশ্ন মনে হয়, আল্লাহপাক কাহার নামাজ পড়িতেছেন? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই প্রথম প্রশ্ন অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নিকটতম সান্নিধ্যে অন্য কোনো নবী (আঃ) কেন পৌঁছাইতে পারিলেন না? এই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া যাইবে। আল্লাহতায়ালা কাহার নামাজ পড়িতেছিলেন? আল্লাহপাক নিজেই মাবুদ বা উপাস্য, তাই তিনি কাহার উপাসনা করিবেন? সকলেই তাহারই উপাসনা করে-ইহাই আমরা জানি। এই প্রশ্নের উত্তরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, আল্লাহতায়ালার যে ইবাদত তাহা মোর্তবা ওজুব সম্পর্কিত ইবাদত; যেখানে তিনি নিজেই একই সাথে উপাস্য এবং উপাসক অর্থাৎ মাবুদ ও আবেদ।
এই অবস্থা বুঝিবার জন্য সৃষ্টির প্রথম অবস্থার সম্বন্ধে ধারণার প্রয়োজন। তখন আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহতায়ালার অসীম জাতে প্রেম বা হোব্ব গুণ সষ্টি হইল। সেই প্রেম প্রকাশ করিবার জন্য তিনি সৃজন করিতে চাহিলেন এমন অস্তিত্ব যাহা তাহার প্রেম ধারণ করিতে ও তাহার প্রেম ও কামালাতসমূহ নিখুঁতভাবে প্রকাশ করিতে পারিবে। এই গুণসমূহ নিখুঁতভাবে প্রকাশ করার জন্য তাহার মধ্যেও আল্লাহতায়ালার কামালাত ও গুণসমূহের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি ও প্রশংসা করিবার যোগ্যতা তথা সেই কামালাত ও গুণসমূহের স্রষ্টা আল্লাহতায়ালার প্রতি আনুগত্যের গুণ থাকিবে তথা খোদাতায়ালার আনুগত্য স্বীকার করিবে। ইহা হইতে বোঝা যায় যে, সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহতায়ালার কল্পনায় দুইটি অবস্থা বিরাজমান ছিল; একটি স্রষ্টা ও উপাস্য বা রবুবিয়াতের রূপ, অন্যটি হইল সৃষ্টি জগত তাহার মাবুদিয়াত বা প্রভুত্ব স্বীকার করিবে।
বিজ্ঞাপন
এই অবস্থা যখন আসিল তখন যে জাত মাবুদ বা উপাস্য সেই জাতপাক হইতে আল্লাহতায়ালার যে কল্পনা উপাসনাকারী সংক্রান্ত, সেই উপাসনাকারীর অবস্থাকে জাতপাক হইতে সরাইয়া আনিয়া আল্লাহপাক তাইনে আউয়ালে বা জাত পাকের প্রথম পর্দায় স্থান দান করিলেন। তাই তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রের গভীরতম প্রদেশ হইল শ্রেষ্ঠ ইবাদতকারীর অবস্থা। একটু চিন্তা করিলে আমরা বুঝিতে পারিব, জাত পাকের ভিতরের একটি অবস্থা বাহিরে আসিয়াছে, সেই স্থান হইতেই বিভিন্ন স্তর পার হইয়া এই স্কুল জগতে মানুষ আসিয়াছে। এই তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রের গভীরতম প্রদেশ ইবাদতকারীর ইবাদতের শ্রেষ্ঠ অবস্থা যাহা তরীকতের ভাষায় "মাবুদিয়াতে ছেরফা" নামে অভিহিত। মানুষ দুনিয়ায় থাকিয়া তাহার ইবাদতকে জাত পাকের তাইনে আউয়ালের স্তরে লইবার বা যথা সম্ভব নিখুঁত ইবাদত করিবার আকাংখা পোষণ করে। আল্লাহতায়ালার জাত পাকের তাইনে আউয়ালের স্তরে খোদাতালাশী ছালেককে দুনিয়ায় থাকিয়াই আত্মিক ভাবে ফিরিয়া যাইতে হয়। এই স্তরে পৌঁছাইতে ছালেককে প্রায় ২৭/২৮ টি মাকাম ত্বয় করিতে হয়। অবশেষে ছালেক যখন তাইনে আউয়ালের গভীরতম প্রদেশ বা মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকাম পর্যন্ত উন্নীত হন, তখন তাহার আর সামনে যাইবার পথ থাকে না। কারণ আল্লাহতায়ালার পবিত্র ছেরফা পর্যন্ত যাইযাই খোদা প্রেমিক সাধক বলিয়া থাকেন, "হে জাত লাতাইনে সৃষ্টি জীব গমন করিতে পারে না। তাই মাবুদিয়াতে আল্লাহ! আপনার যোগ্য নামাজ বা ইবাদত করিতে পারিলাম না কিন্তু আপনিই আমার মাবুদ বা উপাস্য। তাই আবার পড়িতেছি, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"। আপনি ছাড়া আমার আর কেহ মাবুদ নাই বা কেহ কাংখিত নাই।
তবে ঐখানকার যে ইবাদত তাহা বুঝিবার জন্য আরও একটু আলোচনা প্রয়োজন। মানুষ সৃষ্টির প্রাক্কালে আল্লাহপাক যাহা কল্পনা করিয়াছিলেন তাহা হইল, তাহার কামালতের নিখুঁত প্রশংসাকারী ও উপাসক। আল্লাহতায়ালার এই ইচ্ছার মধ্যে অর্থাৎ ইবাদতকারী পর্দার মধ্যে কোনো ত্রুটি থাকিতে পারে না। ত্রুটি যাহা তাহা স্থূল মানুষের। আল্লাহতায়ালার মধ্যে ইবাদতের যে ইচ্ছা বর্তমান ছিল তাহাই তাহার যোগ্য ইবাদতকারী। তিনি যতটা ও যেরূপ চাহিয়াছিলেন, তাহাই তাহার ইচ্ছার মধ্যে বর্তমান ছিল। পরে তাহাই বাহিরে আসিয়াছে তাহারই ইচ্ছার প্রতিবিম্ব হিসেবে। তাই বলা হইয়াছে যে আল্লাহতায়ালা আবেদ ও তিনিই মাবুদ। আল্লাহপাক মানুষকে দিয়া তাহার উপাসনা করাইতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু মানুষ অক্ষম, আল্লাহতায়ালার যোগ্য ইবাদত মানুষ করিতে পারে না। মানুষের ইবাদত যখন আল্লাহতায়ালার যোগ্য হয় না, তখন আল্লাহতায়ালার মনে উপাস্য হইবার যে ইচ্ছা ছিল, সে ইচ্ছা পূরণ করিবে কে? ইহার উত্তরঃ উপাসনাকারী বা ইবাদতকারী সৃষ্টি করিবার যে ইচ্ছা আল্লাহতায়ালার মনে সৃষ্টির প্রাক্কালে জাগিয়া উঠিয়াছিল, সেই ইচ্ছা তাহার নিজেরই পূরণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। তবে এই অবস্থা জাত পাকের নয়, জাত পাকের পরের অবস্থা। মানুষ সৃষ্টি করিবার পূর্বে উপাসনাকারীর এই ধারণা আল্লাহতায়ালার জাতে সৃষ্টি হইয়াছিল। কিন্তু মানুষ তখনও আল্লাহতায়ালার কল্পনায়, মানুষের অবস্থা তখনও বর্ণনাযোগ্য নয়। অতএব বোঝা যায় হাত, পা, চোখ, মুখ লইয়া যে দেহ বা শরীর, সেই শরীরের ইবাদত নয়। মানুষের যে অবর্ণনীয় অবস্থা সেই অবস্থা কেবল আল্লাহতায়ালার মধ্যেই বিদ্যমান। তবে মানুষের জন্য শরীরী নামাজ পড়া অবশ্যই কর্তব্য; কারণ আমাদের রাসূলে পাক (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও আল্লাহতায়ালার হাবীব হওয়া সত্ত্বেও নামাজ পড়িতেন। শুধু ফরজ নামাজ নয়, নফল ইবাদত করিতে করিতে মাঝে মাঝে তাহার পা পর্যন্ত ফুলিয়া উঠিত। কিন্তু ইবাদতকারী হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আল্লাহপাক যেমন নবী করীম (সাঃ) কে বলিতেছেন, "(হে রাসূল!) এর একমাত্র পরিচয় নয়। দয়াল নবী (সাঃ) এর আরও পরিচয় রহিয়াছে।
আপনি বলিয়া দিন, আমি তোমাদেরই মতন মানুষ; তবে আমার উপর অহী নাজেল হয়।" আল্লাহতায়ালার এই বাণী হইতে বোঝা যায় যে আল্লাহতায়ালার রাসূল যেমন মানবিক বৈশিষ্ট্য লইয়া এই পথিবীতে আসিয়া ছিলেন, তেমনি তাহার মধ্যে অতি মানবিক বৈশিষ্ট্যও ছিল। কারণ সাধারণ মানুষের নিকট অহী আসিত না, কিন্তু তাহার নিকট আসিত। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) নিজেও বলিয়াছেন, "আমি তোমাদের কাহারও মত নই। আমি আমার প্রভুর সহিত রাত্রিযাপন করি। তিনি আমাকে পানাহার করান।" এই হাদীস পাক হইতে বোঝা যায, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর সহিত আল্লাহপাকের এক প্রেমময় সম্পর্ক ছিল। এই প্রেমময় সম্পর্ক যে ছিল তাহা নিম্ন লিখিত হাদীসে কুদসী সমূহ দ্বারাও বোঝা যায়। আল্লাহ বলেন, "আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম। পরিচিতি প্রকাশ করিতে ভালবাসিলাম, তাই সৃষ্টিজগত সৃজন করিলাম।" আল্লাহতায়ালার এই গুপ্ত ধনভান্ডার হইল তাহার প্রেম বা হোব্ব। আল্লাহতায়ালার এই হোব্ব বা প্রেমের আমানতের প্রথম পাত্র হযরত রাসূল করীম (সাঃ)। আল্লাহতায়ালা প্রথমে যাহা সৃষ্টি করেন তাহা রাসূলে পাক (সাঃ) এর নূর। এই প্রেমের প্রথম প্রকাশস্থানের নাম হোব্বে ছেরফা। এই হোব্বে ছেরফা হইতে জাত লাতাইনের দিকে আরেফ চাহিয়া থাকিতে পারেন কিন্তু জাতপাককে বুঝিতে পারেন না। তাই হযরত রাসূলে করীমও (সাঃ) বলিয়াছেন, "জাত পাককে বোঝা যায় না।” আর এই না বুঝিবার বেদনায় তিনি প্রায়শই ব্যথিত থাকিতেন। তিনি মাঝে মাঝেই সৃষ্টি জগতকে ভুলিয়া, তদীয় উম্মতগণকে ভুলিয়া আল্লাহতায়ালার প্রেমের কোর্বে ডুবিয়া যাইতেন।
বিজ্ঞাপন
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ ও প্রেমিক ছিলেন। আল্লাহতায়ালা তদীয় প্রেমকে প্রকাশ করিবার বাসনা লইয়া তাহাকেই প্রথম সৃষ্টি করিয়াছিলেন। কখনও আল্লাহতায়ালা হইতে প্রেমের স্রোত তাহার উপরে পড়িয়াছে-কখনও প্রেমের স্রোত রাসূলে করীম (সাঃ) এর দিক হইতে আল্লাহতায়ালার দিকে গিয়াছে। আল্লাহপাক যখন তাহার প্রেম প্রকাশ করিবার জন্য তাহার আমানত সৃষ্টি করিলেন, সেই আমানত হইলেন তাহার প্রেমাস্পদ, আর আল্লাহ হইলেন প্রেমিক। কিন্তু সেই প্রেমাস্পদের মত আল্লাহতায়ালার প্রেমিক সত্ত্বারও প্রকাশ থাকিয়া গেল। আল্লাহতায়ালা যখন বলিলেন, তিনি পরিচিত হইতে ভালবাসিলেন তখন তাহার মধ্যে মহব্বত প্রকাশ ও মহব্বত গ্রহণ-এই উভয় অবস্থাই বর্তমান ছিল। মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতি-এই আল্লাহতায়ালার জাতে সৃষ্টি হইয়াছিল। এই জন্যই নবী করীম (সাঃ) তাহার উৎপত্তিস্থল যাহা আল্লাহতায়ালার মাহবুবিয়াতে গভীর কেন্দ্রে আল্লাহতায়ালার প্রেমে নিবিষ্ট হইয়া যাইতেন। তখন জাতি ও মহব্বতে জাতি, সেই উৎপত্তিস্থল বা হকিকতে মুহাম্মদীর আল্লাহতায়ালা তাহাকে আবার দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিয়া বলিতেন "(হে রাসুল!) আপনি বলুন, আল্লাহ এক।"
হকিকতে মুহাম্মদীর এই স্তরের দুইটি দিক রহিয়াছে- প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্ব। হকিকতে আহমদীর মধ্যে শুধুই প্রেমাস্পদত্ব বর্তমান অর্থাৎ আল্লাহপাক যে অবস্থায় নিজে প্রেমিক এবং নবী করীম (সাঃ) প্রেমাস্পদ। এই মাকামে সৃষ্টির দিক হইতে কোনো প্রেমের স্রোত আল্লাহর দিকে যায় না-আল্লাহর দিক হইতে সৃষ্টির দিকে প্রেম আসিতে থাকে।
আল্লাহতায়ালার প্রতি সৃষ্টির প্রেম অপেক্ষা সৃষ্টির প্রতি আল্লাহতায়ালার যে প্রেম; সেই প্রেম আরও নিখুঁত ও শ্রেষ্ঠতর, ইহাই স্বাভাবিক। সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে প্রেম যত বেশী জমা হয়, ততই সৃষ্টি আল্লাহর দিকে বেশী ঝুঁকিয়া পড়ে। তাহার নিজস্ব অস্তিত্ব আস্তে আস্তে ধ্বংস হইয়া যায়। ছালেকের আর নিজের প্রতি কোনো মহব্বত থাকে না। আল্লাহপাক যখন রাসূলে পাক (সাঃ) কে বলিয়াছিলেন, "হে মোহাম্মদ! আমি আর তুমি এবং তুমি ছাড়া যাহা কিছু আছে তাহা আমি তোমারই জন্যে সৃষ্টি করিয়াছি।" ইহার উত্তরে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন, “হে আল্লাহ! শুধু আপনি, আমি না; আপনি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে, তাহা আপনারই জন্য পরিত্যাগ করিলাম।"
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা ছালেককে যত বেশী ভালবাসেন, ছালেকও নিজের অক্ষমতা, ত্রুটি ততবেশী দেখিতে পান। ছালেক বুঝিতে পারেন, আল্লাহতায়ালাই পূর্ণ ক্ষমতাশালী ও পরিপূর্ণ জ্ঞানী, আর সৃষ্টি পরিপূর্ণ মুর্খ। সৃষ্টির মধ্যে যে সর্বদাই দোষ ত্রুটি ও কলংক বিদ্যমান-এই কথা ছালেক যতখানি বুঝিতে পারেন, আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে তিনি ততবেশী প্রেমাস্পদত্ব বা মাহবুবিয়াতের মর্যাদায় ভূষিত হইবেন। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) নিজের দোষ ত্রুটি পূর্ণমাত্রায় দেখিতে পারিতেন; তাই বলিতেন, মুহাম্মদের রব মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করিলেই ভাল করিতেন। তবে উম্মত হিসেবে আমাদের মনে রাখিতে হইবে যে রাসূলে পাক (সাঃ) তাহার নিজের দোষ সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন তাহা প্রেমের কারণে বলিয়াছেন। মানুষ যতদিন পর্যন্ত এই রূপে নিজেকে পরিপূর্ণ কামালাত হইতে কিছুই লাভ করিতে পারে না। নিজের দোষ ত্রুটি অক্ষম ও দোষত্রুটিতে পরিপূর্ণ না দেখে, ততদিন পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার দেখিবার ক্ষমতা বান্দাকে আল্লাহতায়ালার কাছে আরও প্রিয় করিয়া তোলে। এমন প্রিয় বান্দাদিগকে আল্লাহতায়ালা মাহবুবিয়াতের মাকামের সম্পদে সম্পদশালী করিয়া তোলেন। ইহাতে প্রেমিক বান্দা আল্লাহতায়ালার শহুদ বা দর্শন লাভ করেন। প্রেমিক সাধক এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও প্রশান্তি লাভ করেন। কিন্তু দর্শন করিয়াই সাধ মেটে না; তাহারা আল্লাহতায়ালার ইবাদতে ডুবিয়া যান। কিন্তু সৃষ্টিকে সত্যের পথে আহ্বানের জন্য আল্লাহতায়ালা তাহাদের আবার দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দেন।
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আল্লাহতায়ালার 'প্রেম' আমানতের প্রথম বহনকারী। আবার আল্লাহতায়ালা প্রথম যাহা সৃষ্টি করিলেন তাহা নূরে মুহাম্মদী। এই নূরে মুহম্মদী হইতে সমগ্র সৃষ্টি অস্তিত্ব লাভ করিয়াছে। পবিত্র হাদীসে বলা হইয়াছে যে হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, আল্লাহতায়ালা প্রথম যাহা সৃষ্টি করিলেন, তাহা আমার নূর, আর সমগ্র সৃষ্টি আমার নূর হইতে। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, আল্লাহতায়ালা প্রথম যাহা সৃষ্টি করেন তাহা তাহার আকল বা জ্ঞান। তাই সমস্ত সৃষ্টি জগতের সমস্ত জ্ঞান ও অস্তিত্ব হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জ্ঞান ও অস্তিত্ব হইতে আগত। অন্যান্য নবী (আঃ) গণ বা উলুল আজম পয়গম্বরগণ যেমন হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মুসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) বা হযরত ইউসুফ (আঃ) তথা সকল আম্বিয়াগণই হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর নূর হইতে সৃষ্ট। মেরাজের রাত্রে হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ও হযরত জীব্রাইল (আঃ) এর মধ্যে যে আলাপ হয়, তাহা হইতে জানা যায়, মানবরূপী হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর নিকট হইতেই হযরত জীব্রাইল (আঃ) জানিতে পারেন যে, ৭০ হাজার বছর পর পর সত্তর হাজার বার যে নূরকে উদিত হইতে হযরত জীব্রাইল (আঃ) দেখিয়াছেন-তাহাই নূরে মুহাম্মদী যাহা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নূর। এই হাদীস পাকের তাৎপর্য সম্পর্কে তাফাকুর করিলে বুঝে আসে যে, রূহে মুহাম্মদী বা হকিকতে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার শানুল এলেমে গোপনভাবে রক্ষিত ছিল। এই শানুল এলেম আল্লাহপাকের ভেদ ও নিশানার আমানতস্থল হিসেবে হকিকতে মুহাম্মদীর কেন্দ্রে নিরূপিত।
হকিকতে মুহাম্মদী সম্পর্কে বুঝিতে হইলে আরও কয়েকটি হাদীস ও পবিত্র কুরআন মজীদের আয়াত শরীফের উপর আলোকপাত করা দরকার- যেমন আল্লাহ বলেন, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) কে সৃষ্টি না করিলে তিনি আসমান, জমিন, জগৎ সংসার সৃষ্টি করিতেন না। এমন কি তাহার রবুবিয়াত বা প্রভুত্বও প্রকাশ করিতেন না। সর্বকালের, সর্ব দেশের মানব সন্তানের জন্য ইহা অতি গৌরবের বিষয় যে মক্কায় জন্যগ্রহণকারী আদম সন্তান হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) না হইলে আল্লাহপাক সৃষ্টির কথা চিন্তাই করিতেন না। এমন কি তাহার প্রভুত্বও প্রকাশ করিতেন না। আল্লাহপাকের এই বাক্য নবী করীম (সাঃ) এর উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনো নবী বা ফেরেশতার উদ্দেশ্যে বলেন নাই। আল্লাহতায়ালার এই উক্তি হইতে বোঝা যায় যে, নবী করীম (সাঃ) কে তিনি সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সমগ্র নবী ও ফেরেশতা হইতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ স্থান দান করিয়াছেন।
উপরের হাদীস পাক হইতে বোঝা যায়, তিনি সমস্ত সৃষ্টির অছিলা। আর রাসূলে পাক (সাঃ) যখন বলেন সকল বস্তু তাহারই নূর দ্বারা সৃষ্ট। তাহা হইতে বোঝা যায় যে, সমস্ত সৃষ্টির হকিকত রাসূলে করীম (সাঃ) এর হকিকতের মধ্যেই বিদ্যমান। তাই হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর হকিকতকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব 'হকিকাতুল হাকায়েক' বলিয়াছেন। হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে তাই পৃথক পৃথক হকিকত রহিয়াছে।
সৃষ্টির পৃথক পৃথক ছুরাত দ্বারা প্রত্যেকের বাহিরের অবস্থা বোঝা যায় যাহা বিভিন্ন নাম ও রূপে জগতে আসিয়াছে। এই বাহিরের রূপ গুণ ছাড়া ভিতরের একটি পৃথক রূপ বা অবস্থা আছে। আল্লাহ বলেন, মানুষের সৃষ্টির পূর্বে একটি অবস্থা ছিল যাহা বর্ণনাযোগ্য নহে। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) কে আল্লাহপাক যেমন সমস্ত সৃষ্টির অছিলা ঘোষণা করিয়াছেন, তেমনি আল্লাহপাক ইহাও ফরমাইয়াছেন, সমস্ত সৃষ্টি জগতকে তোমাদের অধীন করিয়া দিয়াছি। সকল সৃষ্টির উপরে মানুষের যে শ্রেষ্ঠত্ব যাহা মানুষকে আল্লাহতায়ালার খলিফা করিয়াছে, সেই শ্রেষ্ঠত্ব মানুষ অর্জন করিয়াছে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) কে প্রদত্ত জ্ঞানের দ্বারা। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ফরমান, “আল্লাহতায়ালা সর্বাগ্রে যে জ্ঞান সৃষ্টি করেন, তাহা আমারই জ্ঞান, যদিও তাহা জগতে তখনও আসে নাই।' হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর জ্ঞানের অংশ হইতেই হযরত আদম (আঃ) কে বস্তু সমূহের নামের জ্ঞান দেয়া হইয়াছিল, যে জ্ঞান আল্লাহতায়ালার সমস্ত ফেরেশতা হইতে আদমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করিয়াছিল। আল্লাহপাক ফরমাইয়াছেন, "আদমকে তিনি তাহার নিজ গুণসমূহ হইতে গুণ দান করিয়াছেন বা তাহার কামালাতের ছুরাতে সজ্জিত করিয়াছেন। আদম বলিতে এই স্থানে যে মানব সত্ত্বা ও গুণের পূর্ণ বিকাশ আমরা কল্পনা করিতে পারি, আল্লাহতায়ালার সেই কামালাতের পূর্ণতাও আসিয়াছে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে, অন্য কোনো নবী (আঃ) গণের মধ্যে নহে। অন্যান্য সকল পয়গম্বর (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান- "তিনি (আল্লাহ) জানেন, তাহাদের (পয়গম্বরদিগের) অগ্রে ও পশ্চাতে কি আছে এবং তাহারা শাফায়াত করিতে পারিবেন না- কেবল মাত্র একজন ছাড়া যাহাকে আল্লাহ মনোনীত করিয়াছেন এবং তাহারা আল্লাহতায়ালার ভয়ে কাঁপিতে থাকিবেন।" হাদীস শরীফে আছেঃ-যাহাদিগকে মানুষেরা ডাকিবে, তাহারা কেহই শাফায়াত করিতে পারিবে না কেবল তিনিই পারিবেন, যিনি সত্যের সাক্ষী। (মেশকাত শরীফ)।
তাই দেখা যায়, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ইহলোকে বা পরলোকে, জড় বা সূক্ষ্ম জগতে, মানুষ হিসেবে বা পয়গম্বর হিসেবে মখলুকের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। আল্লাহপাকের জাত লাতাইনে সর্ব প্রথম যে প্রেম সৃষ্টি হইয়াছিল, তিনি তাহার আমানতদার। তিনি আল্লাহতায়ালার জাতের এলেম হইবার যে শান ও তাইয়ূন, সেই তাইয়ূনের এতেবার বা নিদর্শক।
"তোমাকে সৃষ্টি না করিলে আমি আসমান জমিন কিছুই সৃষ্টি করিতাম না-আমার প্রভুত্বও প্রকাশ করিতাম না”-হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সম্বন্ধে আল্লাহপাকের এই উক্তি হইতে বোঝা যায় যে, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর হকিকত আল্লাহতায়ালার এক গোপন ভেদের আমানতদ্বার। তাই হকিকতে মুহাম্মদীতে আল্লাহপাক তাহার গোপন ভেদ জমা রাখিয়াছেন।
"মানুষ আমার গোপন ভেদ, আমি মানুষের ভেদ" হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাকের এই গোপন ভেদের পূর্ণ প্রকাশ যে রাসূলে করীম (সাঃ), তাহাও বোঝা যায়। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
خَلَقْتُ مُحَمَّداً مِّنْ نُوْرٍ وَجْهِي
অর্থাৎ-'আমি মুহাম্মদকে আমার চেহারার নূর হইতে সৃষ্টি করিয়াছি।'
পূর্বে বলা হইয়াছে, আল্লাহতায়ালা তাহার গোপন ভেদকে সৃষ্টির প্রথমে তাইনে আউয়ালের কেন্দ্র হকিকতে মুহাম্মদীর গভীর কেন্দ্রে আমানত হিসেবে রাখেন। আল্লাহতায়ালা যাহাদের নিকট পরিচিত হইতে চাহেন, তাহাদের সমষ্টিগত একক অবস্থাকে হকিকতে মুহাম্মদী নাম দিয়া তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রে রাখিয়াছেন। ইহাতে মনে হওয়া সংগত যে, হকিকতে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার খুবই প্রিয়। কিন্তু এই কেন্দ্রের যিনি প্রধান অর্থাৎ হযরত নবী করীম (সাঃ), তিনি আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ হওয়া সত্ত্বেও প্রেমিকের ন্যায় আল্লাহপাকের জন্য পাগল ছিলেন। ইহার কারণ কি? তাহা বোঝা দরকার। হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদ হইলেও তিনি জাতপাক হইতে দূরে, তাই তিনি নিছক জাতের জন্য পাগল। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর মধ্যে জাতি প্রেমিকত্ব ও জাতি প্রেমাস্পদত্ব-এই উভয় গুণই তাই বিদ্যমান।
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ব্যতীত আরও অনেক নবী (আঃ) আসিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাদের মধ্যে আল্লাহতায়ালার জন্য একই সাথে জাতি প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্ব ছিল না। কেহ বলেন নাই-'হে আল্লাহ! আপনি ব্যতীত আর কিছুই নয়, আমাকেও আমি পরিত্যাগ করিলাম'-আল্লাহতায়ালাও কাহারও উদ্দেশ্যে বলেন নাই, 'হে নবী! আপনাকে সৃষ্টি না করিলে আমি আসমান জমিন কিছুই সৃষ্টি করিতাম না-আমার রবুবিয়াতও প্রকাশ করিতাম না।" হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ছাড়া আল্লাহপাকের জাতের দর্শনের জন্য পাগল হইয়া ছিলেন আর একজন, তিনি হযরত মুসা (আঃ)। আল্লাহতায়ালাকে দেখিবার জন্য তিনি তুর পাহাড়ে গমন করিয়াছিলেন। আল্লাহপাক তাহার ইচ্ছা পূরণ করিয়াছিলেন। এই ঘটনার আলোকে খোদাতালাশীদের খোদা প্রেমের শ্রেণী বিভাগ করিতে যাইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব "হকিকতে মুসবী” নামক একটি মাকাম চিহ্নিত করেন। পূর্বে বলা হইয়াছে, আল্লাহতায়ালার জাতপাকের মধ্যে প্রেমাস্পদত্ব ও প্রেমিকত্ব-এই দুইটি অবস্থা রহিয়াছে। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে উক্ত দুইটি অবস্থাই বর্তমান। হযরত মুসা (আঃ) এর মধ্যে রহিয়াছে একটি অর্থাৎ প্রেমিকত্ব। বস্তুতঃ ইহা হকিকতে মুহাম্মদীরই একটি শাখা বা অংশ। হকিকতে মুসবীর বৃত্ত হইল মোহেব্বিয়াতে জাতি, আর কেন্দ্র হইল মাহবুবিয়াতে জাতি বা হকিকতে মুসবীর কেন্দ্র হইল হকিকতে মুহাম্মদী। আর হকিকতে মুহাম্মদী নামক বৃত্তের একটি বিন্দু হইল হকিকতে মুসবী। জাতি অর্থাৎ সরাসরি জাতের র সহিত সম্বন্ধ যুক্ত। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ও হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহতায়ালার জন্য পাগল ছিলেন। জাতকে বেষ্টন করিয়া আছে হাকীকী সিফাত। অনেক নবী (আঃ) গণ আল্লাহতায়ালার জাতপাক অপেক্ষা তাহার গুণ বা সিফাতের প্রতি বেশী আকৃষ্ট ছিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পবিত্র জাতকে দেখিবার পরেও বলিয়াছিলেন, "হে আল্লাহ! আপনি আমাকে একটু দেখান, কি রূপে আপনি মৃতকে জীবিত করেন।" আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ইচ্ছাও পূরণ করিয়াছিলেন। হকিকতে ইব্রাহিমী তাই আল্লাহতায়ালার প্রতি প্রেমের যে বহিরাবরণ, সেই বহিরাবরণের দিকে নিরূপিত।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব জাতপাকের তাইয়ূনে ওজুদীকে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল এবং তাইয়ূনে এলমিকে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল নিরূপিত করিয়াছেন। তাইয়ূনে ওজুদী বা হকিকতে ইব্রাহিমীকে তিনি তাইয়ূনে এলমির বর্হিভাগ বা প্রতিবিম্ব বা খোসা বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। হকিকতে ইব্রাহিমীর বৈশিষ্ট্য সমূহ লইয়া পূর্বের নসিহতে বিশদ আলোচনা করা হইয়াছে তাই এ অধ্যায়ে হকিকতে মুহাম্মদী হইতে হকিকতে ইব্রাহিমীর পার্থক্য এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর বিভিন্ন গুণাগুণ ও শ্রেষ্ঠত্ব লইয়া শুধু আলোচনা করা হইল। উপরের আলোচনায় বুঝানোর চেষ্টা করা হইয়াছে যে, আল্লাহতায়ালার জাত পাকের সহিত হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর সম্পর্ক কত নিবিড়। তিনি আল্লাহতায়ালার প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্বের গুণে গুণী কারণ আল্লাহতায়ালা তাহাকে নিজের গোপন ভেদের আমানত করিলেন- স্বয়ং আল্লাহপাক তাই তাহার প্রেমে তাহাকে পৃথিবীতে পাঠাইবার পরও আবার নিজ সান্নিধ্যে টানিয়া লইয়া তাহার সহিত প্রেমময় মিলনে মিলিত হইলেন। তাই রাসূলে করীম (সাঃ) এর এত্তেবা করিলে তদীয় মহব্বতের দ্বারা আল্লাহতায়ালার জাতে পৌঁছানো যায়। অন্য কোনো নবীর (আঃ) এত্তেবা দ্বারা তাহা সম্ভব নয়-কারণ তাহাদের মধ্যে আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদত্বগুণ আল্লাহতায়ালা অর্পণ করেন নাই। আল্লাহতায়ালা যাহাকে প্রেম করেন, আল্লাহতায়ালাই তাহাকে কাছে টানিয়া লন। মানুষের চেষ্টা দ্বারা জাতে পৌঁছান অসম্ভব।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) নিজেই যে শুধু আল্লাহতায়ালার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সন্তুষ্ট হইতে পারিয়ছিলেন তাহা নহে, তিনি তদীয় উম্মতগণের জন্যও সেই জ্ঞান আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে চাহিয়া লইয়াছেন। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, আল্লাহপাক তাহাকে যে জ্ঞান দান করিয়াছিলেন, তাহা তিনি হযরত আবুবকর (রাঃ) এর মধ্যে রাখিয়া দিয়াছেন। হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরই মুজাদ্দেদিয়া তরিকার প্রথম ও প্রধান আরেফ। সেই জ্ঞান আজও নবী করীম (সাঃ) এর তোফায়েলীর' মাধ্যমে তরীকায়ে মুজাদ্দেদীয়ার সূফী সাধকদের মধ্যে বর্তমান রহিয়াছে। তাই এই তরীকার সূফী সাধকের মহব্বতের মাধ্যমেই নবী করীম (সাঃ) এর মহব্বত হাছিল করা যায়, তাহার গুণে গুণী হওয়া যায় বা হকিকতে মুহাম্মদীর মাকাম হাসিল হয় ও আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদত্ব গুণ লাভ করিয়া এই দুনিয়াতে থাকিয়াই আল্লাহতায়ালার জাত পাকে পৌঁছানো যায়।
আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব ছিলেন এমনি মর্তবা সম্পন্ন ওলী, যিনি হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ণ এত্তেবা করিয়া হকিকতে মুহাম্মদীর গুণে গুণান্বিত ছিলেন ও আল্লাহতায়ালার প্রেমাস্পদত্ব ও প্রেমিকের মর্যাদা লাভ করিয়াছিলেন। তোমরাও যদি এই দুনিয়াতে থাকিয়া আল্লাহপাকের মহা পবিত্র জাতের সন্ধান পাইতে চাও; তাহা হইলে আমার দয়াল পীর কেবলাজানের প্রকৃত মহব্বত হাসিল কর, তাহার পাক দেলে দেল মেশাও। তদীয় পাক দেলে দেল মিশাইলে আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত হাছিল হইয়া যাইবে, ক্রমে সেই মহব্বত জাতি রূপ লাভ করিবে। আর আমার দয়াল পীর কেবলাজানের জাতি মোহব্বত তোমাদেরকে আল্লাহতায়ালার জাতের দিকে টানিয়া লইয়া যাইবে। ইহজগত বা পরলোকে ইহার চেয়ে আর বড় কোনো নসীব নাই। যিনি আল্লাহকে পান, তাহার ইহ বা পরজগতে কিছু চাহিবারও থাকে না। আর সেই পরম নেয়ামত লাভ করা সম্ভব আমার দয়াল পীর কেবলাজানের মহব্বত দ্বারা। সেই জাতি মহব্বত অর্জনের জন্য তোমরা চেষ্টা কর। আল্লাহ বলেন, 'যে আমার দিকে এক কদম অগ্রসর হয়, আমি তাহার দিকে দুই কদম অগ্রসর হই।' তাই তোমরা যদি আল্লাহতায়ালাকে পাইবার জন্য আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুরের মহব্বত হাসিলের চেষ্টা কর, তাহা হইলে আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে তোমাদের জন্য তাইদ ও মদদ' আসিতে থাকিবে। তোমরা যতখানি চেষ্টা করিবে; আল্লাহতায়ালা তাহার ফল বহু গুণ বাড়াইয়া দিবেন।




