খোদাতায়ালার আকরাবিয়াত সম্পর্কে আলোচনা

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘জাত ও সিফাত’ بسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালার আকরাবিয়াত বা 'নিকট থেকে নিকটতর হওয়া' সম্পর্কে আলোচনাঃ
আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَ نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-'এবং আমি তাহার (মানুষের) জানরগ থেকেও নিকটবর্তী।' (সূরা ক্বাফঃ ১৬)
পীরানে পীরগণ বলেন, আল্লাহতায়ালার জাত সৃষ্টির প্রতি তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে প্রবাহিত। অর্থাৎ সৃষ্টজগৎ জাত সমুদ্রে নিমজ্জিত। আল্লাহতায়ালার এই আকরাবিয়াত বা নিকট থেকে নিকটতর হওয়া সম্পর্কেই চলমান নসিহতে আলোচনা করা হইতেছে।
যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়, কে তোমার সবচেয়ে নিকটবর্তী? উত্তরে সে বলিবে-আমি নিজেইতো আমার সর্বাধিক নিকটবর্তী। আসলে তাহা নয়। আল্লাহপাক বান্দার নিজ অপেক্ষা তাহার (বান্দার) নিকটবর্তী। উল্লিখিত কুরআন পাকের আয়াত এবং পীরানে পীরগণের অভিজ্ঞতার বর্ণনা থেকে তাহাই প্রমাণিত হয়।
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা মানুষের সর্বাধিক নিকটে হইলেও তাহাকে সহজে বোঝা যায় না, ধরা যায় না। তিনি আমাদের জ্ঞানের অতীত, ধারণার অতীত, বর্ণনার অতীত, এমনকি অনুভবেরও অতীত। যিনি নিকট থেকে নিকটতর, যিনি প্রাণরগ থেকেও নিকটে; যিনি আমাদের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে প্রবাহিত-তাহাকে যদি নাইবা চেনা যায়; নাইবা বুঝা যায়, তবে কেনইবা আমাদেরকে তিনি সৃষ্টি করিলেন? সৃষ্টির উদ্দেশ্যতো আপন পরিচয় প্রদান করা।
আসলে, অতীব দুর্বোধ্য হইলেও খোদাকে বুঝা যায়, দেখা যায়; তবে তাহা প্রকাশযোগ্য বা বর্ণনাযোগ্য নহে। তাহা কৈফিয়তশূন্য। আর এই কারণেই অধিকাংশ ওলী-আল্লাহই আল্লাহতায়ালার আকরাবিয়াত বা নিকটতর হওয়া সম্পর্কে মুখ খোলেন নাই। কেবলমাত্র তরিকতের ইমাম, মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আকরাবিয়াত সম্পর্কে কিছু ইশারা দিয়াছেন মাত্র। তিনি বলেন, "আল্লাহতায়ালা আমাদের জ্ঞান হইতে যে অতি উচ্চ এবং আমাদের এলেম ও অনুভূতির বাহিরেরও বাহিরে; ইহা সত্ত্বেও আমরা জানি যে, এই বাহিরে হওয়া নৈকট্যের দিকে, দূরত্বের দিকে নহে; যেহেতু আল্লাহতায়ালা যাবতীয় নিকটবর্তী বস্তু হইতে অধিক নিকটবর্তী। এই পর্যন্ত যে আমরা তাহার যে সিফাতসমূহের ক্রিয়া ও চিহ্ন; সেই সিফাতসমূহ হইতেও তাঁহার জাতে-আহাদ বা এক জাতকে আমাদের অধিক নিকটবর্তী প্রাপ্ত হইতেছি। এই মারেফাত বা পরিচয় জ্ঞান চিন্তার বহির্ভূত।” (মকতুব-২৫৮, ১ম খন্ড)
মুজাদ্দেদ ছাহেবের উপরোক্ত মন্তব্য থেকেও বুঝা যায় যে, খোদাতায়ালার আকরাবিয়াত বা নিকটবর্তী হওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন সম্ভব-তবে তাহার বর্ণনা সম্ভব নয়। তাই একই মকতুবে মুজাদ্দেদ আলাফেছানী (রাঃ) ছাহেব আরও বলেন যে, "আকরাবিয়াতকে বুঝাইবার জন্য-ইহার উদাহরণ যতই অনুসন্ধান করিলাম, পাইলাম না।"
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালার অধিক নিকটতর হওয়া সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য তরিকায়ে নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়াতে একটি মাকাম নির্ধারিত আছে-যাহাকে আকরাবিয়াতের মাকাম বলা হয়। উল্লিখিত মাকামে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত; উরুজ-ছায়ের না করা পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার আকরাব বা নিকটতম হওয়া সম্পর্কীয় জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়। তবে সেখানে পৌছানো বড় কঠিন। খুব কম সংখ্যক সাধকই সেখানে পৌঁছাইতে পারিয়াছেন।
কেনইবা কঠিন হইবে না? আমাদের সমসৃষ্টি বাতাস। বাতাসের সমুদ্রে আমরা সদা বিরাজমান। অথচ সে বাতাসকে কি আমরা দেখি? বাতাস সম্পর্কে পুরাপুরি জ্ঞান কি আমরা অর্জন করিতে পারি?
শীত-গ্রীষ্ম আমাদেরই মত সমসৃষ্টি। শীতের প্রকোপে আমরা কাঁপিতে থাকি; গ্রীষ্মের উত্তাপে আমরা ঘর্মাক্ত হই। অথচ শীত বা গ্রীষ্মকে কতটুকু বুঝি। যেখানে বাতাস, শীত ও গ্রীষ্ম সম্পর্কে উপলব্ধি ভিন্ন নিখুঁত ভাবে বুঝিতে পরি না; সেখানে খোদাতায়ালা সম্পর্কে বুঝা বা জ্ঞান অর্জন করা কি করিয়া সহজে সম্ভব? সহজে বা অনায়াসে আল্লাহতায়ালাকে চেনা যায় না সত্য, তবে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কঠিন সাধনার মাধ্যমে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। সেই পথ-নির্দেশ সাধকবর্গ আমাদেরকে দান করিয়াছেন।
বিজ্ঞাপন
খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার যে পথ-সেই পথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মাকাম বা দায়েরা নির্ধারিত আছে। নসিহতসমূহের ৭ম খন্ডে 'আত্নদর্শনের পথে মাকাম-মঞ্জিল' নামক পুস্তকে দায়েরা সমূহের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। প্রথম মাকামকে বলা হয় দায়েরায়ে এমকান। দ্বিতীয় মাকামকে বলা হয় দায়েরায়ে বেলায়েতে ছোগরা এবং তৃতীয় মাকামকে বলা হয় দায়েরায়ে বেলায়েতে কোবরা। বেলায়েতে কোবরায় সাড়ে তিনটি অধ্যায় বর্তমান। যাহার প্রথম অধ্যায়কে আকরাবিয়াত বলা হয়। বক্ষমাণ নসিহতের আলোচনার বিষয়বস্তু এই আকরাবিয়াত।
আল্লাহ বলিতে জাত (সত্ত্বা) ও সিফাত (গুণাবলী)-এর সম্মিলিত রূপকে বুঝায়; কেবলমাত্র "জাত" নয়। সিফাত দুই প্রকারঃ সিফাতে হাকীকী ও সিফাতে এজাফিয়া। সিফাতে হাকীকী বা আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণসমূহ হইলঃ হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারাত, কালাম ও তাকবিন। এই আটটি সিফাত জাতকে কেন্দ্র করিয়া বর্তমান। কিন্তু কিরূপে বর্তমান-তাহা বর্ণনাযোগ্য নহে। এই আটটি সিফাতের দায়েরাকেই আকরাবিয়াত বলা হয়। উল্লিখিত আটটি গুণাবলীকে আটটি মহাগ্রন্থের সাথেও তুলনা করা যায়। "নাহনু আকরাবো এলাইহে মিন হাবলিল ওয়ারিদ"-অর্থাৎ খোদাতায়ালা আমাদের প্রাণরগ থেকেও নিকটে-এই আয়াতের মর্মার্থ বুঝিতে হইলে বা আল্লাহতায়ালার আকরাবিয়াত সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে উল্লিখিত আটটি মহা গ্রন্থের জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে।
খোদাতায়ালাকে চেনার পথে দুইটি University তে লেখা পড়া করিতে হয়। যথা এলমে হুছুলী এবং এলমে হুজুরী। এলমে হুছুলীতে জ্ঞান অর্জনে প্রয়োজন আলেম (যিনি জ্ঞান অর্জন করিবেন), মালুম (যে বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে) এবং এলেম (যাহা দ্বারা জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে); প্রয়োজন জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসাবে কালব, মস্তিষ্ক ও তাফাক্কুর। কালব ও মস্তিস্কের যোগাযোগেই এলমে হুছুলী অধ্যায়ে জ্ঞান অর্জন করিতে হয়। কিন্তু বর্ণিত উপাদান সমূহ সবই অকেজো এলমে হুজুরী অধ্যায়ে। এলমে হুজুরী নামক University তে কালব নাই, তাফাক্কুর নাই: আলেম নাই, এলেম নাই: আছে শুধু মালুম। সেখানে আলেম, মালুম ও এলেম-এই তিনই এক হইয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
আকরাবিয়াত মাকাম এলমে হুজুরী অধ্যায়ে অবস্থিত। আকরাবিয়াত থেকে ঊর্ধ্বের সব মাকাম-ই (মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী, কাওছ, বেলায়েতে উলিয়া ইত্যাদি) এলমে হুজরীতে অবস্থিত-যেখানে শুধু মালুম থাকে, আলেম তাহার এলেম লইয়া সেখানে প্রবেশ করিতে পারে না।
সেখানকার জ্ঞান অর্জনের রীতি, নীতি, ধরণ দুনিয়া বা আখেরাতের জ্ঞান অর্জনের মত নহে। সৃষ্টি জগতে স্থান, কাল, সময়, দূরত্ব, গতি, ছুরাত ইত্যাদি আছে; কিন্তু আকরাবিয়াতে স্থান নাই, কাল নাই, দূরত্ব নাই, গতি নাই, এমন কি কোন কিছুর ছুরাতও নাই। ছুরাত লইয়া সৃষ্টি সেখানে প্রবেশও করিতে পারে না। আর তাই হুজুরী অধ্যায়ের অর্জিত জ্ঞানকে প্রকাশ করা যায় না।
বান্দা খলিল তদীয় প্রণীত "আত্মদর্শনে সত্যদর্শন” নামক পুস্তকে আল্লাহতায়ালার সিফাতের দুর্বোধ্যতা সম্পর্কে আলোচনা করিতে যাইয়া একটি সুন্দর উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, আমরা জানি, আল্লাহতায়ালা সর্বশক্তিমান, কোন কাজই তাহার সাধ্যাতীত নহে। এই কথা কি আমরা সঠিকভাবে বুঝিতে পারি? না, আমরা তাহা বুঝি না। তিনি বলেন, ধরুন, আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহতায়ালা সর্বশক্তিমান। তবে তিনি কি এমন একটি বড় পাথর তৈয়ার করিতে পারেন-যাহা তিনি নাড়িতে পারেন না। যদি বলা হয়, হ্যাঁ, তিনি খুব বড় পাথর তৈরী করিতে পারেন। তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন উঠিবে, তবে তিনি ততবড় পাথর তৈরী করিতে পারেন না, যাহা তিনি নাড়িতে পারেন না। আবার যদি বলা হয় তিনি নাড়িতে পারেন, তাহা হইলে আবার প্রশ্ন উঠিবে, তাহা হইলে তিনি ততবড় পাথর তৈরী করিতে পারেন না-যাহা তিনি নাড়িতে পারেন না। আসলে যুক্তি-তর্ক, বিবেক-বুদ্ধি, কালব-মস্তিস্ক কোন কিছু দিয়াই খোদাতায়ালার জাত-সিফাতকে বুঝা যাবে না; বুঝা যাবে না খোদাতায়ালার আকরাবিয়াত বা অধিক নিকটতর হওয়া বিষয়ে।
বিজ্ঞাপন
পূর্বে বলা হইল যে, এলমে হুজুরী অধ্যায়ে আলেম তাহার এলেম লইয়া প্রবেশ করিতে পারে না; সেখানে থাকে শুধু মালুম। প্রশ্ন হইতে পারে, আলেম যদি না থাকেন, তবে জ্ঞান অর্জন করিবেন কে? আসলে আলেম থাকে না-তাহা নহে। আলেম থাকেন, তবে নিরাকার হাকীকী অবস্থায়; সূক্ষ্ম বা স্কুল-কোন ছুরাতেই আকরাবিয়াতে আলেম প্রবেশ করিতে পারে না।
এই অবস্থা সম্পর্কে বুঝার জন্য সৃষ্টিপূর্ব অবস্থার আলোচনা প্রয়োজন। আল্লাহপাক বলেন, কোন কিছু সৃষ্টি করার জন্য আমি "কুন" বা হও বলি। সংগে সংগে হইয়া যায়। "কুন" বা হও আদেশসূচক শব্দ। যেহেতু 'কুন' আদেশ সূচক শব্দ; তাহা হইলে বুঝা যায় 'কুন' আদেশ প্রয়োগের সময় নিশ্চয়ই সেখানে আদিষ্ট বস্তুর বর্তমানতা থাকিবে। যদি আদিষ্ট বস্তুর উপস্থিতি তথায় না থাকে, তবে কাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহতায়ালা 'কুন' আদেশ করিবেন?
আসলে সৃষ্ট বস্তুর হকিকত আছে আকরাবিয়াতস্থিত সিফাতে হাকীকীর মধ্যে। পূর্বেই বলা হইয়াছে, সেফাতে হাকীকীর দুইটি অবস্থা। একটি নিখুঁত অবস্থা, অপরটি খুঁতবিশিষ্ট অবস্থা। সিফাতে হাকীকীস্থিত খুঁত বিশিষ্ট অবস্থাই হইল সৃষ্টির হকিকত। 'কুন' আদেশ শ্রবণে সিফাতস্থিত সেই হকিকত তাহার প্রতিবিম্ব ফেলে আকরাবিয়াতের নিম্নে বেলায়েতে ছোগরায়। বেলায়েতে ছোগরাস্থিত সৃষ্টির প্রতিবিম্বে আল্লাহপাক "রূহ" ফুকিয়া দেন; নিজস্ব গুণাগুণ থেকে ধার হিসেবে প্রতিবিম্বসরূপ চিন্তন, শ্রবণ, দর্শন, বর্ণন, কথন ইত্যাদি দান করেন। সেখানে সৃষ্টি সূক্ষ্ম আকৃতিতে বেলায়েতে ছোগরারত আলমে আরওয়াতে স্থিত হয়। ইহার পর সৃষ্টি বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়া অবতরণ করে আলমে খালকে বা এই দুনিয়াতে-স্কুল আকৃতিতে।
বিজ্ঞাপন
উপরের আলোচনায় মানুষের মোটা মুটি তিনটি অবস্থা সম্পর্কে জানা গেল। যথাঃ
☆ আকরাবিয়াতস্থিত মানুষের নিরাকার হাকীকী অবস্থা।
☆ আলমে আরওয়াহস্থিত মানুষের সূক্ষ্ম অবস্থা।
বিজ্ঞাপন
☆ দুনিয়াস্থিত মানুষের স্কুল অবস্থা।
এই দুনিয়া থেকে মানুষ যখন খোদাতায়ালামুখী যাত্রা করে, প্রথমে তাহাকে তাহার স্কুল শরীর থেকে বাহির হইয়া স্থূল ও সূক্ষ্ম (নূরময়) জগতে বিচরণ করিতে হয়; জ্ঞান অর্জন করিতে হয়। অতঃপর নূরময় জগৎকেও অতিক্রম করিয়া, নিজ সূক্ষ্ম ছুরাতকে পিছনে ফেলাইয়া আল্লাহতায়ালার ফজলে আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিতে হয়। এই সময় কালব ও কালবের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান নীচে পড়িয়া থাকে। স্থুল বা
সূক্ষ্ম-উভয় ছরাতই নীচে পড়িয়া থাকে। আকরাবিয়াত থেকে নীচে তাকাইলে সবই স্পষ্ট বুঝা যায়।
বিজ্ঞাপন
আকরাবিয়াতের নীচে আছে তাজাল্লীয়াতে আফয়াল (আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াকলাপ)। কালব অধ্যায়ে আলোচনা করা হইয়াছে যে, কালবের মূল আরশ, মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়াল। এই কারণে উর্ধ্বদিকে উরুজের সময় কালব ইহার মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়ালে ফানা প্রাপ্ত হয় বা লীন হয়। ফলে কালবের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান (এলেম) বা বুঝাবুঝির জ্ঞান বা বর্ণনাযোগ্য জ্ঞান আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিতে পারে না।
কালবের শেষ সীমা তাজাল্লীয়াতে আফয়াল। এলমে হুছুলী নামক University-এর শেষ ক্লাসও তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল-যাহা বেলায়েতে ছোগরার শেষ প্রান্তে আকরাবিয়াতের নিম্নে অবস্থিত। সুতরাং এলেম অর্থাৎ অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞান বা কালবী জ্ঞান যে আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিতে পারে না-তাহা বুঝা গেল। আরও বুঝা গেল, আলেম তাহার স্কুল বা সূক্ষ্ম-কোন ছুরাতেই আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিতে পারে না। তবে আকরাবিয়াতে সৃষ্টির যে নিরাকার হকিকত আছে-সেই হকিকত বা নাফসে মোলহেমা খোদাতায়ালা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। ইহা ব্যতীত বেলায়েতে কোবরার শেষ প্রান্তে সাধককে দেওয়া হয় 'অজুদ মাওহুব লাহু' নামক এক নূরের দেহ-যাহার সাহায্যে বিদ্যুতের চেয়েও লক্ষ গুণ বেগে ছায়ের করিয়া সাধক জ্ঞান অর্জন করিতে পারে।
সাধকের নিরাকার হকিকত বা নাফসে মোলহেমা সৃষ্টবস্তুর অন্তর্ভুক্ত নহে-তাহা সিফাতে হাকীকীস্থিত খুঁত বিশিষ্ট অবস্থা। সিফাতে হাকীকী যেমন চিরস্থায়ী, সিফাতে হাকীকীর খুঁত বিশিষ্ট অবস্থা বা মানুষের নিরাকার হকিকতও তেমনি চিরস্থায়ী। এই জন্য বলা হয়, মানুষ "খোলেকতুম লিল আবাদ"-অর্থাৎ চিরজীবী সত্ত্বা। তাই সাধক যখন আকরাবিয়াতের মাকামে উন্নীত হয়-তখন সে হায়াতে আবাদী বা চিরজীবন লাভ করে। সে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়। মানুষের নিরাকার হকিকত নিরাকার খোদাতায়ালার অর্থাৎ জাত ও সিফাতের জ্ঞান অর্জন করিতে পারে, তবে আকার জগতে সে জ্ঞান প্রকাশ করা বা বর্ণনা করা যায় না। তাই বলা হয়, আল্লাহপাক জ্ঞানের অতীত অর্থাৎ বর্ণনা সাপেক্ষ ও প্রকাশযোগ্য জ্ঞানের বাহিরে।
সাধক তাহার নিরাকার হকিকতের মাধ্যমে নিরাকার জাত ও সিফাতের
যে জ্ঞান অর্জন করে -সেই ব্যাপক জ্ঞানের তুলনায় বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত অর্জিত জ্ঞান ধর্তব্যই নহে। তাই মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বেলায়েতে ছোগরাস্থিত মারেফাতকে আসল মারেফাতের মোকাবেলায় 'মারুকু ফিত্ তারীক'
مَتْرُوكَ فِي الطَّرِيقِ
অর্থাৎ- 'রাস্তায় ফেলে দেওয়া খড়কুটা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।'
প্রত্যেকটি বিষয়েরই দুইটি অবস্থা আছে। ছুরাত ও হকিকত। যেমন সৃষ্টির (মানুষের) ছুরাত আছে (আলমে খালক ও আলমে আরওয়াহতে); আবার নিরাকার হকিকত আছে (আকরাবিয়াতে)। শরীয়তের ছুরাত আছে; আবার ইহার হকিকত আছে। ঠিক তেমনি মারেফাতের ছুরাত আছে; হকিকতও আছে। মারেফাতের ছুরাতের সীমা বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত অর্থাৎ এলমে হুছুলী নামক University-এর শেষ ক্লাস পর্যন্ত। আর মারেফাতের হকিকতের শুরু আকরাবিয়াত থেকে; ইহার শেষ মহব্বত, শান, শয়ুনাত ও ইতেবারের পরপারে জাতের প্রান্তে-জাতের দর্শনে।
মানুষকে এক অমূল্য সম্পদ দেওয়া হইয়াছে-তাহা হইল প্রেম বা মহব্বত। আল্লাহপাক বলেন, তোমরা যদি আমার হেরেম (অন্তঃপুরে)-এ আসিতে চাও, তবে তিনটি জগৎ পার হইয়া আস। জড় জগৎ, নূরের জগৎ ও সিফাতের জগৎ। যদি তিনটি জগৎ পার হইয়া আসিতে পার; তবে তোমার সাথে শুরু হবে আমার প্রেমের খেলা। আকরাবিয়াতে উন্নীত সাধককে আল্লাহতায়ালা দ্রুতগামী প্রেমের এক বাহন দান করেন-যে বাহনে চড়িয়া সাধক নিজ হকিকত জগৎ- সিফাতে হাকীকীকেও অতিক্রম করিয়া, শান, শয়ুনাত ও ইতেবারকে অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার জাতে পৌছায়-উচ্চ স্তরের ফেরেশতাদের পক্ষে যাহা চিন্তারও অতীত। ইহা সম্ভব হয় প্রেমের কারণে। দয়াল নবী (সাঃ) বলেন,
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
অর্থাৎ- 'যে যাহাকে ভালবাসে, সে তাহার সহিত থাকে।' খোদাতায়ালার প্রেমের আকর্ষণে সাধক নিজ উৎপত্তিস্থলও পার হইয়া তাই জাতের নৈকট্য হাছিল করে।
"খোদাতায়ালা আমাদের জানরগ থেকে নিকটবর্তী"-কুরআন মজীদের এই অকাট্য বাণীর মর্মার্থ বা তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে হইলে প্রয়োজন জড় জগৎ, নূরের জগৎ ও সিফাতের জগৎ (সেফাতে এজাফিয়া) অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার হেরেমে (অন্তপুরে) প্রবেশ করা, আকরাবিয়াতস্থিত সিফাতে হাকীকীর অষ্ট গ্রন্থ (হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তাকবিন) অধ্যায়ন করা। সেই জন্য প্রয়োজন কামেল পীরের আশীষ বা অনুকম্পা। কামেল পীরের দয়া বা অনুকম্পায় মুরীদ নাফসের খোলসমুক্ত হয়, শয়তানের প্ররোচনা মুক্ত হয়; জড় দেহ থেকে বাহির হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। এখানে পীরের নির্দেশিত পথে মুরীদকে অপরিসীম শ্রম দিতে হয়; অনাহারে থাকিতে হয়।
নাফসকে বশীভূত করা এবং দেলকে গোনাহের ময়লা থেকে পরিষ্কার করার জন্য দুইটি অস্ত্রের একান্তই প্রয়োজন। যথাঃ ক্ষুধার চাবুক ও জেকেরের মুগুর। ক্ষুধার চাবুকে নাফসে আম্মারাকে দূর্বল করিতে হয় এবং জেকেরের মুগুরের সাহায্যে অর্থাৎ মুহুর্মুহ জেকেরের মাধ্যমে দেলে পুঞ্জিভূত গোনাহের পাহাড়কে ভাংগিয়া চুরমার করিতে হয়। এইজন্য প্রাথমিক পর্যায়ে মুরীদকে কল্পনাতীত সাধনায় আত্মনিয়োগ করিতে হয়। সবই করিতে হয় পীরের নির্দেশিত পথে, পীরের কদমে থাকিয়া। ফলে পীরের আশীষ বৃষ্টির মত মুরীদের উপর বর্ষে। নাফসকে কাবু করিতে সে সক্ষম হয়। শয়তানও সাধনারত সে মুরীদকে পথভ্রষ্ট করিবার আর ফাক-ফোকর খুঁজিয়া পায় না। পীরের দয়ায় মুরীদের লতিফাসমূহ জাগ্রত হয়। মাথার চান্দি থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত তেত্রিশ কোটি লতিফাই জাগ্রত হয়। তেত্রিশ কোটি মুখে মুরীদ জেকের করিতে সক্ষম হয়। সে সুলতানুল আজকারের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়। কোটি কোটি লতিফার স্পন্দনে সে এক অভূতপূর্ব আনন্দ পায়।
কোথাও লক্ষ বাতি সজ্জিত করিয়া একটি মাত্র সুইজে টিপ দিলে যেমন একই সাথে লক্ষ বাতি জ্বলিয়া উঠে; তেমনি পীরের আশীষ বা নেক দৃষ্টিতে বা তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীতে মুরীদের অজুদ রাজ্যের কোটি কোটি নূরের বাল্ব মুহূর্তেই জ্বলিয়া উঠিয়া এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে; মুরীদের হৃদয়ে শান্তির অনন্ত প্রবাহ সৃষ্টি হয়-যে শান্তির খবর ভুক্তভোগী ব্যতীত অন্য কেহ রাখে না। মুরীদ কালবি-নেত্রে সমুদয় সৃষ্টি জগৎ দেখে, সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জন করে। জাগ্রত ও আনন্দস্নাত রূহের মাধ্যমে নূরময় জগৎ বিচরণ করে; আলমে আরওয়াহর গুণাগুণ অর্জন করে; অসংখ্য সিফাতে এজাফিয়াতে বিচরণ করে; ভ্রমণ করে সৃষ্টির সহিত সম্পর্কযুক্ত খোদাতায়ালার অসংখ্য নাম বা আসমাসমূহে। যেমন খালেক (সৃষ্টিকর্তা), গাফ্ফার (ক্ষমাশীল), রাজ্জাক (জীবিকাদাতা), ওয়াহ্হাব (মহাদানশীল), রহমান (পরম করুণাময়), রাহীম (দয়ালু), সালাম (শান্তিদাতা) ইত্যাদি। খোদাতায়ালার উল্লিখিত নামসমূহ সিফাতে এজাফিয়ার বৃত্তে অবস্থিত। সিফাতে এজাফিয়া মূলতঃ সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব।
মুরীদ রূহের মাধ্যমে উরুজ ও ছায়ের করিয়া ধীরে ধীরে সিফাতে এজাফিয়া ও তাজাল্লীয়াতে আয়ালের জ্ঞান অর্জন করে। সবই বেলায়েতে ছোগরাগত অধ্যায়ের জ্ঞান। এই অধ্যায় পর্যন্ত কালবের মাধ্যমে ও রূহের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করা যায়-ইহার ঊর্ধ্বে আর কালব ও রূহের কার্যকারিতা নাই। রূহ সিফাতে এরাদতে বিলীন হয়।
বেলায়েতে ছোগরাতে মুরীদের নাফস মোৎমাইন্ন্যা প্রাপ্ত হয়; নাফসের আল্লাহ বিরোধিতা দূর হয়। আর এক বিশেষ হাল এই দায়েরাতে পরিলক্ষিত হয়। মুরীদ যে দিকেই তাকায়, সেই দিকেই দেখে-শুধু নূর আর নূর। সিফাতে এজাফিয়ার নূর। আফ্যালে জাতিয়ার নূর। আলমে আরওয়াহর নূর। আল্লাহর অজুদের নূর। আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের নূর। নূরে নূরে নূরময় সর্বদিক। সেই নূরে মুরীদ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মান্ডকে নিমজ্জিত দেখে। নিমজ্জিত দেখে নিজেকেও। নিজেকে আর নূর থেকে পৃথক করিতে পারে না। ফলে শরীয়তের খেলাফ কিছু কথা, কিছু কর্ম তাহার থেকে প্রকাশ পায়। এই সমস্ত কথা বা কর্ম কোফ্রে তরিকতের সামিল। অবশ্য এই মাকাম থেকে আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিলে তাহার উক্ত বিভ্রান্তিকর হাল কাটিয়া যায়। মুরীদ শরীয়তের হকিকতে প্রবেশ করে; এখান থেকে শরীয়তের হকিকতের জ্ঞান ছালেকের অর্জিত হয়। সে বুঝিতে পারে যে, আল্লাহতায়ালা তাহার প্রাণরগ হইতেও নিকটে; সে অনুভব করে যে, খোদাতায়ালার জাত তাহার তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে প্রবাহিত।
জাত ও সিফাতের আলোচনায় বলা হইয়াছে যে, জাত সিফাতের মুখাপেক্ষী নহে। সিফাতের কারণে জাত গুণান্বিত-তাহা নহে। অর্থাৎ সিফাতে এলেমের মাধ্যমে জাত জ্ঞানী, তাহা নয়-জাত স্বয়ং জ্ঞানী; সিফাতে হায়াতের কারণে জাত চিরজীবী-তাহা নহে; জাত স্বয়ং চিরজীবী। অর্থাৎ সিফাতে হাকীকীতে যে গুণাবলী বর্তমান-তাহাদের সবই জাতে বর্তমান। মূলতঃ সিফাতে হাকীকী হইল জাতগত গুণাবলীর প্রতিবিম্ব। এক কথায় সিফাতে হাকীকী হইল জাতের প্রতিবিম্ব। ঠিক তেমনি সিফাতে এজাফিয়া হইল সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব। আবার সিফাতে এজাফিয়া বা তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের দূরবর্তী প্রতিবিম্ব হইল সৃষ্টিজগৎ।
সিফাতে হাকীকীর মধ্যে সৃষ্টির যে নিরাকার হকিকত আছে-তাহা সৃষ্ট বস্তু নহে-ইহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। আল্লাহতায়ালার "কুন" আদেশ শুনিয়া উক্ত হকিকত প্রথমে সূক্ষ্ম (আলমে আরোওয়াহতে) এবং পরে স্কুল শরীরের সহিত মিলিত হইয়াছে। সূক্ষ্ম ও স্কুল শরীরের সহিত হকিকতের মিলনের সময় সৃজনকারীর সৃজনকার্য পরিলক্ষিত হয়।
মোজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই প্রসংগে বলেন, রঞ্জনকারীর কাজ হইল রং লাগানোর সহিত জড়িত, কাপড় তৈরীর সহিত নয়। তেমনি সৃজনকারী কেবল সৃষ্টির হকিকতকে 'কুন' আদেশের প্রভাবে নিরাপদ ক্ষেত্র আকরাবিয়াত থেকে বাহির করিয়া নিম্নে সূক্ষ্ম ও স্কুল আকৃতির সহিত মিলাইয়া দেন-ইহাই সৃজন কার্য।
এতক্ষণের আলোচনায় বুঝা গেল যে, জাতের প্রতিবিম্ব হইল সিফাত, সিফাতের প্রতিবিম্ব আয়াল এবং আফাল (আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াকলাপ)-এর প্রতিবিম্ব সৃষ্টজগৎ। অন্য কথায়, সৃষ্ট জগতের আসল হইল খোদাতায়ালার আফয়াল বা ক্রিয়াকলাপ, আ্যাল বা ক্রিয়াকলাপের আসল বা মূল হইল সিফাত বা গুণাবলী, আর সিফাতের মূল হইল জাত বা সত্ত্বা।
এবার যে কোন তিনটি অবস্থা নিয়ে চিন্তা করি। প্রথমে -জাত (সত্ত্বা), আফয়াল (ক্রিয়া কলাপ-যাহা আকরাবিয়াতের নিম্নে) এবং সৃষ্টিজগৎ। এই তিনটি অবস্থা নিয়ে চিন্তা করিলে দেখা যায় যে সৃষ্টিজগৎ হইতে ক্রিয়াকলাপ (আফ্যাল) আল্লাহতায়ালার জাতের অধিক নিকটবর্তী। কিন্তু আফয়াল হইল সিফাতের প্রতিবিম্ব [সেফাতে হাকীকী আকরাবিয়াতে অবস্থিত।] এবার যদি জাত, সিফাত (আকরাবিয়াতস্থিত হাকীকী সিফাত) এবং আফ্যালকে চিন্তা করি-তাহা হইলে দেখা যায় যে, আফ্যাল (ক্রিয়াকলাপ) এর চাইতে আল্লাহতায়ালার সিফাত তাহার জাতের অধিক নিকটবর্তী। যদি বলা হয়, কোন অবস্থা জাতের অধিক নিকটবর্তী?
এক কথায় যাহা দাঁড়ায় তাহা হইল, সৃষ্টিজগতের চেয়ে আফয়াল; আফয়ালের চেয়ে সিফাত জাতের অধিক নিকটবর্তী। আর সিফাতের মধ্যেই হইল মানুষের নিরাকার হকিকত। যেহেতু জাত সিফাতের সর্বাধিক নিকটবর্তী-সেহেতু জাত সিফাতস্থিত সাধকের নিরাকার হকিকত বা নাফসে মোলহেমার অত্যাধিক নিকটে হইবে-এটাই স্বাভাবিক।
কোন সাধক যখন আকরাবিয়াতে বা সিফাতে হাকীকীতে পৌছায়-তখন পবিত্র জাত তাহার স্কুল শরীর বা সূক্ষ্ম শরীর (রূহানী অবস্থা) এর চেয়ে সিফাতস্থিত নিরাকার হকিকত বা নাফসে মোলহেমার অধিক নিকটতর হয়। এই জন্য আল্লাহতায়ালা বলেন, 'নাহনু আকরাবো এলাইহে মিন হাবলিল ওয়ারিদ'-অর্থাৎ আমি তোমার জান রগ থেকেও নিকটবর্তী এবং পীরানে পীরগণ বলেন, আল্লাহতায়ালার জাত-সমুদ্রে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ নিমজ্জিত বা আল্লাহতায়ালার জাত সৃষ্টের প্রত্যেক তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে প্রবাহিত।
হে জাকেরান সকল! তোমরা আল্লাহতায়ালার আকরাবিয়াত বা আমাদের প্রাণাপেক্ষা অধিক নিকটবর্তী হওয়া সম্পর্কে কিছু বুঝিতে পারিলে। যদি নিজ অভিজ্ঞতায় ইহা আস্বাদান করিতে চাও, তবে তোমাদেরকে জড় জগৎ, নূরের জগৎ ও সিফাতের জগৎ পার হইয়া খোদাতায়ালার হেরেমে (অন্তঃপুরে) বা আকরাবিয়াতের মাকামে পৌঁছাইতে হইবে। সে জন্য প্রয়োজন পীরের আশীষ, পীরের দয়া বা পীরের সন্তুষ্টি। আর পীরের সন্তুটি অর্জনের জন্য প্রয়োজন পীরের নির্দেশ যথাযথ প্রতিপালন এবং পীরের কদমে খেদমত। পীর যদি সন্তুষ্ট হয়, তাহা হইলে আর কোন ভয় নাই। মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন,
"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল,
হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"
অর্থাৎ-যেই মাত্র তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে, তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসেবে, রাসূল তোমাকে উম্মত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি তুমি তখনই লাভ করিলে, যখন পীরের তরফ থেকে তুমি স্বীকৃতি পাইলে।








