Logo

লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থা এবং হকিকতগত অবস্থার ভেদপূর্ণ আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৬ আগস্ট, ২০২৬, ২০:০২
লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থা এবং হকিকতগত অবস্থার ভেদপূর্ণ আলোচনা
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আল্লাহর কালাম কুরআন মজীদের প্রকাশ্য অবস্থা, লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থা এবং হকিকতগত অবস্থা-এই তিন অবস্থার ভেদপূর্ণ আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

ইসলাম আল্লাহপাকের মনোনীত সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক, দোজাহানের সর্দার, হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)। মহান খোদাতায়ালা দীর্ঘ তেইশ (২৩) বছরে তাঁহার নিকট হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী গ্রন্থ পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেন। পবিত্র কুরআন আল্লাহপাকের কালাম বা বাণী। ইহা আল্লাহপাকের পছন্দনীয় ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থার মহাসনদ। পবিত্র এই কুরআনে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক তত্ত্ব নিহিত। শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের সমষ্টি এই কুরআন শরীফ। কুরআনপাকের সাত ভাগের এক ভাগ মাত্র জাহেরা শরীয়তের সহিত জড়িত। বাকী সমস্তই বাতেনী শরীয়ত বা তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের সহিত জড়িত। একদিকে ইহাতে যেমন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় সমস্যার সমাধান নিহিত, তেমনি ইহাতে পারলৌকিক, আধ্যাত্মিক বা পারমার্থিক সকল সমস্যার সমাধান বর্তমান। খোদাতায়ালা হইতে দুনিয়া পর্যন্ত পবিত্র কুরআন শরীফের তিনটি অবস্থা বর্তমান। যথাঃ

  • কুরআন পাকের প্রকাশ্য অবস্থা।

  • কুরআন পাকের লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থা।

  • বিজ্ঞাপন

  • কুরআন পাকের হকিকতগত অবস্থা।

  • প্রকাশ্য অবস্থাঃ

    কুরআন মজীদ সম্পর্কে আল্লাহ্পাক বলেন,

    বিজ্ঞাপন

    قَدْ جَاءَ كُمْ مِّنَ اللَّهِ نُوْرٌ وَ كِتُبٌ مُّبِيْنٍ

    অর্থাৎ- 'আল্লাহর পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নূর এবং স্পষ্ট এক কিতাব আসিয়াছে।' (সূরা মায়েদাঃ ১৫)

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, এই আয়াতপাকে উল্লিখিত 'নূর' শব্দ পবিত্র কুরআন মজীদের অবতরণ হিসেবে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহা কুরআন-পাকের প্রকাশ্য অবস্থার সহিত জড়িত। সমগ্র আরবজাতি যখন ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত, পাপের কাঁদায় নিপতিত, তখনই পবিত্র কুরআন শরীফ নূর হিসেবে অবতরণ করিয়া আরবজাতির জ্ঞানের অন্ধত্ব ও অন্ধকারকে দূরীভূত করিল।

    বিজ্ঞাপন

    কুরআন শরীফের অবতীর্ণকালীন সময়ে আরবজাতি, আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করতঃ দেব-দেবীর পূজা বা অর্চনায় লিপ্ত ছিল। মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি, কলহ-বিবাদ তাহাদের নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। সত্য কি, তাহারা জানিত না। আল্লাহ্ ও রাসূল (সাঃ) কে বা কি তাহারা বুঝিত না। তাহারা ছিল মিথ্যার অন্ধকারে, সত্য থেকে বহুদূরে। পবিত্র এই কুরআন শরীফের নূর বা আলো মানবজাতির মূর্খতা ও পাপের অন্ধকারকে বিতাড়িত করিয়া তাহাদেরকে সরল সঠিক পথের দিশা দিল। এই কারণেই পবিত্র কুরআন নূর হিসাবে পরিচিত। ইহা কুরআন শরীফের প্রাকশ্য অবস্থার নিদর্শন।

    লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থাঃ

    আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন শরীফ সম্পর্কে আরও বলেন,

    বিজ্ঞাপন

    بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌهُ فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظ

    অর্থাৎ- 'বরং ইহা লওহে মাহফুজে সুরক্ষিত কুরআন মজীদ।' (সূরা বুরূজঃ ২১-২২)

    লওহে মাহফুজ কি? লওহে মাহফুজ মাণিক্য সদৃশ একটি ফলক। ইহার দৈর্ঘ সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং প্রস্থ পৃথিবী হইতে আসমান পর্যন্ত বিস্তৃত। লওহে মাহফুজে রক্ষিত কুরআন শরীফকে আল্লাহ্র আদেশানুযায়ী ফেরেশতা সম্রাট হযরত জিব্রাইল (আঃ) ধীরে ধীরে তেইশ বছরে রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট আনয়ন করেন।

    বিজ্ঞাপন

    সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ড দুই ভাগে বিভক্ত। আলমে খালক বা স্থল জগত এবং আলমে আমর বা সুক্ষ্ণ জগত। এই স্থুল জগত ও সুক্ষ্ণ জগতের মাঝখানে আরশ অবস্থিত। লওহে মাহফুজ আরশের নিম্নে স্থুল জগতে অবস্থিত। লওহে মাহফুজে রক্ষিত কুরআন শরীফ হরফ, অক্ষর বা বাক্য সংযুক্ত সসীম অবস্থায় বর্তমান

    হকিকতগত অবস্থাঃ

    কুরআন পাকের উক্ত দুই অবস্থার ঊর্ধ্বে এক বিশেষ অবস্থা বর্তমান যাহা হকিকতে কুরআন নামে পরিচিত। হকিকতে কুরআনের এই অবস্থা ভাষা ও অক্ষর বিমুক্ত, অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য এক অবস্থা। আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাত অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য। জাত চিরস্থায়ী। জাতের ন্যায় সিফাতে হাকীকী চিরস্থায়ী। সিফাতে হাকীকী কি? আকরাবিয়াতের অধ্যায়ে যে আটটি বিশেষ সিফাত বর্তমান, ইহাদের সমষ্টিই সিফাতে হাকীকী। ইহারা হইল হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, ছামাওয়াত, বাসারাত, কালাম ও তাকবিন। জাতের ন্যায় সিফাতে হাকীকীও অনির্বচনীয় ও অবর্ণনীয়। সিফাতে কালাম হইতে উৎপন্ন পবিত্র কুরআন শরীফের অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য অবস্থাকে হকিকতে কুরআন বলা হয়। দায়েরায়ে হকিকতে কুরআন শান জগতে, হকিকতে এলাহিয়ার অধ্যায়ের অন্তর্গত। হকিকতে কুরআনের দায়েরাতে পবিত্র কুরআন শরীফ তকদীম ও তাখীর অর্থাৎ আরম্ভ ও শেষবিমুক্ত, ভাষাবিহীন ও অক্ষরশূন্য অবস্থায় বর্তমান। সেই অবর্ণনীয় ও ভাষামুক্ত কুরআনপাক ধীরে ধীরে শান, মহব্বত, কামালাত ও সিফাতের জগত, আকরাবিয়াত, বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত ভাষাবিমুক্ত অবস্থায় অবতরণ করিয়া স্কুল জগতের অন্তর্ভুক্ত লওহে মাহফুজে আসিয়া ভাষাযুক্ত অবস্থায় তথায় স্থিত হয়। সেখান হইতে হযরত জিব্রাইল (আঃ) ধীরে ধীরে রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট আনয়ন করেন। লওহে মাহফুজে আসিয়া স্থিত হওয়ার পূর্বে ইহা অবর্ণনীয় থাকে। কিন্তু লওহে মাহফুজে আসিয়া বর্ণনাযোগ্য ভাষার আকৃতিতে ইহা জমা হয়। লওহে মাহফুজে স্থিত কুরআন পাককে 'কালামে নাফসী' বলা হয় যাহা আল্লাহতায়ালার কথার ঠিক যথাযথ প্রকাশ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, টেলিভিশনের প্রচার কেন্দ্র হইতে খবর পাঠ করা হয়। কেন্দ্র হইতে প্রচারকৃত সংবাদ শত শত, হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত টেলিভিশনে শোনা যায়, খবর পাঠকের ছবিও দেখা যায়। কিন্তু প্রচার কেন্দ্র হইতে টেলিভিশন পর্যন্ত যে দূরত্ব ইহার মধ্যে সেই সংবাদ বা ছবি কিছুই খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আসলে প্রচারকৃত সেই সংবাদ টেলিভিশন যন্ত্র পর্যন্ত ভাষা ও আকৃতিমুক্তাবস্থায় ইথারের বাহনে ভাসিয়া আসে। তৎপর তাহা ভাষার আকৃতিতে শ্রুত হয়। তদ্রুপ পবিত্র কুরআন শরীফ বা আল্লাহর কালাম হকিকতে কুরআন হইতে ভাষামুক্ত অবস্থায় নিম্নদিকে আসিতে আসিতে লওহে মাহফুজে আসিয়া স্থিত হয়। তথা হইতে ইহা আর সরাসরি মাধ্যমবিহীন অবস্থায় এই স্কুল জগতে অবতরণ করিতে পারে না।

    বিজ্ঞাপন

    তোমরা শুনিয়াছ যে, আল্লাহপাক ওলীয়ে কামেলগণের সাথে কালাম বিনিময় করেন। কিন্তু কিভাবে? আসলে আল্লাহ্পাক যাহা বলিতে চান তাহা কামেলের সত্ত্বার উপরে নিক্ষেপ করেন। এই নিক্ষিপ্ত বাণী প্রথমে অবর্ণনীয়, অবোধগম্য ভাষামুক্ত অবস্থায় থাকে। তৎপর ইহা সেই কামেলের জ্ঞানের সম্মুখে তাহারই বোধগম্য ভাষার ছুরাতে প্রকাশিত হয়। ভাষার ছুরাতে প্রকাশিত এই বাণী আল্লাহতায়ালার কথার যথাযথ প্রকাশ। ইহাকেই কালামে নাফসী বলা হয়।

    হকিকতে কুরআনের জ্ঞান অর্জনের উপায়ঃ

    পবিত্র কুরআন মজীদের জ্ঞান পরিপূর্ণ অর্জন করিতে হইলে হকিকতে কুরআনের দায়েরা পর্যন্ত ছালেককে উন্নীত হইতে হইবে। হকিকতে কুরআনের দায়েরা কামালাতের অধ্যায়সমূহের ঊর্ধ্বে হকিকতে এলাহিয়ার অন্তর্গত এক ভেদপূর্ণ মাকাম। তরিকতের রাস্তায় লতিফা কালব হইতে ঊর্ধ্বদিকে যাত্রা শুরু করিলে ১৯/২০টি মাকাম পরে হকিকতে কুরআনের দায়েরা ছালেকের সম্মুখে উপস্থিত হয়। পথিমধ্যে প্রত্যেকটি মাকামে ছালেকের জ্ঞানের সম্মুখে পবিত্র কুরআন শরীফের কিছু না কিছু রহস্য বা ভেদ বা কোন না কোন আয়াতের অন্তর্নিহিত অর্থ উন্মোচিত হয়। এইভাবে আল্লাহ্র কালাম বা কুরআন শরীফের ভেদ সম্পূর্ণভাবে ছালেকের জ্ঞানের সামনে খুলিয়া যায় হকিকতে কুরআনের দায়েরাতে। কিন্তু হকিকতে কুরআনের মাকাম পর্যন্ত উরুজ করিবার উপায় কি? হকিকতে কুরআন পর্যন্ত পৌঁছাইতে হইলে সমস্ত প্রকার শিরক হইতে মুক্ত হইতে হইবে। শিরক চার প্রকার। যথাঃ শিরকে জলি, শিরকে খফি, শিরকে আফাকি ও শিরকে আনফুসী।

    বিজ্ঞাপন

    শিরকে জলি-

    প্রকাশ্য শিরককে শিরকে জলি বলে। যেমন, মূর্তি পূজা করা, দেব-দেবীর অর্চনা করা।

    শিরকে খফি-

    বিজ্ঞাপন

    নিজের প্রত্যেক কাজে 'আমি' শব্দ প্রয়োগ করা। যেমন আমি আমার ছেলেমেয়েকে খাওয়াই, তাহাদের শিক্ষা দান করি, প্রতিপালন করি। আমি দান করি, অন্যকে সাহায্য করি ইত্যাদি। ইহা এক ধরণের সূক্ষ্ম শির্ক যাহা শিরকে খফি নামে পরিচিত।

    শিরকে আফাকি-

    তরিকতে রাস্তায় বা খোদাপ্রাপ্তির পথে উরুজ ও ছায়ের করিবার সময় ছালেক নিজের বাহিরে (আফাকে) যে সমস্ত নূর দর্শন করে তাহাকে সে আল্লাহ্ জাতি নূর বলিয়া মনে করে এবং বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৌন্দর্যকে আল্লাহ্ সৌন্দর্য বলিয়া মনে করে। ইহাই শিরকে আফাকী।

    বিজ্ঞাপন

    শিরকে আনফুসী-

    খোদাপ্রাপ্তির পথে উরুজ ও ছায়ের করিবার সময় নিজের মধ্যে (আনফুসীতে) যে নূর দর্শন করে তাহাকে অনেক সময় ছালেক জাতি নূর বলিয়া মনে করে। ইহা শিকে আনফুসী।

    পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফের হকিকতে পৌঁছাইতে হইলে উল্লিখিত সমস্ত প্রকারের শির্ক হইতে নিজকে মুক্ত করিতে হইবে। এখানে উল্লেখ্য যে, নাক্সে আম্মারা এবং শয়তান- এই দুই অনিষ্টকারী সত্ত্বা ছালেককে নানাবিধ শিরকের ভিতর ডুবাইয়া রাখে। কাজেই সর্ব প্রথম খোদাতালাশী ব্যক্তির প্রয়োজন নাক্সে আম্মারা ও শয়তানের দাসত্ব মুক্ত হওয়া। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদী ব্যতীত উক্ত দুই শত্রুর ভয়াল থাবা হইতে বাঁচিবার অন্য কোন পথ নাই। কুরআনের বাণীতেই আল্লাহ্পাক বলেন,

    إِنَّ الشَّيْطَنَ لِلإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    অর্থাৎ- 'শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।' (সূরা ইউসুফঃ ৫)

    শয়তানের দুশমনি জাহেরী অবস্থায় যত না প্রকট তাহার চেয়ে অধিক প্রকট ও স্পষ্ট বাতেনীতে। শয়তানের দুশমনি, নাফসের শত্রুতা বুঝিবার বা ধরিবার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের বহির্ভূত। আর এই দুশমনদ্বয়ের হাত হইতে নিজেকে রক্ষা করিতে না পারিলে খোদাতায়ালাকে চেনা বা খোদাতায়ালার কালাম বা কুরআন শরীফের জ্ঞান অর্জন করা মোটেই সম্ভব নয়। কুরআন শরীফের প্রকাশ্য অবস্থা ভালভাবে গবেষণা করিলে কিছুসংখ্যক আয়াতের সাধারণ অর্থ বা বোঝাবুঝির জ্ঞান অর্জন করা যাইতে পারে মাত্র। কিন্তু এই অত্যল্প পরিমান জ্ঞান কুরআন শরীফের হকিকতগত ভেদপূর্ণ জ্ঞানের নিকট ধর্তব্য নহে। তাই আল্লাহতায়ালা বলিলেন, তোমরা যদি আমাকে পাইতে চাও, আমার কালাম যদি তোমরা বুঝিতে চাও তবে 'অছিলা' অন্বেষণ কর, 'ইয়া আইয়্যুহাল লাজিনা আমানুত্তাকুল্লাহা ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলা।' অর্থাৎ-'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাহাকে পাওয়ার জন্যে অছিলা অন্বেষণ কর।' সেই অছিলাই জামানার কামেল ওলী সকল। আল্লাহ্পাক পীরে কামেলদেরকে যে সমস্ত শক্তি প্রদান করেন-তাহার মধ্যে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ওলীয়ে কামেল এই তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর শৃংখলে নাক্সে আম্মারা এবং শয়তানকে অষ্টেপৃষ্টে বন্দী করিতে সক্ষম। তাই মাওলানা রূমী (রঃ) বলেন, তোমরা যদি নারুপী কালসাপের ছোবল হইতে বাঁচিতে চাও, তাহা হইলে নাহন্তা মোর্শেদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে মুরীদের বা ছালেকের দেহের লতিফাসমূহ জাগ্রত হয় এবং লতিফা সমূহে এসমে জাত জেকের জারী হয়। ঘুমে-শয়নে-স্বপনে, দন্ডায়মান-উপবিষ্ট-শায়িত তথা সর্বাবস্থায় এই জেকের চলিতে থাকে। সার্বক্ষণিক জেকের বা ইবাদত করিবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছালেক প্রাপ্ত হয়। ধীরে ধীরে দেহের সমস্ত লতিফা তথা মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত কোটি কোটি লতিফা জাগ্রত হয়। প্রত্যেক লতিফায় উত্থিত জেকেরের শব্দ ছালেক শুনিতে পায়। শুধু তাহাই নহে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রত্যেক রেণু-পরমাণু হইতে যে আল্লাহ্ নামের জেকের উৎপন্ন হইতেছে, তাহাও ছালেক শুনিতে পায়। ইহা দায়েরায়ে এমকানের অবস্থা। এই দায়েরাতে ছালেকের জ্ঞানের সম্মুখে পবিত্র কুরআন শরীফের কিছু কিছু আয়াতের মর্মার্থ বা অন্তর্নিহিত অর্থ প্রতিভাত হয়। যেমন আল্লাহপাক বলেন,

    يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ

    অর্থাৎ- 'আসমান ও জমিন এবং তন্মধ্যস্থিত যাহা কিছু আছে সবই আল্লাহর জেকেরে রত।' (সূরা জুমু'আঃ ১) আবার আল্লাহপাক বলেন,

    وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ

    অর্থাৎ-'আমি মানুষ ও জ্বিনকে ইবাদত ভিন্ন অন্য কোন কাজের জন্য সৃষ্টি করি নাই।' (সূরা জ্বারিয়াতঃ ৫৬) জাগ্রত লতিফার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক জেকের বা ইবাদত করিবার ক্ষমতাপ্রাপ্তির পরেই কেবল ছালেক ইহা বুঝিতে পারে। আবার অন্যত্র আল্লাহ্পাক বলেন,

    رِجَالٌ لا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَّ لَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ

    অর্থাৎ-'এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যাহাদিগকে ব্যবসা বাণিজ্য এমন কি ক্রয়-বিক্রয়ও আল্লাহ্ জেকের হইতে গাফেল করিতে পারে না।' (সূরা নূরঃ ৩৭)

    উল্লিখিত আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত অর্থ ছালেক 'দায়েরায়ে এমকানে' বুঝিতে সক্ষম হন। যাহারা তরিকতের রাস্তায় পদার্পণ করেন নাই, খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্ব হাছিলের চেষ্টা তদবির করেন নাই-তাহারা উল্লিখিত আয়াতের মর্মার্থ কিভাবে হৃদয়ঙ্গম করিবেন? তবে সাধারণ বোঝাবুঝির একটা জ্ঞান হয়ত অর্জন করিতে পারেন।

    যাহাই হোক, ইহার পর ছালেক পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে বেলায়েতে ছোগরা বা প্রতিবিম্বের দায়েরাতে উরুজ ও ছায়েব করে। এই দায়েরা আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্ব পতনের স্থান। এখানে নূরের পতন এত অধিক হয় যে ছালেকের মনে হয়, ছয় দিক বা দশ দিক হইতে প্রবল বেগে নূরের স্রোত প্রবাহিত হইতেছে, সে তখন তামাম সৃষ্টিকে এবং নিজেকেও সেই নূরে নিমজ্জিত দেখে। নিজেকে নূর হইতে তখন আর পৃথক করিতে পারে না। পবিত্র কুরআনের বাণী-

    وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ

    অর্থাৎ- বস্তুতঃ যেখানেই থাক, তিনি (আল্লাহতায়ালা) তোমাদের সংগে আছেন।' (সূরা হাদীদঃ ৪) -এই আয়াতের সঠিক ভাবার্থ ছালেক এই বেলায়েতে ছোগরার মাকামে বুঝিতে পারে।

    ইহার পর আল্লাহপাক ছালেককে বেলায়েতে কোবরা বা আসল বেলায়েতে উন্নীত করেন। যেখান হইতে আল্লাহপাকের সহিত ছালেকের প্রেমের খেলা শুরু হয়। আল্লাহ্পাক কালামুল্লাহ শরীফে ফরমান,

    نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ

    অর্থাৎ- 'আমি তোমাদের জান রগ হইতেও নিকটবর্তী।'

    এই আয়াতের মর্মার্থ ছালেক আকরাবিয়াতের মাকামে দেল এবং দেহের প্রতি তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে অনুভব করিতে পারে। এইভাবে ছালেক যতই ঊর্ধ্বদিকে অগ্রসর হয় ততই কুরআন শরীফের বিভিন্ন আয়াতের প্রকাশ্য এবং গুপ্ত অর্থ বুঝিতে সক্ষম হয়। পবিত্র আল কুরআন সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন,

    إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ فِي كِتَب مَّكْنُونِ لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ

    অর্থাৎ- 'নিশ্চয় কুরআন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন, যা আছে সুরক্ষিত ফলকে, পাক লোক ব্যতীত কেহ তাহা স্পর্শ করিবে না।' (সূরা ওয়াক্বি'আহঃ ৭৭-৭৯) এই আয়াতের মোটামুটি সাধারণ অর্থ এই যে- দেহের নাপাকি দূর করিয়া অর্থাৎ অজু করিয়া কিংবা প্রয়োজন হইলে গোসল করিয়া পবিত্র কুরআন শরীফ স্পর্শ করিতে হয়। নাপাক অবস্থায় কুরআন পাক স্পর্শ করা কঠিন গোনাহ্। ইহা উক্ত আয়াতের একেবারেই সাধারণ অর্থ যাহা শুধুমাত্র জাহেরা দেহের পবিত্রতার সহিত জড়িত। কিন্তু ইহার আরও একটি গভীর অর্থ রহিয়াছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, পাক কুরআনের গোপন ভেদ কেহ স্পর্শ করিতে পারেন না অর্থাৎ ইহার গোপন ভেদ কেহ বুঝিতে পারেন না, তবে যে ব্যক্তি মানবীয় দোষ ত্রুটি হইতে পাক হইতে পারিয়াছেন তিনিই কেবল ইহার গোপন ভেদ স্পর্শ করিতে পারেন অর্থাৎ ইহার হকিকত বুঝিতে পারেন। দেহ বা শরীর পবিত্র না থাকিলে যেমন কুরআন শরীফকে স্পর্শ করা যায় না, স্পর্শ করা উচিতও নয়। তেমনি নাফস এবং দেহের চারি উপাদান যতক্ষণ না পবিত্র হয় ততক্ষণ কেহই কুরআন পাকের হকিকত বা মর্মার্থ উপলব্ধি করিতে পারে না। নাফস পবিত্র হয় বেলায়েতে ছোগরার দায়েরাতেই। কিন্তু মানব দেহের উপাদান চতুষ্টয় পবিত্র হয় বেলায়েতে উলিয়া এবং কামালাতে নবুয়তের দায়েরাতে। কাজেই দেহ বা শরীর পরিপূর্ণভাবে পাক হয় দায়েমী তাজালীর প্রথম অংশ কামালাতে নবুয়তের দায়েরায়। তাই এখান হইতেই পবিত্র কুরআনের রহস্যের দ্বারসমূহ ছালেকের সম্মুখে দ্রুত উন্মোচিত হইতে থাকে।

    পবিত্র কুরআন শরীফে জাহেরা শরীয়ত সম্পর্কিত যত আদেশ-নিষেধ আসিয়াছে, পারলৌকিক যত খবরাখবর বর্ণিত হইয়াছে তথা মউত, করব, মিজান, পুলসুরাত, হাশর, বেহেশত-দোযখ ইত্যাদি সম্বন্ধীয় যত সংবাদ প্রদান করা হইয়াছে- সমুদয় অবস্থার জ্ঞান ছালেক এই কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় আপন দেহ বা ওজুদের মধ্যে অনুভব করে। ইহা প্রমাণের জন্য আর দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্পাকের জাত ও সিফাত সম্পর্কে যত সংবাদ প্রদত্ত হইয়াছে-তাহাও ছালেক এই দায়েরাতে স্পষ্ট বুঝিতে পারে। কিন্তু এখানেও পবিত্র কুরআন শরীফের বহু গুপ্ত ভেদ ছালেকের নিকট অজানা থাকিয়া যায়। ছালেক ইহার পর আরও ঊর্ধ্ব দিকে গমন করিয়া কামালাতে রেসালাতের দায়েরা অতিক্রম করিয়া কামালাতে উলুল আজমের দায়েরায় উন্নীত হয়। এই কামালাতে উলুল আজমের দায়েরাতে ছালেকের নিকট কুরআন শরীফের অধিকাংশ হরফে মোকাত্তায়াত'-এর গুপ্ত ভেদ বা রহস্য উন্মুক্ত হয়। ইহার পরেই হকিকতে এলাহিয়ার মুল্লুকের প্রথম ঘাঁটি হকিকতে কুরআন। এই দায়েরায়ে হকিকতে কুরআনে উন্নীত ছালেক পবিত্র কুরআনের পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে পারেন। রাসূলে করীম (সাঃ)-এর পূর্ণ অনুসরণ, উত্তরাধিকার এবং তোফায়েলের সূত্রে খুবই অল্পসংখ্যক লোক এই মাকামে উন্নীত হইতে সক্ষম হইয়াছেন। তবে যাহারা এখানে (এই দায়েরাতে) উন্নীত হইতে সক্ষম হইয়াছেন, তাহারা কুরআন পাকের যাবতীয় প্রকাশ্য এবং গুপ্ত বা অন্তর্নিহিত ভেদপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে সফল হইয়াছে।

    হকিকতে কুরআনের দায়েরায় উন্নীত ছালেকের মোরাকাবা ও হালসমূহঃ

    হকিকতে কুরআনের দায়েরায় মোরাকাবা করিতে হইলে এই নিয়তে বসিতে হইবে যে, 'হকিকতে কুরআনের দায়েরা হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পতিত হইতেছে।' এই দায়েরায় ফয়েযের নূর বর্ণনাতীত ও বেরংগী। এই দায়েরাতে উন্নীত ছালেকের মনে হয় যে, আল্লহপাক যেন আপন কুদরতের দ্বারা সেই মুহূর্তেই পবিত্র কুরআন শরীফ অবতীর্ণ বা নাযিল করিতেছেন। কুরআন শরীফের প্রতি অক্ষর, প্রতি বর্ণ হইতে অতি সূক্ষ্ণ নূর ফয়েজরূপে ছালেকের উপর অনবরত পতিত হইতে থাকে। কুরআন শরীফের প্রতি অক্ষর বা বর্ণের সহিত আল্লাহতায়ালার সিফাতি নূরের সম্পর্ক রহিয়াছে। এই দায়েরায় উন্নীত ছালেক কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করিতে থাকিলে বা কাহারও তেলাওয়াত শুনিতে থাকিলে তাহার এমন অবস্থা হয় যে, নিজেকে তথা নিজের সমস্ত শরীরকে হযরত মুসা (আঃ) এর নূর প্রজ্জ্বলিত বৃক্ষের মত দেখে। ধীরে ধীরে ছালেকের অবস্থা এমন হয় যে, সে নামাজে বা অন্য কোন সময় কুরআন শরীফের আয়াত পড়িলে, উহার প্রত্যেক শব্দ বা অক্ষর বা আয়াত হইতে পৃথক পৃথক ফয়েজান বিনা ধ্যানে তাহার উপর পড়িতে দেখে অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফের প্রতি বর্ণ, অক্ষর বা আয়াতের নূর কুরআনপাক পাঠ কালে ছালেকের উপর পড়িতে থাকে।

    কাজেই পবিত্র আল কুরআনের পরিপূর্ণ সঠিক জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে হকিকতে কুরআনের দায়েরা পর্যন্ত উরুজ ও ছায়ের করিতে হইবে। জাহেরা ওলামা পবিত্র কুরআন শরীফের প্রকাশ্য অবস্থা হইতে সাধারণ বোঝাবুঝির জ্ঞান আপন আপন বুদ্ধি নৈপুণ্য বা দক্ষতা অনুযায়ী অর্জন করিয়া থাকেন। ইহা মানবীয় জ্ঞান বুদ্ধির উপর নির্ভরশীল। যাহার বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা যত বেশী, তিনি আয়াতসমূহের সাধারণ অর্থ অধিক পরিচ্ছন্নভাবে বুঝিয়া থাকেন। তবে এই বুঝাবুঝি একেবারে সঠিক না হওয়ায় ওলামা সমাজের ভিতর ৭৩ ফেরকা পরিলক্ষিত হয়। জাহেরা ওলামা কুরআন শরীফের লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থা এবং হকিকতগত অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবগত।

    আল্লাহ্পাকের জাত চিরস্থায়ী। জাতের মত সিফাতও চিরস্থায়ী। সিফাতে কালাম পবিত্র কুরআন শরীফের উৎপত্তিস্থল বিধায় পবিত্র কুরআন শরীফও অক্ষয় এবং চিরস্থায়ী।

    আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে পবিত্র কুরআনের অক্ষর বা আয়াত ধ্বংসী এবং লওহে মাহফুজ স্কুল জগতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়-তাহাও ধ্বংসী। কিন্তু কুরআন শরীফের হকিকতগত অবস্থা যাহা অবর্ণনীয়, ভাষাবিহীন তকদীম ও তাখীর অর্থাৎ আরম্ভ ও শেষ বিমুক্ত তাহা চিরস্থায়ী বা কাদিম।

    পবেই বলা হইয়াছে, আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিব্রাইল (আঃ) লওহে আনয়ন করিতেন। ধীরে ধীরে দীর্ঘ তেইশ (২৩) বছরে এই কুরআন মাহফুজ হইতে কুরআনের আয়াতসমূহ রাসূলেপাক (সাঃ) এর নিকট আনয়ন সমাপ্ত হয়। এখানে অনেকের মনেই প্রশ্ন উদয় হইতে পারে যে, যেহেতু হযরত জিব্রাইল ফেরেশতা পবিত্র কুরআন শরীফ বহন করিয়া আনিয়াছেন, সেহেতু হযরত জিব্রাইল (আঃ) হয়ত পবিত্র কুরআন শরীফের হকিকতের জ্ঞানে জ্ঞানী। কিন্তু তাহা ঠিক নহে। হযরত জিব্রাইল (আঃ) লওহে মাহফুজস্থিত কুরআন শরীফ রাসূলে করীম (সাঃ) নিকট আনয়ন করিয়াছেন মাত্র কিন্তু কুরআনের হকিকতের মুল্লুকে বা শান রাজ্যে তিনি প্রবেশ করিতে পারেন নাই। শানরাজ্যে প্রবেশ করিতে পারেন নাই বিধায় পবিত্র কুরআন শরীফের অন্তর্নিহিত ভেদপূর্ণ জ্ঞানে তিনি অজ্ঞ ছিলেন।

    পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, পবিত্র কুরআনের হকিকতগত অবর্ণনীয় অবস্থা আরম্ভ ও শেষ বিমুক্ত অবস্থায় একসাথে লওহে মাহফুজে আসিয়া ভাষার সুরতে স্থিত হয় নাই। আল্লাহ্পাক যখন যে কয়েকটি আয়াত রাসূলে করীম (সাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন, সেইটুকু কুরআন অবর্ণনীয় ও ভাষামুক্ত অবস্থায় লওহে মাহফুজ পর্যন্ত আসিয়া তৎপর তথায় ভাষার সুরতে বা আকৃতিতে জমা হইয়াছে। হযরত জিব্রাইল (আঃ) লওহে মাহফুজে জমাকৃত বা স্থিত আয়াতসমূহ রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট খোদাতায়ালার নির্দেশে আনয়ন করিত। মাঝে মাঝে অতি আশ্চর্য ঘটনা ঘটিত। হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে যখন কুরআনপাকের কিছু আয়াত অবতীর্ণ হইত, হযরত নবী করীম (সাঃ) নাযিলকৃত আয়াতসমূহ পাঠান্তে আরও অগ্রের কিছু আয়াত পড়িয়া ফেলিতেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) বিস্ময়ে হতবাক হইতেন। আল্লাহপাক তাই রাসূলে করীম (সাঃ) কে জানাইয়া দিলেন, 'কুরআন অবতীর্ণ হইবার পূর্বে (তাড়াতাড়ি) অগ্রসর হইবেন না।'

    এখানে প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, রাসূলেপাক (সাঃ) কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে কিভাবে পড়িয়া যাইতেন। আসলে, পবিত্র কুরআন শরীফ লওহে মাহফুজে ও দুনিয়ায় আসিবার পূর্বেই রাসূলে পাক (সাঃ) হকিকতে কুরআনের তকদীম ও তাখীর অর্থাৎ আরম্ভ ও শেষ বিমুক্ত ও ভাষাশূন্য অবস্থার জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন। তাই হযরত জিব্রাইল (আঃ) যখন কিছু আয়াত ভাষায় ছুরাতে তাঁহার নিকট আনিতেন, তখনই কুরআন শরীফের পরবর্তী আয়াতসমূহ তাহার জ্ঞানের সম্মুখে ভাষায় ছুরাত ও আকৃতিতে প্রতিভাত হইত। তাই তিনি অধিক অগ্রসর হইয়া যাইতেন।

    তোমরা যদি পবিত্র আল কুরআনের পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে চাও, কুরআনপাকে নিহিত যাবতীয় রহস্য ও ভেদপূর্ণ জ্ঞানের দ্বার যদি উন্মোচন করিতে চাও, তবে হকিকতে কুরআনের দায়েরায় উরুজ ও ছায়েরকারী, কুরআনের যাবতীয় ভেদ ও রহস্যের জ্ঞানে জ্ঞানী হযরত খাজাবাবা শাহসুফী এনায়েতপুরী (কঃ) সাহেবের রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধর। তাহা হইলে তোমরা নাফসে আম্মারার দাসত্বের বন্ধনমুক্ত হইতে পারিবে, যাবতীয় শির্ক অর্থাৎ শিরকে জলি, শিরকে খফি, শিরকে আফাকি ও শিরকে আনফুসীকে দেল হইতে ঝাড়িয়া ফেলিয়া হকিকতে কুরআনের দায়েরা পর্যন্ত উন্নীত হইয়া পবিত্র কুরআন শরীফের ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করিতে পারিবে। যাহারা হকিকতে কুরআনের দায়েরায় পৌঁছাইতে সক্ষম হইয়াছেন, তাহারা কুরআন শরীফের এমনি ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন, যাহা সাধারণ ওলীদেরও জ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাজকেরাতুল আউলিয়া নামক পুস্তকের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করিতেছিঃ

    হযরত আবুল ফযল হাসান সারাখসী (রঃ) ছাহেব খ্যাতনামা ওলীয়ে কামেল ছিলেন। তিনি সারাখস্ নামক এলাকাতে তরিকা প্রচার করিতেন। হযরত শেখ আবু সাঈদ (রঃ) ছাহেব তাঁহার একজন যোগ্য মুরীদ ছিলেন। একদা হযরত আবু সাঈদ (রঃ) ছাহেব তাহার পীরের সহিত সাক্ষাত করিবার জন্য পীরের খানকায় উপস্থিত হইলে সেদিন তাহার পীর হযরত আবুল ফযল হাসান (রঃ) ছাহেব মুরীদকে বলিলেন, "বাবা, আবু সাঈদ! আজ রাত্রিতে তুমি আমার নিকট থাক। কেননা, রাত্রির অন্ধকার পটেই মারেফাতের গোপন রহস্যাবলী প্রকাশ পাইয়া থাকে।” রাত্রি হইলে তিনি আমাকে আপন কক্ষে আহবানপূর্বক বলিলেন, "বাবা, পবিত্র কুরআন শরীফের একটি আয়াত তেলাওয়াত কর। আমি উহার তাঙ্গীর করিব। আমি তেলাওয়াত করিলাম,

    يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ

    অর্থাৎ- 'তিনি তাঁহাদিগকে ভালবাসেন, তাহারাও তাঁহাকে ভালবাসেন।' (সূরা মায়েদাঃ ৫৪)

    হযরত পীর কেবলাজান এই আয়াতের তাফসীর করিতে শুরু করিলেন তিনি পবিত্র আয়াতটি ব্যাখ্যা করিতেছেন আর আমি গভীর মনোযোগের সহিত শ্রবণ করিতেছি। অবশেষে ভোরের আযানের সুমধুর ধ্বনি ভাসিয়া আসিল। পীর ছাহেব আফসোস করিয়া বলিলেন, 'আহা, রাত্রি শেষ হইয়া গেল কিন্তু আমাদের কথা এখনও সমাপ্ত হইল না। রাত্রির কি অপরাধ, আমাদের কথাই তো ছিল অতি লম্বা।' আমি হিসাব করিয়া দেখিলাম, 'মধ্যরাত্রি থেকে আযানের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত এই একটি মাত্র আয়াতের তিনি সাতশত (৭০০) রকমের তাফসীর করিলেন। প্রত্যেকটি তাফসীরই ছিল পৃথক পৃথক। এক অর্থের সহিত অন্য অর্থের কোন সামঞ্জস্য ছিল না। আমি অবাক হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, জ্ঞানের এ কেমন ব্যাপকতা।'

    এতক্ষণ তোমাদেরকে দায়েরায়ে হকিকতে কুরআনের উপর কিছু বলা হইল। আসলে, হকিকতের দায়েরাই হউক, আর শান বা মহব্বত জগতের দায়েরাই হউক, সমস্তই ত্বয় করিবার একটাই উদ্দেশ্য-তাহা হইল খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা রেজামন্দি অর্জন। খোদাতায়ালার নৈকট্য বা সান্নিধ্য অর্জন হইল মূখ্য উদ্দেশ্য।

    কম খুরদান বা অল্প আহারের গুরুত্বঃ

    খোদাপ্রাপ্তির এই রাস্তায় ওলীয়ে কামেলসকল মুরীদানদের প্রাথমিক স্তরে যে সকল আমলের নির্দেশ দেন-তাহা মূলতঃ কম খুরদান, কম গুফতান, কম খুফতান অর্থাৎ কম খাওয়া, কম ঘুম পারা এবং কম কথা বলা। ইহাদের মধ্যে খাদ্য কম গ্রহণ করিবার রেয়াযতের মূল্য সবচেয়ে বেশী। তোমরা জান যে, তোমাদের দেহ অভ্যন্তরে শয়তানের পক্ষ থেকে এক সিপাহসালার বর্তমান যাহা নাক্সে আম্মারা নামে পরিচিত। কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্য্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা, বাসনা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি কুরিপুসমূহ নাফসে আম্মারার সৈন্যসামন্ত। এই সকল কু-রিপুগুলি তোমাদেরকে গ্রাস করিয়া রাখিয়াছে। ইহাদের ত্রাসনে তোমরা অষ্টেপৃষ্ঠে বন্দী। এই নাক্সে আম্মারার শৃংখল যদি ছিন্ন করিতে না পার, তবে খোদাপ্রাপ্তির আশা অনর্থক।

    তোমরা যদি নাক্সে আম্মরার করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাইতে চাও, আম্মারাকে জ্বালাইয়া ফেল। তাহা হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব লাভ করিতে তবে ক্ষুধার তলোয়ার হাতে নাও, ক্ষুধার আগুনে সৈন্যসামন্তসহ নাফসে পারিবে। একমাত্র ক্ষুধার দাহন-ই নাফসে আম্মারার হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিতে সক্ষম। মহান খোদাতায়ালা নাফক্সকে সৃষ্টি করিবার পরে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কে?' নাফস উত্তর দিল, 'আমি আমি, তুমি তুমি।' আল্লাহপাক নাফসকে এক হাজার বছর দোযখের অগ্নিতে পোড়াইয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কে, আর আমি কে?' নাফক্স এইবারও আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব অস্বীকার করিল। পুনরায় নাফসকে আরও এক হাজার বছর দোযখের অগ্নিতে পুড়াইয়া আল্লাহপাক আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কে, আর আমি কে?' নাফস এবারও আল্লাহ্ প্রভুত্ব অস্বীকার করিল। তৎপর আল্লাহপাক এক হাজার বছর অনাহারে রাখিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কে, আর আমি কে?' এইবার নাক্স বলিল, 'হে খোদা! 'বেশখ, তুমি আমার প্রভু এবং আমি তোমার দাস।"

    কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তাহা হইলে কম খাদ্য গ্রহণের রেয়াযত অবলম্বন কর। দেখ, রাসূলে পাক (সাঃ) আজীবন অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করিতেন। সাতদিন পর পর যৎকিঞ্চিত খাবার খাইতেন। পেটেতে পাথর বাঁধিয়া রাখিতেন। অথচ যাহাকে সৃষ্টি না করিলে আল্লাহ্পাক অপরাপর কিছুই সৃষ্টি করিতেন না। আল্লাহ্পাক বলেন,

    لَوْلاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ

    অর্থাৎ-'(হে নবী!) যদি তোমাকে সৃষ্টি না করিতাম তাহা হইলে আসমান জমিন কিছুই সৃষ্টি করিতাম না।'

    কাজেই যাহাকে সৃষ্টি না করিলে ধন-সম্পদ, ঐশ্বর্য, বিভব, বিভূতি কিছুই সৃষ্টি হইত না, সেই রাসূলে পাক (সাঃ) আজীবন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট করিলেন। তিনি যদি চাইতেন, আল্লাহ্পাক বেহেশত থেকে তাহার জন্য খাবার প্রেরণ করিতেন। তিনি যদি মনে মনে শুধু ইচ্ছা করিতেন, তাহা হইলে জমিন তাহার বক্ষে লুক্কায়িত সকল খনিজ সম্পদ তাহার কদমে হাজির করিতেন। কিন্তু ক্ষুধার দাহনই যেন তাহার প্রয়োজন ছিল। কারণ একমাত্র ক্ষুধার বেড়ীতেই নাক্সকে বন্দী করা সম্ভব; অন্য কোন পথ নাই। রাসুলে পাক (সাঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া সমস্ত ওলীয়ে কামেল আজীবন ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করিয়াছেন। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেন, "তোমরা এসরাজকে জিজ্ঞাসা কর, তোমার সুর এত মধুর কেন? এসরাজ জবাবে বলিবে, 'আমার পেট খালী।' তোমরা সারিন্দাকে জিজ্ঞাসা কর, বেহালাকে জিজ্ঞাসা কর যে, তোমরা এমন মধুর ও মনোহরী সুর কোথায় পাইলে? জবাবে বলিবে, 'আমাদের পেট শূন্য বা খালী। তাই আমাদের সুর এত মধুর।'

    কাজেই, 'হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি খোদা প্রেমের বাজনা বাজাইতে চাও, আল্লাহপ্রেমের সুমধুর সুরের মূর্ছনা যদি তোমরা তুলিতে চাও, তবে বেহালার মত পেটকে খালী বা শূন্য রাখ। হযরত মাওলানা কর্মী (রঃ) ছাহেব তাহার পীরের নির্দেশে চল্লিশ দিন করিয়া এক একটি রোজা রাখিতেন। চল্লিশ দিন পর পর তিনটি করিয়া যবের রুটি দিয়া ইফতার করিতেন। খোদাপ্রাপ্তির কি কঠিন রেয়াযতই না তিনি করিয়াছেন।

    অধিক খাদ্য গ্রহণে রিপুসমূহ সতেজ হয়। তখন বিভিন্ন কু-কর্মে তোমাদেরকে প্ররোচনা দেয়। তোমরা খেয়াল করিলে দেখিবে, রমজান মাসের রোজা শুরু হওয়ার পূর্বে তোমাদের নাক্স তোমাদেরকে রোজা পরিত্যাগ করিবার জন্য নানাবিধ ওয়াসওয়াসা দেয়। নাক্স বলে, 'তোমার শরীর ভাল না, রোজা রাখিলে তোমার শরীর খারাপ হইবে, পেটের গ্যাষ্ট্রিকের ব্যাথা বৃদ্ধি পাইবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তোমরা যখন রোজা রাখা শুরু কর, নাক্স তখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয় এবং তাহার কু-মন্ত্রণা প্রদান বন্ধ হয়। তাই রমজানের মাত্র ত্রিশ দিনের রোজাতেই আল্লাহ্ যে কত খুশি হন তা বর্ণনাতীত। আল্লাহ্পাক বলেন,

    إِنَّهُ لِي وَ أَنَا أَجْزِي بِهِ

    অর্থাৎ- 'রোজা আমারই জন্য এবং আমিই উহার প্রতিফল দান করিব।' (মেশকাত শরীফ)

    কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের আশা রাখ, তাহা হইলে অল্প আহারের অভ্যাস কর। আমার পীর কেবলাজান আমাকে অর্ধচামচ ভাত, তৎসঙ্গে অতি অল্প পরিমাণ তরকারি খাইতে দিতেন। কখনও দিনে একবার, কখনোও বা দিনে দুইবার। কিছুদিন পর আমাকে বলিলেন, 'আটদিন অন্তর আহার করিবে। তোমাকে দেখিয়া লোকে হাসিবে। কিন্তু কাহাকেও কিছু বলিতে পারিবে না। কাহারও নিকট কিছু চাইতে পারিবে না।' পীরের আদেশ যথাযথ পালন করিতাম। পীর কেবলাজান তাই দয়া করিয়া কবুল করিলেন। এই আটরশীতে আসিবার পরও পাঁচ দিন অন্তর অন্তর এক বেলা করিয়া আহার করিতাম। এমনি করিয়া আমার দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল। হঠাৎ একদিন একটি টেলিগ্রাম আসিল। টেলিগ্রাম হাতে লইয়া পড়িতেই আমার হৃদয় কাঁপিয়া উঠিল। পীর কেবলাজান আর দুনিয়াতে নাই। তিনি দারুল বাকায় তসরিফ লইয়াছেন। পীর কেবলাজানের বিরহ জ্বালা আমার নিকট অসহ্য মনে হইল। কেবলাজানের নিকটে যাওয়ার জন্য মন অস্থির হইয়া উঠিল। আমি খাওয়া-দাওয়া ছাড়িয়া দিলাম। একটানা বিয়াল্লিশ (৪২) দিন খাদ্য গ্রহণ করি নাই। বিয়াল্লিশতম দিনে আমি এনায়েতপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। আমার নৌযান যখন ভূবেনিশ্বর নদীর উপর দিয়া চলিতেছিল, এমন সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখি, আমার পীর কেবলাজান আমাকে বলিতেছেন, "বাবা, তুমি না খাইয়া মারা যাইবে, এই জন্য তো তোমাকে আমি রাখিয়া আসি নাই। তোমার হাতে আমার অনেক কাজ রাখিয়া আসিয়াছি।” তৎপর আমার দেহের উপর একটা প্রচন্ড চাপ দিলেন এবং আরও কিছু কাজ তিনি আমার দেহের উপর করিলেন।

    আমার পীর কেবলাজানও অত্যন্ত কম আহার করিতেন। তিনি এক অজুতে তিনদিন পর্যন্ত নামাজ পড়িতেন। তিনদিন অন্তর পুনরায় অজু করিতেন। প্রতি সাত/আটদিন পর পর বাহ্যে যাইতেন

    পেট খালি রখিবার উপকার বহুমুখী। ইহাতে--

    ☆ দুনিয়ার মহব্বত দূর হয়,

    ☆নাফসেট দাসত্বের শৃংখলমুক্ত হওয়া যায়,

    ☆ আল্লাহ্-রাসূলের মহব্বত দেলে পয়দা হয়।

    ☆ তদুপরি ইহাতে বিরহের বাজনাও বাজে।

    মহনবাঁশীর করুণ সুর মানুষের অন্তরের অন্তস্থল পর্যন্ত পৌঁছায়। সর্প পর্যন্ত মোহনবাঁশীর সুর মূর্ছনায় ছুটিয়া আসে। মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলেন, 'তোমরা মহনবাঁশীকে জিজ্ঞাসা কর, তোমার সুর এত করুণ কেন, কিসের এত শোক তোমার?' মহন বাঁশী বলিবে, 'আমি বাঁশবনে ছিলাম। আমাকে সেখান হইতে কাটিয়া আনিয়া ঘাত-প্রতিঘাতে ছিদ্র করিয়া মহন বাঁশী তৈরী করা হয়। আজ আমার ভিতর হইতে যে করুণ সুর উত্থিত হইতেছে, তাহা আমার মূল বাঁশবনে ফিরিয়া যাইবার ক্রন্দন ও আকুলতা বই কিছু নয়।' তোমরা যদি পেট খালি রাখিবার অভ্যাস করিতে পার তাহা হইলে তোমরাও তোমাদের মূল আবাসস্থল আরশের উপরে ফিরিয়া যাইবার জন্য অস্থির হইবে, পাগল হইবে কাজেই তোমরা যদি খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্ব হাছিল করিতে চাও তবে ক্ষুধার তলোয়ারে কাম-ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ-মাৎসর্য্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা-বাসনা ইত্যাদি কু-রিপুগুলোকে কাতেল কর। ইহাই তোমাদের প্রধান কর্তব্য।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD