দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী সম্পর্কে আলোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
রাসূলে করীম (সঃ) ফরমান,
مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ
অর্থাৎ- 'যে নিজেকে চিনিয়াছে, সে খোদাকে চিনিয়াছে।'
বিজ্ঞাপন
নিজেকে চেনা অর্থাৎ আত্মপরিচয় বা আত্মদর্শনের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেকের প্রয়োজন। ইহা খোদাপ্রাপ্তির অন্যতম শর্ত। তুমি কে, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ, তোমার আদি আবাসস্থল কোথায়, তাহা তোমার জানা প্রয়োজন। তুমি তো হাত, পা, চোখ, কান, মুখ, অস্থি-মজ্জা বিশিষ্ট এই স্থুল দেহ নও। ইহা তোমার আবরণ। তুমি অন্য জিনিস। তোমার সেই পৃথক সত্ত্বাকে চিনিতে হইবে, তাহা হইলে খোদাপ্রাপ্তি তোমার জন্য সহজতর হইবে।
আল্লাহতায়ালা গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলেন। সেই গুপ্ত ধন ভান্ডারে প্রথম প্রেম উদ্ভূত হয়। সেই প্রেমের প্রথম বিকাশ হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ), যাহা যাবতীয় হকিকতের মূল। ইহাই সমস্ত সৃষ্টির হকিকত এবং আদি উৎপত্তিস্থল। তোমাদের অবিনাশী আকারবিহীন সত্তা সেই হকিকতে মুহাম্মদীতে ছিল। সেখান হইতে নিম্নদিকে বহু দায়েরা বা মাকাম পার হইয়া, বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়া সর্বশেষে এই আদামাতে স্কুল শরীরের আবরণে তোমরা দুনিয়াতে অবস্থান করিতেছ। এখান হইতে পুনরায় তোমাদেরকে মূলে বা আসলে ফিরিয়া যাইতে হইবে। ইহাতো স্বতঃসিদ্ধ কথা,
كُلُّ شَيْ يَرْجِعُ إِلَى أَصْلِهِ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- 'প্রত্যেক জিনিস তাহার আসল বা উৎপত্তিস্থলে ফিরিয়া যায়।'
বৈজ্ঞানিক জন ডালটন বলিয়াছেন, "পদার্থের ধ্বংস নাই, রূপান্তর হয় মাত্র।" এক খন্ড বরফকে উত্তপ্ত করিলে পানিতে পরিণত হয়। আবার পানিকে উত্তপ্ত করিলে বাষ্পে পরিণত হয়। আবার শৈত্য সংস্পর্শে বাষ্প বরফে রূপ নেয়।-অর্থাৎ বরফ হইতে পানি পানি হইতে বাষ্প এবং বাষ্প হইতে বরফ হয়। এই বরফ, পানি ও বাষ্পকে পরিক্ষাগারে বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায় যে, তাহাদের মৌলিক উপাদান- হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের কোন পরিবর্তন হয় নাই।
মুক্ত বাতাসে বহু মৌলিক পদার্থ বিদ্যমান। ইহাদের মধ্যে নাইট্রোজেন অন্যতম। বাতাসের নাইট্রোজেন বৃষ্টির পানির সহিত মিশিয়া মাটিতে পড়ে এবং নাইট্রেট নামক এক পদার্থের সৃষ্টি করে। ভূ-পৃষ্ঠের গাছ-পালা, বৃক্ষলতা, তথা উদ্ভিজ্জ এই নাইট্রেট নামক পদার্থকে খাদ্যপ্রাণ হিসেবে গ্রহণ করে। ইহার পর পুনরায় উদ্ভিজ্জ সেই নাইট্রোজেনকে বাতাসে ছাড়িয়া দেয়। অর্থাৎ এই নাইট্রোজেন-বাতাস হইতে মাটি, মাটি হইতে তরুলতা, এবং তরুলতা হইতে পুনরায় বাতাসে ফিরিয়া আসে। এই ভাবে 'নাইট্রোজেন চক্র' সম্পন্ন হয়।
বিজ্ঞাপন
তোমরা সাগর, নদী-নালা, খাল-বিলের দিকে তাকাইয়া দেখ। দেখিবে, সূর্যের তাপে পানি বাষ্পিভূত হইয়া আকাশে উঠে। তৎপর শৈত্য সংস্পর্শে ঘনিভূত হইয়া মেঘে পরিণত হয়। সেই মেঘ বাতাসের বাহনে চড়িয়া ভাসিয়া বেড়ায়। পর্বতগাত্রে বাধা প্রাপ্ত হইয়া বৃষ্টি রূপে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হইয়া নদীর এ-কূল ভাংগিয়া ঐকূল গড়িয়া কুলু কুলু ধ্বনিতে আর্তনাৎ করিতে করিতে মূলে তথা সাগরে গিয়া মিলিত হয়। মূলে বা আসলে ফিরিয়া যাওয়ার এইরূপ ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত জগতের বুকে রহিয়াছে। চিন্তা বা তাফাক্কুর করিলেই বুঝিতে পারিবে।
খোদাতায়ালা হইতে নিম্নতমস্তর এই আদামাতে তোমরা আসিয়াছ। এখান হইতে পুনরায় তোমাদিগকে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে হইবে। জাত পাক পর্যন্ত পৌঁছানোর এই জ্ঞান দুনিয়া হইতে শিখিয়া যাইতে হইবে। এখান হইতে তোমাদেরকে আত্মপরিচয়ের জ্ঞান লাভকরিতে হইবে।
আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে স্রষ্টাপরিচয়ের এই জ্ঞানে জ্ঞানী হইলেন জামানার ওলীয়ে কামেল সকল। তাই ওলীয়ে কামেলের খেদমত করিয়া এই মহামূল্য জ্ঞান হাছিল করিতে হয়। খোদাপ্রাপ্তির এই পথকে সূফী সাধকগণ বহু অধ্যায়ে ভাগ করিয়াছেন। দায়েরায়ে এমকান, বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা এবং কামালাতের অধ্যায়সমূহ অতিক্রম বা উরুজ ও ছায়েরের পর ছালেকের সম্মুখে খোদাতায়ালার জাত পর্যন্ত পৌঁছাইবার দুইটি পৃথক পৃথক রাস্তা বর্তমান। যথাঃ হকিকতে এলাহিয়া এবং হকিকতে আম্বিয়া। একটি ইবাদতের পথ, অন্যটি মহব্বতের পথ। এস্থলে মহব্বত রাজ্যের দুই বিশেষ দায়েরা-হকিকতে মুহাম্মদী এবং হকিকতে আহমদী সম্পর্কে আলোচনা করা হইতেছে।
বিজ্ঞাপন
দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদী ও দায়েরায়ে হকিকতে আহমদী- প্রেম মুল্লুকের এই দুই প্রদেশ আমাদের সর্দার, নবীকুল শিরোমণি হযরত রাসূলে মকবুল (সঃ) এর দুই পবিত্র নাম-মুহাম্মদ ও আহমদের সহিত জড়িত। পবিত্র কুরআন মজীদে উক্ত দুই নাম মোবারক উল্লিখিত আছে। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন শরীফের এক স্থানে বলিতেছেন,
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ط وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ -
অর্থাৎ- 'মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তাহার সংগীরা কাফেরদের উপর কঠোর।' (সূরা ফাতিহঃ ২৯)
বিজ্ঞাপন
আবার হযরত ঈসা (আঃ) এর মাধ্যমে রাসূলে করীম (সঃ) এর আগমনের সুসংবাদদান কালে বলিয়াছেন,
وَ مُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
অর্থাৎ- 'এবং আমার পরে একজন রাসূল আসিবেন, যাহার নাম হইবে আহমদ।' (সূরা সাফঃ ৬)
বিজ্ঞাপন
উক্ত দুই নামের পৃথক পৃথক মর্যাদা বা কামালাত রহিয়াছে।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন,
كُنتُ كَنْزاً مَّخْفَيًا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الخَلْقَ لأَعْرِفَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-'আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম। তৎপর আমার পরিচিত হওয়ার স্পৃহা বা আকাংখা বা প্রেম উৎপত্তি হইল, অতঃপর আমি সৃষ্টকে সৃষ্টি করিলাম, যাহাতে আমি পরিচিত হই।'
কাজেই দেখা যায়, গুপ্ত ধন ভান্ডারে পরিচয়ের স্পৃহা বা আকাংখা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে জাত পাকে প্রেম উদ্ভত হয়। সেই প্রেমের প্রথম বিকাশ হইল হকিকতে মুহাম্মদী, যাহাকে হাকিকাতুল হাকায়েক' বলা হয়। এই হকিকতের মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টির হকিকত এবং আদি নিহিত। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক আরও বলেন, উৎপত্তিস্থান
لَوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ وَ لَمَا أَظْهَرْتُ رَبُوْبِيَّتِي
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ- 'যদি তোমাকে সৃষ্টি না করিতাম তাহা হইলে আসমান জমিন কিছুই সৃষ্টি করিতাম না এবং আমার প্রভুত্ব প্রকাশ করিতাম না।' রাসূলে করীম (সঃ) বলেন,
كُلُّ شَيْءٍ مِّنْ نُوْرِي
অর্থাৎ- 'প্রত্যেক বস্তু আমার নূর হইতে সৃষ্ট।' ইহাতে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক বস্তুর হকিকত, হকিকতে মুহাম্মদীতে বর্তমান ছিল।
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালার আলিম হওয়ার শানকে হকিকতে মুহাম্মদী বলে। খোদাতায়ালার ঐ এলেম হইতেই সমস্ত সৃষ্টির উদ্ভব। এই হকিকত মাহবুবিয়াতে জাতি এবং মহব্বতে জাতির সম্মিলিত ফয়েজানের উৎপত্তি স্থান। মহব্বত দুই প্রকার। যথাঃ মহব্বতে জাতি এবং মহব্বতে সিফাতি। আসমা ও সিফাত-নাম ও গুনাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া শুধুমাত্র জাতের প্রতি যে প্রেম এবং যেখানে খোদাতায়ালার নেয়ামত প্রাপ্তির প্রতি কোনই লক্ষ্য দৃষ্ট হয় না, তাহাই মহব্বতে জাতি। আর নাম ও গুণাবলীর জন্য সৃষ্ট যে মহব্বত তাহাই মহব্বতে সিফাতি। উক্ত দুই প্রকার মহব্বত বা প্রেমের উৎপত্তি বা আধিক্য দুই পক্ষের যে কোন এক পক্ষ হইতে অবশ্যই সৃষ্টি হইবে। প্রেমমুল্লুকে দুইটি শব্দ বহুল প্রচলিত। তাহা হইল প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ। কে প্রেমিক, কে প্রেমাস্পদ-ইহা লইয়া অনেকেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। যিনি অপরকে ভালবাসেন অর্থাৎ অপরের প্রতি যাহার প্রেম দৃষ্ট হয় তিনি প্রেমিক এবং অন্যে যাহাকে ভালবাসে তিনিই প্রেমাস্পদ। অর্থাৎ যিনি প্রেমিক তিনি সর্বদাই অপরকে ভালবাসিতে অস্থির থাকেন। আর প্রেমাস্পদ হইল অপরে যাহার সহিত প্রেম করিতে অস্থির বা পাগল থাকেন। জাতি প্রেমিকত্ব ও জাতি প্রেমাস্পদত্ব অর্থাৎ মহব্বতে জাতি এবং মাহবুবিয়াতে
জাতি-এই দুই অবস্থা একত্রে রাসূলে পাক (সঃ) এর মধ্যে বর্তমান। উৎপত্তিস্থল হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ)। এই উভয় অবস্থা একত্রে রাসূলে তাই মহব্বতে জাতি এবং মাহবুবিয়াতে জাতির সম্মিলিত ফয়েজানের করীম (সঃ) ব্যতীত অন্য কাহারও ভিতর আর পরিলক্ষিত হয় না।
হযরত রাসূলে করীম (সঃ) একাধারে আল্লাহর প্রেমাস্পদ ও প্রেমিক ছিলেন। কখনও আল্লাহতায়ালা প্রেমিক ও নবী করীম (সঃ) প্রেমাস্পদ, আবার কখনও আল্লাহতায়ালা প্রেমাস্পদ ও নবী পাক (সঃ) প্রেমিক। এই দুই জনের মধ্যে প্রেমের এক রহস্যময় খেলা বর্তমান। তাই দেখা যায় যে আল্লাহপাক যখন নবী করীম (সঃ) কে বলিয়াছেন,
يَا مُحَمَّدُ أَنَا وَ اَنْتَ وَ مَا سَوَاكَ خَلَقْتُ لأَجْلِكَ
অর্থাৎ- 'হে মুহাম্মদ! আমি আর তুমি এবং তুমি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে তাহা তোমারই জন্য সৃষ্টি করিয়াছি।' ইহার উত্তরে নবী করীম (সঃ) বলিয়াছেন,
اللَّهُمَّ أَنْتَ وَ مَا أَنَا وَمَا سَوَاكَ تَرَكْتُ لَأَجْلِكَ
অর্থাৎ- 'হে আল্লাহ! শুধু তুমি, আমি না এবং তুমি ছাড়া আর যাহা কিছু আছে তাহা তোমারই জন্য পরিত্যাগ করিলাম।' রাসূলে করীম (সঃ) এর মধ্যে প্রেমাস্পদত্বের যে অবস্থা বর্তমান তাহারই প্রকাশ ঘটিয়াছে বর্ণিত ঐ হালে। আবার দেখা যায়, রাসূলে করীম (সঃ) এর উপরে বর্ণিত হালে বা অবস্থাতে আল্লাহপাক তাঁহাকে তাহার উম্মতের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া আপন প্রেমের কোর্ব হইতে দুনিয়ায় প্রেরণ করিয়াছেন। আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবনে উক্ত দুই অবস্থার টানাপড়েন সর্বদাই চলিয়াছে। রাসূলে করীম (সঃ) এর অনুসরণ, উত্তরাধিকার ও তোফায়েলের সূত্রে যে সমস্ত আরেফে কামেল উক্ত হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরাতে উন্নীত হন, আল্লাহতায়ালার সাথে তাহারও প্রেমিকত্ব ও প্রেমাস্পদত্বের খেলা চলিতে থাকে।
পবিত্র হাদীস শরীফ হইতে দেখা যায় যে উলুল আজম পয়গম্বর (আঃ) গণ রাসূলে পাক (সঃ) এর উম্মতের মধ্যে শামিল হওয়ার আশা করিয়াছিলেন। কিন্তু কেন? কারণ এই হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ) যাহা সমস্ত তত্ত্বের তত্ত্ব। সমস্ত পয়গম্বর (আঃ) এবং ফেরেশতাদের হকিকত, হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ) এর প্রতিবিম্ব স্বরূপ। এই হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ) অন্য যাবতীয় হকিকতের এবং আল্লাহপাকের মধ্যে মধ্যস্থ স্বরূপ। তাহার মধ্যস্থতা ব্যতীত জাতে উপনীত হওয়া অসম্ভব। হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ) এর সহিত সম্মিলিত না হওয়া পর্যন্ত উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া যায় না। আর উক্ত হকিকতের সহিত সম্মিলিত হওয়া রাসূলে করীম (সঃ) এর উম্মত হওয়ার উপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত উম্মত না হওয়া যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত উক্ত সম্পদে সম্পদশালী হওয়া যাইবে না। তাই অন্যান্য উলুল আজম পয়গম্বরগণ নবী করীম (সঃ) এর উম্মতদের শামিল হওয়ার আরজু পেশ করিয়াছিলেন। রাসূলে করীম (সঃ) এর অনুসরণ, উত্তরাধিকার বা ওয়ারেসসূত্রে তাঁহার বিশিষ্টের বিশিষ্ট উম্মতগণের ভাগ্যে এই মহামূল্যবান দৌলত বা কামালাত বা পূর্ণতা মিলিয়াছে। আখেরী জামানায় হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়াতে আসিয়া তাই রাসূলে পাক (সঃ) এর অনুসরণ করিবেন।
এই হকিকতে মুহাম্মদীর মাকামে মোরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়তে করিতে হইবে যে, মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতি ফয়েজানের উৎপত্তিস্থান হকিকতে মুহাম্মদী হইতে ফয়েজান আসিয়া ছালেকের হায়াতে ওহাদানী' শরীরে পতিত হইতেছে। এই ফয়েজান অবিরাম ছালেকের উপর পড়িতে থাকে। এই দায়েরাতে ছালেকের সহিত রাসূলে করীম (সঃ) এর এক বিশেষ প্রণয় সম্পর্ক গড়িয়া উঠে। ছালেক সর্বদাই নবী করীম (সঃ) কে তাহার সম্মুখে দেখিতে পায়। ছালেক হযরত নবী করীম (সঃ) এর আছহাবগণের রীতি-নীতি ও ভাব অবলম্বন করিতে ভালবাসে এবং পবিত্র হাদীস শরীফের আদেশ নিষেধের ভূষণে নিজেকে ভূষিত করে।
দায়েরায়ে হকিকতে আহমদীঃ
ইহা হকিকতে মুহাম্মদীর মূল। ইহা বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের উৎপত্তি স্থান। অর্থাৎ এই দায়েরাতে শুধু প্রেমাস্পদত্ব বর্তমান। এখানে আল্লাহ নিজে যে অবস্থায় প্রেমিক এবং নবী করীম (সঃ) যে অবস্থায় প্রেমাস্পদ সেই অবস্থা বর্তমান। এই দায়েরাতে ছালেক প্রেমাস্পদত্বের বা মাহবুবিয়াতের সাজে সজ্জিত থাকে। জাত পাক হইতে যত বেশী প্রেম প্রেমাস্পদের প্রতি আসিতে থাকে, ততই সে আল্লাহর প্রেম সমুদ্রের গভীরে নিমজ্জিত হইতে থাকে। এই মাকামে উন্নীত ছালেক নিজেকে সর্বনিকৃষ্ট হিসেবে দেখিবার জ্ঞান অর্জন করেন। অর্থাৎ নিজেকে অক্ষমতা, অযোগ্যতা, মুর্খতা, নীচতা, হীনতা এবং যাবতীয় দোষত্রুটির আকর মনে করেন। ফলে ছালেক এই মাকামে মাহবুবিয়াতের অলংকারে অলংকৃত হন। নিজেকে নিকষ্ট হিসেবে দেখিবার জ্ঞান রাসূলে করীম (সঃ) এর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় ছিল। তাই তিনি বলিতেন,
لَيْتَ رَبِّ مُحَمَّدٍ لَمْ يَخْلُقُ مُحَمَّداً
অর্থাৎ- 'মুহাম্মদের প্রভু মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করিলেই ভাল হইত।'
এই দায়েরায় উন্নীত হওয়ার পরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নিজেকে অতিশয় অক্ষম, অযোগ্য ও নিকৃষ্ট মনে করিতেন। তদীয় পীর হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের নিকট লিখিত এক মকতুবে তিনি নিজের সম্পর্কে বলিতেছেন, "যে কোন আমল করি না কেন, তাহা এত দোষণীয় ও কদর্য মনে হয় যে, তাহাকে নানা প্রকারে দোষী না করা পর্যন্ত মনে শান্তি পাই না। আমার ধারণা যে, আমি যে কোন নেক আমল করি না কেন, তাহা আমার দক্ষিণের ফেরেশতার লিখিবার উপযোগী নহে। বরং আমার বিশ্বাস যে, আমার নেকীর আমলনামা শূন্য এবং ফেরেশতা যেন বেকার বসিয়া আছে। অতএব নিখিল বিশ্বে যাহা কিছু আছে বরং ফিরিংগি, কাফের এবং বেদীনও যেন আমার চেয়ে উৎকৃষ্ট। আমি যেন সবচেয়ে নিকৃষ্ট।” যিনি হকিকতে আহমদীর মাকামে উন্নীত হন, তিনিও নিজেকে এমনি নিকৃষ্ট ও নিঃস্ব মনে করেন। আসলে এই মাকামে উন্নীত ছালেক নিজেকে যে অক্ষম, অযোগ্য, নিঃস্ব ও যাবতীয় দোষ ত্রুটির উৎপত্তিস্থল মনে করেন-ইহা তাহার জওকী জ্ঞান। সাধারণ জ্ঞান বা বিবেচনায় এই মাকামে উন্নীত ছালেকের চেয়ে জ্ঞানী আর কে? সমস্ত মখলুকের মধ্যে তিনিইতো সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসেবে চিহ্নিত হন। তাহার জ্ঞানের নূর দর্শনে শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা পর্যন্ত আশ্চর্য ও বিস্ময়ে হতবাক। তাহার ক্ষমতার ব্যপ্তি সমগ্র সৃষ্টিজগত ব্যপিয়া। যেমন রাসূলে করীম (সঃ) নিজেকে অক্ষম এবং অযোগ্য মনে করিলেন, আবার তিনিই অঙ্গুলির ইশারায় চন্দ্রকে দ্বিখন্ডিত করিলেন। সর্বোচ্চ মাকামে উন্নীত হইয়া নিজেকে মুর্খ মনে করিলেন। আবার দুনিয়ার মানব সমাজের নিকট প্রচার করিলেন,
أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ وَ عَلِيُّ بَابُهَا
অর্থাৎ- "আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী সেই শহরের প্রবেশদ্বার।"
তবে এই দায়েরায় উন্নীত ছালেক খোদাতায়ালার জাতপাকের শ্রেষ্ঠত্ব, নিজের জ্ঞান, ক্ষমতা ইত্যাদিকে একেবারেই শূন্য মনে করেন এবং নিজেকে যাবতীয় খারাপীর উৎপত্তিস্থল মনে করিয়া সদা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। এখানে এক রহস্য নিহিত। নিজেকে নিকষ্ট এবং যাবতীয় দোষ ত্রুটির আকর মনে করায় আল্লাহপাক তাঁহার প্রেমাস্পদত্ব বা মাহবুবিয়াতের সাজে সেই ছালেককে সজ্জিত করেন, আল্লাহপাকের চরিত্রে তাহাকে চরিত্রবান করেন। এখানে একটি তথ্য তোমাদের জানা প্রয়োজন। তোমরা জান, যে কোন বস্তুর স্বরূপ বুঝিবার জন্য তাহার বিপরীত বস্তুর দরকার। যেমন উৎকৃষ্ট জিনিস বুঝিবার জন্য নিকৃষ্ট জিনিসের প্রয়োজন। আলোর স্বরূপ বুঝিবার জন্য অন্ধকারের দরকার। সুখের অনুভূতিকে হৃদয়ঙ্গমের জন্য দুঃখের আবশ্যক। যাহার জীবনে দুঃখ নাই, সে কোন দিনই সুখের সত্যিকারের স্বাদ পায় নাই। তাই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, “যাহার মধ্যে নিকৃষ্টতা ও বিনষ্টিগুণ অধিক, তাহার মধ্যেই খোদাতায়ালার খয়ের ও কামালের অর্থাৎ উৎকর্ষ ও পূর্ণতার আবির্ভাব অধিক হইয়া থাকে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই দুর্ণামই যেন শ্রেষ্ঠ সুনাম এবং এই নিকৃষ্টতাই যেন তাহার শ্রেষ্ঠত্বের স্বরূপ।"
এই হকিকতে আহমদীর মাকামকে দাসত্বের বা আবদিয়াতের মাকাম বলা হয়। ইহা অপরাপর মাকাম হইতে উচ্চতম। প্রেমিক এবং প্রেমাস্পদের হালত ভিন্ন ভিন্ন। প্রেমিক সদা খোদাতায়ালার দর্শনাকাংখী। খোদাতায়ালাকে দেখিবার জন্য সে পাগল থাকে। তাহাকে দেখিতে পাইলেই ছালেকের হৃদয় শীতল হয়, চঞ্চলতা যেন বন্ধ হয়। তখন সদা খোদাতায়ালার আত্মিক দর্শনে তিনি তন্ময় থাকেন। অপর দিকে প্রেমাস্পদ বা আল্লাহর মাহবুবগণ তাহাকে দেখিবার জন্য পাগল বা অস্থির নন। তাহারা সদা খোদাতায়ালার বন্দেগীতে লিপ্ত থাকেন। বন্দেগী আল্লাহতায়ালার কাম্য। তাই সদা তাহারা আল্লাহতায়ালার এই বাঞ্ছনীয় কর্মে ব্যস্ত থাকেন। ইহা এক অমূল্য নেয়ামত, রাসূলে করীম (সঃ) এর পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত এই নেয়ামত অর্জনের অন্য কোন পথ নাই। অবশ্য এই অনুসরণ জাহেরী এবং বাতেনী, উভয়বিধ অনুসরণ হইতে হইবে।
রাসূলে করীম (সঃ) এর আহমদ নামের মধ্যে এক বিশেষ রহস্য বা ভেদ লুক্কায়িত। আহাদ এবং আহমদ-এই দুই নামের মধ্যে একটি 'মিম' হরফের ব্যবধান মাত্র। সুফী সাধকগণ এই হরফকে মিমের পর্দা হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। পবিত্র আল কুরআনে কয়েকটি সূরায় কিছু কিছু হরফ আছে যাহাদেরকে হরফে মুকাত্তায়াত বলে। যেমন, আলিফ লাম, মিম ইত্যাদি। এই সকল হরফের মধ্যে আল্লাহপাকের গোপন ভেদ বা রহস্য নিহিত যাহা আল্লাহ এবং রাসূলে করীম (সঃ) এবং মষ্টিমেয় কয়েকজন আরেফে কামেল ব্যতীত কেহই জানেন না। অনেক সুফীসাধকের মতে আহাদ ও আহমদ নামের মধ্যে মিমের যে হরফ, যাহা দুই নামের ব্যাবধান স্বরূপ বিদ্যমান, তাহা আসলে হরফে মুকাত্তায়াত-যাহার অর্থ মুষ্টিমেয় দু'চারজন ব্যতীত সকলেই অনবগত।
এই হকিকতে আহমদীর দায়েরাতে মোরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়ত করিতে হইবে যে, বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতির প্রকাশস্থান হকিকতে আহমদী হইতে ফয়েজান আসিয়া ছালেকের হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে। এই দায়েরার ফয়েজান অতিশয় সূক্ষ্ম। এই হকিকতে আহমদীর নূর হকিকতে মুহাম্মদীর নূর হইতে কিছুটা তেজস্কর। এই দায়েরায় পবিত্র কুরআন শরীফ তেলাওয়াত অগ্রগতির জন্য অতি ফলদায়ক।
আল্লাহতায়ালার জাতপাকে যে প্রেম উদ্ভব হইয়াছিল, তাহারই প্রথম বিকাশ হকিকতে মুহাম্মদী (সঃ) যাহা রাসূলে করীম (সঃ) এর হকিকত। কাজেই দেখা যায় প্রেমই তাহার উৎস এবং তাহার জীবনের প্রত্যেকটি কর্মকান্ডে এই প্রেমেরই অভিব্যক্তি। ভূমিষ্ঠ হইয়া জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি উম্মতের জন্য কাঁদিলেন। সমগ্র জীবনই তিনি ব্যয় করিলেন উম্মতের শাফায়তের চিন্তায়। একদিনও তিনি পেট ভরিয়া আহার করেন নাই, আরামের বিছানায় নিদ্রা যান নাই। অনিদ্রায়-অনাহারে, পাহাড়ে-পর্বতে, গুহায়-গহব্বরে পড়িয়া অঝর নয়নে কাঁদিতেন শুধুমাত্র এই পাপ সমুদ্রে নিমজ্জিত, পথভ্রষ্ট, আল্লাহবিস্মৃত উম্মতকুলের জন্য। অথচ এই উম্মতেরাই তাহার উপরে অত্যাচার ও নির্যাতনের স্ট্রীম রোলার চালাইল। পাথরের আঘাতে আঘাতে তাহাকে ক্ষতবিক্ষত করিল। তাহার দন্ত মোবারক ভাংগিয়া ফেলিল। মস্তিস্কে লৌহ শলাকা প্রবেশ করাইল। অথচ কোনরূপ অভিযোগ না করিয়া বরং তাহাদেরই জন্যে তিনি খোদার দরবারে কাঁদিয়া কাঁদিয়া ব্যাকুল হইতেন। ইহাই ছিল তাহার প্রেম বিতরণের রীতি। কাফেরদের সর্দার আবু জেহেল আজীবন রাসূলে করীম (সঃ) কে হত্যার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিল, অথচ সেই আবু জেহেলেরই অসুস্থ্যতায় মানবপ্রেমী রাসূলে পাক (সঃ) আবু জেহেলের রোগ মুক্তির জন্যে কাঁদিয়া কাঁদিয়া আকুল হইতেন। এমনি মানব প্রেমিক ছিলেন তিনি।
যে সকল ছালেক উক্ত দই উচ্চতর মাকাম হকিকতে মহাম্মদী এবং হকিকতে আহমদী ৩য় করিতে সক্ষম হইয়াছেন, তাহারাও অপরাপর মানব কুলের জন্য এমনি করিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বক্ষ ভিজান। আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেব তাই সারা জীবন মুরীদের ব্যাথায় অঝর নয়নে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বুক ভাসাইয়াছেন।
তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, হকিকতে আম্বিয়ার দায়েরা সমূহ ত্বয় করিয়া যদি প্রেমতত্ত্বে জ্ঞানী হইতে চাও, তবে মহব্বত রাজ্যের সমস্ত কোঠায় বিচরণকারী হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধর এবং তাহার নির্দেশিত পথে চলিতে থাক। আশেক কবি বলেন,
"এশকেরও গভীর তত্ত্ব যদিরে জানিতে চাও,
কামেলেরই চরণতলে নেছার হইয়া যাও।"
কাজেই তোমরা যদি প্রেমতত্ত্ব শিখিতে চাও, তাহা হইলে আপন পীরের কঠিন খেদমত করিয়া তাহাকে খুশী করিবার আপ্রাণ চেষ্টা কর। যদি এই কাজে সফলকাম হও তাহা হইলে তাহার তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রয়োগে তোমরা প্রেম রাজ্যের সব গুপ্ত প্রদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাইবে। যেখানে তোমাদিগকে প্রেমের সুগন্ধময় পাপড়ি ছিটাইয়া অভ্যর্থনা জানানো হইবে। তোমরা এক অনাবিল শান্তির অধিকারী হইবে যাহা প্রেমমুল্লুকে বিচরণকারী ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেহই জানে না।
ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার স্বরূপঃ
দুনিয়ার মহব্বত যাবতীয় পাপের মূল। তোমরা পীরের খেদমত করিতে থাক। পীরের নেক দৃষ্টিতে তোমাদের অন্তর হইতে দুনিয়ার মহব্বত সমূলে উৎপাটিত হইবে। দুনিয়ার মহব্বত তোমাদের দেলে বিন্দু পরিমান থাকা পর্যন্ত খোদাতায়ালার মহব্বত পয়দা হইবে না। হযরত খাজা ফোযায়েল ইবনে আইয়ায (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন "আল্লাহতায়ালা সমস্ত পাপরাশীকে একটি গৃহে আবদ্ধ রাখিয়াছেন। উহার চাবি দুনিয়ার মহব্বত। আবার সমস্ত পুণ্যরাজীকে অন্য একটি গৃহে তালাবদ্ধ রাখিয়াছেন-উহার চাবি দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি।" হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "দুনিয়া বাহ্যতঃ তরুতাজা ও সুমিষ্ট, বস্তুতঃ উহা প্রাণ নাশক বিষতুল্য এবং ইহা অস্থায়ী সরঞ্জাম মাত্র। ইহার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া অনর্থক। দুনিয়া যাহাকে গ্রহণ করে প্রকৃত পক্ষে সে অপদস্থ। যে উহার প্রেমাসক্ত সে পাগল। দুনিয়া স্বর্ণপত্রে মন্ডিত বিষ্টা সরূপ এবং শর্করা মিশ্রিত প্রাণনাশক গরলতুল্য। যে ব্যক্তি এতাদৃশ অচল বস্তুর আসক্ত না হয় এবং এইরূপ অপদার্থের প্রেমে আকৃষ্ট না হয় সেই প্রকৃত জ্ঞানী।"
হযরত হাসান বছরী (রাঃ) ছাহেব সর্বজন স্বীকৃত তরিকতের বিজ্ঞ আলেম ছিলেন। কিন্তু তরিকতের দুর্গম পথে প্রবেশ করিবার পূর্বে তিনি মণি-মাণিক্যের ব্যবসা করিতেন। তাই তিনি হাসান জহুরী নামেও পরিচিত ছিলেন। তাহার জীবনের কোন একটি ঘটনা এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার স্বরূপকে তাহার সম্মুখে উম্মোচিত করে। ফলে তিনি দুনিয়ার মহব্বত সম্পূর্ণ ভাবে দেল থেকে মুছিয়া ফেলেন। সেই ঘটনাটি নিম্নরূপ-ব্যবসা উপলক্ষে একবার তিনি রোম দেশে গমন করেন। জনৈক রোমীয় উযীরের সহিত তাহার বন্ধুত্ব হয়। একদিন তিনি উযীরের অনুরোধে ঘোড়ায় চড়িয়া তাহার সহিত শহরের বাহিরে কোন এক স্থানে গমন করেন। সেখানে মণি-মাণিক্য খচিত সুসজ্জিত ও বৃহৎ একটি রেশমী তাঁবু দেখিতে পান। একদল সুসজ্জিত সৈন্য উক্ত তাঁবু প্রদক্ষিণ করিয়া স্বদেশীয় ভাষায় কিছু বলিতে বলিতে চলিয়া গেল। ইহার পরক্ষণেই আনুমানিক চারিশত (৪০০) জন দার্শনিক পন্ডিত আসিয়া পূর্ববৎ তাবু প্রদক্ষিণ করিয়া নিজেদের ভাষায় কি যেন বলিতে বলিতে চলিয়া গেলেন। তাহার পর পরই আবার প্রায় দুই শতাধিক সুন্দরী যুবতী, প্রত্যেকে বহু মূল্যবান মণি-মাণিক্যের থালা মাথায় করিয়া তাবু প্রদক্ষিণ করিল এবং কিছু বলিতে বলিতে চলিয়া গেল। সর্বশেষে স্বয়ং রোমসম্রাট এবং তাহার উযীর তাবুর ভিতরে প্রবেশ করিলেন এবং অল্পক্ষণ পরেই বাহির হইয়া আসিলেন। হযরত হাসান বছরী (রাঃ) বলেন, "এইরূপ দৃশ্য দেখিয়া আমি সত্যিই অবাক হইলাম। আমি উযীরকে জিজ্ঞাসা করিলাম ব্যাপার কি?" উযীর বলিতে আরম্ভ করিলেন, বাদশাহের সুদর্শন এক পুত্র ছিল, যিনি সুবিজ্ঞ আলেম এবং অসীম সাহসী বীরপুরুষ ছিলেন। এই ছেলে একদা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। বহু চেষ্টা তদবীর করিয়াও তাহাকে সুস্থ্য করা সম্ভব হয় নাই। অবশেষে সে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। এই তাঁবুতেই তাহাকে সমাহিত করা হয়। প্রতি বছর একবার বাদশাহ মহাড়ম্বরে তাহার কবর যিয়ারত করিতে আসেন। আজও সেই উদ্দেশ্যে আসিয়াছেন। প্রথমে যে সৈন্যদল আসিয়া তাঁবু প্রদক্ষিণ করিয়াছে, তাহারা বলিয়াছে, "হে রাজকুমার! আপনার যে অবস্থা ঘটিয়াছে, আমাদের রণকৌশলে এবং বাহুবলে যদি তাহা প্রতিরোধ করা সম্ভব হইত তবে আমরা প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া আপনাকে উহা হইতে মুক্ত করিতাম। কিন্তু এই অবস্থা যিনি ঘটাইয়াছেন তাহার কর্মে বাধা দেওয়ার শক্তি আমাদের কেন, পৃথিবীর কাহারও নাই।" ইহার পরক্ষণেই দার্শনিক পন্ডিতগণ আসিয়া বলিয়াছেন, “হে রাজকুমার! যদি আমাদের দর্শন, বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তোমার উপর আপতিত এই বিপদের প্রতিরোধ সম্ভব হইত, তাহা হইলে আমরা আমাদের পূর্ণশক্তি প্রয়োগে তাহা করিতাম। কিন্তু কোন উপায়েই এই অবস্থার প্রতিরোধ সম্ভব নয়।" অতঃপর পরমাসুন্দরী যুবতীগণ রত্নপূর্ণ থালা মাথায় করিয়া আসিয়া বলিল, "হে রাজকুমার! যদি ধনরত্ন ও সৌন্দর্য দ্বারা তোমাকে এই অবস্থার হাত হইতে রক্ষা করা সম্ভব হইত, তবে আমরা তোমার জন্য তাহা লুটাইয়া দিতে কুণ্ঠিত হইতাম না। কিন্তু যিনি তোমার এই অবস্থা ঘটাইয়াছেন, তাহার নিকট ধনরত্ন এবং রূপ-লাবণ্যের কোনই মূল্য নাই।" সর্বশেষে সম্রাট তাহার উযীরসহ অগ্রসর হইয়া বলিলেন, "হে প্রাণাধিক পুত্র! এ ক্ষেত্রে তোমার পিতার হাতে কোনই শক্তি নাই। যদি এমন কোন উপায় থাকিত যাহা দিয়া তোমার এই অবস্থা রোধ করা সম্ভব হইত, আমি আমার সর্ব শক্তি ব্যয়ে তাহাই করিতাম। কিন্তু এই ঘটনা যাহার সৃষ্ট তোমার পিতা কোন ছার-যাহাকিছু এই পৃথিবীতে বিদ্যমান আছে সব কিছুই সেই মহাশক্তিমান স্রষ্টার সম্মুখে অক্ষম ও দুর্বল।" এই বলিয়া সম্রাট অশ্রুসিক্ত নয়নে তাবুর ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসেন। প্রতি বছর এক নির্ধারিত দিনে এই শোকাবহ অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
উযীরের মুখে এই হৃদয়বিদারক বৃত্তান্ত শুনিয়া হযরত হাসান বসরী (রাঃ) ছাহেবের মনে ভাবাবেগ এত প্রবল হইয়া উঠিল যে তিনি প্রায় আড়ষ্ট হইয়া পড়িলেন এবং স্বীয় ব্যবসা ত্যাগ করিয়া বসরায় চলিয়া আসেন। তিনি কসম খাইলেন, জীবনে আর কখনও এই নশ্বর দুনিয়ার মোহে আবিষ্ট হইবেন না। ইহার পর দুনিয়ার মোহ দেল হইতে ঝারিয়া ফেলিয়া কঠোর রিয়াযতে আত্মনিযোগ করিলেন। দীর্ঘ সাধনার পর খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব তিনি হাছিল করিলেন।
কাজেই তোমরা যদি বুদ্ধিমান হও, তবে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহ দেল থেকে মুছিয়া ফেল। দুনিয়ার স্থায়ীত্ব কতক্ষণের? জ্ঞানীরা বলেন, "দুনিয়া হইল দুঃস্বপ্ন বা ভাসমান মেঘের ছায়ার মত।" আল্লাহর পেয়ারা সকল বলেন, "দুনিয়া তিনটি নিঃশ্বাসের সমষ্টি মাত্র।" ইহার একটি নিঃশ্বাস যাহা চলিয়া গিয়াছে। একটি নিঃশ্বাস যাহা তুমি গ্রহণ করিতেছ। আব তৃতীয় নিঃশ্বাস তুমি গ্রহণ করিতে পারিবে কিনা তাহা তোমার জানা নাই। কারণ বহু লোক পরবর্তী নিঃশ্বাস গ্রহণ করিবার আগেই দুনিয়া ছাড়িয়া চলিয়া গেছে। মুলতঃ তুমি মাত্র একটি নিঃশ্বাসের মালিক। কাজেই খোদাতায়ালার ইয়াদে এই একটি মাত্র নিঃশ্বাস অতিবাহিত কর-তবেই কল্যাণ। পরবর্তী নিঃশ্বাস তোমার জন্য কি বহন করিয়া আনিতেছে তুমি তাহা জান না। আল্লাহ বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
অর্থাৎ- 'প্রত্যেককেই মুত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে।' (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৮৫)
কাজেই তোমরা যদি জ্ঞানী হও, বুদ্ধিমান হও, তবে অনিত্য দুনিয়ার মোহ মায়া পরিত্যাগ করতঃ কামেল পীরের কদমে নিজেকে নেছার করিয়া দাও। দেখ, আশেক কবি কি বলেন,
"যদি ঠকিতে না চাও হাটে (দুনিয়ায়) এসে
বস গুরুর নিকটে যেয়ে ঘেসে
হৃদে আক সেই মহা উপদেশ
মনে মুখে মুহাম্মদ শব্দ বল।
যাবে ধাঁধাঁ ছুটে, দিব্য চক্ষু পাবে
বাহিরের রূপে ভ্রম না জন্মিবে,
গুপ্ত তত্ত্ব সবই আশু প্রকাশিবে
তোরে কে ঠকাবে মদিনায়ে চল।"
কাজেই দুনিয়ার ভয়াল থাবা হইতে যদি বাঁচিতে চাও, তবে বর্তমান জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ কামেল হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কঃ) ছাহেবের কদম শক্ত করিয়া ধর। তাহার তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রয়োগে তোমার অন্তররাজ্যে প্রোথিত দুনিয়ার মহব্বতের বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হইয়া তথায় পীরের মহব্বতের বীজ রোপিত হইবে। সেই বীজ অংকুরিত হইয়া ধীরে ধীরে আল্লাহ ও রাসূল (সঃ) এর মহব্বতের মন মাতানো রংগীন ফুলে সুশোভিত হইবে। তোমরা পীরের মহব্বত দেলে দৃঢ়ভাবে পয়দা করিবার চেষ্টা কর। পীরের চরিত্রে চরিত্রবান হও। পীরের খাছলতে খাছলত ধর-তবেই ত্রাণ এবং শান্তি। পীরের যাবতীয় আদেশ ঠিক ঠিক মত প্রতিপালন কর। তাহার আদেশ যদি আপাতঃ শরীয়ত বিরোধীও মনে হয়, তবুও তাহা পালন কর। মহা কবি হাফেজ বলেন, "তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ সিক্তকরতঃ তাহার উপর নামাজ পড়িতে বলেন, তুমি তাহাই কর। কারণ মোকাম মঞ্জিলের পথ তিনিই তোমার চেয়ে ভাল জানেন।" পীরের নিদের্শ আপাতঃ শরীয়ত বিরোধী মনে হইলেও প্রকৃতপক্ষে তাহা শরীয়ত বিরোধী নয়, যখন বুঝ খুলিবে, তখন তোমরা বুঝিতে পারিবে যে, পীর যাহা কিছু বলেন বা ইশারা করেন, তাহা এলহাম যোগে প্রাপ্ত নির্দেশ মোতাবেক করেন, যাহার মধ্যে শরীয়তের বিন্দুমাত্র খেলাফ থাকে না।
কাজেই তোমরা পীরের যাবতীয় নিদের্শ যথাযথ পালন করিতে থাক। ইহাতে পীরের মহব্বত ধীরে ধীরে দেলে পয়দা হইবে। ফলে তোমরা খোদাপ্রাপ্তির দুর্গম পথ ধৈর্যের সাথে অতিক্রম করিতে পারিবে। এই কঠিন পথ পার হইতে আমাকে অসংখ্য বিপদ আপদের মোকাবেলা করিতে হইয়াছে। পীর কেবলাজান আমাকে আধাচামচ পরিমান ভাত, সংগে অতি সামান্য পরিমান তরকারী খাইতে দিতেন। তদুপরি পরিবেশিত খাবার হইতে যৎসামান্য তরকারী বাঁচাইয়া সর্বশেষে তাহা গ্রহণের নির্দেশ দিতেন। আমি তাহাই করিতাম। মাঝে মাঝে তিনি বলিতেন, "তোমাকে যে আমি তোমার পিতার চেয়ে কম ভালবাসি তাহা নহে, তবে তোমাকে অধিক খাবার দেওয়া আল্লাহপাকের হুকুম নাই।" দিনের পর দিন অত্যল্প পরিমান খাদ্য গ্রহণে আমার দেহের রক্তকনিকা পর্যন্ত শুকাইয়া গিয়াছিল। তথাপিও আমি আমার পীরের কদম ছাড়ি নাই। তাই তিনি আমাকে কবুল করিলেন।
কাজেই তোমরা পীরের কদম শক্ত করিয়া ধরিয়া ধৈর্যের সহিত খেদমত করিতে থাক। আল্লাহপাক দয়া করিয়া তোমাদেরকে ধৈর্যের সহিত পীরের খেদমত করিবার তৌফিক দান করুন। আমীন!





