Logo

জাত, সিফাত, এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরী সম্পর্কে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২১ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৩১
জাত, সিফাত, এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরী সম্পর্কে আলোচনা
ছবি: সংগৃহীত

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘জাত ও সিফাত’بسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

বিজ্ঞাপন

জাত (সত্ত্বা), সিফাত (গুণাবলী), এলমে হুছুলী ও এলেম হুজুরী সম্পর্কে আলোচনাঃ

খোদাতায়ালার সত্ত্বাকে জাত বলা হয় এবং গুণাবলীকে সিফাত বলা হয়। জাত ও সিফাতের জগতকে চিরস্থায়ী হাকীকী জগৎ বলা হয়। জাত ও সিফাতের বাহিরে অর্থাৎ হাকীকী জগতের নিম্ন হইতে এই পৃথিবী পর্যন্ত যাহা কিছু সৃষ্ট-তাহা সবই ছুরাত বিশিষ্ট অস্থায়ী জগৎ। সৃষ্টির হকিকত ছিল সিফাতের মধ্যে। সিফাতস্থিত সেই হকিকতসমূহের প্রতি 'কুন' আদেশ আসিয়াছিল। ফলে সিফাতস্থিত হকিকতসমূহ প্রথমে সূক্ষ্ম আকৃতিতে আলমে আরওয়াহতে এবং পরবর্তীতে স্কুল আকৃতিতে এই পৃথিবীতে বা আলমে খাল্কে আসিয়াছে। এই পৃথিবী হইতে আমাদিগকে "অইন্না ইলাইহে রাজেউন”-এর পথ ধরিয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছাইতে হইবে, খোদাতায়ালার নৈকট্য অর্জন করিতে হইবে। সৃষ্টির উদ্দেশ্য ইহাই। আল্লাহপাক তাহার পরিচয় প্রদানের জন্যইতো আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন। পবিত্র জাত জগতে প্রথমে পরিচিতি বাসনা জাগ্রত হয়-যাহার পরিণাম এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড। তাই এই বিশ্ব জগৎ খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রকাশস্থল বা আবির্ভাব স্থল। কিন্তু খোদাতায়ালার জাত রাজ্যের জ্ঞান একমাত্র মানুষই অর্জন করিতে পারে। অন্য কোন সৃষ্ট যেমন ফেরেশতা বা জ্বিনকে তেমন ক্ষমতা দেওয়া হয় নাই।

খোদাতায়ালাকে জানা বা চেনা অর্থাৎ জাত ও সিফাতের পরিচয় জ্ঞান অর্জন করা মানুষের কর্তব্য। কিভাবে মানুষ সেই জ্ঞান অর্জন করিবে? জাত যেমন দুর্বোধ্য ও অবর্ণনীয়, সিফাত তেমনি অবর্ণনীয় ও অতুলনীয়। কোন দৃষ্টান্ত দিয়া জাত ও সিফাতকে বুঝা যায় না, চিন্তা বা কল্পনায় জাত সিফাতকে ধরা যায় না, এমনকি কাশফেও আল্লাহর জাতের দর্শন মিলে না। সাধারণ বোঝাবুঝির বহু ঊর্ধ্বে জাত ও সিফাত। সেই হাকীকী রাজ্যে আমাদের বোঝাবুঝির জ্ঞান প্রবেশ করিতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

তবে কি আল্লাহতায়ালা সম্পর্কে মানুষ কিছু জানিতে পারিবে না? আল্লাহতো পরিচয় প্রদানের জন্যই মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞান যদি জাত ও সিফাত রাজ্যে প্রবেশ করিতে না পারে, তবে কিভাবে মানুষ সেই হাকীকী রাজ্যের জ্ঞান অর্জন করিবে? সে ব্যবস্থাও আল্লাহতায়ালা করিয়াছেন। সেই উদ্দেশেই যুগে যুগে নবী-রাসুল প্রেরণ করিয়াছেন, নবুয়তী শেষ হওয়ার পরে নবুয়তের যোগ্যতা ও মর্তবাসহ ওলীয়ে কামেলদেরকে প্রেরণ করিতেছেন।

নবী রাসূলগণ কর্তৃক প্রদর্শিত পথই হইল জাত ও সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের উপায়। সকল নবী ও রাসূল (আঃ) গণের মধ্যে দয়াল নবী (সাঃ) জাত ও সিফাত সম্পর্কীয় পূর্ণাংগ জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন। তিনিই নিছক জাতের অবাধ মিলন বা ফানা ও বাকা লাভ করিয়াছেন। অন্যান্য সকল নবীই আপন আপন যোগ্যতানুযায়ী তাজাল্লীয়াতে জাত লাভ করিয়াছেন; কিন্তু নিছক জাতের অবাধ মিলন আর কেহই লাভকরেন নাই। কিভাবে দয়াল নবী নিছক জাতের সহিত নিবিড়তম মিলন লাভ করিলেন, জাতে ফানা বাকা প্রাপ্ত হইলেন, জাতের জ্ঞান লাভকরিলেন; সে সম্পর্কে এই নসিহতেরই শেষের দিকে আলোচনা করিতেছি।

রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে যাহারা খোদাতায়ালার দিকে অগ্রসর হন, তাহাদের অনেকে জাত ও সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে সক্ষম হন। তবে খুবই অল্প সংখ্যক সাধক নিছক জাতের সান্নিধ্য লাভ করিতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

খোদাতায়ালাকে চেনার যাত্রা শুরু হয় এই জড় জগৎ হইতে। জড় জগতের এই পৃথিবীই আল্লাহ থেকে সর্বাপেক্ষা দূরে বা নিম্নে অবস্থিত। এই পৃথিবী থেকে খোদাকে পাওয়ার সাধনা শুরু হয়, শেষ হয় পবিত্র জাতে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই যাত্রাপথে দুইটি আধ্যাত্নিক ইউনিভার্সিটিতে (University) অধ্যায়ন সমাপ্ত করিতে হয়। ইউনিভার্সিটি দুইটি যথাক্রমে: এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরী। উল্লিখিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (এলমে হুছুলী ও হুজুরী) এর বিশ্লেষণ এখানে খুবই প্রয়োজন। কারণ এলমে হুজুরী সম্পর্কে না জানিলে জাত ও সিফাত সম্পর্কে কিছুই জানা যাইবে না। জাত সিফাতের জ্ঞান অর্জনের জন্য এলমে হুজুরী অধ্যায়ের জ্ঞান প্রয়োজন। আবার এলমে হুজুরীকে বুঝিতে হইলে এলমে হুছুলীর প্রয়োজন। এই কারণেই খোদাতায়ালাকে চিনিতে বা জানিতে হইলে উভয় অধ্যায়ের বা প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানার্জন অত্যাবশ্যক।

উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান দুইটির অন্তর্ভুক্ত যে সকল অধ্যায়-সেই সকল অধ্যায়ে নিহিত বিভাগ সমূহের নামীয় পরিচয় এই ক্ষেত্রে দরকার।

প্রথমেই আসে দায়েরায়ে এমকান বা সৃষ্ট জগৎ-যাহা অস্থায়ী ও ধ্বংসী। আলমে খালক বা জড় জগৎ ও আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগৎ-এই দুইভাগে বিভক্ত হইল দায়েরায়ে এমকান বা সৃষ্টির বৃত্ত। পৃথিবী হইতে সপ্ত আসমান ঊর্ধ্বে আরশ পর্যন্ত আলমে খালকের ক্ষেত্র। আরশ হইতে প্রতিবিম্বের জগতের পূর্ব পর্যন্ত আলমে আমর অবস্থিত।

বিজ্ঞাপন

দায়েরায়ে এমকান বা আলমে খাল্ক ও আলমে আমরের উপরে আছে বেলায়েতে ছোগরা জগৎ-যাহা আসমা (নামসমূহ) ও সিফাত (গুণাবলী) এর প্রতিবিম্বিত নূরময় জগৎ বলিয়া পরিচিত।

বেলায়েতে ছোগরার উপরে আছে বেলায়েতে কোবরা-যাহা কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত। যথা-আকরাবিয়াত, মহব্বতে আওয়াল, মহব্বতে ছানী ও কাওছ। বেলায়েতে কোবরাকে নবীদের বেলায়েতের দায়েরা বলা হয়। প্রকৃত সিফাতের জগৎ শুরু এই আকরাবিয়াত হইতে। আকরাবিয়াত হইতে কাওছ পর্যন্ত তিনটি অধ্যায়ই সিফাতে হাকীকীর অধ্যায়। তিনটি অধ্যায়েই ছালেক সিফাতি নূর প্রাপ্ত হয়।

বেলায়েতে কোবরার উপরে আছে বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা। ইহা ফেরেশতাদের বেলায়েত। এখানে খোদাতায়ালার জাত মিশ্রিত সিফাতি নূর পাওয়া যায়। বেলায়েতে উলিয়ার ঊর্ধ্বে আছে কামালাতের তিনটি অধ্যায়। যথা কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত ও কামালাতে উলুল আজম। কামালাতে নবুয়ত হইতে ঊর্ধ্বের সবগুলো দায়েরাতে ছালেক আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়াতে জাত বা জাতি নূরের কারেন্ট প্রাপ্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

কামালাতে উলুল আজম হইতে জাতমুখী দুইটি পথ বর্তমান। একটি হকিকতে এলাহিয়া, অপরটি হকিকতে আম্বিয়া। একটি ইবাদতের পথ, অন্যটি মহব্বতের পথ। ইবাদতের পথ তথা হকিকতে এলাহিয়ার শেষ দায়েরা মাবুদিয়াতে ছেরফা এবং মহব্বতের পথ বা হকিকতে আম্বিয়ার শেষ দায়েরা হোব্বে ছেরফা।

মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফার ঊর্ধ্বে আছে জাত লা-তাইন'। লা-তাইনের মাকাম অবোধগম্য। সেখানে কোন তাজাল্লা নাই। সেখানে আছে বহু নূরের পর্দা। সেই সকল পর্দাগুলো নিছক নূরের পর্দা বলিয়া পরিচিত। এই সকল পর্দা হইতে তাজাল্লীয়াতে জাতের উৎপত্তি হয়। জাত সম্পর্কে বলা আছে,

وَ لَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-'এবং আল্লাহর জন্য উচ্চ মাসাল আছে।' (সূরা রুমঃ ২৭) কিন্তু আল্লাহকে বুঝানো যায় এমন কোন দৃষ্টান্ত বা তুলনা সৃষ্ট জগতে নাই। দৃষ্টান্ত বা সাদৃশ্য নাই বটে কিন্তু আল্লাহতায়ালা যে বলিলেন, "তাহার জন্য উচ্চ মাসাল আছে।" এই মাসাল হইল লা-তাইনস্থিত সেই সকল নূরের পর্দা। এই পর্দা দ্বারা জাত আবৃত। বহু পর্দার অন্তরালে খোদাতায়ালার জাত বা সত্ত্বা। উক্ত সব মাসাল জাত নয়। তাই হয়তো আল্লাহতায়ালা বলিলেন,

فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ

অর্থাৎ-'তাই আল্লাহর জাত সম্পর্কে বলিতে গিয়া কোন মাসালকে শেষ কথা বলিয়া গ্রহণ করিও না। পবিত্র জাত মাসালের বহু ঊর্ধ্বে।' (সূরা নাহলঃ ৭৪)

বিজ্ঞাপন

খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের পথে উক্ত সব মাকামের সাথে মুরীদ পরিচিত হয়, মাকামসমূহ ছায়ের করে ও প্রত্যেক মাকামে পতিত নূর বা ফয়েজের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে।

মাকামসমূহের নামীয় পরিচয় দেওয়া হইল মূলতঃ এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরীকে বুঝিবার জন্য। এলমে হুছুলীর ক্ষেত্র জড় জগৎ হইতে আকরাবিয়াতের নিম্নে বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত। জড় জগৎ থেকে হুছুলী জ্ঞানের শুরু, বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত ইহার সীমা। বেলায়েতে ছোগরার উপরে এলমে হুছুলীর কোন প্রবেশ অধিকার নাই। বেলায়েতে কোবরা হইতে পবিত্র জাত পর্যন্ত সমুদয় বিভাগ এলমে হুজুরী অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

এলমে হুছুলী কি? এলমে হুছুলীর অর্থ হইল হাছিলযোগ্য জ্ঞান বা অর্জনসাপেক্ষ জ্ঞান। ইহা জ্ঞানের সেই অধ্যায় যেখানে আলেম, মালুম ও এলেম-এই তিনটি সত্ত্বার অবস্থিতি। আলেম-যিনি জ্ঞান অর্জন করেন। মালুম-যে বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে হয় এবং এলেম-যাহা দ্বারা জানিতে হয় বা বুঝিতে হয়। এলমে হুছুলীর প্রতিষ্ঠানে উক্ত তিনটি জিনিষের অবশ্যই প্রয়োজন। এলমে হুছুলী অধ্যায়ের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হইল কালব। কালব ও মস্তিস্কের যোগাযোগে এখানে জ্ঞান অর্জন করিতে হয়। চিন্তা বা তাফাকুর এখানে অতি প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।

বিজ্ঞাপন

যে বিষয় সম্পর্কে আলেম জানিতে চান, সেই বিষয় লইয়া চিন্তা করিলে তাহার কালবের সমুদ্রে ঢেউ উঠে। সেই ঢেউ-এর আঘাত লাগে মস্তিস্কে। ফলে উদ্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানিতে পারেন আলেম ব্যক্তি। এই পদ্ধতিতেই বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেন। উক্ত পদ্ধতির পরিণতিই বর্তমানের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, গণিত বা ধর্মীয় প্রকাশ্য অংশের গবেষণা-সবই এলমে হুছুলীর অন্তর্গত। অবশ্য ইহা এলমে হুছুলীর নিম্ন অধ্যায়ের বা আলমে খাল্কের ক্ষুদ্র অংশ সম্পর্কীয় জ্ঞান বা পার্থিব জ্ঞান। এই জ্ঞান দ্বারা খোদাতায়ালার দিকে বা জাত ও সিফাতের দিকে পথ পাওয়া যায় না। পথ পাইতে প্রয়োজন রাসূলে পাক (সাঃ) প্রদর্শিত দিক নির্দেশনার অনুসরণ অর্থাৎ জাহেরা শরীয়তের জ্ঞানের সাথে সাথে বাতেনী শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের পথ অবলম্বন।

বিজ্ঞানীদের দান অনস্বিকার্য। মানুষের প্রয়োজনে তাহারা যাহা করিতেছেন, তাহা কল্যাণ প্রসু। তবে ইহা নিতান্তই পার্থিব। কিন্তু যে সকল বিজ্ঞানী বা দার্শনিক নবী-রাসূলের পথকে অস্বীকার করিয়া নিজেদের অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞানকে পথ প্রদর্শক বানাইয়াছে, তাহারাতো শেষ পর্যায়ে নাস্তিকতার কুপে পতিত হইয়াছে। নিজেদের অনন্তকাল বরবাদ করিয়াছে। উক্ত সব দার্শনিক বা বিজ্ঞানীরা নিজেদের বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহকে চিনিতে চেষ্টা করিয়াছে। ফলে ধূর্ত শয়তান দ্রুতই তাহাদের বুদ্ধির উপর ভর করিয়া তাহাদেরকে পথভ্রষ্ট করিয়াছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যেমন, নমরূদ, ফেরাউন, আফ্লাতুন, আবু জেহেল স্ব-স্ব জামানার জ্ঞানী ব্যক্তি ছিল। আফ্লাতুন হযরত ঈসা (আঃ) এর জামানায় প্রখ্যাত দার্শনিক ছিল। কিন্তু নিজেদের মনগড়া দর্শন দ্বারা চেষ্টা করায় সামান্য বিশ্বাসরূপ জ্ঞান থেকেও তাহারা বঞ্চিত হইয়াছে।

গ্রীক দার্শনিকগণ সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, তাহারা ভ্রষ্টতার বিশাল প্রান্তরে পতিত। কারণ তাহারা নবীদের পথকে অবজ্ঞা করিয়া স্বীয় জ্ঞানকে পথ প্রদর্শক করিয়া লইয়াছে। ফলে আল্লাহাতায়ালার জাত সিফাত সম্পর্কে তাহারাই বেশী অজ্ঞ। (মকতুব-২৩, তৃতীয় খন্ড)।

বিজ্ঞাপন

আজ পর্যন্ত যত দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী পৃথিবীতে আসিয়াছে, দুনিয়াবী ব্যপারে তাহাদের যত অবদানই থাকুক না কেন, জাত সিফাত সম্পর্কে তাহারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাহাদের অধিকাংশই নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী। কবির ভাষায়-"বিজ্ঞ হলে বৈজ্ঞানিকে ঢুকে এসে নাস্তিকতা।” আমাদের দেশেও এমন বিজ্ঞ লোকের অভাব নাই যাহারা আযানের ধ্বনি পর্যন্ত সহ্য করিতে পারেন না অথচ তাহারা বড় বড় ডিগ্রীধারী বুদ্ধিজীবী বলিয়া পরিচিত।

প্রশ্ন হইল, কেন এমন হয়? জ্ঞান মানুষকে সুপথ দেখাবে, ইহাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু তাহাদের অর্জিত জ্ঞান তাহাদেরকে আবু জেহেল, নমরূদ বা ফেরাউনের মত অহংকারী ও অবিশ্বাসী করে কেন? মূলত এলমে হুছুলীর নিম্নতম অধ্যায়ের ক্ষুদ্র বিভাগ হইল এই পৃথিবী। এই পৃথিবীতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে আসল ও ভেজাল মিশ্রিত। বহু বিধ ভেজালের মধ্যে আসলকে খুঁজিয়া বাহির করা দুষ্কর। এখানে নিজেকে নিস্তি (শূন্যতা)-র মধ্যে রাখিয়া নবী রাসূলের পথ অনুসরণ করিতে হয়। তবেই জ্ঞানের উচ্চ মাকাম সমূহের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, ঊর্ধ্ব জগতে প্রবেশের দরজা উন্মুক্ত হয়। কিন্তু যাহারা নিজেদের অর্জিত জ্ঞানের অহংকারের দাপটে নবী রাসূলের পথকে অবজ্ঞা করে, ওলী-আল্লাহগণের পথকে ঘৃণা করে, তাহাদের ভাগ্যে নাস্তিকতার দুর্গন্ধময় মদিরা ছাড়া আর কিইবা থাকিবে?

এলমে হুছুলী অধ্যায়ের দ্বিতীয় অংশ হইল আলমে আমর বা নূরের জগৎ বা হুকুমের জগৎ বা সূক্ষ্ম জগৎ। সেই জগতে প্রবেশের মাধ্যম হইল পীরে কামেল বা নায়েবে নবীর নেক দৃষ্টি। কারণ কালবের সাফাই ভিন্ন নূরের জগতে বা আলমে আমরে প্রবেশ করা যায় না। পীরে কামেলের নেক দৃষ্টিতে কালব পরিচ্ছন্ন হইলে তাহাতে নূর আসে। কালব জাগ্রত হয়। কালবের সাথে যোগসূত্র আছে মহাকালবের-যে কালবের মধ্যে অবস্থান আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত, দোযখ ইত্যাদির। জাগ্রত কালবের প্রতিবিম্বিত নূরের সাহায্যে দেখা যায় সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ড; দেখা যায় খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূর। তাই জাগ্রত কালবওয়ালা অক্ষর জ্ঞানশূন্য হইলেও তাহার মূল্য জগতের সমস্ত বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের চেয়ে বেশী। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব তাই হয়তো বলিয়াছেন,

বিজ্ঞাপন

"জাগ্রত পরাণ যার মরে না সে জন

দৈহিক মরণ তার নহে রে মরণ,

শত শত মুর্দা দেল মাটিরই উপরে

তার চেয়ে অধিক ভাল যদিও কবরে।"

অর্থাৎ- তুমি একটি লতিফা জেন্দা করিয়া কবরে শুইয়া থাক, সমস্ত পৃথিবীর মুর্দা দেলওয়ালা লোকের চাইতে কবরেই তোমার অধিক শান্তি হইবে।

লতিফা কালবের মাধ্যমে সাধক আলমে খালক ও আলমে আমরের জ্ঞান অর্জন করে, বেহেশত-দোযখ, আরশ-কুরছী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। অবশ্য ইহা সৃষ্ট জগতের ছুরাত সম্পর্কীয় জ্ঞান, হাকীকী জ্ঞান নয়। হাকীকী জ্ঞান এলমে হুছুলী অধ্যায়ে সম্ভব নয়, তাহা অর্জন সম্ভব এলমে হুজুরী অধ্যায়ে।

কোন বিষয় সম্পর্কে আমরা যখন চিন্তা করি, তখন সেই বিষয়ের একটি ছুরাত আমাদের কালবের আয়নায় প্রতিবিম্বিত হয়। পরে মস্তিস্কের যোগাযোগে কালব সেই বিষয়ে জ্ঞান অন্বেষীকে জ্ঞান দান করে।

দায়েরায়ে এমকানের পরবর্তী অধ্যায় বেলায়েতে ছোগরা বা প্রতিবিম্বের মাকাম। বেলায়েতে ছোগরা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হইয়াছে নসিহতসমূহের ৭ম খন্ডে 'আত্মদর্শনের পথে মাকাম-মঞ্জিল' নামক পুস্তকে। ইহা এই খন্ডের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। অর্জন সাপেক্ষ বা এলমে হুছুলী অধ্যায়ের চুড়ান্ত পর্যায় হইলো এই বেলায়েতে ছোগরা। বেলায়েতে ছোগরাতে তড়িতবৎ তাজাল্লীয়াতে জাতের দর্শনে ছালেকের জ্ঞান (এলেম হুন্ডুলী) নিঃশেষ হয়। এখানে আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের নূরে ছালেক ফানা ও বাকা লাভ করে বিধায় এই মাকামের সাধককেও “ওলী” বলা হয়; যদিও খোদাতায়ালার জাতের নৈকট্য হইতে এই মাকাম অনেক, অনেক নিম্নে।

এ অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় হইল জাত ও সিফাত-যাহা এলমে হুজুরী অধ্যায়ের অন্তর্গত। এলমে হুজুরী অধ্যায়ের শুরু আকরাবিয়াত বা সিফাত রাজ্য থেকে। ইহার শেষ হইল ১৮/১৯ টি মাকাম ঊর্ধ্বে হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফার ঐ পারে লা-তাইনস্থিত নিছক জাতে ফানা ও বাকা প্রাপ্তিতে।

এলমে হুজুরীর যে জ্ঞান তাহা বর্ণনাযোগ্য বোঝাবুঝির অতীত। পূর্ববর্তী নসিহতে এলমে হুজুরী সম্পর্কে বলা হইয়াছিল যে, যেখানে আলেম ও এলেম নাই, আছে শুধু মালুম অর্থাৎ যিনি জ্ঞান অর্জন করিবেন ও যাহা দ্বারা বুঝিবেন-দুই অবস্থায় চলিয়া যায়, থাকে শুধু মালুম। সেই ক্ষেত্রের যে জ্ঞান, তাহা হইল এলমে হুজুরী। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, আলেমই যদি না থাকেন তবে জ্ঞান অর্জন করিবেন কে? আসলে আলেম থাকে না-এই কথার তাৎপর্য হইলঃ আলেম তাহার স্কুল ছুরাত বা সূক্ষ্ম ছুরাতসহ সাধারণ বোঝাবুঝির জ্ঞান লইয়া সিফাত বা জাত জগতে প্রবেশ করিতে পারে না। অর্থাৎ সেই চিরস্থায়ী জগতে ছালেক কোন ছুরাতে প্রবেশ করিতে পারে না। তবে ছালেকের হকিকত আছে সিফাতে হাকীকীতে-যে হকিকতকে উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহতায়ালা "কুন" বলিয়াছিলেন। সেই হকিকত বা হাকীকী সত্ত্বা বা নাফসে মোলহেমা সিফাত ও জাত সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করে আল্লাহর বিশিষ্ট দান খোদাদত্ত নূরের শরীর ওজুদ মাওহুব লাহুর মাধ্যমে।

এখানে উল্লেখ্য, এলমে হুছুলী অধ্যায়ে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হইল, কালব ও রূহ। কিন্তু কালব ও রূহ দ্বারা হুজুরী অধ্যায় অর্থাৎ জাত ও সিফাতের জ্ঞান অর্জন অসম্ভব। কালব তাহার মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফ্যালে' ফানাপ্রাপ্ত হয়-যাহা আকরাবিয়াতের নিম্নে অবস্থিত। আর রূহ আল্লাহপাকের সিফাতে এরাদতে ফানা প্রাপ্ত হয়। কারণ সিফাতে এরাদতই রূহের মূল। কাজেই এলমে হুজুরী অধ্যায়ে কালব ও রূহের সাহায্যে জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। সিফাত ও জাতের জ্ঞান বা চিরস্থায়ী হাকীকী জগতের জ্ঞান আহরণের জন্য মহান খোদাতায়ালা দয়া পরবশ হইয়া ছালেককে জাত ও সিফাতের মত অবর্ণনীয় ও অতুলনীয় এক নূরের দেহ দান করেন-যাহার সাহায্যে বিদ্যুতের চেয়েও বহুগুণ বেশী বেগে ছায়ের করিয়া সেই খোদাদত্ত নূরের শরীর ওজুদ মাওহুব লাহু আসমা, সিফাত, শান ও শয়ুনাত (গুণাবলীর মূল) ও জাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে চিরস্থায়ী জগতে বা জাত ও সিফাত জগতে স্থান, কাল বা সময় বলিয়া কিছু নাই। আসলে আলমে মেসালের আয়নায় দুরত্ব ও গতির ইংগিতে বুঝানো হয়।

ছালেকের হাকীকী সত্ত্বা বা নাফসে মোলহেমা ওজুদ মাওহুব লাহুর মাধ্যমে জাত সিফাতের জ্ঞান অর্জন করিতে পারে। তবে সেই জ্ঞান বর্ণনা যোগ্য নয় বিধায় সাধকবর্গ তাহা বর্ণনা করেন নাই: ইশারা দিয়াছেন মাত্র। যাহা বর্ণনা করা যায় না, তাহা বর্ণনা করিলে জগতে অনর্থ সৃষ্টি হয়, বিশৃংখলা দেখা দেয়। যেমন হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) ছাহেব "আনাল হক" বলিয়া শেষ পর্যন্ত শুলে চড়িলেন।

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ), যিনি সাহাবাগণের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন; এই জাত সিফাতের বর্ণনা প্রসংগে তিনি বলেন,

قُطِعَ الْبُلْعُوْمُ وَ ذُبِحَ الْحَلْقُوْمُ

অর্থাৎ-'এই সম্পর্কে আমি যদি কিছু বর্ণনা করি তবে লোকে আমার গলা কাটিয়া ফেলিবে।' সিফাতে হায়াতের বর্ণনা করিতে যাইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব তাহার "মাবদা ওয়া মায়াদ” নামক পুস্তিকাতে বলেন যে, "সিফাতে হায়াতের গোপন তথ্যাবলী থেকে যদি একটিও প্রকাশ করি, তবে আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হইবে।"

বুঝা গেল যে, জাত ও সিফাতের জ্ঞান অর্জন করা যায়, তবে তাহা বর্ণনা করা যায় না। আর সেই জ্ঞানের স্বাদ একমাত্র ভুক্ত ভোগী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেহ বোঝেও না।

তবে বর্ণনা করা যাক, আর নাই যাক; আসল কথা হইল জাতের পরিচয় আমাদিগকে গ্রহণ করিতে হইবে-সেই উদ্দেশ্যেই আমরা সৃষ্ট। যেহেতু জাতের পরিচয় গ্রহীতা হিসেবে আমরা সৃষ্ট, কাজেই জাতের পরিচয় নেওয়া সম্ভব। কিভাবে জাত ও সিফাতের পরিচয় নেওয়া সম্ভব, সেই বিষয়ে এখন আলোচনা করিতেছি।

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, কাওছের মাকামে ছালেককে 'ওজুদ মাওহুব লাহু' নামক বিশেষ নূরের দেহ দেওয়া হয়। এই দেহ বা সত্ত্বা জাত ও সিফাতের মতই বর্ণনাতীত। এই 'ওজুদ মাওহুব লাহুর' সাহায্যে ছালেক ছায়েরে এস্মোজ্জাহের ও ছায়েরে এস্মোল বাতেনের মাধ্যমে সিফাত, আসমা ও জাতের জ্ঞান অর্জন করে। ছায়েরে এস্মোজ্জাহেরের মাধ্যমে সিফাতে হাকীকীতে ছায়ের করিয়া আটটি মহাগ্রন্থতুল্য সিফাতের জ্ঞান অর্জন করিয়া আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণে ছালেক গুণান্বিত হয়। এই অবস্থায় ছালেকের সহিত আল্লাহতায়ালার কথাবার্তা হয় যেমন টেলিফোনমবা টেলিগ্রামের মাধ্যমে আমরা পরস্পর আলোচনা করি। তবে সামনা সামনি বা মুখোমুখী কথাবার্তা বা দর্শন সিফাতের রাজ্যে সম্ভব নয়। তেমন সান্নিধ্যের জন্য ছালেককে ছায়েরে এস্মোল বাতেনের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার গুপ্ত নাম সমূহে যেমন (হাই, আলীম, বছীর ইত্যাদি) ভ্রমণ করিয়া কামালাতে নবুয়তের দায়েরায় পৌঁছাইতে হয়-যেখানে সাধক তাজাল্লীয়াতে জাত লাভ করে।

ছায়েরে এস্মোলবাতেন সম্পন্ন হয় বেলায়েতে উলিয়াতে। ছায়েরে এস্মোজ জাহের ও ছায়েরে এস্মোল বাতেনের মধ্যে পার্থক্য বিরাট।

এই প্রসংগে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তাহার "মুকাশিফাতে আয়নিয়া” পুস্তিকাতে বলেন, "উক্ত দুই ছায়েরের পার্থক্যকে সামান্য মনে করিবে না এবং বলিবে না যে, এলেম হইতে আলীম পর্যন্ত রাস্তা খুবই নিকটবর্তী। মনে রাখিবে, কখনও এইরূপ নহে। বরং যে দুরত্ব জমিন হইতে আরশ পর্যন্ত বিদ্যমান, সিফাত (এস্মোজ্জাহের) ও এসেম (এস্মোল বাতেন) এর ছায়েরের দুরত্বের তুলনায় ইহা বিন্দু তুল্য। এস্মোল বাতেনের ছায়েরের উদাহরণ হইল অতল সমুদ্রের মতো। ইহা বর্ণনায় খুব কাছে মনে হইলেও অর্জন করা খুবই কঠিন।"

তিনি বলেন, "এস্মোলবাতেনের ছায়েরের সময় আমাকে দেখানো হয় যে, আমি যেন একটি রাস্তায় ছায়ের করিতেছি; আর অত্যাধিক চলিবার কারণে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি। এই সময় আমার হাতে একখানি লাঠি ছিল, যাহার উপর ভর করিয়া আমি চলিতে ছিলাম, কিন্তু রাস্তা ছিল খুবই দুর্গম, যাহার ফলে চলা ছিল খুবই কষ্ট সাধ্য। আর এ চলার সময় আমি চলার পথে প্রাপ্ত প্রত্যেকটি জিনিসকে আকড়াইয়া ধরিতেছিলাম, যাহাতে আমার চলায় গতির সঞ্চার হয়। আর এই সময় চলা ছাড়া আমার জন্য আর কোন গত্যন্তর ছিল না। বিশেষ একটি সময় পর্যন্ত আমার এই ছায়ের জারী থাকে; এমতাবস্থায় আমি একটি শহরের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হই, যাহা অতিক্রমের পর আমি সেই শহরে প্রবেশ করি।.....

"এই শহরের উপর যে ছায়ের হয়-উহাই কামালাতে নবুয়তের ছায়ের-যাহা আম্বীয়া (আঃ) গণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাভ করিয়াছেন, মাটির দেহের সমস্ত অংশ-চাই উহা আলমে আমরের অন্তর্ভুক্ত হউক বা আে খালকের-সবই এই মাকামে মানব দেহস্থিত মাটির অনুসারী। আর মাটির দেহের প্রাধান্য ফেরেশতাদের উপর এই রূপে হাছিল হইয়াছে। কারণ এই যে, মানুষের সৃষ্টি বিশেষভাবে মাটির সহিত সম্পর্কিত।"

উক্তরূপে ছালেক কামালাতের অধ্যায় সমূহ ছায়ের করে। এখান হইতে ঊির্ধ্বের সব মাকামে ছালেক অনবরত জাতি নূরের ফয়েজ লাভ করিতে থাকে। জাতি তাজাল্লী প্রাপ্ত হইয়া ছালেকের বাতেন এমনই প্রশস্ত হয়, ছালেক এমনই ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করে-যে জ্ঞানের নিকট বেলায়েতে উলিয়া পর্যন্ত প্রাপ্ত জ্ঞানকে সাগরের তুলনায় এক বিন্দু পানির ন্যায় মনে হয়; ভূ-পৃষ্ঠের সমুদয় বালুকনার নিকট একটি ক্ষুদ্র বালুকনার মত অনুভূত হয়। এখান থেকে আরেফ শরীয়তের হুকুম আহকামের হাকীকী জ্ঞান অর্জন করে। কবর, মিজান, পুলছুরাত, হাশর, নশর, বেহেশতের শান্তি, দোযখের শাস্তি ইত্যাদি সম্পর্কে যাহা কিছু শরীয়তে বর্ণিত হইয়াছে, তাহার হাকীকী জ্ঞান ছালেক অর্জন করে। সব চেয়ে বড় কথা, জাতি ফয়েজ লাভ করিয়া ছালেক জাতের জ্ঞান অর্জন করিতে শুরু করে।

কামালাতে উলুল আজমের পর হইতে জাত মুখী দুইটি রাস্তা বর্তমান। একটি ইবাদতের, অপরটি মহব্বতের -যাহা পূর্বেও বলা হইয়াছে। কিন্তু ছালেক প্রথমে কোন্ পথে জাতমুখী অগ্রসর হইবে, তাহা নির্ধারণ করিবেন তাহার মোর্শেদ বা পীর। হয় মহব্বতের পথে, না হয় ইবাদতের পথে প্রথমে ছালেক অগ্রসর হইবে জাতের প্রান্তে পৌছিবার প্রবল নেশায়। তবে প্রথমে যে পথেই তিনি গমন করেন না কেন, উভয় পথই তাহাকে অতিক্রম করিতে হইবে। তাহাকে পৌছাইতে হইবে ইবাদতের শেষ প্রান্ত মাবুদিয়াতে সেরফা এবং মহব্বতের শেষ প্রান্ত হোব্বে সেরফায়। মাবুদিয়াতে সেরফা ও হোব্বে সেরফা ছালেকের শেষ গমন। ইহার ঊর্ধ্বে লা-তাইনস্থিত জাত রাজ্যে সৃষ্টির কোন প্রবেশাধিকার নাই। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলে পাক (সাঃ) কেও উক্ত দুই চূড়ান্ত মাকামে থামিয়া যাইতে হয় আল্লাহতায়ালার "কিফ ইয়া মুহাম্মদ” (হে মুহাম্মদ! আপনি থামুন) আদেশ শুনিয়া। কারণ তিনিতো সৃষ্ট। সৃষ্টের কি অধিকার জাত রাজ্যে প্রবেশ করে? তবে আল্লাহপাক জাতের প্রান্তে আগত ছালেকের 'ওজুদ মাওহুব লাহুর' নজরের কুওত বা শক্তিকে বহুগুণে বাড়াইয়া দেন। এই কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে ছালেক একে একে লা-তাইনস্থিত সেরেফ নূরের পর্দাতে (যাহাকে মাসাল বলা হয়) ফানা ও বাকা' লাভ করিয়া পরিশেষে এই কুওতে

নজরিয়ার মাধ্যমেই নিছক জাতে ফানা ও বাকা লাভ করেন, পবিত্র পূর্ণতা ছালেক অর্জন করেন। কিন্তু তাহা বর্ণনাতীত বিধায় প্রকাশ জাতের অবাধ মিলন লাভ করেন। এমনিভাবে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের করিতে পারেন না। কারণ সৃষ্ট জগতে বা এমে হুছুলীর অধ্যায়ে এমন কোন ভাষা সৃষ্ট হয় নাই, যাহা সেই পরম পবিত্র অবস্থাকে বুঝাতে পারে।

নিছক জাতের সহিত অবাধ মিলন বা সম্মুখ সাক্ষাত প্রথম লাভ করেন রাসূলে করীম (সাঃ)। তাহার পূর্বে এমন নিবিড় সান্নিধ্য এবং জাত ও সিফাত সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান কেহ লাভ করেন নাই। তবে অন্যান্য সমস্ত পয়গম্বরই তাজাল্লীয়াতে জাত লাভ করিয়াছেন, যাহা কামালাতের অধ্যায়ে পাওয়া যায়। সমুদয় পর্দা উন্মোচিত অবস্থায় একমাত্র রাসূলে পাক (সাঃ)-ই নিছক জাতের শান্তিময় দর্শন লাভ করিয়াছেন। ইহার বহুবিধ কারণের মধ্যে দুইটি কারণ এখানে তুলিয়া ধরিতেছি।

প্রথমতঃ রাসূলে পাক (সাঃ) এর উৎপত্তি স্থল বা মাবদায়ে তাইয়্যুন সিফাতে এলেম। সিফাতের বৃত্তের অষ্ট গুণের মধ্যে পবিত্র জাতের সহিত সিফাতে এলেমের এমনই এক নিবিড় সম্পর্ক বর্তমান, যে রকম সম্পর্ক অন্য কোন সিফাতের নাই। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, এই সিফাতের শেষ প্রান্ত লা-তাইনস্থিত নিছক নূর বলিয়া পরিচিত। লাতাইনস্থিত এলেমগুণের তাইয়্যুন বা অধ্যায় পাওয়ার পরবর্তী অবস্থাই হইল আকরাবিয়াতস্থিত সিফাতে এলেম। লা-তাইনস্থিত এলেম গুণের অবর্ণনীয় অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করিয়াই আলেম সমাজ সিফাত সম্পর্কে বলেন যে, ইহা "লা গায়রূহু" অর্থাৎ সিফাত বা গুণাবলী তিনি (জাত) ছাড়া কিছু নহে। কিন্তু তাইয়্যুন পাওয়ার পরে আকরাবিয়াতস্থিত এলেম গুণের প্রতি তাকাইয়া তাহারা বলেন যে, ইহা "লা হুয়া” অর্থাৎ তিনি (জাত) নহেন।

উক্ত সিফাতে এলেম হইল দয়াল নবী (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল। এলমে হুজুরী অধ্যায়ে এলেম, আলেম ও মালুম এক হইয়া যায়। ফলে দয়াল নবী (সাঃ) আকরাবিয়াতস্থিত সিফাতে এলেমের জ্ঞান অর্জন করিয়া এই সিফাতের পথ ধরিয়াই জাত পাকে পৌঁছান। প্রথমে তিনি লা-তাইনস্থিত এলেমগুণের শেষ প্রান্তে পৌঁছাইয়া নিছক নূরে ফানা ও বাকা লাভ করিয়া পরিশেষে পবিত্র জাতে ফানা ও বাকা প্রাপ্ত হন, তাই তাহার সম্পর্কেও বলা যায় যে তিনি লা গায়রূহু অর্থাৎ জাত ভিন্ন কিছু নন: যদিও তিনি "লা হুয়া" অর্থাৎ তিনি (জাত) নহেন।

দ্বিতীয় কারণের ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, আল্লাহতায়ালার জাত সুন্দর। তবে জাতের এই সৌন্দর্য বা রূপ লাবণ্য প্রকাশযোগ্য নহে। সুন্দর বলিতে আমরা যাহা বুঝি, জাতের সৌন্দর্য তাহা হইতে পবিত্র। জাতের উক্ত সৌন্দর্য বা রূপ লাবণ্যের প্রথম তাইয়্যুনই হইল হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর হকিকত অর্থাৎ হকিকতে ইব্রাহিমী। কিন্তু জাতের উল্লিখিত সৌন্দর্য, রূপ বা লাবণ্য ছাড়াও পবিত্র জাতে এক বিশেষ উচ্চ অবস্থা বর্তমান-যে অবস্থার কোন তাইয়্যুন হয় না। পবিত্র জাতের সেই উচ্চতম অবস্থার মধ্যেই প্রথম পরিচয় বাসনা জাগ্রত হয়। ফলে আল্লাহতায়ালা জাতের সেই উচ্চতম ও পবিত্রতম অবস্থা হইতে রহস্যপূর্ণ এক প্রেম কনা প্রথম তাইয়্যুন (অধ্যায়) এর কেন্দ্র হকিকতে মুহাম্মদীতে রাখিয়া দেন। এই প্রেমই হইল আসল জিনিস। রাসূলে পাক (সাঃ) প্রথমে তাহার হকিকতে অর্থাৎ হকিকতে মুহাম্মদীতে উন্নীত হন। অতঃপর সেই রহস্যে ভরা প্রেমের বাহনে চড়িয়া হোব্বে সেরফা পর্যন্ত পৌঁছান। তথা হইতে কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে জাতের সেই উচ্চতম ও পবিত্রতম অবস্থাতে পৌঁছান, ফানা ও বাকা লাভ করেন।

রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ করিয়া উম্মতে মুহাম্মদীর কিছু কিছু উম্মত জাতের উক্ত পবিত্রতম অবস্থায় পৌঁছাইয়া ফানা ও বাকা (স্থায়ীত্ব) লাভ করিয়া ধন্য হইয়াছেন। তাহাদের মধ্যে কতিপয় সাহাবী, আহলে বায়াতের বার (১২) ইমাম, হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব, হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব, হযরত খাজা এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেব অন্যতম। এই সকল সাধক বর্গকে আফ্রাদ বলা হয়। আফ্রাদ হইল কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা ও মর্তবা প্রাপ্ত সাধক। অর্থাৎ যে সকল সাধক লা-তাইনস্থিত নিছক নূর সমূহ দ্বারা আবৃত পবিত্র জাতে ফানা ও বাকা লাভ করিয়া পুনরায় সৃষ্টির কল্যাণ সাধনে হেদায়েতের দায়িত্ব লইয়া পার্থিব জগতে আসেন-তাহারাই কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের মর্তবা ও মর্যাদা প্রাপ্ত আফ্রাদ উপাধীতে ভূষিত সাধক।

উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে সাহাবাদের পরে আজ অবধি যত সাধক আফ্রাদের মর্যাদা প্রাপ্ত বা কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের নেয়ামত প্রাপ্ত-তাহারা হকিকতের দিক দিয়া সাহাবা তুল্য। তাহারা এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরী-উভয় দফতরের পরিপূর্ণ জ্ঞানে জ্ঞানী।

তাহারা সর্বোচ্চ মাকামে পৌঁছাইয়া খোদাতায়ালার জাতের অনুরূপ গুণাগুণ লাভ করেন। জাত সম্পর্কে বলা আছে যে, জাত অবিভাজ্য সত্ত্বা। অর্থাৎ জাতের একাংশ শ্রবণ শক্তি, অপর অংশ দর্শন শক্তি বা কথন শক্তি.......... তাহা নয়। এমন বিভক্তি হইতে জাত পবিত্র। জাত সম্পূর্ণই দর্শন শক্তি, সম্পূর্ণই বাকশক্তি ইত্যাদি।

জাতের উচ্চতম ও পবিত্রতম অবস্থাতে উপনীত হইয়া যে সকল সাধক জাতে ফানা ও বাকা লাভ করেন, তাহারাও জাতের মত গুণাগুণ অর্জন করেন। অর্থাৎ সাধকের জাত সম্পূর্ণই দর্শন শক্তি, সম্পূর্ণই শ্রবণ শক্তি বা সম্পূর্ণই ইচ্ছাশক্তি ইত্যাদি হয়।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাই বলেন, "উক্ত কারণে মোমিনগণ বেহেশতে আল্লাহতায়ালাকে দিকশূন্য হিসাবে অবলোকন করিবেন। কেননা তাহারা সম্পূর্ণই নয়ন সদৃশ হইবেন। আর সম্পূর্ণ নয়নতুল্য হইলে দিকের কোন প্রশ্ন আসে না।" (মকতুব নং-৬৫, তৃতীয় খন্ড)

এই কারণেই কামেল পীর বা আফরাদগণের মুরীদ বিপদে পড়িয়া পৃথিবীর যে কোন স্থান হইতে, যত দূর হইতেই পীরকে স্মরণ করুক না কেন, আপন পীর তাহা বুঝিতে পারেন এবং বিপদ গ্রন্থ মুরীদকে উদ্ধার করিতে পারেন। এই ক্ষমতা যাহার নাই; তিনি কামেল ও মোকাম্মেল পীর নহেন। তাই আফরাদ বা কামেল পীর সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাদ শরীফের তৃতীয় খন্ডের ২৬ নং মকতুবে বলেন, "বান্দা কখনও আল্লাহ হয় না। তবে আল্লাহ থেকে পৃথকও নয়।" ইহা যেন "লা হুয়া" (তিনি নহেন) সত্ত্বেও "লা গায়রূহু" এর (তিনি ছাড়া অপর নহেন) অনুরূপ।

উপরের আলোচনা থেকে ইহা বুঝা গেল যে, রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ করিয়া তাহার অনুসরণকারীগণের কেহ কেহ এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরী-উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া যেমন সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন, তেমনি জাত ও সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, উক্ত সাধকবর্গ নিছক জাতের দর্শন, জাতের অবাধ মিলন এবং জাতপাকের সহিত সম্মুখ সাক্ষাত লাভকরেন-যাহা রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ববর্তী নবী (আঃ) গণও পান নাই: যদিও তাহারা তাজাল্লীয়াতে জাত লাভ করিয়াছেন। তাজাল্লীয়াতে জাতের দর্শন ও নিছক জাতের দর্শন-এক কথা নয়। নিছক জাতের দর্শন ও জ্ঞান লাভের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হকিকতে মুহাম্মদীতে মিলিত হওয়া-আর সেই জন্য প্রয়োজন দয়াল নবী (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসরণ। কিন্তু দয়াল নবী (সাঃ) এর পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণ সেই অনুসরণের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকায় তাহাদের ভাগ্যে সেই নেয়ামত জোটে নাই। তাই হয়তো উলুল আজম পয়গম্বরগণ দয়াল নবী (সাঃ) এর উম্মত হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করিয়াছেন। অবশ্য তাহাদের মধ্যে একজন অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) আসিতেছেন। তাহার আগমন ধ্বনি শোনা যাইতেছে। হযরত ইমাম মেহেদী (আঃ) আবির্ভূত হওয়ার পর পরই তিনি আসমান হইতে নামিবেন। সে সময় অতি আসন্ন। পৃথিবীতে আগমন করিয়া উম্মতে মুহাম্মদীর দল ভুক্ত হইয়া ইমাম ছাহেবের তরবিয়ত গ্রহণ করিয়া দয়াল নবী (সাঃ) এর অনুসরণ করিয়া সেই উচ্চ নেয়ামত তিনিও লাভ করিবেন। আল্লাহপাকই সব ভাল জানেন।

জাত ও সিফাতের এই আলোচনায় একটি বিষয়ে হয়তো তোমাদের ধারণা জন্মিয়াছে যে, এই জড় জগৎ হইতে জাত (সত্ত্বা) এর জগৎ বহু দূরে অবস্থিত। আসলে এই যে দূরত্বের কথা বলা হইল-তাহা জ্ঞানের তারতম্য বই কিছু নয়। মূলতঃ সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডইতো জাতের সমুদ্রে নিমজ্জিত। প্রত্যেক সৃষ্টিই জাতের সহিত সম্পর্কযুক্ত। তাই দেখা যায় ক্ষুদ্র প্রাণী পিপিলিকাও যথা সময়ে জন্ম গ্রহণ করে এবং কর্ম সম্পাদন করিয়া নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু আমরা যে জাত সমুদ্রে নিমজ্জিত তাহা বোঝা বা জাত দর্শন মোটেই সহজ নয়। আমাদের সম সৃষ্টি বাতাস। সেই বাতাসের সমুদ্রে থাকিয়া আমরা বাতাসকেই দেখিতে পারি না, সেখানে জাতের দর্শন বা বোঝাবুঝি কি এত সহজেই সম্ভব? খুব অল্প সংখক সাধকের ভাগ্যেই তাহা অর্জিত হয়। জাতের দরশন বা জ্ঞান অর্জন খুবই কঠিন বটে, তবুও আল্লাহতায়ালার ফজল বা অনুকম্পা আসিলে এই পৃথিবীতে থাকিয়াই এলমে হুজুরী অধ্যায়ের জ্ঞান অর্জন করিয়া ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে তাহা সম্ভব।

খোদা দর্শন সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী মতামত বর্তমান। কেহ কেহ বলিয়াছেন, খোদাকে দেখা সম্ভব। কেহ কেহ বলিয়াছেন, খোদাকে দেখা সম্ভব নয়।

হযরত আরেফ (রাঃ) ছাহেব তাহার আওয়ারেফ কিতাবে বলিয়াছেন, 'দেলের চক্ষু মোশাহেদা (দর্শন) করার মহল বা স্থান।' অর্থাৎ আল্লাহকে দেলের চক্ষু দিয়া দেখা সম্ভব। আবার শায়খ মুহাম্মদ ইসহাক (রঃ) তাঁহার তাওয়ারেফ কিতাবে বলিয়াছেন, 'এই কথাতে এজমা (একমত) হইয়া গিয়াছে যে, এই দুনিয়াতে আল্লাহতায়ালার দর্শন বিশ্বাস ছাড়া দিল দিয়া কিংবা চক্ষু দিয়া সম্ভব নয়।' হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিয়াছেন, 'দেলের বা মনের-কোন চক্ষু দিয়াই আল্লাহতায়ালাকে দেখা সম্ভব নয়।'

কথা সমূহ পরস্পর বিরোধী মনে হয়; কিন্তু অবস্থার তারতম্য হিসাবে সবই ঠিক। কারণ বাহ্যিক বা চর্ম চোখে আল্লাহকে (জাতকে) দেখার প্রশ্নই উঠে না। কালবের (দেলের) চোখেও আল্লাহ (জাত) কে দেখা যায় না। কারণ এলমে হুছুলীর শেষ পর্বে কালব তাহার মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়ালে ফানা হইয়া যায়। কিন্তু জাতকেতো এলমে হুছুলীতে পাওয়া যায় না, জাত এলমে হুজুরীর শেষের শেষ মাকামে গেলে দেখা যায়।

রূহের মাধ্যমেও জাতকে দেখা যায় না কারণ রূহ আকরাবিয়াতস্থিত সিফাতে এরাদতে ফানা হয়। প্রশ্ন হইতে পারে, তাহা হইলে জাত দর্শন কিভাবে সম্ভব?

ইহা সম্ভব ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, ওজুদ মাওহুব লাহু হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফায় পৌঁছাইয়া নজরের কুওতের মাধ্যমে জাতের দর্শন লাভ করেন। হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফা যেন সাধকের দুইটি অতীব শক্তিশালী চক্ষু। হয়তো সেই দুই চোখের দিকে ইশারা করিয়া মহা কবি হাফেজ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন-

"যে দিল করুণা করি যুগল নয়ন,

উচিত কি নয় তার রূপ দরশন?"

এলমে হুছুলী ও এলমে হুজুরী নামক যে দুই আধ্যাত্বিক প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হইল-সেই উভয় প্রতিষ্ঠানের ভাইস চ্যান্সেলর রাসূলে পাক (সাঃ) এবং চ্যান্সেলর স্বয়ং খোদাতায়ালা। জগদ্বাসীদিগকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য যুগে যুগে আফরাদবর্গই উক্ত দুই প্রতিষ্ঠানের প্রফেসর নির্বাচিত হইয়া আপন আপন দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। বর্তমান জামানায় মানব সমাজকে আধ্যাত্বিক শিক্ষা দানের জন্য দায়িতে নিয়োজিত আছেন আমার পীর কেবলাজান হুজুর হযরত খাজা বাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। তিনি এলমে হুছলী ও এলমে হুজুরী-উভয় অধ্যায়ের জ্ঞানে পরিপূর্ণ জ্ঞানী ও যোগ্য শিক্ষাদাতা। তাহারই পক্ষ হইতে এই মিছকিন উক্ত উভয় দফতর (এলমে হুছলী ও হুজুরী)-এর জ্ঞান বিতরণে নিয়োজিত। যদিও এমন মহা কর্ম সম্পাদনে অধীনের কোন যোগ্যতা নাই: তথাপিও আমি ভয় পাই না এই কারণে যে আমার পিছনে মদদদাতা হিসাবে আছেন আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) এবং দয়াল নবী (সাঃ)।

হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি হুছুলী ও হুজুরী জ্ঞানের উভয় দফতরের শিক্ষা লাভ করিয়া জাত ও সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে চাও, নিছক জাতের দর্শন ও অবাধ মিলন লাভ করিতে চাও, তবে ইবাদতের সাথে সাথে মহব্বত অর্জনের চেষ্টা কর। যে ইশারা নসিহতে প্রদত্ত হইল, সেই অনুযায়ী চল। তোমরা কামিয়াবী হও-এই দু'আ করিয়া এই নসিহত এখানেই শেষ করিতেছি। আমীন!

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD