Logo

হকিকতে মুহাম্মদী ও তাইনে আউয়াল

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:২০
হকিকতে মুহাম্মদী ও তাইনে আউয়াল
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হকিকতে মুহাম্মদী ও তাইনে আউয়ালঃ

বিজ্ঞাপন

জাত পাক সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফে বলা হইয়াছে যে,

لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ

উক্ত আয়াতের আভিধানিক অর্থ- 'তিনি দৃষ্টির আয়ত্বে নহেন।' ইহার ভাবগত অর্থ দাঁড়ায়-'সৃষ্টি তাহাকে বুঝিতে পারিবে না।' (সূরা আনআমঃ ১০৩)

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- জাত পাক অবোধগম্য ও অবর্ণনীয়। পবিত্র জাতের এই অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য অবস্থাকে বলা হয় জাত লা-তাইন। 'তাইয়্যুন' অর্থ অধ্যায়। আর 'লা' অর্থ নাই। অর্থাৎ পবিত্র জাতের সেই অবর্ণনীয় অবস্থাকে কোন তাইয়্যুন বা অধ্যায়ের ভিতরে আনা যায় না।

খোদাপ্রাপ্তির পথের সর্বশেষ মাকামদ্বয় হইল, হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফা। হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফার ঊর্ধ্বে লা-তাইনের মাকাম। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, জাত লাতাইন বহু সংখ্যক নূরের পর্দা দ্বারা আবৃত।

লা-তাইনের পরেই তাইনে আউয়াল অবস্থিত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "প্রথম তাইয়্যুন বা তাইনে আউয়াল হইল পবিত্র জাতের অজুদ বা অস্তিত্ব গুণের অবতরণ; যাহা যাবতীয় পূর্ণতাকে বেষ্টনকারী এবং যাবতীয় বিপরীত বস্তু একত্রিতকারী ও নিছক উৎকর্ষ ও অত্যন্ত প্রাচুর্যময়।" আল্লাহপাকের অজুদ নামক এই কামালাত যাহা পবিত্র জাত ব্যতীত আল্লাহর সমস্ত কামালত বা পূর্ণতাকে বেষ্টন করিয়া আছে। পূর্ববর্তী বহু ওলী-আল্লাহ এই অজুদকে আল্লাহ মনে করিয়া আজীবন উপাসনা করিয়াছেন। এই অজুদ যাবতীয় প্রকাশযোগ্য অবস্থা বেষ্টনকারী। ইহাই তাইনে আউয়াল বলিয়া পরিচিত। কারণ ইহাই নির্দিষ্টকৃত প্রথম তাইয়্যুন। ইহা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দুর্বোধ্য। পবিত্র জাত থেকে ইহাকে পৃথক করা বা পৃথক হিসেবে উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন। হয়ত এই কারণেই পূর্ব যুগের বহু মাশায়েখ এই তাইনে আউয়াল বা তাইনে অজদীকে আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাত ভিন্ন অন্য কিছু বলা নিষেধ করিয়াছেন। মূলতঃ ইহা অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় তাহারা জাত থেকে ইহাকে পৃথকভাবে বুঝিতে পারেন নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবই প্রথমে পবিত্র জাত থেকে তাইনে আউয়াল বা তাইয়্যুনে অজুদীকে পৃথক করেন এবং বলেন যে, ইহা অর্থাৎ তাইনে আউয়াল হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল এবং তাইনে আউয়াল বৃত্তের কেন্দ্র হইল হকিকতে মুহাম্মদী যাহা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল। সুতরাং বুঝা গেল যে তাইনে আউয়ালের কেন্দ্র হকিকতে মুহাম্মদী এবং এই বৃত্তের পরিধি-যাহা

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রেরই প্রতিচ্ছায়া তাহা হইল হকিকতে ইব্রাহিমী।

হকিকতে মুহাম্মদী কি?

হকিকতে মুহাম্মদী হইল শেষ পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল। পবিত্র জাতে প্রথম পরিচিতি বাসনা জাগ্রত হয়। ফলে প্রেমের উদ্ভব হয়। এই প্রেমের প্রথম বিকাশ হইল হকিকতে মুহাম্মদী; যাহাকে হকিকাতুল হাকায়েক বা যাবতীয় তত্ত্বের তত্ত্ব বলা হয়। সমস্ত সৃষ্টির হকিকত-হকিকতে মুহাম্মদীতে বর্তমান। পয়গম্বর (আঃ) গণের হকিকত, ফেরেশতাগণের হকিকত, মোমিনগণের হকিকত, এক কথায় সবেরই হকিকত উক্ত হকিকতে মুহাম্মদীতে বর্তমান। হকিকতে মুহাম্মদী পবিত্র জাতে উদ্ভূত প্রেমের প্রথম প্রকাশ। আল্লাহপাক বলেন,

বিজ্ঞাপন

。 لَوْ لَأَكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلاكَ وَ لَمَا أَظْهَرْتُ رَبُوبِيَّتِي

অর্থাৎ-'[হে নবী (সাঃ)]! আপনাকে যদি সৃষ্টি না করিতাম, তাহা হইলে কোন কিছুই সৃষ্টি করিতাম না এবং আমার রবুবিয়াত বা প্রভুত্বও প্রকাশ করিতাম না।'

সুতরাং আল্লাহ প্রথম যাহা সৃষ্টি করিলেন তাহা হইল হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর রূহ, যাহা হকিকতে মুহাম্মদীতে নিরূপিত। হকিকতে মুহাম্মদীকে তাই বলা হয় সৃষ্টির প্লাটফর্ম বা ফাউন্ডেশন। ইহাই প্রথম সৃষ্ট এবং সমস্ত সৃষ্টির মূল ইহাতেই বর্তমান। নবী করীম (সাঃ) কে যদি সৃষ্টি করা না হইত তাহা হইলে সৃষ্টির দ্বারই উন্মোচিত হইত না। সৃষ্টি অনন্তকাল শূন্যগর্ভে বা অনস্তিত্বে গুপ্ত থাকিত। এ অধ্যায়ের আলোচনার মূল বিষয়বস্তুই হকিকতে মুহাম্মদী। এই হকিকতে মুহাম্মদীর

বিজ্ঞাপন

সাথে বা পাশাপাশি কয়েকটি দায়েরা বর্তমান। প্রসংগক্রমে সে সমস্ত দায়েরার আলোচনাও এখানে করা হইবে। হকিকতে মুহাম্মদীর ঊর্ধ্বে আছে হকিকতে আহমদী ও হোব্বে ছেরফার দায়েরা এবং ইহার নীচে ঊর্ধ্বেআছে হকিকতে মুসবী ও হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরা। মূলতঃ এই পাঁচটি দায়েরা (অর্থাৎ হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে সেরফা) কামালতের ঊর্ধ্বদায়েরাসমূহের উপরে মহব্বতের মল্লকে বর্তমান। প্রেম বা মহব্বতের মাধ্যমেই এই সকল মাকাম ত্বয় করিতে হয়।

প্রেম শব্দটি দুইটি পক্ষের সাথে জড়িত। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে প্রেম করে বা ভালবাসে। অর্থাৎ প্রেমের স্রোত এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের দিকে প্রবাহিত হয়। প্রেম যদি প্রথম পক্ষ হইতে দ্বিতীয় পক্ষের দিকে প্রবাহিত হয় তবে প্রথম পক্ষকে বলা হয় প্রেমিক ও দ্বিতীয় পক্ষকে বলা হয় প্রেমাস্পদ। আর যদি দ্বিতীয় পক্ষ থেকে প্রেম প্রথম পক্ষের দিকে ধাবিত হয়, তাহা হইলে সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পক্ষ হয় প্রেমিক এবং প্রথম পক্ষ হয় প্রেমাস্পদ।

হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) যেমন প্রেমিক ছিলেন, তেমনি প্রেমাস্পদও ছিলেন। অর্থাৎ প্রেমের প্রবাহ কখনও তাঁহার হইতে জাতের দিকে যাইত, আবার কখনও বা জাত হইতে প্রেমের প্রবাহ তাঁহার দিকে আসিত। সুতরাং প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্ব যেমন পবিত্র জাতে বর্তমান, তেমনি ইহা রাসূলে পাক (সাঃ) এর মধ্যেও বর্তমান। পবিত্র জাতের প্রেমিকত্বকে "মহব্বতে জাতি” বলা হয় এবং প্রেমাস্পদত্বকে "মাহবুবিয়াতে জাতি" বলা হয়। হকিকতে মুহাম্মদী পবিত্র জাতে উৎপন্ন প্রেমের প্রথম বিকাশ বিধায়, প্রেমের উভয় ধারাই অর্থাৎ মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতির ফয়েজান হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরাতে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

উপরের আলোচনায় বোঝা গেল যে, কখনও আল্লাহ প্রেমিক, রাসূলে পাক (সাঃ) প্রেমাস্পদ; আবারও কখনও রাসূলে পাক (সাঃ) প্রেমিক, আল্লাহ প্রেমাস্পদ অর্থাৎ প্রেমের গতি বা প্রবাহ কখনও জাতপাকের দিক হইতে দয়াল নবী (সাঃ) এর দিকে; কখনও দয়াল নবী (সাঃ) হইতে জাত পাকের দিকে প্রবাহিত। এই অবস্থা বুঝা যায় আল্লাহ ও দয়াল নবী (সাঃ) এর মধ্যের কথোপকথনের দ্বারা। আল্লাহ যখন রাসূলে পাক (সাঃ) কে বলিলেন,

با مُحَمَّد اَنَا وَ اَنْتَ وَمَا سَواكَ خَلَقْتُ لاجلك

অর্থাৎ- 'হে মোহাম্মদ! আমি আর তুমি এবং তুমি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে তাহা তোমারই জন্য সৃষ্টি করিয়াছি।' ইহার জবাবে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন,

বিজ্ঞাপন

اللَّهُمَّ اَنْتَ وَمَا أَنَا وَمَا سَواكَ تَرَكْتُ لَأَجْلِكَ -

অর্থাৎ-'হে আল্লাহ! শুধু তুমি, আমি না এবং তুমি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে, তাহা তোমারই জন্য পরিত্যাগ করিলাম।'

রাসূলে পাক (সাঃ) এর উক্ত কথায় বুঝা যায়, তিনি খোদাতায়ালার প্রেমের সাগরে এমনিভাবে নিমজ্জিত হইতেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছুর কথাই তাহার স্মরণে থাকিত না। ইহাই বেলায়েতে নবুয়তের চূড়ান্ত অবস্থা। কিন্তু এই অবস্থা থেকে আল্লাহপাক নবী করীম (সাঃ) কে দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিতেন এবং বলিতেন,

বিজ্ঞাপন

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى

অর্থাৎ-'(হে নবী!) আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতই মানুষ, তবে আমার উপর অহি হয়।' (সূরা হা-মিম ছাজ্বদাহঃ আয়াত-৬)

রাসূলে পাক (সাঃ) প্রেমের কারণে সৃষ্ট। তাই তদীয় সত্তায়, প্রতি অনু-পরমাণুতে প্রেমেরই নূর প্রবাহিত। তদীয় পার্থিব জীবনের প্রতিটি কাজ প্রেমের রং-এ রংগীন ছিল। আজীবন তিনি প্রেম বিতরণ করিয়াছেন। সারাটা জীবন তিনি এই উম্মতের আঘাত সহ্য করিলেন। কত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অত্যাচার সহ্য করিলেন। অথচ কখনও তিনি উম্মতের অত্যাচারের বিরুদ্ধে খোদাতায়ালার নিকট কোন অভিযোগ করেন নাই। তায়েফ নগরীতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইতে গেলে তায়েফবাসীরা যে অমানবিক আচরণ করিয়াছিল তাহা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। তদীয় পবিত্র দেহ তায়েফবাসীদের পাথরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হইয়াছিল, পুনঃ পুনঃ তিনি জ্ঞানশূন্য হইয়াছিলেন। কিন্তু তথাপিও সেদিন তিনি তাহাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগতো করেনই নাই বরং জ্ঞান আসা মাত্রই তিনি মহান খোদাতায়ালার নিকট হাত তুলিয়া অত্যাচারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। বলিলেন, "হে খোদা! ওরা বুঝে নাই, ওরা আমাকে চিনিতে পারে নাই। তুমি দয়া করিয়া ওদেরকে ক্ষমা কর।" কেমন উম্মত-প্রেমিক ছিলেন তিনি!

বিজ্ঞাপন

মূলতঃ সমস্ত বিশ্ববহ্মান্ড তাঁহারই সত্তা থেকে আগত। সমস্ত সৃষ্ট জগতই তাঁহার কলিজার মধ্যে যেন লুক্কায়িত ছিল। তাই তিনি বলেন, "আমি আল্লাহর নূর হইতে সৃষ্ট এবং সমস্তই আমার নূর হইতে সৃষ্ট।" হয়ত তাই সৃষ্টির সর্বত্রই তদীয় প্রেমের ক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল। তাহার প্রেম যে শুধু মানুষের প্রতি, তাহা নয়; তাহার প্রেম-প্রবাহ ছিল পশুপাখী, কিট-পতংগ, গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, এমনকি জড় (নির্জীব) পদার্থের প্রতিও। পবিত্র বোখারী শরীফের একটি ঘটনা-যাহা "উত্তুয়ানায়ে হান্নানাহ" শিরোনামে প্রসিদ্ধ। 'উস্তুয়ানা' অর্থ খুঁটি বা থাম। 'হান্নানাহ' অর্থ বিচ্ছেদ যাতনায় অত্যাধিক ক্রন্দনকারী। নবী করীম (সাঃ) হিজরত করিয়া মক্কা হইতে মদীনায় গমন করিয়া স্বীয় আবাসস্থল নির্বাচনের পর সর্বপ্রথম তথায় একটি মসজিদ নির্মাণ করিলেন। সেই মসজিদ বর্তমানে "মসজিদে নববী" নামে পরিচিতি। সর্ব প্রথম নির্মিত সেই মসজিদের ছাউনী ছিল খেজুর পাতার এবং খুঁটি বা থাম ছিল খেজুর-কান্ডের। মসজিদের যে স্থানে দাঁড়াইয়া নবী করীম (সাঃ) নামাজ পড়াইতেন, উহা সংলগ্নে বামদিকে অগ্রভাগে একটি খুঁটির অবস্থান ছিল। তখন মসজিদে মিম্বর ছিল না। নবী করীম (সাঃ) জুমার খুৎবা বা দীর্ঘ ভাষণ দান কালে ঐ খুঁটির নিকটে দাঁড়াইতেন, মাঝে মাঝে উহাতে হেলান দিয়াও দাঁড়াইতেন। পরবর্তীতে নবীজীর অনুমতি লইয়া সাহাবাগণ কাঠের মিম্বার তৈরী করিলেন এবং তাঁহার আদেশে উহা তাঁহার মোছাল্লা বা নামাজস্থানের ডান পার্শ্বে স্থাপন করিলেন। তৎপর জুমার দিন খোৎবা দানের জন্য প্রথমবারই যখন নবী করীম (সাঃ) মিম্বারে আরোহন করিলেন, তখন ঐ খুঁটি বা খেজুর-কান্ড মা হারা বাচ্চার ন্যায় সশব্দে কাঁদিতে আরম্ভ করিল। উপস্থিত সকল ছাহাবীই সেই কান্নার শব্দ শুনিলেন। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, "আমরা সকলেই সেই খুঁটির ক্রন্দন শব্দ শুনিয়াছি। ঐ থামের কান্নার শব্দ এত জোরে হইতেছিল যে, আশংকা হইতেছিল, থামটি ফাটিয়া যাইবে। অতঃপর সৃষ্টি প্রেমিক হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) মিম্বার হইতে অবতরণ পূর্বক ঐ ক্রন্দনরত খুঁটির নিকটে আসিয়া ইহাকে জড়াইয়া ধরিলেন। (অর্থাৎ স্নেহশীলা মা যেরূপ ক্রন্দনরত শিশুর প্রতি ছুটিয়া আসিয়া উহাকে বুকে জড়াইয়া ধরে, ঠিক তেমনি নবী করীম (সাঃ) থামটিকে জড়াইয়া ধরিলেন)।” হযরত আনাস (রাঃ) ছাহেব বলেন, "ক্রন্দনরত শিশুকে কোন আপনজন সান্তনা দিলে তাহার কান্না যেমন ধীরে ধীরে হিচকি দানের সহিত স্তিমিত হয়, ঠিক তেমনি খেজুর কান্ডটির ক্রন্দন স্তিমিত হইল।" অতঃপর খেজুর কান্ড বা থামটির সহিত নবী করীম (সাঃ) বিভিন্ন কথোপকথনের পর উহাকে বলিলেন, যদি তুমি সবুজ শ্যামল জীবন্ত বৃক্ষ হইতে চাও, তবে আমি দু'আ করিয়া উহার ব্যবস্থা করি। আর যদি চিরস্থায়ী বেহেশতের বৃক্ষ হইতে চাও, তবে বল, আমি দু'আ করি। ঐ থামটি রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রস্তাবে বেহেশতের বৃক্ষ হওয়াকেই সাদরে গ্রহণ করিল। কিতাবে পাওয়া যায়, পরে ঐ খুঁটি বা থামটিকে শবদেহের ন্যায় মাটিতে কবরস্থ করা হইয়াছে। কেয়ামত দিবসে বেহেশতের মধ্যে উহার পুনরুত্থান হইবে।

এমনি ভাবে নবী করীম (সাঃ) শুধু তদীয় উম্মতকুলকে নয়, প্রত্যেক সৃষ্টিকে, সৃষ্টির প্রত্যেক অনু-পরমাণুকেই তিনি ভালবাসিতেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকেই নিজ হৃদয়ের প্রেমরসে সিক্ত করিতেন। এই সৃষ্টজগত যে নূরে মুহাম্মদী হইতে আসিয়াছে তাহা বুঝানোর জন্য বান্দা খলিল তদীয় 'আত্মদর্শনে সত্যদর্শন'-নামক পুস্তকে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত তুলিয়া ধরিয়াছেন। তিনি বলেন, "একটা ক্ষুদ্র বীজ অংকুরিত হইয়া ধীরে ধীরে বর্ধিত হইয়া একটি বিরাট বৃক্ষে পরিণত হয়। আরও দেখা যায় যে, এই বৃক্ষ বর্ধিত হইতে হইতে এমন একটি অবস্থায় আসে, যেখান থেকে ইহা আর বর্ধিত হয় না। বহুদিন ঐ অবস্থায় থাকিয়া ক্রমে ক্রমে আবার ধ্বংস হইয়া যায়। রাখিয়া যায় কতকগুলো বীজ যাহা ঐ শ্রেণীর বৃক্ষের জনক। তৎপর ঐ বীজ মাটিতে ফেলিলে আবার অংকুরিত হয় এবং যথা সময়ে আবার ঐ শ্রেণীর বৃক্ষ জন্মাইয়া যায় এবং পূর্বের বৃক্ষের ন্যায় বর্ধিত হইতে হইতে আবার একদিন ধ্বংস হইয়া যায়। সেই বৃক্ষটি আবার রাখিয়া যায় কতকগুলো বীজ-যাহা ঐ শ্রেণীর ভবিষ্যত বৃক্ষের জনক। এইরূপে বৃক্ষটি একটি বৃত্তের সৃষ্টি করে-বীজ হইতে বৃক্ষ, বৃক্ষ হইতে বীজ। এই বীজ হইতে বৃক্ষে যাওয়ার নাম ক্রমবিকাশ এবং বৃক্ষ হইতে বীজে যাইবার নাম ক্রমসংকোচ। এমনিভাবে জগতের মানুষ, পশু-পাখী, গাছপালা, বৃক্ষ-লতা সবই ক্রমসংকোচ ও ক্রমবিকাশবাদের মধ্যে দিয়া আসা-যাওয়া করিতেছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যায় যে, সৃষ্ট বস্তু সমূহ অসংখ্য হওয়া সত্ত্বেও কয়েকটি বিশেষ শ্রেণীরূপে বর্তমান। যেমন মানুষ শ্রেণী, পশু শ্রেণী, পাখী শ্রেণী ইত্যাদি। ইহারা সকলেই ক্রমসংকোচ ও ক্রমবিকাশবাদের মধ্য দিয়া আসা যাওয়া করিতেছে। এই সমস্ত শ্রেণীভুক্ত সৃষ্টসমূহকে যদি একক সৃষ্টবস্তুু চিন্তা করা যায় তাহা হইলে বুঝিতে সহজ হয়। অর্থাৎ এই সৃষ্টবস্তু রূপ অবস্থাটি আসিয়াছে নূরে মুহাম্মদী হইতে, যাহা রাসূলে পাক (সাঃ) এর বাণীতে প্রতিধ্বনি হয়। তিনি বলেন, "সমস্ত সৃষ্টই আমার নূর হইতে।"

উপরের আলোচনা হইতে বুঝা যায় যে, সমস্ত সৃষ্টির হকিকত, হকিকতে মোমিনদের হকিকত-সবই হকিকতে মুহাম্মদীর প্রতিবিম্ব বা মুহাম্মদীতে নিহিত। নবী (আঃ) গণের হকিকত, ফেরেশতাদের হকিকত, প্রতিচ্ছায়াস্বরূপ। হকিকতে মুহাম্মদী আল্লাহতায়ালার জাতপাক ও অপরাপর হকিকতসমূহের মধ্যে মধ্যস্থস্বরূপ। হকিকতে মুহাম্মদীতে উপনীত হইয়া তৎপর জাতে পৌঁছাইতে হয়। ইহা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নাই। পবিত্র জাতের নিকটতম মাকামের নাম হোব্বে সেরফা। সেখানে পৌছাইয়া খোদাতায়ালার জাতের দর্শন লাভ করিতে হইলে প্রথমে হকিকতে মুহাম্মদীতে সম্মিলিত হইয়া তৎপর ঊর্ধ্বদিকে উরুজ করিতে হয়। ইহার কোন বিকল্প নাই। এই কারণেই দয়াল নবী (সাঃ) যেমন সকল মানুষের নবী, তেমনি তিনি সকল ফেরেশতাদেরও নবী, এমনকি সকল নবী (আঃ) গণেরও নবী। এক কথায় তিনি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের প্রতিটি সত্ত্বার নবী। প্রত্যেক অনু-পরমাণুর নবী। তিনি তাই সম্ভাব্য বৃত্তের তথা সৃষ্ট জগতের সকলেরই কেন্দ্রবিন্দু। অপরাপর নবীগণ ও ফেরেশতাবৃন্দ যত রহমত ও কামালাত বা পূর্ণতা প্রাপ্ত হইতেছেন, সবই হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যস্থতায় আসিতেছে। এই সৃষ্ট জগতের উপর যত রকমের রহমত বা ফয়েজ অবিরাম ওয়ারেদ হইতেছে তাহা সকলই হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যস্থতা হইয়া আসিতেছে। কাজেই, যে কেহ, যাহা কিছুই অর্জন করুক না কেন, যাহা কিছুই খোদাতায়ালার দরবার থেকে প্রাপ্ত হউক না কেন, তাহা সবই রাসূলে পাক (সাঃ) এর মাধ্যম হইয়া আসিতেছে। তাই আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলিলেন,

বিজ্ঞাপন

وَ مَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَلَمِينَ

অর্থাৎ-'আমিতো আপনাকে সমস্ত জগতের রহমত স্বরূপ প্রেরণ করিয়াছি।' (সূরা আম্বিয়াঃ ১০৭)

এই কারণেই সকল সৃষ্ট বস্তুই রাসূলে পাক (সাঃ) এর নিকট ঋণী যেমন মানবকুল তাঁহার নিকট ঋণী; তেমনি ফেরেশতাকুলও তাঁহার নিকট ঋণী। এমন কি অপরাপর নবী রাসূল (আঃ) গণও তাহার নিকট ঋণী। অবশ্য মানব ও জিন ব্যতীত সৃষ্টির সকলেই রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যেমন ফেরেশতাসকল রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রতি দরুদ ও ছালাম পাঠায়। তেমনি অন্যান্য নবী ও রাসূল (আঃ) গণও রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রতি দরুদ পাঠান।

সৃষ্টিজগতস্থিত সকল বস্তুর অনু-পরমাণুই আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর যৌথ নাম সম্বলিত কালেমা শরীফের জেকের করিয়া আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছে। একমাত্র মানব কুলই অকৃতজ্ঞ। অধিকাংশ মানুষই আল্লাহ ও রাসূলকে (সাঃ) ভুলিয়া আছে।

তাইনে আওয়াল ও হকিকতে মুহাম্মদীর কথা বলিতেছিলাম। তাইনে আওয়ালের কেন্দ্র হইল হকিকতে মুহাম্মদী যাহা মূলতঃ হোব্ব বা প্রেম। আর এই কেন্দ্র তথা হোব্ব বা প্রেমের প্রতিচ্ছায়া হইল খোল্লাত বা বন্ধুত্ব-যাহা হকিকতে ইব্রাহিমী বলিয়া পরিচিত। হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদীর মাঝখানে হকিকতে মুসবী নামে একটি মাকাম বর্তমান। হকিকতে মুসবীতে আছে প্রেমিকত্ব। মূলতঃ তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রবিন্দু যদি বৃত্তের রূপ নেয় তাহা হইলে এই বৃত্তের কেন্দ্র হয় হকিকতে মুহাম্মদীর প্রেমাস্পদত্ব এবং পরিধি হয় প্রেমিকত্ব। এই জাতি প্রেমিকত্বের দায়েরাই হকিকতে মুসবী। হকিকতে মুসবী হকিকতে মুহাম্মদীর শাখাস্বরূপ। অর্থাৎ হকিকতে মুসবীর কেন্দ্র হইল হকিকতে মুহাম্মদী এবং হকিকতে মুহাম্মদী বৃত্তের এক বিন্দু হইল হকিকতে মুসবী। হকিকতে মুসবী মহব্বতে জাতির ফয়েজান বা প্রেমিকত্বের উৎপত্তিস্থল। অর্থাৎ হকিকতে মুসবীর মহব্বতে জাতি বা প্রেমিকত্ব, হকিকতে মুহাম্মদীর সমষ্টিগত মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতির একটি শাখা।

হকিকতে মুসবীতে জাতি প্রেমিকত্ব বর্তমান। প্রেমিক সদা প্রেমাস্পদকে দেখিতে চায়। প্রেমাস্পদের দর্শনাকাংখা প্রেমিকের মধ্যে সর্বদাই পরিলক্ষিত হয়। এক মুহূর্তও প্রেমিক যেন প্রেমাস্পদের দর্শন বিনা স্থির থাকিতে পারে না। হযরত মুসা (আঃ) ছিলেন পবিত্র জাতের প্রেমিক। আল্লাহতায়ালার সিফাত বা গুণাবলী ও আফয়াল বা ক্রিয়াকলাপের পূর্ণ পরিচয় বা জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও পবিত্র জাতের দর্শনাকাংখায় তিনি সব সময়ই অস্থির থাকিতেন। হকিকতে মুসবীর দায়েরাতে যে ছালেক উপনীত হন, তিনিও খোদাতায়ালার জাতের দর্শনের জন্য হযরত মুসার (আঃ) মত পাগল বা অস্থির হন। তাহার উপর অবিরাম মহব্বতে জাতি বা জাতি প্রেমিকত্বের ফয়েজ পতিত হয়। কিন্তু হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরা হকিকতে মুসবীর এক ধাপ নিম্নে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মুসা (আঃ) এর মত জাত দর্শনের জন্য অস্থির ছিলেন না। তিনি আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট ছিলেন। আল্লাহতায়ালার জাত বা সত্তা, সিফাত বা গুণাবলী ও ক্রিয়াকলাপের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও সিফাত বা গুণাবলী ও আফয়াল বা ক্রিয়াকলাপের প্রতি বেশী আকৃষ্ট ছিলেন। ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর প্রার্থনা থেকে। তিনি দু'আ করিয়াছিলেন,

رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى

অর্থাৎ- 'রব্ব! আমাকে একটু দেখাও, কেমন করিয়া তুমি মৃতকে জীবিত কর?' (সূরা বাকারাহঃ ২৬০)

খোদাতায়ালার ঐ ক্ষমতার প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল হওয়া সত্ত্বেও তিনি মৃতকে জীবিতকরণ কাজটি দেখিবার জন্য অস্থির হইয়াছিলেন। হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরা তাই মাহবুবিয়াতে সিফাতি নূর বা ফয়েজানের উৎপত্তিস্থান। এখান থেকেই বিশুদ্ধ সিফাতি প্রেমাস্পদত্বের নূর প্রকাশ পায়।

হকিকতে ইব্রাহিমীর উপরে হকিকতে মুসবী; হকিকতে মুসবীর উপরে হকিকতে মুহাম্মদী। আর হকিকতে মুহাম্মদীর উপরে হকিকতে আহমদীর মাকাম। হকিকতে মুহাম্মদীতে আছে মাহবুবিয়াতে জাতি ও মহব্বতে জাতি মিশ্রিত অবস্থায়। জাতি প্রেমিকত্ব ও জাতি প্রেমাস্পদত্বের কারণে রাসূলে করীম (সাঃ) এর মধ্যে যে প্রেমের টানাপড়েন ছিল, যে সম্পর্কে পূর্বে বলা হইয়াছে। মাঝে মাঝেই তিনি নিজ হকিকতের গভীর কেন্দ্রে রক্ষিত প্রেম সমুদ্রের ভিতরে ডুব দিয়া প্রেমসুধা পানে বিভোর থাকিতেন। কিন্তু পরক্ষণেই আবার আল্লাহপাক তাহার হাবিবকে প্রেম সমুদ্রের গভীরতম প্রদেশ হইতে উঠাইয়া দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিতেন দুনিয়াবাসীদিগকে আল্লাহমুখী করিবার জন্য। উল্লিখিত দুই অবস্থা যাহা বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালতে নবুয়তের ইশারা। হকিকতে মুহাম্মদীতে উভয় অবস্থাই বর্তমান।

হকিকতে আহমদীতে শুধুমাত্র মাহবুবিয়াতে জাতি বা জাতি প্রেমাস্পদত্ব পরিলক্ষিত হয়। হকিকতে আহমদী জাতি প্রেমাস্পদত্বের উৎপত্তিস্থল। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে প্রেমাস্পদ হইল সেই, যাহার প্রতি প্রেম প্রবাহ প্রেমিকের তরফ হইতে আগত হয়। হকিকতে আহমদীতে উপনীত ছালেক খোদাতায়ালার জাতকে দেখিবার জন্য অস্থির নহেন। এই মাকামে ছালেক সর্বদাই আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে এবং ইবাদতেই স্বাদ পায়। এইজন্য এই দায়েরাকে আবদিয়াতের মাকাম' বলা হয়। এই দায়েরাতে নিজেকে নিকষ্ট দর্শনের পূর্ণ জ্ঞান জন্মে। হকিকতে আহমদীর দায়েরা পর্যন্ত ছালেক ওজুদ মাওহুব লাহুর কদমী ছায়ের করিতে পারে কিন্তু এর ঊর্ধ্বের দায়েরায় আর কদমী ছায়ের চলে না। সেখানে হইতে ছালেক কুওতে নজরিয়ার দ্বারা ছায়ের করেন।

হাদীস শরীফে আছে, রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, 'আল্লাহর সহিত আমার নৈকট্য এতদূর পর্যন্ত পৌঁছায় যে, কোন নবী (আঃ) বা কোনও ফেরেশতা কেহই ততদূর পৌঁছাইতে পারেন নাই।' অর্থাৎ যাবতীয় নেয়ামতের পরিপূর্ণতা তথা নৈকট্যের পূর্ণতা, জ্ঞানের পূর্ণতা, নজরী ছায়েরের পূর্ণতা, জাতপাক দর্শনের ক্ষমতা মহান খোদাতায়ালা তাঁহাকে দান করেন, তথাপিও তিনি সর্বদাই চিন্তিত থাকিতেন। তিনি নিজেই বলেন, "আমার ন্যায় কোন নবীই ক্লিষ্ট হন নাই।" এই ক্লেশ, দুঃখ-বেদনা কিসের? পার্থিব জীবনে ধর্ম প্রচারকালে তিনি অতিশয় কষ্ট ভোগ করিয়াছেন। অবশ্য তেমন কষ্ট অনেক নবীই (আঃ) করিয়াছেন। হযরত নূহ (আঃ) নয়শত পঞ্চাশ বছর ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইয়াছেন। গুটি কয়েক লোক ব্যতীত কেহই তাঁহার ডাকে সাড়া দেয় নাই। এই দীর্ঘ সময়ের প্রচার কালে তিনি তদীয় উম্মতের হাতে কত যে দুঃখকষ্ট ভোগ করিয়াছেন-তাহার ইয়ত্তা নাই। কিতাবে দেখা যায়, ধর্ম প্রচারকালে তাহার উম্মতেরা তাহার প্রতি এত বেশী প্রস্তর খন্ড নিক্ষেপ করিত যে আঘাতে আঘাতে তিনি অজ্ঞান হইয়া ভুলণ্ঠিত হইতেন এবং প্রস্তর খন্ড দ্বারা তিনি আবৃত হইয়া যাইতেন। তৎপর যখন তাহার জ্ঞান ফিরিয়া আসিত তখন পুনরায় প্রচার কার্য আরম্ভ করিতেন। তখন তদীয় উম্মতেরা আরও অধিকভাবে কষ্ট দিত। তাঁহার ভাগ্যলিপি সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এমনই চলিতেছিল।

হযরত আইয়্যুব (আঃ) দীর্ঘ ১৮ বছর রোগে-শোকে কি কঠিন দুঃখ-কষ্টই না ভোগ করিয়াছেন। কিন্তু তথাপিও রাসূলে পাক (সাঃ) এর দুঃখ-কষ্টই বেশী। কিসের এত দুঃখ বা যন্ত্রণা? মূলতঃ রাসূলে পাক (সাঃ) বর্ণিত বর্ণিতদুঃখ কষ্ট জাগতিক বা পার্থিব নয়। মেরাজ রজনীতে স্থূল জগত, নূরের জগত, সিফাতের জগত পার হইয়া তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রের গভীরতম প্রদেশ হোব্বে সেরফায় পৌছানো মাত্রই আল্লাহপাক তাহাকে বলিলেন, "হে মুহাম্মদ! আপনি থামুন।" সেই হোব্বে ছেরফার মাকাম যাহা তাইনে আউয়ালের প্রান্তসীমায়, লাতাইনের নিম্নে স্থিত। যাহার ঊর্ধ্বে পবিত্র জাতে রাসুলে পাক (সাঃ) কদমসহ আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না। তিনি জাতরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি পাইলেন না কারণ তিনি যে সৃষ্টি হওয়ার দোষে দোষী, সৃষ্ট হওয়ার কলংকে কলংকিত। সৃষ্টের কি অধিকার পবিত্র জাতে প্রবেশ করিবার? পবিত্র জাতে প্রবেশ করিতে না পারায় জাতের পরিচয় যথাযথ অর্জন করিতে পারিলেন না। এই পরিচয় প্রাপ্তির অক্ষমতাই ছিল তাঁহার যন্ত্রণা বা দুঃখের কারণ। তাই তিনি জীবনে একবারও প্রাণ খুলিয়া হাসিতে পারেন নাই। এই কারণেই বড় বড় ওলীয়ে কামেল খোদাপ্রাপ্তির শেষ মাকাম বা হোব্বে ছেরফার মাকামে প্রাপ্ত খোদা পরিচয়ের অক্ষমতার যন্ত্রণা বা হাহাকারকে সঠিক মারেফাত বলিয়াছেন। হযরত আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ) ছাহেব ফরমান, "পরিচয়ের অক্ষমতাই পরিচয় বটে। আল্লাহ পবিত্র, তিনি স্বীয় সৃষ্ট বস্তুকে তাহার পরিচয় হইতে অক্ষম হওয়া ব্যতীত তাঁহার দিকে অন্য কোন পথ প্রদান করেন নাই।"

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাদ শরীফের ৩য় খন্ডের ১২২ নং মকতুবে বলেন যে, মারেফাতের অক্ষমতা, উন্নতির শেষের শেষ মর্তবায় উপনীতি ও নৈকট্যের চরম প্রান্তে অবস্থান বটে। যে পর্যন্ত কেহ শেষ বিন্দুতে উপনীত না হইবে এবং তাজাল্লী ও আবির্ভাব সমূহের মর্তবা সমূহ অতিক্রম না করিবে এবং যে সম্মিলন পাইয়া সে বহুকাল আনন্দিত ছিল, তাহাকে বিচ্ছেদ ও বিরহ বলিয়া না জানিবে, সে পর্যন্ত এই অক্ষমতার সৌভাগ্য সে লাভ করিতে পারিবে না।" আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলিয়াছেন, "সৃষ্টি তাহাকে বুঝিতে পারিবে না। আবার বলিয়াছেন, "এলেম তাহাকে বেষ্টন করিতে পারে না।" আবার বলিয়াছেন, "চক্ষু তাহাকে অনুভব করিতে সক্ষম নয়।" এই সমস্ত আয়াতের মর্মার্থ উক্ত মাকামে পরিচ্ছন্ন হয়। উক্ত মাকামে নিজেকে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্ট মনে হয়। নিজের মধ্যেই যাবতীয় খারাবীর সমাবেশ মনে হয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, "এই নিকৃষ্টতার অনুভূতিই ছালেকের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হয়।" কারণ অন্ধকার যেমন আলোর প্রকাশস্থল বা দর্পণ, দুঃখ যেমন সুখের দর্পণ: তেমনি নিজেকে খোদা পরিচয়ে অক্ষম বা সর্বনিকষ্ট দেখিবার অবস্থাই আল্লাহপাকের যাবতীয় কামালতের দর্পণ বা প্রকাশস্থল। আল্লাহপাকের তরফ হইতে প্রেম প্রবাহ অবিরাম অধিক বেগে ছালেকের উপর তখন পড়িতে থাকে।

সর্বশেষ মাকামে পৌঁছানোর উপায়ঃ

যাই হোক, সর্বশেষ মাকামে পৌঁছাইতে হইলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ প্রয়োজন। কারণ শেষ মাকামে পৌঁছাইতে হইলে হকিকতে মুহাম্মদীতে সম্মিলিত হইতে হয়, আর হকিকতে মুহাম্মদীতে সম্মিলিত হওয়ার জন্য নবী করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ ও অনুগমন প্রয়োজন। তাই রাসুলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণ, অনুগমন ও তোফায়েলে' উম্মতে মুহাম্মদীর খাছের খাছ উম্মতেরা খোদাতায়ালার জাতের এমনি নিকটে পৌঁছাইতে পারেন যেখানে পূর্ববর্তী নবী (আঃ) গণ পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারেন নাই। এই কারণেই পয়গম্বরগণের মধ্যে উলুল আজম পয়গম্বর পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মদীর দলভুক্ত হওয়ার আশা পোষণ করিয়াছেন। ইহাতে অনেকেরই ধারণা হইতে পারে যে, উম্মতে মুহাম্মদীর এই সকল খাছের খাছ উম্মতেরা হয়ত নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু মোটেই তাহা নয়। কারণ উম্মতে মুহাম্মদীর যে শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হইয়াছে তাহা তাহার আংশিক শ্রেষ্ঠত্ব। সমষ্টিগত শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়া পয়গম্বর (আঃ) গণই ঊর্ধ্বে। ধরা যাক, একটি কলেজে দশ জন শিক্ষক আছেন। ইহাদের মধ্যে একজন অধ্যক্ষ এবং বাকী সকল সহকারী শিক্ষক। এই কলেজের কোন ছাত্র যদি লেখাপড়া করিয়া উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করে এবং তাহার ডিগ্রী যদি অধ্যক্ষের ডিগ্রীর সমানও হয়, তথাপিও কলেজের শিক্ষক মন্ডলীর চেয়ে তাহার মর্যাদা রেশী হয় না। শিক্ষক শিক্ষকই, ছাত্র ছাত্রই। শিক্ষকের সাথে ছাত্রের সম্পর্ক শিক্ষক-ছাত্র ভিন্ন কিছুই নয়। তেমনি উম্মতে মুহাম্মদীর কোন উম্মত যদি রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণের দ্বারা সর্বশেষ মাকামে উপনীত হয়, তথাপিও তাহার সহিত অপরাপর নবী (আঃ) গণের সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্য তুল্যই থাকে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, কোন ব্যক্তি যদি স্বীয় পয়গম্বর (আঃ) এর অনুসরণের মাধ্যমে অন্য পয়গম্বর হইতে ঊর্ধ্বের মাকামে উপনীত হয়, তাহা খাদেম ও ভৃত্য হিসেবে হইয়া থাকে। ইহা সর্বজনবিদিত বাক্য যে প্রভুর সমকক্ষগণের সহিত খাদেমের খাদেম হওয়া ব্যতীত অন্য কোন সম্বন্ধ হইতে পারে না।"

মুহাম্মদ ও আহমদ নামের তাৎপর্যঃ

রাসূলে পাক (সাঃ) এর "মুহাম্মদ" ও "আহমদ"-উভয় নামই পবিত্র কুরআনে দৃষ্ট হয়। এই দুই নামের তাৎপর্যও ব্যাপক।

'মুহাম্মদ' নামের মধ্যে দুইটি "মিম” বর্ণ পরিলক্ষিত হয়। একটি মিম তাইয়্যুনে জাসাদী বা দৈহিক ও মানবিক ব্যক্তিত্ব এবং অপর 'মিম' বর্ণটি তাইয়্যুনে রূহী-আত্মীক ও পারলৌকিক ব্যক্তিত্বের ইংগিত বাহক। অর্থাৎ একটি মিম তাহার শরীর সংযুক্ত পার্থিব জীবনের ইংগিত বাহক। অপর মিমটি মৃত্যু পরবর্তী পারলৌকিক জীবনের ইংগিত বাহক।

কিন্তু আহমদ নামের তাৎপর্য আরও ব্যাপক। আহাদ ও আহমদ নামের মধ্যে পার্থক্য শুধু একটি মিম বর্ণ। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, আহমদ নাম 'আহাদ' ও 'মিম' বর্ণের বলয় সংমিশ্রনে সংঘঠিত; যাহা আল্লাহপাকের প্রকার বিহীন জগতের গুপ্ত রহস্য সমূহের এক রহস্য ও 'মিম' বর্ণ ব্যতীত প্রকার সম্ভূত জগতে -উক্ত রহস্যের ভিন্নভাবে বর্ণনা করিবার কোনই অবকাশ ও পথ নাই। যদি পথ থাকিত তবে নিশ্চয় আল্লাহপাক ভিন্নভাবে বয়ান করিতেন। আল্লাহপাক আহাদ অর্থাৎ তিনি এক, একই আছেন, তিনি সমকক্ষ রহিত। 'মিম' বর্ণের বলয় যেন দাসত্বের বেড়ী ও বন্ধন তুল্য; যদ্বারা দাস প্রভু হইতে পৃথক হইয়াছে। অতএব 'মিম' এর বলয় যেন দাস। তৎসংগে আহাদ শব্দ উক্ত দাসের সম্মান ও বৈশিষ্ট্যতা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হইয়াছে।"

নবী-করীম (সাঃ) কেন ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুসরণে আদিষ্ট হইলেন?

প্রেমমুল্লকের দায়েরা সমূহের আলোচনায় বুঝা গেল যে, হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরার উপরে হকিকতে মুসবীর দায়েরা, তাহার ঊর্ধ্বে হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরা, তাহারও উপরে হকিকতে আহমদীর দায়েরা। অর্থাৎ হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরা হকিকতে মুহাম্মদীর দুই ধাপ নিম্নে। তথাপিও রাসূলে পাক (সাঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে অনুসরণে আদিষ্ট হইলেন। আল্লাহপাক বলিলেন,

ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا

অর্থাৎ- 'অতঃপর আমি অহী পাঠাইলাম তোমার প্রতি, একনিষ্ঠ ইব্রাহিমের মিল্লাতকে অনুসরণ কর।' (সূরা নাহলঃ ১২৩)

কিন্তু কেন? কিভাবেই বা ইহা সম্ভব? রাসূলে পাক (সাঃ) নিজের মিল্লাত থাকা সত্ত্বেও নিজ মাকাম হইতে দুই ধাপ নীচের মাকাম হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত অর্জন করিতে হইবে। তিনি তাহা করিলেন। হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত তিনি অর্জন করিলেন নিজ উম্মতকুলের শ্রেষ্ঠের শ্রেষ্ঠ উম্মত হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানীর দ্বারা। তাহা কিভাবে? হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে হকিকতে মুহাম্মদীতে সম্মিলিত হইলেন কিন্তু তদপূর্বে তিনি হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুসবীর কামালাত বা পূর্ণতা হাছিল করিলেন। ফলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর উক্ত দুই হকিকতের তথা হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুসবীর কামালাত অর্জিত হইল। ইহার ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, কোন ব্যক্তি যদি কোন নেক আমল করে এবং ইহা যদি অন্য কোন ব্যক্তির অনুসরণে করে তাহা হইলে অনুসৃত ব্যক্তি অনুসরণকারীর সম পরিমান পারিতোষিক বা সুফল প্রাপ্ত হবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে "যে কেহ কোন নেক সুন্নত জারী করে, তাহার সুফল তিনি নিজে এবং তাহার আমলকারী উভয়ে পাইয়া থাকে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, যদি কেহ কোন ফরজ কাজ আদায় করে এবং সংগে সংগে এই নিয়ত করে যে এই ফরজ নবী করীম (সাঃ) আদায় করিয়াছেন, তাহা হইলে সে দুইবার ছওয়াব পাইবে। প্রথমতঃ ফরজ বা আল্লাহর হুকুম পালন করিবার ছওয়াব এবং দ্বিতীয়তঃ রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণের ছওয়াব। রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণের নিয়ত করিবার জন্য যে ছওয়াব আমলকারী পাইবেন, সমপরিমাণ ছওয়াবও রাসূলে পাক (সাঃ) প্রাপ্ত হইবেন। তেমনি হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুসবীর কামালাত অর্জন করিয়া হকিকতে মুহাম্মদীতে মিলিত হইয়াছেন। তিনি এতদূর পর্যন্ত পৌছাইতে সক্ষম হইয়াছেন রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের কারণে। তাই হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুসবীর কামালাত বা পূর্ণতা অর্জনের যে পারিতোষিক বা সুফল তিনি প্রাপ্ত হইলেন, তাহার সমপরিমাণ সুফল বা পারিতোষিক রাসূলে পাকও (সাঃ) প্রাপ্ত হইলেন। হকিকতে

ইব্রাহিমীর কামালাত অর্জন বা মিল্লাতের অনুসরণের যে হুকুম আল্লাহ পাক রাসূলে পাক (সাঃ) কে করিয়াছেন, তাহা পূর্ণ হইল। এই উক্ত মাকামসমূহের কামালাত অর্জিত হইল হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) মাধ্যমে। তাই তিনি নিজ উম্মতের দেখাশুনার ভার হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের উপর প্রদান পূর্বক তাহাকে দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দিলেন। আর তিনি হকিকতে মুহাম্মদী হইতে উরুজ করিয়া হকিকতে আহমদীতে উপনীত হইয়া হকিকতে আহমদীর গভীর কেন্দ্র হোব্বে ছেরফা বা নিছক প্রেম সমুদ্রের গভীর তলদেশে নিমজ্জিত হইলেন। বর্তমান উম্মতে মুহাম্মদীর দেখাশুনার দায়িত্ব হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর উপর ন্যস্ত। এই কারণেই বলা হয় রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) মত এত বড় ইসলামী দার্শনিক আর ভূ-পৃষ্টে পদার্পণ করেন নাই। এই মুজাদ্দেদীয়া তরিকার ভিতর দিয়াই আসিবেন হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ) ছাহেব, যিনি সমগ্র পৃথিবীর একক নেতৃত্ব দান করিবেন এবং পৃথিবীকে শরীয়তের সুবাসযুক্ত পুষ্পে সুসজ্জিত করিবেন।

এ স্থলে, কাহারো কাহারো মনে এই সন্দেহের উদয় হওয়া স্বাভাবিক যে, একজন উম্মতের মাধ্যমে নবী করীম (সাঃ) কিছু কামালাত বা পূর্ণতা প্রাপ্ত হইলেন। ইহা কেমন কথা! হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নিজেই এই সন্দেহ দূর করার উদ্দেশ্যে বলিতেছেন, "কোন নবী (আঃ) যদি তাহার উম্মতদিগের মধ্য হইতে কোন এক উম্মতের মাধ্যমে কিছু অতিরিক্ত সম্পদ লাভ করেন এবং অন্য মাকামে উরুজ করিয়া উপনীত হন, তাহাতে ঐ নবী (আঃ) এর কোন ক্ষতি হয় না এবং যে ব্যক্তির মাধ্যমে ঐ কামালাত লাভ করেন, সেই ব্যক্তিও ঐ নবী (আঃ) হইতে শ্রেষ্ঠ হন না। ঐ ব্যক্তি ঐ নবী (আঃ) এর উম্মত এবং তাহাকেই অনুসরণ করিয়া তিনি উহা লাভ করিয়াছেন।” বান্দা খলিল তদীয় পুস্তকে বলেন, "খাদেম বা গোলাম প্রভুর অট্টালিকা পার্শ্বে মাটি খুড়িয়া যে ফুলের বাগান তৈয়ার করে, তাহাতে মালিকের বাড়ীর সৌন্দর্য বা মর্যাদা কিছু বাড়িয়া যায়। শুধু তাহাই নয়, মালিকের নিজস্ব গৌরব ইহাতে বাড়িয়া যায়। সমশ্রেণীর লোক হইতে সাহায্য গ্রহণ করিলে সম্মান কিছু ক্ষুন্ন হইতে পারে কিন্তু রাজা নিজের সৈন্য ও খাদেমদিগের সাহায্যে দুর্গ ও দেশ জয় করিলে তাহাতে বাদশাহের সম্মান আরও বাড়িয়া যায়। তেমনি উম্মতকুল নবী করীম (সাঃ) এর গোলাম ভিন্ন কিছু নয়। অন্যতম গোলাম হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জন্য যদি রাসূলে পাক (সাঃ) এর গৌরব কিছু বৃদ্ধি হয়, তাহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই।"

তাইনে আউয়ালের আলোচনার মাধ্যমে নসিহতের এ অধ্যায় শুরু করিয়াছি। ইহার আলোচনার মধ্যে দিয়াই এ অধ্যায় শেষ করিব। তাইনে আউয়াল বৃত্তের কেন্দ্র হকিকতে মুহাম্মদী এবং এই বৃত্তের পরিধি হকিকতে ইব্রাহিমী। ইহা পূর্বেও বলা হইয়াছে।

কে শ্রেষ্ঠ? হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) অথবা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)?

রাসূলে পাক (সাঃ) এর হকিকত, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর হকিকতের চেয়ে দুই মাকাম ঊর্ধ্বে, তথাপিও তিনি হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে অনুসরণে আদৃষ্ট হইয়াছেন। ইহাতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগিবে। কে শ্রেষ্ঠ? হযরত রাসূলে পাক (সাঃ), নাকি হযরত ইব্রাহিম (আঃ)?

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মিল্লাতের অনুসরণের হুকুম হইলেও রাসূলে পাক (সাঃ)-ই শ্রেষ্ঠ। যে কোন বৃত্তের কেন্দ্রই মূল। কেন্দ্র যদি না থাকে বৃত্তই অংকন সম্ভব নয়। তাহা ছাড়া পরিধি কেন্দ্রের প্রতিচ্ছায়া। প্রতিচ্ছায়ায় চেয়ে মূলের শ্রেষ্ঠত্ব সব সময়ই বেশী। তাইনে আউয়াল বৃত্তের পরিধি (যাহা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল)-তাহা এই বৃত্তের কেন্দ্রের (যাহা হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল) প্রতিচ্ছায়া। এই হিসেবে হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

তাইনে আউয়াল লা-তাইনের ঠিক নিম্নে অবস্থিত। ফলে ইহার পরিধির যে কোন স্থান হইতে জাতপাকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে নজর জাতপাক পর্যন্ত উপনীত হয়। ফলে হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরা হইতে নজরের মাধ্যমে পবিত্র জাতে উপনীত হওয়া যায়। কিন্তু হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরা আরোও দুই সিড়ি উপরে, যাহা জাতপাকের আরও নিকটে। এই দায়েরা রাসূলে পাক (সাঃ) এর জন্য খাছ। এই দায়েরায় যিনি উপনীত হন তিনি ওজুদ মাওহুব লাহুর নজর এবং কদম উভয়ের মাধ্যমেই পবিত্র জাতের নিকটতম স্থানে পৌছাইয়া যান। অর্থাৎ হকিকতে মুহাম্মদীতে যিনি সম্মিলিত হন, তিনি নজর এবং কদম উভয়ের মাধ্যমেই জাতের প্রান্তসীমায় পৌঁছান। কিন্তু হকিকতে ইব্রাহিমী হইতে শুধুমাত্র

নজরের মাধ্যমে জাত পর্যন্ত পৌছানো যায়। কাজেই বুঝা যায় যে, একজন শুধু নজরের মাধ্যমে জাতপাক পর্যন্ত পৌছান, অপরজন নজরী ও কদমী ছায়েরের মাধ্যমে জাতপাক পর্যন্ত পৌছান। এই হিসেবেও বোঝা যায় যে হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) হইতে শ্রেষ্ঠ।

তথাপিও হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মিল্লাতের অনুসরণের রহস্য কি? মূলতঃ হকিকতে মুহাম্মদীর দুই ধাপ পূর্বে হকিকতে ইব্রাহিমী। রাসূলে পাক (সাঃ) এর জীবদ্দশাতে তিনি যখন খোদাতায়ালার দিকে অগ্রসর হইতেন, নিজ হকিকতে পৌঁছানোর পূর্বে হকিকতে ইব্রাহিমীর দায়েরা হইয়া তখন তাহাকে নিজ হকিকতমুখে অগ্রসর হইতে হইত। হকিকতে ইব্রাহিমীতে পৌছাইয়া জাতপাকমুখী দৃষ্টি ফেলা মাত্রই নজর জাতপাক পর্যন্ত চলিয়া যাইত। তৎপর তিনি নিজ হকিকতের গভীর কেন্দ্রে ওজুদ মাওহুব লাহুর কদমসহ অগ্রসর হইতেন। হকিকতে ইব্রাহিমীকে বাদ দিয়া হকিকতে মুহাম্মদীতে সম্মিলিত হওয়া যায় না। হকিকতে ইব্রাহিমী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল। সেই দায়েরাকে বাদ দিয়া নিজের হকিকতে পৌছানো সম্ভব নয় বিধায় তিনি হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মিল্লাতের অনুসরণে আদিষ্ট হইয়াছেন। 'ইত্তাবে' শব্দ দ্বারা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুসরণকেই বুঝানো হইয়াছে। হকিকতে ইব্রাহিমীর দরজা ছাড়া জাতপাকের দিকে যাবার আর কোন রাস্তা নাই। কিয়ামত পর্যন্ত যত লোকই জাতপাক পর্যন্ত পৌঁছাইবেন, সকলকে হকিকতে ইব্রাহিমীর সুড়ংগ পথে সম্মুখে অগ্রসর হইতে হইবে। এই কারণেই আল্লাহপাক হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন,

إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا

অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সকল মানুষের ইমাম করিয়াছি।' (সূরা বাক্বারাহঃ ১২৪)

এই আলোচনায় হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মর্যাদা সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা জন্মে। তথাপিও হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব সকলের চেয়ে বেশী। কারণ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর হকিকতও হকিকতে মুহাম্মদীর প্রতিচ্ছায়া। হযরত ইব্রাহিম (আঃ)ও সৃষ্ট হইতেন না, যদি আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) কে সৃষ্টি না করিতেন। মূলতঃ রাসূলে পাক (সাঃ), হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এরও নবী

হে জাকেরান ও আশেকানসকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালার জাতের সান্নিধ্য পাইতে চাও, হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদীর ভেদতত্ত্ব যদি জানিতে চাও, ওজুদ মাওহুব লাহুর কদমী ও নজরীর মাধ্যমে যদি শেষের শেষ মাকামে পৌঁছাইতে চাও, তবে নাফসের দাসত্বের শৃংখল মুক্ত হও। নাফসের শৃংখল মুক্ত হওয়ার জন্য পীরের কদমে কঠিন খেদমত কর। পীরের নির্দেশে সদা কাতেল থাক। তাহা হইলে নাফসের ভয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাইতে পারিবে। আর নাফসের হাত থেকে যদি বাঁচিতে পার তাহা হইলে আশা করা যায়, তোমরা মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইতে পারিবে। আল্লাহ তোমাদের সহায় হউন। দু'আ, ইতি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD