এলমে হুছুলী, এলমে হুজুরী ও মাবদায়ে তাইয়্যুন সম্পর্কে আলোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘জাত ও সিফাত’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ "সেফাতে হাকীকী" প্রসংগে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। ইহা ছাড়াও নসিহতের এই অংশে আছে এলমে হুছুলী, এলমে হুজুরী ও মাবদায়ে তাইয়্যুন বা উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
হাদীস শরীফে প্রকাশ;
كَانَ اللَّهُ وَ لَمْ يَكُنْ مَّعَهُ شَيْءٌ
অর্থাৎ-'আল্লাহই ছিলেন এবং তাহার সহিত অন্য কিছুই ছিল না।' হাদীসে কুদছীতে প্রকাশ, আল্লাহপাক বলেন,
বিজ্ঞাপন
كُنْتُ كَنزاً مَخْفيًا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ الْخَلْقَ لأَعْرَفَ
অর্থাৎ-'আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার স্বরূপ ছিলাম, আমার প্রীতি ও আসক্তি জন্মিল যে আমি পরিচিত হই; তাই আমি সৃষ্ট সৃজন করিলাম।'
উল্লিখিত হাদীসের বাণী দুইটি গবেষণা করিলে বুঝা যায় যে, এই বিশ্বব্রাহ্মান্ড সৃষ্টির পূর্বে কেবলমাত্র আল্লাহপাকই ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
'আল্লাহ' বলিতে কি বুঝা যায়? হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় "মাআরিফে লাদুন্নিয়া" নামক পুস্তকে বলেন, আল্লাহ শব্দের অর্থই হইল জাত ও সিফাতের (সত্তা ও গুণাবলীর) সম্মিলিত রূপ; কেবলমাত্র একক জাত (সত্তা) নয়। সুতরাং আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাত ও তদীয় গুণাবলী ব্যতীত অন্য কোন বস্তুই অস্তিত্ববান ছিল না। অবশ্য দায়েরায়ে জেলাল বা আল্লাহতায়ালার গুণাবলীর প্রতিবিম্বসমূহও অনাদি বৃত্তের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আল্লাহতায়ালার জাতকে কেন্দ্র করিয়া আটটি হাকীকী সিফাত অবর্ণনীয়ভাবে বর্তমান। এই সিফাতগুলি হইলঃ হায়াত (জীবন), এলেম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা), এরাদত (ইচ্ছাশক্তি), সামাওয়াত (শ্রবণশক্তি), বাছারত (দর্শন শক্তি), কালাম (কথন শক্তি) ও তাকবিন (সৃজন শক্তি)। এই সিফাতগুলোকে সিফাতে হাকীকী বা সিফাতে ছামানিয়া বলা হয়। এই আটটি সিফাতের দায়েরাকে আকরাবিয়াতও বলা হয়। হাকীকী সিফাত ব্যতীত আল্লাহপাকের আরও অসংখ্য সিফাত আছে, যাহা সিফাতে এজাফিয়া নামে পরিচিত। সিফাতে এজাফিয়া মুলতঃ সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব। ইহা সম্বন্ধযুক্ত গুণাবলী হিসেবেও পরিচিত। কারণ ইহা সৃষ্টিজগতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন পয়দা করা, আহার দেওয়া, প্রতিপালন করা, দয়া করা ইত্যাদি।
সুতরাং অবশ্যম্ভাবী জগৎ বা চিরস্থায়ী জগতে বা বাস্তব জগতে আছে অবশ্যম্ভাবী জাত, সিফাতে হাকীকী ও সিফাতে এজাফিয়া। পবিত্র জাত যেমন পৃথক অস্তিত্বধারী, তেমনি হাকীকী সিফাতসমূহও পৃথক পৃথক ভাবে অস্তিত্বধারী। হাকীকী সিফাতসমূহ জাতকে কেন্দ্র করিয়া বর্তমান। হাকীকী সিফাত ও জাতের মাঝখানে আরও দুইটি অবস্থা বা স্তর বর্তমান, যথা শান ও ইতেবার। হাকীকী সিফাতের ঊর্ধ্বে শান এবং শানের ঊর্ধ্বে ইতেবার। তবে শান ও ইতেবারের পৃথক কোন অস্তিত্ব নাই, যেমন সিফাতে হাকীকীর আছে। সুতরাং পবিত্র জাত, ইতেবার, শান ও সিফাত লইয়া যে জগৎ-তাহাই বাস্তব বা চিরস্থায়ী বা অনাদি বা অবশ্যম্ভাবী জগৎ বলিয়া পরিচিত। বিশ্ব ব্রাহ্মান্ড সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে উল্লিখিত অবশ্যম্ভাবী জগতই বর্তমান ছিল। তৎপর আল্লহপাক সৃষ্টি করিলেন বিশ্ব ব্রাহ্মান্ড বা সৃষ্টিজগৎ-যাহা অস্থায়ী জগৎ বা হাদেছ বা নবোৎপন্ন বলিয়া পরিগণিত। অবশ্যম্ভাবী বৃত্তের মধ্যে আল্লাহতায়ালার জাত, ইতেবার, শয়ুনাত, সিফাত, সিফাতস্থিত আইয়ানে ছাবেতা বা সুদৃঢ়তত্ত্ব অর্থাৎ সৃষ্টজগতের আকার ও প্রকার বিহীন হকিকত যাহা সিফাতের মধ্যে বর্তমান, তাহা সবই চিরস্থায়ী, অনাদি, অনুৎপন্ন, অনন্ত ও পরিবর্তন রহিত। কিন্তু সম্ভাব্য জগৎ বা দায়েরায়ে এমকান বা সৃষ্ট জগৎ ইহার বিপরীত। অর্থাৎ ইহার আদি আছে, অন্ত আছে, ইহা অস্থায়ী ও ধ্বংসী।
বিজ্ঞাপন
এই বিশ্ব ব্রাহ্মান্ড বা সৃষ্ট জগৎ কিভাবে সৃষ্ট হইল? হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "সিফাতে হাকীকীর প্রত্যেকটি সিফাতের মধ্যে দুইটি অবস্থা বর্তমান। যেমন সিফাতে এলেমের ভিতর জাতপাকের হাকীকী নিখুঁত জ্ঞান ও সৃষ্ট অর্থাৎ মানুষের অসম্পূর্ণ জ্ঞান ও কুদরতের মধ্যে আছে জাতপাকের নিখুঁত ক্ষমতা ও মানুষের অসম্পূর্ণ ক্ষমতা বরং অক্ষমতা বর্তমান ইত্যাদি। এই পারস্পরিক বৈপরীত্যভাব আল্লাহতায়ালার সিফাতের মধ্যে বর্তমান। এই পার্থক্যের বিপরীত ভাবটির (অক্ষমতার) প্রতিবিম্বই প্রকাশিত হইতেছে এবং এই প্রতিবিম্বের রূপটি হাকীকী সিফাতের মধ্যস্থিত বিপরীত খুঁতবিশিষ্ট অবস্থার নিরাকার রূপের দর্পণ বা প্রকাশ এবং বিপরীত গুণবিশিষ্ট সিফাতগুলোর দর্পণ হইলেন স্বয়ং আল্লাহপাক নিজে উহাদের প্রকাশক হিসেবে।” অর্থাৎ সিফাতস্থিত বিপরীত খুঁতবিশিষ্ট নিরাকার হাকীকী অবস্থা হইল সৃষ্টির হকিকত। সেই হকিকতকে উদ্দেশ্য করিয়াই আল্লাহপাক 'কুন' আদেশ করিয়াছিলেন। ফলে সিফাতস্থিত নিরাকার হকিকতসমূহ প্রতিবিম্বিত হইল, রূপসহ প্রকাশ পাইল। ইহাই আদম-যাহা সিফাতস্থিত খুঁত বিশিষ্ট নিরাকার হাকীকী অবস্থার প্রতিবিম্ব। তেমনি হাকীকী সিফাতস্থিত বিপরীত নিখুঁত গুণাবলীর প্রতিবিম্ব হইল আল্লাহতায়ালার 'অজুদ'। সুতরাং অজুদ হইল শুভসমষ্টির প্রকাশ এবং আদম হইল যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রকাশ। অজুদ এবং আদম-উভয়ই সিফাতে হাকীকী বা আকরাবিয়াতের নিম্নে, বেলায়েতে ছোগরার শীর্ষে অবস্থিত।
আল্লাহর কুন আদেশে সিফাতস্থিত খুঁতবিশিষ্ট হকিকতসমূহ রূপসহ প্রকাশ পায়; যাহা আদম বলিয়া পরিচিত। এই আদম যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির উৎপত্তিস্থল কিন্তু অজুদ প্রত্যেক ভাল ও মর্যাদার উৎপত্তিস্থল। মৃত্যু, মুর্খতা, অন্ধত্ব, বধিরতা, মুকত্ব, স্বার্থপরতা, নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি যত রকমের খারাপ বা ত্রুটি বিচ্যুতি-ইহাদের সমষ্টিগত উৎপত্তিস্থল এই আদম। অন্যদিকে যাবতীয় ভাল বা কল্যাণের উৎপত্তিস্থল হইল অজুদ। চিরস্থায়ীত্ব, জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছাশক্তি, শ্রবণশক্তি, দর্শনশক্তি, কথনশক্তি, সৃজন শক্তি, দয়া, ক্ষমা, মহব্বত, প্রেম, ভালবাসা, স্নেহ ইত্যাদি যত রকমের গুণাবলী বা পূর্ণতা আছে সকলেরই উৎপত্তিস্থল হইল অজুদ। অজুদ আল্লাহর জন্য, আর আদম সৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট। কেননা সমস্ত মংগল আল্লাহর এবং সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি সৃষ্টির জন্য নির্ধারিত।
আল্লাহপাক সিফাতস্থিত নিখুঁত গুণাবলীর প্রতিবিম্ব বা অজুদের ছায়া আদমের উপর ফেলিলেন। ফলে আদমের মধ্যেও শুভসমষ্টি আসিয়া গেল। সুতরাং সৃষ্টের মধ্যে তথা মানুষের মধ্যে যে সকল গুণাবলী দেখা যায় তাহা মানুষের নয়, ইহা আল্লাহপাকের। মানুষের জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছাশক্তি, শ্রবণশক্তি, দর্শনশক্তি, কথন, সৃজন যাহা কিছু আছে, তাহা সমুদয়ই হাকীকী সিফাতস্থিত নিখুঁত গুণাবলীর প্রতিবিম্ব যাহা অজুদের আয়না হইয়া মানুষের বা আদমের মধ্যে আসিয়াছে।
বিজ্ঞাপন
সুতরাং মানুষের মধ্যে যাহা কিছু মংগল, গুণ বা ক্ষমতা দৃষ্ট হয় তাহা আল্লাহপাকের নিকট হইতে ধার করা। অন্যকথায় আল্লাহপাক আমানত স্বরূপ মানুষকে উল্লিখিত গুণাবলী সমূহ প্রদান করিয়াছেন। মানুষের নিজের কোন শুভ গুণ নাই-না আছে প্রকাশ জগতে, না আছে জাত জগতে। তাই আল্লাহপাক বলেন, "সমস্ত মংগল আল্লাহ হইতে ও সমস্ত অমংগল নিজ নাফস হইতে আগত।" সুতরাং সমগ্র সৃষ্টজগতেই কোন শুভ নাই, কোন আলো বা কোন মংগল নাই। সৃষ্টি জগতের উৎস বা আদম নিজেই অন্ধকার। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "আদামাত হইল সমস্ত জুলমাত বা অন্ধকারের বড় অন্ধকার।" কাজেই সৃষ্টজগতে যাহা কিছু ভাল পরিলক্ষিত হয়, তাহা আল্লাহপাকের। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলিলেন,
اللَّهُ نُورُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ
অর্থাৎ-'আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর।' (সূরা নূরঃ ৩৫)
বিজ্ঞাপন
পবিত্র জাত হইতে এই নিম্নতম জড় জগৎ পর্যন্ত যাহা বুঝা যায়, তাহা মূলতঃ দুইভাগে বিভক্ত। যথাঃ অবশ্যম্ভাবী জগৎ-যাহা অনাদি, চিরস্থায়ী বা বাস্তব জগৎ এবং সম্ভাব্য জগৎ-যাহা আদিসম্ভূত, অস্থায়ী বা বিনাশী জগৎ।
অর্থাৎ একটি স্রষ্টা জগৎ। অপরটি সৃষ্টিজগৎ। স্রষ্টাজগতের মধ্যে আছে পবিত্র জাত, ইতেবার, শয়ুনাত, সিফাতে হাকীকী ও সিফাতে এজাফিয়া এবং সৃষ্টি জগৎ বলিতে দায়েরায়ে এমকান বা বিশ্ব ব্রাহ্মান্ড। এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু হইল সিফাতে হাকীকী-যাহা চিরস্থায়ী ও অবিনাশী জগতের অন্তর্ভুক্ত। এই সিফাতে হাকীকী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের পথ কি?
জ্ঞান দুই প্রকার যথাঃ
বিজ্ঞাপন
• এলমে হুছুলী বা সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান এবং
• এলমে হুজুরী বা খোদাতত্ত্বজ্ঞান।
এলমে হুন্ডুলী হইল কালব ও মস্তিস্কের যোগাযোগে তাফাকুরের ভিত্তিতে অর্জিত জ্ঞান। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,
বিজ্ঞাপন
تَفَكَّرُ سَاعَةٍ خَيْرٌ مِنْ عِبَادَةٍ سِتِّينَ سَنَةً
অর্থাৎ-'এক মুহূর্তের চিন্তা বা গবেষণা বা তাফাকুর ষাট বছরের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।'
বিজ্ঞান বা সাইন্স এলমে হুছুলীর অন্তর্গত। বিজ্ঞানের যাহা অবদান তথা রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন, কমপিউটার, টেলেক্স, ফ্যাক্স, উড়োজাহাজ ইত্যাদি সবই এলমে হুছুলীর মাধ্যমে আবিষ্কৃত। যে কোন বিষয় সম্পর্কে জানিতে হইলে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
যথাঃ
• যিনি জ্ঞান অর্জন করিবেন অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনকারী বা আলেম।
• যে বিষয় বা যাহা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে অর্থাৎ মালুম এবং
বিজ্ঞাপন
• যাহা দ্বারা জানিতে হইবে অর্থাৎ এলেম। অর্থাৎ কোন কিছু জানা বা জ্ঞাত হওয়ার জন্য তিনটি জিনিসের প্রয়োজন, যথাঃ-আলেম, মালুম ও এলেম।
কোন কিছু জানা বা জ্ঞাত হওয়ার যে পর্যায়ে উল্লিখিত তিনটি জিনিসের প্রয়োজন হয় অর্থাৎ আলেম, মালুম ও এলেম-তাহাই এলমে হুছুলীর অধ্যায়। কিন্তু যেখানে এলেম ও আলেম নাই, আছে শুধু মালুম অর্থাৎ যিনি জ্ঞান অর্জন করিবেন ও যে জ্ঞান দ্বারা বুঝিবেন-এই দুই অবস্থায় চলিয়া যাইবে, থাকিবে শুধু মালুম; সেই ক্ষেত্রের যে জ্ঞান- তাহা হইল এলমে হুজুরী। এলমে হুজুরীর বিশ্লেষণ একটু পরে করা হইবে। প্রথমে এলমে হুছুলী সম্পর্কেই বলা হইতেছে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়- তাহা এলমে হুছুলীর অন্তর্গত। বিজ্ঞান বা সাইন্স এলমে হুছুলীর অন্তর্গত। যেমন টেলিফোন, এলমে হুছুলীর অবদান; ইহার সাহায্যে পৃথিবীর অপর প্রান্তের খবর এই প্রান্তে বসিয়া লইতে পারিতেছি। কিন্তু দুই ফুট মাটির নীচে শায়িত বা মৃত আত্মীয়ের খবর আমরা এই জ্ঞানের সাহায্যে নিতে পারি না। মৃত আত্মীয়ের খবরাখবর যে জ্ঞানের মাধ্যমে নেওয়া সম্ভব-তাহাই এলমে হুজুরী। এলমে হুছুলীর অধ্যায়ে স্থান, কাল, অবস্থান, ছুরাত ইত্যাদির প্রয়োজন কিন্তু এলমে হুজুরীর অধ্যায়ে স্থান, কাল, অবস্থান বা ছুরাতের কোন অবকাশ নাই। জাত, সিফাত ও আফ্যাল সংক্রান্ত যে জ্ঞান তাহা এলমে হুজুরীর অন্তর্গত। সিফাতে হাকীকীর জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে এলমে হুজুরীর প্রয়োজন। সিফাতে হাকীকীর মধ্যে স্থান, কাল, অবস্থান বা ছুরাতের কোন অবকাশ নাই। সিফাতে হাকীকীতে দূর বা কাছ, অগ্র-পশ্চাত বলিতে কিছু নাই। যেখানে প্রতিবিম্ব আছে, সেখানের জ্ঞান এলমে হুছুলীর জ্ঞান, হুজুরীর নয়। সাধারণ বোঝাবুঝির জ্ঞান বা অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞান বা এলমে হুছুলী সিফাতে হাকীকীতে প্রবেশ করিতে পারে না। সাধারণ বোঝাবুঝির জ্ঞান সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব, সিফাতে এজাফিয়ার নূরে নিঃশেষ হইয়া যায়। সিফাতে হাকীকীর জ্ঞান, সিফাতের ভিতর ছালেকের যে নিরাকার সত্ত্বা বর্তমান, যাহা নাফসে মোলহেমা বলিয়া পরিচিত-তাহার মাধ্যমে অর্জন করিতে হয়। আমরা জানি, জাতকে কেন্দ্র করিয়া সিফাত বর্তমান কিন্তু কিভাবে বর্তমান তাহা বর্ণনা যোগ্য জ্ঞান সীমার বাহিরে। জাত যেমন দুর্বোধ্য, সিফাতে হাকীকীও তেমন দুর্বোধ্য। সে জগতে আকার, প্রকার, স্থান বা সময় বলিতে কিছু নাই। মানুষ ছুরাত লইয়াও সেখানে প্রবেশ করিতে পারে না। মানুষ এই বিনাশী জগতের অন্তর্ভুক্ত। তথাপিও আল্লাহ মানুষের কাছে পরিচয় দিতে চাহিয়াছেন, আর হয়তো সেই কারণেই মানুষকে এক সুসংবাদও দিয়াছেন। আল্লাহপাক বলেন যে মানুষ "খোলেকুম লিল আবাদ" অর্থাৎ চিরদিনের জন্য সৃষ্ট। যে মানুষকে উদ্দেশ্য করিয়া ইহা বলা হইয়াছে, তাহা মানুষের নিরাকার হকিকত বা নাফসে মোলহেমা-যাহা সিফাতের মধ্যে বর্তমান। এই মানুষ চিরজীবী, অমর। এই মানুষ নিরাকার। মানুষের এই নিরাকার দুর্বোধ্য সত্ত্বাই এলমে হুজুরীর মাধ্যমে সিফাতে হাকীকীর জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। সিফাতে হাকীকীর নীচে আছে মানুষের সূক্ষ্ম ছুরাত-যাহা আলমে আরওয়াহতে বর্তমান এবং জড় জগৎ বা পৃথিবীতে আছে মানুষের স্কুল ছুরাত। এই স্কুল বা সূক্ষ্ণ ছুরাত জগতে যে জ্ঞান তাহা এলমে হুছুলীর অন্তর্গত। তাহা হউক না জড় জগতের বা নূরের জগতের কিংবা বেলায়েতে ছোগরার জ্ঞান। যেখানে ছুরাত বা আকার প্রবেশ করিতে পারে না, যেখানে সাধারণ বোঝাবুঝি নাই, অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞান যেখানে অনুপস্থিত, সেখানেই প্রয়োজন এলমে হুজুরীর। এলমে হুজুরীকে বুঝা বা বুঝানো বড় কঠিন।
সিফাতে হাকীকীর জ্ঞান এলমে হুজুরীর মাধ্যমে জানিতে হয়। ইহা কিভাবে সম্ভব? প্রথমে নিজ হইতে বাহির হইয়া নিজের অস্তিত্ব, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং অপরাপর সব কিছুকে ভুলিয়া ধীরে ধীরে মালুমের মধ্যে প্রবেশ করিয়া মালুমে বিলীন হইতে হয়। এমন ভাবে একত্রিত হইতে হয়, যেন নিজ জ্ঞান বা বোধ বলিতে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। থাকে শুধু নিজের হকিকত-যাহা দ্বারা মালুম সম্পর্কে বুঝা যায়। কিন্তু সেই বুঝাবুঝি মানব সৃষ্ট ভাষা দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। এই কারণে বলা হয় যে হুজুরী অধ্যায়ে কোন বুঝাবুঝি নাই। মূলতঃ বোঝাবুঝি যে নাই তাহা নহে। অবশ্যই বোঝাবুঝি আছে, তবে তাহা প্রকাশযোগ্য বা বর্ণনাযোগ্য নয়। আসলে বা মূলে যদি বোঝাবুঝি না থাকে, প্রতিবিম্বেও তাহা থাকিত না। এখানে উল্লেখ্য যে, এলমে হুজুরীর প্রতিবিম্ব হইল এলমে হুছুলী। পার্থক্য হইল, এলমে হুছুলীর জ্ঞান প্রকাশযোগ্য বা বর্ণনার যোগ্য কিন্তু হুজুরীর জ্ঞান বর্ণনাযোগ্য নহে।
তবে এলমে হুজুরীর জ্ঞান বা সিফাতে হাকীকীর জ্ঞান বা পরিচয় কিভাবে নেওয়া সম্ভব?
এখানে প্রয়োজন পীরে কামেল-যিনি হুছুলী এবং হুজুরী উভয় জ্ঞানে জ্ঞানী। পীরে কামেল ব্যতীত অন্য কেউ এই জ্ঞান শিক্ষা দিতে পারেন না। যিনি যাহা বুঝেন না, তিনি কিভাবে অন্যকে তাহা শিক্ষা দিবেন?
পীরের নির্দেশিত পথে চলিয়া, পীরের কঠিন খেদমতের মাধ্যমে, পীরের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর মাধ্যমে, এই জ্ঞান অর্জন করা যায়। পীরের নির্দেশিত পথে জেকের-আজকার, মোরাকাবা-মোশাহাদা এবং কঠিন রেয়াজত করিতে করিতে ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তি ধীরে ধীরে পার্থিব মোহ, দুনিয়ার আকর্ষণ, নাফসের শৃংখল মুক্ত হইতে থাকে। ছালেকের লতিফায়ে কালব জাগ্রত হয়। কালব নূরের সন্ধান পায়। হাদীসে আছে "মোমেন খোদার নূরে দেখে।” লতিফায়ে কালবে যে খোদাতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বিত নূর আসে, সেই নূরের মাধ্যমে ছালেক আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, সাততলা আসমান হইতে সাততলা জমিনের নীচে তাহাতাছ ছারা পর্যন্ত সবই দেখে এবং সৃষ্ট জগৎ সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করিতে থাকে। এই জ্ঞান হুছুলীর জ্ঞান। ধীরে ধীরে ছালেকের সমস্ত লতিফা জাগ্রত হয়। সুলতানুল আজকার জারী হয়। এই সুলতানুল আজকারের জ্ঞানও এলমে হুছুলী অধ্যায়ে বর্তমান।
এক পর্যায়ে ছালেক দেহ হইতে বাহির হয় এবং নিজে যে আদম-যাহা যাবতীয় খারাপীর উৎপত্তিস্থল, সেই আদামাতের তমদোষ হইতে মুক্ত হয়। আদামাতকে ঝড়িয়া যাইতে দেখে। এই অবস্থায় ছালেকের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে আল্লাহর নাম ও গুণের প্রতিবিম্ব, যাহা ধার স্বরূপ আল্লাহ তাহাকে দান করিয়াছেন। এই প্রতিবিম্ব যাহাকে ছালেক মূল বলিয়া মনে করে। এই অনুভূতিকে তৌহিদে অজুদী বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এই অবস্থায় ছালেক শুধু নূর আর নূরই দেখে। এই নূরের তীব্রতায়, ঔজ্জল্য বা প্রখরতায় ছালেকের জ্ঞান নিঃশেষ হয়। ছালেক সমস্ত বিশ্বব্রাহ্মান্ডকে সেই নূরে নিমজ্জিত দেখে। ছালেক নিজেকেও এই নূর হইতে আর পৃথক করিতে পারে না। তাহার ফানা সিদ্ধ হয়। এই ফানা মূলতঃ নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বে ফানা। ইহা বেলায়েতে ছোগরা বা সিফাতে এজাফিয়ার দায়েরা-যাহা সিফাতে হাকীকীর নীচে অবস্থিত। এখানে নাফস মোৎমাইন্ন্যা প্রাপ্ত হয়। নাফস আল্লাহর উপর রাজী, আল্লাহও ছালেকের উপর রাজী হয়। এই অবস্থায় ছালেকের মনে হয় যে তাহার আদামাত ঝড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু না। এখানে আদামাত পরাজিত হয় সত্য কিন্তু নগন্য পশমের মত হইলেও তাহা নিজের সাথে বর্তমান থাকে। আল্লাহপাকের দয়ায় ছালেক যখন আরও উন্নতি করিয়া সিফাতে হাকীকীতে প্রবেশ করে, তখনই তাহার সেই পরাজিত আদামাত যাহা সূক্ষ্ম চামড়া বা নগন্য পশমের ন্যায় মনে হইতেছিল, তাহা একেবারেই ঝড়িয়া যায়। কিন্তু বেলায়েতে ছোগরায় আদামাত বা নাফছানিয়াত পরিপূর্ণ দূর হয় না। অত্যন্ত নগন্য হিসেবে বছর ধরিয়া অবস্থান করিয়াছিলেন। তখন নিজের আদামাতকে তাহার অবস্থান করিতে লাগিল। তখন মনে হইতে লাগিল যে তাহার আনানিয়াত হইলেও তাহা বর্তমান থাকে।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, তিনি নিজে বেলায়েতে ছোগরার ঐ হালে কয়েক নিকট জামার পশমের ন্যায় অতি নগন্য বলিয়া বোধ হইত। অতঃপর আল্লাহর যখন দয়া হইল, তখন তিনি দেখিলেন যে পশমের ন্যায় ঐ নগন্য অংশ অপসারিত হইয়া গেল এবং তাহা আদামাতের সহিত মিশিয়া নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। ঐ সিফাতের প্রতিবিম্বসমূহ যাহা পূর্বে আদামাতের সহিত বর্তমান ছিল, সেই প্রতিবিম্বের মধ্যে নিজের আমিত্ব
বা আমিত্ব প্রকৃতপক্ষে সিফাতের প্রতিবিম্বের সহিত সংশ্রব বিশিষ্ট এবং আদামাতের সহিত তাহার কোন সম্পর্ক নাই। যে সকল ছালেক এই মাকামে উন্নীত হয়, অর্থাৎ বেলায়েতে ছোগরা হইতে সিফাতে হাকীকীর
দিকে উরুজ করিতে সক্ষম হয়, তাহার নিকট তখন ইহা পরিচ্ছন্ন হয় যে, উক্ত প্রতিবিম্বসমূহ যাহা হাকীকী সিফাত হইতে প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল, তাহাও ধীরে ধীরে স্ব-স্ব মূলে তথা আসল সিফাতে মিশিয়া যায়। ফলে কি দাঁড়ায়? ছালেকের আদামাত আকরাবিয়াতের নীচে আদমে মিশিয়া যায় এবং ছালেকের গুণাবলী সমূহ যাহা প্রতিবিম্ব হিসেবে ধারস্বরূপ বা আমানত স্বরূপ দেওয়া হইয়াছিল, তাহাও আপন আপন মূলে মিশিয়া যায়। ছালেক তখন পৃথক অস্তিত্ব লইয়া আর অবস্থান করিতে পারে না। তাহার প্রকৃত ফানা সংঘটিত হয়। কিন্তু পূর্বে বেলায়েতে ছোগরার মাকামের ফানা বা নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বের সহিত যে ফানার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহা ছিল ফানার ছুরাত, আসল ফানা যাহা সিফাতে হাকীকীতে সিদ্ধ হয়। এই ফানার পর আল্লাহপাক ছালেককে বাকা (স্থায়িত্ব) প্রদান করেন। তৎপর এই ছালেক যদি পুনরায় এই জড় জগতে আগমন করেন, তখন আবার ঐ আদামতের সহিত তাহাকে সংশ্রব বিশিষ্ট হইতে হয়। আদামাতকে সে তখন সংগী বা সাথী হিসেবে পায়। কিন্তু তখন তাহার আমিত্বের মধ্যে আদামাতের কোন তমদোষ থাকে না। তাহার আমিত্ব সিফাতে হাকীকীর আমিত্ব, যাহা 'কুন' হুকুম শুনিয়া বাহির হইয়াছিল। এই আমিত্ব বা নাফস পরিপূর্ণ মুসলমান। নাফসের এই অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করিয়াই রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছিলেন, "আসলামা শয়তানা” অর্থাৎ আমার নাফস বা শয়তান মুসলমান হইয়া গিয়াছে।
উপরের আলোচনায় একটা জিনিস বেশ ভালভাবেই বুঝা গেল যে, বেলায়েতে ছোগরাতে ছালেকের একত্ববাদ বা তৌহিদে অজুদীর অনুভূতি আসে কিন্তু সিফাতে হাকীকীর দায়রাতে ফানা ও বাকা সিদ্ধ হওয়ার পরে ছালেক দ্বিত্ববাদকে ভালভাবে বুঝিতে পারে। অর্থাৎ বেলায়েতে ছোগরায় সৃষ্টজগৎকে খোদার নূরে নিমজ্জিত দেখিয়া খোদাতায়ালার নূর হইতে আর পৃথক করিতে পারে না। ফলে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা ছালেকের নিকট একই মনে হয়। সিফাতে হাকীকীর দায়েরাতে এই বিভ্রান্তি কাটিয়া যায়। তখন সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে পৃথকভাবে বুঝা যায়। বহু সূফী সাধক একত্ববাদের ঘূর্ণিপাকে আটকাইয়া শরীয়ত খেলাফি বহু কথাই বলিয়া ফেলিয়াছেন-যাহাকে কোফরে তরিকত বলে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, এই একত্ববাদ পথিমধ্যের একটি অবস্থা মাত্র। এখানে আটকাইয়া থাকিলে চলিবে না। একত্রিত হওয়ার পরে পুনরায় পৃথক হইতে হইবে, যাহাকে তিনি "ফরক বাদাল জমা (একত্রিত হওয়ার পর পৃথক হওয়া) বলিয়াছেন।
একত্ববাদের পূর্বে যে দ্বিত্ববাদ, যাহা সাধারণ মুসলমানের জ্ঞান, তাহার তেমন কোনই মূল্য নাই। সেই দ্বিত্ববাদের চেয়ে একত্ববাদ অনেক অনেক শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এই একত্ববাদের পরে সিফাতে হাকীকীতে বা আকরাবিয়াতের দায়েরাতে যে দ্বিত্ববাদের জ্ঞান, তাহা বেলায়েতে ছোগরাস্থিত একত্ববাদের চেয়েও অনেক অনেক দামী।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, কোফ্রে তরিকতের পূর্বে যে ইসলাম, তাহা সাধারণ মুসলমানের ইসলাম এবং ঐ ইসলাম যাহা কোফ্রে তরিকতের পরে আকরাবিয়াত বা সিফাতে হাকীকীর দায়েরাতে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহা খাছের খাছ ইসলাম। ইহাই নবী করীম (সাঃ) এবং অপরাপর পয়গম্বর (আঃ) দের ইসলাম। এখানে প্রবেশ করিলেই নাফস ইসলামী ফেতরাতে আসে; পরিপূর্ণ মুসলমান হয়; আদামাতের শৃংখল মুক্ত হয়। কাম-ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ-মাৎসর্য্য, হিংসা-কিনা, রিয়া, কামনা-বাসনা কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। হাদীস শরীফে আছে, "প্রত্যেকটি শিশুই ইসলামী ফেতরাতে জন্মায়। তৎপর তাহাদের পিতামাতা তাহাদেরকে ইহুদী, নাছারা, খৃষ্টান বা অগ্নি পূজক করিয়া লয় অর্থাৎ তাহারা পিতামাতার ভালবাসায় পতিত হইয়া আল্লাহপ্রদত্ত ইসলামের নূর হারাইয়া ফেলে।" (বোখারী শরীফ) উল্লিখিত হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, জন্মলগ্নে প্রত্যেকটি শিশুই মুসলমান থাকে। ইসলামী ফেতরাত বা স্বভাবে সজ্জিত থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে তাহারা কেউবা ইহুদী, কেউবা নাছারা, কেউবা অগ্নি পূজক হয়।
ইসলামী ফেতরাত কি?
ইসলামী ফেতরাত হইল, আদামাতের তমদোষমুক্ত স্বভাব-অর্থাৎ কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্য্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা-বাসনা মুক্ত স্বভাব। সদ্য প্রসূত শিশুকে সকলেই ভালবাসে; ফেরেশতা উপাধীতে ভূষিত করে। কেন? কারণ সদ্যভূমিষ্ট শিশু আদামাতের অন্ধকারের দোষ মুক্ত থাকে, নাফসের শৃংখলমুক্ত থাকে, অর্থাৎ কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্য্য, হিংসা-কিনা, রিয়া, কামনা-বাসনা মুক্ত থাকে-যাহা ফেরেশতা স্বভাব তুল্য। ইহাই ইসলামী ফেতরাত। শরীয়তে প্রকাশ, "তোমরা মুসলমান না হইয়া মরিও না" অর্থাৎ আদামাতের কালিমা মুক্ত হইয়া তৎপর কবরে আস। যাহার মর্মার্থ দাঁড়ায়, সিফাতে হাকীকীতে প্রবেশ করিয়া ইসলামের স্বভাবে অলংকৃত হও, যাহা রিপু বা প্রবৃত্তিমুক্ত এক পবিত্র স্বভাব।
সিফাতে হাকীকীর কথা বলিতেছিলাম। পূর্বে বলা হইয়াছে যে, সিফাতে হাকীকী অর্থাৎ হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, ছামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তাকবিন পবিত্র জাতকে কেন্দ্র করিয়া বর্তমান। এবার একটু বিশ্লেষণ করিয়া দেখা যাক যে, জাত সিফাতের মুখাপেক্ষী? নাকি, সিফাত জাতের মুখাপেক্ষী? পবিত্র জাত কি সিফাতের দ্বারা গুণান্বিত? নাকি সিফাতে হাকীকী জাতের প্রতিবিম্ব?
সিফাতের কারণে জাত গুণান্বিত-ইহা ভাবা ঠিক নয়। জাত সিফাতের মুখাপেক্ষী নয়। সিফাতে হাকীকী বা অষ্টগুণের মধ্যে যে সকল গুণাবলী বর্তমান তাহা সকলই পবিত্র জাতে সংমিলিত বা মিশ্রিত অবস্থায় বর্তমান। অর্থাৎ পবিত্র জাত সিফাতে হায়াত কর্তৃক চিরজীবী নয়-নিজে নিজেই চিরজীবী; সিফাতে এলেম কর্তৃক জ্ঞানী নয়; নিজে নিজেই জ্ঞানময়। পবিত্র জাত সিফাতে কালাম কর্তৃক কথা বলেন-তাহা নয়; পবিত্র জাতের নিজে নিজেই কথা বলার ক্ষমতা আছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাদ শরীফে বলেন যে, আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাতের মধ্যে অর্থাৎ তাহার স্বীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে যাবতীয় সদগুণ বর্তমান,
الدَّاتُ كُلُّهُ سَمَعَ كُلُّهُ بَصَرَ كُلُّهُ قُدْرَةٌ كُلُّهُ إِرَادَةٌ
অর্থাৎ- আল্লাহর পবিত্র জাত সম্পূর্ণই শ্রবণশক্তি, সম্পূর্ণই দর্শনশক্তি, সমস্তই বাকশক্তি, পূর্ণাংগই ইচ্ছাশক্তি ইত্যাদি।
আল্লাহর পবিত্র জাতে যে সকল গুণাবলী বিদ্যমান, তাহার বহিঃপ্রকাশ হইল সিফাতে হাকীকী। তবে পবিত্র জাতে গুণাবলীসমূহ মিশ্রিত বা সম্মিলিত অবস্থায় বর্তমান। আর আসমা ও সিফাতের বৃত্তে সিফাতে হাকীকী পৃথক পৃথক অস্তিত্বে বর্তমান। এবার প্রশ্ন হইতে পারে যে পবিত্র জাতে সমুদয় গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও সিফাতে হাকীকীর তাইয়্যুন বা অধ্যায়ের কি প্রয়োজন?
সিফাতের প্রয়োজন মূলতঃ সৃষ্টির জন্য। সৃষ্টি সিফাতের মুখাপেক্ষী। কিন্তু পবিত্র জাত সিফাতের মুখাপেক্ষী নয়। সৃষ্টি জগৎ সিফাত কর্তৃক প্রকাশিত এবং সিফাতের মাধ্যমেই টিকিয়া থাকে। মানুষের যত গুণাবলী পরিলক্ষিত হয়, তথা জীবন, জ্ঞান, দর্শন, চিন্তন, বর্ণন, শ্রবণ, কল্পন সবই সিফাতের প্রতিবিম্ব। এই সকল গুণাবলী মানুষকে দেওয়া না হইলে মানুষ অচেতন জড় পদার্থের মত হইত। মানুষের কিইবা মূল্য থাকিত। সৃষ্টির অস্তিত্ব সিফাতের কারণেই। প্রতি পদে পদে সিফাতের প্রয়োজন, প্রতি নিঃশ্বাসে সিফাতের প্রয়োজন। এমনকি প্রাণীজগৎ বা মানুষের যে দৈহিক মৃত্যু হয়, সেখানেও সিফাতের প্রয়োজন। সিফাতবিহীন মানুষ আদম বা অনস্তিত্ব ভিন্ন কিছুই নয়-যে আদম যাবতীয় অশুভ ও ত্রুটি-বিচ্যুতির উৎপত্তিস্থল। সিফাতের মাধ্যমে সৃষ্ট জগৎ প্রকাশিত হইয়াছে।
সিফাতে হাকীকী পৃথক পৃথক অস্তিত্বে বর্তমান থাকিলেও সৃষ্টিকে প্রকট বা প্রকাশিত করিবার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে। এই সৃষ্টিজগৎ প্রকাশিত হইয়াছে মূলতঃ তিনটি হাকীকী সিফাত-অর্থাৎ সিফাতে কুদরত, সিফাতে এরাদত ও সিফাতে তাকবিনের পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রচেষ্টার ফলে। সিফাতে কুদরতের মধ্যে সৃষ্টিকে প্রকাশ করিবার ইচ্ছা বর্তমান। ইচ্ছা করিলে সৃষ্টিকে প্রকাশ বা প্রকট করিবার কাজে সিফাতে তাকবিনকে সাহায্য করিতে পারে, আবার নাও পারে। অর্থাৎ সিফাতে কুদরতের মধ্যে সৃষ্টিকে প্রকাশ করিবার উভয় ইচ্ছায় বর্তমান। কিন্তু সিফাতে তাকবিন সৃষ্টিকে প্রকাশ করিতে সদা ব্যগ্র। প্রকাশ না করিবার কোন ইচ্ছা সিফাতে তাকবিনে নাই। অন্য দিকে সিফাতে এরাদতেও সৃষ্টিকে প্রকাশ করিবার ইচ্ছা বর্তমান। সিফাতে এরাদতের নীচে সিফাতে তাকবিতের অবস্থান। কিন্তু সিফাতে তাকবিনের ঊর্ধ্বে সিফাতে কুদরত বর্তমান। সিফাতে এরাদত ও সিফাতে তাকবিন একত্রে সৃষ্টিকে প্রকট বা প্রকাশ করিতে চায় কিন্তু সিফাতে কুদরতের সহযোগিতা ব্যতীত উক্ত দুই সিফাত সৃষ্টিকে প্রকাশ করিতে পারে না। সিফাতে কুদরতের মধ্যে সৃষ্টিকে প্রকাশের যে ইচ্ছা বর্তমান সেই ইচ্ছা যদি সিফাতে এরাদত ও সিফাতে তাকবিনের সহিত যুক্ত হয়, তবে সৃষ্টি বাস্তবায়িত হয়। আর যদি সৃষ্টিকে প্রকাশ না করিবার যে ইচ্ছা কুদরতে বর্তমান, তাহা যদি এরাদত ও তাকবিনের উপর প্রভাব ফেলে, তাহা হইলে কোন সৃষ্টি প্রকাশিত হয় না। পৃথিবীতে যত কর্মই সৃষ্টি হউক না কেন; উক্ত তিন হাকীকী সিফাতের সহযোগিতা ব্যতীত তাহা প্রকাশ পায় না। এই
কারণেই বলা হয়, পৃথিবীতে যাহা কিছু হইতেছে তাহা এক খোদাতায়ালার ইচ্ছাতেই সংঘটিত হইতেছে।
সৃষ্টির সাথে পবিত্র জাতের সরাসরি কোন সম্পর্ক নাই। আল্লাহ পবিত্র কুরআন পাকে বলেন,
إِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَلَمِينَ
অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত আলম হইতে অমুখাপেক্ষী।' (সূরা আলে-ইমরানঃ ৯৭) সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক হইল সিফাতের। সৃষ্টির সেরা হইল মানুষ। এই মানুষেরও সরাসরি জাতের মর্তবাতে ফানা হওয়ার ক্ষমতা নাই। প্রথমে সিফাতে ফানা হইয়া পরে জাতে ফানা হইতে হয়।
সিফাতের বর্তমানতা না থাকিলে কোন সৃষ্টিই টিকিয়া থাকিতে পারিত না। জাতি নূরের তীব্রতা বা প্রখরতায় সমস্ত সৃষ্টিই ধ্বংস হইয়া যাইত। হাদীস শরীফে প্রকাশ, "জাত ও সৃষ্টির মধ্যে আলো-অন্ধকারের সত্তর হাজার পর্দা বর্তমান। এই পর্দা সমূহ অপসারিত হইলে সমস্ত সৃষ্টিই ধ্বংস হইয়া যাইত।" পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত মুসা (আঃ) এর ঘটনা থেকে জানিতে পাই যে, হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহ্ পাকের জাতের দর্শনের প্রবল আকাংখী ছিলেন। মহান খোদাতায়ালা তাহার আকাংখা নিরসনের জন্য তুর পাহাড়ে, হযরত মুসা (আঃ) এর প্রতি পবিত্র জাতের একটি মাত্র তাজাল্লী প্রকাশ করিলেন। ইহাতে হযরত মুসা (আঃ) বেহুশ হইয়া গেলেন এবং তুর পাহাড় জ্বলিয়া ভস্ম হইল। কাজেই সৃষ্টিকে টিকাইয়া রাখিবার জন্যই আল্লাহপাক জাত এবং সৃষ্টির মাঝে সিফাতের পর্দা রাখিয়া দিলেন। ইহা মানব জাতির প্রতি আল্লাহপাকের এক বিশেষ রহমত। মূলতঃ সৃষ্টিকে যদি টিকাইয়া না রাখা হয়, তাহা হইলে তিনি কাহার নিকট পরিচয় দিবেন? তাই তিনি এমন সুন্দর ব্যবস্থা করিয়াছেন।
সিফাতে হাকীকী বা আল্লাহর অষ্টগুণের মধ্যে সিফাতে হায়াত সকলের শীর্ষে অবস্থিত। সিফাতে হায়াত সকল সিফাতের মাতাতুল্য। অন্যান্য সিফাতের সহিত ইহার সম্পর্ক বিষয়ে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "হায়াত বা জীবনী শক্তি একটি মহান শান বা গুণ, অন্যান্য গুণাবলী ইহার নিকট ঐরূপ, মহাসাগরের তুলনায় লাল-প্রণালী যেরূপ।"
সিফাতে হায়াত অষ্টগুণের মাতৃতুল্য হইলেও পবিত্র জাতের সহিত সিফাতে এলেমের এমনি এক সম্পর্ক বিদ্যমান যাহা অন্যান্য সিফাতের নাই। জাতের সহিত সম্পর্কের শেষ বিন্দুতে সিফাতে এলেম যখন পৌছায়, তখন ইহা লা তাইনস্থিত হেজাব বা নূরের পর্দা হিসেবে উল্লিখিত হয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এলেমের ঐ অবস্থাকে নিছক নূর বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। এই অবস্থায় ইহা কোন তাইয়্যুনের অন্তর্গত হয় না। পবিত্র জাত রাজ্যের সিফাতে এলেমের প্রথম প্রতিবিম্ব হইল হকিকতে মুহাম্মদী-যাহা তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রে স্থিত-প্রথম সৃস্ট বলিয়া পরিচিত, রূহে মুহাম্মদী বলিয়া পরিগণিত। জাতস্থিত এলেমের সেই অবস্থা যাহা নিছক নূর বলিয়া পরিচিত। তখন এই নূর কোন তাইয়্যুন পায় না। কিন্তু পরবর্তীতে তাইয়্যুন পাওয়ার পরে ইহা আসমা ও সিফাত তথা নাম ও গুণাবলীর বৃত্তে সিফাতে এলেম নামে স্থিত হয়। তাইয়ুন পাওয়ার পূর্বে লাতাইনস্থিত এলেমের অবস্থার দিকে লক্ষ্য করিয়াই বলা হয় যে, সিফাত 'লাগায়রূহু' অর্থাৎ তিনি ছাড়া অন্য কিছু নহে। কিন্তু তাইয়্যুন পাওয়ার পরে নাম ও গুণাবলীর বৃত্তে স্থিত হওয়ার অবস্থার দিকে লক্ষ্য করিয়া বলা হয় যে, সিফাত 'লা-হুয়া অর্থাৎ তিনি নহেন। মূলতঃ সিফাত পবিত্র জাত নয়, আবার জাত থেকে পৃথকও নয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, লা হুয়া (তিনি নহেন) কে বিশ্বাস করিয়া লা গায়রূহু (তিনি ছাড়া অন্য কিছু নহেন) কে প্রমাণ করিতে হয়। ইহাই সত্যবাদীদের মত। কিন্তু হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেব সিফাতকে জাতের যথাযথ বা অনুরূপ বলিয়াছেন। সিফাতের পৃথক অস্তিত্ব তিনি স্বীকার করেন নাই। ইহার মূল কারণ তিনি সিফাতের বিশাল বিশাল রাজ্য ছায়ের করেন নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাদ শরীফে বলেন, আল্লাহপাকের অনুগ্রহে সিফাতে হায়াতের মধ্যে যখন এই ফকির (হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী) ছায়ের বা ভ্রমণ করিয়াছিল, তখন উক্ত মাকামের বহু দূরে-নিম্নস্তরে দেখিয়াছিল যে, হযরত ইবনুল আরাবী (রঃ) ছাহেবের তথায় ক্ষুদ্রাবাস আছে এবং তিনি তথায় স্থায়ীভাবে বাস করিতেছেন।" আকার ও প্রকার বিহীন সিফাতের রাজ্যে যে দূরত্বের কথা বলা হইল তাহা এই জগতের দূরত্বের মত চিন্তা করিলে চলিবে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, উক্ত আকার ও প্রকার বিহীন দূরত্ব আলমে মেছালের পর্দায় ব্যবধানের দূরত্বের মত পরিদর্শিত হয়।
সিফাতে হাকীকী বা অষ্টগুণ জাতের সহিত মিলিত হইয়া জাতকে ঐ নামে নামীয় করে। যেমন সিফাতে হায়াত জাতের সহিত মিলিত হইয়া জাতকে হাই বা চিরজীবী নামে নামীয় করে। তেমনি সিফাতে এলেম জাতের সহিত মিলিত হইলে জাত আলীম হয়। সিফাতে কালাম জাতের সহিত মিলিত হইলে জাত কালামকারী হয়। সিফাতে বাছারাত জাতের সহিত মিলিত হইলে জাত বছীর হয়। এমনিভাবে অন্যান্য সিফাতকে বুঝিতে হইবে। সিফাত জাতের সহিত মিলিত হইয়া যে অবস্থার সৃষ্টি করে তাহা যে দায়েরা দ্বারা বর্ণিত হয়, তাহার নাম বেলায়েতে উলিয়া এবং আল্লাহপাকের ঐ সমস্ত নামকে বলা হয় এসমোল বাতেন বা গুপ্ত নাম। এসমোল বাতেন হইল উচ্চস্তরের ফেরেশতাদের মাবদায়ে তাইয়্যুন বা উৎপত্তিস্থল এবং ঐ নামসমূহের ছায়েরকে বলা হয় ছায়েরে এস্মোলবাতেন। আবার সিফাতে হাকীকীর দায়েরার নাম ও গুণ সমূহ হইল পয়গম্বর (আঃ) দের মাবদায়ে তাইয়্যুন বা উৎপত্তিস্থল। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাদ শরীফের তৃতীয় খন্ডের ১১৪ নং মকতুবে বলেন, জানা আবশ্যক যে, আল্লাহতায়ালার সিফাতে ছামানিয়া (সিফাতে হাকীকী) বা গুণ অষ্টকের প্রত্যেকটি গুণ যাহা দ্বিতীয় তাইয়্যুনের মর্তবায় বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে, তাহার প্রত্যেকটি এক এক জন পয়গম্বরের উৎপত্তিস্থল। যেমন এলেমগুণ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর উৎপত্তির কেন্দ্র, তদ্রুপ কুদরত বা ক্ষমতাগুণ হযরত ঈসা (আঃ) এর মাবদায়ে তাইয়্যুন বা উৎপত্তিস্থান। আবার তাকবিন বা সৃজনগুণ হযরত আদম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থান এবং উল্লিখিত সমষ্টিভূত এসস্ম সমূহের বেষ্টি বা অংশ সমূহ অবশিষ্ট পয়গম্বর (আঃ) গণের উৎপত্তিস্থান।"
সুতরাং বুঝা যায় যে সিফাতে হাকীকী পয়গম্বর (আঃ) গণের উৎপত্তিস্থল। কিন্তু ওলী আল্লাহসকল ও মোমিনদের উৎপত্তিস্থল হইল সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব অর্থাৎ সিফাতে এজাফিয়া। পক্ষান্তরে কাফেরদের উৎপত্তিস্থল আল্লাহতায়ালার "আল মোজেল্লু" অর্থাৎ ভ্রষ্টকারী এসমের সহিত সম্পর্কিত-যাহা উল্লিখিত উৎপত্তিস্থল হইতে সম্পূর্ণ পৃথক।
প্রত্যেকটি হাকীকী সিফাতের বহু সংখ্যক এজাফি সিফাত প্রতিবিম্বের দায়েরায় বর্তমান। যে পয়গম্বরের উৎপত্তিস্থান যে হাকীকী সিফাত, সেই পয়গম্বরের উম্মতগণের উৎপত্তিস্থল উক্ত হাকীকী সিফাতের এজাফি সিফাত সমূহ। যেমন হযরত আদম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থান সিফাতে তাকবিন। তদীয় উম্মত সকলের উৎপত্তিস্থল এই সিফাতে তাকবিনের এজাফি সিফাতসমূহ। হযরত ঈসা (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল সিফাতে কুদরত; তদীয় উম্মতসকলের উৎপত্তিস্থল সিফাতে কুদরতের এজাফি সিফাতসমূহ। হযরত মুসা (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল সিফাতে কালাম; তদীয় উম্মতবর্গের উৎপত্তিস্থান সিফাতে কালামের এজাফি সিফাতসমূহ। তেমনি শেষ পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল সিফাতে এলেম এবং উম্মতে মুহাম্মদীর উৎপত্তিস্থল সিফাতে এলেমের এজাফি সিফাতসমূহ। সিফাতে এলেমের সহিত পবিত্র জাতের এক খাছ সম্পর্ক বিদ্যমান, যাহা অন্য কোন সিফাতের নাই। জাতের সহিত সিফাতে এলেমের সম্পর্কের কিছু বর্ণনা পূর্বে করা হইয়াছে। জাতের সহিত সিফাতে এলেমের বিশেষ সম্পর্কের কারণেই অন্যান্য সিফাতের উপর এলেমগুণের শ্রেষ্ঠত্ব। আর এই সিফাতে এলেম হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল বিধায় তাহার সাথে জাতপাকের যে নিকট সম্পর্ক বর্তমান, তেমন সম্পর্ক অন্য কোন পয়গম্বর (আঃ) দের নাই। এই সিফাতি এলেমের এজাফি সিফাতসমূহ উম্মতে মুহাম্মদীর উৎপত্তিস্থল বিধায় উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য উম্মতের চেয়ে অনেক বেশী। উম্মতে মুহাম্মদীর খাছের খাছ উম্মতেরা রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ ও অনুগমনের মাধ্যমে সিফাতের পর্দাসমূহ অতিক্রম করিয়া জাতের এত নিকটে পৌঁছান, যেখানে পূর্ববর্তী পয়গম্বর (আঃ) সকলও পৌঁছাইতে পারেন নাই। এই শ্রেষ্ঠত্ব সম্ভব হইয়াছে গুণঅষ্টকের শ্রেষ্ঠগুণ সিফাতে এলেমের কারণে।
হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি অবশ্যম্ভাবী জগৎ বা চিরস্থায়ী জগৎ অর্থাৎ জাত ও সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে চাও, এলমে হুজুরী অধ্যায়ের জ্ঞান অর্জন করিতে চাও, তবে আমার পীর কেবলাজান যিনি বর্তমান জামানার শ্রেষ্ঠতম মুজাদ্দেদ, তাহার তরিকা মত চল। তরিকতের যাবতীয় নিয়মাবলী যথাযথ পালন কর এবং পীরের কদমে কঠিন খেদমত কর। কঠিন খেদমতের মাধ্যমে পীরের আশীষ বা সন্তুষ্টি যদি লাভ করিতে পার, তাহা হইলে আশা করা যায়, মহান খোদাতায়ালার দয়ায় তোমরা মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইতে পারিবে। দু'আ! ইতি।







