Logo

'মাবুদিয়াতে ছেরফা' এবং 'হোব্বে ছেরফা' সম্পর্কে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৯ আগস্ট, ২০২৬, ২০:০২
'মাবুদিয়াতে ছেরফা' এবং 'হোব্বে ছেরফা' সম্পর্কে আলোচনা
ছবি: সংগৃহীত

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘হকিকতে আম্বিয়া ও হকিকতে এলাহিয়া’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খোদাপ্রাপ্তির পথের সর্বোচ্চ দুই মাকাম 'মাবুদিয়াতে ছেরফা' এবং 'হোব্বে ছেরফা' সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

বেলায়েতে কোবরার শেষ অধ্যায় কাওছ নামে অভিহিত। এই অধ্যায়ে ছালেক নিজের শরীরের মতন একটি কায়া খোদাতায়ালার নূরে নিমজ্জিত দেখে। ইহাকে 'ওজুদ মাওহুব লাহু' বা খোদাদত্ত শরীর বলা হয়। রাসূলে করীম (সঃ) বলেন,

لا يَلِجُ مَلَكُوتَ السَّمَوَاتِ مَنْ لَّمْ يَلِدْ مَرَّتَيْنِ

অর্থাৎ-'যে ব্যক্তি দুইবার জন্মগ্রহণ করেন নাই, তিনি আসমানের জ্ঞানে জ্ঞানী হইতে পারেন নাই।'

বিজ্ঞাপন

এখানে দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণের যে কথা বলা হইয়াছে, তাহা আসলে ছালেকের 'ওজুদ মাওহুব লাহু' বা খোদাদত্ত শরীর প্রাপ্তিকে বুঝানো হইয়াছে। যে ছালেক ওজুদ মাওহুব লাহু বা খোদাদত্ত শরীর প্রাপ্ত হন নাই, তিনি পূর্ণাংগ মারেফাত অর্জন করিতে পারেন নাই। কাওছের মাকাম হইতে ঊর্ধ্বদিকে বহু দায়েরা বা মাকাম অতিক্রম করিয়া আল্লাহতায়ালার মহব্বত, শান, শয়ুনাত পার হইয়া খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে ছালেক পৌঁছাইতে সক্ষম হন এই ওজুদ মাওহুব লাহুর দ্বারাই। ইহাই ছালেকের হকিকত বা আসল অবিনাশী সত্ত্বা। সৃষ্টির প্রাক্কালে আল্লাহপাক বলিলেন, "কুন"। তাহাতে সৃষ্ট সৃষ্টি হইয়া রূপজগতে, আলমে আরোওয়াতে অবস্থান গ্রহণ করিল। সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহপাক কাহার উদ্দেশ্য এই আদেশসূচক শব্দ 'কুন' বলিয়াছেন, তাহা জ্ঞানীদের জন্য চিন্তার বিষয় বটে। এখানে দ্বিতীয় পুরুষের বর্তমানতা আবশ্যক। আল্লাহতায়ালার হাকীকী সেফাতসমূহের মধ্যে সকল সৃষ্টির হকিকতের উৎপত্তিস্থল নিহিত। আল্লাহ সৃষ্টিলগ্নে যে 'কুন' শব্দ প্রয়োগ করিয়াছিলেন তাহা সেফাতস্থিত ঐ হকিকতসমূহের প্রতি। ফলে সমুদয় সৃষ্টি সৃষ্ট হইয়া রূপজগতে বা আলমে আরোওয়াতে (রূহানী জগতে) অবস্থান গ্রহণ করিল। হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব বলেন যে, ছালেক প্রথমে তাহার ওজুদ মাওহুব লাহুকে শিশুর আকতিতে দর্শন করে। পরবর্তীতে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এই জেকেরের মাধ্যমে তাহা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। শিশুর আকৃতিতে দৃষ্ট জাত মাওহুবকে হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব তেফলুল মায়ানী বা খোদা প্রেমের নবজাত শিশু বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।

কাওছের অধ্যায় হইতে সম্মুখে খোদাতায়ালার পানে যাহা উরুজ ও ছায়ের করে তাহা ছালেকের এই ওজুদ মাওহুব লাহু। কাওছের পরে বেলায়েতে উলিয়ায় এসমোল বাতেনের ছায়ের করিয়া ছালেক সিফাত মিশ্রিত জাতের সহিত পরিচিত হয়। এখান হইতে ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তি আরও ঊর্ধ্বদিকে গমন করিয়া কামালাতের দায়েরা সমূহ ছায়ের করে।

কামালাতের তিনটি অধ্যায়। যথাঃ দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়ত, দায়েরায়ে কামালাতে রেসালাত এবং দায়েরায়ে কামালাতে উলুল আজম। ইহা দায়েমী তাজাল্লী' এর তিনটি অংশ। এই দায়েরা গুলো ছায়েরের ফলে ছালেকের হৃদয় খুবই প্রশস্ত হয় এবং গুপ্ত ভেদসমূহ ধীরে ধীরে তাহার নিকট প্রকাশিত হইতে থাকে। কামালাত অধ্যায়ের শেষ মাকাম দায়েরায়ে কামালাতে উলুল আজমের ছায়ের শেষে খোদা প্রাপ্তির পথে দুইটি পৃথক পৃথক রাস্তা রহিয়াছে। যথাঃ হকিকতে এলাহিয়া ও হকিকতে আম্বিয়া।

বিজ্ঞাপন

হকিকতে এলাহিয়া চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। যথা- হকিকতে কুরআন, হকিকতে কা'বা, হকিকতে সালাত এবং মাবুদিয়াতে ছেরফা। আবার হকিকতে আম্বিয়াও কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। যথা- হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী এবং হোব্বে সেরফা। হকিকতে এলাহিয়ার মাকাম সমূহ শান জগতে অবস্থিত। ইহাদের সমষ্টিকে তাইনে আওয়াল বা শানে জামেয়াও বলা হয়। এই সকল দায়েরা ইবাদতের মাধ্যমে অতিক্রম করিতে হয়। আবার হকিকতে আম্বিয়ার দায়েরা সমূহ মহব্বত জগতের হকিকত রাজ্যে অবস্থিত। এই হকিকতসমূহ মহব্বতের মাধ্যমে অতিক্রম করিতে হয়। তাই বলা হয়, খোদাপ্রাপ্তির দুইটি পথ, ইবাদত ও মহব্বত। ইবাদতের রাস্তায় সর্বশেষ ঘাটি মাবুদিয়াতে ছেরফা এবং মহব্বতের রাস্তার সর্বশেষ মাকাম হোব্বে ছেরফা। মাবুদিয়াতে ছেরফার উপর জাত লাতাইন। তাইন এর অর্থ হইল নির্দিষ্ট এক অধ্যায়। লা-তাইন অর্থ তাইন বা অধ্যায় নয়। ইহা জাত পাকের এক অবর্ণনীয় ও অনির্দিষ্ট এক অবস্থা। ইহা বহু ইতেবারের পর্দা দ্বারা আবৃত।

আল্লাহপাক গুপ্ত ধন ভান্ডারের মত ছিলেন। পরিচিত হওয়ার বাসনায় সৃষ্টকে সৃষ্টি করিলেন। পরিচিতি হওয়ার বাসনা ছাড়াও সৃষ্টির পশ্চাতে এরও একটি কারণ ছিল-যে সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআন মজীদে আরও বলেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- 'মানুষ এবং জ্বীনকে আমার ইবাদত ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করি নাই।' (সূরা জ্বারিয়াতঃ ৫৬)

সুতরাং দেখা যায়, সৃষ্টির সময়ে পরিচিত হওয়ার বাসনা ছাড়ার আরও একটি ইচ্ছা জাত পাকের মধ্যে উদ্ভুত হয়। আর তাহা হইল সৃষ্টি তাহার উপাসনা করিবে। জাত পাকের মধ্যে ইবাদত কেন্দ্রিক দুইটি অবস্থা আসিয়া যায়। যথাঃ (১) উপাসিত হওয়া, আর (২) উপাসনাকারীর। এই উপাসনাকারীর যে অবস্থা জাত পাকে আসিয়া যায়, তাহাতো জাত পাকে আর থাকিতে পারে না। তাহা হইলে জাত পাক নির্দিষ্ট হইয়া যায়। ইহার মোজাররদ বা শূন্য অবস্থা আর থাকে না। অসীম সসীমের গন্ডিতে চলিয়া আসে। তাই উপাসনাকারীর প্রতি ইংগিতকারী জাত পাকের ঐ অবস্থাকে লা-তাইনের নিম্নে তাইনে আওয়ালে রাখিয়া দেওয়া হয়। এই অবস্থাই ইবাদতকারীর সর্বোচ্চ অবস্থা। ইহাই মাবুদিয়াতে ছেরফা। ছালেক উরুজ' ও ছায়ের' করিয়া মাবুদিয়াতে ছেরফা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে। ইহার উপরে জাত লাতাইনে সৃষ্টির কোন প্রবেশাধিকার নাই। জাত মোরাজরাদায় কদমি ছায়ের চলে না। ছালেক শুধুমাত্র ওজদু মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার মাধ্যমে তথায় ছায়ের করিতে পারে। আসলে মাবুদিয়াতে ছেরফায় পৌঁছাইয়া ছালেকের ওজুদ মাওহুব লাহু জাত পাকের দিকে তাকাইয়া থাকিবার যোগ্যতা প্রাপ্ত হয়। ইহা ইবাদতের সর্বোচ্চ অবস্থা। মেরাজের রাত্রিতে রাসূলে করীম (সঃ) হযরত জিব্রাইলকে (আঃ) পিছনে রাখিয়া আল্লাহতায়ালার আসমা, সিফাত, মহব্বত, শান, শয়ুনাতের ঊর্ধ্বে মাবুদিয়াতে সেরফায় উন্নীত হইলে, আল্লাহপাক তাহার উদ্দেশ্যে বলিলেন, "কিফ ইয়া মুহাম্মদ" হে মুহাম্মদ! আপনি দাঁড়ান। সৃষ্টির আর সাধ্য নাই এই মাকাম অতিক্রম করিবার। উম্মতে মুহাম্মদীর (সঃ) যে সকল উম্মত অনুকরণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে মাবুদিয়াতে সেরফায় উন্নীত হন, তাহারাও তথায় দাঁড়াইয়া যাইতে বাধ্য হন। আল্লাহপাক বলেন,

لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- 'সৃষ্টি তাহাকে বুঝিতে পারিবে না।' (সূরা আনআমঃ ১০৩)।

মাবুদিয়াতে সেরফায় উন্নীত হইয়া, তথা হইতে জাত পাকে প্রবেশ করিতে ব্যর্থ হইয়া ছালেক পবিত্র কুরআন শরীফের উক্ত আয়াতের মর্মার্থ সঠিক ভাবে উপলব্ধি করিতে পারেন। জাত পাককে বুঝিতে না পারিবার অক্ষমতা ও অপারগতা ছালেকের হৃদয়ে এক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। এই যন্ত্রণা ও হাহাকারই পূর্ণাংগ মারেফাত।

আল্লাহপাক মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকামে রাসূলে করীম (সঃ) কে থামাইয়া দিয়া বলিয়াছেন,

বিজ্ঞাপন

قف يَا مُحَمَّدُ فَإِنَّ اللَّهَ يُصَلَّى

অর্থাৎ-'হে মুহাম্মদ! আপনি থামুন, আপনার আল্লাহ নামাজ পড়িতেছেন।'

ইহা শুনিয়া অনেকেই ভাবনায় পড়ে। আল্লাহতায়ালা নামাজ পড়িতেছেন; ইহা আবার কেমন কথা। আল্লাহতায়ালা নিজেই উপাস্য, নিজেইতো আরাধ্য। তিনি আবার কাহার উপাসনা করিবেন। এই প্রসংগে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, আল্লাহতায়ালার জন্য যে ইবাদত উপযুক্ত তাহা মর্তবা অজুব সংক্রান্ত নামাজ, যেখানে তিনি নিজেই মাবুদ, নিজেই আবেদ। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, সৃষ্টির সময় দুইটি অবস্থা আসিয়া যায়। (১) উপাস্যের, (২) উপসনাকারীর। মাবুদিয়াতে ছেরফায় উন্নীত ছালেক বুঝিতে পারেন যে, খোদাতায়ালার যোগ্য ইবাদত করা তাহার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ জাত জগতে প্রবেশ করা সৃষ্টির ক্ষমতা বহির্ভূত। ফলে উপসনাকারীর যে ইতেবার জাতপাকে উদ্ভুত হইয়াছিল, যাহা জাত লাতাইনের বাহিরে তাইনে আওয়ালে রাখিয়া দেওয়া হইয়াছিল, তাহাই জাতপাকের উপাসনা প্রাপ্তির বাসনাকে পূর্ণ করিতে সক্ষম। আসলে উপসনাকারীর যে অবস্থা তাহা উপাসিত হইবার অবস্থার প্রতি উন্মুখ এবং সদা ব্যগ্র থাকে। উপাসিত হইবার যে অবস্থা সেই অবস্থার প্রতি উপাসনাকারীর অবস্থার এই যে ব্যগ্রতা-ইহাই আল্লাহতায়ালার সালাত। কিন্তু দু'টো অবস্থাই জাতপাকের বিধায় এক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালা নিজেই আবেদ, নিজেই মাবুদ।

বিজ্ঞাপন

এতক্ষণ মাবুদিয়াতে ছেরফা সম্পর্কে কিছু বলা হইল। এইবার হকিকতে আম্বিয়ার সর্বশেষ দায়েরা হোব্বে ছেরফা সম্পর্কে কিছু বলিতেছি। হকিকতে আম্বিয়ার দায়েরাতে কয়েকটি অধ্যায় রহিয়াছে। যথা হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী এবং হোব্বে ছেরফা বা নিছক প্রেম। মহব্বতের মাধ্যমে এই দায়েরাসমূহ অতিক্রম করিতে হয়।

মহব্বত রাজ্যের হকিকতসমূহ অতিক্রম করিয়া ছালেকের ওজুদ মাওহুব লাহু যেই মাত্র হোব্বে ছেরফা বা নিছক প্রেমের দায়েরায় উপস্থিত হয়, তখনই সেখানে তাহাকে থামাইয়া দেওয়া হয়। জাতপাকের মধ্যে সে আর প্রবেশ করিতে পারে না। হোব্বে ছেরফার দায়েরাতে দাঁড়াইয়া ছালেকের ওজুদ মাওহুব লাহু জাত পাকের দর্শনকারী হিসাবে দাঁড়াইয়া থাকে। এই হোব্বে ছেরফা কি? আল্লাহপাক পবিত্র হাদিসে কুদসীতে বলেন, "কুন্তু কান্জাম মাফিয়ান্ ফা আহবা আন্ ওরাফা ফা খালাতুল খাল্কা লেওয়াফা।” অর্থাৎ আমি গুপ্ত ধনভান্ডার ছিলাম। অতঃপর পরিচিত হইতে ভালবাসিলাম। তাই সৃষ্টি জগত সৃজন করিলাম। এই পরিচিত বাসনা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে জাতপাকে হোব্ব বা প্রেম উদ্ভুত হয়। ফলে ঐ জাত হোব্ব দ্বারা নির্ণীত হয়। সেই হোব্ব নির্ণীত জাতকে হোব্বে ছেরফা বলে। আসলে পরিচয় প্রদানের ইচ্ছা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে জাত পাকে আরও একটি অবস্থা আসিয়া যায় যাহা পরিচয় গ্রহীতার। পরিচয়দাতা ও পরিচয় গ্রহীতা- এই দুই অবস্থা জাতপাকে আসিয়া যাওয়ায় আল্লাহপাক পরিচয় গ্রহীতার অবস্থাকে জাত লাতাইনের বাহিরে তাইনে আওয়ালের শেষ প্রান্তে রাখিয়া দেন। ইহাই হোব্বে ছেরফা বা নিছক প্রেম যাহা প্রেম সাগরের নিগুঢ় প্রদেশ বা প্রেম রাজ্যের গুপ্ত কোঠা নামে পরিচিত। ইহা হকিকতে মুহম্মদীর আসলের আসল। অনাদি-অনন্ত জাতের একেবারেই নিকটে অবস্থিত। হোব্বে সেরফার পূর্ব পর্যন্ত ছালেক কদমী ছায়ের করিতে সক্ষম। এখান থেকে আর ঊর্ধ্বে ছালেক কদমী ছায়ের করিতে পারে না; শুধুমাত্র ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার মাধ্যমে জাত পাকের দিকে তাকাইয়া থাকিতে পারে।

আল্লাহপাকের অজুদ নামক এক বিশিষ্ট কামালাত আছে যাহা জাত ভিন্ন সমস্ত কামালাতকে বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছে। ইহা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল বা হকিকতে ইব্রাহিমী। এই অজুদকে একটি বৃত্ত ধরিলে তাহার যে কেন্দ্র হয় তাহাই হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর উৎপত্তিস্থল বা হকিকতে মুহাম্মদী। আর এই হকিকতে মুহাম্মদীর মূল হইল হকিকতে আহমদী। ইহার উপরে হোব্বে ছেরফা বা নিছক প্রেমের দায়েরা।

বিজ্ঞাপন

খোদাপ্রাপ্তির পথ দুইটি। একটি ইবাদতের পথ, অপরটি মহব্বতের পথ। ইবাদতহীন মহব্বতের কোন দাম নাই। আবার মহব্বতশূন্য ইবাদতের কোন মূল্য নাই। একটির সাথে অন্যটি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ছালেক দুই পথের দুই সর্বশেষ দায়েরা মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফায় পৌঁছাইয়া খোদাতায়ালার জাতপাকের দর্শন লাভকরিতে পারেন বটে কিন্তু জাত পাককে বুঝিতে না পারিবার যন্ত্রণায় সর্বদাই বিষণ্ণ বা দুঃখিত থাকেন। এই জীবনে তাই একবারও প্রাণ খুলিয়া তিনি হাসিতে পারেন না। দুনিয়াতে নিজেকে নিকৃষ্ট মনে করেন।

হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বলে, "আউয়ালু মা খালাকাল্ লাহু আকল" -আল্লাহ প্রথমে যাহা সৃষ্টি করিলেন তাহা হইল জ্ঞান। এই জ্ঞানকে আকলে মায়াদ বা উৎপত্তিস্থলগত জ্ঞান বলা হয়। হোব্বে ছেরফা এবং মাবুদিয়াতে ছেরফা- এই উভয় মাকাম বুঝিবার জন্য আকলে মায়াদ বা উৎপত্তিস্থলগত জ্ঞান একান্ত আবশ্যক।

খুবই অল্প সংখ্যক আরেফে কামেল রাসূলে করীম (সঃ) এর অনুসরণ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে উক্ত দুই মাকাম হাসিল করিয়াছিলেন। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামী দার্শনিক। তাহার পদাংক অনুসরণ করিয়া ইসলামী দর্শনের চরম শীর্ষে আরোহণ করেন হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব। আসমানের নীচে এই দুইজন সাধকের পীর স্বয়ং খোদাতায়ালা।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরে আমার পীর, জামানার নূর, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের মত এতবড় ওলী আর দুনিয়াতে আসেন নাই। ইসলামী দর্শনের বিভিন্ন মাকাম বা দায়েরা সমূহকে তিনি অতীব সুন্দর ভাবে মুরীদানদের শিক্ষা দিতেন।

মারেফাত লাভের জন্য প্রয়োজন নাফসের সাথে সংগ্রামঃ

তোমরা যদি খোদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিতে চাও, হোব্বে ছেরফা এবং মাবুদিয়াতে ছেরফা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া যদি পূর্ণাংগ মারেফাত অর্জন করিতে চাও, তাহা হইলে জামানার শ্রেষ্ঠ মুজদ্দেদ হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কঃ) ছাহেবের রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধর। জামানার মুজাদ্দেদ তিনিই হইতে পারেন, যাহার মাধ্যমে, যাহার অছিলায় সমকালীন সময়ের আব্দাল, আওতাদ, নোকাবা, নোজাবা, তথা সমস্ত ওলী-আল্লাহ আবশ্যকীয় কামালাত প্রাপ্ত হন। কাজেই এই তরিকার রজ্জু ধরিয়া তোমরা তোমাদের নাফসের সাথে, নাফসের কামনা-বাসনার সহিত সদা জেহাদ করিতে থাক। নাফসে আম্মারা তোমাদের দেহাভ্যন্তরে এক শত্রু। ইহা তোমাদের ঘরের শত্রু। আর বাহিরের শত্রু হইল শয়তান। ঘরের শত্রু আর বাহিরের শত্রু একত্রিত হইয়া তোমাদেরকে আল্লাহ হইতে দূরে সরাইতে সদা সচেষ্টবান। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বাহিরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রু তথা নাফসে আম্মারার শত্রুতাকে প্রাণনাশক বিষতুল্য বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই উভয় শত্রুর হাত হইতে যদি বাঁচিতে চাও, তবে পীরে কামেলের কদমকে নূহের তরী মনে করিয়া শক্ত করিয়া ধর এবং সদা সর্বদা নাফসের কামনা-বাসনার বিরোধিতা কর। নাফসের বিরোধিতা করিয়া হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রাযী (রঃ) ছাহেব কিভাবে খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিলেন সে প্রসংগে তাহার জীবনী থেকে নেওয়া একটি কাহিনী তোমাদের শুনাই। হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রাযী (রঃ) ছাহেব যৌবনে অতিশয় সুদর্শন ছিলেন। তাহার চেহারা সন্দর্শনে সকলেই মুগ্ধ হইত। যুবক ইউসুফের পেশা ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। একবার ব্যবসার উদ্দেশ্যে এক কাফেলার সাথে আরবের এক গোত্রে যাইয়া উপস্থিত হন। ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে কয়েকদিন সেই গোত্রেই তিনি অতিবাহিত করেন। ঘটনা ক্রমে আরবের গোত্র প্রধানের পরমাসুন্দরী এক কন্যার দৃষ্টি যুবক ইউসুফের উপর পতিত হয়। ইউসুফের অবস্থানের ঠিকানা সংগ্রহ করিয়া সুযোগমত এক নিশীথ রাতে সেই মেয়ে তথায় উপস্থিত হইয়া যুবকের প্রতি তাহার প্রেম বা আসক্তি প্রকাশ করিতে থাকে। এমন সুন্দরী যুবতীর প্রতি আকৃষ্ট না হইয়া তিনি বরং এই বিপদ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজিতে লাগিলেন।

বিজ্ঞাপন

একটা ছলনার আশ্রয় নিলেন। সুন্দরী কন্যাকে অপেক্ষায় থাকিতে বলিয়া তিনি ঘর হইতে বাহির হইয়া আর সে ঘরে ফেরত আসেন নাই। মহান খোদাতায়ালার শোকরিয়া আদায় করিয়া অন্ধকার রাত্রিতে তিনি সেই গোত্র হইতে বাহির হইয়া দৌড়াইতে লাগিলেন। অবশেষে নিশির শেষ ভাগে একটি বালুর ঢিপির উপর ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় দুই হাটুর মাঝে মাথা রাখিয়া বসিয়া পড়িলেন। তখনই তন্দ্রা আসিল। নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্নে দেখিলেন, তিনি অতিশয় মনোমুগ্ধকর এক স্থানে উপস্থিত হইয়াছেন যেখানে জাঁকজমকপূর্ণ তখতে উপবিষ্ট একজন সুদর্শন বাদশাহকে দেখিতে পাইলেন; যাহাকে পরিবেষ্টিত অবস্থায় সবুজ পোশাক পরিহিত একদল লোককে দন্ডায়মান অবস্থায় দেখিলেন। ইহা দেখিয়া তিনি আশ্চর্য হইয়া সেই সুদর্শন বাদশাহ এবং তাহার সংগীদের পরিচয় জানিবার জন্য অগ্রসর হইয়া সেই দলের একজনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভাই! এই সুদর্শন পুরুষটি কে? আর আপনারাই বা কাহারা? উত্তরে লোকটি বলিল, আমরা সকলেই ফেরেশতা আর তত্ত্বে সমাসীন ঐ বাদশাহ আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ (আঃ)। এই কথা শেষ করিয়াই পুনরায় বলিলেন, আমরা হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রাযীর দর্শন লাভের জন্য আসিয়াছি। হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রাযী (রঃ) বলেন, এই কথা শুনিয়া আমি অতিশয় লজ্জিত ও আনন্দিত হইয়া কাঁদিয়া ফেলিলাম এবং ভাবিলামঃ আমি এমন কে যে, পয়গম্বরে খোদা হযরত ইউসুফ (আঃ) ফেরেশতা বেষ্টিত অবস্থায় আমাকে দেখিতে আসিয়াছেন? আমি যখন মনে মনে এই সমস্ত কথা ভাবিতেছিলাম, ঠিক তখনই আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ (আঃ) সিংহাসন হইতে নামিয়া আমাকে আলিংগন পূর্বক তথায় লইয়া তাহার পার্শ্বে তখন্তের উপর বসাইলেন। আমি অতিশয় বিনয়ের সহিত তাহাকে বলিলাম, 'হে আল্লাহর নবী! আমার মত অধমের সাথে আপনার মত মহানের এমন ব্যবহারের কারণ কি?' পয়গম্বরে খোদা হযরত ইউসুফ (আঃ) বলিলেন, শুনুন! আরব সর্দারের রূপসী কন্যা নিশীথ রাত্রে আপনার কক্ষে আসিয়া তাহার নাফসের বাসনা পূর্ণ করিবার আবেদন জানাইলে আপনি খোদার ভয়ে ভীত হইয়া সেই মেয়েকে উপেক্ষা করিয়া দূরে পলায়ন করিলেন। আল্লাহপাক আপনার এই কাজে যারপরনাই খুশী হইয়া আপনার এই

ঘটনা আমার এবং সমুদয় ফেরেশতাদের নিকট প্রকাশ করিয়া বলিলেন, "হে ইউসুফ! জোলেখা যখন তোমার প্রেমে উন্মাদিনী হইয়া তোমার নিকট নিজের নাফসের কামনা প্রকাশ করিয়াছিল, তখন তুমি তাহার হাত হইতে ছুটিবার চেষ্টা করিয়াছিলে, আর তোমারই নামের আর এক ইউসুফকে দেখ, আরব-সর্দারের কন্যা অসাধারণ রূপ-লাবণ্য লইয়া যখন নির্জন নিশীথে তাহার নিকট নাফসের বাসনা পূরণের জন্য আবেদন জানাইল, সে তখন আমারই ভয়ে সেই মেয়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া তথা হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করিল। তুমি ফেরেশতাগণসহ তাহার নিকট যাও, তাহাকে আউলিয়া শ্রেণীভুক্ত করিবার খোশখবর শুনাইয়া আস। তাহাকে বলিও যে, প্রত্যেক যুগেই আমি একজন মানুষকে লক্ষ্যস্থল করিয়া রাখি। বর্তমান সময়ে লক্ষ্যস্থল হযরত যুনুন মিছরী (রঃ)। অতএব তুমি তাহার নিকট যাও এবং তাহার নিকট হইতে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব শিক্ষা কর।" এই অর্থবহ স্বপ্ন দেখিয়া হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন (রঃ) ছাহেব ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, এখন তিনি কি করিবেন। তিনি ব্যবসা বাণিজ্য ধীরে ধীরে ছাড়িয়া দিয়া অবশেষে হযরত যুনুন মিছরী (রঃ) ছাহেবের সন্ধানে বাহির হইলেন। দীর্ঘদিন খোঁজাখুজির পরে মিসরে গমনপূর্বক তাহার হাতে মুরীদ হইয়া খেদমত করিতে লাগিলেন। বেশ কয়েক বছর পীরের কঠিন খেদমত করিয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিল করিলেন।

ভাবিয়া দেখ, শরিয়তের নির্দেশিত পথে চলিয়া, নাফসের বিরোধিতা করিয়া হযরত ইউসুফ (রঃ) ছাহেব খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন পূর্বক কিভাবে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিল করিলেন

খোদাপ্রাপ্তির পথে প্রয়োজন পীরের অগাধ মহব্বতঃ

পীরে কামেলের খেদমতের মুখ্য উদ্দেশ্য পীরের মহব্বত দেলে পয়দা করা। পীরের মহব্বত দেলে পয়দা হইলে আল্লাহ রাসূলের মহব্বত লাভ করিতে পারিবে। পীরের মহব্বত এই রাস্তার প্রধান মূলধন। আপন ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ এবং নিজের জীবনের চেয়েও পীরকে অধিক ভালবাসিতে হইবে। তবেই তোমাদের জন্য এই পথে অগ্রসর হওয়া সহজতর হইবে।

এই পথে যাহারা সফলতা অর্জন করিয়াছেন, তাহারা প্রত্যেকেই আপন পীরকে নিজের জীবনের চেয়েও অধিক মহব্বত করিয়াছেন। তরিকতের ইমাম হযরত বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব পীরকে কতখানি মহব্বত করিতেন, তাহ শুন।

হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের পীরের নাম হযরত আমীর সৈয়দ কুলাল (রঃ)। একদা হযরত বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব তাহার পীর হযরত সৈয়দ কুলাল (রঃ) ছাহেবের খেদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য বোখারা হইতে নাসাফের দিকে যাইতেছিলেন। তাহার মন পীরের বিরহ যন্ত্রনায় কাতর ছিল। পথিমধ্যে খেরকাধারী একজন অশ্বারোহী তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাহার সহিত কিছু কথাবার্তা বলিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। কিন্তু পীরের ধ্যান থেকে মন অন্যদিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বিধায় তিনি পথিকের সাথে কথাবার্তা বলিলেন না। তিনি যখন তাহার পীরের কদমে পৌঁছাইলেন, পীর হযরত সৈয়দ কুলাল (রঃ) ছাহেব তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "বাবা বাহাউদ্দিন! পথিমধ্যে খেরকাধারী একজন অশ্বারোহী [যিনি হযরত খিজির (আঃ) ছিলেন। তোমার সহিত সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন অথচ তুমি তাহার দিকে মনোযোগ দিলে না কেন?” হযরত বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "হুজুর, আমি আমার পীরের খেদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য বহুদূর হইতে আসিতেছিলাম। পীরের অদর্শনে আমার হৃদয় ছিল যন্ত্রণা-কাতর। তাই পথিমধ্যে পীরের লক্ষ্য ভিন্ন অন্য কোন দিকে মনোযোগ দেওয়ার কোন শক্তিই আমার ছিল না।" পীরকে এমনি মহব্বত করিয়া হযরত বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব খোদাপ্রাপ্তির রাস্তায় সফলতার চরম শিখরে আরোহণ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন।

খোদাপ্রাপ্তির পথে আদব, বুদ্ধি মহব্বত ও সাহস- এই চারটি মানবিক বৃত্তি বা স্বভাবের পূর্ণ বিকাশ একান্তই আবশ্যক। উক্ত চারটি গুণাবলী পূর্ণমাত্রায় বিকশিত না হওয়া পর্যন্ত খোদাপ্রাপ্তির এই দুর্গম পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।

আদব- পীরের হাতে মুরীদকে এমন ভাবে থাকিতে হইবে যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা। ইহাই আদব। বেয়াদবের উপর আল্লাহর রহমতের বারি বর্ষে না।

বুদ্ধি- পীরের যাবতীয় কথাই ইশারাপূর্ণ থাকে। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছাড়া পীরের ইশারাকে বুঝা সম্ভব নয়।

মহব্বত- নিজের সবকিছুর চাইতে এমনকি জীবনের চাইতেই পীরকে অধিক মহব্বত করা মুরীদের একান্ত কর্তব্য। পীরের মহব্বত ব্যতীত এই পথে এক কদমও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।

সাহস- পীরের হুকুম বা আদেশ প্রতিপালনের জন্য অসীম সাহসের প্রয়োজন। অদম্য বুকের পাটা ছাড়া পীরের কঠিন হুকুম পালন করা সম্ভব হয় না।

আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-ইহাদের মধ্যে মহব্বতই শীর্ষে। পীরের মহব্বত দেলে উৎপন্ন হইলে আদব, বুদ্ধি ও সাহস ধীরে ধীরে বিকশিত হইতে থাকে। মহব্বত যেন ইমামতুল্য; আর আদব, বুদ্ধি, সাহস যেন মোক্তাদী তুল্য।

আমার পীর, আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতের সূর্য, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব আপন পীরকে এমনি ভালবাসিতেন যে তাহার তুলনা আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। পীরের মহব্বতে তাহার দেল সর্বদাই কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকিত। তাই পীরের যে কোন নির্দেশ পালন করিতে তিনি জীবনপন চেষ্টা করিতেন। নিজের জীবনের চেয়েও তিনি যে আপন পীরকে অধিক মহব্বত করিতেন, তাহা পীরের দরবারে খেদমতরত অবস্থায় পীরের বিভিন্ন নির্দেশ পালনের মধ্যে ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমার দাদাপীর হযরত শাহ্সূফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রঃ) ছাহেবের খানকা শরীফ প্রথমে মেহেদী বাগে ছিল, পরে তাহা গোবরা শরীফে স্থানান্তর করা হয়। গোবরা অঞ্চলটি কলিকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে প্রচন্ড মশকের উপদ্রব ছিল। মশার দংশনে সকলেই অতিষ্ঠ থাকিত। হযরত খাজা শাহ্সূফী সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রঃ) ছাহেব এশার নামাজান্তে কিছুক্ষণ মোরাকাবা করিয়া নিদ্রা যাইতেন এবং শেষ রাত্রিতে নিদ্রা হইতে জাগিতেন। এই কয়েক ঘন্টা তাহাকে বেতির তৈরী ভারী পাখা দ্বারা বাতাস করিতে হইত। বাতাস করিবার জন্য মূলতঃ চারজন খাদেম নিয়োজিত ছিলেন, যাহাদের মধ্যে আমার পীর কেবলাজান অগ্রগণ্য।

একদিন আমার পীর হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব আমাকে নির্দেশ করিলেন বাতাস করিবার জন্য। আমি বাতাস করিতে লাগিলাম কিন্তু পাখা ছিল বেতির তৈরী, অত্যন্ত ভারী। পাঁচ (৫) মিনিট বাতাস করিতে না করিতে আমার হাতে জড়তা আসিল। আমি যেন পাখা ঘুরাইতে অপারগ হইয়া পরিলাম। আমার এই অক্ষমতা দেখিয়া পীর কেবলাজান আমাকে বলিলেন, "বাবা, পাঁচ (৫) মিনিট বাতাস করিতে পার না। অথচ শুন, আমার জীবনের এক রাতের একটি ঘটনা। তিনি বলিলেন, আমরা চারজন খাদেম পীর কেবলাজানকে বাতাস করিতাম। একদা এক রাত্রিতে হুজুর কেবলাজান শুধু আমাকেই তাহার শয়নকক্ষে আহবান পূর্বক সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ করিয়া দিতে বলিলেন। অন্যান্য খাদেম শয়নকক্ষে প্রবেশ করিতে পারিলেন না। এশার নামাজ শেষে মোরাকাবা মোশাহাদা অন্তে হুজুর কেবলাজান নিদ্রামগ্ন হইলেন। আমি বাতাস করিতে লাগিলাম। অন্যান্য তিন জাকের ভাইকে সুকৌশলে কক্ষে প্রবেশ করিতে দেওয়া হয় নাই। আমি একাই বাতাস করিয়া চলিয়াছি। আমাকে নির্লিপ্ত দেখিয়া মশককুল মহানন্দে দংশন করিয়া চলিয়াছে। কলিকাতার মশা যেন জীবন্ত মানুষ খাইয়া ফেলে। কিন্তু মশা তাড়ানোর কোন পথই ছিল না। কেবলাজান হুজুরের ঘুমের ব্যাঘাত হইবে ভাবিয়া পাখা থামাইয়া মশা তাড়ানোর কোন চেষ্টাও করি নাই। মনে মনে ভাবিলাম, মশকের দল যদি দেহের সমস্ত রক্তও চুষিয়া নেয় তথাপিও বাতাস করা বন্ধ করিব না। প্রতিরাত্রে পীর কেবলাজান রহমতের সময়ে জাগিয়া উঠেন। কিন্তু আজ ফজর নামাজের পূর্ব পর্যন্ত গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন রহিলেন। এদিকে মশক কুলের দংশনে আমার সমস্ত শরীর হইতে সদ্য জবাইকৃত ছাগলের রক্তের মত রক্ত নির্গত হইয়া জামা-কাপড় রঞ্জিত করিতে লাগিল। পীর কেবলাজান জাগিয়া উঠিয়া আমার অবস্থা দৃষ্টে বলিলেন, "সর্বনাশ, তোকে তো মশায় খাইয়া ফেলিয়াছে। তুই কি হাতও বদলাইতে পারিস নাই?" আমি নিশ্চুপ রহিলাম। আমাকে দেখিয়া পীর কেবলাজান আফসোস করিলেন। তাহার হৃদয়সমুদ্রে মহব্বতের ঢেউ উঠিল। আমাকে দয়া করিয়া কবুল করিলেন এবং কদমের নীচে জায়গা দিলেন।

এমনি কঠিন খেদমতের মধ্যে দিয়া, দুঃখ-কষ্টের ভিতর দিয়া পীর কেবলাজান তদীয় পীর ছাহেবকে বাধ্য করিয়াছিলেন। কিন্তু আমি নাদান, গোনাহগার, আমার পীরের তেমন কোন খেদমত করিতে পারি নাই। তবে আমার জীবন বহু দুঃখ-কষ্টের ভিতর দিয়া অতিবাহিত হইয়াছে। চরম দুঃখ-কষ্ট এবং দরিদ্রতা সত্ত্বেও আমি আমার পীরের কদম ছাড়ি নাই। তাই একদিন পীর কেবলাজান আমাকে বলিলেন, "তোর দাদা পীর আমাকে যেমন তাঁহার কদমের নীচে জায়গা দিয়াছিলেন। আমিও তোকে তেমনি আমার কদমের নীচে রাখিয়া দিলাম।"

তাই বলি, হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়লাকে পাইতে চাও, এই অমূল্য নেয়ামত যদি হাছিল করিতে চাও, তবে কঠিন খেদমত করিয়া পীরের মহব্বত দেলে পয়দা কর এবং পীরকে বাধ্য করিবার আপ্রাণ- চেষ্টা কর। একবার পীরকে রাজী বা সন্তুষ্ট করিতে পারিলে আর তোমাদের ভয় থাকিবে না। মহা কবি হাফেজ বলিয়াছেন, "তোমরা যদি আমার পীরকে বাধ্য করিয়া দিতে পার তবে সমরখন্দ ও বোখারার সিংহাসন তোমাদের বিলাইয়া দিব।” পীরকে তিনি কতখানি ভালবাসিতেন যে, সর্বশ্রেষ্ঠ সিংহাসন বলিয়া পরিচিত সমরখন্দ ও বোখারার সিংহাসন তাহার পীরের সন্তুষ্টির নিকটে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ছিল। তাই মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন,

"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল

হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"

যেইমাত্র তুমি তোমার পীরের যাতকে কবুল করিলে, তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসাবে, রাসূলে করীম (সঃ) তোমাকে উম্মত হিসাবে কবুল করিলেন। আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি তুমি তখনই পাইলে যখন পীরের তরফ থেকে স্বীকৃতি পইলে।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, " আল্লাহতায়ালার রেযা বা সন্তুষ্টিকে পীরের রেযা বা সন্তুষ্টির পশ্চাতে রাখা হইয়াছে। মুরীদ যতক্ষণ না নিজেকে স্বীয় পীরের সন্তুষ্টির মধ্যে বিলীন করিয়া দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহতায়ালার রিযামন্দী বা সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয় না।"

কাজেই পীরের ইচ্ছাতে নিজেকে বিলীন করিতে হইবে। পীরের প্রতি সন্দেহ বা পীরের কথার কোন প্রতিবাদ চলিবে না। পীরের প্রতি কোনরূপ সন্দেহ মুরীদের জন্য জীবনধ্বংসকারী বিষতুল্য। পীর যখন যাহা নির্দেশ করেন, দ্বিধাহীনচিত্তে তাহা পালন করিতে হইবে। কবিপ্রবর হাফেজ বলেন,

 "ব মায়ে ছাজ্জাদা রুংগিকুন গারব পীরে মগা গুয়েদ

কে ছালেক বে খবর না বুয়াদ যে রাহও রেছমো মঞ্জেল হা।”

অর্থাৎ-'তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ সিক্ত করিয়া তাহার উপর নামাজ পড়িতে বলে, তুমি তাহাই কর। কারণ, মোকাম মঞ্জিলের পথ তিনিই তোমার চেয়ে ভাল জানেন।'

কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, পীরের হুকুম যথাযথ পালন করিয়া পীরের মহব্বত দৃঢ়ভাবে দেলে পয়দা কর। পীরের মহব্বত দেলে পয়দা হইলে আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত তোমাদের দেলে পয়দা হইবে। তোমরা অনাবিল শান্তির অধিকারী হইতে পারিবে। মহাকবি হাফেজ আরও বলেন,

"বদে ছাকী মায়ে বাকী কেদর জান্নাত না খাহিয়াফত

 কেনারে আবে রুখনাবাদ অগুল গাশত মোছাল ধারা।"

অর্থাৎ-আজ রুখনাবাদ দরিয়া হইতে এমন একটি লজ্জত আমি পাইতেছি, যে লজ্জত বেহেশতেও মিলিবে না। সেই রুখনাবাদ দরিয়া হইল আমার পীরের দেল।

কাজেই খোদাপ্রাপ্তির পথে প্রথম ধাপই হইল পীরের দেল। তাই বলা হয়, আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের সাথে আপন পীরের পাক কদম জড়াইয়া ধর এবং তাহার পাক দেলের সহিত তোমার নাপাক দেল মিশাও। এমনি ভাবে মিশাও যেমন দুধের সাথে চিনি। দুধের সাথে চিনি মিশ্রিত করিলে চিনির অস্তিত্ব দুধের সাথে মিশিয়া এক উত্তম স্বাদ বা লজ্জতের সৃষ্টি করে। তেমনি তোমরা যদি তোমাদের দেলকে পীরের দেলের সহিত মিশাইতে পার, তাহা হইলে আল্লাহর ভেদের এমনি এক লজ্জত তোমরা পাইবে, হাফেজ বলেন, যে লজ্জত বেহেশতেও মিলিবে না।

পীরের মহব্বত যদি তোমাদের দেলে পয়দা হয়, তাহা হইলে পীরের অদর্শনে তোমরা সদা কাতর থাকিবে। আমার জীবনের একটা ঘটনা, তোমরা মনোযোগ দিয়া পড়। আমি তখন আমাদের পাকুরিয়া গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান করি। একদিন আছর নামাজান্তে হঠাৎ আমার মন পীর কেবলাজানকে দেখিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিল। বিরহ-যন্ত্রণার আগুন যেন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। আমার বিমাতাকে (যিনি আমার আম্মাজানের ইন্তেকালের পর আমাকে প্রতিপালন করিয়াছেন) বলিলাম, "আম্মাজান! আমার মন ভাল লাগিতেছে না। আমি আমার পীরের সান্নিধ্যে এনায়েতপুর দরবার শরীফে যাইব।" তিনি বলিলেন, "সন্ধ্যা আগত প্রায়। এখন তুমি কিভাবে যাইবে?” বলিলাম, "এক ব্যবস্থা হইবেই। আমি আমার পীরকে না দেখিয়া থাকিতে পারিতেছি না।" আম্মাজানকে কদমবুচি করিয়া একটি জামা, একটি লুংগী ও বিছানার একটি চাদর হাতে লইয়া আমি শেরপুরের দিকে রওয়ানা হইলাম। যখন শেরপুর পৌঁছাইলাম, তখন দিনমণি ডুবু ডুবু প্রায়। কোন যানবাহনই তথায় ছিল না। সমস্ত গাড়ী ব্রহ্মপুত্রের তীরে আগত বৈকালীন ট্রেনের যাত্রী আনয়নের জন্য গিয়াছে। অবশেষে আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াইতে শুরু করিলাম। সারা শরীর ঘামে ভিজিয়া গেল। দৌড়াইতে দৌড়াইতে শেষ পর্যন্ত রাত্রি ১০টা নাগাদ ব্রহ্মপুত্রের তীরে গুদারা ঘাটে আসিয়া পৌঁছাইলাম। গুদারা অন্য পার্শ্বে চলিয়া গিয়াছে। দু'চারবার ডাকাডাকি করাতেও কোন সাড়াশব্দ মিলিল না। নিঝুম রাত্রি। চরিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। জনমানবের কোন সাড়াশব্দ নাই। শৃগালের ভয়ংকর আর্তনাৎ। সব কিছু মিলিয়া যেন এক ভুতুড়ে পরিবেশ। এর মধ্যেই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করিয়া অপেক্ষায় থাকিলাম। প্রায় ঘন্টা খানেক অতিবাহিত হইল। ঘন্টা খানেক পরে একজন দারোগা দুইজন পুলিশসহ তথায় উপস্থিত হইলেন। দারোগা সাহেবের ডাকে গুদারামাঝী গুদারা লইয়া এপারে আসিল। তৎপর গুদারায় করিয়া ঐপারে পৌঁছাইলাম। মাঝিকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলিল যে, রাত্রিকালীন নয় (৯) টার ট্রেন চলিয়া গিয়াছে। নদীর চরা পার হইয়া উপরে উঠিতে উঠিতে রাত্রি এগার (১১) টা বাজিল। শহরে মামা বাড়ী ছিল। ভাবিলাম রজনী মামার বাড়ীতে থাকিব। পরক্ষণেই মন প্রতিবাদ করিয়া বলিল, "তুমি তো তোমার মামার বাড়ীতে রাত্রিযাপনের জন্য আস নাই। তোমার পীরের দরবারে যাওয়ার জন্য বাড়ী হইতে বাহির হইয়াছ। পথিমধ্যে কাহারো বাড়ীতে অবস্থানের কোন অধিকারই তোমার নাই।" অতঃপর স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পথিমধ্যে জনমানব দেখিলে হাটিয়া চলি, আবার জনশূন্য দেখিলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াই। এমনি করিয়া স্টেশন পেন্ডেলে রাত্র একটা নাগাদ পৌছাইলাম। সেখান থেকেও স্টেশনের টিকেট বিক্রয়ের কাউন্টার প্রায় অর্ধমাইল দূরে অবস্থিত। দ্রুত দৌড়াইয়া সেখানে পৌঁছাইলাম। আমার সারা গা ঘামে সিক্ত যেন সদ্য গোছল করিয়া আসিয়াছি। অবশ্য কিছু দূর হইতে দেখিলাম, একটা ইঞ্জিনে ধুয়া নির্গত হইতেছে।

আমার মনের এক পক্ষ বলিতে লাগিল, গাড়ী নিশ্চয় তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তৎক্ষণাৎ আরেক পক্ষ বলিয়া উঠিল, তুমি বুঝি ভারী ওলী-আল্লাহ হইয়া গিয়াছ যে গাড়ী তোমার জন্য অপেক্ষা করিবে। অতঃপর নিকটে যাইয়া দেখিলাম কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার ট্রেনের ইঞ্জিন পরীক্ষা করিতেছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "ট্রেন কোথায় যাইবে?" তিনি বলিলেন, "জগন্নাথগঞ্জে।” আমি বলিলাম সে ট্রেনতো নয় (৯) টায় আসিবার কথা। তিনি বলিলেন, নয়টার সময়ই আসিয়াছে। কিন্তু সেই হইতে ইঞ্জিনে কি যে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়াছে, এতক্ষণ চেষ্টা করিয়াও ইঞ্জিনিয়ারদের চোখে কোন ত্রুটি ধরা পড়িল না। অথচ গাড়ী স্টার্ট হইতেছে না। টিকেট কাউন্টারে গিয়া দেখি, জানালা বন্ধ। টোকা দিতেই মাস্টার জানালা খুলিয়া টিকিট চাইতেই বলিলেন, কি করিবেন টিকেট লইয়া? ইঞ্জিনতো নষ্ট। বলিলাম, "সবারই যাহা হয়, আমারও তাহাই হইবে।" টিকেট সংগ্রহ করিয়া সোজাসুজি ট্রেনের কামরায় গিয়া এক হিন্দু ভদ্রলোককে দেখিলাম। তাহাকে বলিলাম, "আমাকে কি একটু বসিতে দিবেন।" তিনি একটু সরিয়া আমাকে বসিবার জায়গা করিয়া দিলেন। আমি বসিয়া চক্ষু বন্ধ করিয়া পীরের কদম ধরিয় দরখাস্ত করিয়া বলিলাম, "কেবলাজান! এত দুঃখকষ্ট করিয়া আসিলাম। এখন এখানে যদি আটকাইয়া থাকি। তাহা হইলে কিইবা ফল হইবে। মনে মনে এই দরখাস্ত করিতেই আমি দেখিলাম, পীর কেবলাজান আমাকে বলিতেছেন, "চিন্তা করিও না। আর এক মিনিট পরে ট্রেন ছাড়িবে।" কামরা হইতে সোজাসুজি স্টেশনের ঘড়ি দেখা যায়। ঘড়ির পানে তাকাইয়া রহিলাম। ঠিক এক মিনিট শেষ হইতে না হইতেই ইঞ্জিনে স্টার্ট হইল। হুংকার দিয়া ট্রেন দ্রুতবেগে চলিতে শুরু করিল। সম্মুখের কোন স্টেশনে আর গাড়ী থামিল না, গতি মন্থর করিল মাত্র। তারপর রাত্র চারটা নাগাদ ট্রেন জগন্নাথগঞ্জে পৌঁছাইল। ট্রেন থেকে নামিয়া দ্রুতবেগে দৌড়াইয়া স্টীমারে উঠিলাম। একটা চাদর আমার নিকট ছিল। স্টীমারে এক পার্শ্বে একটি জায়গা করিয়া তথায় চাদর বিছাইয়া বসিয়া পড়িলাম। মন অনেকটা শান্ত হইল। এক কাপ চা পান করিলাম। স্টীমার চলিতে লাগিল। অবশেষে বেলা দশ (১০)টার দিকে স্টীমার সোহাগপুর ঘাটে পৌঁছাইল। স্টীমার হইতে নামিয়া আমি দৌড়াইতে দৌড়াইতে বেলা এগার (১১) টার দিকে দরবার শরীফে পৌঁছাইয়া দেখিলাম, কেবলাজান হুজুর শেওরা তলায় বসিয়া আছেন। আমাকে দেখামাত্র খানা খাওয়ার নির্দেশ দিলেন। পীর কেবলাজানকে দেখামাত্রই আমার অশান্ত দেল শান্ত হইল। বিরহ অগ্নি যেন নির্বাপিত হইল। আমি খানা খাওয়া শেষে কেবলাজানের নিকটে আসিলে তিনি আমাকে বিশ্রামের নির্দেশ দিলেন।

কাজেই চিন্তা করিয়া দেখ, পীরের দয়ায় কি না হয়। চলন্ত ট্রেনকে পর্যন্ত থামাইয়া রাখিলেন তাহার একজন সাধারণ মুরীদের জন্য। তিনি উচ্চ ক্ষমতাধারী আধ্যাত্মিক দৃষ্টিসম্পন্ন উচু স্তরের এক ওলী ছিলেন। যাহার ক্ষমতার কোন পারাপার নাই।

তোমরা পীরকে ভালবাস। পীরের ভালবাসা দেলে পয়দা হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব তোমরা সহজে হাছিল করিতে পারিবে। তরিকার নিয়মানুযায়ী চল। মহান খোদাতায়ালাকে ভুলিও না। তিনি তোমাদের কত ভালবাসেন। তাহার দয়ায় গাছে ফল হয়, পানিতে মাছ হয়, জমিনে শস্য হয়। তোমরা কতকগুলো ধান জমিতে ছিটাইয়া আস। তৎপর তিনিই এই ধান থেকে গাছ উৎপন্ন করেন। তিনি আবার আসমানের পানি দিয়া গাছগুলোকে সতেজ করেন। সেই গাছগুলোতে আবার ধান হয় তাঁহারই ইচ্ছায়। তোমরা সেগুলোকে কাটিয়া আন। তিনি যখন তোমাদের এতই ভালবাসেন, তাহাকে স্মরণ করা কি তোমাদের উচিত নয়? মহা কবি হাফিজ বলেন,

"যে দিল করুণা করি যুগল নয়ন

উচিত কি নয় তার রূপ দরশন?"

যিনি তোমাকে একটি চক্ষুর পরিবর্তে দুইটি চক্ষু দান করিলেন সেই চক্ষু দিয়া তাহাকে দেখিবার চেষ্টা করা কি তোমাদের উচিৎ নয়?

"যে দিল করুণা করি রসনা ললিত

কেনরে না গাও তার মহিমার গীত?"

যিনি তোমাকে দয়া করিয়া এমন সুন্দর জবান তৈরী করিয়া দিলেন, সেই জবান দিয়া তাহাকে ডাকা কি তোমাদের উচিৎ নয়?

"হাফেজ করিবে যদি মহত্ত্ব প্রলাপ

তরুর মত কর আপন স্বভাব।"

হাফেজ বলেন, তোমরা গাছগুলোর দিকে তাকাইয়া দেখ, গাছগুলো যখন ফলবান হয়, তাহাদের মাথা নীচের দিকে ঝুঁকিয়া পড়ে। অথচ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে তোমরা অহংকার ও দাম্ভিকতার সহিত বুক ফুলাইয়া চল। তোমরা অহংকার ত্যাগ কর, দাম্ভিকতা দূর কর। আল্লাহর নাম দেলে অংকিত কর। আল্লাহপাক তোমাদের কবুল করুন। দু'আ। ইতি!

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD